STORYMIRROR

Mr Perfect

Horror Thriller

4  

Mr Perfect

Horror Thriller

কুয়াশাপুর জংশন

কুয়াশাপুর জংশন

3 mins
2

যদি শহরের একঘেয়ে রুটিন, ট্র্যাফিক জ্যাম আর কংক্রীটের জঙ্গলে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসে, আর যদি আপনার মনে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা থাকে, তবে একদিন হয়তো আপনিও আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন 'কুয়াশাপুর জংশন'।

তবে এই জংশনে পৌঁছানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট ট্রেন নেই, কোনো টাইমটেবিল নেই। এর খোঁজ পেতে হলে আপনাকে একটা ভুল করতে হবে।

ধরুন, কোনো এক মেঘলা দিনে আপনি উত্তরবঙ্গগামী কোনো ট্রেনে উঠেছেন। আপনার গন্তব্য হয়তো দার্জিলিং বা ডুয়ার্স। জানলার ধারে বসে আপনি দেখছেন পরিচিত স্টেশনগুলো একে একে পার হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ট্রেনের গতি বাড়ছে, আর বাইরে জমাট বাঁধছে অন্ধকার। আপনার কামরায় ভিড় কম, সহযাত্রীরা সবাই যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে।

হঠাৎ মাঝরাতে আপনার ঘুম ভেঙে যাবে। ট্রেনটা একটা অদ্ভুত ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোনো বড় স্টেশন নয়, বাইরে কোনো ফেরিওয়ালার হাঁকডাক নেই, ইঞ্জিনের গর্জনও শান্ত। একটা অখণ্ড নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চারপাশকে।

কৌতূহলবশত আপনি ট্রেনের দরজা খুলে নিচে নামবেন। নামামাত্রই এক হিমশীতল ভিজে বাতাস আপনার চোখেমুখে লাগবে। বাতাসের সাথে ভেসে আসবে পুরনো দিনের কয়লার ইঞ্জিনের ধোঁয়ার গন্ধ। আবছা অন্ধকারে দেখবেন, প্ল্যাটফর্মটা ভাঙাচোরা, পাথরের স্ল্যাবগুলো জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে। শ্যাওলা ধরা একটা মরচে পড়া সাইনবোর্ডে টিমটিম করে জ্বলছে একটা তেলের লণ্ঠন। তার আলোয় কোনোমতে পড়া যাচ্ছে—'কুয়াশাপুর জংশন'।

আপনার মনে হবে, আপনি হয়তো সময় ভুল করে অন্য কোনো যুগে এসে পড়েছেন। এই স্টেশনে শেষ কবে ট্রেন থেমেছিল, কেউ জানে না। আপনার নিজের ট্রেনটাও যেন অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

প্ল্যাটফর্ম ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে দেখবেন স্টেশনের পুরনো স্টেশন মাস্টারের ঘর। দরজাটা আধখোলা। ভেতরে উঁকি দিলে দেখবেন, ধুলো পড়া টেবিলের ওপর একটা হারিকেন জ্বলছে। আর সেই আলোয় বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। তাঁর পরনে ব্রিটিশ আমলের রেলের ইউনিফর্ম, সাদা দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে। তিনি একটা বিশাল বড় রেজিস্টার খাতায় নিবিষ্ট মনে কিছু লিখে চলেছেন।

আপনার পায়ের শব্দে তিনি মুখ তুলবেন। তাঁর ঘোলাটে চোখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং আছে এক অনন্ত প্রতীক্ষা। আপনাকে দেখে তিনি ফোকলা দাঁতে হাসবেন।

"এলেন তাহলে? আমি জানতাম কেউ না কেউ আসবে।" তাঁর কণ্ঠস্বর যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো প্রতিধ্বনি।

আপনি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করবেন, "এটা কোন জায়গা? আমার ট্রেনটা...?"

বৃদ্ধ আপনার কথার উত্তর না দিয়ে বলবেন, "সিগন্যালটা ডাউন করা হয়নি বাবু। সেই ১৯৪২ সাল থেকে ট্রেনটা আউটার সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করছে। আপনি একটু লিভারটা টেনে দেবেন?"

আপনি বুঝতে পারবেন না তিনি কাদের কথা বলছেন, বা কোন ট্রেনের কথা বলছেন। কিন্তু সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে, সেই ভূতুড়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে তাঁর নির্দেশ অমান্য করার ক্ষমতা আপনার থাকবে না। আপনি যন্ত্রচালিতের মতো তাঁর দেখানো পথে এগিয়ে যাবেন প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে।

সেখানে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সিগন্যাল পোস্ট। তার লিভারটা জং ধরে প্রায় অকেজো। আপনি আপনার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই লিভারটা ধরে টান দেবেন। এক বিকট ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে শান্ত স্টেশনটা কেঁপে উঠবে।

আর ঠিক তখনই, কুয়াশা ফুঁড়ে বহুদূর থেকে ভেসে আসবে এক বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের দীর্ঘ হুইসেল। শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসবে। আপনি অনুভব করবেন এক তীব্র কম্পন। বৃদ্ধ স্টেশন মাস্টার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লণ্ঠন দোলাতে থাকবেন।

কিন্তু আপনি কোনো ট্রেন দেখতে পাবেন না। শুধু এক ঝাপটা গরম বাতাস আর ধোঁয়া আপনাকে স্পর্শ করে চলে যাবে, যেন এক অদৃশ্য ট্রেনের মিছিল স্টেশন পেরিয়ে গেল।

বৃদ্ধ আপনার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসবেন। "ওরা বাড়ি চলে গেল। আমার ডিউটিও শেষ।"

কথাটা বলার সাথে সাথেই দূর থেকে আপনার ফেলে আসা ট্রেনের আধুনিক ইলেকট্রিক হর্ন বেজে উঠবে। আপনি চমকে বাস্তবে ফিরে আসবেন। দেখবেন, আপনার ট্রেনটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে। আপনি প্রাণপণে দৌড়ে গিয়ে চলন্ত ট্রেনের হাতল ধরবেন।

পরদিন সকালে যখন আপনার গন্তব্যে পৌঁছাবেন, রাতের ঘটনাটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হবে। আপনি হয়তো আপনার বন্ধুদের বলবেন কুয়াশাপুর জংশনের কথা। তারা বিশ্বাস করবে না, হাসাহাসি করবে। ম্যাপে খুঁজলে এমন কোনো স্টেশনের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আপনি জানেন, ওটা স্বপ্ন ছিল না। কারণ, মাঝে মাঝে গভীর রাতে যখন ট্রেনের দূরবর্তী হুইসেল শোনেন, আপনার নাকে এখনো সেই পুরনো কয়লার ইঞ্জিনের ধোঁয়ার গন্ধটা লেগে থাকে। আর আপনি জানেন, যারা বাস্তবের পথ ভুলে হারান পথে পা বাড়ায়, একমাত্র তাদের জন্যই কুয়াশাপুর জংশন তার কুয়াশার পর্দা সরিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror