STORYMIRROR

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror Tragedy

3  

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror Tragedy

পূর্ণবৃত্ত - ৪

পূর্ণবৃত্ত - ৪

5 mins
208


সত্যিই তাই, পরের দিনও হীয়ারিং করা গেলো না! এই কেসটাতে আমার দ্বারা স্থিরীকৃত একটা শুনানির দিনেও আমি হীয়ারিং করতে পারলাম না! তবে এই শেষবারের কারণটা ছিল সবথেকে বিস্ময়কর এবং অভাবনীয়। আমি কল্পনাই করতে পারিনি যে এইভাবে কেসটার দফা রফা হয়ে যাবে। আমার কি কিছুই করার থাকবে না?


ঐ শুনানির দিন সরকারী উকিল এসে, আমার চাওয়া আগের তিনটে মৃত্যুর ঘটনারই তদন্ত রীপোর্ট পেশ করলেন। ওদিকে না জামানুদ্দিন না ধীরাজ শেঠকে দেখতে পেলাম কোর্টে! আমি ঐ বিষয়েই প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম এমন সময় সদর থানার এক পুলিশ কর্মী এসে পি.পি. সাহেবকে কিছু জানালেন। পি.পি. সাহেব আমায় বললেন - স্যার, এই কেসে আবার নতুন মোড়। এই যে ইনি, সদর থানার এ.এস.আই, কোর্টকে কিছু জানাতে চান।


এ.এস.আই পুলিশ অফিসারটি তখন আমার অনুমতি ক্রমে এগিয়ে এসে জানালেন - স্যার, আজ ভোরে এই কেসের অন্যতম অভিযুক্ত শ্রী জামানুদ্দিন তার অ্যাডভোকেট শ্রী ধীরাজ শেঠের বাড়িতে খুন হয়েছে!


-

ওখানে পুলিশ প্রহরা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত খুন কিভাবে হলো? পুলিশ কি করছিলো? - প্রশ্নটা করতেই পুলিশ অফিসারটি আমায় আরো অবাক করে দিয়ে জবাব দিলেন - স্যার, পুলিশ প্রহরা ছিল তো ওখানে। আততায়ী ধরাও পড়েছে।


বিরক্ত হয়ে বললাম - তাহলে তাকে হাজির করা হলো না কেন কোর্টে? আর বিবাদী পক্ষের উকিল, ধীরাজ শেঠই বা গেলেন কোথায়? খুনের ঘটনার সময় তিনি কি করছিলেন?


পুলিশ অফিসারটি বললেন - স্যার, খুনটা ধীরাজ শেঠ নিজেই তো করেছেন!

আমি তো শুনেই চমকে উঠলাম - কে খুন করেছে? অ্যাডভোকেট ধীরাজ শেঠ, নিজেই? ঠিক ক্লিয়ার হলো না। একটু খুলে ডিটেলে বলুন তো ঠিক কি ঘটেছে?


অফিসারটি বললেন - জামানউদ্দিনের কোমর না হাঁটুর কি একটা সমস্যা ছিলো। তাই সে ধীরাজ শেঠের বাড়ির দোতলায় ওঠা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলো।


সে'জন্যই উকিল সাহেবের বাড়িতে একতলার একটা ঘরেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।


আমাদের পুলিশের দু'জন কনস্টেবল বাড়ির দুই তলায় বারান্দায় পাহারা দিচ্ছিলো। আজ ভোর রাতে ধীরাজ শেঠ তাঁর দোতলার বেডরুম থেকে বের হয়ে নিচে জামানের ঘরে আসেন। কিন্তু তার ঘরে যান নি। জানালার কাছে এসে ঘরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ প্রায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে আবার তৎক্ষণাৎ ওখানে ফিরে আসেন।


প্রায় সকাল হয়েই এসেছিলো আর পুলিশদেরও তখন ডিউটি টীম চেঞ্জ হচ্ছিলো। আজ যেহেতু তাঁদের কোর্টে আসার দিন ছিল, তাই ওরা ভেবেছিলো - উনি হয়তো বিশেষ কিছু আলোচনা করতেই যাচ্ছেন ওঁর ক্লায়েন্টের সাথে! কিন্তু পরের বার ঐ জানালার কাছে ফিরে এসে নিজের পকেট থেকে পিস্তল বের করে, উকিল সাহেব সোজা গুলি চালিয়ে দিন জামানের ওপর! আর জামান তার ঘুমের মধ্যেই মারা যায়।


ঘটনার আকস্মিকতায় সবাইই তখন চমকে গিয়েছিলো - শুধু ধীরাজ শেঠ নিজে স্বাভাবিক ছিলেন। এরপর নিজেই তিনি প্রহরারত পুলিশ কনস্টেবলের হাতে নিজের পিস্তল স্যারেণ্ডার করেন। সদর থানা থেকেও কয়েকজন সিপাহী তখন দৌড়ে যায় ওখানে। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দুই কনস্টেবল থানায় আসে। তিনি নিজে জামানকে খুন করার কথা স্বীকার করে পুলিশকে বলেন - আমি নিজের অপরাধ স্বীকার করছি। আজ কোর্টে নিয়ে চলুন, আমার বয়ান আমি জাজ সাহেবের কাছেই দেবো।


এই পর্যন্ত বলেই উনি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে সেখানেই লুটিয়ে পড়েন! সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে তাঁর নার্ভ, ব্লাড প্রেশার, হার্টবীট সব নরম্যাল দেখলেও, এখনও তাঁর জ্ঞান ফেরে নি! এটা নাকি খুবই আশ্চর্যের বিষয় মনে হয়েছে তাঁদের - কারণ, এভাবে কারোর অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকার কোন যুক্তিই তাঁরা খুঁজে পান নি।


এই পর্যন্ত বলে অফিসারটি থামলেন।

আমিও ভারী আশ্চর্য্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম - আর কিছুই বলেন নি তিনি? পিস্তলের ফিঙ্গার প্রিন্ট পরীক্ষা করা হয়েছে? লাশ পোস্ট মর্টেমে গেছে?


পুলিশ অফিসারটি জানালেন - ফিঙ্গার প্রিন্ট ম্যাচ করেছে। লাশ পোস্ট মর্টেমে গেছে। বডি-তে পাওয়া গুলিগুলো এবং ওনার ঐ পিস্তলটাও ফরেনসিক করতে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যায় আগামী কাল সব রিপোর্ট হাতে এসে যাবে।


আমি রিপোর্টগুলো সব এসে গেলেই কোর্টে সেগুলো তৎক্ষণাৎ পেশ করার জন্য নির্দেশ দিলাম। আর ধীরাজ শেঠের জ্ঞান ফিরলেই তাকে আমার কোর্টে হাজির করতেও আদেশ দিলাম।


আমি সেদিন কোর্টে পি.পি.র পেশ করা আগের তিনটে ঘটনার রীপোর্টগুলো বেশ পরখ করে দেখলাম বাড়ি এসে।


পি.পি. সাহেবের মৃত্যুতে কোনো অস্বাভাবিকতার উল্লেখ কোথাও খুঁজে পেলাম না। তাঁর বডির কোন ময়না তদন্তও হয়নি। সুতরাং এখন তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে আর কিছুই জানার উপায় নেই।


তরুণটির বডির ময়না তদন্তে শুধু বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়েই মৃত্যুর প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া তার শরীরের আর কোথাও কোনো রকম কোনো আঘাতের চিহ্নই নাকি খুঁজে পাওয়া যায়নি! এর অর্থ হয় একটাই - কোন যানবাহনের ধাক্কায় সে নিচে পড়ে যায় নি! তাহলে? এখন এই ঘটনার সম্ভাবনা রইলো দুটো - হয় তাকে কেউ তুলে ঐ রেলিং টপকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ওভারহেডের তারের ওপর অথবা সে নিজেই রেলিং টপকে লাফ দিয়ে পড়েছে ঐ তারের ওপর! পুলিশের কাছেও ঐ ঘটনার অর্থাৎ ঐ তরুণের তারের ওপর এসে পড়ার বিষয়ে কোন রিপোর্ট ছিল না!


