দরজা
দরজা
সালটা ২০২২। জানুয়ারি মাস। শীতের সময়। পুরনো বাসা ছেড়ে নতুন বাসায় উঠেছি। বাসাটা ছিল একটু গ্রামের দিকে। বাবার বদলি হওয়ার কারণে এখানে থাকতে হবে। বাসাটা দোতলা বিশিষ্ট একটি বাংলো বাড়ি। বাড়িটা বেশ পুরনো। বাড়ির পিছনে রয়েছে বাঁশ বাগান। সবারই বাড়িটা মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। কিন্তু অবাক করে দেয়ার মত কথা হল বাড়িটির আশেপাশে কোন ঘরবাড়ি নেই। বাংলো বাড়িতে দুজন চাকর এর ব্যবস্থা আছে। একজনের নাম রহমত আরেকজনের নাম সাথী।সম্পর্কে তারা স্বামী-স্ত্রী। সবার সহযোগিতায় আমরা পুরো বাড়িটি সুন্দর মত গোছাতে সক্ষম হই। আমাকে দেয়া হয় দোতলার একদম শেষের ঘরে থাকতে।
ঘরটা ভালই। ঘরের পাশে টয়লেট আছে ঘরের ভিতরে বড় একটি জানলা রয়েছে এবং আমার যাবতীয় সকল জিনিস এখানে রাখা যাবে। পুরা বাড়িটা আমি ঘুরে দেখলাম। এলাকাটা ভালো মতো চেনার জন্য রহমতকে নিয়ে এলাকা ঘুরতে বের হলাম। জায়গাটা অনেক সুন্দর অনেক পুকুর নদী গাছপালা মাঠ আরো অনেক কিছুই রয়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় কিছুদূর যাওয়ার পরে জনবসতি দেখা মিললো। তারই পাশে কিছু ছোট ছোট দোকান। দেখতে পেলাম এখানে দুটি মুদি দোকান এবং একটি মোবাইল রিচার্জ এর দোকান রয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ পাব নাকি এ নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম দেখার পরে চিন্তাটা দূর করো। গ্রামটা ভালো মতো ঘোরার পরে আমরা বাড়ি চলে এলাম। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরে আমি ঘুমোতে চলে গেলাম। রাতের মাঝখানের দিকে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশের টেবিলে নজর দিয়ে দেখলাম তিনটা বাজে। আমি ওয়াসরুম ব্যবহার করার জন্য আমার রুমের বাহিরে বের হচ্ছিলাম। বলাই বাহুল্য, আমার রুমের বাহিরেই ওয়াসরুম। পুরোনো আমলের বাড়ি। তাই সবই আগের আমলের মতো করা। আমি রুম থেকে বের হচ্ছিলাম তখনই আমার নজর পরলো আমার রুমের দরজার পাশে একটি দরজা রয়েছে। কিন্তু এর আগে দরজাটি আমার নজরে পড়েনি। ভাবতে খুবই অবাক লাগলো, কারণ এখানে আমি অনেকবার এসেছি ঘুরেছি দেখেছি কিন্তু এ দরজাটা একবারের জন্য আমার চোখে পড়েনি। আমি দরজাটা খোলার সিদ্ধান্ত নেই। যখনই আমি দরজাটা খুলি আমি দেখতে পাই ভিতরে বড় একটি অন্ধকার ঘর। সেখানে একটি চেয়ার রাখা চেয়ারে একটি মেয়ে বসে আছে। মেয়েটি ঠিক উল্টো ভাবে বসে আছে তার পিছনের দিকটা আমি দেখতে পাচ্ছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম 'এই মেয়ে কে তুমি এখানে কি করছো?' এরপর মেয়েটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এরপর সে আমাকে বলল 'কি দোশ ছিল আমার কেন মারলে আমায়? মেরে আমাকে এখানে ফেলে রেখেছো তুমি! তোমাকে আমি ছাড়বো না! এই বলে মেয়েটি আমার গলা সজরে টিপে ধরল। আমি বাঁচার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম।আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এমন সময় আমি রহমতের গলা শুনতে পেলাম, স্যার স্যার এরকম কেন করছেন ওঠেন স্যার উঠেন। পরে চোখ খুলে দেখে এটা সব একটি স্বপ্ন ছিল।
