End of Summer Sale for children. Apply code SUMM100 at checkout!
End of Summer Sale for children. Apply code SUMM100 at checkout!

Baiduryya Sarkar

Romance Tragedy


1.0  

Baiduryya Sarkar

Romance Tragedy


প্রবাহ

প্রবাহ

8 mins 561 8 mins 561

সর্বক্ষণ একটা জানলার পাশে বসে নজর রাখে অমিতা । সামনে ওদের বাগানে আম জাম ফুলগাছ তারপর বেশ কিছুটা জঙলা জায়গা । এরপর মিশনারি স্কুল । অমিতা শুনেছে ফাঁকা জায়গাটায় একটা চার্চ হবে । সেজন্যই ওরা ফাঁকা জায়গাটা খুঁড়েছিল, তারপর কী হল কে জানে সব চুপচাপ । গত বর্ষায় জল জমে মজা পুকুরের চেহারা নিয়েছিল, পরে জল শুকিয়ে আগাছায় ভর্তি হয়ে জায়গাটা সাপ ব্যাঙ পোকামাকড়ের আড্ডা হয়ে উঠেছে । 

একা মানুষের পক্ষে গোটা বাড়ি সামলানো মুশকিল । তাই একটা জানলা দিয়ে আসা আলো হাওয়াতেই কাজ চালিয়ে নেয় অমিতা । সকাল আটটা থেকেই স্কুলটাতে ছেলেমেয়েদের আনাগোনা শুরু হয় । দুপুর বারোটা নাগাদ তাদের টিফিন ব্রেক হয় । হুটোপাটি দেখার জন্য জানলার ধারে সাগ্রহে বসে থাকে অমিতা । কেউ কেউ কথাও বলে ওর দিকে চেয়ে । অমিতা শুধু হাসে । ও খেয়েদেয়ে উঠলে তিনটের পর থেকে দফায় দফায় গার্জেনরা বাচ্চাদের নিয়ে যেতে থাকে । বিকেল সাড়ে চারটের মধ্যে সব ফরসা । পাঁচটা নাগাদ কয়েকজন টিচারকে দল বেঁধে চলে যেতে দেখে অমিতা । সবার শেষে সাদা জোব্বা পরা ফাদার আর সহকারী যায় । এরা সব আশপাশের কোয়ার্টারে থাকে বলে শুনেছে । ততক্ষণে আলো মরে আসে । নাজমা এসে বাসন ক’খানা মেজে দিয়ে যায়, আর পুরনো দিনের কিছু গপ্পোগাছা করে যায় । কথা বলার আর কেই বা আছে এখানে ! বড় ছেলেটা আলেকালে আসে, এসে এই ইংরেজি স্কুলটার দিকে তাকিয়ে কিসব বিড়বিড় করে বকে । ছোট ছেলের বউটা আসলে চুপি চুপি কাঁদে । নাতিটাকে দেখতে বড় সাধ হয় অমিতার, সে নাকি বেশ জোয়ান হয়ে উঠেছে দাদুর মতো।

ছুটির দিনগুলো ফাঁকা দুপুরগুলোয় স্কুল বাড়িটায় ঘুঘু ডাকে । নিঃসঙ্গ ঘুঘুর ডাক খুব চেনে অমিতা । স্কুল বিল্ডিংয়ের সামনে মেন গেট পেরিয়ে আলাদা একটা ছোটখাটো পাকা ঘর আছে । সেটায় গুনে গুনে দুদিকে দুটো জানলা । বাকী সময়টা ওখানে একজন পাহারাদার থাকে । সে যে কে – তা ঠিক জানে না অমিতা । তবে বুঝতে পারে তার মতোই কেউ অলক্ষ্যে জেগে আছে । নজর রাখছে । দারুণ বর্ষার দিনে ঘরটার ভেতরে জ্বলা আলো ঘষা কাঁচের পাল্লার ভেতর দিয়ে অস্পষ্টভাবে বাইরে আসতে দেখেছে অমিতা । যখন চারিদিকের অন্ধকারের মধ্যে বিদ্যুৎচমকে একা বাড়িতে কেঁপে ওঠে সে । শীতের সময়েও সের’ম । হুহু করে বয়ে চলা ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে ওই ঘরটায় জ্বলা আলোর আলতো রেখাটুকু ওকে খানিকটা ওম দেয় । অন্য দিনগুলোতে আলো স্পষ্ট ঝাপটা দেয়। অমিতা লক্ষ্য করেছে ওখানকার আলো এসে আমগাছের ছায়া ফেলে ওর ঘরের দেওয়ালে । গরমকালের রাতে পাহারাদার ছায়ামূর্তি হয়ে আশেপাশে হাওয়া খুঁজে ফেরে । তখন হয়তো অমিতা জোরে জোরে শ্বাস টানে ।

রাতের গার্ড বুধিয়া আপন মনে লাঠি ঠুকে ঘুরে বেড়ায় । ফাঁকা জঙলা জায়গা, তার ওপর এতবড় চৌহদ্দিতে একা। পাশ দিয়ে হাইরোড গেছে, বাড়িঘর কাছাকাছি বড় একটা নেই । জায়গাটাকে ওর খুব চেনা চেনা মনে হয়। কিন্তু আগে তো কখনও আসেনি । এখনে আছে বলতে একটা ভাঙাচোরা জমিদারবাড়ি । দেখেই বুধিয়ার মনে পড়েছিল, এখানকার এক জমিদারের খাস লেঠেল ছিল ওর দাদু । বাপের মতো সেও হাতে লাঠি নিয়ে দারোয়ানের কাজ করছে । লোকজন বড় একটা দেখা যায় না । কেউ থাকে না বোধহয় । ও জানে না, শুধু অমিতা একা অপেক্ষায় বসে থাকে শনিবারের জন্য, কখন আসবে তার বর । যেমন অফিস সেরে সে বরাবর ফিরতো ।

ওকে এই চাকরিতে স্কুল রেখেছে কেননা এখানে রাতে কেউ থাকতে চায় না । সকাল সাতটা নাগাদ কোনও একজন দরোয়ান এসে ‘বুধিয়া’ বলে ডাক দিলে ওর ছুটি হয় । তবে একদিকে সুবিধে, সন্ধে সাতটা থেকে সকাল সাতটা – কাজ বলতে শুধু আলো জ্বেলে একা বসে থাকা । রুটি সবজি কৌটোয় করে নিয়ে আসে বুধিয়া, সাথে একটু গুড়। কল থেকে জল ভরে কটা বোতল রেখে দেয় । খৈনি আর বিড়ি মজুত রাখে বুধিয়া। এতেই রাত কেটে যায়।    


খ।


কলকাতার বাসাবাড়ি থেকে কয়লা ইঞ্জিনের ট্রেনে চেপে বরের সাথে ছুটিতে এখানে আসার কথা মনে পড়ে অমিতার । তার আগে বর আসতো শনিবার বিকেলে, আবার ফিরে যেতো সোমবার ভোরে । গোটা সপ্তাহটা একা গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে অমিতা কোকিলের ডাক শুনতো ধূ ধূ দুপুরে । প্রথম প্রথম শুনতে বেশ লাগতো, আবার একটানা শুনলে বিরক্তিও লাগতো । অমিতা বুঝতো, সবই স্বপ্নের মতো । কোথা থেকে যেন ভেসে আসতো অস্পষ্ট বাঁশির সুর । এই গ্রামেরই মেয়ে সে, এ বাড়ির অন্ধিসন্ধিও আগে থেকেই সব জানা । বাড়ির ছোট ছেলের সাথে বিয়ের আগে থেকেই ওর যাতায়াত । 

বর এমনিতে ভদ্দরলোক ছিল, নেশাভাঙ ছিল না । তবে তবলা হারমোনিয়াম বাঁশি পেলে দুনিয়ার আর কিছু তার মনে থাকতো না । আমিতাও বিয়ের আগে আর পাঁচটা মেয়ের মতো গানবাজনা শিখেছিল । পরে তেমন আগ্রহ থাকেনি । বর এলে বৈঠকখানায় আসর বসাতো রবিবার । যাত্রার জোরদার মহলা শুরু হতো শীতে । সে বাবদে আশপাশের দুচারটে গ্রামে যাতায়াত করতো । কোথাও তেমন সন্ধান মিললে দু’চারদিনের জন্য নিরুদ্দেশ । গ্রামের জমজমাট জমিদার বাড়ি, কাজকর্মের লোকের অভাব ছিল না ।

বর ফিরলে মুখ ভার করে রাখতো অমিতা । তাতেও শান্তি ছিল না, জাপটে ধরে তাকে গরম করে তুলতো বর । অমিতা সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে মনে করতো – লোকে তার সুখ দেখতে পারে না বলে কুকথা রটায় । তাছাড়া পুরুষমানুষের বাইরের দিকে টান না থাকলেও বিপদ, সে ঘরের সব ব্যাপারে নাক গলায় ।

