Saswat Routroy

Horror


4  

Saswat Routroy

Horror


হুঙ্কার

হুঙ্কার

14 mins 991 14 mins 991

রাত বারোটা! চারিদিকে এখন উত্তাল ঝড়ের দামাল দাপাদাপি- মনে হচ্ছে যেন অন্ধকার পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে এক অমঙ্গলের অপচ্ছায়া। থেকে থেকে বিদ্যুৎঝলকে চমকে উঠছি আমি। বজ্রবিদ্যুতে আমার ভয় নেই, আমি শিহরিত হচ্ছি আমার অদৃষ্টের কথা ভেবে। হাতে সময় খুব কম, তাই যাওয়ার আগে সব কিছু গুছিয়ে বলে যেতে চাই আমি।


আমি আর পলাশ ছিলাম প্রাণের বন্ধু- যাকে বলে হরিহর আত্মা। শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে, দুজনে ছিলাম একে অপরের পাপের সঙ্গি। দুজনেই ছিলাম অনাথ, দুজনেই অবিবাহিত, দুজনে ছিলাম একই কলেজের অধ্যাপক। এছাড়া দুজনের ছিল এক অদ্ভুত শখ- যাবতীয় দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য বস্তু (কিউরিও) সংগ্রহ করা। অষ্টধাতুর তৈরি সুন্দর নারীমূর্তি থেকে শুরু করে আপেলের সাইজের শুকিয়ে মমি করা মানুষের মুণ্ড, কি ছিলনা আমাদের সেই অবর্ণনীয় ও অকল্পনীয় সংগ্রহে? দুষ্প্রাপ্য বস্তুর খোঁজে আমরা কিউরিও দোকানে, অকশন হাউসে, চোরাবাজারের অন্ধ গলিতে ঘুরে বেড়াতাম। সুবিধের‍ জন্য সুধাকান্ত ও রতিকান্ত নামের দুই ভাইকেও হাতে রেখেছিলাম আমরা। ভাল পারিশ্রমিকের বিনিময় তারা বহু দুষ্প্রাপ্য বস্তুর খবর এনে দিত।


দুর্লভ বস্তু সংগ্রহ করা আমাদের কাছে ছিল মাদক নেশার মত। সৎ ও অসৎ, নানা উপায়ে আমরা আমাদের আকাঙ্খিত বস্তু সংগ্রহ করতাম- এমনকি তার জন্য কবর খোঁড়ার মত নিন্দনীয় অপকর্ম থেকেও পিছুপা হই নি। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন সমাজে মৃতদেহ গোর দেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল ও আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৃতদেরকে গোর দেওয়ার সময় তাদের প্রিয় বস্তুটিকেও সেই কবরের মধ্যে স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাচীণ সমাধিক্ষেত্রে, পরিত্যক্ত কবরস্থানে, অরক্ষিত ম্যাসোলিয়ামে আমাদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। তেমন সন্ধান পেলে আমরা কবরের ডালা ভেঙ্গেও আকাঙ্খিত বস্তুটি সংগ্রহ করতাম। সংগ্রহ? সংগ্রহ না বলে চুরি বলাই শ্রেয়। আমরা চুরি করতাম মৃতদের থেকে, যাদের কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। আমাদের গোপন সত্য, আমাদের অপরাধের জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল একটি ব্যাক্তিগত সংগ্রহশালা, যার বেশিরভাগ দ্রষ্টব্যঃ বস্তুই আমরা সংগ্রহ করেছিলাম অসৎ উপায়। এই সংগ্রহশালার কিছু বস্তু ছিল সুন্দর, কিছু ছিল অদ্ভুত ও কিছু ছিল ভয়াল-ভয়ঙ্কর! দুজনে মিলে শহরের শেষপ্রান্তে, নিরিবিলিতে একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ী কিনেছিলাম। দোতলার একটি ঘরকে বেছে নিয়েছিলাম সংগ্রহশালা হিসেবে।


যে ঘটনাটি বলতে চলেছি তার সুত্রপাত আজ থেকে মাস দুয়েক আগে। এক রবিবারের সকালে রতিকান্ত একটি নতুন খবর নিয়ে এল। ওড়িশা-বিহার সীমান্তবর্তী এলাকার একটি ছোট্ট শহরতলি- নাম নবপুর। সেখানকার রাজপরিবারের এক বংশধর ১৮ শতাব্দীতে গৃহত্যাগ করে ইউরোপের দিকে পাড়ি দিয়েছিলেন। নানা দেশ ঘুরে জীবনের অপরাহ্নে বংশধরটি দেশে ফিরে আসেন, সঙ্গে আনেন দেশবিদেশ থেকে সংগ্রহ করা বহু সামগ্রি। ঘরে ফেরার দশ বছর পর এক অজ্ঞাত কারণে তার জীবনাবসান ঘটে। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর শবটিকে রাজবাড়ীর উত্তর-পশ্চিমের এক ঘরে কবর দেওয়া হয়। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটিও সমাধিস্থ করা হয় তাঁর শবের সাথে।


রতিকান্তর খবর অনুযায়ী রাজবাড়ীটি বর্তমান পরিত্যক্ত। বর্তমানের বংশধরেরা সবাই বাইরে থাকে। নবপুর লোকালয় থেকে রাজবাড়ীটি দুই কিলোমিটার দূরে বলে লোকেরা সেদিকে যাতায়াতও করে না, তাই নির্বিঘ্নে কবর খুঁড়ে জিনিষটি হস্তগত করা যাবে। ঠিক করলাম, পলাশ আর আমি খুব শীঘ্রই নবপুর যাব।


সেবার কি এক উপলক্ষে দুদিনের জন্য কলেজ বন্ধ ছিল। সাতসকালেই দুই বন্ধু নবপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। যখন নবপুর পৌঁছাই তখন দেড়টা বাজে। স্টেশনের পাসেই একটি হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়ে, জিনিশপত্র রেখে ডাইনিং-হলে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিলাম। আমাদের অভিযান রাতের অন্ধকারে হবে, তাই আগে থেকে সবকিছু দেখে রাখা ভালো। সেই ভেবে একটি রিকশা ভাড়া করে রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।


রাজবাড়ী থেকে কিছুটা আগেই রিকশাওয়ালা আমাদেরকে নামিয়ে দিল। কেন জানিনা, রিকশাওয়ালা কিছুতেই আর এগোতে রাজি হল না। অগত্যা ভাড়া মিটিয়ে বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে গেলাম।


রাজবাড়ীটি একদম জীর্ন। বিশাল অট্টালিকাটি যেন ইঁট-পাথরের কঙ্কাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সারা দেওয়ালজুড়ে বট-অশ্বত্থের রাজত্ব। দেওয়াল ঘেরা বিশাল বাগানটি আগাছার জঙ্গলের সমতুল্য। বাগানের মাঝখানে শ্বেতপাথরের নারীমূর্তি বসানো একটি ফোয়ারা- তার দশাও খুব করুণ। দেখেই বোঝা যায় এই রাজবাড়ীতে কয়েক দশক কেউ বাস করেনি।


রতিকান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়েছিল- বংশধরটিকে যে ঘরে কবর দেওয়া হয়, সেই ঘরটিকে একটি অদ্ভুত তালা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। খানিকক্ষন খোঁজাখুঁজির পর সেরকম একটি ঘর নজরে পড়ল। ততক্ষণে দিনের আলো পড়ে এসেছে, তাই আমরা হোটেলে ফিরে গেলাম। 


হোটেলে পৌঁছলাম সন্ধ্যা ছটা নাগাদ। নৈশ-অভিযানের আগে একটি টানা ঘুম দরকার, তাই আমরা টানা ঘুমিয়ে নিলাম। সাড়ে নটা নাগাদ ঘুম ভাঙল। তাড়াতাড়ি জিনিষপত্র গুছিয়ে, হোটেলের ডাইনিং-এ নৈশভোজন সেরে যখন চেক-আউট করি তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজে।


পায়ে হেঁটে রাজবাড়ী পৌঁছতে ঘন্টাখানেক লাগল। নিঝুম রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে তখন কেমন একটা গা-ছমছমে ভাব, যেন ভয়াবহ কিছু ঘটার আশঙ্কায় হাওয়া পর্যন্ত থমকে গেছে। রাতের অন্ধকারে রাজবাড়ীটিকে একটি ভয়াবহ প্রেতপুরীর মত লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন নিরেট অন্ধকারে মূর্ত হয়ে উঠেছে কোন এক অজানা বিভীষিকা। হঠাৎ একটি প্যাঁচা ডেকে উঠল বহুদুরে। জানি না কেন, এক অজানা আশঙ্কায় আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল। মন বলছিল ভয়ানক কিছু একটা ঘটবে। বুকে একরাশ চাপা অস্বস্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ঘরের দিকে এগোলাম।


ঘরটিতে ঢুকতে আমাদের বিশেষ অসুবিধে হয়নি। বহুদিনের মরচে-ধরা তালা গাঁইতির কয়েকটি আঘাতেই ভেঙ্গে গেল। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা ঢুকে পড়লাম ভেতরে। মেঝের ওপর প্রায় দুই-ইঞ্চি পুরু ধুলো, সারা ঘরে মাকড়শার ঝুলের ছড়াছড়ি। ঘরের একপাশে একটি বিশাল সেকেলে পালঙ্ক- সেটা এতটাই বড় যে অনায়াসে সাত-আটজন তাঁর ওপর ঘুমোতে পারবে। পালঙ্কের ঠিক পাসেই একটি কপাট ভাঙ্গা সেকেলে কাঠের আলমারি। আলমারির ভেতর অনেকগুলি ভাঙ্গা কাঁচের বোতল। পালঙ্কের বিপরীত দেওয়ালে দুটি তৈলচিত্র- একটি মধ্যবয়স্ক এক পুরুষের ও অপরটি ষোল-সতের বৎসরের একটি কিশোরের। আশ্চর্যের বিষয়, ঘরের ঠিক মধ্যিখানে একটি পিতলের ঘট বসানো। ঘটের মুখটি বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটি লাল কাপড় দিয়ে বাঁধা।


ঘটটিকে সরিয়ে আমরা মেঝে খুঁড়তে শুরু করলাম। সেকালের শক্ত গাঁথুনির মেঝে, তাই অল্পসময়ের মধ্যেই হাঁফ ধরে গেল। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার খোঁড়া শুরু করলাম। খানিকটা করে খুঁড়ি আর খানিকক্ষণ জিরিয়ে নি। এইভাবে পালা করে প্রায় আধঘন্টা ধরে খুঁড়েও যখন কবরের কোন হদিস পেলাম না, তখন মনে হতাশা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আশাহত হয়ে ফিরে যাব বলে ভাবছি, এমন সময় গাঁইতির আঘাতে ঠং করে একটি ধাতব আওয়াজ হল। সঙ্গে সঙ্গে মানোবল ফিরে পেলাম আমরা, দ্বিগুণ উৎসাহে চলতে থাকল খননকার্য। ধীরে ধীরে মাটি সরে একটি ভুগর্ভস্থ কুঠুরির দরজা দৃষ্টিগোচর হল। দ্রুত হাতে মাটি সরিয়ে আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে দিলাম।


দরজার নিচে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে নিরেট অন্ধকারে। সঙ্গে আনা ইলেক্ট্রিক লন্ঠন আর জোরালো টর্চ নিয়ে আমরা সন্তর্পণে নামতে শুরু করলাম। জোরালো আলোয় কুঠুরির ভেতরটা ধীরে ধীরে দৃষ্টিগোচর হল।


যেটিকে আমরা ভুগর্ভস্থ কুঠুরি বলে ভেবেছিলাম, সেটি একটি ভুগর্ভস্থ গুহার সমতুল্য। পাথুরে দেওয়ালগুলি শুধু অমসৃনই নয়, স্যাঁতস্যাঁতেও। দেওয়াল লাগোয়া প্রাচীণ সিঁড়িটা ধাপে ধাপে নিচে নেমে গেছে। সিঁড়ির ধারে ধারে, দেওয়ালের ওপর খোদাই করা আছে যাবতীয় বিজাতীয় সব মূর্তি! প্রত্যেকটি মূর্তি অপার্থিব, ঘৃণ্য ও ভয়াবহ- সেগুলি দেখলে চরম বিতৃষ্ণা ছাড়া কিছুই উদ্রেক হয় না।


একসময়ে সিঁড়ি শেষ হল। কুঠুরির নিচেটা প্রশস্ত আর মেঝেটা তুলনামুলক মসৃণ। চারিদিকে নজর বুলিয়ে কবরটা খোঁজার চেষ্টা করছি, হঠাৎ বাঁদিকের দেওয়ালে একটি প্রশস্ত সুড়ঙ্গ নজরে পড়ল। সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে কিছুটা এগোনোর পর একটি ছোট্ট ঘর আবিষ্কার করলাম। ঘরের একপ্রান্তে একটি কালো পাথরের বেঢপ বেদি-মত। এতক্ষন যে চাপা অস্বস্তিটা বুকে চেপে বসেছিল, এই ঘরে ঢোকার পর সেই অস্বস্তিটা যেন শতগুণ বেড়ে গেল।


বেদিটাকে দেখে একটি অদ্ভুত কথা মাথায় এল- এইটাই সেই কবর নয় তো? কিছু একটা ভেবে পলাশ বেদিটার ওপর গাঁইতি দিয়ে একটু আঘাত করল। আওয়াজ থেকে বুঝলাম ভেতরটা ফাঁপা। মনে হল বেদির ওপরের স্ল্যাবটা আসলে কবরটির ঢাকনা। খানিকক্ষণ খোঁজার পর বেদিটার চার দেওয়ালের ওপরদিকে একটি সুক্ষ্ম খাঁজ নজরে পড়ল। দুজনে মিলে গাঁইতি দিয়ে বারবার সেই খাঁজটার ওপর আঘাত করে গেলাম। পাথর আর লোহার সংঘর্ষে খানখান হতে থাকল মৃত্যুশীতল পরিবেশ- মনে হল যেন তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল আঁধার জগতের সেই ঘুমন্ত বাসিন্দা, যার চিরনিদ্রা ভঙ্গ করার গর্হিত অপরাধ করছিলাম আমরা।


ক্রমাগত আঘাতের ফলে খাঁজটা আরও চওড়া হল। বেদির ওপরের স্ল্যাবটি একটু আলগা হলে দুজনে মিলে ধীরে ধীরে ঠেলে ঢাকনাটি সরিয়ে দিলাম খানিকটা। ফাঁপা বেদির মধ্যে দেখতে পেলাম তিন’শ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি কঙ্কাল। কালের প্রকোপ উপেক্ষা করে এত বছর পরেও সম্পুর্ণরুপে টিকে আছে সেই শরীরাস্থি, নিজের জায়গা থেকে একচুলও সরেনি একটিও হাড়। না, ভুল বললাম। কালের প্রকোপ না পড়লেও কঙ্কালটি কিন্তু অবিকৃত নয়। কঙ্কালটির ওপর জায়গায় জায়গায় আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট, যেন কোন হিংস্র জন্তু প্রচণ্ড ক্রোধে চালিয়ে গেছে উন্মত্ত আক্রমণ। শ্বেতশুভ্র অস্থির উপর প্রকট হয়ে রয়েছে শ্বাদন্ত ও নখরের দাগ!


“জিনিষটা চিনতে পারছিস?”, বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল পলাশ।


কঙ্কালটার গলায় সবুজ জেড্‌ পাথরের তৈরী একটি লকেট পড়ানো। পাথর কুঁদে কুঁদে লকেটটিকে একটি ডানাওয়ালা কুকুরজাতীয় প্রাণীর আকার দেওয়া হয়েছে। বিকট হাঁ-করা মুখে ধারালো দাঁতের সারি, যার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে রক্তলোলুপ জিহ্বা। চার পায়ের ধারালো নখ ছুরির ফলার মত উদ্ধত। দুচোখের কুটিল চাউনিতে যেন অসীম জিঘাংসা। লকেটটি অজানা ধাতু দিয়ে তৈরী একটি নেকলেসে বসানো। কিন্তু আসল কথাটি হচ্ছে- যদিও আমরা লকেটটি আগে কখনো দেখিনি, তবু আমরা এটির সাথে পরিচিত।


দুষ্প্রাপ্য বস্তুর সাথে সাথে আমরা দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, পুঁথি ও পাণ্ডুলিপিও সংগ্রহ করতাম। এইরকম বেশ কিছু প্রাচীণ পুঁথিতে এই লকেটটির উল্লেখ আছে। সর্বপ্রথম যে পুঁথিটিতে এই লকেটটির বর্ণনা দেওয়া ছিল, তার নাম অক্তুগ্রন্থম। প্রায় তিন হাজার বছর পুরানো এই পুঁথি থেকে টুকরো টুকরো তথ্য নিয়ে বহু ছোট ছোট পুঁথি লেখা হয় পরবর্তী সময়। যদিও নানা ঘটনাচক্রে পড়ে অক্তুগ্রন্থমের প্রায় সবকটি কপি নষ্ট হয়ে গেছে, তবু পণ্ডিতমহলের কিছু লোকের বিশ্বাস পৃথিবীতে এখনো কোথাও অক্তুগ্রন্থমের একটিমাত্র কপি লোকচক্ষুর আড়ালে টিকে আছে। আমরা আদি অক্তুগ্রন্থম না পড়লেও তার ওপর আধারিত এমনই একটি পাণ্ডুলিপি পড়েছিলাম, যার ফলে আমরা লকেটটির সাথে পরিচিত। তিন হাজার বছরের পুরনো সেই দুষ্প্রাপ্য লকেটটি নবপুর নামক এক অখ্যাত শহরতলিতে পাওয়া একেবারে আশাতিত ঘটনা।


দারুণ উৎসাহে পলাশ কঙ্কালটির গলা থেকে লকেটটি খুলে নিল। হায়, তখনো কি জানতাম যে এক মূর্তিমান অমঙ্গলকে আহ্বান জানাচ্ছি আমরা! লকেটটি খুলতেই বহুদুর থেকে ভেসে এল একটি বন্য জন্তুর ক্রুদ্ধ হুঙ্কার- মনে হল যেন গভীর রাতের নীরবতাকে ভঙ্গ করে ধেয়ে এল এক অশুভ সংকেত। আমরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন নই, তবু মনে হল যেন বদ্ধ কুঠুরির ভেতর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এল একটি অলৌকিক অপচ্ছায়া, সেইসঙ্গে অলৌকিক সেই হুঙ্কারের প্রতিধ্বনি যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল আমাদের চেতনাকে। এক অজানা বিভীষিকার ভয় কবরটিকে বন্ধ করে দিলাম তাড়াতাড়ি। বেশিক্ষন সেই অপার্থিব পরিবেশে থাকাটা সমীচীন মনে হল না। তড়িঘড়ি জিনিষপত্র গুছিয়ে কোনরকমে সেই ভুগর্ভস্থ কুঠুরি থেকে বেরিয়ে এলাম দুজনে। বেরিয়েই ভালো করে বন্ধ করে দিলাম কুঠুরির দরজাটা।


রাজবাড়ী থেকে বেরিয়ে যখন রাস্তায় উঠলাম তখন রাতের শেষ প্রহর চলছে। পায়ে হেঁটে সোজা নবপুর স্টেশানে পৌঁছলাম। সকাল সাতটার ফিরতি ট্রেনে বাড়ি ফিরলাম আমরা।


বাড়ী ফিরে সর্বপ্রথম যে কাজটা করলাম, সেটা হল লকেটটিকে ভালো করে পরিস্কার করা। লকেটটি একটি কাঁচের বাক্সে ভরে নতুন একটি ডায়াস টেবিলের ওপর রাখলাম। প্রতিদিনই আমরা সংগ্রহশালার সমস্ত সামগ্রীর পরিচর্যা করতাম। অন্যান্য জিনিষগুলির সাথে লকেটটিরও পরিচর্যা শুরু হল। এর মাঝে একদিন রতিকান্ত এল দেখা করতে। তার জন্যই এত বড় একটি দাঁও মারতে পেরেছি, তাই খুশি হয়ে তাকে মোটা-রকমের পারিশ্রমিক দিলাম দুজনে মিলে। কান এঁটো করা হাসি নিয়ে রতিকান্ত মনের খুশিতে চলে গেল।


লকেটটি আসার পর থেকে পলাশের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করলাম। আগে যে ব্যাক্তি নিষ্ঠা সহকারে সংগ্রহশালার প্রত্যেকটি সামগ্রীর পরিচর্যা করত, সে হঠাৎ বাকি সবকিছু ভুলে শুধুমাত্র লকেটটি নিয়ে সময় কাটাতে শুরু করল। প্রায়ই দেখতাম লকেটটির দিকে মোহাবিষ্টের মত চেয়ে থাকত, ঘন্টার পর ঘন্টা লকেটটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করত, আপনমনে বিড়বিড় করে কি সব বলত। কয়েকবার তো লকেটটির সামনে ধুপকাঠি জ্বেলে মাথা নিচু করে বসে থাকতেও দেখেছি। হঠাৎ দেখলে মনে হত যেন লকেটটির সামনে প্রার্থণা করছে, যদিও প্রশ্ন করলে সে কথা স্বীকার করত না। কলেজের অধ্যাপনা স্বাভাবিক ভাবে চললেও যতক্ষন সে বাড়িতে থাকত, সারাটা সময় যাদুঘরে লকেটটির সাথে কাটাত। একমাত্র বন্ধুর এমন আচরণের জন্য খুবই দুশ্চিন্তায় পড়লাম আমি।


পলাশকে নিয়ে দুশ্চিন্তা তখনও কাটেনি, এর মধ্যেই কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। আগেই বলেছি আমাদের বাড়ীটি বেশ নির্জন পরিবেশে। বাড়ী থেকে দশমিনিটের দুরত্বে একটি ছোট হল্ট স্টেশন। আসেপাশে আরো যে দু-চারটি বাড়ী ছিল সেগুলো সবই খালি। দুটি বাড়ী ছিল বাগানবাড়ী, মালিকরা কালেভদ্রে এসে থেকে যেত। বাকি তিনটি বাড়ীর কন্সট্রাকশান অর্ধসমাপ্ত, তাই সেগুলোও খালি পড়ে ছিল।

দিনটা ছিল শুক্রবার। খুব সকালে উঠে প্রাতঃভ্রমণ করা আমার বহুদিনের অভ্যাস। সেদিন প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরে একটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। সদর দরজায় মাটি থেকে তিন ফুট উঁচুতে তিনটে সমান্তরাল আঁচড়ের দাগ প্রকট হয়ে রয়েছে। যতদুর মনে পড়ল, এই দাগ আগে কখনো ছিল না। পলাশকে ডেকে দাগগুলি দেখালে সে কোন আমলই দিল না। একগাল হেসে ব্যাপারটাকে “কুকুর বেড়ালের কীর্তি” বলে উড়িয়ে দিল। বন্ধু যতই ব্যাপারটাকে অগ্রাহ্য করুক, আমার মনে খচখচানিটা রয়ে গেল। জীবনে কুকুর বেড়ালের আঁচড় বিস্তর দেখেছি। সেগুলি কখনই এত গভীর হয় না।


পরদিন বাজার সেরে ফিরতে পলাশের বেশ রাত হয়ে গেছিল। ঘণ মেঘে আকাশ ছেয়ে রয়েছিল সন্ধ্যা থেকেই। রাত বাড়ার সাথে সাথে দুর্যোগটাও বাড়ছিল ধীরে ধীরে। পলাশ যখন বাস থেকে নামল তখন ঝোড়ো হাওয়ার দরুন পথ চলাই দুষ্কর। একে নির্জন পথ, তার ওপর দুর্যোগ- জনমানবহীন পথ দিয়ে আসতে আসতে এক অদ্ভুত অনুভুতি পেয়ে বসল তাকে। মাঝেমাঝেই তার মনে হচ্ছিল যেন কেউ তাকে অনুসরন করছে। কিন্তু না, বারবার পিছু ফিরেও অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ল না। ব্যাপারটাকে মনের ভুল ভেবে আস্তে আস্তে বাড়ীর দিকে এগিয়ে চলল। পলাশ যখন বাড়ী পৌঁছাল, ততক্ষনে রীতিমত বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ লাগছিল, তাই না খেয়েই শুতে চলে গেল। আমিও তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে ঘুমোতে চলে গেলাম। রাতটা নির্বিঘ্নে কাটলেও পরের দিন সকালে ফের সদর দরজায় সেইরকম আঁচড় দেখা গেল। এবার কিন্তু পলাশ ব্যাপারটাকে অত সহজে “কুকুর বেড়ালের কীর্তি” বলে উড়িয়ে দিতে পারল না।


তারপর থেকেই মাঝেমাঝে এমন সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল যা ব্যাখ্যা করতে আমার বোধবুদ্ধি অক্ষম। প্রতি রাতেই মনে হত যেন কেউ বাড়ীর সদর দরজা পর্যন্ত আসত। নির্জন পরিবেশে আমরা মাঝেমাঝেই কারুর পায়ের শব্দ শুনতে পেতাম, যদিও দোর খুলে কাউকেই দেখতে পেতাম না। আগে যে আঁচড়ের দাগ শুধুই সদর দরজায় পাওয়া যেত, ধীরে ধীরে ঘরের জানলা ও অন্যান্য জায়গাতেও সেইরকম দাগ দেখা দিতে শুরু করল। প্রায়ই মাঝরাতে জানলার কাছে ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পাওয়া যেত। ধীরে ধীরে দোতলার জানলাতেও আঁচড়ের দাগ ফুটে উঠতে লাগল ক্রমাগত। মাঝেমাঝেই মনে হত কারুর অশুভ অস্তিত্ব যেন নিশুতি রাতের গুমোট পরিবেশকে দূষীত করে তুলছে। মনে হত যেন কোন অশুভ বিষবাষ্প কুয়াশার মত চেপে বসেছে ঘরের চারিদিকে।


২৫ সেপ্টেম্বরের রাতে প্রথমবার সেই আতঙ্কটিকে কাছ থেকে অনুভব করলাম। আমার শোবার ঘরটি করিডরের একদম শেষ প্রান্তে। রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় যাচ্ছি, হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দ হল। হয়ত পলাশের কিছু দরকার পড়েছে- এই ভেবে দরজা খুলে দেখি কেউ নেই। আবছা আলোছায়ায় করিডরটি কেমন থমথম করছিল- মনে হচ্ছিল যেন কোন রহস্যময় জগতের একটুকরো খণ্ড। হঠাৎ-ই কানের খুব কাছে কেউ যেন চাপাস্বরে খল্‌খল্‌ করে হেসে উঠল। দারুন আতঙ্কে গলা অব্দি রক্ত ছলকে উঠল আমার। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। সারারাত ভাল করে ঘুম হল না- দুঃস্বপ্ন আর ঘোরের মধ্যে মনে হচ্ছিল যেন বহুদুর থেকে কোন হিংস্র জন্তুর ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে আসছে। আতঙ্কের মধ্যে রাতটা কোনরকমে কেটে গেল। পলাশকে বললে সে আরো ভয় পেয়ে যেত, তাই চেপে গেলাম কথাটা।


এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরেই এল সেই ভয়ঙ্কর রাত। সেদিন আমি কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিলাম। পলাশ আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছিল যে কিছু বিশেষ কাজের জন্য তার ফিরতে দেরি হবে। রাত তখন সাড়ে এগারোটা বাজে, একতলার বৈঠকখানায় বসে আমি তখন বই পড়ছি। হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে স্টেশানের দিক থেকে ভেসে এল একটি মর্মান্তিক আর্তনাদ। আর্তনাদটি শোনামাত্র একটি অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল। ঘর থেকে বেরিয়ে আর্ত-চিৎকার লক্ষ্য করে দৌড়ে গেলাম। কিছুটা দূর গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটি ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মাঠের মাঝে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল আমার বন্ধু। বুকে, পিঠে, ঘাড়ে একাধিক গভীর ক্ষতচিহ্ন, উষ্ণ রক্তে ভিজে যাচ্ছিল শুষ্ক মাটি।


 “ল... লকেট! সেই অ...অভিশপ্ত... লকে...ট”, মাঝপথেই থেমে গেল পলাশের কথা।


পরদিনই বন্ধুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করলাম। পলাশের মৃত্যুর পর একলা সেই বাড়ীতে থাকার সাহস হল না। বাড়ীতে ভাল করে তালা মেরে সেদিনই শহরের ভেতর একটি বাসা ঠিক করলাম। সামান্য কিছু দরকারি জিনিষ নিলাম সঙ্গে। দরকার পড়লে পরে এসে অন্যান্য জিনিষ নিয়ে যাওয়া যাবে। আমাদের সংগ্রহশালা থেকে শুধু লকেটটি সঙ্গে নিলাম- বাকি সবকিছু সেই অভিশপ্ত বাড়ীতে পড়ে রইল।


ভেবেছিলাম শহরের ভিড়ের মধ্যে আমি নিরাপদ, কিন্তু দুদিন পরেই আমার ভুলটা ভাঙ্গল। সেদিন হোটেলে রাতের খাওয়া সেরে বাসায় ফিরছি, হঠাৎ মনে হল কেউ যেন পিছু নিয়েছে। সঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন একজোড়া বুভুক্ষ চক্ষু আমার ওপর নিবদ্ধ রয়েছে। তড়িৎ-গতিতে পিছু ফিরে দেখার চেষ্টা করলাম- একপলকের জন্য মনে হল যেন একটি ছায়া সাঁৎ করে বটগাছটার আড়ালে চলে গেল। আরেকদিন সন্ধ্যাবেলায় লেকের ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছি, হঠাৎ লেকের হাওয়ার সাথে বহুদুর থেকে সেই পরিচিত ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে এল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, এই অশুভ শক্তির হাত থেকে আমার নিস্তার নেই। আমার নিয়তিও হয়ত আমার হতভাগ্য বন্ধুর মত হবে- কিংবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কোন পরিণতি হয়ত আমার ভাগ্যে রয়েছে।


ডুবন্ত ব্যাক্তি যেমন বাঁচার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, আমার অবস্থাও তখন সেরকম। মনের মধ্যে একটি ক্ষীণ আশা ছিল- যদি লকেটটি সেই কবরের মধ্যে ফেরত দিয়ে দি, তাহলে হয়ত এই জীবন্ত দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে পারি। সেই ভেবে কয়েকদিন পরেই লকেটটি নিয়ে নবপুরের দিকে রওনা দিলাম।


নবপুর যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাতের আঁধারে সেই পোড়ো রাজবাড়ীতে যাবার সাহস হল না। আগেরবারের সেই হোটেলটিতে উঠলাম। নটা নাগাদ কাছাকাছি একটি খাবার হোটেল গিয়ে খাওয়াপর্ব সারলাম। হোটেলরুমে ফিরে জামা খুলে শুতে যাচ্ছি, প্যান্টের পকেটে হাত দিয়েই উপলব্ধি করলাম আমার কি সর্বনাশ ঘটেছে। একটি কাপড়ে জড়িয়ে লকেটটি প্যান্টের বাঁ পকেটে রেখেছিলাম, এখন সেটি হাওয়া। হয়ত কোথাও পড়ে গেছে বা কেউ পকেট মেরেছে। যতদূর মনে পড়ে, খাবার হোটেলে ঢোকার আগেও লকেটটি পকেটে ছিল। লকেটটি হারিয়ে আমার বাঁচার শেষ পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট আর ভাঙ্গা মন নিয়ে অনেক রাতে ঘুমোতে গেলাম।


ঘুম কিন্তু হল দারুন। দীর্ঘদিন পরে দুঃস্বপ্নবিহীন নিশ্ছিদ্র ঘুমে রাতটা কাটল। সকালে হোটেলবয় রঞ্জন এল বেড-টি নিয়ে। ছেলেটি খুব মিশুকে, কথা বলার লোক পেলে দারুন খুশি। চা খেতে খেতে তার কাছ থেকেই খবরটি পেলাম।


“জানেন স্যার, সকাল থেকেই নবপুর তোলপাড়।”


“ব্যাপার কি, রঞ্জন? কিছু ঘটেছে নাকি?” 


"সৌরভদার কাছ থেকে ব্যাপারটা শুনলাম স্যার। সৌরভদা মানে আমাদের বাবুর্চি সৌরভ চট্টোপাধ্যায়। পণ্ডাবাজারের ওদিকটায় ও একটি বাড়ি ভাড়া করে থাকে। ওর বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই ভয়ানক দুটি খুন হয়েছে!”


“খুন হয়েছে?”


"হ্যাঁ স্যার। সৌরভদা বলছিল লোকটা চোর-বদমাশ গোছের- তিনবার চুরির দায়ে জেল খেটেছে। কাল রাতে ওকে আর ওর ভাইকে কেউ নৃশংস ভাবে খুন করে গেছে। খানিকক্ষণ আগে পুলিশ এসে ছিন্নভিন্ন বডিদুটো দুটো নিয়ে গেল। সারা নবপুর এই নারকীয় ঘটনায় তটস্থ।“


বুঝতে বাকি রইল না কেন দুজন সাধারন চোরকে এইভাবে মরতে হল। যে আতঙ্কটা এতদিন বুকে চেপে বসেছিল, তার জায়গায় এক দুর্বিষহ কৌতুহল উঁকি দিচ্ছিল।


রঞ্জন কাপপ্লেট নিয়ে চলে যাবার পর তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘণ্টাখানেক পরে রাজবাড়ী পৌঁছে যা দেখলাম, তাতে মনের সন্দেহটা আরো গাঢ় হল। যে চোরাকুঠুরির দরজা আমরা বন্ধ করে গেছিলাম, সেটি এখন খোলা। ধীরে ধীরে কুঠুরিতে প্রবেশ করে সেই ছোট ঘরটিতে গেলাম। রহস্য উন্মোচন হল একটু পরেই।


কবরটির ঢাকনা সরানো- ভেতরে শুয়ে রয়েছে সেই পরিচিত কঙ্কাল, মুখে লেগে রয়েছে একটি ব্যাঙ্গাত্মক হাসি।


যে কঙ্কালটিকে গতবার শ্বেতশুভ্র দেখেছিলাম, আজকে তার ওপরে লেগে রয়েছে কোন হতভাগ্য প্রাণীর জমাট বাঁধা কালচে রক্ত, জায়গায় জায়গায় লেগে আছে মাংসের ছিন্নভিন্ন অংশ! কঙ্কালটির হাতে রয়েছে সেই অভিশপ্ত লকেটটি, যেন পরম স্নেহে একটি মা আঁকড়ে ধরেছে তার সন্তানকে। হঠাৎ গোটা ঘরটি সেই পরিচিত ক্রুদ্ধ হুঙ্কারে কেঁপে উঠল, আর এই প্রথমবার স্বচক্ষে দেখলাম সেই হুঙ্কারের উৎস! সেই হুঙ্কার আসছে শতাধিক বছর পুরানো সেই কঙ্কালের মুখ থেকে! খানিকক্ষণ পর সেই হুঙ্কার থেমে গিয়ে বেরতে থাকল একটি দীর্ঘ খলখল অটহাস্য- হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।


কি করে সেই অভিশপ্ত কুঠুরি থেকে পালিয়ে এলাম জানি না। নবপুর থেকে ফেরা আজকে এক সপ্তাহের ওপর হয়ে গেল। তিনদিন আগে রতিকান্তর ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়েছি। লকেটটি তার মালিকের কাছে পৌঁছে যাবার পরেও সেই অভিশাপ কাটেনি। এখনও সেই হুঙ্কার শুনতে পাই, উপলব্ধি করতে পারি সেই অপচ্ছায়াকে। নিজের বাসায় বসে এই দুর্যোগের রাতে যখন আপনাদেরকে আমার জীবনের অভিশাপের কথা জানাচ্ছি, তখন বহুদুরে কোথাও সেই হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে কোন মুক্তি নেই। মৃত্যু, মৃত্যুই হচ্ছে আমার একমাত্র আশ্রয়। অজানা এক ভয়ঙ্কর পরিনতির চেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুই হচ্ছে একমাত্র মুক্তির পথ।


ইতি

জনৈক হতভাগ্য



Rate this content
Log in

More bengali story from Saswat Routroy

Similar bengali story from Horror