আমি স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেলি। আমি রহমতকে বললাম 'তেমন কিছু না শুধু একটু খারাপ স্বপ্ন দেখেছি আরকি।'
এরপর রহমত বললো 'আচ্ছা স্যার আপনি খাবার টেবিলে আসেন খাবার দিছি '
'আমি আসছি তুমি যাও'
এই বলে রহমত চলে গেল। এরপর আমি স্বপ্নটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। এরকম স্বপ্ন আমি আগে কখনো দেখিনি। এর আগেও অনেক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছে কিন্তু এই স্বপ্নটার মধ্যে আমি বাস্তবে কখনো অনুভব করতে পারিনি। মেয়েটির গলার চেপে ধরা আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া সবই অনুভব করতে পারছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি আমার রুমের দরজার পাশে ভালো মতো চেক করলাম। বাথরুমের দরজায় এবং আমার রুমের দরজা এবং মাঝখানে একটু সামান্য ফাঁকা জায়গা। কোন দরজা নেই। আমি শান্তির নিশ্বাস ফেললাম। সব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে আমি আমার কাজে চলে গেলাম। ইতিমধ্যে দেখা গেল আমার মোবাইলে রিচার্জ শেষ। তাই রহমত কে বলে আমি আমার মোটরসাইকেল নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাজারে গিয়ে রিচার্জের দোকানে গেলাম। রিচার্জের লোকটা আমাকে বলল
-কি ভাই গ্রামে নতুন নাকি? কিছু মনে করবেন না আগে কোনদিন দেখিনি তো তাই।
-না না মনে করার কি আছে, আসলে আমি এক সপ্তাহ আগেই এসেছি। আমার বাবার ঢাকা থেকে এখানে বদলি হয়েছে। তাই এখানে আমরা এসেছি।
-তা আপনারা এখন থাকেন কোথায়?
- এইতো সামনে বাংলা নাম্বার ৩০৩।
-কি বাংলা নাম্বার ৩০৩!
লোকটা কেমন জানি ঘাবড়ে গেলে এবং ভয় পেতে লাগলো। অদ্ভুত আচরণ করতে লাগলো। আমি কতখানি তাকে জিজ্ঞেস করলাম - কি ভাই কোন সমস্যা এমন করছেন কেন?
- ভাই আপনার এক ওখানে জেনে শুনে উঠেছেন?
- কেন ভাই কি হয়েছে?
-গ্রামের মানুষ কয় ওই বাংলা নাকি অভিশপ্ত। রাইত ব্যারাতে গ্রামের মানুষ ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করে না। ওর আশেপাশে কেউ থাকতেও চায় না। আপনি দেখেন নাই কোন ঘর বাড়ি নাই আশেপাশে। ওই বাসায় আগে যারা থাকতো তাগোরে কারা জানি পুরা পরিবার ধইরা খুন কইরা দিছিল। এরপর বাড়ি অনেকদিন পৈড়া ছিল। এরপর সরকার ওই বাড়িডার দখল নেয়। ওইখানে দুইজন লোক রাইখা দেয়। ওরাই এই বাংলো বাড়ির দেখাশোনা করে। এর আগেও দুই পরিবার আইসিলো থাকনের লাইগা, এক পরিবার পুরা ভাগছে আর অন্য পরিবারের দুজন পাগল হইয়া গেছে।
- হাহাহা। অনেক দারুণ একটা গল্প শোনালেন মনটা ভালো হয়ে গেল। আমি একজন সাইন্সের স্টুডেন্ট আর আপনি আমাকে ভূতের কথা বলেন। আরে ভাই ভুত বলতে কিছু আছে নাকি এই দুনিয়ায়? যতসব আজগুবি ভন্ডামি। আপনি দেন তো আমার ফোনে টাকা ভরে দেন।
- ঠিক আছে দিতাছি কিন্তু আপনি বিশ্বাস করলেন না তো একদিন আপনি ঠিকই টের পাবেন। ঐদিন আর কোন সময় থাকবো না।
আমি ফোনে টাকা ভরে নিয়ে বাড়ি চলে আসলাম এবং ভাবতে লাগলাম মানুষ এখনো কোন যুগে বাস করছে।
২০২২ সালে এসেও সেইসব ভূত-প্রেত আত্মা এগুলো বিশ্বাস করে। ভূত-পেতাত্মা শুধু সিনেমাতে,গল্পে এবং নিজের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। যেমন আমি গতকাল একটি স্বপ্ন দেখলাম যেখানে দেখলাম একটি ভুত নাকি আমার গলা টিপে দিচ্ছে এটি স্বপ্নের সীমাবদ্ধ। এসব কিছু ভাবতে ভাবতে আমি বাসায় ফিরে আসলাম। বাসায় এসে রুমে এসে খাটের উপর শুয়ে মোবাইল দেখছিলাম,ঠিক তখনই অনেকগুলো কুকুরের আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওরা ঠিক আমার রুমে জানলা বরাবর দাঁড়িয়ে ডাকছে অনেক জোরে জোরে। এত বিরক্ত বোধ হলো আমার কেন যে এরা কুকুরদের ঠিকমতো খাবার দেয় না। আমি রহমত কে জোরে ডাক দিলাম। বললাম কুকুরদের খাবার দিয়ে শান্ত করতে। কিন্তু খাবার দেয়ার পরও তারা শান্ত হলো না। রহমত বলল যে ওরা নাকি আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে যাবে। হলো ও তাই কুকুরগুলো আধাঘন্টা থেকে এক ঘন্টার ভিতরে শান্ত হয়ে গেল।
ততক্ষণে মাগরিবের আযান দিয়ে দিয়েছে। আমি নামাজ শেষ করে ছাদের উপর একটু হাঁটতে গিয়েছে। এতক্ষণ দেখলাম ছাদের এক কোণে একটি মহিলা দাঁড়িয়ে নিচের দিক তাকিয়ে আছে। আমি ভাবলাম হয়তো সাথে এসেছে কাপড়চোপড় ঘরে নিয়ে যেতে। আমি ছাড় দিয়ে পায়চারি করে যাচ্ছি কিন্তু সাথীর কোন সারা শব্দ নেই সে জায়গার মতো দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পিছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসলো, কণ্ঠটি সাথিরই ছিলো
পিছনে ফিরে দেখলাম সাথী সে আমাকে বলল - স্যার আপনি এই সময় ছাদের উপর কি করছেন?
আমি তো পুরো থ হয়ে গেলাম। তাহলে আমি যাকে দেখলাম সে কে ছিল? তাহলে কিসের চোর ছিল? আমি তাড়াতাড়ি গেলাম ছুটে সে মহিলা যে দিকে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আমি কাউকে পেলাম না। আমি সাথেকে কিছু বললাম না। আমি বললাম যে কাপড়চোপড় ঘরে নিয়ে এসে আমাকে এক কাপ কফি দিয়ে যেও। এরপর আমি নিচে নেমে গেলাম। ওই মহিলার রহস্যটা আমি কিছুতে মিলাতে পারছিলাম না। এটা কিভাবে সম্ভব হলো। একটা মহিলা এসে হঠাৎ উদধাও কিভাবে হল। ভাবলাম ওটা কি ভূত-পা পেট কিছু ছিল না তো? পরে আবার চিন্তা আসলো যে ভূত পেট বলতে তো কিছুই নেই শুধুই কল্পনা। এরকম ভাবার মাঝে সাথী আমার রুমে প্রবেশ করল
- স্যার এইযে আপনার কফি।
- আচ্চা সাথি একটা কথা বলো তো, তুমি কি ভূত প্রেত বিশ্বাস করো?
- জি স্যার করি।
- তুমি কি কখনো ভুত নিয়ে যার চোখে দেখেছো যে তুমি বিশ্বাস করো?
- জি স্যার আমি দেখছি। এই বাড়িতেই দেখছি। আপনারে বাড়ি তো ভালা না। এ বাড়িতে ভূত-প্রেত কো আনাগোনা থাকে। ওই যে একটা সময়....
আমি সাথিকে থামিয়ে দিলাম। থামিয়ে দিয়ে বললাম
- ঠিক আছে ঠিক আছে আমি জানি আমি সব জেনে গিয়েছি কিন্তু আমি এগুলো কিছুই বিশ্বাস করি না। তুমি এবার যাও তোমার কাজে যাও।
এই কথা বলার পর সাথী আমার রুম থেকে চলে গেল। আমি ভূত-প্যাড বিশ্বাস করিনা আজকে যে ঘটনাটা আমার সাথে ঘটলো এটা আমাকে ভাবতে বাধ্য করলো। ওইটা ছিল কি?
এরপর একটু টিভি চালালাম। টিভি দেখা শুরু করলাম। টিভি দেখতে দেখতে খাওয়ার সময় চলে এলো। আমি খাওয়ার জন্য খাবার টেবিলে গেলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি আবার আমার রুমে চলে আসলাম। লাইটটা বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু ঘুম আর আসছে না। যখন চোখ লেগে ঘুম পুরো চলে আসলো তখন আবার সেই স্বপ্নটা দেখা শুরু করলাম। একই স্বপ্ন একই জায়গা একই মেয়ে এবং একই সব। আমি ঠিক আগের মত অনুভব করছিলাম। কিন্তু এবার আমার হঠাৎ করে মাঝখানে ঘুম ভেঙে গেল। আমি অনেক ভয় পেয়ে গেলাম। খাটের পাশে রাখার টেবিল থেকে পানি নিয়ে পানি খেলাম। খাটের উপরে সে আস্তে করে শুয়ে পড়লাম। ঠিক তখনই শীতল একটি কন্ঠে আমার কানে একটি মহিলা বলে উঠলো আমাকে কি তোমরা মুক্তি দেবে না? ' কথাটা শোনার পর আমার সারা শরীরে লোম দাঁড়িয়ে গেল। হার্টের স্পিড বেড়ে গেল। আমি এত ভয় আমার সারা জীবনে পাইনি। আমি দৌড়ে গিয়ে লাইট অন করলাম। বাবা মাকে ডাকলাম, সাথে রহমত এবং সাথীও ঘুম থেকে উঠে পড়ল চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে। বাবা মা আমাকে বোঝালো যে আমি এটি ভুল শুনেছি। ভয়ংকর স্বপ্ন দেখার পর ভয় পেয়েছি বলে এটি নাকি আমি শুনতে পেয়েছি। কিন্তু আমি জিনিসটা আসলেই শুনেছি কিন্তু তাদেরকে এটা বোঝাতে পারলাম না। বাবা মা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আবার। এদিকে রহমত এবং সাথী আমাকে নিয়ে আমার রুমে গেল। এবার সাথী আমাকে বলে উঠলো
-- স্যার আমি জানি আপনি মিথ্যা বলেননি কারণ এই ঘটনা আমাদের সবার সাথেই প্রায়ই ঘটে। আপনি কোন চিন্তা করবেন না এই তাবিজটা কাছে রাখুন। এটা হাতে বেঁধে আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন আর এটি কখনো খুলবেন না।
