Patralika Biswas

Classics Inspirational

4  

Patralika Biswas

Classics Inspirational

মায়ের বিয়ে

মায়ের বিয়ে

5 mins
17.3K



এক দুবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই ফোনটা তুলেই ঋজু বলল, হ্যাঁ মা বলো। কিছু দরকার আছে?

লাবনী দেবী - কেমন আছিস ঋজু? দরকার ছাড়া কি তোকে ফোন করতে পারিনা আমি? তোর সাথে একটু কথা ছিলো।

ঋজু - না মা তা কেন হবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম যদি কিছু লাগে তোমার। আচ্ছা বলো কি বলবে বলছিলে?

লাবনী দেবী - আমি বিয়ে করবো।

ঋজু কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর বললো, মা প্লিজ এখন ইয়ার্কি মারার সময় নেই আমার।আমি অফিসে আছি।

লাবনী দেবী - আমি একটুও ইয়ার্কি করছি না ঋজু। আমি সত্যিই বিয়ে করবো।

ঋজু - কি যা তা বলছো মা। তোমার বয়সটা ভেবে দেখেছো একবার? তোমার এখন একষট্টি বছর। মা প্লিজ পাগলামি করোনা অন্তত এই বয়সে এসে। 

লাবনী দেবী - আমি কোন পাগলামি করছিনা ঋজু। ছেলের কাছে তো আর আমি পারমিশন চাইতে পারিনা বিয়ে করার জন্য। তবে তোকে আগেভাগে জানিয়ে রাখা আমার কর্তব্য। আর তোকেও তো থাকতে হবে বিয়ের দিন। অবশ্যই বৌমা আর মিনি, চিনিকেও নিয়ে আসিস কেমন। কাল পরশু ডেটটা ফাইনাল হলে তোকে জানিয়ে দেবো।

এতক্ষণ কথাগুলো চুপ করে শুনছিল ঋজু, এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে বলে উঠলো, তুমি কি একবার আমার মান সম্মানের কথা ভাববে না মা? এই বয়সে কোন মানুষটা বিয়ে করে বলতে পারো।

লাবনী দেবী - এতে মান সম্মানের কি আছে ঋজু? তোমার বাবা মারা গেছে যখন তুমি ক্লাস নাইন।তারপর থেকে তো আমি একাই তোমাকে বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। কোনোদিন নিজের জন্য আলাদা করে কিছু ভাবার কথা মাথায় ও আনিনি। 

ঋজু - মা, প্লিজ এগুলো বুড়ো বয়সের ভীমরতি ছাড়া আর কিছু না। আর নিজেরটা ভাববে বলে এখন হঠাৎ বিয়ের কথা মাথায় এলো তোমার? 

লাবনী দেবী - হঠাৎ করে কিছু ভাবিনি আমি। বেশ কয়েক বছর আগেই কলেজের রি ইউনিয়নে গিয়ে আমার এক ক্লাসমেট সুপ্রভাতের সাথে দেখা হয়। তারপর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ওর সাথে কথা বলা, কয়েকবার দেখাও করেছি। ওর ও স্ত্রী গত হয়েছে প্রায় পনেরো বছর।আর কথা বলতে বলতে পুরনো বন্ধুত্ব আবার ঝালিয়ে নিতে নিতে কখন যেন দুজনেই অনুভব করেছি দুজনেরই এই বয়সে পাশে থাকার মত একটা মানুষের বড় প্রয়োজন। 

ঋজু - মা প্লিজ তোমার এই প্রেম কাহিনী আমি শুনতে ইন্টারেস্টেড নই। আর এতই যদি তোমার একা লাগে, তোমায় তো কতবার বলেছি আমার সাথে কলকাতার ফ্ল্যাটে এসে থাকো। তোমার বৌমা আর চিনি, মিনি আছে দিব্যি সময় কেটে যাবে। যতবার তোমায় আমি আর তোমার বৌমা নিয়ে যেতে চেয়েছি ততবার তুমি বলেছো, বাবার এই বাড়িটা ছেড়ে তুমি কোথাও যেতে চাওনা।

লাবনী দেবী - হ্যাঁ বলেছি তো। তোদের সাথে থাকলেই কি আমার একা লাগাটা কমে যেত? তোদের চাকরি, চিনি মিনির স্কুল, পড়াশুনো, তোরা কত ব্যস্ত। তারমধ্যে আমি একটা বুড়ো মানুষ তোদের মাঝে গিয়ে পড়া মানে আমি কি একটা বোঝা হয়ে যেতাম না?

ঋজু - এগুলো তোমার বিয়ে করার জন্য নেহাতই অজুহাত মা। তোমাকে তো এও বলেছিলাম কয়েকদিনের জন্য নয়, তুমি একেবারে আমাদের কাছে এসে থাকো। এই বাড়িটার জন্য প্রোমোটাররা কতবার এসেছে, আমার সাথেও কথা বলেছে, শুধু তোমার জেদের জন্য আমরা এগোতে পারিনি। 


তোমায় এখনও বলছি মা তুমি আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো, এখানে তুমি তোমার মতই থাকবে।এখানে মহিলারা বিকেলে আড্ডা দেয়, মাঝেমাঝেই অনুষ্ঠান করে নানারকম। তুমিও ওদের সাথে আলাপ করে নেবে। আর তুমিও তো গানবাজনা ভালবাসো মা। 


লাবনী দেবী - এ হয়না ঋজু। ওই বাড়িটা তোমার। এখানে তোমার বাবা আর আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এসব ছেড়ে 

ঋজু - এসব ছেড়ে পারবেনা আমার কাছে এসে থাকতে তাইতো? কিন্তু বিয়ে করে ওই লোকটার বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারবে।

লাবনী দেবী - তোমায় কে বলেছে ঋজু আমি ওর বাড়িতে গিয়ে থাকবো। তুমি তো শুনতেই চাওনি আমার কথাগুলো। আমরা এই বাড়িতেই থাকবো। 

হ্যাঁ সুপ্রভাত ও রাজি হয়েছে আমার এই প্রস্তাবে। 


ঋজু - কি বললে তুমি? এটা কিন্তু তুমি ঠিক করছো না মা।ওটা বাবার বাড়ি, আর আমারও নিশ্চয়ই কিছু ভাগ আছে ওই বাড়িতে। ওখানে তুমি ওনাকে এনে রাখবে মানে। মা পাড়ায় আমাদের একটা মান সম্মান আছে, সেটা তো অন্তত মাথায় রাখবে।

লাবনী দেবী - তোমার ভাগ এই বাড়িতে এখনও কিছু নেই ঋজু। তোমার বাবা আর আমি অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করেছিলাম। আর বাড়ি, তোমার বাবা আর আমার নামে। আমি চাইলে তোমায় এই বাড়ি না ও দিতে পারি। 


আর মান সম্মানের কথা তুমি বলছো ঋজু? মনে আছে গত বছর পয়লা বৈশাখে তোমরা এখানে এসে ছিলে কয়েকদিন। আমার তো ডায়াবিটিস,রাতে বেশ কয়েকবার বাথরুম যেতে হয় আমায়। সেকথা হয়তো তোমাদের মনে ছিলনা, তাই বেশ জোরে জোরেই কিছু কথা বলছিলে ঘরে বসে, যেগুলোর কিছু আমার কানে এসে পৌঁছায়। এই যেমন বৌমাকে বলছিলে এই বাড়িটা বিক্রি করে দিলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। আর বৌমা তোমায় বলেছিল, আমাদের তো তিন রুমের ফ্ল্যাট, তার মধ্যে তোমার মা যদি একটা দখল করে নেয়, চিনি মিনির পড়াশুনো আছে, গেস্ট আসতে পারে, ওইটুকু ফ্ল্যাটে এতগুলো লোক দমবন্ধ হয়ে আসবে আমার। তুমি বরং মাকে কয়েকমাস আমাদের সাথে রেখে একটা বৃদ্ধাশ্রমে দিও। ওখানে নিজের বয়সের লোকজনকে পেলে ওনারও ভালো লাগবে। সেদিন খুব ভালো লেগেছিলো ঋজু তোমার আর বৌমার আমাকে নিয়ে এত চিন্তা দেখে। আমি বৃদ্ধাশ্রমে থাকলে বুঝি তোমার মান সম্মানটা বেশ খানিকটা বাড়ত তাইতো? 

তারপর আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যায় লাবনী দেবী, ফোনের ওপ্রান্ত থেকে বেশ খানিকক্ষণ কোনো শব্দ আর ভেসে আসেনা। এবার লাবনী দেবী নিজেই আবার বলেন, ডেটটা ফাইনাল হলে জানাবো, তোমার কাছে কোনোদিন কিছু চাইনি ঋজু। তবে আজ চাইছি অবশ্যই তোমরা আমার বিয়ের দিন উপস্থিত থেকো।

এখন আমি রাখছি। ভালো থেকো। চিনি মিনিকে আমার আদর দিও।


আজ লাবনী দেবী আর সুপ্রভাত বাবুর বিয়ে। খুব ছিমছাম সাজে লাবনী দেবী আর সুপ্রভাত বাবু সোফায় বসে সই করছেন ম্যারেজ রেজিস্ট্রির কাগজে। অল্প কয়েকজন বন্ধু আর ঋজুরাও স্বাক্ষী আছে সেই বিয়ের। সইসাবুদ শেষ হতেই চিনি, মিনি সুপ্রভাত বাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, তুমি কে আমরা জানি।

সুপ্রভাত বাবু - তাই নাকি। তোমরা জানো? কে বলতো? 

চিনি - আমাদের দাদান।

মিনি - তুই ভুল বলছিস চিনি। ঠাম্মা বলেছে না এটা দাদাই। আর দাদান তো ওই যে মালা দেওয়া ফটোতে আছে।

তাই না ঠাম্মা? 

চিনি মিনির কথা শুনে সবাই হাসতে শুরু করে। সেই হাসির শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে কিছু কথা,সম্পর্ক বড় সহজ, কিছু লোভ, লালসা, হিংসা দিয়ে ভালোবাসাকে আড়াল করা যায়না, ভালোবাসা একদিন জিতে যাবেই।




Rate this content
Log in

Similar bengali story from Classics