Sanghamitra Roychowdhury

Romance Classics Inspirational

3  

Sanghamitra Roychowdhury

Romance Classics Inspirational

নয়নতারা

নয়নতারা

4 mins
688



ঘুম ভাঙতেই নয়নতারার মনটা একেবারে তিতকুটে হয়ে গেলো গত রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই। বিয়ে হয়েছে এই সবে বছর খানেক। মানে এই কমবেশি তিনশো পঁয়ষট্টি দিন। কিন্তু এরমধ্যেই বোধহয় কমপক্ষে দুশো বার তো ঝগড়া হয়েইছে নয়নতারার সাথে ওর শাশুড়ি মায়ের। অবশ্য এই ঝগড়াটাও একতরফাই। শাশুড়ি মা ঝড়ের বেগে নিজের কথা বলেই চলেন। আর নয়নতারা কোনোরকমে চোখের জল চেপে ধরে রেখে মাথা নীচু করে শুনেই যায়। পাল্টা কিছু বলতেই সুযোগ পায় না নয়নতারা। উনি কেমন যেন নয়নতারাকে সহ্যই করতে পারেননি সেই শ্বশুরবাড়ীতে প্রথম পা রাখার দিনটা থেকেই। নেহাত সুবীর খুব মানিয়ে গুছিয়ে চলে তাই এখনো নয়নতারা এবাড়ীতে টিকে আছে। নইলে কবেই... ভাবতে ভাবতে পায়ে স্লিপারটা গলিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো নয়নতারা।


ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে যেন নিজেকে মাপতে থাকলো নয়নতারা। কখন যে সুবীর ঘুম থেকে উঠে এসে ওর পেছনে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে সুবীর বলে, "কীইইই, আজ অফিস যাওয়ার প্ল্যান নেই বুঝি? তাহলে আমিও ডুব দিই নাকি?" "উঁহু, মশাই, সেটি হবার যো নেই। ইয়ার এণ্ডিঙের খাঁড়াটা একেবারে মাথার ওপরে ঝুলে আছে, এখন একটা দিনও ছুটি নেওয়া যাবে না গো," আদুরে বেড়ালের মতো বরের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে গদগদ স্বরে বললো নয়নতারা। এই সুবীরটার জন্যই ও এখনো এবাড়ীতে রয়েছে। ও ঠিক যে করে হোক বৌয়ের মান ভাঙায়। বৌকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে রেখে সুবীর ভাবে, "মাও পারে বটে। শুধু শুধু নয়নের সব কিছুতেই মায়ের খুঁত ধরা চাই। চাট্টি কথা শোনানো চাই। কী দরকার বুঝি না বাবা। নয়নের মতো মেয়ে লাখে একটা মেলে। সবাইকেই যে একদম ডানাকাটা পরী হতে হবে, তার তো কোনো মানে নেই। অথচ নিজেই ঘটক লাগিয়ে সম্বন্ধ দেখে বিয়ে দিয়েছে, তবুও কিছুতেই মা মানতে পারে না নয়নের এই রূপের খামতিগুলো। ওর গুণগুলো চাপা পড়ে গেছে মায়ের চোখে। কত বড় চাকরি করে মেয়েটা, ডব্লিউবিসিএস। তা নয়, মা আমাকেও আজকাল কথা শোনাতে ছাড়ে না। নানাজনের তুলনা টানে দিনরাত। শুধু নয়নের মতো মেয়ে বলেই, ও এখনো এবাড়ীতে রয়েছে। নাহলে ও তো আলাদা থাকতে চাইতেই পারতো।"



নয়নতারা তাড়া মারলো সুবীরকে। সত্যিই এই সকালে ভীষণ তাড়াহুড়ো থাকে। নয়নতারা এর মধ্যেই ঘর গুছিয়ে নিজে ফ্রেশ হয়ে চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। সুবীর শেভিং করছিলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নয়নের সদ্যোস্নাত ভেজা মুখের দিকে। শুধুই কি গায়ের রং, কাটা কাটা নাক মুখ আর ছিপছিপে চেহারার মধ্যেই সব রূপ থাকে? এই যে নয়নের জুঁইয়ের মতো ধবধবে দাঁতের পাটি, ছোট্ট কপাল ঘেরা ঢেউ খেলানো চুল, বড়ো বড়ো চোখের কুচকুচে কালো স্থির তারা... এই দেখেই তো সুবীরের ভারী ভালো লেগেছিলো। তারপর ওও সুবীরের মতো গানপাগল, বইপাগল আর ক্রিকেট পাগল। ওকে ভালো না লেগে সুবীরের কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু মা মানতে পারেননি কিছুতেই, যে সুবীর কেন নয়নতারাকেই বিয়ে করবে বলে বেঁকে বসলো।



