STORYMIRROR

Rashmita Das

Crime Thriller

5  

Rashmita Das

Crime Thriller

রক্তজবা রহস্য

রক্তজবা রহস্য

60 mins
1

রক্তজবা রহস্য  দৃশ্য এক ঠান্ডা টা এখন বেশ জাঁকিয়ে ই পড়তে শুরু করেছে।এটা ‌সবেমাত্র যে নভেম্বর মাসের শুরু,এটা কে বলবে! আমি এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে জানলার পাশে টেবিলে বসে,একটা নতুন উপন্যাসের খসড়া নিয়ে ভাবনায় মশগুল হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে আসল। আমার সব ভাবনাগুলো নিমেষের মধ্যে কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। আমার সমস্ত ভাবনা চিন্তার মাঝখানে এমন একখানি বাধা আসায় আমি মনে মনে বেশ বিরক্তই হলাম। কিন্তু এখন কি আর করা... এই ভর সন্ধ্যায় আমাদের এই হ্যারিসন রোডের মেসবাড়িতে কার আগমন ঘটল... সেটা এখন আমাকেই দেখতে যেতে হবে।অগত্যা...আমি উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম।দরজা খুলতেই, যাকে দেখলাম, তাঁকে আমি চিনতে পারলাম এক লহমায়।ইনি হলেন লোকাল থানার ইনস্পেক্টর রতনপুরী। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম,তাঁর মুখে চোখে গভীর উদ্বেগ এবং ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অজিতেশ আরামকেদারায় বসে পাইপটা ধরাচ্ছিল। রতনবাবুকে দেখে সে মুচকি হেসে বলে উঠল, "আসুন রতনবাবু। তা...কি ব্যাপার বলুন দেখি...দীপাবলির রাতে আলোর উৎসব ছেড়ে হঠাৎ এই সত্যান্বেষীর দরবারে? চারদিকে আলোর রোশনাই এর মধ্যেও আপনার চোখে যেন অমাবস্যার অন্ধকার প্রত্যক্ষ করছি...!" রতনবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,ধপ করে সামনে রাখা চেয়ারটায় বসলেন। তারপর চিন্তান্বিত কন্ঠে বলে উঠলেন, "অজিতেশবাবু, আপনি একদম ঠিক ধরেছেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চণ্ডীপুরে ...পরপর তিনটে খুন হয়ে গেল।চন্ডীপুর কলকাতা থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার পথ, কিন্তু দীপাবলির রাতেও যেন সেখানে অমাবস্যার চেয়েও গভীর অন্ধকার জমে থাকে। চণ্ডীপুরের ঘোষাল রাজবাড়ির উঠোনে তিনশো বছর ধরে হয়ে আসছে ডাকাত কালীর পুজো। আসন্ন কালীপূজো র এই সময়টাতে পরপর তিনটি রহস্যাবৃত হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা করতে লালবাজারের এখন রীতিমতো নাজেহাল অবস্থা।আর তার চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন...ওই প্রতিটি খুনের ধরণ এতটাই বীভৎস আর রহস্যময় যে লালবাজারের একেবারে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। মানুষজন ভাবছে এইসব নৃশংস হত্যাকান্ড আসলেই কোনো তান্ত্রিকের কালো যাদু অথবা নরবলির ই ফলশ্রুতি।খবরের কাগজগুলো ও এইরকম কথাই লিখছে‌।" অজিতেশ পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে এবার সোজা হয়ে বসল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"রতন বাবু...খুনের ধরণ টা আমাকে একটু খোলসা করে বলুন।" অজিতেশের মুখে এই কথা শুনে,রতনবাবু এবার পকেট থেকে একটা ছোট ডায়েরি বের করলেন । তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরি টা পড়তে শুরু করলেন। আমিও একটা চেয়ার টেনে ওদের সামনে গিয়ে বসলাম।রতন বাবু ডায়েরি দেখে বলে উঠলেন, "প্রথম খুনটা হয়েছিল ঠিক তিন দিন আগে। শহরের এক নামী ব্যবসায়ীর লাশ মিলেছিল গঙ্গার ঘাটে। দ্বিতীয় খুন টা হয়েছে পরশু রাতে, আর আজ সকালে ঘোষালপাড়ার পুরনো রাজবাড়ির পেছনে জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছে তৃতীয় লাশটা। আর অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন...প্রতিটি লাশের গলায় পরানো ছিল তাজা রক্তজবার মালা।আর কপালে ছিল সিঁদুরের মস্ত বড় তিলক। আর প্রতিটি লাশের পাশে পড়ে ছিল একটা করে চিরকুট, যাতে রক্ত দিয়ে তন্ত্রসাধনার একটা নির্দিষ্ট শ্লোক লেখা।" আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "শ্লোকটা কী?" "‘কঙ্কালমালিনীং কালীং রক্তবস্ত্রাধরাং শিবাম…’ এই জাতীয় কিছু," রতনবাবু বললেন।  "কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টা অন্য জায়গায়, অজিতেশ বাবু। প্রতিটি মৃতদেহের বুক চিরে শরীরের ভিতর থেকে হৃদপিণ্ডটা নিখুঁতভাবে কেটে নেওয়া হয়েছে। যেন কোনো তান্ত্রিক মহাশ্মশানে বসে সিদ্ধিলাভের জন্য নরবলি দিচ্ছে!" অজিতেশের চোখ দুটো হঠাৎ যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। সে বলল, "হৃদপিণ্ড কেটে নেওয়া হয়েছে?তাও আবার নিখুঁতভাবে?" "হ্যাঁ, একেবারে নিখুঁত অস্ত্রোপচারের মতো," রতন বাবু বলে উঠলেন। অজিতেশ বাবু, সুজিত বাবু... আপনারা দয়া করে ঘোষাল রাজবাড়ী তে গিয়ে কয়েকটা দিন থেকে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি টা ভালো করে চাক্ষুষ করুন... আমার মনে হয়, ওই নৃশংস নরহত্যাকারী খুব বেশিদিন আপনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে আত্মগোপন করে থাকতে পারবেন না।" আমি এবার রতন বাবু কে জিজ্ঞাসা করলাম,"আচ্ছা রতন বাবু, এই নৃশংস খুনের তদন্ত করার জন্য আপনি অজিতেশ আর আমাকে ঘোষাল রাজবাড়ী থাকবার জন্য অনুরোধ করছেন কেন?ওই বাড়ির কারোর সাথে আমার বা অজিতেশের কোনো আলাপচারিতা বা দেখা সাক্ষাৎ ও তো হয়নি...  ইনস্পেক্টর রতনপুরী আমার প্রশ্নটা শেষ হতে না দিয়েই সাথে সাথে বলে উঠলেন, "সুজিতবাবু, ঘোষাল রাজবাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের খবরটা পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আরেকটা খবর পাই। রাজবাড়ির বর্তমান কর্তা মহেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল কয়েক দিন আগে একটি অজ্ঞাত চিঠি পেয়েছেন। ওই চিঠিতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, আজ কালীপূজার রাতেই নাকি তাঁর মৃত্যু হবে।" এই কথাটা শুনে আমি ভীষণভাবে চমকে উঠে বললাম, "কী বলছেন রতন বাবু! তা হলে কি এই তিনটে খুনের সঙ্গে ঘোষাল রাজবাড়ী র বর্তমান কর্তা মহেন্দ্রনারায়ণ বাবুরও কোনও সম্পর্ক রয়েছে?" রতন বাবু গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন, "দেখুন সুজিত বাবু, তিনটে খুনের সাথে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর কোনোরকম সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না,কিন্তু ওই চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই উনি প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। প্রথমে বিষয়টাকে কেউ গুরুত্ব দিতে চায়নি। অনেকে ভেবেছিল, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরেই কেউ হয়তো ওঁকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পরপর তিনটে খুন হয়ে যাওয়ার পর সেই ধারণা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। অজিতেশ এতক্ষণ চুপ করে কথাগুলো শুনছিল। এবার সে প্রশ্ন করল, "চিঠিটা কি আপনারা পরীক্ষা করেছেন?" "হ্যাঁ। চিঠিটা আমার হাতে এসেছে। তাতে কোনও প্রেরকের নাম বা ঠিকানা নেই। লেখার ধরন দেখে বিশেষ কিছু বোঝা যায়নি। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। চিঠির শেষের দিকে লাল কালিতে একটা রক্তজবার ছবি আঁকা ছিল।" অজিতেশের চোখে মুহূর্তের জন্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল। "রক্তজবা?" "হ্যাঁ অজিতেশ বাবু।ঠিক তাই। আর সেই কারণেই বিষয়টাকে আমি আর নিছক ভয় দেখানোর ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না। একদিকে তিনটে মৃতদেহের গলায় রক্তজবার মালা, কপালে সিঁদুরের তিলক, আর অপরদিকে তন্ত্রসাধনার শ্লোক লেখা চিরকুট...আর তারই মধ্যে রাজবাড়ির বর্তমান কর্তার কাছে রক্তজবার চিহ্ন-সহ মৃত্যুর হুমকি! এই সবকিছুকে আলাদা আলাদা ঘটনা বলে ধরে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি আর নেই।" অজিতেশ কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হয়ে রইল। তারপর বলল, "আপনি কি মনে করেন, খুনি মহেন্দ্র নারায়ণ ঘোষালকে পরবর্তী শিকার হিসেবে বেছে নিয়েছে?" "সেই আশঙ্কাই করছি। আর একটা বিষয়ও আমাকে ভাবাচ্ছে। তৃতীয় মৃতদেহটা পাওয়া গিয়েছে রাজবাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে। খুনি যদি সত্যিই এই বাড়ির বর্তমান কর্তাকে নিশানা করে থাকে, তা হলে সে হয়তো বাড়ির আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে। এমনও হতে পারে, ওই বাড়ির ভিতরের কোনও লোক তাকে সাহায্য করছে।" "অথবা," অজিতেশ ধীরে ধীরে বলল, "ওই রাজবাড়ির অতীতের সঙ্গে কোনও গুহ্য ঘটনা জড়িয়ে থাকাটাও অসম্ভব নয়, যার প্রতিশোধ নিতে খুনি একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। চন্ডীপুরের ওই ঘোষাল রাজবাড়ী আমি চিনি। ওই অঞ্চলে ওই রাজবাড়ির আশেপাশে আমার যাতায়াত ছিল এক সময়ে। ওই বাড়িতে নাকি কিছু গোপন কেচ্ছা রয়েছে... এরকম কিছু কিছু কথা আমার কানে এসেছে।" রতনবাবু মাথা নেড়ে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ অজিতেশ বাবু, আপনি যেরকম বলছেন সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আসলে এই কেস টা এখন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের রাতের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে।আর এই সময়ে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু নিজেও এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।আমি আপনার কাছে আসব জেনে, তিনি তাই আমার হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি আপনাকে ওই ঘোষাল রাজবাড়ী তে পায়ের ধূলো দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।এই নিন অজিতেশ বাবু,এই সেই চিঠিখানা...! এই বলে রতন বাবু একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে ধরলেন অজিতেশের সামনে। অজিতেশ হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা নিল। তারপর ভ্রূ কুঁচকে চিঠিখানা খুলে মনোযোগ সহকারে পড়ল। তারপর অজিতেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হঠাৎ ও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "রতন বাবু, আগামীকাল তো কালীপূজার অমাবস্যা। খুনি যদি কোনো তান্ত্রিক চক্র পূরণ করতে চায়, তবে আগামীকাল রাতটাই হয়তো তার শেষ সুযোগ। সুজিত, ওঠো। আমাদের আর দেরি করা ঠিক নয়।রতনবাবু, আমাদের এক্ষুনি সেই রাজবাড়িতে নিয়ে চলুন।" দৃশ্য দুই  কালীপূজার আগের রাতে আমরা যখন ঘোষালপাড়ার সেই প্রাচীন রাজবাড়িতে পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল। রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে প্রতিমা গড়ার শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে এখন। মা কালীর জিভ আর চোখের ওপর লাল রঙ লেপা হচ্ছে। বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধের সাথে মিশে আছে এক প্রাচীন চামচিকের গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে ভাব।দীপাবলির আলো আর বাজি পটকার ধোঁয়ায় কলকাতার আকাশ একেবারে কুয়াশাচ্ছন্ন।চারিদিকে আলোর রোশনাই থাকলেও কলকাতার উপকণ্ঠের এই প্রাচীন রাজবাড়িটায় যেন একটা থমথমে, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ওত পেতে বসে ছিল। বনেদি এই পাড়ার নাম ঘোষালপাড়া, আর আজ সেখানে প্রাচীন রীতি মেনে ডাকাতকালীর পূজা। ঢাকের গুরুগুরু আওয়াজ আর বারুদের গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে বাতাসে। রতনবাবু একবার রাজবাড়ির বিশাল ফটকটার দিকে তাকিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন, "রাজবাড়ির বর্তমান কর্তা মহেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল কয়েক দিন আগে যে অজ্ঞাত চিঠি পেয়েছেন, ওই চিঠিতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, আগামীকাল কালীপূজার রাতেই নাকি তাঁর মৃত্যু হবে। অজিতেশ বাবু, আপনি চারদিকে চোখ কান খোলা রাখুন।" এই কথাটা শুনে আমি বলে উঠলাম, "আচ্ছা রতন বাবু! আপনার কি মনে হয়, এই তিনটে খুনের সঙ্গে কি মহেন্দ্রনারায়ণবাবুরও কোনও সম্পর্ক রয়েছে?" রতন বাবু গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন, "দেখুন সুজিত বাবু, তিনটে খুনের সাথে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর কোনোরকম সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না,কিন্তু ওই চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই উনি প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। প্রথমে বিষয়টাকে কেউ গুরুত্ব দিতে চায়নি। অনেকে ভেবেছিল, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরেই কেউ হয়তো ওঁকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পরপর তিনটে খুন হয়ে যাওয়ার পর সেই ধারণা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।" দৃশ্য তিন ঘোষাল বাড়ির প্রাচীন এই রাজবাড়ির পিছনের জঙ্গলে তৃতীয় মৃতদেহ উদ্ধারের খবরটা, এই বাড়ির লোকজনের মধ্যে যে একটা চাপা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, তা তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যাচ্ছিল। তবে আমি যেন অনুভব করলাম,সেই আতঙ্কের আড়ালে আরও যেন লুকিয়ে রয়েছে কোনো গূঢ় রহস্য। বিশেষ করে রাজবাড়ির বর্তমান কর্তা মহেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল আমাদের আপ্যায়ন করে ঘোষাল রাজবাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার যেন মনে হচ্ছিল,ভয়কে অতিক্রম করে তার ভিতরে চাগাড় দিয়ে উঠছে একটা কোনো উৎকণ্ঠা...!  আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলে উঠল, এই মানুষটা কোনও গোপন সত্য জানেন। ওই সত্য উন্মোচিত হয়ে প্রকাশ্যে আসুক, সেটা তিনি একেবারেই চান না। অজিতেশও যে ব্যাপারটা লক্ষ করেনি, তা নয়। তবে সে মুখে কিছু প্রকাশ করল না।ও শুধু ধীরে ধীরে রাজবাড়ির চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ঘোষাল রাজবাড়ীর ভিতরে ঢোকার পর মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু আমাদের একেবারে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু, স্ত্রী প্রভাবতী দেবী র সাথে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। বৌঠান হাঁটাচলা করতে পারেন না।বিছানা আর হুইলচেয়ার...এইটুকু গন্ডির মধ্যেই তাঁর সমস্ত পৃথিবী টা সীমাবদ্ধ। আমার তার এহেন অবস্থা দেখে বেশ খারাপই লাগল। বৌঠান বলে উঠলেন,"জানেন অজিতেশ বাবু ,আমি ই  আপনাদের সাথে আলাপ করার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলাম। চারপাশে যা সব ঘটে চলেছে, তার কিনারা করতে হলে ওই চাবি....!" গিন্নি মাকে তাঁর কথা শেষ না করতে দিয়েই সাথে সাথে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন,"আঃ গিন্নি, তুমি জেদ করছিলে বলে ওনাদের এখানে নিয়ে এসে তোমার সাথে আলাপ করিয়ে দিলাম। কিন্তু তোমাকে তো নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখতে হবে তো নাকি!এত কথা বলা তোমার জন্য একদম ঠিক নয়। তুমি এখন বিশ্রাম নাও, আমি ওনাদের এই ঘোষাল রাজবাড়ীর চারপাশটা ঘুরিয়ে দেখাই, যদি কোনো সূত্র মেলে...! আমি লক্ষ্য করলাম, গিন্নি মার চোখমুখ হঠাৎ কোনো এক অজ্ঞাত ভয়ে একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেল! গিন্নি মা যে নিজের স্বামীর ভয়ে রীতিমতো সিঁটিয়ে থাকেন, এটা আমি অচিরেই অনুধাবন করতে পারলাম। মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু আমাদের তড়িঘড়ি ওই ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন। তারপর বলে উঠলেন, আপনারা এই ঘোষাল রাজবাড়ীর চারপাশটা ভালো করে ঘুরে দেখুন অজিতেশ বাবু, দেখুন কোনো সূত্র পান কিনা...! এরপর অগত্যা অজিতেশের সাথে সাথে  আমিও, এই ঘোষাল রাজবাড়ীর চারপাশটা ভালো করে ঘুরে দেখতে শুরু করলাম।এই প্রাচীন রাজবাড়ির উত্তর দিকে একটি সরু করিডর চলে গিয়েছে। করিডরের দুপাশে রয়েছে সারি সারি ঘর। অধিকাংশ ঘরের দরজাই বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও দেওয়ালের চুন উঠে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে।এই বাড়ির কোণায় কোণায় জমে থাকা মাকড়সার জাল আর পুরোনো কাঠের দরজাগুলোর বিবর্ণ রং দেখে মনে হয়, এই অংশে বহুদিন ধরে কেউ বিশেষ যাতায়াত করে না। হঠাৎ করিডরের শেষ প্রান্তে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অজিতেশ। দরজাটার গায়ে মরচে ধরা পিতলের তালা ঝুলছে। অজিতেশ আমাকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলে উঠল,দেখো সুজিত, এই দরজার নিচে,পুরু হয়ে জমে থাকা এই ধুলোর স্তরের ওপরে কয়েকটি জুতোর ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে...! আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তো... এই বহু বছরের পুরোনো পরিত্যক্ত দরজার নীচে পুরু ধূলোর স্তরের ওপরে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে কয়েকটা জুতোর চিহ্ন! অজিতেশ নিচু হয়ে ওই ছাপগুলো ভালো করে নিরীক্ষণ করল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "অজিতেশ, কোনো সূত্র পেলে?" না...অজিতেশ আমার কথার কোনো উত্তর দিল না।ও বরং মহেন্দ্রনারায়ণবাবুর দিকে ফিরে বলে উঠল, "মহেন্দ্র বাবু,এই ঘরটা কীসের জন্য ব্যবহৃত হত?" অজিতেশের এই প্রশ্ন শুনে মহেন্দ্রনারায়ণবাবু প্রথমটায় একটু ইতস্তত করলেন। তারপর গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলেন , "আজ্ঞে অজিতেশ বাবু,ওটা আমাদের পুরোনো দলিলঘর। ওই ঘর এখন আর বিশেষ খোলা হয় না।" অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, "কেন?" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, "আসলে...ওই ঘরে অনেক পুরোনো নথিপত্র রয়েছে। অনেক কাগজপত্র তো নষ্ট ও  হয়ে গিয়েছে।আর তাছাড়া, এই বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে আদালতে মামলা চলায় কিছু নথি আলাদা করে রাখা হয়েছে।তাই এই ঘরের দরজা খোলার আর দরকার ই পড়ে না।" অজিতেশ এবার দরজার তালাটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল, "আচ্ছা মহেন্দ্র বাবু,এই ঘরটা কি আজ খোলা হয়েছিল?" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, "কই না তো!" উত্তরটা বেশ দ্রুত এল। এত দ্রুত যে আমার নিজেরই এবার একটু সন্দেহ হল। অজিতেশ সাথে সাথে জিজ্ঞাসা করল, "আচ্ছা মহেন্দ্র বাবু, এই ঘরের চাবি কার কাছে থাকে?" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু একরাশ ইতস্তত ভাব নিয়ে বলে উঠলেন, "চাবি আমার কাছে একটা আছে। আরেকটা চাবিও ছিল আমার বাবার কাছে।কিন্তু, সেটা বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছে।" অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, "আপনার বাবা কবে মারা যান?" মহেন্দ্র বাবু বলে উঠলেন, "প্রায় আঠারো বছর আগে।" এবার অজিতেশ আর কোনও প্রশ্ন না করে সামনে এগিয়ে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে দরজার নিচের ধুলোর ওপর একবার টর্চের আলো ফেলল। আমি লক্ষ করলাম, দরজার ঠিক পাশে মেঝের ওপর লাল রঙের একটা ক্ষীণ দাগ রয়েছে। আমার মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত শিহরন খেলে গেল। কিসের দাগ ওটা?ওটা সিঁদুরের দাগ কি?নাকি অন্য কিছু? এই প্রশ্নটা আমার মনে তীব্রভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও তখন আর আমি অজিতেশকে এই বিষয়ে আর কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না। এরপর আমরা আবার ঘোষাল রাজবাড়ীর দোতলার প্রশস্ত বারান্দা টায় ফিরে এলাম।ঠাকুরদালান থেকে ঢাকের আওয়াজ টা যেন আরও জোরে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে। পূজোর আগের রাতেও মন্ডপের ভিতরে ঘটা করে ঢাক বাজছে।রাজবাড়ির বাইরে ক্রমশ পাড়ার লোকজনের ভিড় জমেছে। অনেকেই এখানে এসেছে ডাকাতকালীর পুজো দেখতে।কিন্তু বাড়ির ভিতরে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার আঁচ বাইরের লোকজনের কাছে এখনও পুরোপুরি পৌঁছয়নি। মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু আমাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,"আপনারা এখন অতিথিশালায় আপনাদের ঘরে গিয়ে একটু আরাম করুন। বাকি সব কথা পরে বলা যাবে। অগত্যা... আমি আর অজিতেশ ঘোষাল রাজবাড়ীতে আমাদের দুজনের জন্য বরাদ্দ সুসজ্জিত ঘরে পা রাখলাম। সেখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর, হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দ হল। অজিতেশ গিয়ে দরজা টা খুলতেই,এক চাকর আমাদের কাছে এগিয়ে এসে বলল, "অজিতেশবাবু,বাবু আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান। আপনারা দয়া করে বৈঠকখানার ঘরে চলুন।" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু যে এবার অজিতেশের সাথে একান্তে কিছু কথা বলার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছেন,এটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। চাকর টি ফের বলে উঠল,"সুজিত বাবু, আপনিও চলুন... বাবু বৈঠক খানার ঘরে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছেন।" অগত্যা... আমর সময় কে আর অতিবাহিত হতে না দিয়ে,চাকরটির সঙ্গে দক্ষিণ দিকের বৈঠকখানার ঘরটিতে প্রবেশ করলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, এই ঘরটি অন্য ঘরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সাজানো। দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে ঘোষাল পরিবারের পূর্বপুরুষদের ছবি। মাঝখানে রয়েছে একটি ভারী সেগুন কাঠের টেবিল, তার ওপর রয়েছে কিছু কাগজপত্র, কয়েকটি পুরোনো বই এবং একটি রুপোর পেপার ওয়েট। মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আনমনা ভাবে। আমাদের দেখে তিনি সাথে সাথে চাকর কে নির্দেশ দিলেন, এই ঘরের সব জানলা বন্ধ করে দিতে। এমন অদ্ভুত আদেশ শুনে আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম।চাকর টি অবশ্য,"জ্বি হুজুর..." বলে সাথে সাথেই বাবুর হুকুম তামিল করার কাজে লেগে গেল। নিমেষের মধ্যে সব জানলা বন্ধ করে দেওয়ার পর সে নিজে বৈঠকখানার ঘর থেকে প্রস্থান করল। মহেন্দ্র নারায়ণ সাথে সাথে উঠে গিয়ে এবার বৈঠকখানার দরজা টা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তিনি পাঞ্জাবী র পকেট থেকে একটি খাম বের করে অজিতেশের হাতে দিয়ে বললেন, "দেখুন অজিতেশ বাবু,এই চিঠিটা আজ সকালে পেয়েছি।" অজিতেশ চিঠিখানি হাতে নিয়ে খাম খুলে...চিঠি টা মনোযোগ সহকারে পড়ল। তারপর , সে কয়েক মুহূর্ত গম্ভীর ভাবে চুপচাপ বসে রইল। আমি এবার চিঠিটা হাতে নিয়ে ভালো করে পড়লাম। চিঠির লেখাগুলো পড়ে আমার রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল যেন...! চিঠি তে লেখা রয়েছে, 'অতীতের ঋণ কখনও মুছে যায় না। তোমাদের বংশের যে পাপ এতদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল, তার বিচার এবার হবে। তিনটি রক্তঋণ শোধ হয়েছে। কালীপূজার অমাবস্যায় শেষ প্রদীপটিও নিভে যাবে। তোমার রাজবাড়ির উঠোনেই এবার ফুটবে শেষ রক্তজবা। তুমি প্রস্তুত হও, মহেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল, তোমার অন্তিম লগ্নের শুভ সূচনা হতে চলেছে খুব শীঘ্রই।' চিঠির নিচে লাল কালিতে একটি ত্রিশূলের চিহ্ন স্বরূপ একটা অদ্ভুত সাংকেতিক চিহ্ন! ওই চিঠি পড়ে আমি শিউরে উঠে বলে উঠলাম। "কি সাংঘাতিক!এ তো সরাসরি খুনের হুমকি!" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু ক্লান্ত গলায় বললেন, "জানেন অজিতেশ বাবু, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, কোনও শত্রু আমাকে ভয় দেখাতে চাইছে। কিন্তু যখন শুনলাম, আমার বাড়ির পিছনেই একটা খুন হয়েছে, তখন বুঝলাম বিষয়টা এত সহজ নয়।" অজিতেশ এবার চিঠিটা আলোয় ধরে ভালো করে নিরীক্ষণ করল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল, "এই চিঠিটা কখন হাতে পেয়েছেন মহেন্দ্র বাবু?" মহেন্দ্র বাবু ভীত সন্ত্রস্ত কন্ঠে বলে উঠলেন, "আজ সকাল আটটার দিকে। সদর দরজার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই চিঠি।" "কে প্রথম চিঠিটা দেখেন?" "এই চিঠি প্রথমে আমাদের পুরোনো কর্মচারী হরিপদ র চোখে পড়েছে।" "আচ্ছা,তা তিনি এখন কোথায়?" "সে এখন এই বাড়িতেই আছে।" অজিতেশ এবার চিঠিটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, "চিঠিটা পাওয়ার পর আপনি কি করেছিলেন?" মহেন্দ্র বাবু কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলেন, "প্রথমটায় আমি কাউকে কিচ্ছুটি বলিনি। চিঠির ব্যাপার টা পুরোপুরি গোপন ই রেখেছিলাম। কিন্তু তারপর আজ সকালে যখন এই ঘোষাল রাজবাড়ীর লাগোয়া জায়গায় ওই নৃশংস খুনের খবর টা পেলাম, তখন আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। আমি সাথে সাথে ইনস্পেক্টর রতনপুরীকে টেলিফোনে সব জানাই।" অজিতেশ বলে উঠল, "আচ্ছা মহেন্দ্র বাবু,আপনার কি মনে হয়, এই হুমকির সঙ্গে আপনার পারিবারিক অতীতের কোনও সম্পর্ক আছে?" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু এবার হঠাৎ যেন চুপ করে গেলেন। কিছুক্ষণ গম্ভীর ভাবে চুপচাপ শুধু চেয়ে রইলেন রূপোর পেপার ওয়েট টার দিকে। বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ,তিনি ধীরে ধীরে বলে উঠলেন,  "অজিতেশ বাবু, আসলে...আমাদের পরিবারের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে আমি একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না।আমার ঠাকুরদার আমলে জমিজমা নিয়ে অনেক বিবাদ হয়েছিল। কয়েকজন প্রজার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও ছিল। তবে সেসব ঘটনার সঙ্গে আজকের খুনের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা আমার জানা নেই।" অজিতেশ বলে উঠল, "অতীতের কোনো অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ এই কাজ করতে পারে। আবার সেই ধারণাটাকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোনও উদ্দেশ্যও চরিতার্থ করতে পারে কোনো অজ্ঞাত শত্রু। আপাতত কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।" তারপর সে চিঠিটা আবার হাতে তুলে নিয়ে ওই ত্রিশূলের চিহ্নটা খুব মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে লাগল।আর সেই সঙ্গে ওই সাংকেতিক চিহ্নটার মানে অনুধাবন করার চেষ্টা করতে লাগল। ওই সাংকেতিক চিহ্ন টা দেখে আমার যেন মনে হল, ওটা হয়তো কোনো একটা চাবির অগ্রভাগের ছবি! ঠিক এই সময়ে, বৈঠকখানার দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ হল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে, মহেন্দ্র বাবু সন্তর্পনে উঠে গিয়ে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,"কে?কি চাই?" দরজার ওপাশে রতন পুরীর গলা শোনা গেল। মহেন্দ্র বাবু নিশ্চিন্তে দরজা খুলে দিলেন।রতন পুরী ঘরের ভিতরে ঢুকে আসতেই মহেন্দ্র বাবু আবার বৈঠকখানার দরজা টা আগের মতো বন্ধ করে দিলেন। রতন পুরী এবার আমাদের সাথে এসে এই আলোচনায় যোগ দিলেন। আমি রতন পুরীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম, "আচ্ছা রতন বাবু,ওই তিনটি খুনের পাশে যে চিরকুট পাওয়া গিয়েছে, তার সঙ্গে কি মহেন্দ্র বাবুর কাছে আসা এই উড়ো চিঠির কোনও মিল পাচ্ছেন আপনি?" রতন পুরী বলে উঠলেন, "দেখুন সুজিত বাবু,লালবাজারে রাখা চিরকুট গুলোর ওপরে যে চিহ্ন আঁকা রয়েছে, মহেন্দ্র বাবুর কাছে আসা এই উড়ো চিঠিতেও কিন্তু ওই একই ধরনের চিহ্ন রয়েছে। এখানেই স্পষ্টভাবে বলা যায়,ওই চিরকুট ও এই চিঠি একসূত্রে গাঁথা হয়ে রয়েছে।তবে এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য এখানেই, ওই চিরকুট গুলোতে শুধুমাত্র তন্ত্র সাধনার শ্লোক লেখা ছিল। আর মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর কাছে আসা এই চিঠিতে তো সরাসরি খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।" অজিতেশের চোখ দুটো এবার শিকারি বাঘের মতো প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল যেন...! অজিতেশ বলে উঠল,"তা হলে খুনি প্রতিটা ক্ষেত্রেই একই প্রতীক ব্যবহার করছে, কিন্তু ওর বার্তার ধরনটা বদলাচ্ছে। এটা কিন্তু লক্ষ করার মতো একটা বিষয়।" মহেন্দ্রনারায়ণবাবু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, "আমার কি তা হলে আজ রাতের পুজো বন্ধ করে দেওয়া উচিত?" রতন পুরী উত্তর দেওয়ার আগেই অজিতেশ বলল, "পুজো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আপনার। কিন্তু মনে রাখবেন, পুজো বন্ধ করলেই যে বিপদ কেটে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আমাদের জানতে হবে, কে আপনার মৃত্যু কামনা করছে এবং কেন।