তাই পরের দিনই পি.পি. সাহেবকে ডেকে ঐ থানার আই.সি.কে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার জন্য বলতে জানিয়ে দিলাম। আই. সি. সেদিনই নিজেই এসে দেখা করলেন আমার সঙ্গে। আরে বাঃ, আই.সি. পদাধিকারী ছিল - আশিস, আমারই কলেজের জুনিয়র ছিল সে। আমরা একই হোস্টেলে থেকে পড়াশুনাও করেছি। বহু বছর পর দেখা হ'লো আমাদের!


আশিস জানালো - আমার নামটা শুনেই ও নিজেই এসেছে দেখা করতে। এরপর দুজনের পারস্পরিক কুশল বিনিময় এবং অনেক পুরানো স্মৃতিরোমন্থনের পর তাকে বললাম - ঐ ঘটনার তদন্তের কথা।


আশিস বললো - আমি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আজকেই রিপোর্ট করে দিচ্ছি। তুমি সন্ধ্যে অবধি পেয়ে যাবে।


তো, সেই রিপোর্ট আসলো, তার সঙ্গে একটা ঐ সিসিটিভি ফুটেজের সিডিও দিয়েছিলো আশিস। সিডিটা চালিয়ে দেখলাম - চলতে চলতে ছেলেটা ব্রীজ থেকে হঠাৎ যেন শূন্যে ভেসে গিয়ে রেলিং টপকে আছড়ে পড়লো ওভারহেডের ঐ তারের ওপর!বুঝলাম, আমার আর কিছুই করণীয় নেই এই ঘটনায়।


নৌকাডুবির রীপোর্টে দেখলাম - ট্রলারটির কোন ভূমিকা ছিল না দুর্ঘটনাটির পিছনে। নৌকাকর্মী দুজনেরও কোন কিছুই করার ছিলো না। কারণ, চলন্ত অবস্থায় আকস্মিক ভাবে নৌকাটির খোলের নিচে থেকে, ঠিক মাঝের কাঠের পাটাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো নৌকা থেকে!


আর ফলস্বরূপ, এরপর দ্রুতগামী যাত্রীবোঝাই ঐ নৌকাটি ঠিক ডাইভ দেবার মতন অকস্মাৎ নিম্নগামী হয়ে জলের মধ্যে তলিয়ে যায় কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই! কাঠের পাটাতনটার ঐভাবে নৌকার খোল থেকে ভেঙে বের হয়ে যাওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার! কিন্তু তবুও আপাতত দুর্ঘটনা বলেই তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় রইলো না!যদিও এখনও আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর পিছনে অন্য কারোর হাত থাকতেই হবে। নতুবা হঠাৎ করে একটা সচল নৌকায় এমন কাণ্ড ঘটতেই পারে না।


এখন শুধু ধীরাজ শেঠের জ্ঞান ফেরা আর তারপর তার বয়ান শোনাটাই বাকি রয়ে গেলো। জামানুদ্দিন দোষী বা নির্দোষ যাই হোক, তার মুক্তি বা সাজা ঘোষণা করা ছিল কোর্টের কাজ, তার উকিলের নয়!


আমি নিজেই ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড উৎসুক হয়ে উঠেছিলাম এটা জানার জন্য - ধীরাজ শেঠের মত একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ, স্থিতধী উকিল কি করে কেন এমন একটা ভয়ঙ্কর কাজ করে বসলেন?



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama