Ariyam Bhattacharya

Classics


2  

Ariyam Bhattacharya

Classics


প্রাপ্তি

প্রাপ্তি

7 mins 237 7 mins 237

গত সপ্তাহের শনিবার। দিনটা শুরু থেকেই ছিল বিচ্ছিরি। প্রায় পনেরো দিন পর জামাকাপড় কাচব ঠিক করেছিলুম।শুরু করতে না করতেই হঠাৎ মেঘ ফেঘ করে ঘিনঘিনে কাঁদুনির মতো বৃষ্টি শুরু হলো। ভাবখানা যেন Perth এ প্রথম ইনিং আরম্ভ করছে। দেখে শুনে ধীরে সুস্থে চললো। বিকেল এর আগে থামার কোনো ব্যাপার ই নেই। কাজেই ওই একগাদা জামা কাপড় দুটো ঘরে ভাগ করে শুকোতে দিতে হলো। টিভি ফ্রিজ বই এর আলমারি খাবার টেবিল সর্বত্র কাচা কাপড়। সে এক মেফিস্টোফিলিস কান্ড। বাড়ি টা কেমন অভয়ারণ্য গোছের হয়ে দাঁড়ালো। ফেব্রুয়ারী মাসে সক্কাল বেলা আবার বৃষ্টি কি। যত্তস্সব। তবু ছুটির দিন এভাবে মাটি হতে দেওয়া যায় না। তাই রান্নার দিকে এগোলাম। সকাল থেকে পোস্ত ভেজানো ছিল। মিক্সার এ দিয়ে যেই চালিয়েছি একটা বিশ্রী শব্দ করে সেটা বন্ধ হয়ে গেলো। তাজ্জব ব্যাপার। এই সেদিন অবধি গরম মশলা গুঁড়ো করেছিলাম। ঠিকঠাকই তো ছিল সব। হাওয়া থাকা সত্ত্বেও যেভাবে হঠাৎ করে ঘুড়ি গোঁত্তা খেয়ে পোস্ট এর তার এ জড়িয়ে তালগোল পাকিয়ে যায় সেরকম ভাব করে মিক্সার টা আমার দিকে চেয়ে থেমে রইলো। ভাব খানা এমন যেন আওয়াজ দিচ্ছে। নে শালা , খা পোস্ত কত খাবি। মাথায় আমার আগুন জ্বলে গেলো। ভূমিকম্প ছাড়া যে আমি ছুটির দিনে কক্ষনো বাড়ির বাইরে পা রাখার কথা ভাবতেই পারিনা সেই আমি ছাতা বাগিয়ে পণ করলুম এক্ষুনি এর হেস্তনেস্ত করবো। মিক্সার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ সব কটাকে থলি তে ভরে বার হলুম। অমিতাভ বচ্চন র তেজ নিয়ে বেরিয়ে বৃষ্টি মাথায় দোকানে পৌঁছে তিন মিনিটের মধ্যে কালী ব্যানার্জীর মতো অসহায় গরিব পেনশন লেস অবহেলিত বাবার মতো চুপসে গেলুম। as usually আমি হেরে গেছি। যে ধরণের গোলমাল হয়েছে সেটা সারিয়ে মিক্সার ফেরত পেতে পেতে সোমবার সন্ধ্যে। 

