Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Rinki Banik Mondal

Inspirational


3  

Rinki Banik Mondal

Inspirational


বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে

বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে

6 mins 969 6 mins 969

আজকাল নীলাদ্রিবাবুর মনটা খুব একটা ভালো থাকেনা। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন প্রায় দু'বছর হতে চলেছে। ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ভালোই আছে ওরা। বিদেশে থাকে। মাঝে মাঝে আসে দেখা করতে। সংসারটা বড় হলেও তাতে কোনো অশান্তি নেই। বড় ছেলে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরে চাকরি করে আর ছোট ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। ছোট বৌমাও আগে চাকরি করত, কিন্তু সংসারের চাপে এখন চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। বড় বৌমা সারাক্ষণ সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বড় ছেলের ঘরে দুই মেয়ে, টিয়া আর রিয়া। টিয়া জিয়োগ্রাফি অনার্স নিয়ে কলেজে পড়ছে। আর রিয়া মাধ্যমিক দেবে। ছোটজনের ঘরে একটি ছেলে, তাতান। মাত্র পাঁচ বছর বয়স।

এতকিছুর মধ্যেও স্ত্রী রমলাদেবী মারা যাওয়ার পর নীলাদ্রি বাবু কিরকম একাকিত্বে ভুগতে থাকেন। কোন কিছুরই অভাব নেই নীলাদ্রিবাবুর। বৌমারা ভালোই সংসার সামলাচ্ছে, রান্না করছে, ছেলেমেয়ে সামলাচ্ছে, সবাইকে সময়মতো খেতে দিচ্ছে। তাছাড়া বাড়িতে তো দুটো কাজের লোকও আছে। কিন্তু কোথাও যেন অবসর জীবনের কালো একটা ছায়া নীলাদ্রিবাবুকে মাঝেমধ্যেই হাতছানি দেয়।

 ------"ও দাদুভাই, দাদুভাই.. আজকে তো সান ডে, আমার স্কুল নেই। একটা গল্প শোনাও। প্লিজ দাদুভাই।"

নীলাদ্রিবাবু তো রবিবারের দিনটায় ছোট্ট নাতি তাতানের কথা শুনে খুব খুশি। ছোট্ট তাতান বয়সেই ছোট, কিন্তু ওর রোজকার রুটিন তো খুব বড়। সকালবেলায় স্কুলে চলে যায়, তারপর স্কুল থেকে এসে স্নান করে একটু কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে উঠেই তারপর টিউশন, সেখান থেকে বাড়ি এসে আবার মা'র কাছে হোমওয়ার্ক করা। রাত্রিবেলায় এসে যখন খাওয়ার টেবিলে খেতে বসে, তখন ওর ক্লান্ত চোখগুলো ভাবে কখন একটু ঘুমবে।

 ------"রবিবার তো কি হয়েছে! এখন আর দাদুর সাথে গল্প করতে হবে না। পরে করবে গল্প। এখন চলো ড্রইং ক্লাসে যেতে হবে।"

রবিবার দিনটাতেও ওর জন্য ওর মা বাবার হাঁকডাকের শেষ নেই। না আজকেও ওর ছুটি নেই। সকালে ড্রয়িং ক্লাস আছে আর বিকেলে ক্যারাটে ক্লাস। নীলাদ্রিবাবুর মনটা ক্ষণিক সময়ের জন্য নাতির সাথে গল্প করার ভবিষ্যৎ আনন্দে বিভোর হলেও তা আর হয়ে ওঠেনি।

ছোটবৌমা তো তাতানকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বড় ছেলের ঘরে মেয়ে দুটোরও একই অবস্থা। টিয়া আসে মাঝে মাঝে দাদুর ঘরে, কিন্তু সে তো অনেক স্বল্প সময়ের জন্য। কলেজে পড়ছে। তারও পড়ার খুব চাপ। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় আর বাড়িতে আসার সময় সবাই নীলাদ্রিবাবুকে একবার করে 'আসছি' আর 'এলাম' এই দুটি শব্দ বাইরে থেকে বলে সম্মোধন করে। কিন্তু কে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, তা আর নীলাদ্রিবাবুর জানা হয় না, কেউ আর ঘরে এসে বলার সময় পায়না। যতটুকু আন্দাজ করে বোঝেন ততটুকুই তার মনের শান্তি।

 ------"বড় বৌমা, এক কাপ চা দেবে?"

 ------"হ্যাঁ, বাবা। এক্ষুনি দিচ্ছি।"

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নীলাদ্রিবাবু ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের পরিবেশটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করেন। ওই যে, সেই বটগাছটা। তারও অবস্থা ঐ গাছটার মত। কিন্ত ঐ গাছটা এখনো সবাইকে ছায়া দেয়, কিন্তু উনি? নীলাদ্রিবাবু নিজেকে খুব অসহায় ভাবেন এইভেবে। আগে বটগাছের তলায় গিয়ে সবাই বসে আড্ডা জমাতো। আবার অনেকে বটগাছকে পুজো করত, পাড়ার ছেলে-মেয়েগুলো ওখানে খেলা করত। রমলাদেবী বেঁচে থাকতে পাড়ার বউ-মেয়েরা ওখানে গিয়ে সংসারে খুঁটিনাটি গল্প করে আসত। কিন্তু এখন ওই বটগাছটার তলায় কতগুলো মদ মাতালের উৎপাত হয়েছে। ওখানে মানুষের আনন্দের আশ্রয়স্থলের দরজায় তালা চাবি লেগে গেলেও, পশু পাখিগুলো ঠিক তাদের বাসস্থানটা বজায় রেখেছে। মানুষের গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টার আওয়াজ না পাওয়া গেলেও ওখানে কত পশু পাখির কলরব, চিৎকার পাওয়াই যায়।

বয়সের ভারে পায়ের বাতের ব্যথাটা খুব বেড়েছে নীলাদ্রিবাবুর, একা আর বাড়ির বাইরে বেরোতে পারেন না। কিন্তু ছেলেরা তার দেখভালের কোন অভাব রাখেনি। গাড়ি করে ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে ঠিকমতো ওষুধ কিনে দেওয়া, বাবার পছন্দের খাবার- সবই তারা সময়মতো বাড়িতে এনে হাজির করে। কিন্তু বাবার সাথে দুদণ্ড বসে কথা বলার জন্য তাদের সময়ের বড় অভাব।

 -----"বাবা আজ বিকেলে একটা ভালো জামা কাপড় পরে রেডি হয়ে থেকো।"

 -----"কেন বড় খোকা? কোথাও যেতে হবে নাকি?"

 -----"না বাবা। টিয়াকে আজ দেখতে আসছে। তুমি তো বাড়িতে সব থেকে বড়, তাই.."

 -----"ও, তা আগে বলিসনি তো? আর এত তাড়াতাড়ি মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার কি আছে?"

 -----"না বাবা। তুমি বুঝবে না, চিন্তা হয় আমার, দিনকাল যা পড়েছে!

 -----"আচ্ছা যা ভালো বুঝিস। আমি তৈরি হয়ে থাকবো।

বিশাল বড় একটা সাদা রঙের ইনোভা করে ছেলের বাড়ির লোক এসেছে টিয়াকে দেখতে। ক'দিন ধরে টিয়া নীলাদ্রিবাবুর ঘরে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দেখা করতে আসে না। আজ কত সুন্দর সেজেগুজে ও সম্বন্ধ দেখতে বসেছে। টিয়ার দিকে তাকিয়ে নীলাদ্রিবাবু বুঝতে পারেন যে টিয়ার মনটা খুব একটা ভালো নেই। যেন একরকম জোর করেই তাকে বড় বৌমা নিয়ে এসেছে। টিয়াকে দেখে ছেলের বাড়ির লোক অনেক ভালো ভালো কথাই বলল- "বেশ মিষ্টি দেখতে" , "কোন কাজ করতে হবে না", "বাড়িতে কাজের লোক ভর্তি", "পড়াশোনা করবে বিয়ের পরেও" আরো কত কি! নীলাদ্রিবাবু ওখানে শুধু নীরব শ্রোতা। ঘরের একটি কোণে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। টিয়াকে দেখতে আসা ছেলেটির নাম অনি। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। ছেলেটি যাওয়ার সময় টিয়ার ফোন নম্বরও চেয়ে নিয়ে গেল। নীলাদ্রিবাবুর কোন ভূমিকাই এখানে ছিল না। শুধু তিনি বাড়ির সব থেকে বড় মানুষ, সবার গুরুজন। যাওয়ার সময় হবু কুটুম্ব বাড়ির কয়েকজন পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করল, আর যাওয়ার সময় সেই 'আসছি' এই রোজকার শোনা শব্দটি বলে চলে গেল।

 -----"কেন তুই ওদের ফোন ধরবি না? কত ভালো ছেলে জানিস? এরকম সম্বন্ধ লাখে একটা পাওয়া যায়, বুঝলি ?"

 -----"কিন্তু মা, আমারও কিছু ভালোলাগা থাকতে পারে।"

 -----"তোর আবার ভালো লাগা কিসের? ভুলে যাস না তোর একটা বোন আছে। ওকেও তো বিয়ে দিতে হবে। তুই আর ঝামেলা করিস না।"

মা মেয়ের এই কথা শুনে নীলাদ্রিবাবু আরো জোর দিয়েই বুঝতে পারেন যে, টিয়া এই বিয়েতে রাজি নয়, কিন্তু তিনি কাকে কি বলবেন, কেউ তো উনার কোনো কথাই গুরুত্ব দেয় না।

অনি মানে ওই সম্বন্ধ দেখতে আসা ছেলেটি আজ টিয়াকে ডিনারের জন্য বাইরে নিয়ে গেছে। টিয়া যেতে চায় নি, তবে বাড়ি থেকে একরকম জোর করেই তাকে পাঠানো হয়েছে।

একদিন সকালবেলা নীলাদ্রিবাবুর বড় বৌমা, বড় ছেলে তাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে তার বাপের বাড়িতে গেছে টিয়ার বিয়ের কথা জানাতে। ছোট ছেলে অফিসে, আর ছোটবৌমা তাতানকে নিয়ে নিজের ঘরে। সেই সময় তার দাদুর ঘরে টিয়া এলো। খুব মনমরা সে।

 ------"কি হয়েছে রে মেয়ে? হঠাৎ আমার ঘরে আগমন! আজ কলেজে যাবি না?

 ------"না দাদুভাই। কি হবে আর কলেজে গিয়ে, বিয়ে করে তো অন্যদের ঘরে চলেই যাব।"

 ------"মেয়ের কথা শোনো! তা ছেলের বাড়ি থেকে তো তোকে পড়াবে বলেছে।"

 ------"হ্যাঁ, দাদুভাই। সেটাই সবাই দেখছে।"

 ------"তা তুই কি অন্য কাউকে পছন্দ করিস?"

 ------"না, দাদুভাই। সেরকম কিছু না। তবে আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। আর ওই ছেলেটাকে আমার ঠিক ভালো লাগেনা। এই দুদিন ধরে ওর সাথে মিশেই আমি বুঝে গেছি, ও আমাকে সব কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার ভালো-মন্দ বোঝার চেষ্টা করে না।"

 ------"প্রথম প্রথম এরকম মনে হয় রে দিদি। তোর ঠাম্মি যখন প্রথম এসেছিল, তখন আমাকেই লজ্জা পেতো। কোন কিছু মুখ ফুটে বলত না। আমাদের সময় তো আর বিয়ের আগে ঘোরাফেরার নিয়ম ছিল না। বিয়ের পরেই প্রেম।"

 ------"না দাদুভাই। তুমি বুঝতে পারছ না।"

দাদু, নাতনি আজ জমিয়ে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখগুলো ভাগ করে নিচ্ছে। হঠাৎ করেই কলিং বেলের আওয়াজ। টিয়া গিয়ে সদর দরজা খুলতেই দেখে অনি এসেছে।

 ------"তুমি হঠাৎ! ফোন করে বললে না তো?"

 ------"করেছিলাম আন্টিকে। বললেন উনারা বাড়িতে নেই। আমি বলিনি উনাদের আসবো। ভাবলাম সারপ্রাইজ দেব তোমাকে। আজকে তোমাকে নিয়ে একটু বেরিয়ে আসি চলো।"

 ------"না অনি, ভালো লাগছে না। আজ যাব না।"

 ------"যেতে তো তোমাকে হবেই। চলো রেডি হও তাড়াতাড়ি।"

টিয়া আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে গেল রেডি হতে। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তাকে অনির সাথে যেতে হবে।

 ------"ছাড়ো বলছি। আমার লাগছে। আমি কিন্তু চিৎকার করবো। তুমি এই ঘরে এলে কি করে?"

 ------"দুদিন পরে আমাদের তো বিয়ে হবেই। প্লিজ, এইসব ন্যাকামোগুলো আমার ভালো লাগেনা।"

নীলাদ্রিবাবু পাশের ঘর থেকে টিনার ঘরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। নিজের লাঠিটাতে ভর করে নীলাদ্রিবাবু তাড়াতাড়ি টিয়ার ঘরে গিয়ে দেখলেন অনি টিয়াকে তার লালসায় কাবু করতে ব্যস্ত। নীলাদ্রিবাবু অনির পিঠের উপর একটা সজোরে আঘাত করলেন।

 ------"এই বুড়ো, ভালো হবে না কিন্তু।"

 ------"কার ভালো হবে না, এবার একটু দেখাই যাক। বয়সের ভারে আমি বুড়ো হয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমার দায়িত্ব কর্তব্যগুলো এখনো জলাঞ্জলি দেইনি রে ছোকরা।"

 ------"কি করবি বুড়ো তুই? বাড়িতে তো কেউ নেই। আজ তোকে আর তোর নাতনিকে...."

অনির কথাটা শেষ না হতেই নীলাদ্রিবাবু তার বুড়ো বয়সের শেষ সম্বল লাঠিটা দিয়ে অনির কপালে আরেকটা সজোরে আঘাত করলেন। অনির কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে। এত চেঁচামেচি শুনে নীলাদ্রিবাবুর ছোট বৌমা আর ছোট্ট তাতানও ঘর থেকে ছুটে এসেছে। ওদের সবাইকে দেখে অনি দৌড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। টিয়া তার দাদুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে, ছোট বৌমা কিছু বলার আগেই তাতান মায়ের হাত ছেড়ে দাদুর ঘরের জানালার দিকে গিয়ে বলল- "মাম্মাম, বাইরে তাকাও, ঐ বটগাছটাকে কতগুলো আন্টি পুজো করছে। ঠাকুরমশাই মন্ত্র পড়ছে।"

বাড়ির ভেতরেও ভেসে এলো সেই মন্ত্র-

 "আয়ু প্রজা ধন ধ্যান্য সৌভাগ্য সর্বসম্পদম্। 

 দেহি দেব মহাবৃক্ষ ত্বামহ শরন গতঃ।। 

 বিশ্বাস বিশ্বেশরায় বিশ্বসম্ভবায় বিশ্বপতয়ে গোবিন্দায় নমো নমঃ।"


Rate this content
Log in

More bengali story from Rinki Banik Mondal

Similar bengali story from Inspirational