সুবীর অফিস যাবার জন্য তৈরী হয়ে গেছে। নয়নতারা রান্নাঘরে গেছে দু'জনের টিফিন গুছিয়ে আনতে। সুবীর আলমারী খুলে বেছে বেছে সেই ঢালা কালো জমির সিল্কের শাড়ীটা বের করেছে নয়নের পরার জন্য। নয়ন ঘরে ঢুকেই বিছানার ওপর কালো শাড়ীটা দেখে আঁতকে উঠলো, "আবার? সেই কালো শাড়ী? না না, রেখে দাও এটা। শুধু শুধু অশান্তি ভালো লাগে না সকাল বিকাল সর্বক্ষণ।" সুবীর শাড়ীটা বিছানা থেকে তুলে নিয়ে নয়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় পরে নিতে বললো শাড়ীটা, তাড়াতাড়ি। নয়নতারা ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো সুবীরের দিকে, বড়ো বড়ো কাজলকালো চোখের কোলে টলটল করছে জল। গতকাল রাতের শাশুড়ি মায়ের কথাগুলো মনে পড়লো, "তোমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? এই হাতির মতো চেহারা আর যমদূতের মতো গায়ের রং নিয়ে একখানা কালো শাড়ী পরেছো!" শাড়ীটা নয়ন শক্ত মুঠি করে চেপে ধরলো। সুবীর নীচে নামতে নামতে গলা তুলে বললো, "এবারে কিন্তু তুমি সত্যিই লেট হয়ে যাবে!"



নয়নতারা শাড়ীটা পরে কপালে টিপ লাগালো, ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক বোলালো, তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে ভাবলো, "নাহ্, যে করেই হোক এবারে একটু ওজন কমাতেই হবে।" কাঁধে ব্যাগটা ফেলে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলো। সুবীর শাশুড়ি মায়ের সাথে কথা বলছিলো, কানে আসতেই থেমে গেলো নয়ন। "আচ্ছা মা, ধরো তোমাকে যদি নয়ন বলে, সিড়িঙ্গে বুড়ির এখনো শখ কত, সপ্তাহে দু'বার চুল রং করা চাই, চড়া মেকাপ করে বেরোনো চাই রোজ... তোমার কি তা শুনতে ভালো লাগবে? নাকি তোমার সারাদিনের প্রত্যেক পদে পদে তোমার ত্রুটি খুঁজে বেড়ালে, সেটাই তোমার ভালো লাগবে? লাগবে না তো? তবে তুমিই বা কেন সারাক্ষণ ওর কালো গায়ের রং, মোটা চেহারা এসব নিয়ে খোঁটা দাও? দেখো মা, নয়ন চাকরি করে, ও যদি আলাদা হয়ে যেতে চায় তবে কিন্তু তুমি আটকাতে পারবে না। তাহলে রোজ রোজ এই অশান্তি কেন, বলতো মা?" সুবীরের কথা শুনে ওর মা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। সুবীর দু'সেকেণ্ড থেমে আবার শুরু করলো, "মা, নয়ন কালো মোটা যেমনই হোক, সেটা ওর খুব ব্যক্তিগত সমস্যা। ও কি পোশাক পরবে , কি রং পরবে, সে স্বাধীনতাও আছে বৈকি ওর। এভাবে তুমি ওকে রোজ রোজ ওর গায়ের রং বা চেহারা আর পোশাক আশাক নিয়ে খোঁটা দিও না মা। আমার সত্যিই খুব লজ্জা করে ভাবতে যে তুমি আমার মা। আমার যখন কোনো অসুবিধা নেই ওর রূপ নিয়ে, বা পোশাক আশাক নিয়ে, তখন তুমি আর এসব বলে রোজ রোজ নিজেকে আমার চোখে আর নামিও না মা। গতকাল রাতে তোমার কথাগুলো খুব খারাপ লেগেছে আমার। ওকে ভালো না বাসতে পারলে বেসো না, কিন্তু সর্বক্ষণ ওর চেহারা বা রূপ নিয়ে খোঁটা দিয়ে বাড়ীর পরিবেশ এভাবে তিক্ত কোরো না। নয়নের গুণের সংখ্যাই বেশী, সেগুলোকেই বরং মনে করে করে বোলো এবার থেকে, কেমন?"



নয়নতারা শাশুড়ি মায়ের সামনে গিয়ে মুখ নীচু করে বললো, "আসি মা।" আজ নয়নের শাশুড়ি মায়ের মুখে একটা কথাও নেই। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। আর তাকিয়ে রইলেন নয়নের কালো সিল্কের শাড়ীতে মোড়া কালো, ভারী চেহারার দিকে। সুবীরের ডাকে নয়ন চঞ্চল হরিণীর মতো প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলো... শাশুড়ির বিস্মিত দৃষ্টিকে পেছনে ফেলে রেখে।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance