Gopa Ghosh

Inspirational


4.9  

Gopa Ghosh

Inspirational


দুর্গা

দুর্গা

4 mins 763 4 mins 763

ডাক্তার বাবুর কথা শুনে তো দুর্গার পায়ের নিচের মাটি কাঁপতে লাগলো। অনিলের মাথায় টিউমার আর ওটা খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করা প্রয়োজন। এখনও পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি ছেলেটার। মেয়ে নীলা হওয়ার চার বছর পর অনিল এর জন্ম। তবে ওদের অভাবের সংসারে নীলা যেন এত কম বয়সেই বেশ পরিনত হয়ে গেছে। মায়ের কষ্ট খুব বেশি করে অনুভব করে। দুর্গার স্বামী বিকাশ প্রায়ই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় , মানে নেশা করে কোথাও পড়ে থাকে। এমনও অনেক সময় হয়েছে দুর্গা খবর পেয়ে রিকশা করে বিকাশ কে তুলে বাড়ি নিয়ে এসেছে। আসলে যতদিন দুর্গার শ্বশুরমশাই বেঁচে ছিলেন ততদিন ওদের এতো পয়সার অসুবিধা ছিল না। কারণ শ্বশুরমশাইয়ের পেনশন দিয়ে ওদের যাহোক করে চলে যেত। বছর তিন মারা গেছেন উনি আর শাশুড়ি তার বেশ কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। দুর্গার দুটি ছেলেমেয়ে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। বিকাশ কোন কাজ করে না বরং দুর্গা পাশের টেইলার্স থেকে কিছু শাড়ি নিয়ে এসে ফলস পিকো করে সামান্য কিছু রোজগার করে। এখন অনিল এত অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ও ছেলের দেখাশুনা করে খুব বেশি সময় বাঁচাতে পারে না। মাঝেমাঝে বিকাশের ওপর খুব রাগ হয় কিন্তু কাকে বলবে? সে মানুষটা সারা দিন নেশা করে বসে আছে। তাই অগত্যা ভগবান কে ডাকা ছাড়া ওর আর কোন উপায় নেই। কিন্তু অনিলের এই অসুখটা ওকে দিশেহারা করে দিল। ডাক্তারবাবুর মতে প্রায় দুই আড়াই লাখ টাকার মত লাগবে। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মত অবস্থা তাদের কাছে দুই আড়াই লাখ টাকা জোগাড় করা অসম্ভব। কিন্তু অনিলের মুখটা মনে পড়লেই ও আর স্থির থাকতে পারছিল না। অনেক ভেবে চিন্তে ওর এক খুড়তুতো ভাই পলাশের বাড়ি গেল। পলাশের স্ত্রী শ্রেয়া ওকে যে খুব একটা সহ্য করতে পারে না বা বলতে গেলে গরিব বলে একটু অবজ্ঞা করে, সেটা ও ভালো করেই জানত। তাই পলাশ নেই শুনে ও আর বাড়িতে ঢুকলো না শুধু নিচের ভাড়াটের ঘরে পলাশ এলে ও যে এসেছিল সেটা জানিয়ে দিতে বলে চলে এলো। কারণ ও জানে শ্রেয়া ওর আসার খবরটা পলাশকে কিছুতেই দেবে না।

পরের দিন পলাশ এল। সব শুনে দুর্গার জন্য একটা কাজর ঠিক করে দেবে বলে কথাও দিয়ে গেলো কিন্তু দুর্গার সময় কোথায় যে অসুস্থ অনিল কে ঘরে ফেলে রেখে ও বাইরে কাজ করতে যাবে? তাও ও না করলো না। শুধু অপারেশনের টাকাটা যদি কোন ভাবে পলাশ জোগাড় করে দিতে পারে সেই অনুরোধ টুকু করল। পলাশ দেখছি বলে সেদিনের মত চলে গেল। দুর্গা বুঝতে পারল পলাশ ওকে কোনো সাহায্য করবে না। কিন্তু অনিলকে যে ভাবেই হোক বাঁচিয়ে তুলতে ই হবে। সারা রাত ওর দুচোখে ঘুম এলো না।

নানা চিন্তায় কখন যে ভোর হয়ে গেছে ও টের পায়নি।

সেদিন মাথায় অনিলের চিন্তা নিয়ে ও নীলাকে ঘরে রেখে বেরোলো। ভাবল সবাই তো বলে মেয়েদের অনেক শক্তি, এই পরিস্থিতিতে যদি শক্তি না কাজ করলো তাহলে আর এই শক্তি দিয়ে কি হবে ?আমার অসুস্থ ছেলেটাকে যেভাবে হোক সুস্থ করে তুলতে হবে। এক রকম মরিয়া হয়ে ও সোজা হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে গিয়ে ঢুকলো। বাইরে নার্সেরা বাধা দিলেও শুনলো না। বেশ কিছুদিন ধরে অনিল কে নিয়ে আসা যাওয়া করায় ডাক্তার বাবু দুর্গাকে ভালো করেই চিনতেন। তাই ও ভেতরে ঢুকে ডাক্তারবাবুর সামনের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়ল। ডাক্তার বাবু একটু অবাক হলেও বেশ নরম সুরে দুর্গা কে জিজ্ঞেস করল

"ছেলে কি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে?"

এবার দুর্গা ধরা গলায় বলে উঠলো

"ডাক্তার বাবু আপনি যে ভাবে হোক ওর অপারেশন টা করে দিন, আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে সব টাকা শোধ করে দেব"

ডাক্তারবাবু একটু চুপ থেকে বললেন

"দেখুন আপনার ছেলের মত এখানে অনেক পেশেন্ট আছে, তাই আমি আপনাকে কিছুটা সাহায্য করতে পারি কিন্তু সবটা করা অসম্ভব"

সেদিন দুর্গা একটু হলেও আশার আলো দেখতে পেল। ডাক্তার বাবুর সাথে কথা বলে বুঝল আরো এক লাখ টাকার মতো ওকে জোগাড় করতে হবে। ও যেন এখন একটা শক্তি পেয়ে গেছে। কারণ ডাক্তার বাবু বলেছেন এই অপারেশনের পর অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠবে তাই অনিল কে সুস্থ করার জন্য দুর্গা প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো। বিকাশ প্রায় ছয় দিন হলো বাড়িতে আসেনি। দুর্গা আর বিকাশের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা ও করল না। পরের দিন পলাশ দুর্গার বাড়িতে এলো

"দূর্গাদি অনিল এখন কেমন আছে?"

"ভালো নেই ওর অপারেশনের জন্য এখনও প্রায় এক লাখ টাকা জোগাড় করতে হবে । দেখি চেষ্টা তো করছি ছেলেটাকে আমাকে বাঁচাতেই হবে"

পলাশ কিছু টাকা দুর্গার হাতে দিয়ে বলল

"এটা রাখ আমার কাছে যা ছিল দিলাম তবে শ্রেয়াকে ভুলেও বলিস না কারণ তুই তো জানিস ও কেমন?"

দুর্গা টাকাটা নিল না। বলল

"দ্যাখ পলাশ, যে টাকা নিয়ে তোদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে সেই টাকা আমি নিতে পারবো না"

"না রে দূর্গাদি তুই যদি পারিস পরে আমাকে ফেরত দিয়ে দিস কিন্তু অনিলের অপারেশন টা এখন করিয়ে নে"

শেষে দুর্গা টাকাটা নিল ।

পরের দিন ওর কিছু গয়না বিক্রি করে পুরো টাকাটা ডাক্তারবাবুর হাতে তুলে দিয়ে এলো। নীলার বিয়ের জন্য গয়নাগুলো বুকে করে ধরে রেখেছিল এত অভাব সত্ত্বেও কিন্তু অনিলের জীবনের কাছে ওই গয়নাগুলো খুবই তুচ্ছ মনে হলো দুর্গার।

অবশেষে অনিলের অপারেশন খুব ভালো ভাবেই হলো এবং ডাক্তারবাবুর মতে তিন মাসের মধ্যেই ও বেশ অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠবে। দুর্গা হাসপাতালে বেঞ্চে বসে ভাবতে লাগলো কোন শক্তিতে ও আজ অনিল কে সুস্থ করে তুলতে পারল? কেউ যেন বলে উঠল এটাই তো নারী শক্তি, সব নারীর ভেতরে থাকে প্রয়োজনে তা বেরিয়ে আসে।


Rate this content
Log in