Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

SUBHAM MONDAL

Drama


5.0  

SUBHAM MONDAL

Drama


ভ্যম্পায়ার রহস্য

ভ্যম্পায়ার রহস্য

15 mins 1.2K 15 mins 1.2K

শিবু দার দোকানের বেঞ্চে বসে সবে গরম মটর ডালে কচুরি ডুবিয়ে এক কামড় দিয়েছি, এমন সময় ফোন টা গাক গ্যাক করে বাজতে শুরু করলো। ফতুয়ার পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে দেখি অনীশ কল করছে। ধুর গাধা টার বাড়িতে গিয়েও শান্তি নেই নাকি, এখন আবার ফোন করছে কেন? ধরলাম না ফোন টা, পাশে রেখে দিলাম। রোববারের সকাল শান্তি করে ডাল কচুরি খাই,তারপর দেখছি। আবার গাধা টা ফোন করছে, মরুক গে যাক,আমি আগে খাই তারপর কথা বলবো। অবশ্য ও বাড়ি যেতে সুবিধা ই হয়েছে, মেসের ছোটো ঘরে একা হাত পা ছড়িয়ে কদিন রাজত্ব করতে পারছি।

কচুরি খেয়ে উঠে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে শিবু দাকে বললাম - শিবু দা খাতায় লিখে নাও, আর এক বান্ডিল বিড়ি দাও। 

-আবির ভাই, তোমার আগের মাসের কিন্তু বাকি আছে এখনো পাঁচশো....

- "এই শিবু দা কি এরকম পর পর করে কথা বলো বলতো? তোমার টাকা কোনোদিন কি পাও নি? বেকার ছেলে পিলে জানোই তো? ঠিক আছে দাড়াও বিকেলে দিয়ে যাচ্ছি।" আমাদের শিবু দার আর যাই হোক মন কিন্তু গন্ধমাদন পাহাড়ের থেকেও বড়, আর সঠিক সময় সঠিক সেন্টিমেন্টের ডোজ টা কোথায় দিতে হয় তা আমি ভালো করেই জানি।

শিবু দা মুখ কাচু মাচু করে বলে - আহ্ সেটা বললাম নাকি, তোমরা আমার কাছে কত্ত বছর খাচ্ছ। ঠিক আছে বাবা বিড়ির বান্ডিল ধরো, তোমার যখন সুবিধা দিও।

শিবু দার দোকান থেকে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে, মেসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম, এই যাহ ভুলেই গেছিলাম, গাধা টাকে কল করি একবার। সেই থেকে কল করেই যাচ্ছে। ফোন টা আনলক করে অনীশ কে কল করলাম। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ও রিসিভ করল,ভেবেছিলাম ঝাঁঝিয়ে উঠবে, উল্টে দেখলাম জলে ভিজেনো চিড়ে এর মত গলার স্বর মিইয়ে গেছে,

-হ্যালো, আবির, কি করছিস ভাই?

-এই তো গিলছিলাম,তুই এতবার ফোন করছিস কেন?

- আর বলিস না ভাই গত তিনদিন ধরে বাড়িতে মানে গ্রামে অদ্ভুত কাণ্ড কারখানা হচ্ছে, কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না, ভাবলাম তোকে ফোন করি।

- মানে কি হচ্ছে?? আর আমিই বা কি করবো?

-শোন না আমার মনে হচ্ছে গ্রামে ভ্যাম্পায়ারের উপদ্রব হয়েছে। অনেক কিছু হয়েছে এই কদিনে।

- শোন গাধা তোকে বারবার বারণ করেছিলাম ওইসব দিনরাত গথিক নভেল আর ডার্ক ফিকশন না পড়তে...

- ধুর তুই আয়ে ভাই , না এলে বোঝানো যাবে না...

-বলছিস? যাই ঘুরেই আসি , অবশ্য কাকিমার হাতের পাতুরি আর তোদের গ্রামের ওই নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সিগ্রেট খাওয়া আলাদাই এক্সপিরিয়েন্স।

-তাহলে আজই চলে আয়ে, শিয়ালদা থেকে ১২.৪০ এ লালগোলা আছে ওটা ধরেই চলে আয়ে। আমি স্টেশন এ থাকবো। ট্রেন ওই সাড়ে ছয়টা নাগাদ ঢুকবে কৃষ্ণ পুর। ওখান থেকে বাসে আবার ১ ঘণ্টা লাগবে আমাদের গ্রাম বল্লভপুর। তোর মনে আছে নিশ্চই।

-ঠিক আছে চল সন্ধ্যেবেলা দেখা হচ্ছে।

      

      *******************


শেয়ালদা থেকে ট্রেনে উঠে একটা ভাতঘুম দিয়ে নিয়েছিলাম। যখন চোখ খুললাম তখন প্রায় সাড়ে তিনটা, ট্রেন ধুবুলিয়া ছাড়ছে। উল্টোদিকে চোখ পড়তেই দেখলাম বেশ সুন্দরী একটা মেয়ে ঠিক আমার উল্টো দিকে বসে আছে। আমার পক্ষে দৃশ্য টা সুখকর হলেও তার জন্য একেবারেই নয়, আমার উস্কো খুস্কো চুল, মুখে পনের দিনের না কাটা দাড়ি। বহরমপুর পর্যন্ত সেই মেয়েটিকে আড়চোখে দেখে আর বাকি রাটা জানলার হাওয়া খেতে খেতে যখন কৃষ্ণপুর নামলাম তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে , প্ল্যাটফর্মে নেমেই দেখলাম অনীশ দাঁড়িয়ে আছে।

-কি রে শালা, এত ফাটছে কেন তোর?? আর কি ভ্যাম্পায়ার ? সত্যি তোর কাছ থেকে এইসব আজগুবি আশা করিনি।

-শোন আবির , ইয়ার্কি মারিস না। গ্রামে চল। গেলেই বুঝতে পারবি। চল বাসে যেতে যেতে বাকি টা তোকে বলছি।

বাসে জানলার ধারে দুটো সিট দখল করে বসে অনীশ তার গল্প শুরু করলো,

তুই তো জানিস, আমাদের পূর্বপুরুষ এই গ্রামের জমিদার ছিলেন, তাদের প্রতিপত্তি বা বিত্ত কানাকড়িও কিছু অবশিষ্ট নেই আজ, শুধু কিছু জমি আর ওই দেখার মত মস্ত বাড়ি টা পড়ে আছে। আমাদের ফ্যামিলি অনেক বড়, বিভিন্ন তুত সম্পর্কের আত্মীয় রা নিজেদের মতো ভাগাভাগি করে বাড়িতে বাস করে, কেউ বা পাশে বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। এইরকম ই এক জ্যাঠামশাই হলেন কানু জ্যাঠা। সম্পর্কে তিনি আমার বাবার জেঠতুত ভাই। তো বেশ ইন্টারেস্টিং ভদ্রলোক জানিস। যুবক বয়েসে সারা ভারত চষে খেয়েচেন। বিভিন্ন রকমের কাজের সুবাদে প্রচুর ঘুরেছেন আর তাছাড়া ইতিহাস সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্য। তবে সবথেকে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো ভদ্রলোক হলেন গল্পের খনি, তুই তো জানিস আমি গল্পের পোকা, তো এইরকম একটা মানুষ কে কাল্টিভেট করে না থাকা যায় বল?? আমি যখনই আসি রোজ সন্ধ্যেবেলা ওঁর কাছে গল্প শুনতে যাই। যথারীতি সেদিন বাড়ি ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম কানু জ্যাঠার কাছে। আমাকে অনেকদিন পর দেখে জ্যাঠা ও খুশি, বললেন - শোন অনীশ ,আজ আর অন্য কোনো গল্প শোনাবো না,আজ তোকে শোনাবো আমাদের এই বল্লভপুর এর ঘটনা যেটার সাথে আমাদের বাড়ির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। বলেই পকেট থেকে বিড়ি ধরিয়ে জ্যাঠা শুরু করলেন,

- আমাদের বাড়ির ইতিহাস তো তুই জানিস, এই জমিদারি চলে আসছে সেই সিরাজউদ্দৌলার আমল থেকে। আমাদের পরিবারের পূর্বপুরুষ বলরাম সেন সেই সময় নামকরা বৈদ্য ছিলেন। তো সেই সময় আলীবর্দী খানের হারেমে থাকা...আচ্ছা হারেম মানে জানিস তো??

হারেম হলো নওয়াব দের প্রাসাদে থাকা তাদের বাড়ির নারী, পত্নী , বা উপপত্নী দের জন্য ঠিক করে দেওয়া প্রাসাদের আলাদা অংশ । যদিওনওয়াব আলীবর্দী ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন, তার মদ ও নারী তে আসক্তি অন্য নওয়াব দের থেকে কম ছিল। যাইহোক সেই হারেমে থাকা আলীবর্দীখাঁর এক উপপত্নী এর খুব অসুখ হয়, বহু দেশ বিদেশের রজবৈদ্য যেটা সারাতে অসমর্থ হন, শেষ পর্যন্ত বলরাম সেন তাকে সুস্থ করে তোলেন। খুশি হয়ে দক্ষিনা স্বরূপ নবাব এই গ্রামের জমিদারি বলরাম সেন কে দেন, সেই থেকে শুরু আমাদের প্রতিপত্তি। যাই হোক যে ঘটনাটা বলবো সেটা এত পুরনো না, এই ঘটনা টা হলো একদম উনবিংশ শতকের  মাঝামাঝি দিকে, তখন সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলেরা উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বিদেশ যাচ্ছেন, "কালা পানি" পার হয়ে। দর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার বিরাজ মোহন সেন ডাক্তারি পড়ানোর জন্য একমাত্র ছেলে সরোজ মোহন কে বিদেশে পাঠানোর একদমই পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু সরোজ মোহন ছিলেন আধুনিক শিক্ষা তে শিক্ষিত, সেই সময়ে বাংলা তে ঢেউ তুলছে ডিরোজিও এর ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট,ব্রাহ্ম সমাজ ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদে তাকে বিদেশ পাঠাতে বাধ্য হলেন বিরাজ মোহন।সরোজ মোহন ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল মেডিক্যাল স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। সেই সময় তার আলাপ হয় মার্থা নামের একজন মহিলার সাথে, সরোজ মোহন মার্থার প্রেমে পড়েন ও তাকে বিয়ে করেন। কিন্তু এই মার্থা কোনো সাধারণ নারী ছিলেন না তিনি ছিলেন বিভিন্ন তন্ত্র ও ব্ল্যাক ম্যাজিকে সিদ্ধহস্ত, তার সংস্রবে সরোজ মোহন ও ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে অভ্যেস শুরু করেন, এবং অল্প সময়ে বেশ পটু হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই সময়েই তার জীবনে চরম দুর্দিন ঘনিয়ে আসে, সন্তান সম্ভবা মার্থা প্রসবের সময় মারা যান, এবং সদ্যজাত শিশু টিও মারা যায়। এর বছর খানেক পর সরোজ মোহন সব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। বিরাজ মোহন তখন মৃত্যু শয্যায়।কিন্তু অবাধ্য ছেলে কে আপন করে নিতে বা তার সাথে বাড়ির সম্পর্ক রাখতে তিনি অস্বীকার করেন। সরোজ মোহনের জায়গা হয় বাড়ির নিচের তলার কোণের একটি ঘরে। 

এতদূর বলে একটু নিশ্বাস নেওয়ার জন্য থামেন কানু জ্যাঠা , আমাকে বলেন, ওই যে পশ্চিম দিকের যে ঘর টা তালা বন্ধ করা থাকে, ওটা দেখেছিস তো?? ওটাই কিন্তু সরোজ মোহনের ঘর ছিল?


- ওই ঘরে তো ছোটো থেকে মা আমাকে কোনোদিন ও ঢুকতে দিত না। 

- শুধু তোকে না, বাড়ির কোনো বাচ্চা কেই ঢুকতে দেওয়া হয় না, এমনকি বড়রাও কেউ ঢোকে না। তবে সত্যি কথা বলবো? তোকেই বলছি ওই ঘরে আমি একা দুবার রাত কাটিয়েছি লুকিয়ে চাবি খুলে, কিছু অস্বস্তিকর একটা উপস্থিতি অনুভব করেছিলাম কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে কিছু দেখিনি। যাইহোক যেটা বলছিলাম, শোনা যায় , এই সময় মাঝে মধ্যেই গ্রামের গবাদি পশু , ছাগল , গরু, হাঁস , মুরগি এসব মরতে শুরু করে। আশ্চর্য জনক ভাবে তাদের সবার গলার নালী কাটা থাকতো। সরোজ মোহন ও এই সময় থেকে আস্তে আস্তে বাড়িতে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন। নিশুত রাতে অনেকে তাকে গ্রামে, নদীর ধারে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল তিনি রাতে নিজেকে ভ্যাম্পায়ারের রূপান্তরিত করে এইসব কাজ করতেন। যদিও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় নি।তবে যেদিন সরোজ মোহন মারা যান সেদিন তার ঘরে কিছু মরা বাদুড় পাওয়া গেছিল, আর নিথর সরোজ মোহনের ঠোঁটে নাকি তখনও লেগে ছিল রক্ত। এখনো নাকি মাঝে মধ্যেই সরোজ মোহন কে দেখা যায়, এই আমাদের আম বাগানে তারপর নদীর ধারে, সব এই গ্রাম্য লোকেদের কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।


অনীশ থামে, আমার দিকে চোখ তুলে বলে ,কানু জ্যাঠা র এই গল্প শোনার পর আমার তেমন কিছু মনে হয়নি জানিস, কিন্তু খটকা লাগে ফেরার সময়। আমাদের আর কানু জ্যাঠদের বাড়ির মাঝে একটা আমবাগান পড়ে, সেটা দিয়ে আসার সময় আমার কেবলই মনে হতে থাকে যে কেউ আমার পিছু নিয়েছে, হটাৎ পেছন ফিরতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই একজন আমগাছের আড়ালে চলে গেল। তারপর আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়ি, এই কথাটা আর লজ্জায় কাউকে জানায় নি।  পরদিন সকালে উঠে শুনি যে বাদল ঘোষের একটা দুধেলা গাই নাকি গলা কাটা অবস্থায় পড়ে ছিল। সকালে বাদল ঘোষ গোয়াল ঘরে গিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে পায়। আমি সেই শুনে দেখতে যাই ,কিন্তু এত বিভৎস দৃশ্য, একটা গরু গলা কাটা অবস্থায় পড়ে আছে,আমার সেই দৃশ্য দেখে এতটাই অস্বস্তি হয় আমি বাড়ি ফিরে আসি, এসে আমার শরীর অসুস্থ হয়ে যায়, কয়েকবার বমি করি। সেই রাতে অবশ্য অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু কাল রাতে যা ঘটেছে সেটা..- কি হয়েছে কাল রাতে?

-কাল রাতে খাওয়া র পর বোন ছাদে পায়চারি করছিল আর হেডফোনে গান শুনছিল। এমন সময় পেছন থেকে কেউ ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ে ওর ঘাড়ের কাছে কামড়ে ধরে, ও খুব জোরে চিৎকার করে অজ্ঞান হয় যায়। সবাই নিচে থেকে ছুটে আসে। জ্ঞান হওয়ার পর ওকে আমরা জিজ্ঞেস করি ও বলে ও নাকি কাউকে দেখতে পায়নি। কিন্তু ভয়ে খুব দূর্বল হয়ে পড়েছে, ঘাড়ের কামড় টা খুব সাংঘাতিক না হলেও বেশ দাঁতের দাগ বসে আছে। মা ও খুব টেনশন করছে জানিস।

- হুম, খটকা তো আছেই।

- কি খটকা? বুঝলাম না।

-আচ্ছা কানু জ্যাঠা এসেছিল কাল তোর বোনের ওরকম হওয়ার পর? 

- কাল আসেনি, আজ সকালে এসে দেখে গেছিলেন।

- হুম, আর শোন আমি তোর ঘরে একসাথে থাকবো না, ওই সরোজ মোহনের পাশাপাশি কোনো ঘর আছে? সেখানে ব্যবস্থা করিস।

- কি বলছিস? কি সব হচ্ছে শুনলি না। তুই একা একা ওই ঘরের পাশে থাকবি?

- যা বললাম সেটা কর না।

- আচ্ছা চল, এসে গেছি। বাস থেকে নামতে হবে এবার।

    

         *********************


অনীশ দের বাড়িটা তে ঢোকার আগে একটা আমবাগান পড়ে,আমবাগান এর শুরুতে এসেই বা হাতে চোখে পড়লো একটা একতলা পাকা বাড়ি। বেশি পুরনো নয়। 

-অনীশ এটাই তোর কানু জ্যাঠার বাড়ি তো??

- হ্যা রে।

- চল, ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করে আসি।

- ঠিক আছে চল।

অনীশ বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁক দিল, জ্যাঠা মশাই বাড়ি আছ নাকি?

ভেতরে থেকে আওয়াজ এলো, কে বাবা? চলে আয়ে সামনের ঘরেই আছি।

সামনের ঘরের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো, চৌকির উপর এক শীর্ণকায় ভদ্রলোক বসে আছেন, সামনে একটা টিমটিমে হ্যারিকেন ...জ্বলছে।

-ও অনীশ, আয় বোস। সাথে কি বন্ধু নাকি? যার আসার কথা ছিল?

- হ্যা জ্যাঠামশাই ও আবির ,আমরা মেসে একসাথে থাকি, আবির উনি হচ্ছে জ্যাঠামশাই।

আমি কানু জ্যাঠা কে প্রণাম করতে গেলাম, প্রথমেই চোখ পড়লো তার পায়ের নখের দিকে, কি বিশ্রী বড়ো নখ কতদিন কাটেন না আর পরিষ্কার করেন না কে জানে।

- হ্যা বাবা ,থাক থাক বসো, সেই সন্ধ্যে থেকে লোডশেডিং , অবশ্য আমার অন্ধকার ই বেশি ভালো লাগে।

- অন্ধকার ভালো লাগে কেন? আমি বললাম।

- অন্ধকারের আলাদা একটা শান্তি আছে, মন স্থির করা যায়, আলোতে সেই ব্যাপার টা নেই। তাছাড়া এই বিজলী বাতি এসে সেই সন্ধ্যের মোহময় পরিবেশ টাই নষ্ট করে দিয়েছে।

- আচ্ছা জ্যাঠা মশাই আপনার কি মনে হয়? এগুলো যে হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো কেন ঘটছে? মানে আপনার কি ধারণা?

- আমি যদি বুঝতে পারতাম তাহলে তো বলেই দিতাম, তবে আমার মনে হয় অপ্রাকৃত কিছুর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে।

- আমার কিন্তু তা মনে হয় না। বেশ গম্ভীরভাবে কথা টা বললাম। 

- তো বেশ তো চেষ্টা করেই দেখ, বের করতে পারো কিনা? এই রহস্যের সমাধান।

ফিরে আসার সময় একবার পেছন ফিরে তাকালাম, কানু জ্যাঠা তখন ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। ভদ্রলোকের চোখের মণি হ্যারিকেন এর আলোতে চক চক করছে। অনীশ দের বাড়িতে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে অনীশের ঘরে বসলাম, কাকীমা খুবই সাদাসিধা মানুষ আমার সামনে এসে চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, - দেখ বাবা, কি হল বলত? সবই ঠিকঠাক ছিল। হটাৎ কি শুরু হলো? আমার মেয়েটার সাথে...

-কাকীমা আপনি চিন্তা করবেন না। রিয়া কেমন আছে এখন? 

-ওই তো বাবা নিজের ঘরে শুয়ে আছে, হালকা জ্বর আছে, শরীর ও দুর্বল...

-চলুন ওকে দেখে আসি।

অনীশ এর বোন রিয়া কে দেখেছিলাম বছর দুয়েক আগে যখন প্রথম ওদের বাড়িতে এসেছিলাম। তখন ও সবে উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছিল। বেশ প্রাণোচ্ছল স্বতস্ফূর্ত মেয়ে। ঘরে যখন ঢুকলাম দেখলাম রিয়া চুপ করে শুয়ে আছে, চোখের কোণে কালি, বেশ দূর্বল দেখাচ্ছে ওকে। আমাকে দেখে বললো - কেমন আছো আবির দা?

- ভালো আছি। তোর শরীর এখন কেমন?

-আগের থেকে ভালো।

-আচ্ছা শোন তোকে কটা কথা জিজ্ঞেস করবো। ভালো করে মনে করে উত্তর দিবি।

- হ্যা বলো।

- তুই কি রোজই খাওয়ার পর ছাদে যাস??

- হ্যা, রোজই যাই, একটু গান শুনি, পায়চারি করি, তারপর চলে আসি।

- আচ্ছা, এটা বাড়ির সবাই জানে তাই তো?

- হ্যা।

-আচ্ছা ছাদে যখন ঘটনাটা ঘটলো, কিছু দেখতে পেয়েছিলি?

- না পুরো টা এত টাই আচমকা হয়েছিল, আমি কিছুই দেখতে পায়নি।

- আচ্ছা অনীশ, ওর চিৎকার পেয়ে প্রথম কে গেছিল? ছাদে? তুই?

- না হারু কাকা গেছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ ঘুম ভেঙে শুনি এইসব হয়েছে।

- হুম, ঠিক আছে রিয়া তুই ঘুমা। অনীশ চল। খেয়ে নিই।


             *******************


রাতে খাওয়া এর পর নিচের তলায় পশ্চিমের বারান্দার আমার ঘরের দিকে শুতে এলাম। একদম সরোজ মোহন এর পাশের ঘরটাই আমাকে দেওয়া হয়েছে।অনীশ আমাকে ঘরে দিতে এসেছিল, ঘরের সামনে দাড়িয়ে আমার চোখ গেলো সরোজ মোহনের ঘরের দিকে, দরজা জানলা বন্ধ করে তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থাকা একটা ঘর। আমি এক নজর ঘরের দিকে তাকিয়ে আমার ঘরে ঢুকলাম,এই ঘরটা বোধ হয় বন্ধই থাকে, আমি থাকবো বলেছি বলে তাড়াহুড়ো করে পরিষ্কার করা হয়েছে, খাটে একটা নতুন চাদর পাতা, ধুপ জ্বালিয়ে দেওয়া তে ঘরের পুরনো ভ্যাপসা আর ধূপের গন্ধ মিলিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোচ্ছে। রাতে খাওয়া র জন্য এক বোতল জল ও দেওয়া আছে দেখলাম। আমি ভেতরেঢুকে খাটের পাশের জানালাটা খুলে দিলাম। দুদিন পরেই পূর্ণিমা, বাইরে টা চাঁদের আলো তে বেশ চকচক করছে। লোডশেডিং থাকার কারণে পূর্ণিমার রূপ বোধহয় আরো খুলেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাড়ির পেছনের ছোটো বাগান। অনীশ হাতের হ্যারিকেন টা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললো - তোকে বললাম বার বার, এখানে থাকিস না ,শুনবি না তো আমার কথা। যাক গে টর্চ টা রাখ, আর ফোন তো থাকলো, অসুবিধা হলে ফোন করিস। আমার ঘুম পাচ্ছে যাই।

-ঠিক আছে যা।

অনীশ বেরিয়ে যেতে আমি একটা বিড়ি ধরিয়ে খাটে বসলাম, জানলা দিয়ে বাইরে চাঁদের আলো দেখতে দারুন লাগছে, এই সুন্দর পরিবেশের মধ্যেই কোনো এক হিংস্র শ্বাপদ ওত পেতে অপেক্ষা করছে শিকারের জন্য এটা ভাবতেও অবাক লাগে।আমি ধোয়ার রিং ছাড়তে ছাড়তে ভাবছিলাম, হিসেব ঠিক মিলছে না। এতদিন পর্যন্ত সব চুপ ছিল হটাৎ এখনই কেনো শুরু হলো এই ঘটনা, সরোজ মোহন কি হাইবেরনেশন এ ছিলেন নাকি? কানু জ্যাঠা কেন ওইরকম বাড়িতে একা একা থাকেন ,তিনি নাকি সরোজ মোহনের ঘরে আগে রাত ও কাটিয়েছেন, তার ভয় লাগে না কেন?

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শুয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে, বারান্দা তে পাশের ঘরের দরজা তে খুটখাট শব্দ হচ্ছে,যেন কেউ তালা খোলার চেষ্টা করছে। আমি বালিশের পাস থেকে ফোন টা আনলক করে দেখি ১.১৩ বাজে। আসতে আসতে খাট থেকে নেমে পা টিপে টিপে দরজার কাছে গেলাম, দরজা খুলতে গিয়ে ছিটকিনি টা পড়ে গিয়ে খট করে একটু শব্দ হলো, আমি সঙ্গে সঙ্গে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বেরোলাম। একটা ছায়ামূর্তি কে সঙ্গে সঙ্গে বারান্দা থেকে নেমে পিছনের আমবাগানের দিকে চলে যেতে দেখলাম। আমার মনে ততক্ষণে বিপদের ঘণ্টাধ্বনি বাজা শুরু হয়ে গেছে আমি তাড়াতাড়ি করে, ছায়ামূর্তির পিছু নিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে গেলাম, বাইরে থেকে বাগান টা আলোকিত দেখাচ্ছিল, ভেতর টা মোটেও সেরকম না, আমি আলো আঁধারি তে ছায়ামূর্তি কে হারিয়ে ফেললাম। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ভাবছি কোনদিকে যাব। এমন সময় বাগানের কিছু দূর থেকে তীব্র চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো। আমি চিৎকার লক্ষ্য করে ছুটে গেলাম, গিয়ে দেখি একজন লোক প্রাণপণে হাত পা নাড়াচ্ছে আর একটা মানুষ মাথা নিচু করে তার ঘাড় কামড়ে ধরেছে, আমি অন্ধকারে কারোর মুখ দেখতে না পেলেও, কি হচ্ছে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। ছুটে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,

- অনীশ ছাড়।

তারপর সর্বশক্তি দিয়ে অনীশ কে ছড়ানোর জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করলাম, সে কি পাশবিক শক্তি তার গায়ে, শেষ পর্যন্ত নিজের সব শক্তি এক করে অনীশ এর ঘাড়ের শিরা বরাবর একটা কিল মারলাম, অনীশ অজ্ঞান হয়ে পাশে পড়ে গেলো। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এসেছিল। টর্চ জ্বালিয়ে তারা দেখল আমার এক পাশে অনীশ আর এক পাশে কানু জ্যাঠা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ।

       

    **********************


কথা হচ্ছিল অনীশ দের বসবার ঘরে, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, জানলা দিয়ে পুবের আলো ঘরে এসে ঢুকছে, চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে সেই দিকে তাকালে রাতের ঘটনাটা নিতান্ত কল্পনা বলে মনে হয়। আমার সাথে বসেছিলেন, অনীশ এর কাকা, ওর বোন রিয়া আর ইন্সপেক্টর সাহেব। ইন্সপেক্টর সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন,

- ওয়েল ডান, ইয়াং ম্যান, তুমি ছিলে বলে ভদ্রলোক প্রাণে বেঁচে গেলেন। 

- হ্যা আমি জানতাম ঠিক এরকম কিছু একটা ঘটবে।

- তুমি কি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলে যে অনীশ ই এর পিছনে আছে?

- প্রথমে বলি অনীশ এর এতে কোনো দোষ নেই, এই কাণ্ড টা ঘটিয়েছে সরোজ মোহন।

- হোয়াট ডু ইউ মিন?

- হ্যা একদম ঠিকই শুনেছেন, অনীশ একটা জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত, যার নাম হচ্ছে ডিসোসিয়েটভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার, এই রোগে একই মানুষের মধ্যে দুই বা তার বেশি সত্ত্বার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।এই মুহূর্তে অনীশ এর মধ্যে অনীশ ছাড়াও সরোজ মোহন এর সত্ত্বা আছে, যিনি মাথা চাড়া দিলেই অনীশ এই কাজ গুলো করছে। ওর জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করে দেখবেন ও বলবে কিছুই জানি না।- ওহ ম্যাই গুড।

- ইয়েস, এবার বলি আমি কিভাবে ধরতে পারলাম, অনীশ যখন আমাকে ফোন করেছিল তখনই বুঝেছিলাম এর পিছনে কোনো মানুষ আছে, এই সব ভ্যামপায়ার এর কোনো মানে হয় না। তারপর যখন ও বাসে আসতে আসতে বললো যে ও যে রাতে কানু জ্যাঠার কাছে গল্প শুনেছে সেই রাতেই এসব শুরু হয়েছে তখন ওর ওপর প্রথম সন্দেহ হলো, কিন্তু সত্যি বলতে কানু জ্যাঠা কে প্রথম দেখে ওনার ওপর ও আমার সন্দেহ হয়েছিল। তবে রাতে নিজের ঘরে অনেক ভেবে দেখলাম কানু জ্যাঠা এই ঘটনার পেছনে থাকতে পারেন না ,কারণ এক জন ৬৫ বছরের বৃদ্ধের পক্ষে একটা গরুর গলা কাটা বা রিয়ার মত কম বয়েসি মেয়ে কে কাবু করে ফেলা এত সহজ নয়। তাহলে কে? ভূত নিশ্চয় আছে সর্ষের মধ্যেই। অনীশ আসার দিন ঘটনা শুরু হলো, পরদিন ও সারাদিন কিছু খেল না , বমি করলো, কেন করলো? মানুষ তো আর আদিমতম পর্যায়ে নেই, সময়ের সাথে তার পরিপাক তন্ত্র ও বিবর্তিত হয়েছে, যতই হজমশক্তি সম্পন্ন মানুষ হোক না কেন? গরুর কাঁচা রক্ত খেয়ে হজম করা সহজ না। তারপর যখন রিয়ার উপর আক্রমণ হলো তখন কিন্তু অনীশ ছিল না, ও বলেছে ও ঘুমাচ্ছিল, আসলে তখন অনীশ সত্ত্বা ঘুমিয়ে ছিল, জেগে ছিল সরোজ মোহন, চেঁচামেচি শুনে সম্ভবত ও পালিয়ে নিজের ঘরে এসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তারপর উঠে দেখে এরকম হয়েছে, আগের কোনো কথাই তার মনে থাকে না। তারপর রাতে অনীশ হয়তো আমার উপর ই আক্রমণ করতো, সে কোনো কারণে বাগানে ঘুরছিল বা ওত পেতেছিল। কিন্তু বাদ সাধলেন কানু জ্যাঠা, ভদ্রলোকের খুব সাহস এবং আমার মত তিনিও ধরতে পেরেছিলেন এর পেছনে কোনো মানুষ আছে। তাই নিজেই তদন্ত করতে এসেছিলেন লুকিয়ে আসল কে আছে ধরার জন্য। কিন্তু আমার দরজা খোলার শব্দে লুকাতে গিয়ে বাগানের দিকে গেলেন আর অনিশের হতে পড়লেন। আসলে অনীশ ছোটো থেকে ই এসব গথিক ফিকশন এর ভক্ত , ওর সাব কন্সিয়াস মস্তিষ্কে এর একটা এফেক্ট পড়েছিল, তার সাথে যোগ দিয়েছিল কানু জ্যাঠার গল্প। তবে যেটা মূল কারণ সেটা আমি জেনেছি এই বাড়ির হারু কাকার সাথে কথা বলে, যেটা রিয়া বা কাকীমা কেউ আমাকে বলেন নি। সেটা হলো অনীশ যখন ছোটো ছিল পাড়ার কোনো এক মদ্যপ কালীপূজার রাতে এতার যৌনতা নিবৃত্তি করতে চেয়েছিল অনীশ এর উপর। সেই ভীষণ ঘটনার ছাপ অনীশ এর মনে থেকে গেছে, সাধারণত এই সব কেসে বিকৃত অভিজ্ঞতা, বা কোনো ভয়াবহ ঘটনা সুপ্ত অনুঘটকের কাজ করে। যাই হোক ইন্সপেক্টর স্যার আপনার কাছে একটা অনুরোধ ছিল।

- হ্যা বলো।

- অনীশ কিন্তু ওর ফ্যামিলির বাইরে কারোর ক্ষতি করেনি, ওর ফ্যামিলির কেউ ওর উপর চার্জ আনতে চায় না। কানু জ্যাঠা এখন সুস্থ আছেন, হাসপাতালে ওনার জ্ঞান হয়েছিল ওনার সাথে আমি কথা বলেছি, আর থাকলো মরা গরুর কথা তার ক্ষতিপূরণ অনীশ দের বাড়ি থেকে দিয়ে দেওয়া হবে। অনীশ এর কাধে অনেক দাইত্ব স্যার। রিয়া ,কাকিমা ওদের কথা ভেবে আপনি ক্রিমিনাল চার্জ আনবেন না , অনীশ এর এখন চিকিৎসার দরকার, এই মুহূর্তে ওর মানসিক শান্তির প্রয়োজন খুব।

- অনীশ এর বাবা আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। এই অনুরোধ টা না করলেও আমি রাখতাম।

- থ্যাংক ইউ স্যার।

দেখলাম রিয়া জল ছল ছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে,

- দাদা ভালো হয়ে যাবে তো আবির দা?

- হ্যা রে পাগলী ভালো হয়ে যাবে, আমি তো আছি, তুই আরেক কাপ চা বল।

          

**********************

 

 


Rate this content
Log in

More bengali story from SUBHAM MONDAL

Similar bengali story from Drama