Sanghamitra Roychowdhury

Romance Fantasy


3  

Sanghamitra Roychowdhury

Romance Fantasy


হায় রে কালা, কী যে জ্বালা

হায় রে কালা, কী যে জ্বালা

10 mins 945 10 mins 945

হায় রে কালা, কী যে জ্বালা

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

---------------------------------------

"কানু, ও কানুউউউউ...... দাঁড়াও গো, দাঁড়াও একটুউউ..."

চেনা গলার ডাক শুনে কানু সাইকেলের ব্রেক মেরে দাঁড়ায়, তারপর পিছিয়ে আসে খানিক, ডাকের উৎসের দিকে। লাল-হলুদ ফুলতোলা টিয়া রঙের শাড়ি পরে ঘোষাল পুকুরের বাঁধানো ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে রাধি, মানে রাধারাণী। গালের দু'পাশে উড়ছে গুঁড়োচুল, রেশমী ফিতেয় বাঁধা লম্বা দুই বিনুনি। কানু সাইকেলের স্ট্যান্ড ফেলে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালো রাধির সামনে এসে, "ডাকছিলি যে বড়ো, খুব সাহস হয়েছে তো দেখছি।" রাধি হাসলো ঠোঁট টিপে। এই হাসি দেখলে কানুর চারপাশটা যেন দুলে ওঠে আলোর নাচনে। রামধনু নেমে আসে এই

গোকুলপুর গাঁয়ে।

হাসি মুখেই বললো কানু, "বল,কী হয়েছে? অমন করে চিৎকার করছিস কেন?" রাধি বললো, "শহরে যাচ্ছো তো, আমাকে কয়েক লাছি রঙীন রেশমী সূতো এনে দেবে?" কানু জানতে চায়, "কী করবি?" রাধির সংক্ষিপ্ত উত্তর, "সে আমার একটু দরকার আছে।" আর কিছু বলার সাধ্য কানুর নেই। কানুও তো সুযোগ খোঁজে এমনি করে রাধির কোনো কাজে, কোনো উপকারে লাগতেই।

********

কদমতলায় দেখা করার কথা কানুর আজ রাধির সাথে, সূতো পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে যে। বড্ড তাড়ায় আছে আজ। আর আজই কিনা জগাইখুড়ো দেহ রাখলো। পাড়ার সব ঘর থেকে একজন করে শ্মশানে যাবার নিয়ম চালু গাঁয়ে। এ নিয়ম ভাঙার ক্ষমতা গাঁয়ের ধনী দরিদ্র কারুর নেই। কানুর ঘরে বুড়ি ঠাকুমা আর কানু বাদে আর তৃতীয় প্রাণী নেই, যে যাবে শ্মশানে, কানুর বদলে। কানুর মনটা ভারী চঞ্চল, "আহা, মেয়েটা এসে দাঁড়িয়ে থাকবে একলাটি, কদমতলায়!" উপায় খুঁজে পেলো না কানু, কী করে খবর পাঠায় তার পাগলী রাধিটাকে!

রাধি আসেনি কদমতলায়, জানে তো যে গাঁয়ের জগাইখুড়ো মারা গেছে, আর কানুকে শ্মশানযাত্রী

হতেই হবে গাঁয়ের সবার সাথে। ওটাই যে নিয়ম ওদের গোকুলপুর গাঁয়ে।

*******

রাধি.... মানে রাধারাণী, বাপ-মা মরা মেয়ে, এই গাঁয়ে তার মামারবাড়ী। বাপ-মা অকালে চলে গেছে কী এক অজানা জ্বরে, মহকুমা হাসপাতালের ডাক্তারেরা ধরতেই পারেনি সে রোগ। পরীক্ষা নিরীক্ষা সব হতে না হতেই দু'জনেই দু'দিনের আড়াআড়িতে চলে গেলো। তখন রাধি সবে বছর ছয়েকের। মেয়ে জামাইয়ের শোক বুকে পাথর রেখে সামলে, রাধিকে বুকে আঁকড়ে বড়ো করতে লাগলো রাধির দাদু দিদিমা। রাধির দুই মামাই রাধিকে বড্ড ভালোবাসে। রাধির বাপ-মায়ের গাঁয়ের দু-কামরা ঘর আর সামান্য জমি জিরেত বিক্রি করে মামারাই টাকাটা ব্যাঙ্কে রেখেছে ভাগ্নীর বিয়ের জন্য। ইস্কুলে ভর্তি করেছে রাধিকে, তবে লেখাপড়ায় রাধির খুব তেমন মন নেই। লেখাপড়ায় মন নেই বটে, তবে রাধির হাতের কাজ কিন্তু চোখ ধাঁধানো। কী সুন্দর যে ওর সেলাইয়ের হাত, চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। দিনরাত ঐ সেলাই ফোঁড়াই নিয়েই থাকে মেয়েটা। রাধি একেবারে দিদিমার চোখের মণি।