আমি সাথীর কথামতো তাবিজটি পড়ে শুয়ে পড়লাম। এরপরে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। এরপর আর কিছু আমার সাথে হয়নি। আর সাতদিন হয়ে গেল। সেই স্বপ্ন আমি আর দেখিনা এবং কোন শরীরে এসে অনেক আছে কথা বলে না। কিন্তু সে অশরী কেন আমাকে বলেছিল আমাকে মুক্তি দাও । আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে। এইজন্য আমি লেগে পড়লাম এই রহস্য উন্মোচন করার জন্য। আমি বাসার স্টোর রুম থেকে বেশ কিছু ছবি কালেক্ট করি যেখানে অনেক গুলো ছবি ছিল। এখন এর মধ্যে কে যে সেই মেয়ে ছিল তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারণ
স্বপ্নে মেয়েটার চেহারা অনেক ভালোমতো দেখতে পারিনি। এবং মেয়েটাকে কেউ কখনো দেখেও নি । কারণ ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৬ সালে। ঘটনাটি একমাত্র সেই বলতে পারবে যে সেই সময় এবং এখনো বেঁচে আছে । এমন মানুষ খোঁজ করার জন্য গ্রাম ঘুরলাম। তখন আমি সেই সময়ের বাংলো বাড়ি সিকিউরিটি গার্ডের বাসা খুঁজে পেলাম।
তার বাসায় আমি নক করলাম। একটি মাঝ বয়সী মহিলা দরজা খুলল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল - আপনারা কারা এবং এখানে কি চান? আমি বললাম - আমি একটু সানজিদ সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই।
- ও আচ্ছা আসুন উনি ভিতরেই আছে।
আমি রহমত ভিতরে গেলাম। দেখলাম বৃত্তের বয়স প্রায় ৯০ হবে কিন্তু এখনো ফিট। বয়সের কারণে চামড়া ঝুলে গেলেও একদম সোজা রয়েছে। আমি গিয়ে তাকে সালাম দিলাম তিনি বললেন
- ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা, কি চাও বাবা তুমি এখানে?
- আসলে দাদু আমি একটু আপনার কাছে ৩০৩ নাম্বার বাংলো সম্পর্কে যানতে চাই।
- না আম কিছু বলতে পারব না আমাকে ক্ষমা করো। এই নিয়ে অনেক মানুষ এসেছে আমার কাছে জিজ্ঞেস করতে আমি কাউকে বলিনি আমি সে ঘটনা মনে করতেও চাই না এবং বলবো ও না। - আসলে দাদু জানাটা খুবই জরুরী কারন আমরা ঐ বাংলোতে উঠেছি এবং আমার সাথে অনেক কিছু হয়ে গেছে এই কয় দিনে।
-কি??!! তোমার ওইখানে কেন উঠেছ। জলদি ওখান থেকে চলে যাও।
-আসলে দাদু আমি বিষয়টা রহস্য সমাধান করার চেষ্টা করছি আসলে আমাকে কোন একটি মেয়ের আত্মা কানে কানে বলেছে যে আমাকে মুক্তি দাও। এরপর থেকে আমি রহস্য সমাধানে নেমেছি। আমি ওই আত্মাকে এখন মুক্ত করেই ছাড়ব।
- আমি এই ৫০ বছরে প্রথম দেখলাম রহস্য সমাধান করার চেষ্টা করছে। তুমি যদি সত্যিই রহস্য সমাধান করতে চাও তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করবো। বল বাবা তুমি কি জানতে চাও।
-- আসলে দাদা আমি জানতে চাই ৬৩ বছর আগে আপনি ওই বাংলো বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড ছিলেন তো ওই রাতেও আপনি উপস্থিত ছিলেন এবং ঠিক কি হয়েছিল ওই রাতে আমাকে একটু বলতে পারবেন?