অগত্যা ফিরে এলুম। পোস্ত ভেস্তে গেছে। আজ আর খাবার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা। আব্দুল এর দোকান থেকে কিঞ্চিৎ কাবাব আনিয়ে নেওয়াই স্থির করলুম । ভাগ্য ভালো বৃষ্টিতে টিভি এর কানেকশন এ কোনো সমস্যা হয়নি। বেশ অবাক হলুম। সাধারণত গাজিয়াবাদ এ মেঘ করলেও আমার দিল্লির বাসায় সবার আগে টিভি টি নিষ্ঠার সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে আজ কি ব্যাপার। তারপর মনে হলো আমি তো আর ঋত্তিক ঘটকের ছবির প্রোটাগোনিস্ট নই যে মিনিটে মিনিটে সাংঘাতিক সব বিপদ একের পর এক আসতেই থাকবে। সকাল থেকে অনেক ঝক্কি গেছে। এটুকু তাই কনসেশন। পিট সাম্প্রাস আর প্যাট্রিক রাফটার এর পুরোনো একটা টানটান ম্যাচ এর কভারেজ দেখতে দেখতে কতক্ষন যে সময় কেটে গেছে খেয়ালই করিনি। এমন সময় কলিং বেল এর শব্দ এবং পরমুহূর্তেই পড়শী মিস্টার তলাপাত্রের প্রবেশ। আমার এই প্রতিবেশী ভদ্রলোক চাকরিসূত্রে সারা ভারতবর্ষ চষে আজ বছর সাতেক হলো দিল্লিতে থিতু হয়েছেন। ওনার বিপুল অভিজ্ঞতা আর গুছিয়ে গল্প বলতে পারার ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা আমাকে এতটাই মুগ্ধ করে যে ছুটির দিনে আমার অনুরোধে একবার অন্তত ওনাকে আসতেই হয় আমার ফ্লাট এ। সেদিন ও সেইমতো বসলো আমাদের আসর। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের কথা ভেবেই বোধয় মিস্টার তলাপাত্র শুরু করলেন এক চির অসুখী মানুষের গল্প। ওনার ভাষাতেই তুলে দিচ্ছি সেই কাহিনী।

 বছর পনেরো আগেকার কথা। আমি তখন শোভা বাজারের তপন বিশ্বাস এর বাড়িতে ভাড়া থাকতুম । একা মানুষ তপন বাবু। বিপত্নীক। ছেলেপুলে নেই। কর্পোরেশন এ কাজ করতেন। আমি অবশ্য যখন থেকে তার ওখানে ছিলাম ততদিন এ তিনি অবসর নিয়েছেন। একদিন অন্তর বাজার করেন আর বিকেলের দিকে আহিরীটোলা ঘাটে একা একা বসে থাকেন। সন্ধ্যে পার করে বাড়িতে ফিরে আমার সাথে ঘন্টা খানেক আড্ডা দেন ।একটু বেশি রাত করে খাওয়াদাওয়া করেন। ঘুম অবশ্য তার ভীষণ কম। ২ টো আড়াইটে এ শুয়ে সকালে কাঁটায় কাঁটায় ৭টায় ওঠেন। ওনার ওখানে আমি বছর সাতেক ছিলাম। আত্মীয় স্বজন , বন্ধুবান্ধব পারতপক্ষে আমার চোখে পড়েনি। এহেন তপন বাবুর জীবনে একমাত্র ভালোবাসা ছিল বাঁশি। খুব যে একটা ভালো বাজাতেন তা নয়। তবে ওটিকেই তাঁর ধ্যান জ্ঞান মন্ত্রের মতো আঁকড়ে থাকতেন। পাড়ায় একটু আধটু সবাই তার এই গুণ এর কথা জানতো। ছোটোখাটো ফাঙ্কশন টানক্শন এ ছেলেরা কয়েকবার তাঁকে বাজাতেও ডাকতো। তবে সেখানে শিল্প-সমাদরের চেয়ে কৌতুকের ইন্ধন টাই থাকতো বেশি। তপন বাবু অবিশ্যি সেসব কোনোদিনই গায়ে মাখেননি। যখনি ডাক পেয়েছেন বাজাতে গেছেন। 


একবার সরস্বতী পুজোর বিচিত্রানুষ্ঠান এ ডাক পড়লো তপন বাবুর। তবে একক হিসেবে নয়। গানের সাথে সঙ্গত করার ব্যাপার। গাইতে আসছেন সেই সময় এর উত্তর কলকাতার শিল্পী বসন্ত সেন মহাশয়। বসন্ত বাবু তখন সারা কলকাতায় এক নামে খ্যাত। একের পর এক রেকর্ড বেরোচ্ছে। দিন এ দুই তিনটে করে জলসা। বসন্ত বলতে গোটা শহর অজ্ঞান। পাড়ার ছেলেরা বললো , "একদম ঘাবড়াবেননা তপন দা। যেমন পারেন বাজাবেন। তারপর বসন্ত দা তো আছেনি। বাকিটা উনি ই বুঝে নেবেন। ওরকম বড় শিল্পীর সাথে এক মঞ্চে আমাদের পাড়ার একজন হিসেবে আপনাকে প্রোমোট কচ্চি। বুঝলেন না। " কথাগুলোর মধ্যে একটা তাচ্ছিল্যের সুর স্পষ্ট ধরতে পারলেন তপন বাবু। হতে পারে বসন্ত বিস্তর নাম করেছে। কিন্তু আদতে তো সেদিনের ছোকরা। কোথায় মান্না বাবু , হেমন্ত বাবু আর কোথায় বসন্ত। পাবলিক ও হয়েছে তেমন। যাকে তাকে মাথায় তুলে নাচতে পারলেই হলো। আজ বত্রিশ বছর ধরে বাজাচ্ছি আমি যেন ডামি পুতুল। সব সামলাবে নাকি ওই কালকের ছোঁড়া। " এই বলে মনে মনে একটা ভয়ঙ্কর ফন্দি আঁটলেন তপন বাবু। সাতে পাঁচে কেউ নেই তাই আমি ছাড়া আর কেউ জানতেও পারলোনা সেকথা। অনুষ্ঠানের দিন উপস্থিত হলো। পূর্ব নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী পাড়ার একদল ছেলেমেয়ে দেবী বন্দনা দিয়ে শুরু করবে ,তপন বাবু ধরবেন বাঁশি। তারপর তিনি কিউ দিলে সেখান থেকে ঢুকবেন বসন্ত সেন। বসন্ত সেন এর আবার সেই সন্ধ্যায় তিন জায়গায় গান গাইবার কথা। সময় এর খুব টানাটানি। তা সেই মতো শুরু হলো অনুষ্ঠান। দেবী বন্দনার পর শুরু করলেন তপন বাবু। আশাভরির আলাপ দিয়ে শুরু করে ,ললিত হয়ে খামাজ এর দিকে ভাসিয়ে নিয়ে চললেন তার সুরের ভেলা ।অদ্ভুত ব্যাপার ত্রূটি বিচ্যূতি তো দূরস্থান প্রতিটা রাগ ই বাজতে লাগলো অভাবনীয় 

নিখুঁত মাত্রায়। আগে থেকে ভেবেই এসেছিলেন তপনবাবু । এভাবে নিজেকে হেয় করতে দেবেন না। ব্যাটা ছোকরা কে সুযোগই দেবেন না গাইবার। এই আসর হবে ওনার একার। প্রায় বিশ মিনিট কেটে গেলো। বসন্ত সেন প্রানপনে ফাঁক খুঁজছেন "দেখেছি সখি বৃন্দাবনে " বলে ঢুকলেন বলে। কিন্তু কোথায় কি? তপন বাবু তখন এই জগতেই নেই। এতদিনের এক ছাপোষা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিল্পসত্তা সাধারণতার খোলস ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসছে একটু একটু করে। নিজেকে মেলে দিচ্ছে উৎকৃষ্টতম সুরের বিচরণে। কে তাকে থামাবে? কে খুঁজবে ফাঁক।প্রায় চল্লিশ মিনিট পর থামলেন তপন বাবু। মনে এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তি। হয়েছে। এক ঢিলে দুই পাখি। মনের সুখে বাজানো ও হলো। আর বসন্ত কে বেশ টাইট দেওয়াও গেলো। আর কোনো ব্যাটাচ্ছেলে বাজনা নিয়ে মুখ খুলতে আসবেনা। ওদিকে কর্মকর্তারা রেগে ফায়ার। বসন্ত নাকি মিনিট দশেক হলো চলে গেছেন। তার পরের অনুষ্ঠানের সময় গিয়েছিলো। এতো এতো মানুষ তাঁর গান শুনতে এসে বিফল হয়ে টিকিট এর দাম ফেরত চাওয়া নিয়ে এমন গোলমাল বাঁধিয়েছে যে সেদিক সামলাতে গিয়ে কারুরই আর তপন বাবু কে এক হাত নেওয়া হলোনা। তিনিও একপ্রকার নির্বিঘ্নে বাঁশি বগলে বাড়ির পথে দিলেন হাঁটা। সারাটা পথ নিজের কর্মে গর্বিত হয়ে ফুলে ফুলে উঠ তে লাগলেন। শিল্পের প্রতি আজ একটা সুবিচার করতে পেরেছেন। এটার দরকার ছিল। সেদিনের ছেলে ছোকরা সব তালিমের মা বাবা নেই ড্যাং ড্যাং করে জলসা করে বেড়াবে আর সেসব লোকে পাগলের মতো গিলবে। আজকের পর থেকে বসন্ত নিশ্চই এজম্মে আর আমার তাঁর সামনে খাপ খুলতে পারবেনা এই ভেবে বিশ্বযুদ্ধ জয় এর ভাব নিয়ে বাড়ি পৌঁছলেন। সদর দরজার বাইরে কোলাপ্সিবল গেট এর কাছে এসে হঠাৎ কি যেন দেখে একটু থামলেন। একটা ছোট্ট কাগজ কেউ গেটের এক কোণে গুঁজে দিয়ে গেছে। কি ব্যাপার? কাগজ টা খুলে রাস্তার আলোর দিকে ফিরে পড়ার চেষ্টা করলেন। একটা চিঠি বলা যায় :