তার উদ্দেশ্যটাই বা কি...!" দৃশ্য চার মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা আবার সেই দীর্ঘ করিডরে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন আতশবাজির শব্দে আকাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে। দূরের বাড়িগুলোয় প্রদীপ জ্বলছে। কিন্তু এই রাজবাড়ির ভিতরে যেন উৎসবের কোনও ছোঁয়াই নেই। অজিতেশ হঠাৎ আমাকে বলল, "সুজিত, তুমি কি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ?" আমি বলে উঠলাম, "কী ব্যাপার অজিতেশ?" অজিতেশ বলে উঠল, "ওই চিঠিতে লেখা হয়েছে, 'তিনটি রক্তঋণ শোধ হয়েছে'। কিন্তু খুনি কেন নিজেকে প্রতিশোধ পরায়ণ বলে পরিচয় দিতে চাইছে? সে যদি সত্যিই কোনও গুপ্ত তান্ত্রিক সাধনা সম্পূর্ণ করতে চায়, তা হলে প্রতিশোধের কথা বলার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি?" আমি একটু ভেবে বললাম, "হ্যাঁ, এই কথাটা তো ঠিকই বলছে তুমি।তা হলে কি এই তন্ত্রসাধনার ব্যাপারটা লোক দেখানো?" অজিতেশ চিন্তিত স্বরে বলে উঠল, "হ্যাঁ সুজিত,সেই সম্ভাবনা কিন্তু যথেষ্ট। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি,...এই তিনজন মৃত ব্যক্তির মধ্যে অন্তত দুজনের সঙ্গে এই রাজবাড়ির পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে।যে তিনজন খুন হয়েছেন তাদের একজন ছিলেন এই বাড়ির দেওয়ান রামচরণ মুখুজ্জে। আরেকজন হলেন মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর পারিবারিক ও ব্যবসায়ীক বন্ধু সুকুমার ভট্টাচার্য। আরেকজন হলেন এই ঘোষাল রাজবাড়ীর প্রাক্তন পুরোহিত। এখন আমাদের জানতে হবে, এই তিনজনের অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে কোনও সাধারণ সূত্র আছে কি না...যা এদের তিনজনকেই একসূত্রে গাঁথে।" রতনপুরী বলে উঠলেন, "আমি ইতিমধ্যেই লালবাজারে খবর পাঠিয়েছি। ওই তিনজনের ব্যক্তিগত নথি এবং পরিচিতদের সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।" অজিতেশ বলল, "ভালো।এই সবকিছুর সাথে সাথে রাজবাড়ির কর্মচারীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।" ঠিক সেই সময় করিডরের অন্য প্রান্ত থেকে একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এলেন। তাঁর গায়ে মলিন ধুতি, কাঁধে গামছা। মুখে বয়সের ছাপ থাকলেও চোখ দুটো বেশ সতর্ক। মহেন্দ্রনারায়ণবাবু তাঁকে দেখে বললেন, "এই যে হরিপদ, এঁদের একটু বলো তো, আজ সকালে তুমি সদর দরজার কাছে কী দেখেছিলে।" এই সময়ে হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে একটা ভগ্ন নারী কন্ঠ শোনা গেল। ---"ওগো... একবারটি এদিকে শুনে যাও...!" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন,"অজিতেশ বাবু... রতন বাবু... আমাকে মাফ করবেন... আপনাদের বৌঠান বিছানা আর হুইলচেয়ারের বাইরে আর কোনো নাড়াচাড়া করতে পারেন না ‌। তাঁর বোধহয় কিছু দরকার পড়ল... আমি নিজে গিয়ে একবার টি দেখে আসি...!" অজিতেশ বলে উঠল,"হ্যাঁ মহেন্দ্র বাবু... আপনি নিশ্চিন্ত বৌঠানের কাছে যান। আমরা এদিকে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সারছি এখন...!" মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু হন্তদন্ত হয়ে ভিতরে চলে গেলেন। অজিতেশ এবার হরিপদ র দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে উঠল,"হরিপদ,আজ সকালে তুমি সদর দরজার কাছে কি দেখেছিলে?" লোকটি হাত জোড় করে বলল, "আজ্ঞে,আজ সকালবেলা আমি উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে দেখি, সদর দরজার কাছে একটা খাম পড়ে আছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, কোনও চিঠিপত্র হবে। পরে খামটা আমি বাবুর হাতে দিই।" অজিতেশ জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি কাউকে দরজার কাছে আসতে দেখেছিলে?" "না বাবু। তবে হ্যাঁ,রাতের দিকে অবশ্য একজন লোককে আমি দেখেছিলাম।" এই কথাটা শুনে আমরা সবাই চমকে উঠলাম। রতন বাবু তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, "কী বললে? কাকে দেখেছিলে?" হরিপদ একটু ইতস্তত করে বলল, "আজ্ঞে,গতকাল রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ পিছনের উঠোনের দিক থেকে আমি একজনকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলাম। তবে তার মুখটা আমি ভালো করে দেখতে পাইনি।তার গায়ে...তার গায়ে একখানি কালো চাদর ছিল।" "তুমি তখন কাউকে খবর দাওনি কেন?" রতনপুরী গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন। হরিপদ বলে উঠল,"আজ্ঞে...আমি ভেবেছিলাম,সে এই বাড়িরই কেউ হবে। এখন তো পুজোর সময়...এই সময়ে এই বাড়িতে কত লোক আসে যায়, আমি ভেবেছিলাম তাদের ই কেউ হবে।" অজিতেশ এবার শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা,লোকটা কোন দিকে গিয়েছিল?" হরিপদ বলে উঠল, "আজ্ঞে,সে করিডোরের শেষ ঘরটার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।" "সেই ঘরের দরজার চাবি কার কাছে থাকে?" হরিপদ মাথা নিচু করে বলল, "ওই চাবি আগে মহেন্দ্র বাবুর ছোটভাই অর্থাৎ ছোটবাবু ননীগোপাল বাবুর কাছে থাকত। এখন কার কাছে আছে, জানি না।" এইবার আমি অজিতেশের দিকে তাকালাম। হরিপদের মুখে ননীগোপালের নামটা শোনার পর অজিতেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরস্বরে বলল, “আচ্ছা হরিপদ, তুমি বললে, ছোটবাবুর কাছে আগে ওই পিছনের দরজার চাবি থাকত। কিন্তু ঠিক কতদিন আগে সেই চাবি তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা কি তুমি জানো?” হরিপদ একটু ভেবে বলল, “আজ্ঞে, তা...বছর দুয়েক তো হবেই। তখন ছোটবাবু আর বড়বাবুর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে খুব ঝামেলা চলছিল। একদিন বড়বাবু রাগ করে ছোটবাবুকে বলেছিলেন, ওই বাড়ির কোনও চাবি যেন আর তাঁর হাতে না থাকে। তারপর থেকে ছোটবাবুর কাছে আর  ওই চাবি দেখা যায়নি।” “তাহলে এখন চাবিটা কার কাছে থাকে?” “আজ্ঞে, সেটা আমি বলতে পারব না বাবু। বড়বাবুর কাছে থাকতে পারে। আবার বাড়ির পুরোনো কর্মচারী রামদীনও হয়তো জানে।” অজিতেশ এবার রতনবাবুর দিকে তাকাল। “রতনবাবু, রামদীন বলে এই বাড়িতে একজন কর্মচারী রয়েছে, তাই তো?” রতনবাবু মাথা নেড়ে বলে উঠলেন,"হ্যাঁ অজিতেশ বাবু। আমি তো রামদীন কে দেখেছি‌। তবে হ্যাঁ, ওই লোকটাকে আজ সন্ধের পর থেকে আর দেখা যায়নি। শুনেছি, শরীর খারাপ বলে ও নিজের ঘরে শুয়ে রয়েছে দরজা বন্ধ করে।” এই কথাটা শুনে আমার কেমন যেন খটকা লাগল। যে বাড়িতে পরপর তিনটি খুনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, সেই বাড়ির দুজন কর্মচারীর একজন রহস্যময় লোকের গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে, আর অন্যজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে! তবে এই ঘটনাটা নিছক কাকতালীয়ও হতে পারে, আবার এর পিছনে অন্য কোনও কারণ থাকাও নেহাত অসম্ভব নয়। অজিতেশ এবার হরিপদকে জিজ্ঞাসা করল, “হরিপদ,তুমি কি জানো, রামদীন কতদিন ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে?” “আজ্ঞে বাবু, ও তো আমারও আগে থেকে রয়েছে এই ঘোষাল রাজবাড়ী তে।" অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল,"তা মোটামুটি কতদিন হবে?" হরিপদ মাথা চুলকে বলে উঠল,"আজ্ঞে...তা প্রায় পঁচিশ বছর তো হবেই।” আমি বলে উঠলাম,"রামদীন এই বাড়ির পুরোনো সব ঘটনা জানে নিশ্চয়ই?” হরিপদ একটু ইতস্তত করে বলল, “আজ্ঞে জানে তো বটেই বাবু। তবে সব কথা যে মুখ ফুটে বলে, তা কিন্তু নয়।” অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “কেন?” হরিপদ এবার এমনভাবে চারদিকে তাকাল, যেন দেওয়ালেরও কান রয়েছে। তারপর সন্তর্পনে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আজ্ঞে, এই বাড়ির পুরোনো দলিলঘর নিয়ে ওকে একবার কথা বলতে শুনেছিলাম। অনেক বছর আগে ওই ঘরে নাকি এমন কিছু কাগজ রাখা ছিল, যা প্রকাশ্যে এলে ঘোষাল পরিবারের অনেকেরই নাকি ভীষণ বিপদ হতে পারত।” এই কথাটা শুনে অজিতেশের চোখে মুহূর্তের জন্য একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল। সে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা...সেগুলো ঠিক কী ধরনের কাগজ...সে বিষয়ে তুমি জানো কিছু?” হরিপদ বলে উঠল, “আজ্ঞে...তা আমি জানি না বাবু। রামদীন ওসব কথা কাউকে কিছু বলেনি। শুধু একদিন অন্য একজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলার সময় বলেছিল, ‘সব সত্যি কাগজে লেখা থাকে না। কিছু সত্যি চাপা থাকাই ভালো।" অজিতেশ আর কোনও প্রশ্ন করল না। তবে আমি বুঝতে পারলাম, দলিলঘর সম্পর্কে হরিপদের এই কথাটা ওর মনে গভীর রেখাপাত করেছে। হরিপদ চলে যাওয়ার পর আমি বললাম, “অজিতেশ, ওই ঘরে নিশ্চয়ই কোনও গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে। তা না হলে এত গোপনীয়তা কেন?” অজিতেশ শান্তভাবে উত্তর দিল, “সেটা ঠিক। তবে পুরোনো দলিলঘর আর তিনটি খুনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনও আমাদের জানা নেই। মনে রেখো, কোনও রহস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হওয়া আর সত্যিই সেই রহস্যের অংশ হওয়া কিন্তু এক ব্যাপার নয়।” অজিতেশ এবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তে করিডরের দিকে তাকাল। রতন পুরী বলে উঠলেন,"অজিতেশ বাবু... এবার?" অজিতেশ হাত ঝেড়ে বলে উঠল, “চলুন রতন বাবু, রামদীনের সঙ্গে একবার কথা বলা যাক।” দৃশ্য ছয় রামদীনের ঘরটি ছিল একতলার উত্তর-পশ্চিম কোণে। সরু সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা ছোট উঠোন পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়। ঘরের সামনে রয়েছে একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চ, তার পাশে কয়েকটা ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল পড়ে রয়েছে। ওই ঘরের দরজার কাছে গিয়ে অজিতেশ কড়া নাড়ল। ভিতর থেকে দুর্বল গলায় উত্তর এল, “কে?” “আমরা একটু কথা বলতে এসেছি। দরজাটা খুলুন।” কিছুক্ষণ পর দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল। রামদীন কে দেখামাত্র ই আমার মনে হল, লোকটা সত্যিই অসুস্থ। লোকটার মুখটা একেবারে শুকনো হয়ে রয়েছে, চোখের নিচে কালি, আর গায়ে একটা পুরোনো চাদর জড়ানো রয়েছে। তবে আমাদের দেখে তার মুখে যে অস্বস্তি ফুটে উঠল, সেটা শুধু অসুস্থতার কারণে হয়েছে বলে কিন্তু আদৌ মনে হল না আমার। অজিতেশ বলে উঠল, “আপনি অসুস্থ শুনলাম।তা... এখন আপনার শরীর কেমন আছে?” “এই একটু জ্বরজ্বর লাগছে বাবু। বয়স হয়েছে তো, তাই এই শরীরে আর আগের মতো সয় না। আপনারা দাঁইড়ে কেনে...ভিতরে আসেন...!” আমার কেন জানি না শুধু মনে হতে লাগল, আমরা শুধু শুধু একজন অসুস্থ মানুষ কে বিরক্ত করতে আসলাম।রামদীন আমাদের ভিতরে আসার জন্য আহ্বান জানাতে... আমরা একটু ইতস্তত বোধ ই করছিলাম। কিন্তু এখন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে সবটা জানা সত্যিই খুব দরকার।  রতন পুরী একটু আগেই থানার দিকে রওনা দিলেন। আমি আর অজিতেশ রামদীনের এই ঘরে এসে চারপাশটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম ‌। অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “তা...আপনি কতদিন ধরে এই বাড়িতে কাজ করছেন?” “আজ্ঞে... তা মোটামুটি পঁচিশ বছর তো হবেই।” “আচ্ছা রামদীন...এই বাড়ির পুরোনো দলিল ঘর সম্পর্কে আপনি কি কিছু জানেন?” অজিতেশের মুখে এই প্রশ্নটা শোনামাত্র রামদীনের চোখের পাতা যেন কেঁপে উঠল। নিজের ভীত সন্ত্রস্ত ভাবটা কোনোমতে যেন সামলে নিল রামদীন। মুখে সে বলে উঠল, “দলিলঘর? ওখানে তো পুরোনো কাগজপত্র ছাড়া আর কিছুই তো নেই বাবু।” অজিতেশ মৃদু হেসে বলল, “আমি তো এখনও বলিনি, ওই ঘরে অন্য কিছু রয়েছে। আপনি আগেভাগেই সে কথা বলছেন কেন?” রামদীন যেন নিজের ভুল বুঝতে পেরে কেমন যেন থমকে গেল। তারপর কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল, “না বাবু, আসলে আমি বলতে চাইছিলাম, ওই ঘরে ওই কাগজপত্র ছাড়া আর কিছু থাকার কথাও নয় এমনিতে।” অজিতেশ বলে উঠল, “বেশ। তা হলে আপনি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। গত কয়েক দিনে আপনি কি ওই ঘরের আশেপাশে গিয়েছিলেন কোনো দরকারে?" রামদীন কম্পিত কন্ঠে বলে উঠল, “না বাবু।ওদিক পানে তো আমি যে যাইনি!” অজিতেশ এবার রামদীনের দিকে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠল, “ওদিকে একেবারেই যাননি? একটু ভালো করে মনে করে দেখুন তো...” রামদীন সাথে সাথে বলে উঠল, “আজ্ঞে, না বাবু। ওদিকে কেন যেতে যাব! ওদিকে তো আমার কোনো কাজ নেই...।” অজিতেশ এবার আর কিছু বলল না। ও বরং ঘরের ভিতরে একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিল। আমিও ঘরের ভিতরটায় ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিলাম ‌।একটা কাঠের খাট, ছোট টেবিল, দেওয়ালে ঝোলানো কয়েকটা পুরোনো জামাকাপড় আর জানলার পাশে একটা লোহার সিন্দুক... এছাড়া এই ঘরের ভিতরে আর বিশেষ কিছুই ছিল না। তবে এসবের মধ্যেই আমি একটা জিনিস লক্ষ করলাম‌। আমি দেখলাম, ওই লোহার সিন্দুকটার ওপর একটা ছোট্ট পিতলের চাবি পড়ে রয়েছে। অজিতেশও বোধহয় সেটা লক্ষ করেছিল। কিন্তু সে তখন চাবির বিষয়ে কোনও প্রশ্নই করল না।ও বরং উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল, “বেশ, আপনি বরং এখন বিশ্রাম নিন। পরে যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আবার কথা বলব।” রামদীন হাতজোড় করে বলে উঠল,"জ্বি হুজুর...!" এরপর আমরা রাম দীনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। রাম দীনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর আমি ফিসফিস করে অজিতেশের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম, “অজিতেশ, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে,লোকটা কিছু একটা লুকোচ্ছে। ওই দলিলঘরের নাম শুনেই ওর মুখের ভাব কিরকম বদলে গেল এটা লক্ষ্য করেছ তো তুমি?” অজিতেশ বলে উঠল, “হ্যাঁ সুজিত। তুমি একদম ঠিক বলেছ।কিন্তু তুমি একটা বিষয় লক্ষ করেছ? আমার প্রশ্নের উত্তরে ও শুধু এটাই বলল, ওই ঘরে পুরোনো কাগজপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই।অথচ আমরা ওকে শুধু ওই ঘরটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।” আমি বলে উঠলাম, “হ্যাঁ,এটা আমিও লক্ষ্য করেছি...