ওদের গ্রামে অনেক মুসলমান ছিল । স্বাধীনতার সময় শোনা গেছিল এ গ্রামের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা, কিন্তু কে জানে কেন যাওয়া হল না । বাড়িতে একটা কাজের বউ ছিল নাম – নাজমা । অমিতার বয়সী ছিল বলে, ভারী ভাব ছিল । মেয়েটার বরকে সবাই পাগল বললেও সে নাকি ছিল জ্বিনে পাওয়া । এমনিতে ভাল থাকলেও মাঝে মাঝেই খেপে যেতো । নাজমা ওকে বলতো এসব সময়ে বর তার ওপর নানারকম অত্যাচার করে, হাত পা বেঁধে চিৎপাত করে ফেলে করে, পেচ্ছাপ দিয়ে চান করিয়ে দেয়, সারারাত ঘুমোতে দেয় না । শুনে গা হাতপা শিরশির করে উঠতো অমিতার । তবে নাজমা হেসে এও বলতো, সে এমন সুখ মাঝে মাঝে দেয় মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় । নাজমা লাজুক মুখে অমিতাকে বলতো, এক জামাইবাবুর সাথে ওর ভারী আসনাই। সে এলে বরটাকে একদম ঠাণ্ডা করে দেয় । শুনে চোখ বড়বড় করে তাকাতো অমিতা ।

এসব গল্পগাছা, সুখের দিন বিশেষ রইল না আর । তখন বড় দু’টো ছেলেমেয়ে হয়েছে সবে । কিছুদিনের মধ্যে হাতছাড়া হল জমিজমা । রইল না জমিদারি বোলবোলাও । সরকার কেড়ে নিল সব । এই বাড়ি আর কিছু সম্পত্তি ছাড়া সব গেল । সেই শোকেই একে একে শ্বশুর ভাশুররা চোখ বুজলো । পুরো সংসার এসে পড়ল বরের মাথায়। তার গান বাজনা মাথায় উঠলেও ক্রমে ঠিক সামলে গেল সব । চাকরির সাথে কিসব ব্যবসা করে কলকাতায় নিজের মাথা গোঁজার জায়গা করে ফেললো । তখন গ্রামের বাড়ির ওদিকে খুব অশান্তি । পূব পাকিস্তান থেকে দলে দলে লোক এদিকে এসে অস্তানা গাড়ছে । অমিতা শুনেছিল, পাগলা বরটাকে ফেলে সেই জামাইয়ের সাথে নাজমা ওদিকে পালিয়ে গেছে ।

তারপর যা হয়, সংসার বাড়ছিল । তিন ছেলে চার মেয়ে । ছেলেপুলে বড় হচ্ছিল । গ্রামের বাঁধন কেটে যাচ্ছিল একটু একটু করে । তবে বড় ছেলেটা নকশাল হয়ে কিছুদিন এই বাড়িতে লুকিয়েছিল । সে যে কিসব করতো, জানতো না অমিতারা । শুনেছিল, গ্রামের বাড়ি থেকে যেদিন কলকাতায় ফিরেছিল সেদিনই তাকে গুলি করে মেরেছিল পুলিস । ডেডবডি পর্যন্ত দিতে চায়নি । অমিতা তখন শক্ত হয়ে সংসার সামলেছে, পরের বছর বড় মেয়েটার বিয়ে দিয়েছে । মেজো ছেলে পড়াশোনা করে সেই যে বিদেশ গেছে – আর ফেরেনি । কোনও খবর পাওয়া যায়নি । সে মেম বিয়ে করেছে, কানাঘুষো শুনেছিল অমিতা । ছোট ছেলেটা ছেলেপুলে নিয়ে কলকাতার বাড়িতে আছে । তার বড়বাজারে দোকান । বাপ ওকেই বোধহয় বেশী ভালবাসতো, তাই দোকানের ব্যবস্থাটা যাওয়ার আগে করে দিয়ে গেছিল । মেয়েদেরও যথাসাধ্য দিয়ে গেছে বাপ । তবু তাদের আশ মেটেনি । বর ওকে ফেলে গেছে, তাই নিত্য অশান্তি পোয়াতে হতো অমিতাকে । 


