Banabithi Patra

Drama


3  

Banabithi Patra

Drama


হারিয়ে যেতে যেতে

হারিয়ে যেতে যেতে

4 mins 1.6K 4 mins 1.6K

নিজের ঠোঁটটা সজোরে কামড়ে কোনমতে কান্নাটা আটকায় ঝিল্লি , এখন কিছুতেই কাঁদলে চলবে না । মাকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবেনা যে ওর ঘুম ভেঙে গেছে । জানলার দিকে পাশ ফেরে শোয় ঝিল্লি । বন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে আসা নরম আলোর হালকা রেখাটা দেখেই বুঝতে পারে , বিকালটা আর ফুরিয়ে আসতে বেশি বাকি নেই । কদিনের টানা জ্বরে শরীরটা কেমন যেন হালকা লাগছে আর মাথাটুকু ভারভার , চোখগুলো জ্বালাজ্বালা করছে । জলতেষ্টা পেলেও জল খেতে একদম ইচ্ছা করছে না , জিভ দিয়েই শুকনো ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নেয় ঝিল্লি । দুপুরে মানদামাসি দুধরুটি খেতে দিয়েছিল । দুধ দেখলেই গা বমি দেয় ঝিল্লির , তবু কোনরকমে দুচামচ মুখে দিয়েছিল জোর করে । তারপরেই দুধরুটির বাটি ঠেলে রেখে উঠে এসেছিল । ভেবেছিল মা অফিস থেকে ফিরলে একটু ঝালঝাল কিছু বানিয়ে দিতে বলবে , মুখটাতে একটুও স্বাদ নেই ।

          

শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছিল বুঝতেই পারেনি ঝিল্লি । ঘুম ভাঙলো পাশের ঘর থেকে মা আর অরুণকাকুর কথার শব্দে । অফিস ফেরত মায়ের সাথে এবাড়িতে আসাটা যেন অরুণকাকুর অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে । চা - জলখাবার - গল্পগুজব চলবে কিছুক্ষণ , তারপর অরুণকাকুর বাড়ি ফেরার পালা । এইসময়টাতে বাপীর জন্য সবথেকে মনখারাপ করে ঝিল্লির । ছোট হলেও ঝিল্লির কেন জানিনা বারবার মনে হয় ঐ অরুণকাকুর জন্যই বাপী আর ওদের সাথে থাকে না । বাপী এখন যে ফ্ল্যাটটাতে থাকে সেখানেও বেশ কয়েকবার গেছে ঝিল্লি । বাপীর সংসারটা কেমন যেন অগোছালো লাগে ঝিল্লির । খাটবিছানা - জামাকাপড় - রান্নাঘর , এমনকি বাপীর জীবনটাই কেমন যেন এলোমেলো লাগে ঝিল্লির চোখে , বাপীর চেহারাটাও কেমন যেন রোগা হয়ে গেছে । মাকেও কথাটা বলেছিল ঝিল্লি । মা চোখ বড় বড় করে ওকেই ধমক দিয়েছিল , ছোটছেলে ছোটছেলের মতো থাকবে ; বেশি পাকা-পাকা কথা বলবে না ।

ওর মধ্যে পাকা কথার কি যে ছিল বুঝতেও পারেনি ঝিল্লি ।


গত আট-দশ মাসে ডিভোর্স , উকিল , কোর্ট শব্দগুলো ঝিল্লির খুব চেনা হয়ে গেছে । মা আর অরুণকাকু এইসব কথা আলোচনা করে , তার কিছু টুকরো তো ঝিল্লির কানে এসেই যায় ।

কদিন ধরেই টুকরো টুকরো কথায় ঝিল্লির মনে হচ্ছিল , মা আর বাপীর ডিভোর্সটা এবার ফাইনালি হয় যাবে । কিন্তু সেটা কালকেই ???? একটু আগে তো অরুণকাকু আর মা সেই আলোচনাই করছিল । কাল কোর্টে যেতে হবে বলে দুজনেই অফিস ছুটি নিয়েছে । কৈ মায়ের তো এতটুকু মনখারাপ করছে না , আজো দিব্যি হেসে হেসে গল্প করছে অরুণকাকুর সঙ্গে ।

আগে বাপীই রোজ ঝিল্লিকে স্কুলবাসে তুলতে যেত , এখন মানদামাসি যায় । পৌলমীদি একদিন বাসে চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করেছিল ঝিল্লিকে , তোর মা আর বাপী নাকি এখন একসাথে থাকে না । পৌলমীদি কি করে কথাটা সেটা জানতে চেয়েছিল ঝিল্লি । ওদের পাড়াতে নাকি পৌলমীদির মাসির বাড়ি , মাসি ওর মাকে কথাটা বলছিল যখন তখনি পৌলমীদি কথাটা শুনেছে ।

পৌলমীদিই ওকে বলেছে , ডিভোর্স হয়ে গেলে মা আর বাপী নাকি আবার যে যার মতো বিয়ে করে আলাদা আলাদা সংসার করবে । ওদের আবার বেবি হবে , তখন নাকি ঝিল্লিকে আর কেউ ভালোবাসবে না । পৌলমীদির এক কাকা আর কাকিমার নাকি ডিভোর্স হয়ে গেছে , আর ওদের ছেলেটাকে নাকি অনেক দূরে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছে । ছেলেটাকে কেউ নিজের কাছে রাখেনি ।

ঝিল্লি পৌলমীদির কথা বিশ্বাস করেনি , ওর মা-বাপী খুব ভালোবাসে ঝিল্লিকে । কেউ ওকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবে না । তারপর থেকে আর কথা কোনদিন কথা বলেনি পৌলমীদির সাথে ।

কিন্তু আজ যেন পৌলমীদির কথাগুলোই বারবার মনে আসছে ঝিল্লির । আগে জ্বর হলে অফিস ছুটি নিয়ে সারাটা দিন ঝিল্লির পাশেই বসে থাকতো মা । এটা খাবি - সেটা খাবি - কিছু তো খেতে হবে - নাহলে শরীর আরো খারাপ করবে এইসব বলে যেত সারাদিন । কতো আদর করতো ঝিল্লিকে । আর আজ অফিস থেকে ফিরে একটিবার দেখতেও এলোনা মেয়েটা কেমন আছে ।

মা আর অরুণকাকুর গল্পের ছোট ছোট টুকরো আর হালকা হাসির আওয়াজ ছুঁয়ে যাচ্ছে ঝিল্লিকে । ওদের খুশির মুহুর্তগুলোয় কিছুতেই নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে না ঝিল্লি । বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে । সন্ধ্যে হয়ে গেছে , ঘরের চাপা অন্ধকারে যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ন'বছরের বাচ্চা মেয়েটা ।

আবার শীত-শীত করছে , জ্বরটা আসছে হয়তো । চোখদুটো ক্লান্তি আর কষ্টতে বন্ধ হয়ে আসছে ঝিল্লির । আস্তে আস্তে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে ঝিল্লি । চোখের সামনে ভেসে আসছে ছেঁড়া ছেঁড়া , স্বপ্ন স্বপ্ন কতো ছবি । দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখছে মা-বাপী আর ঝিল্লী , পুরীর সমুদ্রে স্নান করছে ওরা তিনজন , চিড়িয়াখানায় বড়দিনের ছুটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা তিনজন । ছবিগুলোকে কিছুতেই হারাতে দেবেনা ঝিল্লি । শেষবারের মতো জ্বরের ঘোরে একসাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা আর বাপীর হাতদুটো ........

       


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design