কিন্তু একটা সোজা প্রশ্নের উত্তর এরকম ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়ার মানে কি?” অজিতেশ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, “তার মানে এটাই, ওই দলিলঘর নিয়ে ওর মনে আগে থেকেই একটা নির্দিষ্ট ধারণা রয়েছে। এখন সেটার ব্যাপারেই বিস্তারিত জানতে হবে আমাদের।” আমি বলে উঠলাম, “আচ্ছা অজিতেশ, তোমার কি মনে হয়, ও-ই সেই কালো চাদর পরা লোকটা কি আসলে রামদীন?” অজিতেশ মাথা নাড়ল। তারপর বলে উঠল, “সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না সুজিত। হরিপদ ওই লোকটিকে দেখেছে পিছনের উঠোনের দিক থেকে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু তার মুখ সে দেখেনি। আর কালো চাদর পরা লোকটির পরিচয় যে রামদীনই হবে, এমন কোনও প্রমাণও কিন্তু আমাদের কাছে নেই।” অজিতেশ আর আমি এরপর,এহেন নানাবিধ আলোচনা করতে করতে আবার দোতলার দিকে উঠে এলাম। দোতলার সিঁড়ির মাথায় পৌঁছতেই দেখলাম, সামনে ননী গোপাল দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাদের দেখে তিনি যেন একটু চমকে উঠলেন। তারপর যেন একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলে উঠলেন, “নমস্কার...আমি ননী গোপাল। আপনিই নিশ্চয়ই অজিতেশ বক্সী তাই না?" অজিতেশ বলে উঠল,"আজ্ঞে হ্যাঁ ননী গোপাল বাবু।আমিই সত্যান্বেষী অজিতেশ বক্সী।" তারপর আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে উঠল, "আর ও হল আমার বন্ধু লেখক সুজিত বন্দোপাধ্যায়।" ননী গোপাল বাবু বলে উঠলেন, "তা বেশ বেশ...তা আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন?” অজিতেশ উত্তর দিল, “আসলে...এই বাড়ির কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছিলাম আর কি। বুঝতেই তো পারছেন...এই ঘোষাল রাজবাড়ীর কাছেই এত নৃশংস একটা খুন হয়ে গিয়েছে...!” ননীগোপাল বাবু এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে উঠলেন, “হুমম...বুঝলাম। তবে একটা কথা বলে রাখি, এই বাড়ির ভিতরে কিন্তু অনেক পুরোনো শত্রুতার কালো দাগ রয়েছে। বাইরের লোকের পক্ষে সবকিছু বোঝা অতটাও সহজ হবে না।” অজিতেশ এবার তাঁর মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলে উঠল, “হ্যাঁ, সেটা আমি বুঝতে পারছি।আর সেই কারণেই তো আপনাদের সাহায্য চাইছি, ননীগোপালবাবু।” ননীগোপাল বাবু এবার যেন কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তারপর হঠাৎ একটা পাল্টা প্রশ্ন করে বসলেন, “তা...আপনারা কি ডাক্তার অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে কথা বলেছেন?” এই প্রশ্নটা শুনে এবার অজিতেশের চোখে একটা ক্ষীণ কৌতূহল দেখা দিল। “ডাক্তার অনিরুদ্ধ? তিনি কে” ননীগোপাল এবার ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বলে উঠলেন, “না, বিশেষ কিছু নয়। তবে ওঁকে নিয়ে আমার হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল।” অজিতেশ বলে উঠল, “কী কথা?” ননী গোপাল বাবু বলে উঠলেন, “জানেন,বহু বছর আগে, এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তখন ডাক্তার অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে আমাদের পরিবারের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর ধীরে ধীরে এই সুমিষ্ট সম্পর্কটা কেমন যেন বদলে যায়।” অজিতেশ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, “কী ঘটনা ঘটেছিল?” ননী গোপাল বাবু বলে উঠলেন,"দেখুন, এখন দাদার ওপর বিপদের খাড়া ঝুলছে।তাই আপনাদের এখানে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।আপনারা খুনি‌কে ধরুন। কিন্তু এই ঘোষাল রাজ পরিবারের আভ্যন্তরীন বিষয়ে যত কম মাথা ঘামাবেন তত আপনাদের জন্য মঙ্গল।আর আমার মন বলছে, ওই ডা.অনিরুদ্ধ ই শুধু নন, এই চন্ডীপুর গ্রামের কালী মন্দিরে চন্দ্র ভৈরব নামে এক তান্ত্রিক এসে ঘাঁটি গেড়েছে কয়েকদিন ধরে ‌। ওই ভন্ড লোকটা দিনরাত শুধু তন্ত্র মন্ত্র নিয়ে পড়ে থাকে। আমি দাদাকে বারবার বলেছিলাম, ওই ভন্ড লোকটাকে এই ঘোষাল পরিবারের কালীপূজোর দায়িত্ব দিও না।। কিন্তু কে শোনে কার কথা...! কালী মা কে সন্তুষ্ট করার জন্য ওই লোকটাই যে নরবলি দিচ্ছে না,এ বিষয়ে আমি অন্তত নিশ্চিত হতে পারছি না। তারপর আর কোনও কথা না বলে তিনি অতি দ্রুতবেগে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। আমি এবার অজিতেশকে বললাম, “এ তো আরও দুটো নতুন রহস্য সামনে এল! ওই অনিরুদ্ধ বাবুর সঙ্গে এই ঘোষাল পরিবারের একটা পুরোনো সম্পর্ক ছিল, এই পর্যন্ত জানা গেল, কিন্তু ননী গোপাল বাবু সেটা আমাদের কাছে আর পরিষ্কার করে বললেন না।আর তাছাড়া ওই কালী সাধক চন্দ্র ভৈরব ও তো সন্দেহের উর্দ্ধে নয়....!” অজিতেশ চিন্তিত স্বরে বলল, “হ্যাঁ। ননী গোপাল বাবু তো নিজে এসব কথা তুলেছেন। কিন্তু কেন?এর পিছনে তাঁর উদ্দেশ্যটাই বা কি?তিনি কি সত্যিই আমাদের সাহায্য করতে চাইছেন, নাকি ইচ্ছা করেই সন্দেহের তীর টা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন? বুঝলে সুজিত...রহস্য ক্রমশ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। আমাদের এখন রহস্যের আরো গভীরে যেতে হবে।” দৃশ্য সাত এখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। ঠাকুরদালানে পূজোর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাড়ির বাইরে মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে। বাজির শব্দে মাঝে মাঝেই কথাবার্তা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমি আর অজিতেশ বৈঠকখানার পাশের ঘরে বসে চা খাচ্ছিলাম। এমন সময় মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু এই ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি লক্ষ্য করলাম,তাঁর মুখে ক্লান্তি থাকলেও আগের তুলনায় যেন কিছুটা স্থিরতা ফিরে এসেছে। তিনি ঘরে প্রবেশ করে আমাদের সামনে বসলেন । তারপর বলে উঠলেন, “অজিতেশবাবু, আমার মনে হয়, এখন ই আপনাদের একটা কথা জানানো খুব দরকার।” এই কথা শুনে অজিতেশ কাপটা নামিয়ে রাখল। তারপর বলে উঠল, “কি কথা মহেন্দ্র বাবু, আপনি নিঃসংকোচে বলুন।” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, “আসলে...আজ বিকেলে আমার কিছু পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আমার হাতে একটা অদ্ভুত ধরনের চিঠি এসেছে। চিঠিটা দেখে আমার মনে হল, চিঠি টা বহু বছরের পুরোনো। কিন্তু বর্তমানে ঘটে চলা এইসব ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই চিঠির কিছুটা মিল রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে আমার।” এই কথা শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমি বলে উঠলাম, “কী লেখা রয়েছে ওই চিঠিতে?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু এবার তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা হলদেটে কাগজ বের করলেন। আমি লক্ষ্য করলাম,কাগজের ভাঁজে ভাঁজেই তার বার্ধক্যের ছাপ একেবারে স্পষ্ট। কালির রং একেবারেই ফিকে হয়ে এসেছে। উপরে কোনও তারিখ নেই, কোনো প্রেরকের নামও নেই। মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু চিঠি টা অজিতেশের হাতে দিলেন। অজিতেশ এবার কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। চিঠিতে লেখা রয়েছে, ‘যে হিসেব একদিন অসমাপ্ত রেখে এসেছিলে, তার হিসেব একদিন না একদিন চোকাতেই হবে। বাড়ির দেওয়াল যত উঁচুই হোক, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সত্যকে চিরকাল আটকে রাখা যায় না। যে রক্তের দাগ মুছে ফেলতে চেয়েছিলে একদিন, সেই দাগই একটা সময়ে তোমাদের দরজায় ফিরে আসবে।’ চিঠিটা পড়ে আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এ যেন বর্তমানের সেই হুমকিরই বহু পুরোনো প্রতিধ্বনি! অজিতেশ ভালো করে কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখল।না... চিঠির পিছনের দিকে কোনও লেখা নেই। তবে হ্যাঁ , চিঠির নিচের কোণে পেনসিলে আঁকা একটা অদ্ভুত চিহ্ন রয়েছে। চিহ্নটা ঠিক ত্রিশূলের মতো নয়, আবার পুরোপুরি ত্রিশূল ভিন্ন অন্যরকম কিছু বলেও মনে হল না আমার। চিহ্ন টা আসলেই,তিনটি সরু ছোটবড় রেখা ভিন্ন আর কিছুই নয়... এমন একখানি চিহ্ন দেখে আমার মাথার ভিতরে নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করতে শুরু করল। অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “মহেন্দ্রবাবু, এই চিঠিটা আপনি কোথায় পেয়েছেন?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, “আমার বাবার পুরোনো আলমারিতে ছিল এই চিঠি টা। ওই আলমারির ভিতরে কয়েকটা দলিলের সঙ্গে রাখা ছিল।” অজিতেশ সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলে উঠল, “আপনি কি জানেন, কে চিঠিটা লিখেছিল?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, “না। তবে আমার মনে হয়, এটা আমার বাবার উদ্দেশেই লেখা হয়েছিল।” ----“আপনার বাবা কি এই চিঠির কথা কখনও আপনাকে বলেছিলেন?” মহেন্দ্রনারায়ণবাবু মাথা নাড়লেন। তারপর বলে উঠলেন, “কখনও না। বরং ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, বাবা ওইসব পুরোনো কাগজপত্র কখনো কাউকে ঘাঁটতে দিতেন না। এমনকি আমি কিছু জানতে চাইলেও তিনি রেগে যেতেন সবসময়।” অজিতেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা মহেন্দ্র বাবু,আপনার বাবার মৃত্যুর আগে কি কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বলে উঠলেন, “আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বেশ কিছু বলতে হয়। আসলে...আমার বাবার মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে আমাদের পরিবারের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁর নাম ছিল শশাঙ্কশেখর ঘোষাল। তিনি এই বাড়িতেই থাকতেন। একদিন সন্ধেবেলায় দোকানে যাওয়ার পর আর কোনোদিন ফিরে আসেননি। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল, কিন্তু তাঁর আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি কোনোদিন।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়...তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এই চিঠির কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বলে উঠলেন, “তা জানি না সুজিত বাবু। তবে শশাঙ্ক শেখর বাবু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে যে বাবার সঙ্গে তাঁর ভীষণ ঝগড়া হয়েছিল... এটা আমার বেশ মনে আছে। তবে ঠিক কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল, সেটা আমি কখনও জানতে পারিনি।” অজিতেশ এবার কাগজটা আবার হাতে তুলে নিল। তারপর বলে উঠল, “আচছা, এই শশাঙ্ক শেখর বাবুর সঙ্গে আপনার ভাই ননী গোপালবাবুর সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু একটু গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলেন, “ শশাঙ্কশেখরবাবু ওকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি যে সময়ে নিখোঁজ হয়ে যান, ওই সময়ে ননী গোপাল খুব ই ছোট ছিল ‌।” কথাটা শুনে আমার মনে একটা খটকা ভীষণভাবে আন্দোলিত হতে শুরু করল।," সম্পত্তির বিবাদই কি তবে এই সবকিছুর একমাত্র কারণ? নাকি বহু পুরোনো কোনও ঘটনা আজকের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে? অজিতেশ হঠাৎ প্রশ্ন করল, “মহেন্দ্রবাবু, আপনার বাবা কি ডাক্তার অনিরুদ্ধবাবুকে চিনতেন?” অজিতেশের মুখে এই প্রশ্নটা শুনে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু বিস্মিত হয়ে তাকালেন। তারপর বলে উঠলেন, “হ্যাঁ অজিতেশ বাবু,অবশ্যই চিনতেন। অনিরুদ্ধ বাবুর বাবা একসময় আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক খুব একটা ছিল না।” “আচ্ছা, আপনি কি বলতে পারেন...শশাঙ্ক শেখর বাবুর কোনো অসুস্থতায় তিনি চিকিৎসা তাঁর করেছিলেন?” মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলে উঠলেন, “সম্ভবত। তবে সেটা অনেক দিনের কথা। আমার ঠিক ভালোভাবে মনে নেই।” অজিতেশ আর কোনও প্রশ্ন করল না। ওই হলদেটে চিঠিটা সাবধানে ভাঁজ করে মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর হাতে ফিরিয়ে দিল। আমি বললাম, “অজিতেশ, তোমার কি মনে হয়...এই চিঠিটা কি খুনির পাঠানো বর্তমান চিঠির সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত?” অজিতেশ বলে উঠল, “হ্যাঁ সুজিত...সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করে দেখেছ সুজিত...এই পুরোনো চিঠিতে কিন্তু কোনও ত্রিশূলের ছবি নেই, আর বর্তমান চিঠির সঙ্গে তার লেখারও মিল আছে কি না, সেটা ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার। তবে আপাতত এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এই ঘোষাল পরিবারের অতীতে এমন কিছু ঘটেছিল, যার স্মৃতি এখনও কারও কাছে খুবই মর্মবিদারক!” মহেন্দ্রনারায়ণবাবু উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “আচ্ছা অজিতেশ বাবু, আপনার কি মনে হয়... এই খুনগুলোর পিছনে আমাদের পরিবারের কারোর হাত রয়েছে?” অজিতেশ শান্তভাবে উত্তর দিল, “দেখুন মহেন্দ্র বাবু,খুনি আপনার পরিবারের ভিতরের কেউ হতে পারেন, আবার বাইরের কেউও হতে পারেন। আবার কেউ পুরোনো কোনও ঘটনার সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার অভিপ্রায় নিয়েও এইসব অপকীর্তি ঘটাতে পারে।আমরা এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি।” দৃশ্য আট মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর সাথে কথাবার্তা শেষ করে আমরা যখন বৈঠকখানা থেকে বেরোলাম, তখন করিডরের শেষ প্রান্তে একজন অপরিচিত লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি লক্ষ্য করলাম,লোকটির পরনে একটা কালচে ধূসর পোশাক রয়েছে। মাথায় রয়েছে টুপি,আর তার মুখের অর্ধেকটা মাফলার দিয়ে ঢাকা। আমাদের দেখতে পেয়েই সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। অজিতেশ সাথে সাথে তাকে ডাকল, “এই যে, এদিকে একটু শুনুন!” লোকটি থামল, কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়াল না। অজিতেশ আবার একটু উঁচু গলায় বলে উঠল, “আপনি কি এই বাড়ির কর্মচারী?” এবার লোকটি ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল। তারপর নীচু স্বরে বলে উঠল, “না বাবু। আমি এই বাড়ির মন্দিরের কাজের লোক। পুরোহিতমশাই আমাকে একটা খবর দিতে পাঠিয়েছেন।” অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “কী খবর?” লোকটা আবার নিচু স্বরে বলে উঠল, “আজ্ঞে...আজ রাতের পূজোর জন্য কিছু অতিরিক্ত সামগ্রীর প্রয়োজন হয়েছে। সেই কথাই বড়বাবুকে জানাতে এসেছিলাম।” অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “আপনার নাম কী?” লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে উঠল, “আজ্ঞে...আমার নাম হরনাথ।” “তা আপনি কি রোজ এই মন্দিরে কাজ করেন?” “না বাবু। আমি ওই বিশেষ বিশেষ দিনে আসি।” অজিতেশ লোকটাকে আর কোনও প্রশ্ন করল না।