শ্রদ্ধেয় তপন দা,

আপনার নাম আজি বকুলতলার ছেলেদের কাছে প্রথম শুনলাম। আজ ৬বছর হলো পেশাদারি গান বাজনা করছি। অনেক অনুষ্ঠানে গাইবার ডাক পাই। তা হয়তো আপনি জানেন। তবে আমার পরম আক্ষেপের বিষয় আপনার কথা আমি এতদিন জানতাম না। নিজে যখন মঞ্চে গাই বহুবার সুর থেকে সরে যাই। নিজে বুঝি।তবে শ্রোতারা আমাকে বুঝতে দেয় না। শুধরে নেবার ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে মরে যেতে বসেছিল দাদা। তবে আজ ওই আধ ঘন্টায় যে সুর আপনি তৈরী করলেন তা থেকে আবার নতুন করে শুরু করার উৎসাহ পেয়েছি। আপনার সাথে দেখা করতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিলো। কিন্তু অনেক গুলো টাকা আগাম নেওয়াছিলো। তাই পরের অনুষ্ঠানে যেতেই হচ্ছে। তবে সাথে করে আপনার সুর নিয়ে গেলাম। যতদিন গান বাজনা নিয়ে থাকবো ওই সুর আমার ভেতর থাকবে। জানি ধৃষ্টতা , তবু ভবিষ্যতে আবার কোথাও আপনার সাথে একই মঞ্চে দাঁড়াবার সুযোগ এর অপেক্ষায় রইলাম। 


প্রণাম নেবেন।


ইতি ,

বসন্ত সেন। 


এরপর থেকে তপন বাবুর জীবন যাপনে অবিশ্যি তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি তবে তার মুখের ওপর থেকে হতাশ,বীতশ্রদ্ধ ছায়া টা একেবারে উধাও হয়ে যায়। হয়তো তিনি বুঝেছিলেন রাগ অভিমান প্রতিশোধস্পৃহা এগুলো সবই মুহূর্তের দুর্বলতা। এসব আর যাই হোক মানুষকে উত্তরণের পথ কখনোই দেখাতে পারেনা। ভালো কাজের স্বীকৃতি একদিন না একদিন আসবেই। তাই মন কে এসব থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং সততার সাথে লেগে থাকতে হবে। সেখানেই বেঁচে থাকার , এগিয়ে যাবার স্বার্থকতা। 


মিস্টার তলাপাত্র কফি তে শেষ চুমুকটি বসিয়ে বিদায় নিলেন । বিকেল তখন পৌনে ৫টা। বৃষ্টি ধরে এসেছে। একটু একটু করে ফর্সা হয়েছে চারপাশ। ধীরে সুস্থে উঠে গিয়ে জামা কাপড় গুলো মেলে দিলুম বারান্দায়। 


Rate this content
Log in