অশনিসংকেত পর্ব ৭
অশনিসংকেত পর্ব ৭
ঘ্যাঁঅ্যাঅ্যাচ্ করে একটা কর্ণবিদারক শব্দ হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মাথার উপর দিয়ে ঝটপট করে তীব্রবেগে উড়ে চলে গেল একঝাঁক বাদুড়।আর সাথে সাথে একটা ভ্যাপসা গন্ধ আমাদের নাকে এল।এটা বুঝতে বাকি রইল না,যে বাংলোর ভিতরটা বহুযুগ বাদে বাইরের বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছে।অন্ধকার রাতের চাঁদনী আলোর আবছা আবহে বাইরে থেকে দেখে বাংলোর আদলটা যতটা সুন্দর মনে হয়েছিল,ভিতরটা তার থেকেও বেশি চোখ ধাঁধাঁনো আর রাজকীয়।শুধু যুগের পর যুগ ধরে ধূলোময়লা মাকড়সার জালের আস্তরণ পড়ে পড়ে,পোকামাকড়ের স্হায়ী আস্তানা এই ক্ষয়প্রাপ্ত জরাজীর্ণতায় আচ্ছাদিত বাংলোটি বার্ধক্যের ভারে ভগ্নপ্রায়।কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে চোখ সয়ে আসা আমরা চাঁদের আলো যেটুকু দরজার ভিতর দিয়ে ঢুকছে সেই স্বল্প আবছা আলোআঁধারিতেই স্পষ্ট দেখলুম...বাংলোর ভিতরের রাজকীয়তা অর্থ ও যশের এক দাপুটে প্রতাপপূর্ণ অতীতের বহিঃপ্রকাশ করছে নিঃশব্দে।আমরা একে একে সবাই বাংলোর ভিতরটায় ঢুকলাম।কি সুবিশাল তার অন্দরমহল।আমাদের মাথার উপরে যেন একটা বিশালাকৃতি উল্টোনো বাটি ছাদের রূপ নিয়ে নিজের জায়গায় বিদ্যমান।বাটির সুবিশাল গোলাকৃতি ধারজুড়ে কক্ষের সারি এবং তার সামনে ঝুলন্ত ব্যালকনি যেন গোটা বাংলোর উপরের চতুর্দিকে পরিখার মতো ঘিরে রেখেছে।বাংলো বাড়িটি যেন আসলেই শুধু বাংলো নয়,একেবারে রাজপ্রাসাদ।আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করে চলেছি এই অপূর্ব সৌন্দর্য। হঠাৎ খেয়াল হল,অজিতেশ বাবু দেশলাই জ্বেলে কিছু কাঠকুটো যোগাড় করে আগুন জ্বালিয়েছেন।সেই আলোতেই মায়াময় কূহেলীর আস্তরণে মোড়া এই মায়াময় পরিবেশের অনির্বাচনীয় সৌন্দর্য আমাদের চোখে ধরা দিতে পারছে।আমাদের হুঁশ ফিরল ওনারই হাঁকডাকের সাথে।"বাংলোর ভিতরে ঢুকে সবাই কি ভাবের ঘোরে চলে গেলে নাকি?বলি...রাত তো কম হল না।ক্ষিদেয় পেটে ইঁদুর দৌড়োনো শুরু করে দিয়েছে।খেতেটেতে হবে তো নাকি?ফল মিষ্টি যা আছে সব বার করো ভাই...এবার আলো আঁধারিতে পিকনিকটা আরম্ভ হয়ে যাক...
আমাদের সকলের সম্বিত ফিরল।আমরা আমরা সবাই একে একে অজিতেশবাবুর জ্বালানো অাগুনের চারধার ঘিরে বসে গেলাম একেবারে পিকনিকের মেজাজে।সত্যিই আমাদের সবারই খুব ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল।তোমার দাদু এবার তাঁর ব্যাগ থেকে ফল মিষ্টি সব বার করতে থাকলেন একে একে।হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর কর্ণবিদারক শব্দে আমাদের হৃদপিন্ড কেঁপে উঠল যেন।আমরা সবাই একেবারে বোবা হয়ে গেলাম।কোথা থেকে এমন কলিজা কাঁপানো শব্দ হল আমরা কেউই সেটা বুঝে উঠতে পারলাম না।তোমার দাদু উঠে দাঁড়িয়ে শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করতে থাকলেন এবং তারপর হয়তো কিছু একটা বুঝে নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেলেন বাংলোর সিংহদরজার দিক অনুসরণ করে।আমরা এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকলাম।হঠাৎ তোমার দাদু ভীষণ হন্তদন্ত হয়ে আমাদের মাঝে এসে আতঙ্কে ভিজে আসা কন্ঠে সমস্ত শক্তি জড়ো করে বললেন,"সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। যে দরজা দিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকেছিলাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে বাইরে থেকে। ওই দরজা আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলেও খুলতে পারব না এটা আমার বুঝতে এতটুকুও বাকি নেই!"
এতটুকু বলে উনি একেবারে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।আমাদের প্রত্যেকের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।কোনো এক অদৃশ্য,অপার্থিব শক্তির বজ্রমুষ্ঠির কবলে আমরা আটকা পড়ে গিয়েছি যেখানে আমাদের অন্তিম লগ্নের সূচনা হয়ে গিয়েছে এটা বুঝতে আমাদের কারোর আর বাকি রইল না।আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম নিজেদের অদৃষ্টের খেদ হাতে নিয়ে।