ঐ বলে উঠল,"ঠিক আছে, আপনি আপনার কাজ করুন।" এই কথা শুনে, লোকটা প্রায় ছাড়া পাওয়া পাখির মতোই দ্রুতবেগে ছুটে বেরিয়ে গেল। লোকটি চলে যাওয়ার পর অজিতেশ আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “সুজিত, তুমি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ?” আমি বলে উঠলাম, “কী ব্যাপার অজিতেশ?” অজিতেশ একটা চুরুট ধরিয়ে বলে উঠল, “এই লোকটা আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ও বারবার ওর ডান হাতটা চাদরের ভিতরে লুকিয়ে রাখছিল। আর তাছাড়া...!" আমি জিজ্ঞাসা করলাম,"তাছাড়া কি অজিতেশ?" অজিতেশ চুরুটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল,"ওর জুতোর তলায় যে কাদা লেগে রয়েছে, সেটা কিন্তু আদৌ এই বাড়ির উঠোনের কাদার মতো নয়।” আমি বললাম, "তার মানে?" অজিতেশ বলে উঠল, “ হতে পারে ও জঙ্গল থেকে সোজা এখানে এসেছে।আবার রাজবাড়ির বাইরে অন্য কোনও জায়গা থেকেও আসতে পারে। শুধু কাদা দেখে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।” আমি উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলাম, “তাহলে এখন আমাদের কি করা উচিত? আমার মনে হচ্ছে, ওকে অনুসরণ করলে হয়তো কিছু বোঝা যাবে।" অজিতেশ মাথা নেড়ে বলে উঠল, “না সুজিত,আপাতত ওর পিছু নেওয়া টা উচিত কাজ হবে না ‌‌।লোকটা সত্যিই মন্দিরের কর্মচারী কি না, সেটা আগে যাচাই করা দরকার।” আমরা যখন সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছি, ঠিক তখনই ঠাকুরদালানের দিক থেকে চন্দ্রভৈরবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “সব পাপের বিচার এই জন্মেই হয় না। কিছু ঋণ থেকে যায়, যা একদিন না একদিন শোধ করতেই হয়।” কথাটা শুনে অজিতেশ হঠাৎ থেমে গেল। আমি বলে উঠলাম, “তান্ত্রিক চন্দ্রভৈরব!” অজিতেশ ধীরে ধীরে ঠাকুরদালানের দিকে এগিয়ে গেল। আমি তার পিছনে চললাম। চন্দ্রভৈরব তখন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর পরনে রয়েছে গেরুয়া বস্ত্র, গলায় ঝুলছে রুদ্রাক্ষের মালা। তাঁর চোখদুটো একদম স্থির, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য বিরাজমান। অজিতেশ ধীর পায়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলে উঠল, “আমার প্রণাম নেবেন গুরুজি‌। আচ্ছা, আমি আপনাকে সবরকম একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?" চন্দ্র ভৈরব গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,"বল...কি জানতে চাস!" অজিতেশ গলা খাকারি দিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠল,"আচ্ছা গুরুজি,আপনি কি একটু আগে কোনও বিশেষ ঘটনার কথা বলছিলেন?” চন্দ্রভৈরব এবার ধীরে ধীরে আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন, “বিশেষ ঘটনা? মানুষের জীবনটাই তো এক বিশেষ ঘটনা রে পাগল। কেউ নিজের পাপ ভুলে যায়, কেউ অন্যের পাপের বোঝা নিজের ঘাড়ে বয়ে বেড়ায়।” অজিতেশ মৃদু হেসে বলল, “আচ্ছা,আপনি কি ঘোষাল পরিবারের অতীত সম্পর্কে কিছু জানেন?” আমি লক্ষ্য করলাম, এবার চন্দ্র ভৈরবের মুখে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি বলে উঠলেন, “এই বাড়ির দেওয়াল অনেক কথা জানে। কিন্তু দেওয়াল কথা বলে না। আর মানুষ যা জানে, তার সবটুকু প্রকাশ করে না।” অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি শশাঙ্কশেখর ঘোষাল নামে কাউকে চিনতেন?” এই নামটা শুনেই চন্দ্রভৈরবের চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। “শশাঙ্কশেখর?” তিনি ধীরে ধীরে নামটা পুনরাবৃত্তি করে আবার উচ্চারণ করলেন। তারপর বলে উঠলেন, “এ তো অনেক দিনের পুরোনো নাম। কেন, হঠাৎ তাঁর খোঁজ করছিস কেন?” অজিতেশ বলে উঠল, “আসলে,তিনি বহু বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে শুনলাম।” চন্দ্রভৈরব এবার মুখ ফিরিয়ে প্রতিমার দিকে তাকালেন। তারপর বলে উঠলেন, “সব নিখোঁজ মানুষ হারিয়ে যায় না রে। কেউ কেউ এমন সত্যের মধ্যে হারিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ আর সে খুঁজে পায় না।” আমি তাঁর কথাটার কোনো অর্থ বুঝতে পারলাম না। অজিতেশও  আর কোনও মন্তব্য করল না। সে শুধু জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা,শশাঙ্ক শেখর বাবুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এই বাড়ির কোনও গোপন ঘটনার সম্পর্ক ছিল কিনা...এই বিষয়ে আপনি কি কিছু জানেন?” চন্দ্রভৈরব এবার আমাদের দিকে ফিরে বললেন, “সেই উত্তর আমার কাছে খুঁজতে আসিস না। এই বাড়িতে এমন মানুষ রয়েছেন, যাঁরা অতীতকে ভুলে থাকার ভান করেন। অথচ প্রতি বছর কালীপূজার রাতে তাঁদের চোখে আমি সেই একই ভয় দেখতে পাই।” “কার চোখে?” অজিতেশ প্রশ্ন করল। চন্দ্রভৈরব এবার আর অজিতেশের কথার কোনও উত্তর দিলেন না। বরং তিনি পূজোর প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অগত্যা...আমরা সেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। করিডরে ফিরে এসে  আমি আর থাকতে না পেরে,এবার অজিতেশকে বলে উঠলাম, “অজিতেশ, আমি একটা কথা বুঝতে পারছি না। ননীগোপাল, রামদীন, ডাক্তার অনিরুদ্ধ, আর এই চন্দ্র ভৈরব...এরা প্রত্যেকেই যেন এই বাড়ির কোনও না কোনও পুরোনো ঘটনার কথা জানে। অথচ কেউই পুরো কথাটা বলতে চাইছে না।” অজিতেশ বলে উঠল, “হ্যাঁ।আর এইটাই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সুজিত। প্রত্যেকে যেন রহস্যের একটা করে টুকরো আমাদের সামনে রাখছে, কিন্তু কোনও টুকরোই অন্যটার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।” আমি বলে উঠলাম, “তাহলে কি শশাঙ্কশেখরবাবুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এই তিনটি খুনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?” অজিতেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলে উঠল, “সম্ভবত...! কিন্তু আরও একটা বিষয় ভেবে দেখো। খুনি যদি সত্যিই পুরোনো কোনও অপরাধের প্রতিশোধ নিতে চায়, তা হলে সে কেন এমনভাবে তন্ত্রসাধনার চিহ্ন ব্যবহার করছে? আর মৃতদের হৃদপিণ্ডই বা কেন সরিয়ে নিচ্ছে? প্রতিশোধের জন্য এই অস্বাভাবিক পদ্ধতির কি আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে?” আমি অজিতেশের এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারলাম না। হঠাৎ এই সময়ে আমাদের পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে গেলেন এক অল্পবয়সী তরুণী।  আমি লক্ষ্য করলাম, মেয়েটির পরনে রয়েছে গাঢ় লাল  শাড়ি। তার হাতে রয়েছে একটা ছোট রুপোর থালা। ওই থালার ওপর কয়েকটি রক্তজবা ফুল রাখা আছে। তরুণীটি আমাদের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলেন। অজিতেশ নিচু স্বরে তাঁকে ডাকল, “একটু শুনবেন?” তরুণী থেমে গেলেন। অজিতেশ তার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি এই ঘোষাল পরিবারের সদস্য?” মেয়েটি সলজ্জ ভাবে বলে উঠল, “হ্যাঁ। আমি মহেন্দ্রনারায়ণবাবুর ভাইঝি, মাধুরী।” “এই ফুলগুলো কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” মাধুরী একটু ইতস্তত করে বললেন, “ওই ঠাকুর দালানে। পূজোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।” অজিতেশ এবার ওই রূপোর থালার দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, এখানে যে তিনটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে গিয়েছে,এটা আপনি জানেন কি?" মেয়েটি মাথা নিচু করে বলে উঠল,"হ্যাঁ,জানি।" অজিতেশ এবার জিজ্ঞাসা করল,"আচ্ছা,ডা.অনিরুদ্ধ রায় কোথায় থাকেন এটা আপনি জানেন?" মাধুরী বলে উঠলেন,"ডাক্তার কাকা তো দিনকয়েক ধরে নিখোঁজ! তাঁকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কিন্তু আপনি এইসব কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন?" অজিতেশ বলে উঠল, "কারণ আছে। আপনি আমাকে শুধু এটা বলুন, আপনি কি জানেন...তিনটি মৃতদেহের গলায় রক্তজবার মালা পাওয়া গিয়েছে?” মাধুরীর মুখটা এবার যেন মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল, “হ্যাঁ। শুনেছি।” “আপনার কি মনে হয়, এই ফুলের সঙ্গে খুনগুলোর কোনও সম্পর্ক আছে?” মাধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি জানি না। তবে একটা কথা বলব?” “বলুন।” তিনি গলা নামিয়ে বললেন, “গত কয়েক দিন ধরে এই বাড়িতে রক্তজবা ফুল নিয়ে অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন সকালে ঠাকুরদালানের সামনে তাজা রক্তজবা ফুল পড়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ রাতে সেখানে কোনও ফুল রাখা হয় না।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেউ কি ফুলগুলো সেখানে রেখে যায়?” মাধুরী মাথা নাড়লেন। তারপর বলে উঠলেন, “কোথা থেকে ওই ফুল আসে,তা কেউ জানে না। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, প্রতিদিন ফুলের সংখ্যা একটা করে বাড়ছে।” অজিতেশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “গতকাল সকালে কতগুলো ফুল পাওয়া গিয়েছিল?” “তিনটে।” “আর আজ?” মাধুরী থালার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, “চারটে।” আমার বুকের ভিতরটা এবার যেন কেঁপে উঠল। তিনটি খুন, তিনটি রক্তজবার মালা, আর আজ সকালে চারটি ফুল! তাহলে কি কেউ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের আগাম সংকেত দিচ্ছে? অজিতেশ অবশ্য কোনও মন্তব্য করল না। সে শুধু জিজ্ঞাসা করল, “এই ঘটনাটা আপনি মহেন্দ্রনারায়ণবাবুকে জানিয়েছেন?” মাধুরী মাথা নাড়লেন। তারপর বলে উঠলেন, “হ্যাঁ জানিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করেছেন।” “কেন?” মাধুরী এবার মুখ তুলে অজিতেশের দিকে তাকালেন। “সেটাই তো বুঝতে পারছি না। শুধু বলেছিলেন, পুরোনো কিছু ঘটনা আবার সামনে আসছে। আর সেগুলো সামনে এলে এই পরিবারের অনেকেরই বিপদ হবে।” কথাটা বলেই মাধুরী দ্রুতবেগে ঠাকুরদালানের দিকে চলে গেলেন। আমি অজিতেশের দিকে তাকিয়ে বললাম, “অজিতেশ, মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু আমাদের কাছে এতক্ষণ ধরে অনেক কথাই বললেন। অথচ এই ফুলের ঘটনাটা তো একবারও উল্লেখ করলেন না!” অজিতেশ ধীরে ধীরে বলল, “হ্যাঁ। তার মানে, তিনি হয় এই ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না, নয়তো ইচ্ছা করেই আমাদের কাছে বিষয়টা গোপন রেখেছেন।” আমি বললাম, “কিন্তু চারটে ফুলের সঙ্গে চতুর্থ খুনের কোনও সম্পর্ক আছে কি?” অজিতেশ আমার কথার কোনো উত্তর দিল না।সে শুধু ঠাকুরদালানের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিমার সামনে তখন প্রদীপের আলো দুলছে। ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উপরে উঠে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আর সেই আলো-আঁধারির মধ্যে, প্রতিমার পায়ের কাছে রাখা ফুলের থালার পাশে, আমি হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলাম। একটা ছোট্ট সাদা খাম। খামটার ওপর লাল কালিতে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ— ‘হিসেব এখনও বাকি।’ অজিতেশ ধীরে ধীরে খামটা তুলে নিল। খামটা খুলে তার ভিতরের কাগজটা বার করার সাথে সাথেই অজিতেশের চোখমুখের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে গেল‌। ওই কাগজে কোনও দীর্ঘ চিঠি লেখা নেই। সেখানে রয়েছে শুধুমাত্র একটা নাম, আর তার নিচে লেখা রয়েছে একটা তারিখ ও সময়, আর ডানদিকের কোণে আমাদের পরিচিত ওই অদ্ভুত বৃত্তের মধ্যে এখন আঁকা রয়েছে তিনটি রেখার চিহ্ন। ওই নামটা পড়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে অজিতেশের দিকে তাকালাম। কারণ নামটা ছিল... শশাঙ্কশেখর ঘোষাল। আমি হিসেব করে দেখলাম,যে তারিখ ও সময় উল্লেখ করা রয়েছে ওই কাগজে, ওই তারিখ এবং সময় টায় ছিল আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগের এক কালীপূজার রাত...! দৃশ্য নয়  রাত ঘনিয়ে এসেছে।অজিতেশ কিছুক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে ছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ছবিগুলো, পুরোনো চিঠি আর কালীমন্দির থেকে পাওয়া কাগজের টুকরোগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ সে বলল, “সুজিত, একটা ব্যাপার কি তোমার মাথায় এসেছে?” আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললাম, “কোন ব্যাপার?” “এই যে পঁচিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো একটা ঘটনা বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, অথচ ঘোষাল রাজবাড়ির কেউই সে সম্পর্কে মুখ খুলতে চাইছে না...কিন্তু এর কারণটা কী? তিন-তিনটে খুন হয়েছে। প্রত্যেকের বুক থেকে সন্তর্পনে হৃদপিণ্ড খুবলে নেওয়া হয়েছে। যারা খুন হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এই রাজবাড়ির পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবারই হত্যাকারী রেখে যাচ্ছে রক্তজবার মালা, সিঁদুরের দাগ আর সেই অদ্ভুত চিহ্ন। আমার মনে হয়, এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সূত্র খুঁজতে হলে আমাদের খুন হওয়া মানুষগুলোর অতীত ও ইতিহাস জানতে হবে।” আমি বলে উঠলাম, “হ্যাঁ, এই কথা টা তুমি ঠিক বলেছ অজিতেশ।কিন্তু সেই ইতিহাস আমরা জানব কীভাবে?দেখছ তো,রাজবাড়ির কেউ তো মুখ খুলতে রাজি নয়।” অজিতেশ মৃদু হেসে বলে উঠল, “মানুষের মুখ বন্ধ করা যায়, সুজিত। কিন্তু পুরোনো বাড়ির দেওয়াল, বন্ধ ঘর আর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিকে চিরকাল চুপ করিয়ে রাখা যায় না।” কথাটা বলেই সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর বলে উঠল, “চলো। এই ঘোষাল রাজবাড়ির শেষের ওই করিডোর টা আমাদের আরেকবার দেখা দরকার। এরপর অগত্যা, আমি আর অজিতেশ রাজবাড়ির সেই দীর্ঘ করিডোরের কাছে পা রাখলাম। করিডোরের একেবারে শেষের ওই রহস্যাবৃত ঘরটার জানলাগুলোর পাল্লা বন্ধ। ঘরের দেওয়ালের গায়ে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে দাগের ওপর দিয়ে একটা টিকটিকি দ্রুত সরে গেল। এই ঘরের দরজায় এখনও ভারী তালাটা ঝুলছে। অজিতেশ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তালাটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল,হরিপদ হাতে ঝাঁটা হাতে সেখান দিয়ে যাচ্ছে। আমি সাথে সাথে ওকে ডাকলাম।"হরিপদ,একটু এদিকে শোনো...!" হরিপদ আমাদের দুজনকে এই ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বোধহয় খানিকটা ভীত হয়ে পড়ল। কিন্তু আমার ডাক সে অগ্রাহ্য করতে পারল না।ও ধীর পায়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা হরিপদ...এই ঘরটা কত বছর ধরে বন্ধ রয়েছে?”  হরিপদ একটু ইতস্তত করে বলল, “আজ্ঞে...অনেক বছর ধরে বন্ধ আছে বাবু। আমি তো আমার ছোটবেলা থেকেই দেখছি, এই দরজা বন্ধ। আমি যদ্দুর শুনেছি... এই ঘরটায় পুরোনো দলিলপত্র রাখা আছে।” অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “শুনেছ? না কি নিজের চোখে দেখেছ?” হরিপদ মাথা নিচু করল। তারপর নিচু স্বরে বলে উঠল,“আজ্ঞে...নিজের চোখে দেখিনি, বাবু।” অজিতেশ বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল, “অদ্ভুত। এই ঘোষাল রাজবাড়ীর ভিতরের একটা ঘর পঁচিশ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে, অথচ তার ভেতরে কী আছে, তা জানার আগ্রহ কারও হয়নি?” হরিপদ উত্তর দিল না।সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। অজিতেশ এবার দরজার কাঠে হাত বুলিয়ে বলল, “এই ঘরটা কি পঁচিশ বছর আগেও বন্ধ ছিল?” প্রশ্নটা শুনে হরিপদের মুখের ভাব এক মুহূর্তে বদলে গেল। সে যেন কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। সে বলে উঠল, “আমি তখন খুব ছোট ছিলাম, বাবু। সব কথা মনে নেই।” অজিতেশ বলে উঠল, “তোমার মনে না থাকলেও এই বাড়ির অন্য কারও তো নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা।তাই না?এই ঘর কি পরিষ্কার করা হত না কোনোকালে?এই কোনো কাজের লোককে তো আমি এই ঘরের কাছে আসতে দেখলাম না এখনো পর্যন্ত...!" হরিপদ এবার হঠাৎ চারপাশটা ভালো করে সন্তর্পনে দেখে নিল। তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল, "একটা কথা বলব বাবু... পঁচিশ বছর আগে মালতি নামের একটা কাজের মেয়ে ছিল।সে এই ঘরেই থাকত‌। অজিতেশ অবাক হয়ে বলে উঠল,“মালতি?” হরিপদ চুপ করে রইল কিছুক্ষন। অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, “সে এখন কোথায়?” হরিপদ আবারো চারদিকে তাকিয়ে, তারপর নিচু গলায় বলে উঠল, “আমি যদ্দুর শুনেছিলাম, সে হঠাৎ করেই একদিন উধাও হয়ে গিয়েছিল।” “উধাও হয়ে গিয়েছিল?” অজিতেশ কথাটা পুনরাবৃত্তি করল। “একজন মানুষ এই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল, আর কেউ তার খোঁজ করল না?” “সেসব আমি ঠিক জানি না, বাবু।” “তুমি জানো না, নাকি জানলেও বলতে চাইছ না?” হরিপদ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে আতঙ্কের ক্ষীণ ছায়া দেখতে পেলাম আমি। “আমি যা জানি, সবই লোকের মুখে শোনা। ভুল কিছু বলে ফেললে বিপদে পড়ব, বাবু।” অজিতেশ হরিপদ কে আর চাপ দিল না। বরং শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রেখো,পঁচিশ বছর আগের যে ঘটনা এতদিন চাপা পড়ে ছিল, তার সাথে কিন্তু আজকের ঘটনার যোগসূত্র থাকা অসম্ভব নয়। সত্যিটা যত দেরিতে সামনে আসবে, তত বেশি মানুষ বিপদে পড়বে।” হরিপদ মাথা নিচু করে হাত কচলাতে শুরু করল। আমি ওর উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম,"ঠিক আছে হরিপদ, তুমি এখন আসতে পারো। হরিপদ এরপর আর এক মিনিট ও না দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে সেখান থেকে প্রায় মিলিয়ে গেল। অজিতেশ এবার বলে উঠল, বুঝলে সুজিত, আসল সত্যটা এইভাবে জানা যাবে না।আসল সত্যটা জানার জন্য এখন আমাদের বিশেষ একজনের কাছে যেতে হবে।" আমি বলে উঠলাম,"কার কাছে যাওয়ার কথা বলছ তুমি?" অজিতেশ চুরুট ধরিয়ে বলে উঠল,"বৌঠান...!" দৃশ্য নয়  মহেন্দ্র নারায়ণ বাবু এখন পূজোর যোগাড় যন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত। অজিতেশ বলে উঠল,"চলো সুজিত, এখন ই সুবর্ণ সুযোগ!" এরপর আমি আর অজিতেশ তাঁর ঘরের দিকেই পা বাড়ালাম। দরজার কাছে পর্দাটা হাওয়ায় দুলছে।আর তার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বিছানায় শায়িত অবস্থায় মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর গিন্নি নিমগ্ন চিত্তে গ্রামাফোনে শ্যামাসংগীত শুনে চলেছেন। বিছানার পাশেই রাখা রয়েছে তাঁর হুইলচেয়ার টি‌‌। অজিতেশ দরজার কাছে গিয়ে বলে উঠল,"বৌঠান, আসতে পারি?" আমাদের দেখামাত্র গিন্নিমা গ্রামাফোন বন্ধ করে বলে উঠলেন,"আরে অজিতেশ বাবু, সুজিত বাবু...আসুন আসুন... ভিতরে আসুন...! অজিতেশ হাত জোড় করে বলে উঠল,"বৌঠান, আমরা আপনাকে একটু বিরক্ত করতে এলাম। আসলে, চারপাশে যে নৃশংস হত্যালীলা ঘটে চলেছে, সেই রহস্যের কিনারা করার জন্য আমাদের এই ঘোষাল পরিবারের অভ্যন্তরীন বিষয়ে কিছু তথ্য জানার আছে। আপনি যদি দয়া করে আমাদের একটু আলো দেখান তাহলে খুব ভালো হয়...! গিন্নি মা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন,"হ্যাঁ... চারপাশে যা ঘটে চলেছে তা আর আশ্চর্যের কি...!পাপ তো বাপকেও ছাড়ে না। আমি ওকে কত করে বুঝিয়েছি... কিন্তু আমার কথা কানে তুললে তো...!" অজিতেশ বলে উঠল,"পাপ... কিরকম পাপ? একটু খোলসা করে বলবেন?" গিন্নিমা বলে উঠলেন, "বসুন, সবটা বলছি। উনি যদি চলে আসেন, তাহলে আপনারা আর কিছুই জানতে পারবেন না।" একরাশ কৌতূহল নিয়ে অজিতেশ গিন্নিমার বিছানার সামনে একটা বেতের চেয়ার টেনে বসল। আমি ওদের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। গিন্নিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, “এসব আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। এই বাড়িতে এক বিপত্নীক কর্মচারী কাজ করত। সে হঠাৎ কলেরায় মারা যায়।ওর আকস্মিক মৃত্যু র পর ওর বিশ বছরের বোবা মেয়ে মালতি কাজ আর আশ্রয়ের আশায় এই বাড়িতে এসেছিল জানেন। কিন্তু আমার স্বামী তাকে আশ্রয় দেওয়ার নাম করে নিজের রক্ষিতা করে রাখতে চেয়েছিল। মালতি যখন বুঝতে শুরু করে ও কি বিপদে ফেঁসে গিয়েছে, তখন ও এই বাড়ি ছেড়ে পালানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। মালতি আমার স্বামী র এই গোপন কুকীর্তি ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেয় । তখন আমার স্বামী রাগে অন্ধ হয়ে ওকে করিডোরের ওই শেষ ঘরটায় আটকে রাখে। তারপর আমার স্বামী, এই বাড়ির দেওয়ান রামচরণ মুখুজ্জে, আমার স্বামী র পারিবারিক ও ব্যবসায়ীক বন্ধু সুকুমার ভট্টাচার্য, এই ঘোষাল রাজবাড়ীর পুরোহিত সঞ্জয় চাটুয্যে... মিলে মেয়েটার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। ওদের মদত দিয়েছিল আমার দেবর ননী গোপাল আর এই পরিবারের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় শশাঙ্ক শেখর ঘোষাল। মালতির ওপর ওদের খুব খারাপ নজর ছিল। ওইদিন ওই নরপিশাচের দল নিজেদের লালসা চরিতার্থ করতে মেয়েটার ওপর এমন অকথ্য নির্যাতন করেছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওদের নির্যাতনের ফলপ্রসূ মালতি মারা পড়ল। তারপর থেকেই করিডোরের ওই শেষ ওই ঘর টা সবসময় বন্ধ করে রাখা হয়। আমি আর অজিতেশ একরাশ বিস্ময় নিয়ে শুনছিলাম সমস্ত বৃত্তান্ত! গিন্নিমা আবার বলে উঠলেন, জানেন অজিতেশ বাবু, ওই মালতির একটি ছোট ছেলে ছিল, ওর নাম ছিল রঘুবীর। ওর বয়স তখন মাত্র বারো। ওই ঘটনা ঘটবার পরে পরেই ওকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আগে সে বোধহয় আসল সত্যটার কিছুটা আঁচ পেয়েছিল। ও হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিল ওর মায়ের মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা আসল রহস্য!ও পরে লুকিয়ে এই বাড়িতে ফিরে এসেছিল ,সে খবর আমি জানি।ও ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার করে সব সত্যিটা জেনে যায়।সে তো বহু বছর আগে এই বাড়ির চৌহদ্দি ছেড়ে চলে গিয়েছে। তবে কি জানেন অজিতেশ বাবু...আমার মনে হয় আজকের এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো না কোনোভাবে সেই পঁচিশ বছর আগের পাপেরই ফল। এই দেখুন না... মালতি র পায়ের নূপুর জোড়ার একখানি নূপুর এখনো আমার কাছে রয়ে গিয়েছে।" অজিতেশ অবাক হয়ে বলে উঠল,"মালতির নূপুর জোড়া আপনার কাছে আছে?" গিন্নি মা বলে উঠলেন,"হ্যাঁ অজিতেশ বাবু। মালতি র নিখোঁজ হওয়ার বছর তিনেক পরেকার কথা... আমি তখনো মালতি কে ভুলতে পারিনি। ওই সময়ে আমি হাঁটাচলা করতে পারতাম ‌। একদিন এই ঘোষাল পরিবারের দরজার সামনে আমি মালতির নূপুর জোড়ার একখানি নূপুর এবং সেই সঙ্গে একটা কাগজ দেখতে পেলাম।ব্যস... তারপর থেকে এই বাড়িতে মালতি র নাম আর কখনো উচ্চারণ করাই হয়নি! আমি আর অজিতেশ মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম ‌। গিন্নিমা বিছানা এবার সংলগ্ন একটা দেরাজ খুলে তার ভিতরের একটা ড্রয়ার টেনে বার করলেন একখানি রূপোর সরু নূপুর এবং একটা হলদেটে কাগজ!আর একখানি ফটোগ্রাফ। ফটোগ্রাফ টা অজিতেশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন,"এই দেখুন, মালতি আর ওর ছেলে রঘুবীর কে নিয়ে এক দুর্গাপূজার সময়ে একটা ছবি তুলেছিলাম শখ করে। মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত আমার স্বামী র জন্য ই এমন নির্মমভাবে মরতে হবে,এ আমি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি! অজিতেশ মনোযোগ সহকারে ফটোগ্রাফখানি দেখল। তারপর ওই হলদেটে কাগজটা আর নূপুর টা অজিতেশের হাতে দিয়ে গিন্নি মা বলে উঠলেন, এই কাগজ টায় যা লেখা আছে তার মানে আমি আজ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারিনি। অজিতেশ কাগজ টা হাতে নিল। কাগজের ভাঁজ টা খুলে পড়তে শুরু করল। "দেবী র পৃষ্ঠদেশে যেদিন এই নূপুর দেখা যাবে, সেদিন থেকেই শুরু হবে সব পাপের হিসাব!" আমি তো এ লেখার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না! অজিতেশ বলে উঠল,"আচ্ছা গিন্নি মা, এই ঘোষাল রাজবাড়ীর কালি মন্দিরে মা কালির বিগ্রহের পিছনে আপনি কোনোদিন খুঁজে ছিলেন এই নূপুরের দ্বিতীয় জোড়া টা? গিন্নি মা বলে উঠলেন,"আরে, মন্দিরের সব জায়গা প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয়। এরকম কোনো নূপুর জোড়ার একখানি নূপুর যদি সত্যিই পাওয়া যেত তাহলে এই খবর টা আমার অজানা থাকত না।” গিন্নিমার কথাগুলো শুনে ই অজিতেশের চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “তার মানে, করিডোরের শেষ ঘরটাই তাহলে রহস্যের একমাত্র চাবিকাঠি নয়, আমাদের রহস্যের আরো গভীরে যেতে হবে!” আমি বলে উঠলাম,""ঠিক আছে গিন্নি মা ‌। আসল সত্যটা বলার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। আমরা তবে এখন আসি...! দৃশ্য দশ  আজ সকাল থেকেই অজিতেশ এই ঘোষাল রাজবাড়ী থেকে বেপাত্তা। আমি যখন স্নানে ঢুকতে যাবো, তখন অজিতেশ বলে উঠল,"সুজিত, আমি একটু দোকান থেকে ঘুরে আসছি।" এই বলে সেই যে বাইরে গেল, একদম দুপুর একটা নাগাদ ফিরল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,"এতক্ষণ ধরে কোথায় ছিলে অজিতেশ?" অজিতেশ একটা রহস্যময় হাসি র সাথে বলে উঠল,""এই সিগারেট কিনতে গিয়েছিলাম ‌।" এবার অজিতেশের ওপর আমার ভারি রাগ হল। ওর চোখমুখ দেখে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম ও একটা কিছু চেপে যাচ্ছে।" আমি সাথে সাথেই অজিতেশ কে চেপে ধরতেই ও শান্ত কন্ঠে বলে উঠল,"আরে ভাই,এত অধৈর্য হয়ো না। ধীরে ধীরে সব জানতে পারবে। ক্রমশ প্রকাশ্য...! দৃশ্য এগারো  আজ সন্ধ্যায় অজিতেশ আরো একবার গিন্নিমার ঘরে গিয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর অজিতেশ বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। আমি দেখলাম,ওর হাতে সেই হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরোটা ধরা রয়েছে। গিন্নিমার ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা করিডোরের কাছে চলে এলাম।করিডোরের মৃদু আলোয় দাঁড়িয়ে অজিতেশ বারবার লেখাটার দিকে মনোযোগ সহকারে  তাকাচ্ছিল। আমার যেন মনে হচ্ছিল, কয়েকটি সামান্য শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কোনো গভীর রহস্যের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে অজিতেশ। এবার আমি আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে বলে উঠলাম, “কী ব্যাপার বলো তো অজিতেশ? গতকাল গিন্নিমার কথাগুলো শুনে আমার তো মনে হচ্ছিল, পঁচিশ বছর আগের সেই ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে বর্তমানের খুনগুলোর কোনো না কোনো সম্পর্ক থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু...আমি ওই নূপুরের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।” আমার কথা শুনে অজিতেশ হঠাৎ কাগজটা ভাঁজ করে নিল । তারপর ওটা নিজের পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে রাখতে বলল, “সুজিত, রহস্যের সমাধান করতে গেলে কখনও কখনও এমন সব জায়গায় নজর দিতে হয়, যেগুলোকে চোখের সামনে দেখলেও তাকে অনুধাবন করা শক্ত। গিন্নিমা নুপুরের সাথে এই কাগজটা আমাদের হাতে দেওয়ার সময় যে কথাগুলো বললেন সেগুলো ভালো করে খেয়াল করেছ?” আমি বলে উঠলাম,"কোন‌ কথা?" “তিনি বলেছেন, প্রতিদিন কালীমূর্তির চারপাশ পরিষ্কার করা হয়, অথচ দেবীর পিছনে কখনও দ্বিতীয় নূপুরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু চিঠিতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে—‘দেবীর পৃষ্ঠদেশে যেদিন এই নূপুর দেখা যাবে, সেদিন থেকেই শুরু হবে সব পাপের হিসাব!’” আমি একটু ভেবে বললাম, “তার মানে তুমি বলতে চাইছ, দ্বিতীয় নূপুরটা এখনও কোথাও লুকোনো রয়েছে?” “ঠিক তাই। আর সেই জায়গাটা খুঁজে বের করাই এখন আমাদের প্রথম কাজ।” কথাটা বলেই অজিতেশ দ্রুত পায়ে করিডোর পেরিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। আমিও তার পিছু নিলাম। বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। রাজবাড়ির অন্য প্রান্ত থেকে কালীপুজোর প্রস্তুতির নানা শব্দ ভেসে আসছিল। কোথাও ঢাকের আওয়াজ, কোথাও বা পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ। অথচ মন্দিরের পিছনের দিকটায় পা রাখতেই যেন অন্য এক পরিবেশ আমাদের ঘিরে ধরল। জায়গাটা বেশ নির্জন। পুরোনো ইটের দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে, একপাশে কয়েকটা ঝোপঝাড়, আর তারই পাশে বহুদিনের জমে থাকা শুকনো পাতা। অজিতেশ প্রথমে মন্দিরের পিছনের দেওয়ালটা ভালো করে পরীক্ষা করল। তারপর নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাতে লাগল। মাঝে মাঝে শুকনো পাতা সরিয়ে দেখছিল, কোথাও মাটি খোঁড়ার চিহ্ন রয়েছে কি না। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী খুঁজছ তুমি?” অজিতেশ আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হাতের ইশারায় আমাকে চুপ করতে বলল। তারপর মন্দিরের পিছনের এক কোণে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এই জায়গাটার মাটি আশপাশের তুলনায় কিছুটা আলগা রয়েছে বলে মনে হচ্ছিল আমার। অজিতেশ আঙুল দিয়ে মাটি সরিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরীক্ষা করল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “সুজিত, এক্ষুনি একটা কোদাল জোগাড় করতে পারবে?” আমি আর কোনো প্রশ্ন না করে এই ঘোষাল রাজবাড়ীর বাগানের মালির ঘরে গিয়ে তার কাছ থেকে ছোট একটা কোদাল নিয়ে এলাম চট করে। অজিতেশ আমার হাত থেকে কোদালটা হাতে নিয়ে এবার ওই মাটি আলগা হয়ে থাকা নির্দিষ্ট জায়গাটার মাটি খুঁড়তে শুরু করল। প্রথমটায় বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। শুকনো মাটি, ছোট ছোট পাথর আর গাছের শিকড় ছাড়া সেখানে আর কিছুই ছিল না। কিন্তু অজিতেশ হাল ছাড়ল না। সে ক্রমাগত মাটি সরিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কোদালের আঘাতে ধাতব কিছু একটা ঠং করে বেজে উঠল। অজিতেশ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। “কী হয়েছে?” আমি উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করলাম। সে কোনো উত্তর না দিয়ে হাত দিয়ে সাবধানে মাটি সরাতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই মাটির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল রুপোর তৈরি একটি নূপুর। মাটির আস্তরণে সেটি প্রায় কালচে হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নকশা দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না যে, এটি গিন্নিমার দেওয়া নূপুরটি জোড়ার ই অবশিষ্ট নুপূর। আমি বিস্ময়ে বলে উঠলাম, “তাহলে এটা এখানেই লুকোনো ছিল!” অজিতেশ নূপুরটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করল। তার চোখেমুখে তখন গভীর চিন্তার ছাপ। কিন্তু পরক্ষণেই সে আবার মাটির দিকে মনোযোগ দিল। কারণ নূপুরটি যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, তার ঠিক পাশেই মাটির একটা অংশ অন্য জায়গার তুলনায় বেশ উঁচু হয়ে ছিল। অজিতেশ আবার সেখানে কোদাল চালাতে শুরু করল। আরো গভীরে কোদাল চালাতেই এবার মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এল এমন এক বস্তু, যা দেখে আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সেখানে মাটিচাপা অবস্থায় পড়েছিল তিনটি মানুষের হৃৎপিণ্ড! আমি আতঙ্কে কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না। এতক্ষণ পর্যন্ত যে ঘটনাটাকে কেবল অতীতের কোনো অন্ধকার রহস্যের সূত্র বলে মনে হচ্ছিল, এই আবিষ্কার যেন তাকে আরও ভয়াবহ করে তুলল। তিনটি হৃৎপিণ্ড এখানে কেন পুঁতে রাখা হয়েছে? এগুলোর সঙ্গে কি সাম্প্রতিক তিনটি হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগ রয়েছে? নাকি পঁচিশ বছর আগের মালতির মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও গভীর? প্রশ্নগুলো একের পর এক আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম,অজিতেশের মুখে আতঙ্কের চিহ্নমাত্র নেই। সে বেশ কিছুক্ষণ নীরবে আবিষ্কৃত ওই মাংসল বস্তুগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নূপুরটি সাবধানে নিজের পকেটে রেখে দিল। তিনটি হৃৎপিণ্ডের অবস্থানও ভালো করে লক্ষ করল সে। মনে হল, সে যেন এই ভয়ংকর আবিষ্কারের মধ্যেও কোনো বিশেষ সূত্র খুঁজে পেয়েছে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। “অজিতেশ, ব্যাপারটা কী বল তো? এই নূপুর, তিনটি মানুষের হৃৎপিণ্ড—সবকিছু কি একই সূত্রে বাঁধা? আর যদি তাই হয়, তবে হত্যাকারী আমাদের কী বোঝাতে চাইছে?” অজিতেশ এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যা দেখলেই বুঝতে পারি, তার মস্তিষ্কের ভিতর রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। “সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না, সুজিত। তবে এটা এখন পরিষ্কার, তন্ত্র সাধনা বা নরবলি নয়...এই খুনগুলো র একমাত্র উদ্দেশ্য হল প্রতিশোধ! আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম,"প্রতিশোধ!" অজিতেশ বলে উঠল," হ্যাঁ সুজিত, প্রতিশোধ! মালতির সাথে হওয়া অবিচারের প্রতিশোধ!"  এই কথাটা বলেই অজিতেশ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর আচমকা পকেট থেকে একটি  চাবি বের করল। মন্দিরের আবছা আলোয় চাবিটা একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে সেটি মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল। আমি বিস্মিত হয়ে চাবিটার দিকে তাকালাম। “এটা কিসের চাবি, অজিতেশ?” অজিতেশ সরাসরি উত্তর দিল না। বরং মন্দিরের পিছনের অন্ধকার কোণটার দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল। তারপর বলে উঠল,এত নিখুঁতভাবে মানুষের হৃৎপিণ্ড কাটা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাজ হতে পারে না সুজিত...!" এই বলে অজিতেশ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “চলো সুজিত। এবার আর শুধু সূত্র খুঁজে বেড়ানোর সময় নয়। রহস্যের দরজা খোলার সময় এসে গেছে।” আমি আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু অজিতেশ ততক্ষণে মন্দিরের পিছনের পথ ছেড়ে রাজবাড়ির ভিতরের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। আমি তার পিছু নিতে নিতে আবার চাবিটার কথা তুললাম। “কিন্তু অজিতেশ, ওই চাবিটা দিয়ে কোন দরজা খুলবে?” অজিতেশ পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কাছে নিজের তর্জনী টা নিয়ে এসে বলে উঠল,শ্ শ্ শ্.. আমি লক্ষ্য করলাম,ওর ঠোঁটের কোণে আবার সেই চিরপরিচিত রহস্যময় হাসি ফুটে উঠেছে! চাপা স্বরে অজিতেশ বলে উঠল, “সেটা জানতে হলে তোমাকে আরও একটু অপেক্ষা করতে হবে, সুজিত। আপাতত তুমি আমার সাথে পা মেলাও...!” আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে অজিতেশের সাথে সাথে এগোতে শুরু করলাম। অবশেষে আমরা করিডোরের শেষ ঘরটার দরজার কাছে পৌঁছে গেলাম। অজিতেশ ওর হাতের ওই চাবির সাহায্য অবশেষে ওই ঘরের দরজার তালাটা খোলার কাজে মনোনিবেশ করল।কি আশ্চর্য!এতদিন ধরে যে ঘরটাকে এই রাজবাড়ির সবচেয়ে দুর্ভেদ্য রহস্য বলে মনে হচ্ছিল, তার দরজাটা খুলে গেল অজিতেশের হাতে র এই চাবির সাহায্যে! আমি জিজ্ঞেস করলাম,"অজিতেশ, তুমি এই ঘরের চাবি কোথায় পেলে?" অজিতেশ চাপা স্বরে বলে উঠল,"এখন কোনো কথা বোলো না সুজিত,সময় এলেই সবটা জানতে পারবে।" এই বলে অজিতেশ দরজাটা ঠেলে খুলতেই ভেতর থেকে একরাশ বদ্ধ বাতাস বেরিয়ে এল। সেই বাতাসে পুরোনো কাগজ, স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা ঘরের একটা অদ্ভুত গন্ধ মিশে রয়েছে।আর সেই সঙ্গে মিশে রয়েছে আরো একটা অদ্ভুত গন্ধ। আমি যদি খুব ভুল না হই, তাহলে এ হল রক্তের গন্ধ!অজিতেশ রুমাল দিয়ে নাক ঢেকে হাতে থাকা টর্চটা জ্বালাল। আমিও তার পিছু পিছু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলাম। টর্চের আলোয় ঘরের ভিতরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। একপাশে সারি সারি পুরোনো কাঠের আলমারি। অন্যদিকে কয়েকটা ভাঙা চেয়ার আর একটা বিশাল সেগুন কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে কিছু ছেঁড়া কাগজ, ধুলো জমা খাতা আর মরচে ধরা একটা কালি রাখার পাত্র। টর্চের আলোটা যেই ঘরের ভেতরে পড়ল, সাথে সাথেআমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে রয়েছে একটা সেগুন কাঠের টেবিল। আর তার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে রামদীনের ছিন্ন ভিন্ন মৃতদেহ। ওর বুকটা মাঝ বরাবর চেরা। তাজা রক্ত তখনও চুঁইয়ে পড়ছে মেঝেতে। আর টেবিলের পাশে মেঝেতে বসে আছেন একজন। তাঁর পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, কিন্তু তাঁর সারা গা রক্তে ভেজা। তাঁর মুখ বাঁধা রয়েছে শক্ত করে।তাঁর কম্পমান হাতে ধরা রয়েছে একটা চকচকে স্ক্যালপেল। তিনি রামদীনের খোলা বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা খুব সাবধানে কেটে বের করার চেষ্টা করছেন। ডা. অনিরুদ্ধ! আমি ছুটে গিয়ে তাঁর মুখের শক্ত বাঁধন টা খুলে দিলাম। "জল... একটু জল..." তিনি প্রথমে এই কথাটাই বললেন। তারপরই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন,  "আমি খুন করিনি! বিশ্বাস করুন, আমি খুন করিনি! আমি একজন ডাক্তার, আমি মানুষের প্রাণ বাঁচাই, কারোর প্রাণ নিই না!" অজিতেশ কোনোমতে তাঁকে ধরে টেবিলের পাশে বসাল। আমি আমার পাঞ্জাবি রপকেট থেকে ছোট জলের বোতলটা বের করে ডাক্তার বাবু কে খাইয়ে দিলাম। ডাক্তারবাবু ঢকঢক করে জল খেয়ে কিছুটা ধাতস্থ হলেন। তাঁর দৃষ্টি তখনও রামদীনের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন বুকের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে। কম্পিত কন্ঠে ডাক্তার বাবু বলে উঠলেন, "তিন দিন... তিন দিন ধরে আমাকে এখানে আটকে রেখেছে,"  অজিতেশ বলে উঠল,"কে আপনাকে এখানে আটকে রেখেছে?"  "চন্দ্র ভৈরব! ওই তান্ত্রিকের বেশে থাকা শয়তানটা! ও নিজে পরপর একটার পর একটা খুন করে চলেছে। তারপর মাঝরাতে মৃতদেহগুলো টেনে এই ঘরে নিয়ে আসে। আর আমাকে বলে  "কাট! এই মৃত শরীর থেকে হৃৎপিণ্ডটা নিখুঁতভাবে কেটে বের কর!" "কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম, গলা শুকিয়ে গেছে আমার। ডা. অনিরুদ্ধ ফুঁপিয়ে উঠলেন, "ওর মায়ের পায়ে বলি দেবে বলে! বলে, ওর মা অতৃপ্ত। তার আত্মা পাপীদের রক্ত চায়! শুধু প্রতিশোধ চায়!" অজিতেশ এতক্ষণ চুপ করে সবটা শুনছিল। এবার সে টর্চের আলোটা ঘরের কোণে ফেলল। সেখানে একটা থালায় রাখা রয়েছে তাজা রক্তজবার মালা। অজিতেশ খুব শান্ত গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলল, "হুমম... পুরো ব্যাপারটা আপনি এখানো বুঝতে পারেননি অনিরুদ্ধ বাবু...ওর মা মানে কালী মা নয়, ডাক্তারবাবু। ওর মা হল মালতি।" ডা. অনিরুদ্ধ চমকে অজিতেশের দিকে তাকালেন, "মালতি? আপনি... আপনি মালতি র কথা কী করে জানলেন?" ঠিক সেই সময় বাইরে অনেকগুলো বুটের আওয়াজ আর টর্চের আলো। "অজিতেশবাবু! সুজিতবাবু! ভেতরে আছেন?"  রতন পুরীর গলা ভেসে এল বাইরে থেকে। পুলিশ ফোর্স নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে করিডোরে ঢুকে পড়েছেন। ঘরের ভেতরে এহেন বীভৎস দৃশ্য দেখে রতন পুরীও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলেন,"এ কী! ডা. অনিরুদ্ধ আপনি এখানে!" ডা. অনিরুদ্ধ যেন পুলিশ দেখে আরও ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি সাথে সাথে অজিতেশের হাতটা চেপে ধরে বললেন, "আপনারা মহেন্দ্রবাবুকে বাঁচান! চন্দ্র ভৈরবের পরবর্তী শিকার মহেন্দ্র নারায়ণ! আজ রাতেই, এই কালীপুজোর অমাবস্যার রাতেই ওকে মারবে! ও আমাকে বলেছে, মহেন্দ্রর হৃৎপিণ্ডটা কেটে ওর মায়ের পায়ে দিলেই ওর প্রতিশোধ শেষ হবে। তারপর... তারপর ও নিজেকেও শেষ করে দেবে। এই কথা ও নিজে আমাকে বলেছে!" "আচ্ছা, বুঝলাম,তা অনিরুদ্ধ বাবু...আপনি এই জঘন্য কাজটা করছেন কেন?" রতন পুরী এবার গর্জে উঠলেন। ডা. অনিরুদ্ধ এবার কেঁদে ফেললেন, কম্পিত কন্ঠে তিনি বলে উঠলেন, "ভয়ে! শুধু নিজের পরিবারের সুরক্ষার ভয়ে! ও আমার বাড়িতে গিয়েছিল জানেন!আমার স্ত্রী, আমার ছোট নাতনির গলায় ছুরি ধরেছিল। বলেছিল, আমি যদি ওর কথা না শুনি, ওদেরও এইভাবেই মারবে। আমি কী করব? আমি একজন সার্জন। আমার হাত কাঁপে না অপারেশন করতে। আর সেই বিদ্যেটাই... সেই বিদ্যেটাই ও নিজের প্রতিশোধের কাজে লাগাচ্ছে! আমি শুধু... আমি শুধু হৃৎপিণ্ডটা কেটে ওর হাতে তুলে দিচ্ছি! কোনো খুন আমি করিনি!" এবার এই ঘরটায় একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। একজন ডাক্তার, যার হাত জীবন দানের জন্য তৈরি, তাকে দিয়ে এমন একখানি কুৎসিত কাজ করানো হচ্ছে! অজিতেশ এবার ধীরে ধীরে অনিরুদ্ধ বাবুর পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর বলে উঠল, "আপনার কোনো দোষ নেই, ডাক্তারবাবু। আপনি শুধু পরিস্থিতির শিকার।"  তারপর অজিতেশ রতন পুরীর দিকে ফিরে বলল, "রতনবাবু, আপনি ভাবছেন এই তালা আমি খুললাম কী করে? তাই তো?" রতনপুরী বলে উঠলেন,"হ্যাঁ অজিতেশ বাবু, আমি তখন থেকে এই কথাটাই ভাবছি। আপনি আমাকে আজ দুপুরে কনস্টেবল দের নিকরিডোরের শেষের ঘরে আসতে বলেছিলেন । কিন্তু এই ঘরের দরজা তো বহু বছর ধরে বন্ধ! অজিতেশ এবার বলতে শুরু করল, "জানেন রতন বাবু, আমি গিন্নিমার ঘরে প্রথম যেদিন প্রবেশ করি, সেদিনই একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছিল। গিন্নিমার শাড়ির আঁচলে একটা খুব পুরনো, মরচে ধরা, বড় পিতলের চাবি ঝুলছে, যেটা দেখে মনে হয় ওটা বহু যুগ ধরে কোনো কাজেই আসে না। সাধারণত কোনো বাঙালি গৃহিণী, সচরাচর কাজে লাগে না...এমন চাবি আঁচলে ঝোলান না, যদি না সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়। সেই রাতেই মহেন্দ্র বাবুর কাছে আসা হুমকি চিঠিটা আমি ভালো করে দেখি। নিচে লাল কালিতে আঁকা  সাংকেতিক চিহ্নটাকে দেখে সবাই ভাবছিল ওটা ত্রিশূল। কিন্তু আমি ভালো করে দেখলাম…ওটা ত্রিশূল নয়। ওটা একটা পুরনো দিনের তালার চাবির মাথার ছবি! তিনটে দাঁতওয়ালা চাবি! আমি গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখলাম,গিন্নিমার আঁচলে ঝোলা ওই চাবিটার সঙ্গে এই চিহ্নের হুবহু মিল! আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, গিন্নিমা রাতে শোয়ার সময় ওই চাবিটা খুলে বিছানার পাশের টেবিলে রাখেন। গতকাল গিন্নিমার সঙ্গে কথা বলার অছিলায় আমি ইচ্ছে করেই গিন্নিমার চোখ এড়িয়ে টেবিলের ওপর  আমি একটা সাবান ফেলে দিই। পরে সাবানটা তুলতে গিয়ে, তার নরম গায়ে চাবিটা চেপে ধরে তার ছাপ তুলে নিই। আজ সকালে চণ্ডীপুর বাজারের চাবিওয়ালার কাছ থেকে তার ডুপ্লিকেট বানিয়ে আনি।" আমি এতক্ষণে বুঝতে পারলাম,আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অজিতেশের গায়েব হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে আসল রহস্য টা কি! মনে মনে বললাম,"অজিতেশ, তুমি ধন্য!" অজিতেশ এবার পকেট থেকে সেই সাবান আর নতুন চাবিটা বের করে দেখাল। তারপর বলল, "রতন বাবু,মহেন্দ্রবাবু আমাদের মিথ্যে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ ঘরের চাবি তাঁর কাছে নেই, হারিয়ে গেছে। আসলে তিনি চানই না এই ঘরের দরজা কোনোদিন খুলুক। কারণ তিনি জানেন, এই ঘরের মাটির নিচে কী পাপ চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।" রতন পুরী আর দেরি করলেন না। তিনি কনস্টেবলদের ডাকলেন, "শীঘ্র শাবল নিয়ে এসো! এই ঘরের মেঝে খোঁড়ো!" এবার আমরা সবাই বাইরে বেরিয়ে এলাম। পুলিশ মেঝের একটা জায়গা, যেখানে মাটি একটু উঁচু হয়ে ছিল, সেখানে খুঁড়তে শুরু করল। কয়েক কোপ মারতেই একটা পচা গন্ধ বেরিয়ে এল। আর তারপরই টর্চের আলোয় দেখা গেল - একটা নরকঙ্কাল! আর তার পায়ে এখনও আটকে আছে একটা রূপোর নূপুর । নুপুর টা দেখে আমার চিনতে কোনো অসুবিধা হল না, এই ঠিক গিন্নিমার কাছে থাকা নূপুর জোড়ার দ্বিতীয় নুপূর টা! অজিতেশ এবার নিচু গলায় বলল, "এই কঙ্কাল মালতি দেবী র মৃত দেহাংশ! আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি,মালতি দেবী কে কেউ এখান থেকে পালিয়ে যেতে দেখেনি। এখানকার  দারোয়ান ও ওকে পালাতে দেখেনি।পঁচিশ বছর ধরে এই ঘরের মাটিই ওকে পৃথিবীর বাতাসের থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। চন্দ্র ভৈরব ওরফে রঘুবীর , অর্থাৎ মালতির সেই বারো বছরের ছেলে - মায়ের এই কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়েই তার প্রতিশোধের বলি দিচ্ছিল এতদিন ধরে।" রতন পুরী বলে উঠলেন,"সব বুঝলাম, কিন্তু রাম দীনের মতো একজন বৃদ্ধ চাকরকে মেরে খুনির কোন প্রতিশোধ চরিতার্থ হল বলতে পারেন অজিতেশ বাবু?" না,অজিতেশ রতন পুরীর এই কথার উত্তর দিল না। আমি লক্ষ্য করলাম,ও এখন রামদীনের দেহের দিকে তাকিয়ে নেই, তাকিয়ে আছে রামদীনের মুখের দিকে। হঠাৎ ও ধীর কন্ঠে বলে উঠল, "রতনবাবু, ইনি রামদীন নন।" রতন পুরী বলে উঠলেন,"মানে?" অজিতেশ এবার টর্চের আলোটা রামদীনের মুখের ওপর ফেলল। তারপর বলে উঠল,"পঁচিশ বছরের দাড়ি-গোঁফ, মলিনতা সরিয়ে দিলে এই মানুষটার যে মুখটা বেরিয়ে আসে, সেটা মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর বৈঠকখানার দেওয়ালে ঝোলানো পারিবারিক ছবিতেই আমার নজরে এসেছে। ইনি আসলেই রামদীন নন, ইনি হলেন শশাঙ্কশেখর ঘোষাল।" অজিতেশের এই কথা উচ্চারণের পর হঠাৎ পুরো ঘরে নেমে এল পিনপতন নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই হঠাৎ ননীগোপালবাবু হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলেন। রামদীনের লাশ দেখে তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, "বাবা!" অজিতেশ বলল, "হ্যাঁ ননীগোপালবাবু, ইনি আপনার বাবা। পঁচিশ বছর আগে যিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে সবাই জানে। আসলে তিনি নিখোঁজ হননি।" ননীগোপাল মাটিতে বসে পড়লেন। অজিতেশ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল, "পঁচিশ বছর আগে মালতির ওপর যখন ওই পাশবিক অত্যাচার হয়, শশাঙ্কশেখরবাবু ছিলেন সেই ঘটনার একমাত্র নির্বাক দর্শক। তিনি পরে বুঝতে পারেন, কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি।মহেন্দ্রনারায়ণবাবু, তাঁর বন্ধু সুকুমার, দেওয়ান রামচরণ, পুরোহিত  এরা যখন মালতিকে শেষকালে এই ঘরে আটকে রেখে তারপর পাশবিক অত্যাচার করে মারল, ওই সময়ে শশাঙ্কশেখরবাবু চুপ থাকলেও পরে তিনি বলেছিলেন , কাজটা ঘোরতর অন্যায় ছিল। শশাঙ্ক শেখর বাবুর এই কথা শুনে মহেন্দ্রবাবু ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মালতির হত্যাকাণ্ডের কোনো সাক্ষী রাখা যাবে না। এই কারণে সেই রাতেই তিনি শশাঙ্কশেখরকে খুন করার চেষ্টা করেন। প্রাণের ভয়ে শশাঙ্কশেখর তখনকার মতো একাই পালিয়ে যান। কিন্তু নিজের পুত্র ননীগোপালকে এই নরকে ফেলে চিরতরে পালিয়ে যেতে পারেননি। তাই ওই ঘটনার কয়েক মাস পরেই তিনি ফিরে আসেন, রামদীন নাম নিয়ে, ছদ্মবেশে। একজন সাধারণ কাজের লোক হয়ে এখানে রয়ে যান তিনি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটাই ... নিজের ছেলেকে এই পরিবারের পাপ থেকে বাঁচানো, তাকে সাবধান করা। বারবার তিনি ননীগোপালকে বোঝাতে চেয়েছেন - এই বাড়ি ছেড়ে চলে যা। কিন্তু ননীগোপালবাবু বোঝেননি। শশাঙ্কশেখরবাবুও পালিয়ে যেতে পারেননি, মায়ার টানে আটকে ছিলেন। আমি গভীর রাতে তার ঘরের কাছে গিয়ে আড়ি পেতে তার ঈশ্বর প্রার্থনা ও সেই সংক্রান্ত সব কথা শুনেছি। তিনি ঈশ্বরের কাছে নিজের সব কথা প্রাণ খুলে বলছিলেন যখন, সেই সব কথা আমার কানে আসে। সেখান থেকেই আমি সব বৃত্তান্ত জানতে পারি!" ননীগোপাল কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমি... আমি বাবাকে চিনতেও পারিনি... উনি কতবার বলেছিলেন... এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য... কিন্তু আমি সম্পত্তির লোভে এখানে আটকে পড়েছিলাম। ভুল করেছিলাম...মহা ভুল!" হঠাৎ বাইরে থেকে হরিপদ ভয়ে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে এল এই ঘরের দিকে।ও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "বাবু! সর্বনাশ হয়ে গেছে! পুজো এইমাত্র শেষ হল! চন্দ্র ভৈরব... চন্দ্র ভৈরব হঠাৎ সবার সামনে... মহেন্দ্রনারায়ণবাবুর ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে কেটে... কাটা মাথাটা হাতে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছে!" "কী!" রতনপুরী এবার চিৎকার করে রিভলবার বের করে ছুটলেন। আমরা সবাই সাথে সাথে ছুটলাম ঠাকুরদালানের দিকে। ঠাকুরদালানে তখন হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছে। সেখানে পৌঁছে আমরা দেখলাম, একটা বীভৎস দৃশ্য!মহেন্দ্র নারায়ণ বাবুর মুন্ডহীন দেহখানি পড়ে আছে প্রতিমার সামনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চাতাল। অজিতেশ কিন্তু ঠাকুরদালানে দাঁড়াল না। ও সোজা ছুটল মন্দিরের পিছনে, যেখানে আমরা সকালে নূপুরটা পুঁতে থাকতে দেখেছিলাম।ও রতন পুরীর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"রতন বাবু, তাড়াতাড়ি এখানে আসুন!" অজিতেশের কথা শুনে রতন পুরী সাথে সাথে কনস্টেবলদের নিয়ে অজিতেশের দেখানো পথ ধরে ছুটে গেল। সেই সাথে আমিও ছুটে গেলাম মন্দিরের পিছনে। সেখানে পৌঁছে দেখলাম, মন্দিরের পিছনে মাটির ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে মহেন্দ্রবাবুর কাটা মাথা। ওই কাটা মুন্ড র চোখ দুটো তখনও বিস্ফারিত হয়ে রয়েছে। রতনপুরী কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে একরাশ হতাশা নিয়ে বলে উঠলেন, "খুনি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেল!" অজিতেশ এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আমি লক্ষ্য করলাম,ওর দৃষ্টি এখন মাথাটার দিকে নিবদ্ধ নেই,ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে জমায়েত হওয়া ভিড়ের দিকে । অজিতেশ এবার ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল, "না রতন বাবু। খুনি কোথাও পালায়নি। খুনি আমাদের মধ্যেই আছে।" এই কথা শুনে সবাই চমকিত হয়ে অজিতেশের দিকে তাকাল। অজিতেশ এবার ধীরে ধীরে ভীড়ের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ আঙুল তুলল ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নিরীহ মানুষের দিকে ...! আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, অজিতেশ যার দিকে আঙ্গুল তুলেছে সে আর কেউ নয়,সে মন্দিরের কাজের লোক হরিহর। যে একটু আগেই আমাদের বলেছিল সে অতিরিক্ত পুজোর সামগ্রীর তালিকা নিয়ে এখানে এসেছে। অজিতেশ বলে উঠল, "মন্দিরের কাজের লোক হরিহরকে সবসময় কাজে লাগে না।ও বেশিরভাগ সময়ে মন্দির ও নিজের ঘরের ভিতরেই  থাকে।আর এই সুযোগটাই ও কাজে লাগিয়েছে ‌।" রতন পুরী বলে উঠলেন,"তার মানে?" অজিতেশ বলে উঠল, "রতন বাবু, এই হরিহর ই চন্দ্র ভৈরব সেজে ছিল এতদিন। ও নিজে খুন করে এখন আবার আমাদের মধ্যে নিরীহ... মন্দিরের কাজের লোকের বেশ ধরে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সামনে।এই হরিহর ই আসলে রঘুবীর।ও হল মালতির ছেলে।" হরনাথ এবার প্রচন্ড ভয়ে থতমত খেয়ে গেল, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ও বলে উঠল,"কী বলছেন বাবু! আমি..." অজিতেশ গর্জে উঠল, "নাটক কোরো না রঘুবীর! গিন্নিমার কাছে মালতি আর তোমার একটা ফটো ছিল। সেই ফটোতে আমি স্পষ্ট দেখেছি, তোমার ডান হাতের কনুইয়ের কাছে একটা বড় আঁচিল আছে। সেই একই আঁচিল আমি তিন জায়গায় দেখেছি। প্রথমবার, যেদিন কালো চাদর মুড়ি দিয়ে তুমি করিডোর দিয়ে পালাচ্ছিলে, তখন চাদরের ফাঁক দিয়ে ওই দাগ আমার চোখে পড়ে। এরপর, চন্দ্র ভৈরবের বেশ ধরে তুমি যখন মন্ত্র পড়ছিলে, তখন তোমার গেরুয়া চাদরের ফাঁক দিয়ে ওই একই দাগ আমি দেখতে পাই।আর, এখন, তোমার এই ছেঁড়া জামার ফাঁক দিয়ে হরিহরের বেশ এ ওই দাগ এখন সবাই দেখতে পাচ্ছে!আর কোনো বেশ ধরে... অভিনয় করে কোনো লাভ নেই রঘুবীর, তোমার সব কুকীর্তি ধরা পড়ে গেছে!" এই বলে অজিতেশ হনহন করে হরিহরের দিকে ছুটে গিয়ে এক টানে হরনাথের জামার হাতাটা টেনে ছিঁড়ে দিল। আমরা দেখলাম, সত্যি ই ওর ডান হাতের কনুইয়ের ঠিক ওপরে একটা কালো, জলজ্যান্ত আঁচিলের দাগ একেবারে স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে! এবার চারপাশে সবাই আঁতকে উঠল। রঘুবীর এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এবার উন্মত্তের মতো হো হো করে হেসে উঠল, ওর সেই হাসিতে মিশে ছিল পঁচিশ বছরের জমানো মাতৃহারা এক ছেলের অব্যক্ত কান্না ও যন্ত্রনা...! ও এবার চিৎকার করে বলে উঠল, "হ্যাঁ! আমিই রঘুবীর! আমি চন্দ্র ভৈরব সেজেছিলাম! যাতে সবাই ভাবে খুনগুলো তন্ত্রসাধনা ও নরবলির জন্য হচ্ছে! আমি ভেবেছিলাম, চন্দ্র ভৈরবের বেশে খুন করে, আবার হরনাথ হয়ে সবার মাঝে ফিরে এলে কেউ আমাকে ধরতে পারবে না! সবাই চন্দ্র ভৈরবকে খুঁজবে! পুলিশও চন্দ্র ভৈরবের পিছনে পড়ে যাবে! আসল হত্যাকারী কে সবাই সামনে থেকে দেখবে কিন্তু শনাক্ত করতে পারবে না!" এবার সে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল, তারপর মহেন্দ্র বাবুর কাটা মাথার দিকে একরাশ ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে বলে উঠল, "মা... দেখ... তোর সব হিসেব আজ আমি শোধ করে দিলাম। তিনটে জানোয়ারকে আগেই মেরেছি। আজ শেষটাকেও মারলাম... তুই শান্তিতে ঘুমা মা... নিশ্চিন্তে ঘুমা...!" রতনবাবু এগিয়ে গিয়ে রঘুবীরের হাতে হাতকড়া পরালেন। রঘুবীর এবার আর কোনো বাধা দিল না। ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে এক অনাবিল শান্তি র ছাপ...! দূর থেকে তখনো ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে। প্রতিমার সামনে তখনও জ্বলছে প্রদীপ। কিন্তু ঘোষাল রাজবাড়ির পঁচিশ বছরের পাপের হিসেব আজ অমাবস্যার রাতেই শেষ হল। চণ্ডীপুর থেকে ফিরেছি আজ তিনদিন হল। চারপাশের বাতাসে এখনো কালীপুজোর বাজির ধোঁয়া  র আমেজ রয়েছে, রাস্তা জুড়ে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া রঙিন কাগজ। আমাদের হ্যারিসন রোডের মেসবাড়ির ছোট ঘরটায় আবার সেই চেনা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আমি জানলার পাশে বসে সেদিনের সব ঘটনা নোটবুকে লিখছিলাম। রঘুবীর ধরা পড়েছে, পুলিশের খাতায় কেস ক্লোজড। খবরের কাগজ খুললেই এখন বড়  হেডলাইন ..."চণ্ডীপুরে তান্ত্রিক খুনি গ্রেপ্তার।" অজিতেশ এখন ওর আরামকেদারায় বসে রয়েছে, ওর হাতে ধরা রয়েছে একখানি চুরুট, কিন্তু ওটা তে ও আগুন ধরায়নি, ও শুধু চুরুট টা হাতে নিয়ে বসে আছে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ও হঠাৎ বলে উঠল, "ঘোষাল রাজবাড়ীর ঘটনা টা লিখছ সুজিত?" আমি বললাম, "হ্যাঁ, এখন শেষটা লিখছি। রঘুবীরের ফাঁসি হবে হয়তো..." অজিতেশ মৃদু হেসে জানলার বাইরে তাকাল। তারপর হতাশ কন্ঠে বলে উঠল, "দেখো সুজিত,আমাদের সবার চোখে আজ রঘুবীর অপরাধী। পুলিশের খাতায়, আদালতের খাতায়, খবরের কাগজের পাতায় ... সে একজন খুনি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? শুধু রঘুবীরই কি একমাত্র অপরাধী?" আমি এবার কলম থামিয়ে ওর দিকে তাকালাম। অজিতেশ ধীর কন্ঠে বলে উঠল, "দেখ সুজিত, চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী সকলে কী করে? বছরে একদিন মাটির প্রতিমাকে ঘটা করে পুজো করে। আলো দিয়ে সাজায়, ঢাক বাজায়, মন্ত্র পড়ে - 'যা দেবী সর্বভূতেষু...' বলে চোখের জল ফেলে। আর বাকি তিনশো চৌষট্টি দিন? রক্তমাংসের যে জীবন্ত প্রতিমারা আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় , তাদের অসম্মান করে!একটা অসহায় কাজের মেয়ে মালতি, তার মতো হাজার হাজার মেয়ে - তাদের মানুষ নিজের ভোগের বস্তু হিসেবে ছিঁড়ে খায়। তাদের মানুষ বলেই মনে করে না কখনো। মনুষ্যেতর হিসেবে গন্য করে, তাদের শুধু অসম্মান করে, পায়ের তলায় পিষে মারে। এটাই হল মানুষের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি, সুজিত। মাটির প্রতিমার সামনে ভক্তি আর রক্তমাংসের প্রতিমার সামনে লালসা - এই ভণ্ডামিটাই হল আসল অমাবস্যার অন্ধকার। যে অন্ধকার চণ্ডীপুরের রাজবাড়িতে পঁচিশ বছর ধরে জমে ছিল। দীপাবলির হাজার প্রদীপও সেই অন্ধকার তাড়াতে পারেনি।" চুরুট টা এবার ধরাল অজিতেশ। আমি দেখলাম,চুরুটের ধোঁয়া গুলো রিং পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। অজিতেশ বলে উঠল, "রঘুবীর খুন করেছে, এটা সত্যি। আইন তাকে শাস্তি দেবে। কিন্তু রঘুবীরকে খুনি কে বানাল? ওই ঘোষাল রাজবাড়ির কর্তারা, যারা মাটির কালীকে প্রণাম করে এসে রক্তমাংসের মালতিকে ধর্ষণ করে মেরে মাটিতে পুঁতে দিল। তারাই তো রঘুবীরের হাতে অস্ত্র তুলে দিল। মানুষ যদি ওই ভণ্ডামিটা না ছাড়ে, তাহলে এক রঘুবীর জেলে যাবে, আরো দশটা রঘুবীর জন্মাবে।" আমি চুপ করে শুনছিলাম। অজিতেশ উদাস দৃষ্টিতে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল,  "যেদিন মানুষ বছরে একদিন মাটির প্রতিমাকে ঘটা করে পুজো করার আগে, রক্তমাংসের প্রতিমাকে মন থেকে সম্মান করতে শিখবে... একজন মালতিকে মা-বোন হিসেবে দেখতে শিখবে, সেদিন আর কোনো ছেলেকে তার মায়ের নূপুর মাটিতে পুঁতে, প্রতিশোধ নিতে হাত কালিমালিপ্ত করতে হবে না। সেদিন রঘুবীরের মতো ছেলেরাও বাকি সকলের মতো সুন্দরভাবে নিজের জীবনটা অতিবাহিত করতে পারবে। সেইদিনই হবে সত্যিকারের দীপাবলি। অমাবস্যার অন্ধকার সেদিন সত্যি সত্যি ঘুচবে। তার আগে পর্যন্ত... সব আলোই মিথ্যে, সব পুজো আসলেই ভণ্ডামি।" বাইরে তখন একসঙ্গে অনেকগুলো বাজি ফাটল। আকাশটা আলোয় ভরে উঠল। কিন্তু আমাদের ছোট ঘরটায়, একটা গভীর, ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমি বুঝলাম, রক্তজবা রহস্যের শেষ পাতাটা খুনি কে ধরার মধ্যে নয়, এই উপলব্ধিটার মধ্যেই লেখা ছিল। সমাপ্ত                                                                                                     


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Crime