SUBHAM MONDAL

Romance


5.0  

SUBHAM MONDAL

Romance


জানলার পাশের সিটের মেয়েটা..

জানলার পাশের সিটের মেয়েটা..

10 mins 819 10 mins 819


চাকরি পেয়েছি আজ প্রায় দুবছর হতে চললো। গ্রাম থেকে প্রায় অনেক দূরে, তাই দুবছর আর বাড়িমুখো হইনি।


হাতে ছুটিছাটাও কম, মাসে কখনো কখনো দু চারদিন ছুটি মেলে, ছুটির দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েই কাটিয়ে দিই।


মন চাইলেও বাড়ি আসতে পারিনা, বাড়ি আসা মানে আবার সেই বাস, আবার সেই ভিড়, আবার সেই.......


ভাবলেই যেন আজও আমার মনটা কেঁদে ওঠে, তাইতো দুবছর আগের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি আঁকড়ে আজও বেঁচে আছি, অনেক কিছুই তো জানার বাকি ছিল। তাই নতুন করে আর কিছুই জানতে চাই না, কিচ্ছু না।


তবুও এবার দুর্গাপুজোতে অফিস থেকে প্রায় পনেরো দিনের ছুটি দিলো। অনেক দিন গ্রামের পুজোটাও দেখা হয়নি তাই মনকে অনেক বুঝিয়ে এবার দুর্গাপুজোতে গ্রামে ফিরছি আবার।


বাড়ি যেতে প্রায় অনেকখানি রাস্তা, বাসে উঠে জানালার পাশের একটা সিটে বসেই আঁতকে উঠে বসে পড়লাম পাশের সিটটা এখানের বাসে ততটা ভিড় হয়না বললেই চলে, তাই আমার জানালার পাশের সিটটা আজও খালিই রয়ে গেলো।


ঠিক দুবছর আগে এমনটাই তো ঘটেছিলো। সিটটার দিকে তাকাতেই মনে পড়লো আবার সেই দুবছর আগের সেই পুরোনো স্মৃতি, সেই দুর্গাপুজো দেখতে বাড়ি যাওয়া, আর......


আরও অনেক কিছু......


"জানালার পাশের সিটের মেয়েটা"


"এই যে একটু সরবেন, আপনি একটু জানালার পাশের দিকে সরে গেলে এই সিটটায় ..."


মেয়েটার কথা শেষ না হতে হতেই আমি বলে উঠলাম, "হুম বুঝেছি", বলেই পাশের সিটটায় সরে গেলাম, বললাম, "এই যে এবার বসুন।"


মেয়েটার দিকে চেয়ে অবাক হলাম, দেখি একজন বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে আসছেন সিটটার দিকে, বাসে ভিড় কম ছিলো তাই স্পষ্ট দেখতে পেলাম। মনে মনে ভাবলাম : যাক আমারই ভুল, ভাবলাম একটা সুন্দরী মেয়ের পাশে বসে গল্প করতে করতে এই দুঘন্টার journey টা কাটিয়ে দেবো। কিন্তু কোথায় কি।


যাইহোক মানবিকতার খাতিরে সেই মহিলাকে বসাতে সাহায্য করলাম। দেখলাম মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলো।


হয়তো সেও আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেছে, বেকার ওসব ভেবে আর কোনো কাজ নেই তাই আমিও জানালার দিকে মুখ করে তাকিয় রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ ফিরিয়ে দেখি মেয়েটা দাঁড়িয়ে, বাসের আর কোনো সিট খালি নেই।


অগত্যা আমিই উঠে পড়লাম, বললাম, "যান আপনি গিয়ে বসুন আমার সিটটায়।"


মেয়েটি একটু ইতস্তত বোধ করে বললো, "না, না, আমি দাঁড়িয়েই চলে যেতে পারবো, আপনি বসুন।"


আমি বললাম, "আমি একটু পরেই নেমে যাবো। তাই আর কিছুক্ষনের জন্য বসে কি লাভ।"


"ও.." বলে মেয়েটি গিয়ে বসলো আমার সিটটায়। যাক বাবা আমার কথা তাহলে বিশ্বাস করেছে, আসলে আমি যাবো অনেক দূরে, তাও প্রায় ঘন্টা দুয়েকের ব্যাপার, তাও চোখের সামনে একটা মেয়েকে এভাবে দাঁড়িয়ে যেতে দেখতে পারিনা। তার চেয়েও বড়ো ব্যাপার হলো আসলে মেয়েটাকে দেখতে বেশ ভালো, তাই আমি চাইছিনা যে পরে অন্যকোনো সিট পেয়ে ও বসে যাক আর আমার চোখের আড়াল হোক, তাই ওকে নিজের সিটেই বসিয়ে দিলাম, বরং আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখি। আমি আমার ব্যাগটা সাবধানেই রেখে দিলাম, আসলে অনেককিছুই আছে ওই ব্যাগে।


সদ্য graduation পাশ করে রেজাল্ট হাতে নিয়ে আজ অনেক দিন পরেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। সঙ্গে আরো কিছু ব্যাগ রয়েছে সেগুলো বাসে ওঠার সময়ই রেখে উঠেছি। এখন হাতে শুধু একটা স্কুলব্যাগ। আর কিছুদিন পরেই দুর্গাপুজো তাই বাড়িতে গিয়ে দুর্গাপুজো আনন্দটাও বেশ দারুন হবে। এখন পড়াশুনারও কোনো চাপ নেই, উফফ বাবা কতবছর পরে এমন খোলা নিঃশ্বাসে বাড়ি যাচ্ছি। পড়াশুনার জীবনের গন্ডি প্রায় শেষ, এখন কিছুদিন একটু জিরিয়ে নিই তারপর দরকার একটা চাকরি। ব্যাস......


এসব ভাবতে ভাবতে হটাৎ তাকিয়ে দেখি সেই মেয়েটা আর সেই মহিলা , মেয়েটারই কেউ চেনাজানা হবে হয়তো নিজেদের সিট বদল করে ফেলেছেন, ঠিক আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার পাশেই মেয়েটা বসে আছে আর তার পাশের জানালার পাশের সিটটায় সেই মহিলা।


কয়েকবার ভাবলাম মেয়েটার সাথে কথা বলবো কিন্তু সাহস হলো না।

এমনিই দাঁড়িয়ে আছি, হটাৎ ওই মেয়েটা আমাকে অবাক করে ডাকলো, "এই যে.."


-হুম বলুন

-আপনি নাকি কিছুক্ষন পরেই নেমে যাবেন যে তাই, তা প্রায় আধঘন্টা তো হতেই চললো।

-না মানে ...

-বুঝতে পেরেছি মিথ্যে বলেছিলেন তো। কি দরকার ছিল এতটা রাস্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার, নিন বসুন।


আমি বললাম আমি ঠিক আছি, "আপনি বসুন।"


আমি এটা বলতেই, সে বললো, "না না তা কি করে হয়, আপনি বসুন আমি বরং দেখছি অন্য কোনো সিট খালি আছে কিনা, আমি ঠিকই বসে পড়বো।"


বলেই মেয়েটি নিজের সিট ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করলো।


-আরে আরে বসুন বসুন বলে প্রায় অনেকটা ওর কাঁধে হাত দিয়েই ওকে আবার বসিয়ে দিলাম।


মেয়েটি একটু লজ্জা পেল বটে তবে রাগ করলো কিনা জানি না।


অবশ্য রাগ করারই কথা, হটাৎ করে বাস এর মধ্যে ওকে স্পর্শ করাটা আমারও উচিত হয়নি।


তাই কিছুক্ষন পরেই ওকে বললাম, "সরি আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।"


-ইটস ওকে


আমি একটা স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললাম।


হটাৎ কিছুক্ষন পরেই দেখি সেই মহিলাটি নিজের সিট ছেড়ে উঠে পড়লেন আর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, আমি একটু করুন কণ্ঠে মেয়েটাকে বললাম, "আপনারা কি এখানেই নামবেন ??"


-না না আমার তো এখনও অনেক দেরি নামতে।


-তাহলে ওই মহিলা নেমে যাচ্ছেন যে ?


