Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Abul Jamader

Horror Romance Classics


4.7  

Abul Jamader

Horror Romance Classics


হ্যান্ডওভার

হ্যান্ডওভার

13 mins 737 13 mins 737


বিপ্লব দা আমি ব্রেক এ যাচ্ছি।

সুজয় হেডফোন টা নামিয়ে সিস্টেম লক করে ফ্লর থেকে বেরিয়ে এল। লিফ্ট লবিতে ওয়েট করছে লিফটের জন্য। হঠাত্‌ মনে হল আজ একবার ফোর্থ ফ্লরে গিয়ে সিগারেট খেলে হয়না! লিফটের জন্য ওয়েট না করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল ফোর্থ ফ্লরে। এই ফ্লরটা ওদেরই কোম্পানির কিন্তু এটা এখন অপারেশনাল না। আগে এখানে একটি অস্ট্রেলিয়ান টেলিফোন কোম্পানির ইনবাউন্ড প্রসেস চলত। কয়েক মাস অগে সেটা র‌্যাম্পডাউন হয়ে গেছে। সেটআপ যথা রীতি থাকলেও বাকি সব জিনিসপত্র নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি একটি Non SEZ ক্যাম্পাস। তাই এই খালি ফ্লরটাকেই সবাই আন অফিসিয়াল স্মোকিং জোন বানিয়ে নিয়েছে। কারণ মেন গেট বা নির্ধারিত স্মোকিং জোন এখান থেকে অনেকটা দুরে। তাই অনেকেই এখানে স্মোক করতে আসে। সুজয় শুনেছে সেকথা কিন্তু কখনো এখানে আসেনি স্মোক করতে, বাইরেই যেতো। আসলে সুজয় এই এক দেড় মাস হল জয়েন করেছে এখানে। ট্রেনিং শেষ করে এই সপ্তাহ খানেক হলো কল নিচ্ছে। পাছে কন ঝামেলাই পরে চাকরি টা না চলে যায় তাই এখানে আসতে ভয় পেত সে। তবে আজ ওর এতটা হেঁটে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না।

বিশালকায় ফ্লরে কয়েকটা আলই মাত্র জ্বলছে আর কাচের জানলা ভেদ করে বাইরের হেলজেনের আল মিলে মিশে বেশ একটা মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এখানে। ফ্লরের পেছনের দিকের যে বড়ো জানলা আছে সুজয় তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট টা জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়েছে সবে, পেছন থেকে একটি মেয়ের গলা পেল।

এক্সকিউস মি...

সুজয় পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে একটি মেয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে।

এক্সকিউস মি, মাচিস হবে? মেয়েটি হাতে সিগারেট নিয়ে সুজয়ের সামনে তুলে ধরল।

সুজয় প্রথমে ভয় পেয়েছিল যে অ্যাডমিন এর কেউ নাতো! কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে সে পকেট থেকে মাচিস বের করে মেয়েটির দিকে বাড়িয়ে দিল। মেয়েটির সিগারেট জ্বালান হয়ে গেলে মাচিসটা ফেরত নিয়ে আবার জানলার দিকে তাকায়। মেয়েটি থ্যাংক ইউ বলল বটে তবে সুজয় কন রেসপন্স করল না। সুজয় এতটা অভদ্রতা করেনা সচরাচর, কিন্তু কেন যেন এই মেয়েটির ওপর ওর রাগ হচ্ছিল। শুধু শুধু এতটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল না যে সিগারেট খাওয়ার মজাটাই নষ্ট গেল। সুজয় মনে মনে এইসব ভাবছে, মেয়েটা ওর ঠিক পশে এসে কাচের জানালাটাই পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল।

তুমি নতুন জয়েন করেছ বুঝি? মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।

সুজয় : হ্যাঁ, এই দেড় মাস মত হলো।

মেয়েটি : হুম.....আমি জানি, আমিও তো ওয় একি প্রজেক্টে।

সুজয় : ওহ তাই!

মেয়েটি : হ্যাঁ তাই। তুমি আমকে দেখনি হইত।

সুজয় : হবে হইত।

মেয়েটি : বাই দা ওয়ে আই অ্যাম জয়ী, জয়ী সরকার। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেই সুজয়ের দিকে।

আমি সুজয়, উত্তরে সুজয় ও হ্যান্ডশেক করে।

আমি এখানে রোজই আসি স্মোক করতে। ধুর কে যাবে অত দুর হেঁটে সিগারেট খাবার জন্য। জয়ী আধ খাওয়া সিগারেট টা ফেলে পা দিয়ে নিভাতে নিভাতে বলল।

সুজয় মৃদু হেঁসে জয়ির কথাই সাই দিল।

জয়ী থামল না...তাছাড়া আমার না এখান থেকে এই পেছনের ভিউ টা খুব ভাল লাগে। ভাবো এরকম একটা ঝাঁ চকচকে বিল্ডিংয়ের ঠিক পেছনেই ধান জমি, খাল, গ্রাম। যেন মনে হয় নিউ ইয়র্কের হাইরাইজ বিল্ডিং এ বসে জীবনানন্দ পড়ছি। বলেই হা হা করে হেসে ওঠে জয়ী। এই আমি আসছি তুমি কি যাবে?জয়ী চলে যাবার প্রস্তুতি নেই।

সুজয় প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেট টা দেখিয়ে বলে নাহ তুমি চলো। আমি এটা শেষ করে আসছি।

ওকে...টাটা...জয়ী চলে গেল।

সুজয় জয়ির আধ খওয়া সিগারেটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গোল্ডফ্লেক লাইট! পনের টাকা দাম! এটা জাস্ট ফেলে দিয়ে চলে গেল! সুজয় ফ্লেক খাই, পাঁচ টাকা দাম, তাও জতখোননা ফিল্টার পর্যন্ত অগুন পৌঁছাচ্ছে সে সিগারেট ফেলেনা। তাই এটা তার কাছে বহুমুল্য সিগারেটের অপচয় ছাড়া আর কিছু মনে হল না। জলের মোতো সে সিগারেটেরও অপচয়ের বিরুদ্ধে।

সিগারেট শেষ করে সুজয় আবার ঢুকে পড়ে ফ্লরে। আবার ব্যাক টু ব্যাক কল। আবার কাস্টমারদের অফুরন্ত খিস্তি শোনা। আবার সেই কাস্টমারদেরই আপনি আগ্জ্ঞে করে স্বসম্মানে পরামর্শ দেওআ। উউফফ।


অধ্যায় ২

আজ মঙ্গলবার। সুজয় সবে অফিসে পৌঁছে লগিন করেছে। সোমবারের মোতো আজ অতটা টায়ার্ড লাগছেনা। উইক এন্ড কাটিয়ে সোমবারের অফিস টা যেন অসহ্য লগে তার। গা টা ভারি ম্যাজ ম্যাজ করে। পাশের সিস্টেম টা খালি। গতকাল ওখানে ওসমান বলে একটি ছেলে বসেছিল। ওর দুবছরের এক্সপেরিয়েন্স, হলে কি হবে মোটেও হেল্পফুল না। সুজয় নতুন, অনেক ব্যাপারেই অন্যের হেল্প লাগে একটু আধটু। কাল বার বার উঠে গিয়ে SMEর থেকে হেল্প নিতে হয়েছে। আজ ও মনে মনে ভাবছে ঐ ছেলেটা যেন না বসে এখানে। বীপসাউন্ড পেয়ে সুজয় কলে মনযোগ দেই। কল চলা কালীন সুজয় বুঝতে পারে পাশের সিটে কেউ একজন বসেছে। সুজয় তাকায় না। ওকে খুব মন দিয়ে এপ্লিকেশানের বিভিন্ন অপশন গুলো দেখতে হয়। অনভিজ্ঞ হবার এই এক জালা।


কল শেষ করে সুজয় প্রতিবেশীর দিকে অর্থাৎ পাশের জনের দিকে তাকায়। জয়ী লগিন করেছে। একগাল হাসি নিয়ে জয়ী গির্টিঙস জানাই...গুডআফ্টারনুন স্মোকার।