এতদিন কোনো সমস্যাই ছিলো না সতেরো বছরের রাধির জীবনে। তবে এই ক'মাস হোলো বড়োমামার বিয়ে হয়ে বড়োমামী এসেছে বাড়ীতে। সে মোটেই সহ্য করতে পারে না রাধিকে। সামনেই রাধির মাধ্যমিক পরীক্ষা, ইস্কুল যেতে হয় না এখন। বাড়ীতে বসে পড়ে আর মাঝেমধ্যে সেলাই ফোঁড়াই নিয়েই বসে। এইটা মামীর মোটে পছন্দ নয়। দিদিমা রাধিকে আগলে আগলে রাখে, আর মামীর কাছে এন্তার মুখঝামটা খায়। তবুও দিদিমা রাধিকে কুটো ভেঙে দু'টুকরো করতে দেয় না। রাধি বোঝে এখন, মামারবাড়ীর আশ্রিত ও, দাদু দিদিমা আর কদ্দিন।

তারপর মামারা হয়তো একমাত্র ভাগ্নীকে ফেলতে পারবে না, কিন্তু মামীরা তাকে মানিয়ে নেবে না যে কিছুতেই, সেটা রাধি বিলক্ষণ বোঝে। ছোটমামী তো এখনো আসেইনি। যদিও ছোটমামার এককথা,

"রাধিকে বিয়ে না দিয়ে বিয়ে করবো না।"

এই এতকিছুর মধ্যে রাধির দুর্বলতা আবার কানু.... বড্ড ভালো ছেলেটা। জলপানির টাকায় লেখাপড়া করে। কানুরও বাপ-মা নেই। কানুর বাবা ক্ষেতে কাজ করবার সময় সাপের কামড়ে চলে গেলো এই ক'বছর আগে। আর ওর মাতো কানুর দু'বছর বয়সে আবার বাচ্চার জন্মের সময় ধনুষ্টঙ্কারে মারা গেছে। কানু ওর বুড়ি ঠাকুমার সঙ্গে থাকে। বুড়ি এতোকাল মুড়ি খই ভেজে, নাড়ু মোয়া তক্তি বানিয়ে বাড়ী বাড়ী ঘুরে বেচে নাতিকে মানুষ করেছে। সামান্য যেটুকু জমি ছিলো তাও বিক্রি করে সেই টাকা পোস্টঅফিসে রেখেছে। তারও কিছু সুদ পায়, তাতেই নাতি কানুকে নিয়ে বুড়ির সাদামাটা জীবন দিব্যি চলে যায়। অবশ্য ইদানিং কানুও কয়েকটি ছেলেপুলেকে পড়িয়ে নিজের কলেজে পড়া আর শহরে যাতায়াতের খরচা জোগাড় করে নেয়।

কানু.... মানে কানাইরঞ্জন ঘোষ আর রাধি.... মানে রাধারাণী সরকার, ওদের দু'জনের বেশ মনের মিল। বয়সে দু'জনের বছর আড়াই-তিনের তফাৎ হলে কী হয়, একই ব্যথায় ব্যথী যে, তাইই দু'জনের ভারী ভাব, সেই ছোট্টবেলা থেকেই। গাঁয়ের এমাথায় ওমাথায় দু'জনের বাড়ী হলে কী হবে, ইস্কুল তো একটাই গাঁয়ে, দেখা সাক্ষাৎ ওখানেই। কানুকে দেখে রাধিরও মনে সংকল্প, নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।

***********

জগাইখুড়োর শ্মশানযাত্রায় যেতে যেতে কানু ভাবে, "আজ তো রাধিকে সূতোটা দেওয়া হোলো না, ফিরতে না জানি কত দেরী হবে। সূতোটা না পেয়ে খুব অসুবিধায় পড়লো হয়তো মেয়েটা!" তারপর ভাবে, "আগেরবার যখন রাধিকে সূতো এনে দিই, তখন কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাধি পকেটে সূতোর দাম ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। তবে এবারে কিছুতেই দাম নেবো না।" দাম নেবার ইচ্ছে কানুর নেই ঠিকই, তবে রাধির ঐ ছোঁয়াটুকু পাওয়ার ইচ্ছে ষোলোআনাই আছে। সেই আগেরবার রাধি নিজের হাতে যখন কানুর বুকপকেটে সূতোর দামের টাকা গুঁজে দিচ্ছিলো, কানুর বুকের ভেতরের ধুকপুক করতে থাকা যন্ত্রটা একেবারে ব্যাঙের মতো লাফালাফি শুরু করে দিয়েছিলো। রাত্তিরে শুয়ে পড়ার পরও কানুর হৃদপিন্ডের সে লাফানো ঝাঁপানো একটুও কমেনি। কানুর তো তখন মনে হচ্ছিলো, ঘরের অন্য দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসানো চৌকিতে শুয়ে বুঝি তার বুড়ি ঠাকুমাও তার বুকের ঐ ধপধপানি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। সেও প্রায় মাস ছয়েক আগেকার কথা। তখনকার থেকে রাধি আরো সুন্দর হয়েছে, যতদিন যাচ্ছে ততই কানুর চোখে রাধির রূপ যেন আরো বেড়েই চলেছে। নিজের মনেই মুচকি হাসলো কানু, রাধিকে সে তার ঘরে আনতে চায়, আর তার আগে চায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে, অনেক রোজগার করতে, যাতে তাদের সংসারে কোনোরকম কোনো অভাব না থাকে।

*********

বছর পাঁচেক পার হয়ে গেছে। কানু কলেজের পড়া শেষ করে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে সরকারি ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছে। রাধি মাধ্যমিকের পর কাটিং টেইলারিং-এর সরকারি ট্রেনিং নিয়েছে। কানুই ওর ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। ঐ ট্রেনিংয়ের শেষে রাধি বাড়ীতে বসেই অর্ডার নিয়ে সেলাই বোনাই সব করে, আয় মন্দ হয় না। দিদিমা আর ছোটমামার কড়াকড়িতে টাকা একটাও বেহিসাবি খরচা করতে পারে না। সব টাকা জমানো থাকে, রাধির ব্যাঙ্কের পাশবইতে।

দাদু দু'বছর হোলো মারা গেছে। দিদিমার বড্ডো শখ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ধূমধাম করে রাধির বিয়ে দেবে, রাধির বয়সও তো এই বৈশাখে বাইশ পূর্ণ হোলো। রাধির ছোটমামার তাড়া আরেকটু বেশী, রাধির বিয়ে না দিয়ে সে বিয়ে করবে না বলে পণ করেছে যে। যাইহোক জোর উদ্যমে রাধির জন্য পাত্র দেখা শুরু হোলো। রাধির মন ভালো নেই, কানুটা যে সেই কোন দূর শহরে বদলি হয়েছে, আসতেও পারে না আজ এতকাল তেমন।

যোগাযোগ বলতে, ঐ বুড়ি ঠাকুমার কাছে পাঠানো চিঠিতে বরাদ্দ রাধির জন্য দু-চার লাইন। ঠাকুমা বুড়ি বোঝে সবই, কিন্তু বলে না কিছু, রাধিকে যে ঠাকুমারও খুব পছন্দ, কানুকে বলেওছে সে কথা।

*********

রাধির বিয়ের দেখাশোনা চলছে, সব সম্বন্ধই একটু এগিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। কানুর ঠাকুমা লোকমুখে খবর পেয়ে রাধির দিদিমার সাথে দেখা করে কথা বলতে এসেছিলো। রাধি আর কানুর বিয়ের কথা। রাধির ছোটমামা দেখলো, এইতো খুব ভালো সম্বন্ধ, কোনো গোল নেই। চেনাশোনা ছেলে, পাল্টি ঘর, দাবি দাওয়া কিচ্ছু নেই, যদিও তা থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই। রাধির বিয়ের জন্য সব তৈরীই আছে। কেবল পাত্রপাত্রী রাজী থাকলেই হয়। রাধি সম্মতি জানিয়ে দিয়েছে। কানুর ঠাকুমাও নাতির সম্মতির কথা জানিয়েছে। তবে আর দেরীতে কী দরকার? রাধির ছোটমামা উঠেপড়ে লাগলো, রাধির বিয়ের জোগাড়ে।

রাধির বড়োমামা একবার কানুর ব্যাঙ্কের অফিসের এলাকায় সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে গেলো, সব ঠিকঠাক আছে কিনা। হাজার হোক, ভাগ্নী বলে কথা, আপন মরা দিদির একমাত্র মেয়ে, রক্তের সম্পর্ক! এটুকু না করলে হয়? তারপরে আবার দু'জনের জন্মছকের কুণ্ডলী মিলিয়ে দেখে তবে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য হবে। রাধির দিদিমা আর ছোটমামাও ভেবে দেখলো, খুব মন্দ কথা নয়। সাবধানের মার নেই। ছেলে একেবারে বিদেশ বিভুঁইয়ে না হলেও দূর শহরে চোখের আড়ালে তো থাকে বটে! তবে সঙ্গে ছোটমামা আর তার এক বন্ধুও গেলো খোঁজ খবর করতে। এবং তারা বেশ হাসিমুখেই ফিরে এলো, কোথাও কোনো গোলমাল নেই। যাক বাবা, এবার শুধু ঠিকুজি কোষ্ঠী মিলে গেলেই হোলো, বিয়ের সানাই বাজবে গোকুলপুর গাঁয়ে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলায় মুখ অন্ধকার করে রাধির বড়োমামা বাড়ীতে ঢুকলো। শহরের নামকরা জ্যোতিষীকে দিয়ে রাধি কানুর ছক মেলানো হয়েছে। একেবারে মিল নেই দু'জনের জন্মছকে।

পুরোপুরি বিপরীতধর্মী এবং অনেক খারাপ খারাপ যোগও রয়েছে। নির্বন্ধের খেয়াল! এক্ষেত্রে কারুর কিছু করবার নেই। রাধি ও কানু দু'জনেই বড়ো শান্ত, ধীরস্থির। বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না, দু'জনেই মেনেই নিলো। ঝুঁকি নিতে চাইলো না, ছোট থেকেই দু'জনে অনেক হারিয়েছে, নতুন করে আর কিছু পেয়ে হারাতে চায় না। যতই মনে কষ্ট হোক, যদি কিছু খারাপ হয়, তবে ওরা সহ্য করতে পারবে না। দু'জন দু'জনকে স্বান্তনা দিলো, এক হওয়াটা তাদের দু'জনের কপালেই নেই। মেনে তো নিতেই হবে, যত কষ্টই হোক।

**********

আরো অনেক সম্বন্ধ দেখা হয়েছে, আর ভেঙেও গেছে সব সম্বন্ধই। অবশেষে মাস ছয়েক পরে শেষ পর্যন্ত রাধির বিয়ের কথা পাকা হয়েছে। ছেলের ব্যবসা, সাধারণ ঘর। রাধি নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছে, জীবনের সব আশা তো পূরণ হয় না। যা আছে কপালে দেখা যাবে। কানু সেই যে ছক মেলানোর খবর জানতে এসেছিলো, তারপর আর গাঁয়ে আসেনি, শুনেছে একথা রাধি। পাড়ার... গাঁয়ের সবাই মনমরা, কানু আর রাধির বিয়ে হলেই সবাই খুশী হোতো। সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেলো। রাধির মনটা ভারাক্রান্ত!

লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনও বর আসেনি। রাধির দিদিমার মাথায় হাত। শেষে মেয়েটা লগ্নভ্রষ্টা হবে?

এই ছিলো শেষমেশ কপালে? কিন্তু এই পাত্রের সঙ্গে তো রাধির নাকি রাজযোটক মিল হয়েছিলো। জন্মছক বিচার করে জ্যোতিষী তো তেমনই জানিয়েছিলো। রাধির থমথমে মুখের সামনে মামারা দাঁড়াতে পারছে না। কী হবে এখন? গাঁয়ের লোকেরা তো আগেই মুষড়ে পড়েছিলো, এবার এক এক করে সব বিদায় নিতে শুরু করলো। রাধি মনে মনে ভাবলো, এ একদিকে ভালোই হোলো। নিজের অপছন্দের লোককে বিয়ে করার থেকে আইবুড়ো থাকাই ভালো। নিজের মতো নিজে সেলাই বোনাই নিয়ে থাকবে, আর কানুকে সারাজীবন ভালোবেসে যাবে। নাই বা হোলো বিয়ে, কানুকে তো আর জোর করে ভোলার চেষ্টা করতে তো হবে না! এই বেশ হোলো!

রাধির চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেলো, হৈহৈ রব উঠেছে। কানে এলো, বর এসেছে.... বর এসেছে।

রাধি ভাবলো মনে মনে, "শেষরক্ষা আর হোলো না", তার প্রার্থণা ভগবান মঞ্জুর করেনি!"

শুভদৃষ্টির জন্য আনা হয়েছে রাধিকে, মামারা আর পাড়ার দু-একজন দাদা সাতপাকে ঘোরাচ্ছে। চন্দন আঁকা গম্ভীর মুখের ওপর থেকে পান পাতার ঢাকা সরিয়েছে রাধি, কিন্তু চোখ এখনও খোলেনি। মনে মনে ভাবলো, "কী হবে শুভদৃষ্টি করে? সেই কবেই তো চার চোখের মিল হয়েছিলো!"

পাশ থেকে কেউ একজন রাধির গালে ঠোনা মারলো, "ওরে ও মুখপুড়ি, চোখটা খুলে দেখ একবার।" গলাটা রাধির খুব চেনা ঠেকলো, এতো কানুর ঠাকুমার গলা! তাড়াতাড়ি চোখ খুলে রাধির ভিরমি খাবার জোগাড়! বরের বেশে তার সামনে দাঁড়িয়ে কানু! এ কী করে সম্ভব?

গাঁক গাঁক শব্দে বক্সটা কেউ চালিয়েছে রাধি আর কানু বাসরে ঢোকার আগে। গান বাজছে, সুরেলা গলায়, "হায় রে কালা, কী যে জ্বালা .........."!

*********

রাধি-কানুর বিয়ে পর্ব খুব শান্তিতেই চুকেবুকে গেছে। বৌভাত-ফুলশয্যাও নির্বিঘ্নেই মিটেছে। কিন্তু এখনও সবাই হতভম্ব ভাবটা যেন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। জন্মছক না মেলার অজুহাতে যে বিয়ের সম্বন্ধ ভেস্তে গিয়েছিলো, তাই আবার জোড়া লাগলো কী উপায়ে? কী সে রহস্য? কেমন করে কাটলো অমন জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণীর জট? কৌতূহলে টগবগ করে ফুটছে সবাই, গাঁ-সুদ্ধু লোক একেবারে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।

রাধি কানুর অষ্টমঙ্গলার পরের দিন সুবচনী সত্যনারায়ণ পুজো, কানুদের বাড়ীতে। রাধির দিদিমা আর কানুর ঠাকুমা দু'জনেই পুজোর জোগাড় করতে ব্যস্ত। ফিসফিস করে গল্পও করছে দু'জনেই বেশ। কেউ সেখানে কান পাতলে শুনতে পেতো রহস্যটা। তবে আপাতত দুই বৃদ্ধা ঐ রহস্যকে ভেঙে আর দু'কান থেকে তিনকান করতে চায় না। তবে দু'জন দু'জনকে বাহবা দিলো বটে, দু'জনের এমন জম্পেশ অভিনয়ের। কোনো জবাব নেই দুই বৃদ্ধার টিমওয়ার্কের!