গ।


জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাপের সাথে ঝামেলা লাগে ধীমানের । বাপ বিষয়ী লোক, ধীমানের কোনও ব্যাপারেই গা করে না । ধীমান ছবি তুলতে ভালবাসে, অনেক কষ্টে একটা সেকেণ্ড হ্যাণ্ড ক্যামেরা কিনেছে । সেই নিয়েই ছবি তুলে আওয়ার্ড পায় । গান না শিখলেও ইউটিউবে শুনে অনেক গান চমৎকার গাইতে পারে । তাতে কোনও কদর নেই । অনেক টাকা রোজগার না করতে পারলে এমনই হয় । তার চাকরি করতে ভাল লাগে না, দুচারটে জায়গায় পেয়েও ছেড়ে দিয়েছে । ব্যবসাতেও ঢুকতে চায় না ।

বাপের থেকে হেন কুকথা নেই সে শোনেনি । নেহাত মা মরা ছেলে তাই বাড়ি থেকে তাড়ায়নি । তবে বাপ চেনা আরেক ব্যবসাদারের মেয়ের সাথে তার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে । ধীমানের মনে হয়েছে, এবার তাকে হেস্তনেস্ত করতেই হবে । তাই ব্যাগে কিছু টুকটাক জামাকাপড়, কিছু টাকা আর ক্যামেরা ঝুলিয়ে ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছে । গন্তব্য তাদের গ্রামের বাড়ি । যদিও জানে না, সেখানকার পরিস্থিতি কি। সেখানে অনেক ছোটবেলায় গেছিল ।

সেই ভরসাতেই ঘণ্টাদুয়েক পর ট্রেন থেকে নেমে টোটোওলাকে বোঝাতে পারলো ওখানে যাওয়ার কথা । লোকটা প্রথমে ভেবেছিল স্কুলে যাবে বোধহয় । কথায় কথায় ওই বাড়ির কথা বলাতে সে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল । উত্তেজনার চোটে ধীমান এখন থেকে ওখানে থাকবে বলাতে লোকটা ওকে পাগল ঠাওরালো হয়তো । কিন্তু তাতে ধীমানের কিছু যায় আসে না, ওর কেমন যেন একটা রোখ চেপে গেছে । 

ঝলমলে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙাচোরা এই অট্টালিকা ছবি তোলার তোলার পক্ষে আদর্শ হলেও এখানে থাকা সম্ভব কি ? নিজেকে প্রশ্নটা করে যখন আগাছার জঙ্গল ভেঙে ধীমান বাড়িটায় ঢুকছিল, লক্ষ্য করলো লাঠি হাতে একটা লোক ওর দিকে চেয়ে আছে অবাক হয়ে । লোকটা এক পা দু’পা করে কাছে আসলে, ধীমান জিজ্ঞেস করলো – এখানে থাকা যাবে ? ঘরদোর ভাল আছে !

লোকটাও অবাক । এর’ম ভাঙা বাড়িতে কেউ থাকতে আসে বলে শোনেনি কখনও । তবে মুখে কিছু বলল না, বরং কিসের একটা টানে সেও ধীমানের পেছনে এসে বাড়িতে ঢুকলো । একটা বহুদিনের পুরনো চাপা দীর্ঘশ্বাস যেন মুক্তি পেল এতদিনে । যেখানটা দালান ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে ধীমানের মনে হল এতদিন এখানে আসারই কথা হয়ে ছিল ওর । কেউ বলেনি। তবু ভেতরের কে যেন ধাক্কা দিয়ে ওকে এখানে এনে ফেলেছে । গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখে বুঝতে পারলো ওপরের কয়েকটা ঘর মোটামুটি বাসযোগ্য আছে । রান্নার সাবেক জায়গাটায় কিছু বাসনপত্র স্টোভ পাওয়া গেল । বাথরুম ভাঙাচোরা হলেও টিউবওয়েল পাম্প করতে বেশ ঠান্ডা জল বেরোলো।

অমিতার অপেক্ষা শেষ হয়েছে । সে এবার শান্তিতে ঘুমোতে পারবে বরের সাথে । পুরনো বাড়ি থেকে একটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা দিল ধীমানের গায়ে । ও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো সিলিং থেকে ঝোলা ঝাড়টার দিকে, কাঁধে তার ক্যামেরা । বুধিয়া ওই নিঃসঙ্গ স্কুলে রাতে থাকার পর দিনটা এখানে থেকে এই বাবুর কাজ করে দেবে ঠিক করেছে।

ওরা জানে না, কিসের অনুসরণে এখানে এসে পড়েছে । জীবনের বিচিত্র গতির কথা কেই বা বলতে পারে ।





Rate this content
Log in

More bengali story from Baiduryya Sarkar

Similar bengali story from Romance