Bhattacharya Tuli Indrani

Romance


2  

Bhattacharya Tuli Indrani

Romance


অতিক্রম

অতিক্রম

13 mins 677 13 mins 677

রীতেশ বেরিয়ে যাওয়ার পরে পরেই মায়া ঢুকেছিল রান্নাঘরে। টুকিটাকি যোগাড় করে, স্নান সেরে, ঠাকুরের আসনে প্রদীপটা জ্বালিয়ে, বসবার ঘরে এল সে।

কী অবস্থা করে রেখেছে ঘরটার... শোবার ঘরে গিয়ে খাটের ওপর থেকে ভেজা তোয়ালেটা তুলে কাচার মেশিনে ফেলল, জুতো গুলো র‍্যাকে রেখে, বিছানার চাদর বদলিয়ে, এদিক ওদিক নজর বুলিয়ে আবার বসবার ঘরে এল মায়া।

রাত এগিয়ে চলেছে। সারাদিনের খাটা খাটনির পরে, মায়ার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। রীতেশের পছন্দের প্রায় সবকিছুই রান্না করেছে সে। টেবিল সাজিয়েছে সুন্দর করে, ওর প্রিয় ওয়াইন কালারের জারবেরা শোভা পাচ্ছে ঘরের কোণে।

সকালে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছিল রীতেশ, খুব জরুরী মিটিং ছিল তার। বিশেষ দিনটার কথা তার মনেই ছিল না, আর সব বছরের মতই। মায়ার দুঃখ হয়নি, রীতুকে চমকে দেওয়ার জন্যেই কিছুই মনে করায়নি সে।

একমাত্র নিমন্ত্রিত অতিথি আজ সঞ্জয়, রীতেশের ছোটবেলার বন্ধু... ওর মধ্যে এক ভাইকে খুঁজে পায়, বাবা- মায়ের একমাত্র সন্তান মায়া।


... ড্রয়িং রুমে বসেছিল তারা তিনজন। হঠাৎই সঞ্জয় বলে উঠল 'মায়া, আমার পাবের ইন্টেরিওরটা তুই করবি রে... ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ল রীতেশ।

'তুই কি পাগল হয়েছিস সঞ্জু... পাব আর মায়া! প্রোফেশনাল কাউকে দিয়ে করা না।'

'ওর থেকে ভাল প্রোফেশনাল আমি কোথায় পাব রে রীতু? তুই বোধহয় ভুলে গেছিস, বিয়ের আগে মায়া শহরের সবথেকে বড় ইন্টেরিওর কোম্পানী 'ইন্টেজাইনার্স' এর সঙ্গে কাজ করেছে আর কাজ ছেড়েছেও ও তোর কথা রাখতেই...

তোর কাজ ছাড়া একদম উচিত হয়নি রে মায়া। অনেক বড় বড় অফিসেই তোর অসাধারণ কাজ দেখেছি আমি। তখন তো জানতামই না সে আমাদেরই মায়া।'

একটু হেসে মায়া উঠে পড়ল। আজ কোল্ড কফি খাওয়ার নেমন্তন্য নিজেই চেয়ে নিয়েছে সঞ্জু। রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল সে কফির সঙ্গে কিছু স্ন্যাক্স পরিবেশন করবে, তার যোগাড়ে। সঞ্জুর কফিতে আবার বেশী ক্রীম দিতে হবে, আনিয়ে রেখেছে সে ফ্রেশ ক্রিম।

সঞ্জুর জেদাজেদিতে তার পাব 'বিয়ণ্ড দ্য ক্লাউড' এর ইন্টেরিওর প্ল্যান করতে বসল মায়া... কতদিন পরে যে সে ঘর থেকে বেরলো। এই শহরে কোনও বন্ধু নেই মায়ার। ইন্টেজাইনার্সের কাজ নিয়ে ছোট্ট শহর রাঁচী ছেড়ে এখানে এসেছিল মায়া। ক্লায়েন্ট রীতেশের সঙ্গে এক পার্টিতে আলাপ হয় তার। ম্যানেজিং ডায়রেক্টর পুরোহিত সাহেবের টেকনিকাল সেক্রেটারী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। পার্টির গেস্ট- এন্টারটেনমেন্টের ভার ছিল সেদিন, মায়ার ওপরে।

কালো শিফনের অফ দ্য শোল্ডার ইভনিং গাউনে সজ্জিত স্টানিং মায়ার থেকে চোখ ফেরাতে পারেনি সেদিন রীতেশ। সেই দৃষ্টি পড়ে ফেলতে বেশী সময় লাগেনি মায়ারও।

আগ তো দোনো তরফ সে হী লগী থী। পার্টিতে আরও অনেক বিমুগ্ধ ভক্তের দেখা পেলেও রীতেশকে বিশেষ ভাবে ভাল লেগে গেল মায়ার। ছোটবেলায় গোগ্রাসে গেলা নভেল গুলোর নায়কদের মনে পড়ে গেল যে... টল- ডার্ক- হ্যণ্ডসাম।

চোরা চোখের চাহনি বিনিময়েই হয়তো বা শেষ হয়ে যেত সেদিনের সেই মুলাকাত। ডান্সফ্লোরে যাওয়ার জন্যে যখন মায়ার হাত ধরল রীতেশ, ১৩ বছরের কিশোরীর মত লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল মায়ার গাল দুটো। ওহ! সে যে কী অবর্ণনীয় উত্তেজনা। রীতেশের সান্নিধ্য, তার মুগ্ধ দৃষ্টি, তার শরীরের পুরুষালি সুগন্ধ... মায়ার মনে হল এইই বোধহয় তার জীবনের শেষ রাত, সে কী বাঁচবে রীতেশকে ছাড়া?

হৃদয়ের ধুকপুকুনিটা উঠে এল গলার কাছে যখন রীতেশ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ডান্সফ্লোরেই...

মায়ার ঠাণ্ডা, ঘামে ভেজা হাতটা নিজের হাতে নিয়ে সে বলে উঠল 'লোকে বলে আমি খুব স্বার্থপর, সুবিধেবাদী, উগ্রচণ্ডা... আমি ১০০% গ্যারান্টী দিতে পারি, সে'দিন আমাদের জীবনে আসবেই যেদিন আমরা দুজনেই ডানা ঝাপটে মরব এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে, খুবই কঠিন সময় হয়তো আমাদের সুখ শান্তিকে গ্রাস করেও ফেলবে কিন্তু আমি তোমাকে এই কথাটাও বলতে চাই যে আজ যদি আমি আমার মনের কথা তোমাকে বলে উঠতে না পারি, সারাজীবন আমার আক্ষেপ থেকেই যাবে...'

একটু বেশী তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না... জীবনের এত্তবড় একটা নির্ণয় নেওয়া... সাঙ্ঘাতিক এক দোলাচলে দুলতে রইল মায়া কিন্তু রীতেশের এই ফিল্মি কায়দা, রোমান্টিক এ্যাটিট্যুড তাকে বাঁধভাঙা স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সেই বিজনেস এন্টারটেনমেন্ট- পার্টির পরিবেশ বদলে গেল রীতেশ আর মায়ার এনগেজমেন্ট- পার্টিতে।

কেউ খেয়ালই করল না, মায়া কিতু রীতেশের প্রশ্নের কোনও উত্তরই দেয়নি... উপস্থিত, উত্তেজিত জনতা মায়াকে না বলার কোনও সুযোগই দিল না।

'মায়া, আমরা এসে গেছি... তুই ভেতরে গিয়ে তোর কাজকর্ম শুরু করে দে, আমি আসছি।'

সঞ্জুর কথায় সম্বিত ফিরে পেল মায়া। রীতেশের মন তার থেকে সরে গেছে, তার মোহ ভেঙে গেছে মায়া বেশ বুঝতে পারে... ডানা ঝাপটানোর সময় যে এত তাড়াতাড়ি এসে যাবে তা ভাবতেই পারেনি মায়া। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে সে বেশ বুঝতে পারছে, রীতেশের জীবনে আরও কারুর পদার্পণ ঘটেছে। একটা সন্তান যদি সে দিতে পারত রীতেশকে, যে বাচ্চা এত ভালবাসে...

সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল মায়ার। পিরিয়ড মিস করার পরে, ঘনিষ্ঠ রীতেশের বক্ষলগ্না হয়ে সে যখন বলেছিল 'রীতু, তুমি বোধহয় বাবা হতে চলেছ।'

মায়ার মুখটাকে দু'হাতের মধ্যে ধরে উত্তেজিত রীতেশ বলে উঠেছিল 'ওহ মায়া, মায়া! আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না, আমি আজ কত্ত কত্ত খুশী। কবে থেকে আমি অপেক্ষা করে আছি তোমার মুখে এ'কথাটা শোনার জন্যে। আমি জানি মায়া, আমাদের মেয়েই হবে... তোমার মত সুন্দর। আদরের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল মায়াকে তার স্বামী, রীতেশ।

মনে পড়ল সেদিনের কথাও... যেদিন ডাক্তার মায়ার হাতে রিপোর্টটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন 'আয় এ্যাম সো সরি ম্যাম... আপনি প্রেগন্যান্ট না, আপনার ইউটেরাসে একটা টিউমার বেড়ে উঠেছে। অপারেট করতে হবে, মন খারাপ করবেন না... জীবন তো আগে, আপনি কিন্তু আর মা হতে পারবেন না।'

অকস্মাৎ বজ্রাঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেছিল মায়া। শরীর ও মনের এই বিপর্যয়ে, পাশে না থেকে স্ত্রীর থেকে অনেক দূরে সরে গেছিল রীতেশ। মায়ার মনে হয়েছিল সব আবার আগের মত ঠিকঠাক হয়ে যাবে, টাইম ইজ দ্য বেস্ট হীলার... কিন্তু কিছুই আর আগের মত হয়নি, তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে বই কমেনি। রোজই রাত করে বাড়ি ফেরে রীতেশ। মায়া অপেক্ষা করে থাকলেও রেগে যায় সে।


একদিন অনেক বেশি রাতেই ফিরল রীতেশ। দরজা খুলে দিয়েই শোবার ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল মায়া, রীতেশ তার হাত ধরে থামাল। অবাক হয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল অনেকদিন পরে, মায়া। রীতেশের মুখটা আজ হাসি হাসি। রীতুর মনের খুশির ছোঁয়া ছুঁয়ে গেল মায়াকেও। তাহলে বোধহয় অচ্ছে দিন আ গয়ে... রীতেশের কোটটা খুলে নিয়ে হাসিমুখে তার দিকে তাকাল মায়া, চোখদুটো ভরে উঠল জলে... গড়িয়ে গাল বেয়ে নামার আগেই মুখ ঘুরিয়ে মুছে নিল সে, নাইটির হাতায়।

'উফফ, আজ একটা দিন গেল বটে! আজ আমার প্রায়ভেট সেক্রেটারি সিলেকশনের ইন্টারভিউ ছিল, জান মায়া। পার্সোনেল ডিপার্টমেন্ট মনে হয় কারুর বায়োডাটা পড়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সে যেন এক ওয়াক ইন ইন্টারভিউ। পঙ্গপালের মত ক্যাণ্ডিডেট এসেই চলেছে। তুমি ওখনে থাকলে আজ মজা পেতে। ওহ গড! যেমন তাদের ড্রেসিং সেন্স তেমনই তাদের বাচনভঙ্গী। কিন্তু ভগবান বাঁচালেন, শেষ পর্যন্ত যাকে সিলেক্ট করলাম সে এক সাগরছেঁচা মুক্তো.. শী ইজ এ্যান এঞ্জেল… আয় এ্যাম সো ভেরি হ্যাপী মায়া, শী ইজ গোয়িং টু ওয়র্ক ফর মি।'

মায়ার মনে উঁকি মারা খুশির ঝলক এক নিমেষেই উড়ে গেল। খাবার গরম করে, চুপচাপ সে টেবিলে রাখতে থাকল।

'কী হলো, জেলাস? ওহ গড, ইউ উইমেন! তোমরা এত স্টুপিড। সে আমার সেক্রেটারি, তুমি আমার স্ত্রী... আপসেট হবার কিছু হয়নি।'

সত্যিই তো আপসেট হবেই বা কেন মায়া, রীতেশের কোনও ফীলিং-ই আর অবশিষ্ট নেই তার জন্যে, কোনও আগ্রহই নেই। কতদিন হয়ে গেছে, রীতেশ তার কাছেই আসেনি। বছর ঘুরতে চলল তারা মুভি যায়নি, বাইরে খায়নি... আমার চাকরী ছাড়াটাই আমার কাল হয়েছে, এ্যাটলিস্ট ব্যস্ত তো থাকতাম... এইসব ফালতু ভাবনা মাথায় ঘুরতো না।


'কী রে কী ভাবছিস তুই?’’

সঞ্জয়ের কথায় বাস্তবে ফিরল মায়া।

‘আমি একতরফা বক বক করেই যাচ্ছি, কোনও উত্তরই দিচ্ছিস না, শুনছিস আমার কথা না কি, শরীর খারাপ লাগছে? আজ ছেড়ে দে তাহলে...'

'না না সঞ্জয়, আমি একদম ঠিক আছি। চল, কাজ শুরু করি আমরা। তোমার মনে তো কিছু আইডিয়া আছে তোমার পাবের ডেকোরেশনের ব্যাপারে... পাবের ব্লু প্রিন্টটাও চাই আমার। আমি বাড়ি বসে প্ল্যান করে নেব, তারপরেই কাজ শুরু করব। চল, আমাকে ড্রপ করে দাও।'

'লেটস হ্যাভ আ কাপ অফ কফি।'

সি সি ডি-র পাশে গাড়িটা দাঁড় করাল সঞ্জয়।

'যা, আমি আসছি।'

গ্লাস ডোরটা টেনে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে বরফের মত জমে গেল মায়া। সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরতেই সঞ্জয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হলো তার। সঞ্জয় চোখ সরিয়ে নিল মায়ার চোখ থেকে... খুবই অস্বোয়াস্তিতে পড়ে দুজনেই ফিরে চলল গাড়িতে। কফিশপে সেক্রেটারি নীলার সঙ্গে ঘন হয়ে বসে আছে রীতেশ, বাহ্যজ্ঞান শূন্য।

মায়ার মুখে আষাঢ়ের মেঘ, বাড়ি ফেরার পথে, গাড়ির বাইরে তাকিয়ে রইল সে পুরোটা রাস্তা। সঞ্জয়ও চেষ্টা করল না তার সঙ্গে কথা বলার, যেন দোষী সে ই। থাক, ওকে একটু সময় দিতে হবে।

বসার ঘরের টিভিটা চালিয়ে দিয়ে মায়া সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করল 'কী বানাব, কোল্ড না হট?'

কিছুক্ষণের জন্যেই মায়া হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে, আবার তাকে শান্ত- সমাহিত দেখল সঞ্জয়।

ঘরের স্তব্ধ আবহাওয়াটাকে বদলাবার জন্যে হেসে সে বলল 'ঠাণ্ডা ই ঠিক হবে মনে হয়, তোর মুডটাকে ঠিক করতে পারবে... এত রেগে যাস না প্লিজ, নীলা রীতেশের সেক্রেটারি। প্রচণ্ড কাজের চাপ কাটাতে দুজনে একটু ব্রেক নিয়েছে...'

'তুমি তো ভাল করেই চেন তোমার ছোটবেলার বন্ধুকে, ব্যাপারটা কতদূর গড়িয়েছে বলে তোমার মনে হয়?'

'আরে, না রে মায়া... আমার মনে হয় না সীরিয়াস কিছু, হ্যাঁ একটু আধটু খুনশুটি... ধরে নে না হেলদী ফ্লার্টিং..'

'হেলদী ফ্লার্টিং' চোখদুটো বড় হয়ে গেল মায়ার। মুখটা রাগে, বিতৃষ্ণায় তমতমে...

'তোমাদের, পুরুষদের কাছে এটা তো কোনও ব্যাপারই না, তাই না? ফ্লার্টিং সে ও আবার স্বাস্থ্যসম্মত- অস্বাস্থ্যকর! পারও বটে। আজ আমি সেই হেলদী ফ্লার্টিং করতে শুরু করি, মেনে নেবে তো তোমরা... তোমাদের সমাজ? আমাকে কাজ পর্যন্ত করতে দিল না রীতেশ তার পেছনেও কিন্তু এই এক মেন্টালিটি কাজ করল তার... হায় রে মেল শভেনিস্ট পিগস। খুনসুটি করার জন্যে কাউকে বাইরের দুনিয়া ভুলে, গায়ে গা লাগিয়ে বসতে হয় না গো... তোমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজ নিজেদের সুবিধের জন্যে সব রকম সম্পর্কেরই একটা না একটা নাম দিয়ে রেখেছ... আমার কাছে কিন্তু এটা এক্সট্রা ম্যারিটাল এ্যাফেয়ার ছাড়া কিছুই না।'

সঞ্জয়ের মুখে কথা সরল না। মায়াকে সে নিজের বোনের মত ভালবাসে। রীতেশও তার খুবই কাছের। বহুবার দেখেছে সে রীতেশ আর নীলাকে একসঙ্গে, মায়াকে জানাবার সাহস হয়নি তার। রীতেশকেও প্রশ্ন করতে পারেনি। ব্যাপারটা এত ডেলিকেট! কিন্তু মেয়েদের সিক্সথ সেন্সটা এতই জবরদস্ত হয়, ইন্ট্যুইশন এমন কাজ করে, সবই বুঝে ফেলে ওরা। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল সঞ্জয়ের। নাহ, এবারে কথা বলতেই হবে রীতেশের সঙ্গে।

মায়ার অসাধারণ প্ল্যানিং-এ সঞ্জয়ের পাব সেজে উঠেছে, অপূর্ব সাজে। পাবের উদ্বোধনের দিন মায়া আর রীতেশ দুজনেই এসেছিল, তাদের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেনি সঞ্জয়। সেদিনই নেমন্তন্য করে গিয়েছিল মায়া সঞ্জয়কে, আলাদা করে ডেকে... তাদের বিবাহবার্ষিকীতে।

 

মায়া আর সঞ্জয় অপেক্ষা করছিল রীতেশের, যদিও জানত তারা ওর দেরী হবে। রীতেশকে কিছু জানাতে বারণ করেছিল মায়া, সারপরাইজ দেওয়ার জন্যে। ঘড়ির দিকে দেখল সঞ্জয়, দশটা বাজতে চলেছে। মায়ার দিকে তাকাল সঞ্জয়। সব ভুলে গিয়ে নিজেকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে সে আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে তার প্রিয়তমের জন্যে। কী সুন্দর একটা ড্রেস পরেছে মায়া, বিশেষভাবে কেনা, এই বিশেষ দিনটির জন্যে।

'আজ আমি উঠি রে মায়া, অনেক দেরী হয়ে গেছে। রীতেশ ক্লান্ত হয়ে ফিরবে। আজকের এই শুভমুহূর্ত তোমরা দুজনেই একান্তে কাটাও... আমি কেন আবার কবাব মে হাড্ডি হই বাবা? আমি পালাই, আর এক দিন আসব।'

চোখের কোণে মায়ার মুখের দিকে তাকাল সঞ্জয়। তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ঝুলে রয়েছে, চোখে বাদলের কালো মেঘের ভার... যে কোনও সময়েই বৃষ্টি আসবে, সঙ্গে ঝড়- তুফান।

সঞ্জয় দরজার দিকে এগোতেই, ডোরবেলটা বেজে উঠল। রীতেশ ঘরে ঢুকে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল সন্দেহের দৃষ্টিতে। মায়া এগিয়ে গেল রীতেশের দিকে।

'এত দেরী করলে রীতু... ডেলিগেটসরা...

'দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস... প্লিজ মাইন্ড ইয়োর ওন! আর, কী পরেছ এটা? সব সময়ে খুকি সেজে লোকের নজরে আসার চেষ্টা। জঘন্য দেখাচ্ছে তোমাকে।'

সঞ্জয় আর সহ্য করতে পারল না, তার কিছুই করার ছিলও না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল সে, চোরের মত। রীতেশ শোবার ঘরে ঢুকে গেল।

মায়া অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল ডাইনিং টেবিলে।

'ও ফ্রেশ হয়ে নিক, আমি ঠিক নিয়ে আসব ওকে খাবার টেবিলে। আজ কোনও কথা কাটাকাটি করব না আমি।'

বাথরুমের দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে বেডরুমে ঢুকল মায়া। রীতেশ বিছানায়।

'রীতু...' মায়া হাতটা রাখল রীতেশের কপালে।

'কী হয়েছে বাবু, খুব ক্লান্ত? চল, একটু খেয়ে নাও। দেখ, তোমার সব পছন্দের খাবার বানিয়েছি...'

'আমি খেয়ে এসেছি। বিরক্ত কোর না। আলো নিভিয়ে দিয়ে চলে যাও। আমাকে একা থাকতে দাও...'

সব খাবারের পাত্র সরিয়ে ডাইনিং টেবিল পরিস্কার করে নিল মায়া, শুধু কেকটাতে হাত লাগাল না। রীতেশ চকোলেট কেক ভালবাসে। নিজের হাতে বানিয়ে, সুন্দর করে সাজিয়েছিল সে।

এক কাপ কফি বানিয়ে নিল মায়া, নিজের জন্যে। খুব ক্ষিদে পেয়েছে, কিন্তু ইচ্ছে করছে না খেতে। 

শরীরটাকে কোনরকমে নিয়ে গিয়ে ফেলল সে তার প্রিয় যায়গা, বারান্দায় রাখা বেতের চেয়ারটার ওপরে। মাথা কাজ করছে না। কী করবে সে এখন... ফিরে যাবে মা- বাবার কাছে? তাঁরা তো এই বিয়ে সমর্থনই করেননি... এমন একজনকে বিয়ে করতে চাইল মায়া যার সম্বন্ধে কেউ কিছুই জানে না... না, বাড়ি ফেরা যাবে না, হার মানবে না মায়া। কথা বলবে রীতেশের সঙ্গে? কোনও লাভ হবে না... বেনা বনে মুক্ত ছড়ানো। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল রীতেশের। মাথাটা ভার হয়ে আছে। শোবার ঘর থেকে বেরতেই তার চোখ গেল টেবিলে রাখা সুন্দর করে সাজানো কেকটার দিকে। সে তার রিস্ট ওয়াচটার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিল 'হে ভগবান! এবারেও আমি ভুলে গেলাম...'

মনে পড়ে গেল তার, রাতের অত্যন্ত খারাপ ব্যবহারের কথা, মায়ার সঙ্গে... সে ও আবার সঞ্জয়ের সামনে। খুব লজ্জা পেল রীতেশ। একটু ভয়ও করল, এখন কীভাবে মুখোমুখি হবে সে মায়ার? রান্নাঘরের দিকে এগোল রীতেশ। মায়া ফোনে কথা বলছে কার সঙ্গে, বেশ হেসে হেসে। যাক বাবা, বাঁচা গেল। কিচেনের দরজায় দাঁড়াল সে।

'গুড মর্নিং রীতু, উঠে পড়েছ? ব্রেক ফাস্ট রেখে দিচ্ছি টেবিলে, একাই খেতে হবে তোমাকে। সরি, আমার একটা দরকারী এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।'

বেরবার জন্যে রেডি মায়া। কী সুন্দর লাগছে ওকে। আবার কার সঙ্গে যেন কথা বলছে মায়া, হেসে হেসে... কিছুই শুনতে পেল না রীতেশ। এবারে রীতেশের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। বারান্দায় গিয়ে শুনবার চেষ্টা করল সে, কার সঙ্গে কথা হচ্ছে অসভ্য ছেনালটার।

'...হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক সময়েই পৌঁছে যাব আমি। ডোন্ট ওওরি...'

আর কিছুই শুনতে পেল না রীতেশ। মায়ার খিলখিলে হাসির শব্দে তার মন ঘৃণায় ভরে উঠল। 'কার সঙ্গে কথা বলছে শয়তানিটা, এত হেসে হেসে? কে থাকতে পারে ফোনের ওপারে? নিশ্চয়ই সঞ্জয়! বিশ্বাসঘাতক, লোক দেখানো ভালবাসা... "মায়া আমার বোন।" দেখাচ্ছি মজা।'

মায়া বেডরুমে ঢুকল, রীতেশও রেডি হয়ে গেছে। বাহ, সো ফাস্ট!

তার হ্যান্ডব্যাগটা তুলে নিয়ে মায়া বলল 'বায় ডার্লিং, হ্যাভ আ নাইস ডে।'

ভীষণ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল মায়া। রীতেশও দৌড়ল তার পেছনে। রীতেশ পার্কিং লট- এ পৌঁছনোর আগেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল মায়া। কম্পাউন্ড থেকে বেরিয়ে একটা ক্যাব ধরে মায়াকে ফলো করার চেষ্টা করল রীতেশ।

'ওই তো মায়ার গাড়ি পার্ক করা "কপার স্পুন"-এর সামনে, তাদের দুজনেরই ভীষণ পছন্দের ইটারি। বছরখানেক আগেও প্রায়ই আসত তারা এখানে। সব ওয়েটাররাও চেনে তাদের।

দুজনের জন্যে রিজার্ভ করা একটা টেবিলে বসে মায়া... ভীষণ ভাল মুডে আছে সে, আবার ফোনে কথা বলছে।

একটা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল রীতেশ। হাতে নাতে ধরতে হবে মায়াকে। রীতেশের চোখে ধুলো দেওয়া মজা বার করছি, দাঁড়াও... একটা ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক নিয়ে বেয়ারা এসে দাঁড়াল টেবিলের সামনে। কেকের ওপরে একটা মোমবাতি।

'আরে, কীসের সেলিব্রেশন করছে ও?'

সারসের মত গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে দেখার চেষ্টা করল রীতেশ, কী লেখা আছে কেক- এর ওপর...

'গুড মর্নিং সার! আপনি এসে গেছেন? ম্যাম আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আসুন সার।' এক এ্যাটেন্ডয়ান্ট এসকর্ট করে নিয়ে চলল রীতেশকে, টেবিল পর্যন্ত।

সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল মায়া রীতেশকে...

'হ্যাপী এ্যানিভার্সারী মাই ডিয়ার হাবি...'

রীতেশের চোখের পলক পড়ল না। কেকটার দিকে চোখ গেল তার... কেক-এর ওপরে একটা ছোট ফ্ল্যাগ লাগানো...

"হ্যাপী ম্যারেজ এ্যানিভার্সারী রীতেশ এ্যান্ড মায়া!!উইশ ইউ মেনী মেনী ইয়ার্স অফ হ্যাপী টুগেদারনেস..."


Rate this content
Log in