রাধির বিয়ের ক'দিন আগে থাকতে কিছুতেই মন মানছিলো না রাধির দিদিমার। মনে হোলো কানুর সাথে রাধির বিয়ে নিয়ে প্রথম ব্যাগড়াটা তুললো বড়োছেলে আর বড়োবৌমা। ওদের যেন একটু বেশীই আপত্তি রাধির বিয়ের ব্যাপারে, তারপর সম্বন্ধ দেখতে দেখতে একেবারে বড়োবৌমার ভাইপোর সাথে বিয়ের কথা, এটা রাধির দিদিমার মনে প্রধান খটকা। তারপর কানুর ঠাকুমার সাথে গোপনে যুক্তি করে গাঁয়ের ভবানী পণ্ডিতকে দিয়ে আবার রাধি কানুর জন্মছক মেলানো। জানতে পারা গেলো, কোনো সমস্যাই নেই। রাধি আর কানুর রাজযোটক মিল রয়েছে।

তবে শেষ কয়েকটা দিনে এইকথা গোপন রাখলো দুই বৃদ্ধা, অশান্তি এড়িয়ে সব আয়োজন ঠিকমতো করিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে। তারপর বিয়ের লগ্নের ঘন্টাকয়েক আগে একটা ফোন করা হয় পাত্রের বাড়ীতে, পাত্রী তার প্রেমিকের সাথে পালিয়েছে।

কাজটি নিজ দায়িত্বে রাধির দিদিমা পাশের পাড়ার ফোনবুথ থেকে করেছে। আর তার আগের রাতেই কানুকে খবর পাঠিয়ে আনানো হয় তার ঠাকুমার গুরুতর অসুখ বলে। কানু এসে পৌঁছেছে বিয়ের লগ্নের খানিক আগে। তার ঠাকুমা আর রাধির দিদিমা দু'জনে মিলে ভবানী পণ্ডিতের কাছে নিয়ে গিয়ে কানুকে সব কথা খুলে বুঝিয়েছে।

রাধির দিদিমা অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলো যে রাধির নামে ব্যাঙ্কের জমা টাকা কয়েকগুন বেড়ে এখন প্রায় তিরিশলাখ, রাধির মায়ের সব গয়নাগাটি আর রাধির নিজের পাঁচ-ছ'বছরের পুরো রোজগারের জমা টাকা.... এইসবের লোভেই বড়োছেলে আর বড়োবৌমা রাধির বিয়েতে ভাঙচিই দিয়েছে শুধু।

তারপর বড়োবৌমার হাবাগোবা ভাইপোর সাথে বিয়ের ঠিক করেছে, রাধির টাকাপয়সার লোভে পড়ে। তবে রাধির দিদিমার বড্ড জানার ইচ্ছা, রাধির সাথে ভাইপোর বিয়ে দিয়ে ঠিক কতটা লাভের আশায় বড়োবৌমা ছিলো?

বর আসেনি, রাধি লগ্নভ্রষ্টা হবে এই আবেগানুভূতি কাজে লাগিয়ে রাধির দিদিমা ছোটমামাকে রাজী করায় কানুদের বাড়ীতে যেতে। রাধির বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষার জন্য যদি কানু এসে থাকে, তবে কানুকে বিয়েতে রাজী করাতেই হবে। তারপর রাধির কপালে যা আছে তাই হবে। রাধির ছোটমামা কানুর বাড়ীতে গিয়ে আন্দাজ করতে পারে কিছুটা ঠিকই। তবে সেও একটুও কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। বুঝেছিলো রাধির জন্য তার দিদিমা যা করছে, তার থেকে ভালো আর কিছু করার ক্ষমতা কারুর নেই, কিচ্ছু নেই। তবে বিয়ে করতে পাত্রপক্ষ এলো না কেন, সেটা একটা বড়সড় ধন্ধ অবশ্যই তার কাছেও। তবে খুশীই হয়েছে। আর মনে মনে তারিফ করেছে তার মায়ের এই "সাপও মরলো অথচ লাঠিও ভাঙলো না" গোছের তীক্ষ্ম বুদ্ধির।

যার শেষ ভালো তার সব ভালো। এই খানিকক্ষণ আগে রাধি আর কানু সিমলার পথে রওনা হোলো মধুচন্দ্রিমায়। ওদের জন্য একরাশ শুভেচ্ছা।


Rate this content
Log in