সুজয় ও উত্তর দেয় এবং যোগ করে, এই যেখানে সেখানে স্মোকার বোলোনা প্লিজ।

জয়ী হাসতে থাকে।

পাশে যখন বসেছ তখন আমায় কিন্তু হেল্প করতে হবে। সুজয় অনুরোধ করে।

নো প্রব্লেম। জয়ী সম্মতি দেই।


আজ কলের অতটা প্রেশার নেই। মাঝে মাঝেই দুজনের মধ্যে গল্প চলতে থাকে। আজ সুজয়ের খুব ভালো লাগছে। অনেক স্ট্রেস ফ্রী হয়ে কল নিতে পারছে সে। দু ঘণ্টা কেটে গেল।

সিগারেট খেতে যাবি (এই আধঘণ্টা আগেই ওরা “তুমি” থেকে “তুই” তে নেমেছে)? জয়ির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল সুজয়। টিম লিডার কে জানিয়ে ব্রেক দিয়ে উঠে পরল। দুজনেই এখন ফোর্থ ফ্লরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। সিগারেট টা জ্বালান হলে সুজয় জানতে চায় - তুই বিপ্লব দাকে বলে ব্রেক দিস না?

জয়ী : ছাড়ত। নিজের ব্রেক নিজে নেবো, ও পারমিশান দেবার কে রে?

সুজয় : না আমার মনে হয় বলে আসাই ভালো। কলের প্রেসার থাকলে তো ব্রেক সীজ করতে হয় ওদের? আফটার অল আমরা তো আর কলেজে নেই বল যে যখন খুশি ক্লাস করলাম নাহলে আড্ডা মারলাম।

জয়ী : আমি ওসব পাত্তা দিই না। ছাড়, তর ব্যপারে কিছু বল।

সুজয় : কি বলব?

জয়ী : এই তোর বাড়িতে আর কে আছে? তারা কি করে?

সুজয় : মা আমি আর দিদা।

জয়ী : বাবা?

সুজয় : আমাদের সঙ্গে থাকেনা, দে আর ডিভোর্সড।

জয়ী সুজয়ের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায় আর সরি বলে।

সুজয় : না না। ঠিক আছে। তুই সরি হবি কেন? আর তোর?

আমরা দুজন। আমি আর ঠাম্মা।

সুজয় : আর তোর প্যারেন্টস?

অঙ্গুলে ধরা সিগারেট আকাশের দিকে উঁচিয়ে জয়ী ইশারায় জানালো ওঁরা আর নেই। কার অ্যাক্সিডেন্ট। তাও বছর পাঁচেক হয়ে গেল।

সুজয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পড়ছিল না। এরকম সিচুএসনে যে কি বলতে হয় সুজয় বুঝে উঠতেই পারছিল না।

জয়ী সম্ভবত সুজয়ের মনের অবস্থাটা বুঝতে পারে। সে জানালার স্টিলের কাঠামোর ওপরে রাখা সুজয়ের হাতের উপর হাথ রাখে।

সুজয় অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে। এটা সে এক্সপেক্ট করেছিলনা। সে জয়ির চোখে চোখ রাখে। জয়ী পাত্তা না দিয়ে বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেই। দুজনের কেউই হাত সরালনা। চুপচাপ এভাবেই কেটে গেল কয়েক মুহুর্ত। শুধু সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার শব্দ নেপথ্য সঙ্গীতের মতো বাজতে থকে।

সিগারেট শেষ হয়েছে দুজনারই। দুজনেই নেমে আসে ফোর্থ ফ্লর থেকে।


অধ্যায় ৩

বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। সুজয় আর জয়ির বন্ধুত্ব এখন গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। ওরা এখন অফিস এ আসে একসাথে, যে আগে আসে সে অপেক্ষা করে অন্নের জন্য। দুজনে চা সিগারেট খেয়ে তবেই ভেতরে ঢোকে। শুট্টা ব্রেক থেকে লাঞ্চ ব্রেক সব একসঙ্গে। অফিসে অন্য কার সঙ্গে সেরকম মেশা হয়না সুজয়ের। কাজের বিষয়ে হেল্প থেকে ফাঁকা সময়ের গল্প, জয়ী ছাড়া আর কাউকে ভাবতেই পারেনা সে। অফিসের অন্য কলিগরা সুজয় কে নিয়ে কানাঘুষো করে। সুজয় বুঝতে পারে সবই। কিন্তু কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেনা। বরং কিছুটা গর্ভ বোধ করে। অফিসের সব থেকে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে সে। লোকে তো একটু কানাঘুষো করবেই।


আজ ফ্রাইডে, কাল থেকে উইকেন্ড শুরু। আধা ঘণ্টা হয়ে গেল জয়ী আসেনি। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুটো সিগারেট খেয়ে ফেলেছে সুজয়। বার বার তাকাচ্ছে রাস্তার দিকে। ও কখনো দেরি করে অফিস এ ঢোকেনা। কিযে করে মেয়েটা!

সরি সরি সরি। জয়ী দ্রুত গতিতে সুজয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়।

নে চা বল। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো জয়ী।

এই তর সময় হল আসার? কিরে কথাই ছিলিস এতক্ষণ? লেট লগিন হয়ে গেল তো। ফোনটাও তো ধরছিস না। ইশ আজ রাত ১টার ক্যাব বুক করতে হবে। এক সঙ্গে অনেক গুলো কথা বলে ফেলল সুজয়।

জয়ী সিগারেট জ্বালিয়ে বলে আরে চাপ নিসনা বস। সুজয়কে চিন্তামুক্ত করার চেষ্টা করে। একটা খবর আছে।

সুজয় : কি খবর?

জয়ী চায়ের ভাঁড়টা হাথে নিয়ে একটা চুমুক দেই। আজকে আমরা হাফডে করে বেরিয়ে যাব। তুই বিপ্লবদাকে বলে রাখিস।

সুজয় : হাফডে কেন? কোথায় যাচ্ছি আমরা।

জয়ী : আমার বাড়ি।

সুজয় : তোর বাড়ি? হঠাত্, কেন? আমার আবার নাইট শিফ্টের টাকাটা মার যাবে। সুজয় একটা একটা করে টাকা জমাচ্ছে। কিছু টাকা জমে গেলে ও MBA টা ডিস্টেণ্সে কম্পলীট করে নেবে। সারা জীবন তো আর কল নিয়ে কাটানো যাবে না।

জয়ী বিরক্ত হয়ে বলে এই সবসময় কিপ্টামি করিসনাত। আমি আজ ঠাম্মাকে বলেছি তুই আসবি আমার সঙ্গে। আমি সব কেনাকাটা করে রেখে এসেছি। ঠাম্মা রান্না করে রাখবে বলেছে। রাতে আমাদের বাড়ি খাবি। তাই আসতে একটু দেরি হয়ে গেল আরকি।

সুজয়ের এখন ব্যাপারটা আর খারাপ লাগছেনা। নাইট শিফ্টের টাকার মায়া ত্যাগ করে সে রাজী হয়ে গেল। হইত বা বলা যায় সে এই দিনটারি অপেক্ষা করছিল । চা খাওয়া শেষ করে দুজনেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটল অফিসের ভেতর।

সাড়ে আট্টার সময় অফিস থেকে বেরিয়ে পরল ওরা। জয়ী একটা ক্যাব বুক করে ফেলেছে এরি মধ্যে। দমদম স্টেশন থেকে একটু দূরেই বাড়ি জয়ীদের। নিউ টাউন থেকে বড়জোর আধা ঘণ্টা লাগবে পৌঁছতে। ক্যাব এ বসেই জয়ী কানে হেডফোন গুজে চোখ বন্ধ করে নিল। এই আধা ঘণ্টা সুজয় একটা কথাও বলেনি জয়ির সঙ্গে। তবে ওর ভাবতে ভালো লাগছিল জয়ী কে নিয়ে। জয়ির সঙ্গে আসন্ন জীবনের ভবিষ্যত নিয়ে। সব কিছু যেন কি সুন্দর ভাবে ঘটে চলেছে। যেন সবকিছু কেউ সাজিয়ে রেখেছিল ওর জন্য। একেবারে সিনেমার চিত্রনাট্যের মোতো। কোথাও কন বাধা নেই। কোনো সমস্যা নেই। সত্যি জীবনটা যেন এক রঙিন স্বপনের মত মনে হচ্ছে সুজয়ের।

গাড়িটা দাঁড়াতেই সুজয়ের ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। দুজনেই নেমে এল গাড়ি থেকে। একটি বেশ পুরোনো আবাসনের ভিতরে ঢুকে পড়ল ওরা। জয়ী সুজয়ের হাথ টা ধরে এগিয়ে চলল। সুজয়ের অস্বস্তি হচ্ছিল। একটু অবাক ও হল বটে। জয়ীটা এত ডেস্পারেট কেন! নিজেদের আবাসনের ভেতরে বয়ফ্রেন্ডের হাথ ধরে যাওয়াটা কি ভাল দেখাই? বিশেষ করে এই উত্তর কলকাতার মানুষ জনের কাছে। নাহ সুজয় মনে মনে ভাবল যে সে হয়তো জজমেন্টাল হয়ে যাচ্ছে? থাক অত ভেবে লাভ নেই। বরং জয়ির হাতের উষ্ণ অনুভূতি উপভোগ করতে করতে এগিয়ে গেল সে লিফটের সামনে।

তিন তলার একটি ফ্লাটের দরজায় এসে দাঁড়ায় ওরা। একটি নেমপ্লেটে ইতালিকে লেখা “‌‌Sirkar’s”। জয়ী নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে সুজয়কে ভেতরে আস্তে বলে। ওরা একটি অগোছালো লিভিং রূমে এসে দাঁড়ায়। জয়ী সুজয়কে সোফা দেখিয়ে বলল তুই একটু বস আমি চেঞ্জ করে আসছি। জয়ী একটা ঘরে ঢুকে গেল। সুজয় লিভিং রুমের চারিদিক দেখতে থাকে। দেওয়ালে সিলিং এ প্রচুর ঝুল পরেছে। তাকে রাখা বয় গুলিতে ধুলোর পরত পরেছে, যেন কতকাল কেউ ছুয়ে দেখেনি বইগুলো। নাহ জয়ী সত্যিই ল্যাদখর। বাড়িতে এসে ঘুমান ছাড়া আর কিছু করে বলে তো মনে হয় না।


কে ভাই তুমি ?

এক বৃদ্ধার আওয়াজে ফিরে তাকাল সুজয়। একজন সত্তরর্ধো বৃদ্ধা পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। সুজয়ের বুঝতে অসুবিধা হল না যে ইনিই জয়ির ঠাম্মা। সুজয় উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম করল ঠাম্মাকে। পরিচয় দেই আমি সুজয়, জয়ির অফিস এ...

ঠাম্মা : ওহ তুমি জয়ির বন্ধু?

সুজয় :হ্যাঁ।....হ্যাঁ ঠাম্মা।

বস ভাই বস। এই বলে ঠাম্মা হাতের লাঠিটা সোফার পাশে রেখে নিজেও বসলেন সামনের সোফায়।

কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন। ঘরদোর ভীষণ নোংরা। আমি একা বুড়ো মানুষ কত আর সামলাব বলো। এই দেখ তোমাকে যে একটু জল দেব তা ভুলেই গেছি, ঠাম্মা ওঠার চেষ্টা করেন। সুজয় বাধা দিয়ে বলে না ঠাম্মা আপনি অস্থির হবেন্ না। আমি ঠিক অছি।

ঠাম্মা পুনরায় বসে পরেন। আর বোলো না ভাই হাঁটুর ব্যাথা টা এত বেড়েছে যে উঠতে বসতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ওষুধটাও শেষ হয়ে গেছে তা প্রায় আট দশ দিন হবে। আমার তো আর গায়ে সে বল নেই যে নিজে গিয়ে কিনে নিয়ে আসব।

সুজয়ের এবারে কিন্তু রাগ হল জয়ির ওপর। খুব রাগ হল। বৃদ্ধা ঠাম্মার ওষুধটা পর্যন্ত এনে দেয়না! এত উদাসীনতা ওর। ও বার বার জয়ির ঘরের দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। বেরোলেই ওকে কয়েকটি কথা শোনাতে হবে।

তুমি কি জয়ির ঘরে যাবে ভাই?

না না, সুজয় একটু লজ্জা পেয়ে গেল।

ঠাম্মা ছাড়বেননা। যাও না, গিয়ে দেখে এস ওর ঘরটা, আমি ততক্ষণ তোমার জন্য একটু চা করে নিয়ে আসি।

অগত্যা, সুজয় জয়ির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

জয়ির ঘরটা বেশ সাজান গছানো তবে ঝুল এবং ধুল সমস্ত কিছুতেই জমে আছে।সুজয় কিন্তু জয়ীকে কথাও দেখতে পাচ্ছে না। বাথরুমে আছে হয়ত। সুজয় কয়েকবার জয়ীকে ডাকলেও কোনো উত্তর পায়নি। সুজয় ঘরের চারিদিকটা ভালো করে দেখতে লাগল। উত্তর দিকের দেওয়ালে তাকাতেই সুজয় আঁতকে ওঠে। শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় হিম শীতল বাতাস। শরীরের রক্ত যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। দেওয়ালে টাঙান জয়ির ছবিতে রজনীগন্ধা ফুলের মালা। অনেকদিন মালাটা চেঞ্জ করা হয়নি, তাই ফুলগুলো শুকিয়ে লালচে হয়ে গেছে। সুজয় বাকরুদ্ধ, জিভ জড়িয়ে যাচ্ছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। ধপ করে বসে পরে সে ধুলো জমা বিছানায়।


এই আজকের দিনেই কালমুখি আমকে ছেড়ে চলে যায় । আজ ওর বাত্সরিক। কিছুই করে উঠতে পারলাম না । আর কি করেই বা করব বলো, না আছে অর্থ বল, না আছে দৈহিক বল। কিভাবে যে এই একটি বছর কাটিয়েছি সে আমি আর আমার ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেনা। যাক আজকের দিনে তবু তুমি এসেছ মনে করে, আমার খুব ভালো লাগছে। কেউ তো আসেনা আর। চোখের জল মুছতে মুছতে ঠাম্মা কথা গুলো বলল।

কখন যে ঠাম্মা ঘরে ঢুকেছে সুজয় টের পায়নি। প্রথমে সুজয় ভয় পেয়ে গেলেও ঠাম্মাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কে কাকে স্বন্তনা দেবে? তবুও ঠাম্মা এগিয়ে এসে সুজয়ের মাথায় পিঠে হাথ বুলিয়ে দেই। কেঁদোনা ভাই। যে যাবার তাকে কি আমরা ধরে রাখতে পারি? যাক আমি ছাড়াও পৃথীবিতে আরো কেউ আছে যে ওকে এত ভালবাসে, চোখের জল ফেলে। কেঁদো না, ঠাকুর আছেন সব ঠিক হয়ে যাবে।


জয়ির বাড়ি থেকে একটা ক্যাব বুক করে বড়ির পথে রওনা দেয় সুজয়। আসার অগে চা খেতে খেতে দিদার কছে সে শুনে এসেছে জয়ির অকাল মৃত্যুর কাহিনী। আগামি কাল বিপ্লবদাকে ফোন করে জানতেই হবে যে কি এমন ঘটেছিল সেদিন। বাইপাস ধরে ঝড়ের বেগে ছুটে চলল কলকাতার আধুনিক টেক্সি।


অধ্যায় ৪


সেদিন রাতে সুজয়ের বিশেষ ঘুম হয়নি। স্নান সেরে সে ডায়াল করল বিপ্লবের নাম্বার।

প্রাথমিক কথা বার্তার পর বিপ্লব যা বলল তার সারমর্ম হল এরকম.......


সেদিন ফ্লরে যুদ্ধকালীন পর্যায়ে কল শেষ করা চলছে। লাস্ট তিন দিন SLA মীট করতে পারেনি। আজকেও প্রচুর কল একের পর এক আছড়ে পড়ছে ফ্লরে। টীম লিডার থেকে ম্যানেজার সকলেই তাড়া দিয়ে যাচ্ছে এসোসিয়েটদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কল শেষ করার জন্য। এমন সময় জয়ী একটা খুবই কমপ্লিকেটেড কলে আটকে পরেছে। ৩ মিনিটের জায়গাই ১৫ মিনিট হয়ে গেছে কাস্টমার কিছুতেই মানছেনা অথবা জয়ী কনভিনস করতে পারছেনা। এদিকে পেছন থেকে টীম লিডার অনবরত চেঁচিয়ে যাচ্ছে “জয়ী কল শেষ কর, জয়ী কল শেষ কর, তোর শ্বশুর কল করেছে নাকি? এত কিসের কথা?” জয়ী আর পারছিলনা, ওর শরীর খারাপ লাগছিল, চোখ অন্ধকার হয়ে আসছিল। শেষমেশ জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে জয়ী। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। ছুটে আসে টীম লিডার, আরো অনেকে। আনা হয় স্ট্রেচার, জয়ীকে নিয়ে হসপিটাল যাওয়ার বেবস্থা হচ্ছে, এমন সময় ছুটে আসে ম্যানেজার রক্তিম দা, আমি এদিকটা দেখছি তোরা ফ্লর সামলা। রক্তিম পাঠিয়ে দেই বাকিদের ফ্লরে, অফুরন্ত কলের ঝড় সামাল দিতে, এম্বুলেনস ডাকা হয়েছে। এমন সময় রক্তিমের ফোন বেজে ওঠে, ক্লায়েন্টের কল, কারেন্ট সিচুএশান কিভাবে সামলাবে।তারই প্লান অফ একশান পাঠাতে হবে। রক্তিম, বুঝে উঠতে পড়ছিল না কোনটা বেশি গুত্বপুর্ন ওর কছে? একদিকে সঙ্গাহীন একটি মেয়ে পরে আছে স্ট্রেচারে অন্য দিকে ক্লায়েন্টের জরুরি তলব। ফ্লর থেকে কাউকে ডাকতেও পারছিলনা। শেষ তিনদিন SLA মীট হয়নি তার সমস্ত দায়ভার কাঁধে নিয়ে বসে আছে সে। আজ যদি SLA মীট না হয়, প্রোজেক্টাই হয়ত হাতছাড়া হবে। চাকরিটাও হয়ত যেতে পারে। মনে একটু আশার আল জ্বলল এই ভেবে যে গত সপ্তাহেও দুটি মেয়ে এরকম সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল, অফিসের ইন হাউস ডাক্তার দেখেছিল, এক ঘণ্টা রেস্ট নিয়ে ফিরে এসেছিল ফ্লরে। এও হয়ত ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আজ ডাক্তার নেই। হাসপাতালে নিয়ে যেতেই হবে। এম্বুলেনস অসতে দেরি আছে। সাত পাঁচ ভেবে সঞ্জয় ঢুকে পড়ে চেম্বারে। কাজ মিটিয়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসে। লিফ্ট লবিতে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে সঙাহীন জয়ী।পাশে অবোধের মত দাঁড়িয়ে দুই সিকিউরিটি গার্ড। এম্বুলেনস এসে গেছে। নিয়ে যাওয়া হল জয়ীকে হসপিটালে। ততক্ষণে সব শেষ। প্রাথমিক চিকিত্সার পর ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছিল। মৃত্যুর কারণ হিসাবে জানানো হয়েছিল সেলিব্রাল এটাক। চিরতরে চলে গেল বাপ মা হারা বৃদ্ধা ঠাম্মার একমাত্র সহায় জয়ী। একটি MNCর বিজনেস বাঁচাতে গিয়ে চলে যেতে হলো এক একুশ বছরের তরতাজা মেয়েকে। এটাকে মৃত্যু বলে না মার্ডার? এই প্রশ্নের উত্তর খুজে না পেয়ে রক্তিম রিজাইন করেছিল পরের দিন। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই যে এই মৃত্যুর দায় তারই, তাই তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে।


বিপ্লব অনুশোচনা করে বলেছিল যে শুধু রক্তিম দা নয়, আমিও হয়ত কোথাও না কোথাও দায়ী জয়ির মৃত্যুর জন্য। কিন্তু আমার বড়ির যা অবস্থা তখন আমি রিজাইন করার সাহস পাইনি রে। আমার আর প্রায়শ্চিত করা হোলোনা হয়তো।

যে দুটো মানুষকে কাল রাত থেকে জয়ির মৃত্যুর জন্য দ্বায়ী করে এসেছিল সুজয়, তাদের অনুশোচনা আর অনুতাপ যেন সেই মানুষ দুটোকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। তবে এই মানুষ গুলিকেউ কি অপরাধী বলা যায়? এরাও কি ভিক্টিম নয় এই এক অনস্বীকার্য সিস্টেমের? সুজয়ের হয়ত এত কিছু ভাবার সময় এবং মানসিকতা কোনটাই এখন নেই।


আজ শনিবার স্নান করে বেরিয়ে পড়ে সুজয়। দমদম যেতে হবে। ঠাম্মার ওষুধটা অগে কিনতে হবে। ঘরগুলোকেও পরিস্কার করতে হবে। টানা দুদিন কাটিয়ে আজ সোমবার সে বাড়ি ফিরছে। ঠাম্মাও সুজয়কে প্রাণ ভরে আদর জত্ন করেছেন। অথৈ জলে ভাসতে থাকা পিঁপড়ের খুঁজে পাওয়া খর-কুটর মত ঠাম্মাও খূঁজে পেয়েছেন সুজয়কে। আমৃত্যু যেন আগলে রাখতে পারেন এই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনাকে। মনে মনে হয়তো এই প্রার্থনাই করছিলেন বৃদ্ধা যখন সুজয় ফিরে আসে।


সুজয় একটি কাজের লক ঠিক করে দিয়েছে। যে সারাদিন ঠাম্মার খেয়াল রাখবে। MBAটা আর করা হোলোনা তার, অনেক দায়িত্ত তার এখন। ঐ ফ্লাটে যে বৃদ্ধা একাকী দিন কাটাচ্ছে সে এমন একজনের ভালোবাসার মানুষ যাকে সে ভালবেসেছে প্রাণ দিয়ে। জয়ী হয়তো ওর জীবনে এসেইছিল ঠাম্মাকে হ্যান্ডওভার দেবে বলে। রক্তিমও জয়ির চিকিত্সার হ্যান্ডওভার নিয়েছিল বিপ্লবের থেকে পারেনি। কিন্তু তাকে তো পারতেই হবে।

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরল সুজয়। একটা শীতল হাত স্পর্শ করল সুজয়ের হাতে, মনে হল কে যেন তার পাশে এসে বসল। একটা শীতল বাতাসের ঝাপটা যেন তার কানে কানে বলে গেল “থ্যাংক ইউ স্মকার”। সুজয়ের ঘুমন্ত ঠোঁটে ঝিলিক দিয়ে গেল এক অনাবিল হাসি।



বি: দ্র: গল্পের প্লট নির্মাণের স্বার্থে গল্পের চরিত্র ধুমপান করলেও, এই গল্পের লেখক কোনোভাবেই ধূমপানের সমর্থন বা প্রচার করেনা। শুধু শুধু ধুমপান করে শরীর খারাপ করবেন কেন, তার চেয়ে বরং ভাল ভাল গল্প পড়ুন শরীর এবং মন দুটোই ভাল থাকবে



Rate this content
Log in

More bengali story from Abul Jamader

Similar bengali story from Horror