-ওনার জায়গায় উনি নামবেন।


আমি সেরকম আর কিছু বললাম না, বাস থামলো, মহিলাটি নামলেন আর নামার আগে গেটের সামনে থেকেই মেয়েটিকে আর আমাকে বললেন, "আসছি, ভালো থেকো।"

বাস ছেড়ে দিলো, মেয়েটি আমাকে বললো, "এবার বসুন।"


হুম বলেই বসতে গেলাম, মেয়েটা জানালার পাশের সিটে চলে গেল, আর আমি ওর পাশের সিটটায়।


মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, "ওই মহিলা কি আমার চেনাপরিচিত কেউ নন ??"


"না না এই বাসেই আমাকে বললো, 'আমাকে একটা বসার জায়গা খুঁজে দাওনা।' তাই আমিও খুঁজে দিলাম, এই আর কি।"


-ও


-মানুষের উপকার করতে বেশ ভালো লাগে এই আর কি ।।


-হুম, আমারও বেশ লাগে


-ও তাই জন্যেই বুঝি আপনাকে বলার সাথে সাথে আপনি সিটটা দিলেন।


-হুম।


মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "হাসলেন কেন ?"


-এমনি।।


বুঝতে পেরেছি মেয়েটা আমার কথা শুনেই হাসলো। আসলে ও জানে যে আমি ওর জন্যই সিটটা ছেড়ে দিয়েছিলাম।


একটু সাহস নিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি যাচ্ছেন কোথায়"


-আমার মামাবাড়ি


-ও ঘুরতে নাকি অন্য কোনো কারণ


-আসলে অনেকদিনই যাওয়া হয়নি আর ওখানে নাকি খুব বড় দুর্গাপুজো হয়। একেবারে দুর্গাপুজো দেখে তারপর ফিরবো।

তা আপনি কোথায় যাচ্ছেন ?


-আমি এই তো আমার নিজের বাড়ি যাচ্ছি।


-ও, কোথাও ঘুরতে গিয়েছিলেন নাকি।


-আরে না না আসলে আমি পড়াশুনার জন্য হোস্টেলে থাকি। graduation কমপ্লিট করে আজ প্রায় মাস ছয়েক পর বাড়িতে ফিরছি।


-ও আচ্ছা, ভালো


-একটা কথা বলতে পারি কি


-হুম বলুন


-আমরা প্রায় এক ঘন্টা বসে কথা বলছি, এখনো কি আমাদের মধ্যে আপনি, আজ্ঞে চলবে ??


-তাহলে কি চলবে আপনি বলুন।


-আবার আপনি


-আচ্ছা সরি


-তোমার মামাবাড়ি কোথায় ??


-এই তো কিছু পরেই।


-কিছুপরেই মানে ?? জায়গার নাম জানেন না ??


-না আসলে অনেকদিন পরে আসছি তো তাই নামটা ভুলে গেছি।


-তাহলে চিনবেন কিভাবে ??


-জায়গাটা দেখলেই চিনে নেবো।


-ও বাবা, কত বছর আগে এসেছিলেন তখন আর এখন সবকিছু কি একইরকম থাকবে নাকি।


-কি জানি, তবে কি হবে।


বুঝলাম মেয়েটা একটু ভয় পেয়েছে। ওকে সাহস দেওয়ার জন্য বললাম, "আচ্ছা একটা কাজ করো তোমার মামাবাড়ির কাউকে একটা ফোন করো। তারপর আমাকে ফোনটা দাও আমি দেখেছি।"


-আমার তো কোনো ফোন নেই। আর নম্বরও তো মনে নেই।


-যা বাবা, তাহলে কি হবে


-আরে তোমার বাড়ির লোক তোমাকে এভাবে একটা একা মেয়েকে কিভাবে ছেড়ে দিলো। আর তুমিও বা একা মেয়ে বাড়ি থেকে কাউকে সঙ্গে না নিয়ে বেরিয়ে এলে।


এভাবে বাসে বসে থাকতে থাকতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেলো। মেয়েটির জন্য ভয় ভয় করতে লাগলো।


মেয়েটি অনেকক্ষন পর উত্তর দিল, "বাড়িতে বলার কেউ নেই।"


-মানে ??