- আজ থেকে ৬৩ বছর আগে আমার বয়স ছিল তখন ২৭ বছর। বিয়ে করেছিলাম তাই সংসার চালাতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছিলাম। ওই বাড়িতে চারজন থাকতো। বাড়ির মালিক, মালিকের স্ত্রী এবং মালিকের বড় মেয়ে এবং ছোট মেয়ে। মালিকের বড় মেয়ের নাম ছিল অর্পিতা এবং ছোট মেয়ের নাম ছিল মিলি। সারাদিন ওরা দুজন মিলে খেলতো। আমিও অনেক সময় তাদের সাথে খেলাধুলা করতাম। স্যার ম্যাডামরা অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ আসলো সেই অলক্ষণে রাত। আমি ডিউটি করে নিজের রুমে শুয়েছিলাম। রাত তখন প্রায় বারোটা বাজে। তখনকার সময় এই এলাকায় ডাকাতদের অনেক উপদ্রব ছিল।
আমি তখন দূর থেকে দেখি ডাকাতের দল হাতে বড় বড় ছুড়ি নিয়ে এ বাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে। তখন ডাকাতদের শক্তি এতটাই ছিল যে এদেরকে পুলিশরা ও ভয় পেতো। তারা একে একে সবাই ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল। আমি নিজের জানের ভয়ে পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম।তখন আমি দেখলাম ডাকাতরা একে পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলল। অতিরিক্ত তাড়াহুড়ার কারণে ডাকাতরা সবার লাশ বের করে মাটিতে পুতে ফেলার পরেও মালিকের বড় মেয়ে অর্পিতার লাশটা তারা একটি রুমের ভিতর রেখে দেয়। এরপর তারা সেখান থেকে চলে যায়। এরপর বাড়ির ভিতর অনেক কাজ করানো হয়েছে কিন্তু সে লাস্টার খুঁজে পাওয়া যায় নি। অর্পিতার আত্মা এখনো সেই বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। এটাই ছিল বাবা পুরো কাহিনী।
- দাদু আমি বুঝতে পেরেছি অর্পিতা লাশটা কোথায় আছে। অর্পিতার লাশটা ওই দরজার পিছনেই আছে। এবং আমি হান্ডেট পার্সেন্ট সিওর। এত বছরে হয়তো লাশটা নেই গুলো এখন হাড্ডি গুলো অবশিষ্ট রয়েছে বলে আমার ধারণা। রহমত পুলিশকে ডাকো এবং তুমি আমার সাথে চলো বাসায়।
এরপর আমরা ওখান থেকে বের হয়ে সোজা বাসায় চলে গেলাম রহমত কে বললাম বড় একটা হাতুড়ি আনো। রহমত তাই করল।
আমি দরজা এবং আমার রুমের দরজার মাঝখানে একটি দেয়াল ছিল সেটা আমি ভাঙ্গা শুরু করলাম। দেখলাম এর ভিতর একটি বড় রুম রয়েছে। আমি আরো ভাঙ্গা শুরু করলাম। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। এরপর পুলিশেরা দেয়াল ভাঙ্গার কাজে হাত লাগালো। আমাকে বললে সরে দাঁড়াতে। পুরো দেয়ালটা ভাঙ্গা হলো দেয়ালটা ভাঙার পরে সবাই দেখে পুরো অবাক হয়ে গেল। দেয়ালের পিছনে পুরো একটা রুম এবং সেখানে অনেক মাকড়সার জাল। এরপর তারা ভালোমতো খোঁজার পরে একটি মৃতদেহের কিছু হাড্ডি পেল। পুলিশ ভালোমতো খোঁজার পর পুরো একটি কঙ্কাল খুঁজতে সক্ষম হল। এসব দেখে মা এবং বাবার দুজনেই অনেক ভয় পেয়ে গেল। এরপর আমার বাবা না জানিয়ে আবার বদলি হওয়ার জন্য একটি দরখাস্ত করল। অন্যদিকে পুলিশ সকল হাড়গুলোকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম এ তাবিজ রেখে আর কি হবে? তাবিজটি আমি খুলে ফেলে দিলাম। এরপর ওই ডাকাতদের নামের কেসটা আবার ৬৩ বছর পর রি ওপেন হয়।
কিন্তু ডাকাত দলের সবাই এতদিনে মারা যাওয়ায় কেসটা বন্ধ হয়েছে। অর্পিতারা হিন্দু ছিল তাই অর্পিতার কঙ্কালটিকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর অনেক মাস কেটে যায় আমরাও ওই গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। আমি প্রতিদিনের মতো সকাল বেলা বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুচ্ছি।
তখন শীতল গলায় বলে উঠলো আমার কানে "ধন্যবাদ তোমাকে"।
ইশরাক আহমেদ ( রাইটার )

