Rinki Banik Mondal

Inspirational


2  

Rinki Banik Mondal

Inspirational


বাড়িয়ে দাও তোমার হাত

বাড়িয়ে দাও তোমার হাত

5 mins 983 5 mins 983

আজ সকাল সকাল মৃণাল আর জবার মধ্যে আবার তুমুল ঝগড়া শুরু হয়েছে গতকাল রাত্রে মৃণালের ফোনে একটি মেসেজ আসা নিয়ে। জবার মৃণালের ওপর রাগ করাটা অবশ্য ভুল কিছু নয়। কারণ বিয়ের দু বছর যেতে না যেতেই মৃণালের আচরণে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে জবা। যেমন কথা কম বলা, রাত্রে বাড়ি না ফেরা। আর এই নিয়েই ঝগড়ার সূত্রপাত। দাম্পত্য জীবনের চার বছর হতে চলেছে কিন্তু তবুও মৃণালের কোন পরিবর্তন নেই। কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে ও।

জবা সেটা বুঝতে পেরেছে। আড়ালে ফোনে কথা বলা, সারাদিন ফোনে মেসেজ আসছে। এই সবের জন্যই আজ আবার ওদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়েছে। গতকাল রাত্রে যে রাজন নামে সেভ করা নম্বরটা থেকে ফোনে এসএমএস এসেছিল সেই নম্বরে ডায়াল করে জবা আজ সকালে দেখেছে ওটা একটা মেয়ের নম্বর। আর যে ভাষায় এসএমএস গুলোতে মৃণাল আর ঐ নম্বরে কথা হয়েছে তাতে আর জবার আর কিছু বুঝতে বাকি নেই।প্রত্যেকদিনই ওদের মধ্যে কিছু না কিছু নিয়ে অশান্তি। জবা কিছুতেই আর মানিয়ে চলতে পারছে না। টাকাপয়সা খাওয়া-দাওয়া কোন কিছুরই অভাব নেই এই ছোট্ট সংসারে, শুধু সুখ ব্যতীত। আর প্রত্যেকদিনের ওদের এই ঝগড়ার মাঝে ভুগছিল ওদের ছোট্ট মেয়ে পরী। একদিন তো নেশা করে মৃণাল জবাকে গায়ে হাত তুলতেও গিয়েছিল সেটাও ওই ছোট্ট পরীর চোখের সামনে।

তিন বছরের ওই ছোট্ট শিশুটা সারাক্ষণ ভয়ে থাকে, এই বুঝি তার মাম্মাম পাপার আবার ঝগড়া শুরু হলো এই নিয়ে। ওই ছোট্ট মনটা কি চায় তা যে কেউ বোঝে না। জবা অনেকবার ভেবেছে মৃণালকে ডিভোর্স দিয়ে নিজের মতো করে আবার জীবন শুরু করবে পরীকে নিয়ে। মৃণাল মুখে কোনোদিন না বললেও ও তাই'ই চায়। আর ওর মুখে বলতে কতক্ষণ! জবা ওর মা বাবার একমাত্র সন্তান। নিজে দেখে বিয়ে করেছিল মৃণালকে বাড়ির আপত্তি সত্ত্বেও।

বড় বিশ্বাস করেছিল যে ও মৃণালকে। কিন্তু মৃণাল যে এরকম পাল্টে যাবে তা ও ভাবতেই পারেনি। ওর এখন কি করা উচিত ও জানে না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় ওর। অসহায় মনে করার যথেষ্ট কারণও যে রয়েছে। ওই তো সেদিন জবা তার বাপের বাড়ি গিয়ে বাবাকে যখন বলল মৃণালকে ডিভোর্স দিতে চায় ঠিক তখনই জবার বাবা বললেন-

-------"নিজেই তো দেখেশুনে বিয়েটা করেছিলে, প্রথমেই মানা করেছিলাম আমরা। এটা তো আর খেলাখেলি ব্যাপার নয়। আর তুমি যে বিচ্ছেদের কথা বলছ, তোমাদের বিচ্ছেদ হলে তুমি থাকবে কোথায়? আর তোমার ওই ছোট বাচ্চাটার কি হবে?"

-------"কেন বাবা এই বাড়িতে থাকবো। একটা চাকরি ঠিক জোগাড় করে নেবো।"

------এ বাড়িতে থাকবে বললেই তো আর হলো না। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কি বলবে? আমাদের তো একটা আত্মসম্মান আছে নাকি! আর এখন তো তুমি একা নয়, পরীও আছে তোমার সাথে।"

------"পরীর খরচা আমি চালাবো বাবা। তুমি শুধু একটু থাকার জায়গা দাও।"

------"খরচা দেওয়ার কথা বলো না আমায়। তুমি জানো আমার আর্থিক সামর্থ্য আছে। কিন্তু লোকে কি বলবে? এর থেকে বরং তুমি শ্বশুরবাড়িতে মানিয়ে নিয়ে থাকো। আমি মাস গেলে কিছু টাকা তোমায় লুকিয়ে দিয়ে আসবো।"

জবার বাবা তো এই বলেই খালাস। জবার মায়ের'ও একই বক্তব্য-

------"দেখ মা মেয়েদের একটু মানিয়ে গুছিয়ে চলতে হয়। তোর বাবা তো ঠিকই বলেছে, তুই যদি এখন এখানে থাকতে শুরু করিস তাহলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন বলবে যে মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে সংসার করতে পারল না।"

এত কথা শোনার পর জবা আর কথা না বাড়িয়ে আবার মৃণালের কাছে ফিরে এসেছে। মৃণালের মা মানে জবার শাশুড়ি মা ওদের কাছে না থাকলেও ফোন করে মাঝে মাঝেই জবাকে বলে সেই নাকি ছেলের মাথা'টা খাচ্ছে, তাই তার ছেলে নাকি নেশা ভান শুরু করেছে। মৃণালের সাথে জবাব আবার সেই অশান্তি চলতে থাকে। অশান্তি তো সেদিন চরমসীমায় গিয়ে পৌছালো। মৃণাল সেদিন জবাকে প্রচুর মারধর'ও করলো। জবার মত মেয়ে আর কি করবে, থানায় যেতেও ভয় পাচ্ছে একা। কোথায় যাবে ওই ছোট্ট পরীকে নিয়ে ও। জবা আর পরীর ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারের সম্মুখীন।

নিজের চোখের সামনে পরীর জীবনটা এরকম তিলে তিলে শেষ হয়ে যাক তা ও সহ্য করতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত জবা আত্মহত্যার পথটাই বেছে নেয়। ও মনে করে, ও মরে গেলে তো সংসারের ভালো-মন্দে ওর আর কোনো দায় থাকবে না। তাই ও সেটাই সহজ উপায় হিসাবে বেছে নেয়। সেদিন রাতে পরীকে পাড়িয়ে ও কতগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে চায়। মাঝ রাত্রে 'মাম্মাম, মাম্মাম' বলে পরী'র কথায় মৃণালের ঘুম ভাঙ্গে। জবাকে সাথে সাথে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। পুলিশ কেস'ও হয়।এই যাত্রায় জবা বেঁচে যায়। তবে জবার মতো এরকম কত মেয়ে নিজের অসহায়তা সহ্য করতে না পেরে মরে যায়।

আর তার জন্য দায়ী সমাজের প্রত্যেকে। অনেক সময় নিজের মা-বাবা'ও। এই ঘটনা শুনে জবার মা-বাবা আজ মেয়ের কাছে ছুটে এসেছে। যদিও ফোনটা মৃণাল'ই তাদেরকে করেছে। জবার মা-বাবা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে, এখন মেয়ের কাছে ছুটে না এসে যদি সেদিন জবাকে একটু আশ্বাস দিত তাহলে তো এই ঘটনাটাই ঘটতো না।

আমরা কন্যাভ্রূণ হত্যা নিয়ে সমাজে অনেকেই আলোচনা করি। কন্যাভ্রূণ হত্যা যেমন একটি নিষ্ঠুর কর্ম, ঠিক সেরকমই একটি মেয়েকে বড় করে তার অসহয়তার সময় তার দায়িত্ব না নেওয়া, সেটাও একটি নিষ্ঠুর কর্মের মধ্যে পড়ে। মানুষ মাত্রেই ভুল হয় এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। পুত্র সন্তান হলে আমাদের প্রথমেই এই ধারণা হয় যে বাচ্চাটাকে ভালোভাবে বড় করে মানুষ করতে হবে, বড় জায়গায় চাকরি করবে ও, মা-বাবাকে দেখবে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুত্র সন্তানের প্রতি এত ভাবনা ভুল হয়ে দাঁড়ায়। ছেলে-মেয়ে মা-বাবাকে দেখবে এই ভরসাটা না করেই যদি তাদের মানুষ করা যায়, তাহলে বোধ হয় বেশি ভালো হয় না। আশা না থাকলে দুঃখ পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। ওরা বড় হয়ে কে কি করবে, সেটা ওদের উপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

মা-বাবার যতটুকুনি দায়িত্ব সেটা পালন করলেই যথেষ্ট। কথাতেই আছে, কর্ম করে যাও ফলের আশা করো না। সে যাই হোক, এবার আসল কথায় আসা যাক। ছেলেদের নিয়ে মা-বাবারা এতটাই ভাবে যে, তাদের বাড়ি মানেই তার ছেলের বাড়ি। কিন্তু মেয়েরা কোথায় যাবে? ওদের বাড়ি কোনটা? বিয়ের আগে বাবার বাড়ি, বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি, তারপর বৃদ্ধ হলে ছেলের বাড়ি। কেন বলুন তো? মেয়ে সন্তান ঘরে জন্ম নিলে আমরা যদি প্রত্যেক মা-বাবা ভাবতে শুরু করি যে, ওই বাচ্চাটাকে ভালোভাবে মানুষ করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হবে, মা-বাবার বাড়িটাই ওর নিজের বাড়ি, মা-বাবার সব সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে ওর পাশে আছে শুধু এইটুকুনি আশ্বাস দিতে পারে, তাহলে হয়তো অনেক গুলো মেয়ের জীবন আমরা বাঁচাতে পারি। লোক সমাজের ভয়ে নিজের কন্যাসন্তানকে হেলাফেলা করলে নিজেরই ক্ষতি।

তাই চলুন না এবার একটু অন্যভাবে ভাবা যাক। এই গল্পে জবার মা-বাবা ভুল বুঝেছে। জবা যেরকম চেয়েছিল তার মা-বাবা আবার সেই ছোটবেলার মতো তাদের হাতটা বাড়িয়ে দিক, যাতে ও আবার তাঁদের আঙুল ধরে নতুনভাবে জীবনটাকে শুরু করতে পারে। ঠিক তেমনি সমাজের প্রত্যেক মা-বাবা নিজের সন্তানের খারাপ সময়ে তাদের হাতটা বাড়িয়ে দিক। আজকাল অনেক ছেলে মেয়েদের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের ছলচাতুরি করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সত্যিই সেইসব ছেলে-মেয়েদের শাস্তি পাওয়া উচিত। তবে আমাদেরও একটু ভাবতে হবে এবার থেকে, বিশেষ করে একটি কন্যাসন্তানের মা বাবাকে। তাহলে সমাজের চেহারাটা একটু হলেও বদলাবে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Rinki Banik Mondal

Similar bengali story from Inspirational