-সে অনেক কথা, আসলে আমি হোস্টেলে থাকি।আমার বাড়িতে আমার আপন বলতে কেউই নেই। মা বাবা ছোটবেলায় মারা গেছেন। তারপর কাকুকাকিমা দের কাছেই মানুষ। ওরা কেউ আমায় একটুও ভালোবাসে না। আমি মামাবাড়িতে এলেই একটু ভালো থাকি। তাই এখানেও আসতে দেয়না। মামাবাড়ির কাউকে যে ফোন করবো তারও কোনো উপায় নেই।


মেয়েটার মুখে ওর কষ্টের কথা শুনে খুব খারাপ লাগলো।


আমি কিছুক্ষন ভাবলাম তারপর একটু সাহস নিয়ে মেয়েটাকে বললাম, "একটা কথা বলবো।"


-বলুন


-আপনি আমার সাথে চলুন আমার বাড়ি।


-না না আমি যাবো না। আমি আমার মামাবাড়ি ঠিকই চলে যাবো।


-কিভাবে যাবেন আপনি। দেখুন প্রায় দুঘন্টা হতে চললো। আর কতদূর এভাবে যাবেন আপনি।


-বাস যতদূর যাবে ততদূর পর্যন্তই টিকিট নিয়েছি। এর মধ্যে ঠিকই খুঁজে পাবো নিশ্চয়ই।


-আরে পাগলামি বন্ধ করুন। শেষমেষ একটা অচেনা অজানা জায়গায় গিয়ে কোনো খারাপ লোকের পাল্লায় পড়লে কি বিপদ হতে পারে খেয়াল আছে আপনার ??


-বিপদ আর কি হবে বলুনতো ?? মরে গেলে বরং এই নরকযন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেতাম।


-আরে কি আবোল তাবোল বকছেন এসব। দেখুন আমাকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন।


মেয়েটি কিছুই বললো না।


আমি মেয়েটিকে বললাম, "দেখুন একটু পরেই আমি নামবো, আপনিও যাবেন আমার সাথে।"


মেয়েটি কিছুই বললো না।


-আরে কিছুতো একটা বলুন। যা ভাবার এখুনি ভাবুন। আপনাকে এভাবে একা ফেলে আমি কিভাবে যাই বলুন।


মেয়েটি তাও কিছুই বললো না।


আর কিছুক্ষন পরেই আমাকে নামতে হবে, তাই তৈরি হয়ে গেলাম।


মেয়েটিকেও নিয়ে চললাম।


বাস থামতেই আমরা নামলাম, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বাস থেকে আমার ব্যাগগুলো নিয়ে দুজন রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে ।


মেয়েটি অনেকক্ষন ধরেই দেখছি কোনো কথা বলছে না, ভাবলাম হয়তো ভয় পেয়েছে কিন্তু আমাকে কি ও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না, মনে সন্দেহ জাগতেই প্রশ্নটা করেই ফেললাম, "এই যে তখন থেকে দেখছি মুখে কোনো কথা নেই।"


-না না বলুন


-কিছু খাবেন ? সেই দুঘন্টা ধরে তো বাসে বসে আছেন। চলুন সামনের কোনো দোকানে কিছু খাওয়া যাক


-না না, আমার খিদে নেই


-দুজন একসাথেই দুঘন্টা ধরে বসে আছি, আমার খিদে পেয়ে গেল আর আপনার পায়নি বললেই হলো নাকি। চলুন


-আরে না, আমি কিছু....


ওর কথাটা শেষ না হতেই বললাম, "আচ্ছা আপনি কি আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না ?"


-না ঠিক তা নয়, তবে...


-কি বলুন


-আমার কাছে তো বেশি টাকাপয়সা নেই।


একটু রেগে বললাম , "চলুন"


 দোকানে বসে দুজন চাওমিন খেলাম, আমাদের এখানে ঠিক সন্ধ্যে হলেই বাজারে চাওমিন খাওয়ার ভিড় পড়ে যায়। তাই অনেকটাই দেরি হয়ে গেল প্রায়। ঘড়িতে সময় সাড়ে সাতটা, এখনো প্রায় মিনিট কুড়ি হাঁটতে হবে, বাসস্ট্যান্ড থেকে এখানে কোনো অটো বা রিকশার সুবিধা নেই তাই প্রায় দুই তিন কিলোমিটার এর পথ হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, বেশি লোকজন হয়না রাস্তায়, মাঝে মাঝে দুটি একটি লোক রাস্তায় যাতায়াত করে, আসলে বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের গ্রামের এই রাস্তাটি প্রায় জনমানবশূন্যই বটে, কিছুটা দূরেই আমাদের গ্রাম, গ্রাম না বলে মফঃস্বল বলাই যায়। রাস্তাঘাট, বাজার, দোকান, সিনেমাহল, স্কুল প্রায় সবকিছুই আছে গ্রামে। গ্রামের মানুষেরা কৃষিকাজটাই বেশি করেন, আর কারোর বা গ্রামেই বিভিন্ন ব্যাবসা রয়েছে, কারোর বা দোকানপাট আর কারোর বা হোটেল। তাই গ্রামের মানুষদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কম আর তাই যোগাযোগ ব্যবস্থার এই ক্ষীণ পরিণতি। তাই কারোর খুব দরকার না পড়লে গ্রামের আঁচল থেকে বেরোয় না কেউই। গ্রাম নিয়ে এসব সাতপাঁচ ভেবে যাচ্ছি, একটু পরেই মেয়েটি মৃদু স্বরে বলে উঠলো, "আমরা আর কতদূর যাবো" বুঝতে পারলাম মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে, প্রায় তিরিশ মিনিটের হাঁটা পথ, একটু সময় নিয়ে বললাম, "এই তো আর দু মিনিট"


-ও


-আচ্ছা আপনার কষ্ট হলে চলুন কোথাও একটা বসি।


-এই রাস্তার মাঝে কোথায় বসবেন, দুদিকে তো মাঠ, তার ওপর অন্ধকার প্রায় ঘনিয়ে এসেছে।


-রাস্তার পাশে একটু দূরে দূরেই বসার জায়গা রয়েছে। আপনি বোধ হয় খেয়াল করেননি।


-ও না না


-হুম, তবে এবার সত্যিই মিনিট দুয়েকের মধ্যেই গ্রামে ঢুকে পড়বো।


এবার সামনে তাকাতেই দূর থেকে গ্রামটি দেখা যাচ্ছে, আলো জ্বলছে, কি মায়াবী এই রূপ। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ফিকে হয়ে আসা গ্রামের আলো যেন সমস্ত সৌন্দর্য কে হার মানায়। গ্রামের আলো দেখে মেয়েটাও যেন একটু হাসলো বলে মনে হলো, ওর হাসি দেখে আমারও খুব মনে হলো : বাড়িতে গেলে বাড়ির সবাই নিশ্চই ওকে খুব আপন করে নেবে, আদর করবে সবাই। সামনেই দুর্গাপুজোটা হয়তো ওর জীবনের সেরা একটা মুহূর্ত হয়ে থাকবে সারাজীবন। হয়তো এই অকৃত্রিম আনন্দ আর ভালোবাসার মধ্যে ওর সেই জলজ্যান্ত কষ্টের অতীতটা একদিন ঠিকই ভুলে যাবে। ঠিক এসব ভাবতে ভাবতেই টের পেলাম ওর মাথাটা আমার ঘাড়ের ওপর লুটিয়ে পড়লো, আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হলাম ঠিকই কিন্তু পরক্ষনেই ভাবলাম হয়তো এতটা রাস্তা হাঁটার ক্লান্তিতেই ও একটু অজ্ঞেন হয়ে পড়েছে। রাস্তায় মানুষজন কেউ নেই, রাস্তার একধারে ওকে বসিয়ে ওর চোখে মুখে জল দিলাম, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমার শরীর ঠান্ডা হলাগলো। খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। কি করবো হটাৎ করে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। গ্রামে নিয়ে গেলে আরো সমস্যা হতে পারে তাই ওকে কোলে তুলেই দিলাম ছুট ওই বাসস্ট্যান্ডের দিকেই, আমার সঙ্গে যা যা ছিল সব রাস্তাতেই পড়ে রইলো। প্রায় তিরিশ মিনিট হাঁটার পর আবার একই রাস্তা দিয়ে আবার বাসস্ট্যান্ড, শরীরে কোথা থেকে জানি না অদ্ভুত একটা শক্তি ফিরে পেলাম। ওকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌছালাম ঠিক কিছুটা আগেই একটা বাস ছুটে যেতে দেখলাম। প্রায় এক ঘন্টা ছাড়া ছাড়া বাস, আমি অনেক চেষ্টা করলাম ওর জ্ঞান ফেরানোর, কিন্তু আমার সব চেষ্টাই বৃথা গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে দেখি ওর শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আসছে। প্রায় একঘন্টা হয়ে গেল বাসস্ট্যান্ডেই বসে আছি, ঘড়িতে প্রায় দশটার কাছাকাছি। শেষমেষ একটা বাস পেলাম, ওকে নিয়ে খুব সাবধানে বাসে উঠলাম, রাত্রিবেলা তাই বাস প্রায় খালি ছিল।

বাস কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম কাছাকাছি কোনো ভালো হসপিটাল দেখে দাঁড় করানোর জন্য। একটা নির্জন জায়গায় নামিয়ে দিয়েই কন্ডাক্টর বললো এখান থেকে ডানদিকে কিছুটা হেঁটে গেলেই সামনে বড়ো হাসপাতাল। কন্ডাক্টরের কথা শুনে সেদিকেই গেলাম। হুম সামনেই হাসপাতাল বেশ বড়ো। খুব তাড়াহুড়ো করে একটা ডাক্তারকে খবর দিলাম। আমি বাইরের সিটে বসে অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেই জানিনা। ঘুম ভেঙে সকাল ছটা, আমি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকলাম ডাক্তার কে। কিছুক্ষন পর মেয়েটাকে দেখতে পেলাম, ঘুমিয়ে আছে, স্ট্রেচার এর ওপর। সেই ঘুম থেকে জেগে ওঠা আর সম্ভব নয়। ওর সারা শরীর ঠান্ডা। হয়তো কাল রাতেই ও মারা গিয়েছিলো। দেখলাম সকালের মিষ্টি রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে আমার চোখে এসে পড়লো। ওই রোদের অনুভূতি আমার চোখে পড়লেও সেই মেয়েটির চোখে সেটি অধরাই থেকে গেল। মাত্র কয়েকঘন্টাতেই মেয়েটিকে খুব আপন করে ফেলেছিলাম, কাউকে আপন করলে সে নাকি খুব দূরে চলে যায়, তবে এতটা দূরে তা কোনোদিন ভাবিনি। হয়তো একটু বেশি আপন করেছিলাম ওকে, হয়তো মনের একটু বেশিই কাছে ওকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।


কিন্তু আমি তো ওর কেউ নই, তাই ওর ডেডবডি টা হসপিটালে রেখেই চলে এলাম। ওর প্রিয়জনেরা যদি ওকে খোঁজার চেষ্টা করে, যদি শেষবারের মতো ওর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে, যদি একবারের জন্যও তাদের চোখে ওই মেয়েটার জন্য জল নেমে আসে, হয়তো বা সেই আশাতেই। আজ দুবছর ধরে এই মর্মান্তিক স্মৃতিটাকে আমার সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছি। বাড়ি ফিরছি, আবার সেই বাস, আবার সেই জানালার পাশের সিট ঠিক সেদিনের মতোই। কিন্তু নেই শুধু সেই মেয়েটা, ওই সিটটা আজ ফাঁকা। মেয়েটির সেই মৃদহাসি, ভয়ে স্তব্ধ চোখ, তার কথা বলা খুব মনে পড়ছে আজ। তাকে অনেক কিছুই তো বলার ছিল। অনেক কিছুই তো জানার বাকি ছিল, পরিবারের আনন্দ উপহার দেওয়া টাও বাকি থেকে গেলো, বাকি থেকে গেলো ওর জীবনের সেই সেরা দুর্গাপুজোর মুহূর্তটা আসার, বাকি থেকে গেছে অনেক কিছু। এমনকি তার নামটা জানাও বাকি থেকে গেছে। 


হয়তো নন্দিনী, হয়তো বা রুপশ্রী। শুধু ওই জানে


"জানালার পাশের সিটের মেয়েটা"!


Rate this content
Log in