STORYMIRROR

Priyanshu Datta

Tragedy Classics

4.4  

Priyanshu Datta

Tragedy Classics

।। ওলো সই ।।

।। ওলো সই ।।

4 mins
7

পাশের ক্লাব থেকেই ভেসে আসছে সেই চেনা গানের ক্ষীণ সুর। একজন শিক্ষিকা ছাত্র-ছাত্রীদের গান শেখাচ্ছেন –
"ওলো সই ওলো সই 
     আমার ইচ্ছা করে তোদের মতন মনের কথা কই।। "

গানটি শুনে সৌদামিনী দেবীর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুবন্যা গড়িয়ে পড়ল। প্রায় ৪ বছর হয়ে গেল তিনি বৃদ্ধাশ্রমে আছেন, তাঁর ছেলে খোঁজটুকুও নেয় না এখন। ভাবতেও অবাক লাগে—যেই ছেলেকে প্রায় দশ মাস নিজের গর্ভে ধারণ করেছিলেন, প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন; যার জন্মের পরপরই স্বামী মারা যাওয়ার পর তীব্র অভাব-অনটনে সেলাইয়ের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে একা মানুষ করেছিলেন, প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ছেলেকে, অনুষ্ঠান করে বিয়ে দিয়েছিলেন—সেই ছেলেই কিনা নিজের বউ-বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁকে আবর্জনা ভেবে নিজের ঘাড় থেকে নামিয়ে দিল! অবশ্য তাঁর নাতনি 'ঠাম্মি চলে যাচ্ছে' বলে প্রচণ্ড কেঁদেছিল; কিন্তু কে শুনবে ওই ফুটফুটে পাঁচ বছরের অবুঝ বাচ্চার কথা? সেই সময়ে বড়ই মনে হচ্ছিল, এর চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই হয়তো সুখের হত। এখন সেই মেয়েটির বোধহয় তাঁর ঠাম্মিকে মনে নেই। 

এই বৃদ্ধাশ্রম যেন শ্মশানের মতন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, ওঁকে নিয়ে হাতে গোনা বারোজন বৃদ্ধ মানুষ। তবে এই আশ্রমে এসে তাঁর সই হয়েছিলেন তাঁর চেয়ে ৬ বছরের বড় বৃদ্ধা– নাম যুক্তামুখী। তাঁর দুধে-আলতার মতো গায়ের রং, পটলচেরা চোখ, টানা টানা দু'টি ভ্রূ, শরীরের চামড়া এক ফোঁটাও কুঁচকে যায়নি। তিনি যেহেতু অজপাড়াগাঁ থেকে এসেছেন,তাঁর কথায় বিশেষ এক ধরণের টানের আভাস পাওয়া যেত। আর লোককে বিভিন্ন ধরণের রান্না করে খাওয়াতে পছন্দ করতেন । সৌদামিনী দেবী এবং যুক্তামুখী দেবী দু'জনেই একই ঘরে থাকতেন।
যখন সৌদামিনী দেবী প্রথমবার বৃদ্ধাশ্রমে পদার্পণ করেছিলেন তখন যুক্তামুখী দেবী বটবৃক্ষের ছায়ার মতন তাঁকে আগলে রেখেছিলেন, যখন কষ্টের বাঁধ ভেঙে গিয়ে নয়ন বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত তখন আলতো করে সেই জল মুছিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন – "ওলো সই, কাঁদিসনে এই অশ্রুর দাম কেউ দেবে নে । ভুলে যাসনে,একা যখন এই পৃথিবীতে এয়েচিস, একাই মলো! সবাই স্বার্থপর। আর মা‐জননীর তো দায়িত্ব ব্যাটা-মাইয়ারে মানুষ করা, ন্যাকাপড়া শেখানো। সবকিছু তোর হাতের মুঠোয় আনতে পারবিনে,তেমনই তোর ব্যাটা যদি অমানুষ হয় সেটায় তোর দোষ কোতায়? তুই তো চেষ্টা করেছিলিস নিজের ব্যাটারে মানুষ করতে। আর কাঁদবিনে নিজের জন্যে বাঁচ।"
সৌদামিনী দেবী– "আপনার জীবনের গল্প বলুন?"
"আবার আপনি?! আপনি কইতে হবে নে, আমায় তুই সই বলেই কস্। আর সে অনেক বড়ো গল্প।"
সৌদামিনী দেবী আর্দ্র গলায় বললেন– "তবুও বলো শুনি। "
"আমি থাকতুম রাঙাজবা গাঁতে, বাপ-মা আগেই বিয়া দিয়ে শ্বউরঘরে পাঠায়ছিল। তখন হবে আমার ৯ বৎসর বয়স। আমার শ্বউরমশাই গাঁয়ের মোড়ল ছিলেন,আর আমার স্বামীরা দুই ভাই ছিলেন। আমার শ্বাউরিমা আমায় নিজের মাইয়ার মতো ভালোবাসতেন। যা শুধাতুম সেটা এনে দিতেন,নিজেই হেঁসেল সামলাতেন। শ্বউরমশাই স্বামীরে বিলেতে পাঠিয়েছিলেন ন্যাকাপড়া শেখাতে,আর ছোট ঠাউরপো ছিল ১১ বৎসরের। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কত খেলতুম – 'কুমির ডানা','গুলি- ডান্ডা','এক্কা-দোক্কা' আরও কত কি! তারপর ছোট ঠাউরপোর সঙ্গে ন্যাকাপড়া করতুম,পাঠশালায় যেতুম ।
শ্বউরবাড়িতে আসার ঠিক এক মাস পর, আমাদের দু'টো বাড়ি পরে এক চালাঘরে এক সদ্য বেধবা মাইয়া এলো–শ্বউরবাড়ি থেকে একেবারে খেঁদিয়ে বিদায় করেছিল, নাম তার লাজু।" – তারপর কিছুক্ষণ থেমে কাষ্ঠ হেসে বলেছিলেন– "ঠাউরপো আর লাজু একই বৎসরের ছিল, ঠাউরপোর বড়ো সোহাগের ছিল। কিন্তু ওই যে সমাজ জাত-পাত বিচার করত,লাজু ছিল নিচু জাতের,আর ওর বিয়া এক গরিব বৃদ্ধ তাঁতির সঙ্গে হয়েছিল । তাঁতিও মলো,ব্যস ঝেঁটিয়ে বের করল..."
"কারা করলেন?"
"তাঁতির ভাইরা। সব সম্পত্তির লোভী পিশাচ।আর ওই হতভাগির যা পোড়া কপাল, নিজের ঘরেও ঠাঁই পেত নে,যদি না আমার শ্বাউরিমা ওদের বাড়িতে হত্যে দিয়ে প্রতিবাদ করতেন। আমার শ্বাউরিমার মতন নারী এ জনমে দু'টি দেকিনি। কিছুদিন পর লাজুও আমাদের খেলার সই হইল। গরমে আমগাছ থেকে আম কুড়োতুম, কারুর বাড়ি থেকে ফুল চুরি করতুম পুজোর জন্যে। শ্বাউরিমা আম-চুর কইরা খাওয়াত। সন্ধ্যে মাঝে মাঝে চলত পুতুলনাচ,বহুরুপীদের খেলা। আর দুপুরবেলা পুকুরপাড়ে ঠাউরপো আর লাজু দুজনে মিলে কথা হত। কিন্তু গাঁয়ের লোকেরা একেকটা পাষণ্ড,বর্বর। ওদের সাঙাতকে কলঙ্কিত করল। লাজুর মা-বাপ ওরে বেধড়ক মারলো, আর কিছুদিন পরে হতভাগির দেহ পুকুরে পেল সবাই। বেচারী জলে কলসি বেঁধে শেষমেষ মলো। ঠাউরপো পাগল হইয়া গেসল, তার ৪ বৎসর পর সেও বিদায় হল। আর কয়েক বছর পর শ্বউরমশাই আর শ্বাউরিমা দু'জনেই মলো। আমরা গাঁ ছাইড়া শহরে এলেম। আমার স্বামী এক উচ্চবিদ্যালয়ের পণ্ডিত মশাই ছিলেন আর তাঁর অবসর নেওয়ার এক মাস পর তিনিও আমায় ছাইড়া চইলা গেলেন। তারপর এইটাই আমার বাসাখান হইলো।"
সৌদামিনী দেবীর চোখ ছলছল করে উঠেছিল। 

প্রায় ৩ বছর একটা মিষ্টি বন্ধুত্বের সম্পর্কে কাটিয়ে যুক্তামুখী দেবী পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। এখন সৌদামিনী দেবী একাই শোন বিছানায় । তাঁর সইয়ের হাতের রান্না বড়ো মনে পড়ে। 
তিনি গুনগুন করে সুর করলেন –
"আমি একা বসি সন্ধ্যা হলে 
      আপনি ভাসি নয়নজলে 
কারণ কেউ শুধাইলে নীরব হয় রই।।
ওলো সই ।"


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy