কার্শিয়াং এ কেলেঙ্কারি
কার্শিয়াং এ কেলেঙ্কারি
কার্শিয়াং এ কেলেঙ্কারি
দৃশ্য এক
রাত গভীর!ঘন পাহাড়ী জঙ্গলের ভিতরের ওই দুর্গম জায়গাটায় এখন চিড়বিড় শব্দে জ্বলছে আগুন।ওই আগুনের সামনে বসে আগুন পোহাচ্ছে ক্যালডেং শেরিং!ওর হাতে রয়েছে একটা দামী বিদেশি সিগারেট।ওর পায়ের কাছে বসে রয়েছে ওর দলের লোকেরা । বেশ কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা হেরোইন পাচারের ব্যবসায় বিগত কয়েক মাস ধরে যেভাবে লালে লাল হয়ে উঠছে ক্যালডেং শেরিং ও তার দলের লোকেরা, তাতে ওদের মন মেজাজ খুশি তে ডগমগ করার কথা। কিন্তু ওদের কারোর মনে এখন খুশি র কোনো চিহ্ন নেই। বরং তার বদলে ওদের চোখে মুখে ছেয়ে রয়েছে দুশ্চিন্তা র কালোমেঘ!
---"স্যার, আপনি যদি বলেন,তো আমরা আশমি কে খুঁজে বার করে ওকে আটকাই?"
সিগারেটে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে ক্যালডেং শেরিং বলে উঠল,"ওই সর্বনেশে মেয়ে কে আমিই ঠিক করব। তোরা কোনো চিন্তা করিস না। আমাদের রাস্তায় যে বাধা হয়েছে তাকে যে আমি কি পরিণতি দেখাই তা তো তোদের অজানা নয়।ওই সর্বনাশী কে এবার আমি কিভাবে সঠিক রাস্তায় আনি,সেটা তোরা শুধুমাত্র দেখে যা!ক্যালডেং শেরিং এর মতো ধুরন্ধর স্মাগলার কে খোঁজার জন্য পুলিশের নাকানি চোবানি খাওয়ার অবস্থা,আর ওই মেয়ে কিনা আমার হাতে হাতকড়া পরানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে! কতবড় দুঃসাহস! পিঁপড়ের পাখা গজায় মরিবার তরে... বুঝলি!এই ক্যালডেং শেরিং কে ও ক্ষেপিয়ে তুলেছে! ওকে আমি এমন শিক্ষা দেব,যে আগামী সাত জন্ম ও তার আতঙ্ক ও ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তোরা ওই মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে অনর্থক সময় নষ্ট করিস না। আমি এখন তাঁবু র ভিতরে জিরোতে গেলাম, তোরা প্যাকেটগুলো ঠিকঠাক ভাবে করে রাখিস!
দৃশ্য দুই
সকাল সাতটা বাজে। ঝলমলে রোদেলা সকালের সতেজতা এখন বাতাসের পরতে পরতে মিশে গিয়েছে।নতুন একটা উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছি দুদিন হল সবে।এই শান্ত নিরিবিলি পরিবেশটা আমার লেখার জন্য খুবই উপযোগী।আমার নিজের বাড়িতে ইদানিং তুমুল অশান্তি ও হট্টগোলের কারণে আমার লেখালেখি তে বড় বিঘ্ন ঘটছিল।তাই নেট ঘেঁটে পাহাড়ী সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত কার্শিয়াং শহরের এই প্রাসাদ তুল্য বাড়ির একখানি ঘর আমি কয়েক মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছি।রাজকীয় কারুকার্যখচিত অপূর্ব দর্শন এই বাড়িটার ভিতরে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় ঘর।এই ঘরগুলোর বেশিরভাগ ই একেবারে ফাঁকা। যদিও এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা নেহাত কম নয়।শতাধিক বছর ধরে কয়েক পুরুষ ধরে এই প্রাসাদ তুল্য বাড়িটার ভিতরে বাস করছেন এই রায়চৌধুরী পরিবারের বংশধরেরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রচুর অতিরিক্ত ঘর রয়েছে অব্যবহৃত ও প্রায় পরিত্যক্ত...!এইরকম একখানি ঘর বরাদ্দ করেছেন এই বাড়ির মালিক আমার থাকবার জন্য।এই বাড়িতে আমি এসে উঠেছি খুব বেশিদিন হয়নি।তবে এই অল্পসময়ের মধ্যেই আমি বুঝতে শুরু করেছি অনেক কিছু...!এই সুবিশাল বাড়িখানা আসলে ইতিমধ্যে অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। রায়চৌধুরী পরিবারের বর্তমান সদস্য যারা... তাদের ভিতরে সম্পত্তির ভাগ নিয়ে তুমুল মারামারি কাটাকাটি র ফলস্বরূপ ই যে এই সুবিশাল প্রাসাদ তুল্য বাড়ির ভিতরে এতগুলো বিভাজন তৈরি হয়েছে, এটা বুঝতে বাকি নেই আমার।এই বাড়ি আসলে এই রায়চৌধুরী পরিবারের এক পূর্ব পুরুষ তার মনিবের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন।প্রায় তিনশো বছর আগে কার্শিয়াং অঞ্চলটি সিকিমের চোগিয়াল দের রাজত্বের অধীনে ছিল।সেই সময়ে এই রায়চৌধুরী পরিবারের পূর্বপুরুষ রাজপরিবারের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।রাজা তাঁর কাজে যারপরনাই খুশি হয়ে, সপরিবারে এই কার্শিয়াং এ বসবাস করার জন্য একখানি সুন্দর বাড়ি উপহার দেন।একজন কোষাধ্যক্ষ কে দেওয়া,রাজার এমন উপহারের নিদর্শন দেখে অনুমান করা যায়,চোগিয়াল রা কত প্রভূত ঐশ্বর্যের অধিকারী ও প্রতিপত্তিশালী ছিল...! নিদেনপক্ষে যে ঘরে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে,ওই একখানি ঘরের আকার আয়তন ও বাহারি রাজকীয় কারুকার্য ভালোভাবে পুরোটা নিখুঁতভাবে নিরীক্ষণ করার জন্য টানা চার পাঁচ দিন লেগে যাবে।তবে এই ঘরের সমস্ত কারুকার্য ও তার সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করে অপার বিস্ময়ের জগতে সীমাহীন বিচরণ করব, তেমন ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই আমার।যে উপন্যাস লেখার কাজ শেষ করার জন্য আমার এতদূরে ছুটে আসা, সেই কাজে আমাকে মনোনিবেশ করতে হবে।এই প্রাসাদ তুল্য বাড়ির যে অংশে ভাড়া থাকি আমি,ওই অংশটির মালিক হলেন প্রতাপ রায়চৌধুরী।তিনি তাঁর ভাগের এই ঘরগুলো ভাড়া দিতে শুরু করেছেন বেশ কিছু মাস হল। তবে রাজকীয় ঘরের ভাড়া যে সাধারণের নাগালের মধ্যে হবে না, সেটাই স্বাভাবিক। মোটামুটি মার্চ থেকে মে মাসে এখানে ট্যুরের সিজিন। একমাত্র ওই সময়েই কিছু অভিজাত ও টাকাওয়ালা পরিবার এই রাজবাড়ীতে ঘর ভাড়া করে ছুটি কাটিয়ে যায়। কিন্তু এখন শীতকাল।অফ সিজিন। তাই এই সময়ে এই রায়চৌধুরী ভিলা তে আমি ছাড়া কোনো ভাড়াটে নেই।আর তাছাড়া আমি অল্পদিনের ছুটি কাটানোর জন্য নয়, বরং আমার লেখার কাজ টা অনেকখানি এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় সাত কি আট মাসের মতো লম্বা একটা সময়ের জন্য যেহেতু এই ঘর ভাড়া করেছি,তাই প্রতাপ রায়চৌধুরী বেশ খাতির যত্নের সাথেই
আমার আতিথেয়তা করছেন।বলা বাহুল্য... আমার নাম ও পরিচয় টাই এই খাতির যত্নের অন্যতম কারণ।
ঔপন্যাসিক ঋদ্ধিমান সেনগুপ্ত...এই পরিচয় টা পাওয়ার পর তিনি আমাকে তার ভাড়া দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ঘরগুলোর মধ্যে সেরা ঘরটা আমার জন্য বরাদ্দ করেছেন।তার খাতির যত্নের ঠেলায় আমার প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে!
আমার দেখাশোনা করার জন্য একজন চব্বিশ ঘণ্টার চাকর কেও নিযুক্ত করেছেন তিনি।বেশ কিছুদিনের জন্য আনকোরা নতুন কোনো জায়গায় একটা ঘরে নিরিবিলি তে নিজের মতো করে থেকে মনের শান্তি তে আমার উপন্যাস লেখার কাজে মনোনিবেশ করব, এইটুকুই চাওয়া ছিল আমার।একা থাকার জন্য একটা মানুষের যা যা বেসিক কাজ শেখার ও জানার দরকার সবটাই জানি আমি। নিজে কোথাও একা থেকে রান্নাবান্না,কাপড় ধোয়া সমেত নিজের দরকারি সব কাজ নিজে করে নিতে কোনো অসুবিধা ছিল না আমার।এখানে আসার পর থেকে সকালে ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই হাতে পেয়ে যাচ্ছি গরম চা ও জলখাবার, সারাদিন আমার সমস্ত কাজকর্ম করে দেওয়ার জন্য সবসময় এক পায়ে তৈরি রয়েছে একজন চাকর। রাতে আমার ঘরে বিছানা পরিপাটি করে দিয়ে তারপর রাতে আমার খাবার বেড়ে দিয়ে তবে তার ডিউটি শেষ করে বিশ্রাম পাচ্ছে।একটা অচেনা জায়গায় ভাড়াটে হিসেবে থাকতে এসে এত খাতির যত্ন পেয়ে আমার তো প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠার যোগাড়! তবে রান্নাবান্না র ঝামেলা থেকে পুরোপুরি নিষ্কৃতি পেয়ে এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজকর্ম করার জন্য একপায়ে খাড়া একজন লোককে সময়ে অসময়ে পাশে পেয়ে আমার বড়ো সুবিধাই হল। আমি বরং সবকিছু কে একপাশে সরিয়ে রেখে লেখা তে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারলাম।আর আমি তো এইটাই চেয়েছিলাম!কিন্তু, মাঝে মাঝে এই এত খাতির যত্নের ঠেলায় আমার প্রাণ একেবারে ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠার উপক্রম হয়ে ওঠে মাঝেমাঝে। তবুও, উপন্যাস লেখার জন্য যে সময় ও পরিবেশ পাচ্ছি, এইটাই আমার জন্য যথেষ্ট!এই বাড়ির যে অংশে আমি ভাড়াটে হিসেবে রয়েছি, সেই লোকটির গদগদ আচরণ দেখে আমার মাঝে মাঝে বেশ বিরক্তই লাগে। আমি এটা বুঝতে শুরু করলাম, তিনি ভাড়াটে হিসেবে আমাকে কোনোমতে হাতছাড়া করতে চান না। আমি একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, এবং বাঙালি হিসেবে এই প্রতাপ রায়চৌধুরী আমার নাম টা জানতেন অবশ্যই! তিনি মুখেও বলেছিলেন, এতবড় মাপের একজন ঔপন্যাসিক তার বাড়িতে পা রেখেছে, উপন্যাস লেখার জন্য তিনি তার বাড়িকে বেছে নিয়েছেন,এ তাঁর পরম সৌভাগ্য! তিনি নিজে বাংলা সাহিত্য প্রেমী।
কিন্তু এখানে কিছুদিন থাকার পর আমি বুঝতে পারলাম, ওসব সাহিত্য প্রেমী ট্রেমী একদম বোগাস! নিজের আগ্রহে একটা চটি বই খুলে পড়বার আগ্রহ তাঁর নেই। আমার প্রতি তাঁর এই আগ্রহ সম্পূর্ণ অন্য কারণে।আমি যেদিন এই বাড়িতে পা রাখি, সেদিন আমার কোলে ছিল একটা বছর পাঁচেকের ছোট বাচ্চা ছেলে।আসলে হয়েছে কি, আমি যে ক্যাব এ করে এই বাড়িতে এসে পৌঁছেছি,ওই বাচ্চা ছেলে টি তার ওই ক্যাব চালক সনাতন মাইতি র এর নাতি।নাতি, অর্থাৎ সনাতন মাইতি র মেয়ে আশমি র ছেলে।আশমি আসলে অবিবাহিতা। অবিবাহিতা হয়েও সন্তানের মা হওয়ার কারণে সে এতদিন ধরে নিজের বাবা মায়ের কাছেই ব্রাত্য ছিল।দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ওর বাবা মায়ের হঠাৎ ওর জন্য মন কেমন করতে শুরু করে। নিজেদের মনের আকূলতা আর তাঁরা চেপে রাখেননি। মেয়েকে খবর পাঠালেন যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে তাদের কাছে একটিবার আসে...। চারপাশের লোকজনেরা এখনো পর্যন্ত জানে না মেয়ে টা বিয়ে না করে সন্তানের মা হয়েছে।ওর বাবা মা চেনা পরিচিতদের কাছে আশমি র সম্বন্ধে যাহোক একটা মিথ্যা গল্প বলে পুরো ব্যাপারটা চেপে গিয়েছে। আমি যেদিন এই কার্শিয়াং শহরের বুকে পা রাখলাম সেইদিন ই ওই আশমি তার শিশুপুত্র টোটোনকে কোলে নিয়ে তার বাবার কাছে এসেছিল। পাড়ার সকলে জেনেছে,ওই বাচ্চা ওর নিজের নয়। বাচ্চাটির মা কিছুদিন আগে হঠাৎ মারা যাওয়াতে আশমি ওই দুধের বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে।তো ওইদিন সকালে আমি ক্যাবের ভিতরে ওই পাঁচ বছরের ছোট্ট বাচ্চা টোটোনকে দেখি। জীবনে প্রথম সে দাদুর কাছে আসতে পেরেছে।সে আর কোনোমতেই দাদুকে কাছছাড়া করতে চাইছে না। কান্নাকাটি ও বায়না করে দাদুর সাথে সে জোরজবরদস্তি
উঠে পড়েছে গাড়ির ভিতরে।তো এতে ওই ক্যাব চালকের নিজের কাজ করতে খুব একটা সমস্যা হয়নি, বরং বাচ্চাটির সাথে আমার বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওইটুকু বছর পাঁচেকের ছোট্ট বাচ্চা ছেলে কি সুন্দর আধো আধো স্বরে কথা বলে...!শুনলেও মন টা জুড়িয়ে যায়।
গাড়ির ভেতর থাকাকালীন বাচ্চা ছেলে টা আমাকে ওর মায়ের সম্বন্ধে অনেক কথা বলতে থাকে।ও বলতে থাকে,এই প্রথমবার ও নিজের মামার বাড়ি তে এসেছে, নিজের দাদু দিদিমাকে দেখছে।এই কারণে ওর আনন্দের সীমা নেই।ড্রাইভারের স্টিয়ারিং ধরে ড্রাইভার সনাতন বার বার নাতিকে ধমকে বকে বোঝাচ্ছিলেন, বলছিলেন,"ওরে,তুই তোর বকবকানি থামা, ওনাকে বিরক্ত করিস না।"
আমি বুঝতে পারছিলাম, নিজেদের পারিবারিক কথাগুলো এইভাবে একজন অচেনা মানুষের সামনে বেআব্রু হয়ে পড়ায় খুব ই অপ্রস্তুত এবং সেই সাথে অপ্রস্তুত হচ্ছেন ওই বয়স্ক ভদ্রলোক।কিন্তু গাড়ি চালানোর জন্য নাতিকে নিজের মতো করে শাসন করে চুপ করাতেও পারছিলেন না।যাই হোক,
বাচ্চা ছেলে টি অনর্গল বকবক করছিল আর তার ফলপ্রসূ আমি ওই ড্রাইভারের পরিবারের ভিতরকার অনেক কথাই আন্দাজ করতে পারলাম। গাড়ি যখন এই রায় চৌধুরী ভিলার কাছে পৌঁছাল, তখন গাড়ির ওই বয়স্ক ড্রাইভার আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বললেন,"আমার নাতি এতক্ষণ যা যা বকবক করল আপনার সাথে, সেসব শুনে নিশ্চয়ই আপনি অনেক কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন! আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ রয়েছে।ও যে আমার নিজের নাতি বা আমার মেয়ে আশমি র নিজের ছেলে,এ কথা দয়া করে আপনি আপনার নিজের ভিতরেই রাখুন।আসলে নাতি টা আজ ভোরেই এসেছে।আর আমাকেও রুটি রুজির জন্য কাজে বেরোতে হয়েছে। ওকে যে আলাদা করে কিছু শিখিয়ে রাখব সে সুযোগটাই পাইনি আমি।যতদিন আপনি এখানে আছেন, আপনি আসল ব্যাপারটা নিজের ভিতরেই রাখবেন আর বিশেষ করে এই রায়চৌধুরী পরিবার, যেখানে আপনি থাকার জন্য এসেছেন, সেই বাড়ির প্রতিটি সদস্যের কাছে এই কথা টা গোপন রাখবেন। কারণ ওনাদের দৌলতেই এই এলাকায় আমি কাজ করে নিজের পরিবার ও জীবন অতিবাহিত করছি।ওনারা যদি জানতে পারেন যে আমার ঘরের মেয়ে অবিবাহিত হয়েও পাঁচ বছরের একটা শিশু পুত্রের মা হয়েছে তাহলে আমার পরিবারের ওপর ইট পাথরের বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে।এই এলাকা ছেড়ে দিয়ে আমাদের দূরে বিতাড়িত হয়ে চলে যেতে হবে অবর্ণনীয় অপমানের সাথে।এই বয়সে এত কষ্ট করে নিজের রুটি রুজির ব্যবস্থা করে চলছি কোনোমতে। এরকম কোনো অঘটন ঘটলে আমি তা সইতে পারব না।আপনি দয়া করে এই ব্যাপারে ওনাদের বা এই এলাকার কাউকে কিছু জানাবেন না কথা দিন...!"
আমি দেখলাম,এই ঠান্ডাতেও বয়স্ক মানুষ টা একেবারে ঘেমে একশা হয়ে গিয়েছেন।আমি ওনার জড়ো করে রাখা হাত দুখানি ধরে বলে উঠলাম,"আপনি চিন্তা করবেন না। আমি এইসব কথা পাঁচ কান করব না একেবারেই।"
আমার কথা শুনে বয়স্ক ক্যাবচালক সনাতন একটু নিশ্চিন্ত হলেন। বলা বাহুল্য,ওই বাচ্চা ছেলে টা তখনো আমার কোলেই খেলা করে চলেছিল। হঠাৎ রায়চৌধুরী ভিলা থেকে বেরিয়ে এলেন প্রতাপ রায়চৌধুরী,যার কাছে ভাড়া থাকব বলে লটবহর গুছিয়ে এখানে এসেছি আমি। তিনি বেরিয়ে এসে আমাকে দেখামাত্র বলে উঠলেন,"আরে, আপনি পৌঁছে গেছেন! আসুন ভিতরে আসুন। আপনার ঘরখানা দেখিয়ে দিয়ে আমাকে আবার একটু বেরোতে হবে।আর একটা কথা আপনাকে বলে দিই।আপনি আগে বলেছিলেন আপনি একা থাকবেন। আমি সেই মতোই ঘরভাড়া নির্ধারণ করেছি আপনার জন্য। কিন্তু সপরিবারে যদি থাকতে চান তো ভাড়া কিন্তু সেক্ষেত্রে বেশি লাগবে। আমি স্পষ্ট কথার মানুষ।তাই আগে থাকতেই কথাটা আপনাকে জানিয়ে দিলুম।"
আমি অবাক হয়ে বললাম,"আমি সপরিবারে এসেছি,এমন কথা কে বলল আপনাকে?"
---"এতে বলবার কি আছে? বাচ্চা কোলে গাড়ি থেকে নামছেন যখন, নিশ্চয়ই পরিবার সাথে করেই এসেছেন।তাই বললাম কথা টা।"
গম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন প্রতাপ বাবু।
আমি সাথে সাথে হাঁ হাঁ করে বলে উঠতে গেলাম,"আরে এ আমার ছেলে নয়,এ তো এই ক্যাব চালকের নাতি!"
কিন্তু না,এই কথাটা আমার ঠোঁটের ডগা পর্যন্ত এসেও ঠিক সামলে গেল।
আমি বলে উঠলাম,"ও আমার দাদার ছেলে। আমার দাদা এই কার্শিয়াং শহরে একদিনের জন্য এসেছে একটা দরকারে। কালকেই ফিরে যাবে বাড়িতে। কিন্তু বৌদি দাদার ওপরে ভীষণ রেগে বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছেন। তিনি নিজে স্বামী র মুখ দর্শন করতে তো চান না, এমনকি এই বাচ্চা ছেলেটার ওপরে দাদার ছায়া পড়ুক এটাও তিনি চান না। আসলে পুরোটাই ভুল বোঝাবুঝির ফল। আমার দাদা যে এখানে আসবে এই খবর আমি আগে জানতাম। আমার দাদা বহুদিন তার নিজের ছেলে কে দেখেনি।তাই আমি বৌদিকে বলে বুঝিয়ে আমার ছোট্ট ভাইপোটাকে নিজের সাথে করে নিয়ে এসেছি এখানে।একটু পরেই ওকে নিয়ে আমি দাদার কাছে যাব,দাদা ওকে নিয়ে কার্শিয়াং থেকে নিজের ঘরে ফেরার পথ ধরবে। আমি আমার পরিবার নিয়ে এখানে থাকতে আসিনি।যে ঘর আমি ভাড়া করেছি,ওই ঘরে আমি একাই থাকব। বুঝলেন!"
আমার কথা শুনে প্রতাপ রায়চৌধুরী আশ্বস্ত হলেন। তারপর বলে উঠলেন,"আচ্ছা আচ্ছা,তাই বলুন। ঠিক আছে। আমি শম্ভু কে ডেকে দিচ্ছি,ও এইসব মালপত্র নামাতে তোমাকে সাহায্য করবে।"
শম্ভু, শম্ভু...!
জোরে হাঁক দিলেন প্রতাপ রায়চৌধুরী। হাঁক শুনে সাথে সাথেই হাফপ্যান্ট ও স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত এক অল্পবয়সী ছেলে এসে বলে উঠল,"আজ্ঞে হুজুর...!
প্রতাপ রায়চৌধুরী বলে উঠলেন,"এই বাবু র জিনিসপত্র গুলো ঘরের ভিতরে নিয়ে যেতে একটু সাহায্য করো কেমন! আমার ফিরতে দেরি হবে। তুমি সবদিক টা সামলিও কেমন! উনি কিন্তু অতিথি মানুষ,ওনার যেন কোনোকিছু তে অসুবিধা না হয় সেদিক টা দেখবে কেমন! আমি আসলাম।"
এই বলে প্রতাপ রায়চৌধুরী লাঠি হাতে হনহন করে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেলেন চোখের সামনে থেকে।
ক্যাব চালক ও একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।
আমি তখনকার মতো বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আমার জন্য বরাদ্দ করে রাখা ঘরখানায় ঢুকলাম। এইটুকু সময়ের মধ্যে টোটোনের সাথে আমার ভালোই বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।ওকে কোলে নিয়ে আমি যখন ঘরের দিকে পা বাড়ালাম, তখনো ও অনর্গল বকবক করে যাচ্ছিল।হাত পা নেড়ে আধো আধো স্বরে অনর্গল বকবক করতে থাকা ওই ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটার প্রতি ওই অল্প সময়ের ভিতরেই আমারো কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল।
গাড়ি থেকে নেমে ঘরের দিকে যখন পা রাখতে যাব,সেই সময়ে আমি টোটোনের দাদুকে বলেছিলাম,"ও আপাতত আমার কাছেই থাকুক কেমন!"
আমার কথা শুনে টোটোন ও প্রজাপতির মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠেছিল,"হ্যাঁ হ্যাঁ দাদু, আমি এখন এই কাকুটার সাথেই একটু থাকব...!"
ছোট্ট নাতির এমন জেদ দেখে ওই সনাতন বলে উঠেছিলেন,"এখন জেদ করে না সোনা,দেখছ তো কাকু কে এখন এই এত্ত জিনিসপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে সেগুলো কে ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতে হবে।এই সময়ে তুমি ওনাকে আর বিরক্ত কোরো না। চলে এসো আমার সাথে।"
আমি ই তাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম,"আরে,ও আমার সাথে থাকলে কোনো সমস্যা নেই আমার।ও আমার সাথে থাকলে আমার ভালোই লাগবে।আপনি এখন আপনার কাজে ফিরে যান,পরে আমি ওকে আপনার কাছে দিয়ে আসব'খন।ঘরের মধ্যে একটা জায়গায় টোটোনকে বসিয়ে রেখে চট করে হাতমুখ ধুয়ে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর আমার সব লাগেজ পত্র আনপ্যাক করতে বসলাম। বাচ্চা ছেলে টা কিন্তু এতটুকুও বিরতি না নিয়ে ওই একটাই জায়গায় বসে বসে অনর্গল বকবক করে চলেছে তখনো। জিনিসপত্র গোছগাছ করতে করতে ওর কথাগুলো আমার কানে আসছিল বটে। আমি তো সেইসব কথাগুলো অবোধ শিশুর অর্থহীন প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম। সেদিন দুপুরেই ওকে আমি ওর দাদুর কাছে দিয়ে আসি।আর তার পর থেকেই এই প্রতাপ রায়চৌধুরী পুরোপুরি আঠার মতো আমার পিছনে পড়ে গিয়েছেন।বারে বারে তিনি শুধু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টোটোনের কথা জিজ্ঞাসা করে চলেছেন। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনি বারে বারে শুধু বলে চলেছেন,"তোমার দাদার ছেলেটিকে আমার ভারি ভালো লেগেছে। আমার একমাত্র ছেলে প্রদীপ্ত পড়াশোনা শেষ করে এখন বিদেশে চাকরি করছে।ওর ছোটবেলার চেহারার সাথে তোমার দাদার ছেলে র খুব মিল। আমার ছেলে ইদানিং ব্যস্ততার কারণে আমার সাথে যোগাযোগ করে কালেভদ্রে। তোমার দাদার ছেলেটিকে দেখলে আমার কলিজা ঠান্ডা হয় যেন! আমার মনে হয়, আমার ছেলে প্রদীপ্ত আমার সামনে এসেছে। তুমি ভাই, তোমার ওই ভ্রাতুষ্পুত্র টিকে এখানে একটিবার নিয়ে আসবে? ওকে দেখে আমি আমার চোখের জ্বালা, মনের জ্বালা জুড়াব!"
প্রতাপ রায়চৌধুরী র মুখে এই কথাগুলো আমি যতবার শুনি ততবারই আমি বড় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি।
আমি তাঁকে প্রতিবার এই বলে আশ্বস্ত করি,টোটোনকে আমি ওনার কাছে ঠিক নিয়ে আসব। তবে আমি কিন্তু তাঁকে মিথ্যা আশ্বাস দিইনি। সত্যিই টোটোনকে আরো একবার আমার কাছে নিয়ে আসবার বড়ো ইচ্ছা ছিল আমার। নিজের লেখার কাজ টা বেশ অনেকটা গুছিয়ে নিয়ে একদিন আমি ফোনে যোগাযোগ করলাম ওই ক্যাব চালকের সাথে।টোটোনের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ওই ক্যাব চালক হায় হায় করে উঠলেন। কেঁদে উঠে বললেন,"সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে বাবু...! আমার নাতিটাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!"
ফোনের ওপার থেকে এমন কথা শুনে আমি রীতিমতো চমকে উঠলাম। আমি উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলাম..."সে কি,কবে থেকে ও নিখোঁজ হল!আপনি থানায় খবর দিয়েছেন তো?"সনাতন বলে উঠল,"না না, পুলিশে খবর আর দেব কি করে বলুন, নিজের নাতি বলে যদি পরিচয় দিই তাহলে যে সর্বনাশ হবে!"
আমি উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলাম,"আরে,এখন আপনার নাতি ছাড়া আর কোনোকিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে কে কি বলবে বা কে কিভাবে অপমান করবে সেসব ভেবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা একদম উচিত হবে না।নাতির প্রাণের চাইতে বড়ো আর কিছু হয় নাকি!নাতি কে নিয়ে নিজের পরিবারকে নিয়ে প্রয়োজনে অন্যত্র চলে যাওয়ার রাস্তা তো খোলাই আছে যেখানে কেউ আপনাদের ব্যাপারে কিছু জানে না...!সনাতন কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল,"হ্যাঁ ভাই, কথাটা ঠিক।দেখি কতদূর কি করা যায়...!"
টোটোনের নিখোঁজ হওয়ার খবর টা পাওয়ার পর আমার মনটা কেমন যেন উথালপাথাল করতে শুরু করল। মাত্র একবেলাতেই ওই ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে টা আমার মনের অনেক টা জায়গায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে এটা আমি ভীষণভাবে অনুভব করতে শুরু করলাম। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে হুঁশ ফিরল আমার। আমি ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি, ঘরের মালিক প্রতাপ রায়চৌধুরী হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আমার মন মেজাজ যে একেবারেই ভালো ছিল না এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি একটু খেঁকিয়ে উঠেই জিজ্ঞাসা করলাম,"কি হল বলুন তো,এই অসময়ে? আমাকে এক্ষুনি একটা জরুরী দরকারে বেরোতে হবে।যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন।"
প্রতাপ রায়চৌধুরী হাত কচলাতে কচলাতে বলে উঠলেন,"আচ্ছা আচ্ছা, আপনার তাড়া আছে!বেরোবেন!না তাহলে আর আপনাকে বিরক্ত করব না। আসলে ওই বাচ্চা ছেলে টোটোনকে কবে এইখানে নিয়ে আসবেন সেইটাই জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলুম আর কি! ঠিক আছে, আমি চলি।"
আমি মনে মনে যারপরনাই খচে গেলাম।এ তো আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল!এই ভদ্রলোকের ভাবখানা এমন, যেন আমি টোটোনকে ওর সামনে হাজির করানোর কোনো চুক্তিপত্রে সই করে তারপর কাজে গড়িমসি করছি,আর ইনি এসেছেন আমাকে তাগাদা দিতে! আমি একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললাম,"দেখুন প্রতাপ বাবু, বৌদি কে বলে বুঝিয়ে তার কোল থেকে অল্প সময়ের জন্য টোটোনকে এনেছিলাম আমি, কিন্তু তাই বলে এই কাজ টা বার বার করা সম্ভব নয়।টোটোন এখন ওর মায়ের কোলে রয়েছে, আমি ওকে এখানে আমার কাছে আনতে পারব না।আপনি আর বারে বারে এই এক কথা বলে বলে আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করবেন না।আমি এখন বেরোব।"
প্রতাপ বাবু আমার বিরক্তি মাখা কথাগুলো চুপচাপ শুনে মানে মানে কেটে পড়লেন আমার এই ঘর থেকে।আর আমিও তড়িঘড়ি রওনা দিলাম সনাতন মাইতি র ঘরের উদ্দেশ্যে!
দৃশ্য তিন
---"আমাকে ছেড়ে দিন, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন! আমার পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা আছে...এই দুনিয়ায় আমি ছাড়া ওর কেউ নেই! দয়া করুন আমাকে... আপনার দুটি পায়ে পড়ি!
---"শালী, পুলিশের কাছে ক্যালডেং শেরিং এর খোঁজ দিতে যখন মরিয়া হয়ে উঠেছিলি, তখন তোর এসব কথা মনে ছিল না?
---ক্যালডেং শেরিং কে আমি কখনো পুলিশের সামনে আনব না। আমি... আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি! দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন...! আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না।"
---"স্যার আর তোর একটি কথাও বিশ্বাস করেন না।আর এই কারণেই উনি তোর শেষ দেখতে চান। আজ আমরা সবাই তোকে নিয়ে খেলবো।বুঝলি?
---"আমায় নিয়ে খেলবে? মানে?কি বলতে চাইছ তোমরা?"
---"আরে বোকা, নারী পুরুষের আদি খেলাটাই আজ আমরা এক এক করে খেলব তোর সঙ্গে! এতদিন ধরে স্যার কে অনেক জ্বালিয়েছিস তুই।আজ স্যার নিজে তোকে আমাদের প্লেটে তুলে দিয়েছেন!আজ তো আনন্দ স্ফূর্তি টা বেশ জম্পেশ করেই হবে!"
---"দোহাই তোমাদের, তোমাদের ঘরে ও তো মা বোন আছে। তাদের কথা একবার মনে করো তোমরা, তোমরা বিশ্বাস করো, আমি আজ রাতেই টোটোন কে নিয়ে এই কার্শিয়াং শহর ছেড়ে চলে যাব।আর কেউ কোনোদিন আমাদের খোঁজ পাবে না।"
---শোন শালি,ক্যালডেং শেরিং হলেন আমাদের ভগবান! ওনার বিরুদ্ধে যদি আমাদের ঘরের মা বোন রা কোনো শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করত, তবে আমরা তাকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে দুবার ভাবতাম না।
পাশ থেকে হঠাৎ একজন গুন্ডা বলে উঠল,"ওস্তাদ, ইভানের বাবার এই বাংলোটা কিন্তু খুব ঝামেলা পুইয়ে তারপর ম্যানেজ করা গেছে। এখন আর দেরি করা ঠিক নয়।ওর মতো মাথামোটা একজন বন্ধু কে ম্যানেজ করে একরাতে র কিছু টা সময়ের জন্য এই বাংলো টা হাতের মুঠোয় করতে পারলেও সময়ের দিকটা কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।"
---"যা কিছু বলেছিস!আর দেরি করে কি লাভ!চল, এক এক করে আনন্দ করতে শুরু করি! এরপর তো ক্যালডেং শেরিং এর হাতে একে ছেড়ে দিতে হবে তাই না! তিনি নিজের হাতে চিরতরে সরিয়ে দেবেন তাঁর এই পথের কাঁটা টিকে!
দৃশ্য চার
গোটা কার্শিয়াং শহর এখন উত্তাল। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত এই কার্শিয়াং শহরের পাহাড়ের
গায়ে অবস্হিত একখানি বাগানবাড়ি র ভিতরে মিলেছে, বছর পঁচিশের কোনো তরুণীর ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ! অমানুষিক নির্যাতনের পর মেয়েটার গলায় চালানো হয়েছে ক্ষুর।আর তার ফলপ্রসূ মেয়েটার ধড় থেকে মাথাটা ঝুলে রয়েছে আর চারপাশে বয়ে চলেছে রক্তের ধারা...! এরকম নৃশংস দৃশ্য চাক্ষুষ করার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।নিরিবিলি একটা পাহাড়ী জায়গায় কিছুদিন থেকে লেখালেখি র কাজটা অনেক টা এগিয়ে নেব,এমন ভেবেই এখানে আসা।কিন্তু এখানে আসার পর থেকেই এখানে ঘটতে থাকা একটার পর একটা অঘটনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ব,এটা ঘূণাক্ষরেও ভাবিনি আমি।
বাগানবাড়িটার চারপাশটায় এখন লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে।বাংলোটা ঘিরে রেখেছে পুলিশ বাহিনী। পুলিশ বাদে বাংলোর ভিতরে রয়েছি আমি আর সনাতন মাইতি।সনাতন মাইতি নিজের মেয়ের মৃতদেহের ওপরে আছাড়ি বিছাড়ি খেয়ে উন্মাদের মতো কান্নাকাটি করে চলেছেন।টোটোনের নিখোঁজ হওয়ার খবর টা পাওয়ামাত্রই আমি সনাতন মাইতি র ঘরের দিকে ছুটে যাই,আর তখন ই ফোনে কেউ সনাতন মাইতিকে তার
নিজের একমাত্র মেয়ে আশমি র মৃত্যু সংবাদ দেয়। মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর সনাতন মাইতি সাথে সাথেই সংজ্ঞা হারিয়ে বসেন। আমি সাথে সাথে পাশে রাখা জলের কুঁজো থেকে হাতের মুঠোয় করে তার চোখেমুখে
জল ছিটিয়ে তার জ্ঞান ফেরাই।নাতি নিখোঁজ হওয়ার পর এখন হঠাৎ করে মেয়ের মৃত্যুর খবর টা আর নিতে পারলেন না ওই বয়স্ক মানুষ টা...! আমি তাকে কোনোমতে বলে, বুঝিয়ে মার্ডার স্পটের দিকে নিয়ে যাই।সনাতন মাইতি যে বাস্তবিকই কতখানি একা ও কোণঠাসা জীবন যাপন করেন তা আমি ভালোভাবেই বুঝে গেলাম। কোনো আত্মীয় স্বজন বা প্রতিবেশী কিন্তু ওর সাথে এল না। আমি ই ওই বয়স্ক মানুষ টাকে নিজের দায়িত্বে মার্ডার স্পট পর্যন্ত নিয়ে গেলাম।ওই বাগান বাড়ির আশেপাশে থিকথিকে ভীড় জমে উঠলেও বাংলোর চারপাশে তৈরি করা একটা বাউন্ডারি র ভিতরে কাউকে অ্যালাও করা হচ্ছে না।আশমি র বাবা হিসেবে সনাতন মাইতিকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হল। সনাতন মাইতি কে যেহেতু আমি একা সামলে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছি,তাই তাঁর অনুরোধে আমাকেও ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হল।আশমির গলাকাটা মৃতদেহ টা চোখে পড়ামাত্র আমার সারা শরীর যেন কেঁপে শিউরে উঠল!হা ঈশ্বর!মানুষ মানুষকে এতখানি নৃশংসভাবে মারতে পারে কিভাবে!
পুলিশ রা নিজেদের মধ্যে যা বলাবলি করছে তার একটু আধটু আমার কানে এসে পৌঁছাচ্ছিল। আমি যা বুঝলাম, খুনের আগে আশমি কে গণধর্ষণ করা হয়েছিল!মেয়েটার মৃত শরীরের দিকে তাকানো যাচ্ছে না,এত নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে ওকে!সকাল থেকে আশমি র ছোট্ট ছেলে টোটোন পুরোপুরি নিখোঁজ,আর বেলা না পোহাতেই এই বাগান বাড়ির ভিতরে এমন নৃশংসভাবে মেয়েটাকে খুন হতে হল! আমি যা বুঝলাম,এই সনাতন মাইতি র পরিবার বলতে তেমনভাবে কিছুই নেই।রোগে ভুগে কিছুদিন আগে ওঁর স্ত্রী গত হয়েছে আর তারপর থেকে উনি একাই থাকেন নিজের বাড়িতে। নিজের মেয়েকে দূরে নিয়ে গিয়ে পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে এসেছেন এবং মেয়ে সেখানে সুখে শান্তিতে সংসার করছে, এমন একখানি মনগড়া কাহিনী তিনি প্রতিবেশীদের শুনিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ঠিক ই, কিন্তু তার এই কাহিনী কেউই বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি।আবার দুহাত ভর্তি শাঁখা পলা নোয়া, এবং সিঁথি তে সিঁদুর দেখে ওকে বিতাড়িত ও করতে পারেনি তারা। কিন্তু আশমি র চরিত্র নিয়ে ওর সমস্ত চেনা পরিচিত রা সওয়াল করে এসেছে সবসময়ে। এহেন পরিস্থিতিতে আশমি র মৃত্যু সংবাদ শুনে সনাতন যখন উদ্ভ্রান্তের মতো সেখানে ছুটে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, তখন পাড়া প্রতিবেশী রা সামনে এসেই নাক সিঁটকে বলেছিল,"ও মেয়ে মরেছে খুব ভালো হয়েছে।এই দুনিয়া থেকে একটা আবর্জনা কমল!"
এখন সনাতন এই এতবড় পৃথিবীতে পুরোপুরি স্বজনহারা হয়ে গেলেন। তার নিজের বলতে আর একজন ও রইল না এই পৃথিবীতে! মানুষটার জন্য আমার বড়োই খারাপ লাগতে শুরু করল।এই কার্শিয়াং শহরে আমি পা রেখেছি খুব বেশিদিন হয়নি।তাই এই জায়গার সম্বন্ধে আমি খুব একটা বেশি কিছু জানি না এখনো। পুলিশের কথাবার্তা কিছু কিছু কানে আসছিল আমার।আর তাতে আমি জানতে পারি,এই কার্শিয়াং শহরের পাহাড়ী নির্জনতায় চলছে স্মাগলিং।এই কার্শিয়াং শহরের একেবারে কাছাকাছি পড়ে নেপাল, ভুটানের মতো আন্তর্জাতিক সীমানা।পাহাড়ী জঙ্গল ও তার দুর্গমতাকে কাজে লাগিয়ে একদল স্মাগলার হেরোইন পাচার করে চলেছে প্রতিনিয়ত, পুলিশ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। তাদের ধরার জন্য এখানকার পুলিশ এখন ভীষণভাবে তৎপর!
ইতিমধ্যে এই বাগান বাড়ির ভিতরে এমন নৃশংস খুনের ঘটনায় পুলিশ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।এই বাগান বাড়ির মালিক ইভান দত্ত কে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এটা আমার কানে এসেছে ইতিমধ্যেই। হঠাৎ এখানে একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের আগমনের ফলপ্রসূ আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলাম।এই ভদ্রলোক কে আমি বিলক্ষণ চিনি!ইনি হলেন আমার বন্ধু অরিত্র দত্ত র বাবা প্রণবেশ কাকু! স্কুলে পড়ার সময়ে আমি আর অরিত্র হরিহর আত্মা বন্ধু ছিলাম।যখন কলেজে উঠি তারপর ব্যবসা র কারণে অরিত্র র বাবা এই প্রণবেশ কাকু কলকাতা থেকে নিজেদের পাততাড়ি গোটাতে শুরু করেন।এরপর থেকে অরিত্র র সাথে আমার আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি।ওঁরা যে এই কার্শিয়াং শহরে এসে উঠেছে সপরিবারে,এটা আমি জানতামই না। যখন আমি শুনলাম, প্রণবেশ কাকু পুলিশকে বারেবারে কাকুতি মিনতি সহ অক্লান্তভাবে বুঝিয়ে চলেছেন,এই বাগান বাড়ির মালিক যদিও তার কনিষ্ঠ পুত্র ইভান।কিন্তু এই নৃশংস খুন সে আদৌ করেনি। এইসবকিছুর পিছনে অন্য কারোর হাত রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাঁর কথায় কোনো কর্ণপাত করলেন না। তাঁরা বললেন, মার্ডার স্পট এই বাংলো বাড়িটি খাতায় কলমে ইভান দত্তের নামে রয়েছে এবং সে মাঝে মাঝেই রাতবিরেতে
এখানে সময় কাটাতে আসে। কাজেই সন্দেহভাজনের তালিকায় সবার প্রথমে তার নামটাই আসে। তবে পুলিশের ইনভেস্টিগেশনের পর যদি প্রমাণ হয় যে ইভান দত্ত সম্পূর্ণ নির্দোষ, তাহলে অবশ্যই তাকে সসম্মানে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হবে।তবে তদন্ত যতদিন চলবে, ততদিন পর্যন্ত তাকে পুলিশি হেফাজতেই থাকতে হবে।প্রণবেশ কাকু এতটাই উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন,যে আমাকে তিনি খেয়াল ই করেননি।অরিত্র র ছোট ভাই ইভান কে আমি ছোট থেকে অনেক টা বড় হতে দেখেছি।যে ইভান দত্ত কে পুলিশ অ্যারেস্ট করে ধরে নিয়ে গেছে থানায়,সেই ইভান যে আসলে আমার বাল্যবন্ধু অরিত্র র ভাই, এটা আমি বুঝতে পারলাম অচিরেই। বাংলোর ভিতরে যখন এমন মর্মবিদারক পরিস্থিতি, সেই সময়ে হঠাৎ ভিতরে ঢুকল প্যান্ট শার্ট পরিহিতা বছর পঁচিশের এক তরুণী।তার দুচোখের দৃষ্টিতে শাণিত তলোয়ারের তীক্ষ্ণ ফলা র মতো এমন এক ঔজ্জ্বল্য ছিল,যে আমি ক্ষণিকের জন্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে...! চারপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে,সেই সবকিছু ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে গেল যেন...!হঠাৎ ঘরের ভিতরে তুমুল হট্টগোল আরম্ভ হল। ইভানের বেশ কয়েকজন কাছের বন্ধু হঠাৎ জোরজবরদস্তি এখানে ঢুকে পড়ে চিৎকার চ্যাঁচামেচী জুড়ে দিল।তারা পুলিশ কে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল,যে তাদের বন্ধু পুরোপুরি নির্দোষ কারণ গতকাল রাতে অর্থাৎ খুনের সময়ে ইভান ওদের সাথে ওদের ই একজনের বাবা র অসুস্থতার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিল।এই খুনের সাথে ইভানের কোনো সম্পর্ক ই নেই।প্রণবেশ কাকু ততক্ষণে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়েছেন।শার্ট প্যান্ট পরিহিতা ওই তরুণী এবার প্রণবেশ কাকুর দিকে এগিয়ে আসল এক পা এক পা করে। তারপর তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল,"আঙ্কেল আপনি একদম চিন্তা করবেন না, ইভান আমার ছোট ভাইএর মতো।ওকে আমি চিনি।এই নৃশংস খুনের সাথে যে ওর কোনো যোগসূত্রই নেই,এই বিষয়ে আমি আপনার সাথে পুরোপুরি একমত।আমি খুব শীঘ্রই প্রমাণ সমেত আসল খুনী কে পুলিশের সামনে এনে দাঁড় করাব।আপনি আপাতত ঘরে ফিরে চলুন...!
দৃশ্য পাঁচ
কার্শিয়াং শহরের আনাচে কানাচে এই মর্মবিদারক, নৃশংস খুনের ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়ল অচিরেই।আর সেই সাথে আশমি র চরিত্র সম্বন্ধেও নানা মুনির নানা মত আমার কানে আসতে শুরু করল। আমার শুধু একটা জিনিস ভারি অদ্ভুত ঠেকল,আশমি র যে একটা পাঁচ বছরের ছোট বাচ্চা ছেলে রয়েছে,এটা কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ জানে না।না,টোটোন কে এখনো পর্যন্ত খুঁজে পায়নি সনাতন মাইতি অর্থাৎ ওর আপন দাদু।আর অদ্ভুত ব্যাপার, নাতির অস্তিত্ব টা বলতে গেলে পুরোপুরি উহ্য ই রয়ে গিয়েছে এখনো পর্যন্ত। তাকে খোঁজার চেষ্টা টা পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে।আর চেষ্টা টা করবেই বা কে!সনাতন জেঠু কে এখন সামলানো যাচ্ছে না রীতিমতো। প্রথমে নাতি নিখোঁজ হওয়ার পর নিজের একমাত্র মেয়ের এহেন মর্মান্তিক মৃত্যু র পর তিনি তাঁর মানসিক স্থিতি সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে বসেছেন।একলা নিজের ঘরে ফিরে তো গিয়েছেন তিনি, কিন্তু এখন ওনাকে নিয়ে আমার বেশ দুশ্চিন্তার উদ্রেক হচ্ছে। স্ত্রী কে হারানোর পর নিজের একমাত্র মেয়ে ও নাতিকে সাথে নিয়ে বাকি জীবনটা পার করবেন, এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। হঠাৎ করে অল্পদিনের মধ্যেই ছোট্ট নাতি টা রাতারাতি নিখোঁজ হয়ে গেল আর রাত পোহানোর পরেই পেলেন মেয়ের মৃত্যু সংবাদ।মেয়ের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখার পর তিনি নিজের বুকে সজোরে চাপড় মারতে মারতে শুধু বলে চলেছিলেন,"এই এতবড় দুনিয়ায় আমাকে একা করে দিয়ে তোরা সবাই কোথায় চলে গেলি! আমি এখন কার জন্য বাঁচব বল,কার জন্য বাঁচব!"
সনাতন জেঠু র ওই মর্মবিদারক ক্রন্দনধ্বনি এখনো যেন আমার কানে বেজে চলেছে। এখন গভীর রাত। আমি শুধু বিছানায় এপাশ ওপাশ করে চলেছি। ঘুম আসছে না কিছুতেই।
আমার মন বারে বারে বলে উঠছিল,"সনাতন জেঠু কে ওইভাবে একা থাকতে দেওয়া টা একেবারে উচিত নয়। ওঁকে নিজের সাথে করে নিজের কাছে নিয়ে রাখলে সবচেয়ে ভালো হত।এই অল্পদিনের পরিচয়েই এই মানুষটার ওপর আমার বড্ড যেন মায়া পড়ে গিয়েছে।
ক্যাব চালিয়ে কোনোমতে জীবন ও জীবিকা অতিবাহিত করা এই ছাপোষা, বয়স্ক মানুষটার চোখে একটা মায়া রয়েছে। আমি অনেক ছোটবেলায় নিজের বাবা কে হারিয়েছি।এই মানুষটার চেহারার আদলের সাথে আমার বাবার চেহারার অনেক মিল আছে।আর এই কারণেই এনার প্রতি আমি একটা টান অনুভব করছি। এখন গভীর রাত। চারপাশে সবাই এখন গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। কিন্তু আমার অন্তরাত্মা ছটফট করে চলেছে ভীষণভাবে।আমার মন বারে বারে বলে উঠছে, সনাতন জেঠু একলা নিজের ঘরের ভিতরে শোকে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে
হয়তো কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসবেন!আর তাছাড়া টোটোন ই বা এখন কোথায় আছে! বাচ্চা ছেলে টা নিখোঁজ হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই।এখনো পর্যন্ত ওর কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি।এখন যা পরিস্থিতি, তাতে ওর নিখোঁজ ডায়েরি করতে থানায় যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থাটাই নেই সনাতন জেঠু র। সনাতন জেঠু আর আশমি,এই দুজন ছাড়া এই এত বড় পৃথিবী তে টোটোনের খোঁজ করার মতো কেউ নেই,এটা ভেবে আমার গলার কাছে এক দলা কষ্ট জমে উঠল। আমি শুধু অপেক্ষা করে রইলাম আকাশ ফর্সা হওয়ার জন্য।ভোর হওয়ার সাথে সাথে যেভাবেই হোক, সনাতন জেঠু কে সাথে নিয়ে আমায় টোটোনে র নিখোঁজ ডায়েরি টা করে আসতে হবে।
দৃশ্য ছয়
সারা রাত ছটফট করে বিছানায় এপাশ ওপাশ করার পর, ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আমি ছুটে গেলাম সনাতন জেঠু র ওই একচালা ছোট্ট ঘরে।
সনাতন জেঠুর ঘরে পৌঁছে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম।গতকাল মার্ডার স্পটে সাদা শার্ট ও প্যান্ট পরিহিতা যে বছর পঁচিশের তরুণী কে প্রণবেশ কাকু কে সান্ত্বনা দিতে দেখেছিলাম, সেই মেয়েটি এখন সনাতন জেঠুর ঘরের একপাশে রাখা স্টোভে একটু দুধ গরম করতে ব্যস্ত। সনাতন জেঠু বিছানায় শুয়ে শুন্য দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন ছাদের দিকে।মুখটা হা করা রয়েছে।আর দুচোখের কোল বেয়ে ফল্গুধারা র মত নেমে আসছে অশ্রুধারা! আমি বুঝলাম,আমি যা আন্দাজ করেছিলাম সেটাই সঠিক। সনাতন জেঠু র অবস্থা টা এখন এতটাই শোচনীয়,যে একা একা একটা ঘরে নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সামলে থাকাটা রীতিমতো অসম্ভব! এখন ওনার পাশে কারোর থাকা টা খুব ই দরকার। মার্ডার স্পটে গিয়ে মেয়ের মৃতদেহ চাক্ষুষ করার পর থেকে গোটা রাতটা যে তার গলা দিয়ে যে কিছুই নামেনি, এটা আমি বুঝতে পারলাম অচিরেই।এই মেয়েটি এখন সনাতন জেঠু কে একটু কিছু খাওয়ানোর জন্য ই যে স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম করতে বসেছে,এটাও আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম। কিন্তু এই মেয়েটার সাথে সনাতন জেঠু র কি সম্পর্ক!এই মেয়েটা কি তবে সনাতন জেঠু র কোনো আত্মীয়?এমন ই হাজারো প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করল। হঠাৎ মেয়ে টা আমার দিকে তাকাল,আর তাকিয়েই সে প্রচন্ড আনন্দিত হয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠল,"আরে, আমার কি সৌভাগ্য!বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ঋদ্ধিমান সেনগুপ্ত আমার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে!"
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠলাম,"ইয়ে...মানে... সনাতন জেঠু এখন কেমন আছেন?"
---"জেঠু!আই সি...ইনি তাহলে আপনার কোনো আত্মীয়!এই কারণেই গতকাল আপনি ওই মার্ডার স্পটে এনার সাথে এসেছিলেন। আমি আপনাকে ওই মার্ডার স্পটে কালকেই লক্ষ্য করেছিলাম।আপনার সাথে একটিবার আলাপ করার একটা ইচ্ছা জেগে উঠেছিল আমার মনে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল,যে সেসব নিয়ে আর কিছু ভাবনা চিন্তা করার কোনো ফুরসৎ ই পেলাম না আমি।যাক গে,ভালোই হল। এখন এখানে আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল।তা,বাই দ্য ওয়ে,এই সনাতন মাইতি আপনার কে হন?"
মেয়েটির মুখে ওই প্রশ্ন শোনার পর আমি বুঝতে পারলাম, আমি এতক্ষণ যা ভাবছিলাম সেসব হয়তো ভুল হতে পারে।"এই সনাতন মাইতি আপনার কে হন"... মেয়েটার এমন বাচনভঙ্গি শুনে আমার মনে হল, সনাতন মাইতি এই মেয়েটির কাছেও হয়তো অপরিচিত হলেও হতে পারে।
আমি একটু আনমনা হয়ে গেলাম। মেয়েটি আবার বলে উঠল,"আমি তৃষা। তৃষা চৌধুরী।এই কার্শিয়াং শহরে প্রথমবার এলাম। গতকাল ওই মার্ডার স্পটে আপনিও নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন আমাকে।আমি তখন এই সদ্য সন্তান হারা এই ভদ্রলোক কে চাক্ষুষ করি এবং এনার মর্মবিদারক বিলাপ শ্রুতিগোচর করে বুঝতে পারি,এই মানুষটা এখন এই গোটা পৃথিবীতে পুরোপুরি একা হয়ে পড়েছেন। আমার খুব খারাপ লাগতে শুরু করে এনার দুরাবস্থার জন্য। খোঁজ খবর নিয়ে তাই একবার দেখতে এলাম এনাকে।তা, এনার এখানে এসে আপনার সাথে আলাপ হয়ে খুব ই ভালো লাগল।"
আমি বলে উঠলাম,"আমি এখানে আসার পর থেকেই এই সনাতন জেঠু র সাথে আমার আলাপ হয়। বয়স্ক এই মানুষটার প্রতি আমারো বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছে। এখন এই মানুষটা এই ভরা দুনিয়ায় পুরোপুরি একা হয়ে গেলেন। আমি এনার সাথে একবার দেখা করার জন্য ই এসেছি।বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি প্রনবেশ কাকুর আত্মীয়?"
---"হ্যাঁ। ঠিক ধরেছেন আপনি।প্রণবেশ দত্ত আমার আপন মামা হন।"
---"আই সি, আচ্ছা আপনি তাহলে এখানে আপনার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন।আপনার মামার সাথে আমি পরিচিত খুব ভালোভাবেই। ওনার বড় ছেলে অরিত্র আমার বাল্যবন্ধু। বহুদিন হল,ওর সাথে কোনো যোগাযোগ নেই আমার।ওরা যে সপরিবারে এই কার্শিয়াং শহরে এসে উঠেছে,এটা আগে জানতাম না আমি। অরিত্র র ছোট ভাই ইভান, যাকে পুলিশ খুনের দায়ে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে,ওকে আমি আমার ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবাসতাম এবং এখনো বাসি।ওকে পুলিশ এইভাবে খুনের দায়ে ধরে নিয়ে গেছে শুনে আমার ভীষন মন খারাপ লাগছে। চারপাশে যে কি ঘটে চলেছে,তার কোনো কূলকিনারা করতে পাচ্ছি না...!---হ্যাঁ।ও যে পুরোপুরি নির্দোষ এটা আমিও জানি। কিন্তু এই মূহুর্তে ওকে লকাপ থেকে ছাড়িয়ে আনার কোনো উপায় নেই।কারণ ওর জামিন করানো টা এখন খুব মুশকিল।ও খুনের সাথে সাথে স্মাগলিং এর কেসেও জড়িয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। এখন সব জট না ছাড়াতে পারলে ওর জামিনের ব্যবস্থা করা টা খুব ই কঠিন। এদিকে মামা মামী এখন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছেন।আর অন্যদিকে একজন অল্পবয়সী মেয়ে নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর ওর এই বাবাও পুরোপুরি অসহায়। এখন মামা মামী কে সামলানোর সাথে সাথে এনাকেও সামলানো প্রয়োজন।আমি বললাম,"হ্যাঁ। আমি তো এই কারণেই ভোর না হতেই এখানে ছুটে এলাম। আপনি এনার সাথে রয়েছেন ইতিমধ্যে,এটা দেখে আমি বেশ নিশ্চিন্ত হলাম।তৃষা গরম দুধের গ্লাস টা হাতে নিয়ে সনাতন জেঠু র কাছে ধরল।সনাতন জেঠু কোনোমতে মুখে কিছু তুলতেই চাইছিলেন না। তৃষা কোনোমতে তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দুধ টা খাওয়াল।ওই দৃশ্য দেখে আমি একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। তৃষা বলে উঠল,"আপনি চিন্তা করবেন না সনাতন কাকা, আমি আপনার জন্য দুপুরের রান্না করে দিয়ে যাব।"
এরপর তৃষা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,"আমি এনার জন্য ভাত তরকারি রান্না করে রেখে যাব।আপনি একটু দায়িত্ব নিয়ে এনাকে ভাতটা খাইয়ে দেবেন কেমন! ওদিকে আমার অনেক কাজ রয়েছে। এখন ইমিডিয়েটলি ইভানকে জামিন করানো এইসব ঝুটঝামেলা থেকে বাঁচানোর জন্য একজন উকিল খুঁজতে হবে আমাকে!"
তৃষা র কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠে বললাম,"আপনি উকিল নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমার এক পরিচিত বন্ধু আছে।সে একজন দুঁদে উকিল।নাম অনির্বাণ সান্যাল। আমি ওকে আপনাদের এই কেস নেওয়ার জন্য অনুরোধ করব। ও আমার খুবই কাছের বন্ধু। আমি যদি ওকে কোনো অনুরোধ করি ও সেটা ফেলবে না ,সে আমি জানি। আমি আজ ই ওকে ফোন করব।
তৃষা বলে উঠল,"হ্যাঁ তাহলে তো ভালোই হয়।মামা ইতিমধ্যে উকিল খুঁজতে শুরু করেছেন। কিন্তু কি জানেন তো,মামা তো দীর্ঘ বছর ধরে এখানে রয়েছেন, খুব একটা ভরসার যোগ্য কাউকে পাচ্ছেন না।তাই একটু সময় লাগছে।"
আমি বললাম,"আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আজ ই অনির্বাণ কে একটা খবর পাঠাব। তবে আপনি যখন এই সনাতন জেঠু র ঘরে এসেই পড়েছেন, তখন একটা কথা আপনার সাথে শেয়ার না করে আমি পারছি না। এখন পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো,যে কিভাবে কথা টা বলা শুরু করব সেটাই ভাবছি।"
তৃষা বলে উঠল,"কি কথা, বলুন...।"
---"আসলে,আশমি র খুনের ঘটনা টা চারদিকে তো ইতিমধ্যেই চাউর হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেউ এটা জানে না,আশমি র বছর পাঁচেকের একটা বাচ্চা ছেলে আছে। নাম টোটোন। ওকে গতকাল সকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বলতে পারেন, রাতারাতি একটা জলজ্যান্ত বাচ্চা ছেলে পুরোপুরি গায়েব হয়ে গিয়েছে!"
---"হোয়াট!আশমি র বছর পাঁচেকের ছোট বাচ্চা ছিল! কিন্তু আমি তো যতদূর জেনেছি ও অবিবাহিতা একটা মেয়ে!"
---"আরে ম্যাডাম,এই কারণেই তো সনাতন জেঠু বা আমি এখনো পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছি না,টোটোন কে খুঁজে বার করব কি করে...!কারণ আশমি যে অবিবাহিতা বা ওর একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা ছেলে আছে,এই কথা টা কিন্তু এখানে কেউ জানে না। সনাতন জেঠু এই কথা টা চেপে রেখেছেন সকলের কাছে।টোটোন নিজেও ওর জন্মের পর এই প্রথম এসেছে ওর মায়ের এই জন্মভিটা তে।ওর আসল পরিচয় টা এখনো এখানে কেউ জানে না। সনাতন জেঠু আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছেন, আমি যেন টোটনের আসল পরিচয় টা কারোর সামনে ফাঁস না করি। কিন্তু এখন তো এই পরিস্থিতিতে টোটোন কে খুঁজে বার করার জন্য পুলিশের সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।ওর মা আশমি এখন পৃথিবীতে নেই।এই গোটা পৃথিবীতে এই এক দাদু ছাড়া বেচারা বাচ্চাটার আর কেউ নেই। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পুলিশ কে সবটা জানাতে হবে।আশমি কে তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। টোটোনকে যদি অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, এখন সেটাই এখন সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।"
---"সত্যি, সনাতন কাকুর এই ঘরে যদি না আসতাম, তাহলে এতকিছু জানতে অনেকটাই দেরি হয়ে যেত। এখন আমার কাছে আশমি র প্রকৃত খুনীর শাস্তি ঠিক যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততখানি গুরুত্বপূর্ণ হল এই সনাতন জেঠু আর ওর নাতিকে একসাথে মিলিয়ে দেওয়া।আর এই ব্যবস্থা টা আমাকে করতেই হবে। আপনি আমাদের পাশে আছেন তো?"
আমি বলে উঠলাম,"নিশ্চয়ই,এ তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না...!"
সনাতন জেঠু কে কোনোমতে সামলে, তাকে কিছু খাইয়ে দিয়ে আমি চলে এলাম আমার ঘরে। গতরাতেও সনাতন জেঠু কে নিয়ে আমি একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু,আজ সকালে সনাতন জেঠু র ঘরে তৃষা কে দেখার পর থেকে আমি অনেক টা নিশ্চিন্ত বোধ করছি।এখন ঘরে ফিরে এসে আমি তোয়ালেটা নিয়ে স্নানে ঢুকতে যাবো, এমন সময়ে ফের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। এখন এই অবেলায় দরজায় কড়া নাড়ছে কে, এটা বুঝতে আমার খুব অসুবিধা হল না। আমি বেশ বিরক্তি নিয়েই দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে ছিটকিনি টা খুললাম। দরজা খোলার পর দেখলাম, আমি যা ভেবেছি তাই। আমার বাড়িওয়ালা প্রতাপ রায়চৌধুরী আমার সামনে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,"কি হয়েছে প্রতাপ বাবু, কিছু বলবেন?"
---"ইয়ে...মানে... তোমার কোলে সেদিন তোমার দাদার ছেলেটিকে দেখে আমি বলেছিলাম না, ওকে একদিন নিয়ে আসবেন আমার এখানে,তা ওকে কবে নিয়ে আসবেন?"
ওনার কথাগুলো শুনে এবার আমার গায়ে জ্বালা করে গেল।এ তো আচ্ছা জ্বালা... একটা বাচ্চা ছেলে কে এখানে একবার নিয়ে আসার জন্য এ তো একেবারে ছিনে জোঁকের মতোই পিছনে পড়েই রয়েছে!আমি একমুখ বিরক্তি নিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম, "আরে টোটোনকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওকে পেলে তবে তো নিয়ে আসব আপনার কাছে!"
এই কথা টা মুখের ডগায় এসেই হঠাৎ করে আটকে গেল।আমি কথাটা বলতে গিয়েও কোনোমতে সেটা গিলে নিয়ে, মুখে বলে উঠলাম,"আরে,দাদা তো ওকে নিয়ে বাড়িতে রওনা দিয়ে দিয়েছে।টোটোন কে এখন আমি আপনার কাছে কি করে আনব বলুন...!"
আমার এই কথা শোনার পর তিনি কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। নিমপাতার মতো মুখ করে তিনি বলে উঠলেন,"অ...তা বটে... আমি অনেক আশা করে এসেছিলাম।তা এবারে না হোক,পরে যখন আসবেন এই কার্শিয়াং শহরে, তখন কিন্তু আমার এই বাড়িতেই উঠবেন,আর সাথে করে টোটোন কেও নিয়ে আসবেন,কেমন!"
আমি নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে উঠলাম,"আমার মাথাটা গোবর দিয়ে ঠাসা।টোটোনের নিখোঁজ হওয়ার পিছনে এনার হাত ও যে বিলক্ষণ থাকতে পারে,এই কথাটা আগে কেন আমার মাথায় আসেনি!"
আমি নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। হঠাৎ আমার কানে এল একটা মর্মভেদী চিৎকার! হ্যাঁ,এই আর্ত চিৎকার তো প্রতাপ রায়চৌধুরী র গলা থেকে বেরিয়ে আসছে!মাত্র
দু মিনিট আগেই তো মানুষ টা আমার সাথে একদম স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছিল! মাত্র মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ভদ্রলোকের কি বিপদ হল? আমি তোয়ালে টা বিছানায় ছুড়ে ফেলে রেখে একছুটে দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুললাম। দরজা খুলতেই যে দৃশ্য আমি দেখলাম, তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল!প্রতাপ রায়চৌধুরীর বুকে একটা ছুরি গাঁথা রয়েছে।
রক্তের স্রোতে চারপাশ টা ভেসে গিয়েছে।হঠাৎ অদূরেই খুট করে একটা শব্দ ভেসে এল। আমি চকিতে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম,কালো রঙের একটা ট্রাকসুট দিয়ে নিজের চেহারা আপাদমস্তক আবৃত করে রাখা আততায়ী দ্রুত গতিতে পাঁচিল টপকে পালিয়ে গেল চোখের নিমেষে!
আমি সাথে সাথে সেদিকে দৌড়ে গেলাম। পাঁচিলের কাছটায় জলা জঙ্গলে এক্কেবারে ভর্তি। কিন্তু আমি সেসবের পরোয় না করে প্রাণপণে দৌড়ে গেলাম আততায়ী কে হাতেনাতে ধরার জন্য। কিন্তু পাঁচিলের কাছাকাছি পৌঁছানোর সাথে সাথেই আমার পা একটা শক্ত ধাতব কোনো বস্তুর সাথে ধাক্কা লাগার ফলপ্রসূ আমার গতি পুরোপুরি বেসামাল হয়ে গেল।আমি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম মাটিতে! পায়ের অনেক টা অংশ, এবং হাতের কিছু অংশ কেটেছড়ে রক্তারক্তি হয়ে গেল।
আমি মনে মনে নিজেকেই গাল পাড়তে লাগলাম!একটু যদি চারপাশে কোথায় কি রয়েছে সেদিকে খেয়াল করতাম তাহলে ঠিক ওই পাঁচিল টা টপকাতে পারতাম আমি।আমি রীতিমতো হাত কামড়াতে শুরু করলাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন ফিসফিস করে আমার কানে কানে বলতে শুরু করল, প্রথমে টোটোন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, এরপর ওর মা আশমি র নৃশংস হত্যাকাণ্ড,আর আজ প্রতাপ রায়চৌধুরী কোনো অজ্ঞাত
আততায়ীর হাতে খুন হলেন। এইসব ঘটনাই আসলে একসূত্রে গাঁথা! কিন্তু কি সেই সূত্র!আমি কোনোকিছুর সাথে কোনোকিছু কে ঠিকভাবে মেলাতে না পেরে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম! ইতিমধ্যে বাগানের মালি হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসল এইদিকে। তারপর বলে উঠল,"ধরতে পারলেন বাবু?ওই খুনি কে ধরতে পারলেন?"
দৃশ্য সাত
সারা রাত ধরে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে থাকলাম আমি।ডান পা টা এমনভাবে মচকে গিয়েছে,যে আমি মাটিতে পা ই ফেলতে পারছি না। ইতিমধ্যে চারপাশে শুরু হয়ে গিয়েছে তুমুল চিৎকার চেঁচামেচি আর ঝগড়া।রায় চৌধুরী বাড়ির এই পারিবারিক ঝগড়ার সাথে আমি এই কদিনে ভালোমতো পরিচিত হয়ে গিয়েছি।এরা দিনরাত যে শুধু সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে মত্ত থাকে শুধু তাই নয়। ওদের এই তুমুল পারিবারিক বিবাদের কারণ টা বোধ করি কিছু অন্য!এই রায় চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি সদস্য যে প্রতিনিয়ত একটা কিছু খুঁজে চলেছে এই বাড়ির ভিতরেই,এটা আমি ভালোভাবেই বুঝতে পেরে গিয়েছি এই কদিনে।এই বাড়ির ভিতরেই তিনশো বছর ধরে লুক্কায়িত রয়েছে অমূল্য রত্নখচিত একখানি তলোয়ার!চোগিয়াল রাজা তাঁর রাজ্যের বিপ্লবকালীন সময়ে নিজের তলোয়ারখানি গচ্ছিত রাখেন এই রায়চৌধুরী বংশের পূর্ব পুরুষ তার বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষের কাছে।ওই তলোয়ার রাখার জন্য এমন একটা নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন ছিল,যা শত্রুপক্ষের কল্পনাতেও আসা সম্ভব নয়।তাই তিনি ওই তলোয়ার এই রায়চৌধুরী ভিলা র ভিতরে লুকিয়ে রাখার একটা ব্যবস্থা করেছিলেন, এবং তিনি নিজেও এই রায়চৌধুরী ভিলার ভিতরে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার একটা ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু এখন সেই সবকিছুই অতীত।কিন্তু এই রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা কিছুতেই তা মানতে চান না। তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, এমন বহু মূল্যবান একখানি তলোয়ার নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর,ওই তলোয়ার হাতছাড়া করার মতো মূর্খামি করতে পারেন না তাদের সেই পূর্ব পুরুষ!তা সে যতই রাজার বিশ্বস্ত কর্মচারী হোন না কেন তিনি... এমন মহামূল্যবান বস্তু হাতে পাওয়ার পর তিনি ও জিনিস হাতছাড়া করতেই পারেন না ।আর ওই মহামূল্যবান তলোয়ার টা লুকানো রয়েছে এই রায় চৌধুরী ভিলার অন্দরমহলে। বেশ কিছু বছর ধরে এই পরিবারের সদস্যদের মনে একটা দৃঢ় বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছে,যে প্রতাপ রায়চৌধুরী জেনে গিয়েছেন ওই তলোয়ারের হদিশ!আর তাদের এহেন চিন্তাভাবনার যুক্তিসঙ্গত কারণ ও আছে। প্রতাপ রায়চৌধুরী অল্প কিছু বছরের ব্যবধানেই আর্থিক দিক থেকে যেভাবে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন,তা এই পরিবারের বাকি সকলের কাছে প্রচন্ড ঈর্ষা র উদ্রেক করেছে।
এখন প্রতাপ রায়চৌধুরী হঠাৎ এইভাবে খুন হয়ে যাওয়ার পর,এই রায় চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি সদস্য একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে দিয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রতাপ রায়চৌধুরী কে ওঁর পরিবারের লোকেরা তীব্রভাবে ঈর্ষা করলেও তাদের সকলের কাছে এই প্রতাপ রায়চৌধুরী র প্রাণের মূল্য সর্বাগ্রে! কারণ ওদের সকলের বিশ্বাস,ওই বহু মূল্যবান বস্তুটি কোথায় আছে,এটা তিনি বিলক্ষণ জানেন এবং সকলে ওঁর পেট থেকে এই তথ্য টা বার করার জন্যই হত্যে দিয়ে বসেছিল এতদিন। কাজেই ওঁর পরিবারের কারোর হাতে যে খুন হননি প্রতাপ রায়চৌধুরী,এটা আমি বুঝতে পারছিলাম অচিরেই...! তাহলে ওই কালো ট্রাকসুট পরিহিত আততায়ী কে ছিল! আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিতে শুরু করল যেন! এইসব জটিল চিন্তাভাবনা থেকে মনটাকে একটু নির্মল প্রশান্তির কোনো ঠিকানায় ভাসয়ে দেওয়ার জন্য উচাটন হয়ে উঠলাম।
বিছানায় শুয়ে আমি দুচোখ বন্ধ করে ফেললাম।আর সাথে সাথে আমার বন্ধ চোখের পাতায় একখানি সুন্দর মুখ ভেসে উঠল। হ্যাঁ,সাদা সালোয়ার কামিজ পরিহিতা সেই মেয়েটির স্বচ্ছ দিঘির মতো চোখদুখানি আমার মনের প্রতিটি কোণায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তৃষাকে যেদিন প্রথম দেখি, সেদিন ই নিজের অজান্তেই আমার বুকের বামপাশে একটা তীব্র বেদনা অনুভব করেছিলাম!
এখন হঠাৎ করে আবার আমার মনের ভিতরে যেন হাজারো রঙের রামধনু রং মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠল তৃষা...!হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল,ওকে আমি যে কথা দিয়ে এসেছি,সেটা এই সব ঘটনার তালে গোলে এখনো পর্যন্ত রাখাই হয়ে উঠল না।আমি তাড়াতাড়ি করে বালিশের নিচ থেকে মোবাইল ফোন টা বার করে, বন্ধু অনির্বাণের নাম্বার ডায়াল করলাম।কিন্তু আমায় অবাক করে দিয়ে,ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল অরিত্র র গলা। প্রথমটায় আমি অবশ্য অরিত্র র গলা চিনতে পারিনি...কিন্তু পরে অনির্বাণের সাথে কথা হওয়ার পর আমার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
ইভান দত্ত কে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য ইতিমধ্যেই
আইনিভাবে তোড়জোড় শুরু করেছে অনির্বাণ। অরিত্র র সাথে অনির্বাণের আগে আলাপ ছিল না। ভালো একজন উকিলের খোঁজ করতে করতে অরিত্র অনির্বাণের খোঁজ পেয়েছে। এখন যখন অরিত্র জানল, আমি এই কার্শিয়াং শহরেই আছি, এবং এই সমস্ত ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছি, তখন ও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল,"কতদিন পরে তোর গলা শুনছি ঋদ্ধি, কেমন আছিস তুই?
---"এই চলে যাচ্ছে রে,একটু নিরিবিলি তে উপন্যাস লিখব বলে এই পাহাড়ে ঘেরা শহরে এসে থাকছি কদিন হল।আর এর মধ্যেই এখানে যা সব ঘটে চলেছে,তাতে আমার গায়ে রীতিমতো কাঁটা দিয়ে উঠছে...!কন্সফারেন্স কলে ছিল ফোন টা। অন্যপাশ থেকে অনির্বাণ কথা বলে উঠল।
---"ভাই, অরিত্র বাবু যে তোর পুরোনো বন্ধু,এটা জেনে আমার ভারি ভালো লাগছে। আমি ইভান দত্ত কে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য সবরকম চেষ্টা করব।
ওপাশ থেকে আবার অরিত্র বলে উঠল,"ভাই ঋদ্ধি , অনেক বছর তোকে দেখিনি।তুই এক কাজ কর,কাল সকালেই আমার বাড়িতে চলে আয়। অনির্বাণ বাবু ও থাকবেন, তিনজন মিলে বসে কথা বললে পরিস্থিতি হয়তো একটু হালকা হবে।"
পাশ থেকে অনির্বাণ বলে উঠল
"হ্যাঁ ভাই, চলে আয়। আমি তো অরিত্র বাবু কে বারবার বলছি, আপনি কুল থাকুন। টেনশন একদম করবেন না। আমি যখন এই কেসের দায়িত্ব নিয়েছি, তখন ইভান কে নির্দোষ প্রমাণ করে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা এখন আমার দায়িত্ব। কিন্তু উনি কিছুতেই শান্ত হচ্ছেন না। এখন তুই এসে ওনাকে একটু সামলা...!
তৃষা র নাম টা শোনামাত্র আমার হৃদস্পন্দন যেন দশগুণ দ্রুত হয়ে উঠল। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়েই এল,"কবে...কবে আসবে তৃষা?"
ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল,"কাল সকালে তুই চলে আয় সনাতন মাইতি র ওই ঘরে, তৃষা যাবে ওখানে।ও ওখান থেকেই তোকে নিয়ে আসবে এখানে।
দৃশ্য সাত
ঝলমলে রৌদ্রজ্জ্বল সকালের রোদেলা সতেজতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে চারদিকে। সনাতন জেঠু র বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য আমি তৈরি হচ্ছি। চারপাশে এত অঘটন ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও, হঠাৎ করেই কেন জানি না, আমার হৃদয়ের গহিন কোণায় যেন সহস্র হরিণ ছুটে চলেছে! মনের ভিতরে ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছে হাজারো প্রজাপতি!আমি একদম সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে ছুটে যেতে উদ্যত হলাম সনাতন জেঠু র ওই একচালা ঘরের অভিমুখে, যেখানে আজ আমার জন্য অপেক্ষা করবে,"তৃষা"!
ডান পায়ে এখনো যথেষ্ট ই ব্যথা রয়েছে এখনো। তবে সেসব ব্যথাট্যথা র বিশেষ পরোয়া না করে আমি তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গেলাম।ঘর থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে এগোতেই আমি দেখি,তৃষা এগিয়ে আসছে এই বাড়ির গেটের দিকে। আমি এই রায়চৌধুরী বাড়িতে ওকে দেখে যারপরনাই অবাক হলাম।রায় চৌধুরী ভিলার সামনে এগিয়ে এসে ও দারোয়ানের সাথে কথা বলছে। আমি বুঝতে পারলাম, দারোয়ান তৃষা কে ওর পরিচয় জিজ্ঞাসা করছে।ও এখানে কার সাথে দেখা করার এসেছে, এইসব জানতে চাইছে।আর করবে না ই বা কেন!দিনের আলোয় এই বাড়ির ভিতরে একটা জলজ্যান্ত মানুষ খুন হয়ে গিয়েছে। এই কারণে ইদানিং এই রায়চৌধুরী ভিলার চারপাশে অহরহ চলছে পুলিশি টহল।
আমি সাথে সাথে গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ান কে থামিয়ে ওর প্রশ্নবাণ থেকে তৃষা কে বাঁচালাম।তারপর ওকে সোজা নিয়ে এলাম আমার ঘরে।সত্যি বলতে কি, একটা মেয়ে কে এইভাবে নিজের ঘরের ভিতরে নিয়ে আসতে মনের ভিতরে একটা চাপা অস্বস্তি কাজ তো করছিল।কিন্তু এখন এই রায় চৌধুরী পরিবারের ভিতরে যা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে,তাতে কারোর সাথে শান্তি তে কথা বলতে গেলে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করা টা অত্যন্ত জরুরী।ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করেই আমি তৃষা র উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম,"আপনি সনাতন জেঠু র সাথে দেখা করেছেন?"
---"হ্যাঁ। আমি ওনার সাথে দেখা করে তারপর আপনার সাথে দেখা করতে এলাম। আপনার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে।"
---"হ্যাঁ অবশ্যই...কি জানতে চাও বলো, আমি যতটুকু জানি সব তোমাকে বলতে প্রস্তুত আমি।"
আপনি থেকে এক মূহুর্তের মধ্যেই তুমি তে নেমে এলাম নিজের অজান্তেই!তারপর সবিস্তারে ওকে বলতে শুরু করলাম এই রায়চৌধুরী ভিলার অন্দরমহলের সমস্ত বৃত্তান্ত!
যা যা ঘটে চলেছে চারপাশে, সেই সবকিছুর সাথে যে এই রায়চৌধুরী ভিলা র যে একটা গভীর সংযোগ রয়েছে,এটা যত সময় অতিবাহিত হচ্ছে,ততই যেন এই সত্য টা আমার সামনে বড়ো বেশি করে বেআব্রু হয়ে পড়ছে ।টোটোনের নিখোঁজ হওয়ার খবর টা এখন তৃষার ও কর্ণগোচর হয়েছে।ও বলে উঠল,
---"আচ্ছা, সনাতন কাকুর নাতি টোটোন কে তো এই এলাকায় কেউই চেনে না। এমনকি ও কার সন্তান,এটাও এখানকার কেউই জানে না।তাই তো?
---"হ্যাঁ তৃষা, সনাতন জেঠু আমাকে যতটুকু বলেছেন,টোটোন যখন আশমি র পেটে ছিল,ওই সময়েই আশমি এই এলাকা থেকে অনেক দূরে চলে যায়। এরপর কেটে যায় পাঁচ বছর। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর নিজের একমাত্র মেয়ে ও নাতিকে দেখবার জন্য সনাতন জেঠু র মন উচাটন হয়ে ওঠে।তাই তিনি আশমি আর নাতি টোটোন কে নিয়ে আসেন নিজের কাছে।এই এলাকার কোনো মানুষের সাথে সনাতন জেঠুর কোনো শত্রুতা নেই। সনাতন জেঠু একেবারেই সাধাসিধে মানুষ। কারোর সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। কাজেই সনাতন জেঠু র সাথে শত্রুতাবশত তার নাতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাবে কোনো দুষ্কৃতি,এটা বলতে গেলে অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। আবার অদ্ভুত ব্যাপার,টোটোন নামের ওই বছর পাঁচেকের বাচ্চা ছেলেটার নিখোঁজ হওয়ার খবর টা কথায় কথায় আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়।আর তারপর থেকেই এই রায়চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি সদস্যের চোখেমুখে আমি একপ্রকার সর্বহারার মতো হাহাকারের অভিব্যক্তি চাক্ষুষ করেছি।বলা বাহুল্য,টোটোন কে এ বাড়ির কারোর ই চেনা র বা জানার কথাই নয়। এখন,একটা শিশু হঠাৎ অপহৃত হয়েছে, এইরকম একটা খবর হঠাৎ কানে আসলে যেকোনো মানুষের মনেই মৃদু উদ্বিগ্নতা দেখা দেওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।কিন্তু টোটোনের অপহরণের খবরটা পাওয়ার পর,এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাথায় যেন রীতিমতো আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।"
---"আই সি, আমাদের সকলের চোখে একটা পট্টি বেঁধে রেখেছে কেউ,আর তার আড়ালে থেকে সে নিজের মতো করে কার্যসিদ্ধি করে চলেছে।
চারপাশে ঘটে চলা এইসব ঘটনাগুলো কে ভালোভাবে নিজের মনে বিশ্লেষণ করতে থাকলে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।
--- "এক্স্যাক্টলি!তুমি একদম ঠিক কথা বলেছ তৃষা। আমারো এমনটাই মনে হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, চারপাশে যা যা ঘটে চলেছে,এই সবকিছু যেন একসূত্রে গাঁথা। কোনো এক অদৃশ্য যাদুকর যেন আমাদের চোখে ভ্রমের কোনো এক কালো পট্টি বেঁধে নিজের কাজ করে চলেছে নিশ্চুপে...!আর তাছাড়া তুমি জানো, প্রতাপ রায়চৌধুরী যখন বেঁচে ছিলেন, তখন টোটোন কে যাস্ট একবার ই আমার কোলে এক ঝলক মতো দেখেছিলেন।আর তার পর থেকেই তিনি সমানে আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে গিয়েছেন যাতে টোটোন কে আমি একটিবার তাঁর কাছে নিয়ে আসি।"
প্রতাপ বাবু অবশ্য আমাকে বলেছিলেন,টোটোনকে দেখলে তার নিজের একমাত্র পুত্রের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। সেই হিসেবে তাঁর ওই আকূলতাটা আমি নিজে অনুভব করতে পারতাম।
আমার নিজের বেশ খারাপ ই লাগত।কারণ আমি ভদ্রলোক কে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম,টোটোন আমার দাদার ছেলে।ও ওর নিজের বাবা র সাথে ওর নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়েছে।এই কথা টা শুনে যারপরনাই আশাহত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরও তিনি কিন্তু টোটোনকে একটিবারের জন্য চোখের দেখা দেখবার জন্য রীতিমতো আমার পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন আর আমি প্রতিবার ই এটাসেটা বলে কাটিয়ে এসেছি।টোটোন যে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে,এই খবরটা হয়তো মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জানতেন না প্রতাপ রায়চৌধুরী।
প্রতাপ রায়চৌধুরী টোটোন কে দেখার পর থেকে এমন উচাটন হয়ে উঠেছিলেন,তার তবু কোনো একটা কারণ রয়েছে তাহলে। কিন্তু এই রায়চৌধুরী পরিবারের সবাই মিলে টোটোনের নিখোঁজ হওয়ার খবরটা শোনার পর থেকে এমন হায় হায় করে মরছে কেন...এইটাই হচ্ছে সবচাইতে বড়ো প্রশ্ন!
সবটা শোনার পর, তৃষা থুতনি তে আঙুল বুলাতে থাকল চুপচাপ।ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে রহস্য উদঘাটনের অভিপ্রায় মিশ্রিত এক তীক্ষ্ণ ফলার মতো দৃষ্টি। তৃষা র আসল পরিচয় টা এখন জানতে বাকি নেই আমার। অরিত্র র মুখেই শুনেছি,ওর পিসতুতো বোন তৃষা পেশায় একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। রহস্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে তার কিনারা করা ওর পেশা এবং নেশা। দিনকয়েকের জন্য মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছে মেয়েটা।আর আসার পর থেকেই একটার পর একটা অঘটনের মুখোমুখি হয়ে চলেছে তৃষা। আমি অবশ্য মনে মনে বেশ উৎফুল্লতা অনুভব করছিলাম। তৃষা র সাথে এই একান্ত সান্নিধ্যের মূহুর্ত গুলো,আর কেউ না জানুক, আমি নিজের হৃদয়ের সিংহাসনে সাজিয়ে রাখতে শুরু করেছিলাম।ইতিমধ্যেই হঠাৎ চারপাশে প্রবল চিৎকার চ্যাঁচামেচী কর্ণগোচর হল আমাদের দুজনের ই।হঠাৎ করে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এমন আকস্মিক কলহ কর্ণগোচর করার ফলপ্রসূ আমরা দুজনেই বেশ চমকে উঠলাম। রায়চৌধুরী ভিলা র অন্দরমহলের এই পারিবারিক কলহ এই কদিনে আমার পরিচিত ছবি হয়ে উঠেছে। এবার আমি বিরক্তি সহকারে বলে উঠলাম,"ধুত্তোর,প্রায়শই এদের এহেন ঝগড়ায় কানে তালা লেগে যাওয়ার যোগাড়। কোথায় ভেবেছিলাম,পাহাড়ী সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত কোনো নিরিবিলি পরিবেশে একটা থাকার ব্যবস্থা করে নিশ্চিন্তে উপন্যাস লেখার কাজ টা অনেকটা এগিয়ে নেব,তা এদের জ্বালায় তো সেসবের কোনো জো নেই!তৃষা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে তাকিয়ে বলে উঠল,
শ্ শ্ শ্... দাঁড়াও। আমি একটু শোনার চেষ্টা করে দেখি, ব্যাপারটা কি!
---তোর মতো আহাম্মক আমি জীবনেও দেখিনি।তুই যদি জানতিস,ওই পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলে টা সবকিছু জানে, তাহলে ওকে আগে থেকে কেন নিজের কব্জা য় করে নিলি না?টোটোন নামের ওই বাচ্চা ছেলে টা তো শত্রুপক্ষের
হাতের তুরুপের তাস!ওই বাচ্চাটাকে যে নিজের হাতে করতে পারলে তো তারাই রাতারাতি অঢেল ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে যেতে পারবে!"
---"আরে আমাকে তোমরা মিথ্যেই দোষারোপ করছ। তোমাদের কি ধারণা, আমি চেষ্টা করিনি!
আর তাছাড়া তোমাদের মনের ভিতরে যে কি চলছে সে কি আমি জানি না!ওই বাচ্চাটাকে হাত করে একা এই অঢেল সম্পদের একচ্ছত্র মালিক হওয়ার স্বপ্নে মশগুল তোমরা প্রত্যেকে। বেড়ালের গলায় ঘন্টা টা আমি বাঁধব,আর তোমরা সবটা যার যার মতো লুটে নিয়ে চলে যাবে,এ কি আমি জানি না! পুলিশের ভয় তোমাদের আছে,আর আমার বুঝি নেই! অপকর্মগুলো সব আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়ে তারপর মধু চেটেপুটে নিয়ে সব সাধু পুরুষ সাজবে তোমরা তাই না?ওটি হচ্ছে না।সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আমাদের ভাই এ ভাই এ ঝগড়া ঝামেলা এখনো লাগাতার চলতেই আছে।আর ইতিমধ্যে সব ভাই এ ভাই এ হঠাৎ একসাথে হয়ে ওঠার পিছনে যে শুধুমাত্র যার যার ব্যক্তিগত স্বার্থ ই কাজ করছে,এ আমার বুঝতে বাকি নেই। তোমাদের লোভের বৈঠা পার করার দায় আমার একার নয়। বাচ্চা ছেলে টা যে দিনকয়েক ধরে নিখোঁজ,কে বলতে পারে,এর পিছনে তোমাদের কারোর হাত নেই?"
---"হতচ্ছাড়া গর্দভ!তোর সাহস কি করে হয় বড় দাদাদের সাথে এইভাবে কথা বলার!বলি, বাচ্চাটাকে যদি আমরা হাতে করতে পারতাম, তাহলে কি এইভাবে ঘরে বসে বুড়ো আঙুল চুষতাম?"
---"ধুর,তোদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না,বলি... নিজেদের মধ্যে ঝগড়া অশান্তি করে এখন কি কোনো লাভ আছে? সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারার চাইতেও এখন এটা গুরুত্বপূর্ণ,এটা কি তোদের ঘটে ঢুকছে না?ওই তলোয়ার বিদেশে বিক্রি করতে পারলে যে টাকা আসবে,সেটা তো কল্পনারও অতীত!---"দাদা,ও বড্ড বেশি বাড় বেড়ে গিয়েছে দেখতে পাচ্ছ না? নিজের দাদাদের এতটা নিচু নজরে দেখার স্পর্ধা ওর আসে কোথা থেকে!
---"আমি যা যা বলেছি, একদম ঠিক বলেছি। আমার বাপ তো এই পরিবারের লোকেদের বিষে বহু বছর আগে পৃথিবী ছেড়েছেন।বলি,ওই অনির্বাণ মিত্র নামের ওই উকিল,যে কিনা এই কার্শিয়াং শহরে পা রেখেছে শুধু নিজের মা কে ন্যায় বিচার ও তার প্রাপ্য সম্মান পাইয়ে দেওয়ার জন্য,সে এখন ওই ইভান দত্তের কেস লড়ছে ঠিক ই, কিন্তু সে উঠে পড়ে লেগেছে নিজেকে এই পরিবারের একজন ওয়ারিশ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য! আমি ভালো করেই জানি,ওই ভদ্রলোক আদৌ মিথ্যা বলছেন না।আর এই অপকীর্তি টা যে জেঠাদের ই কারোর যৌবনের আগুন উথলে ওঠার নিদর্শন,এ আমার বুঝতে বাকি নেই!
---"কি বললি?যত বড় মুখ নয়,তত বড় কথা!আজ মেরেই ফেলব তোকে!"
এহেন চিৎকার চ্যাঁচামেচী ও ঝগড়া অশান্তি যখন রীতিমতো চরমে উঠে গিয়েছে, তখন আমি আর তৃষা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমরা অচিরেই অনুমান করতে পারলাম, ক্রমবর্ধমান এই গৃহযুদ্ধ একটা সময়ে চরম আকার ধারণ করবে।
এই রায়চৌধুরী পরিবারের ভিত ভাইএ ভাইএ শত্রুতার রক্তে ভেসে উঠতে খুব বেশি সময় নেই, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।কিন্তু অনির্বাণের এই কার্শিয়াং শহরে এসে পা রাখার আসল কারণটা জানার পর থেকে, আমার সমস্ত চিন্তাভাবনা যেন খেই হারিয়ে ফেলল। অনির্বাণের সাথে আমার আলাপ ও বন্ধুত্ব কলেজে পড়ার সময় থেকে।ওই সময়ে আমি দুই একবার কলেজের নোটস নিতে ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই অনির্বাণের মাথার ওপর যে ওর বাবার ছায়া নেই,এটা আমি জানতাম।আর এই কারণে, কলেজ ও পড়াশোনার পাশাপাশি ও টুকিটাকি বিভিন্ন ধরণের কাজটাজ করত ওদের ছোট মা ছেলের সংসার ও নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য।আর এই কারণেই, ওকে ওর বাড়িতে পাওয়া খুবই মুশকিলের ব্যাপার ছিল। আমি যখন ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেই সময়ে ও দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করত।সেই কাজ শেষ করে ওর ঘরে ফিরতে খানিকটা দেরি হয়েছিল। ততক্ষণ ওর ঘরে বসে আমি ওর আসবার অপেক্ষা করছিলাম। কাকিমা সেলাই মেশিনে কাজ করতে করতে আমার সাথে কথা বলছিলেন। কাকিমার কথা শুনে আমি বুঝতে পারছিলাম, উনি নিজে স্বামী, সংসার থেকে বঞ্চিত একজন নারী।অনির্বাণ কে উনি অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন। এখন অনির্বাণ ল পাশ করলেই তিনি শান্তি তে মরতে পারবেন। ছেলে ল পাশ করে নিজের অধিকার নিজে আদায় করে নিলেই তার মনে হবে, সেটাই তাঁর অপমানিত ও পরাজিত জীবনের একমাত্র জিত।
হ্যাঁ, সেইদিন আমি তার বেশভূষা তে বৈবাহিক চিহ্ন দেখতে পাইনি। আমি ভেবেছিলাম, অনির্বাণের পিতৃহীনতার কারণ, শুধু কাকিমার বৈধব্য! কিন্তু আসল ব্যাপারটা হঠাৎ এইভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়ায় আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।মুখ দিয়ে আমার কোনো কথাই সরছিল না।তৃষা আমার উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বলে উঠল,"চারপাশে যা যা ঘটে চলেছে,সেই সবকিছুর শিকড় আসলে অনেক গভীর!হঠাৎ তৃষা র মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। তৃষা ফোন রিসিভ করে, সাথে সাথে বলে উঠল,"ঋদ্ধি, আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।আর তুমি কিন্তু সাবধানে থাকবে।আর বুঝতেই তো পারছ,এই বাড়ির সব মানুষজনের মতিগতি কিরকম!এই বাড়িতে তোমাকে যিনি ভাড়াটে হিসেবে থাকতে দিয়েছিলেন তিনি তো এখন এই পৃথিবীতে নেই!তা সত্ত্বেও এঁরা তোমাকে এই বাড়িতেই থেকে যেতে বলছেন!আমার এই ব্যাপারটা কেমন যেন সন্দেহজনক ঠেকছে। আমার পরামর্শ শোনো, তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে ওঠো। আমি নিজে আমার মামার সাথে কথা বলব এই ব্যাপারে। তুমি আর এই বাড়িতে থেকো না।"
---"আরে না না,এই নিয়ে তুমি এত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পোড়ো না।এমনিতেই এখন হাজারো ঝামেলা এখন জর্জরিত হয়ে রয়েছ তুমি।এর মধ্যে আর আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না। আমি নিজেই এই বাড়িতে থাকতে চাই না আর। আমি খুব শীঘ্রই এখান থেকে উঠে যাব।"
---"হ্যাঁ। সেটাই উচিত কাজ হবে। আমি তবে এখন আসছি।পরে আবার দেখা হবে।"
আস্তে আস্তে চোখ মেলতে শুরু করেছি আমি।মাথার তীব্র যন্ত্রনা টা অনুভব করলাম প্রবলভাবে।হাত পা আস্তে আস্তে সচল হতে শুরু করার সাথে সাথেই আমার মনে ভেসে উঠল সেই ভয়াবহ মূহুর্তগুলো!বাড়ির মালিক প্রতাপ রায়চৌধুরী র আকস্মিক মৃত্যুর পর আমি যখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলাম,সেই সময়ে এই রায়চৌধুরী পরিবারের লোকেরা যে কেন আমার হাতেপায়ে ধরে আমাকে এখানে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল,তা এখনো পর্যন্ত আমার বোধগম্য হয়নি।শুধু আমি এতটুকু মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছি, ওদের কাতর অনুরোধে নরম হয়ে পড়ে এই বাড়িতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া টা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল!আর সেটা আমি বুঝতে পারলাম তখন ই,যখন নিশুতি রাতের অন্ধকারে এই রায়চৌধুরী পরিবারের অন্দরমহলের মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বী রা এক জায়গায় হয়ে আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল!
প্রতাপ রায়চৌধুরী র তিন ভাই আদিত্য রায়চৌধুরী, দেবাশীষ রায়চৌধুরী ও বিক্রম রায়চৌধুরী আমার চারপাশে জমায়েত হয়ে আমাকে ঘিরে রয়েছেন দেখে,একটা অজানা আশঙ্কায় আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছিল।হরিণের চারপাশে জমায়েত হওয়া বুভুক্ষু নেকড়ের দলের সাথে তার যে কোনো পার্থক্য নেই,এটা আমি অচিরেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। চারপাশ থেকে আমায় ঘিরে ধরার পর তাদের একজন যখন বলে উঠল,"তুই এই পরিবারের অন্দরমহলের সংস্পর্শে থেকে যে এই পরিবারের অভ্যন্তরের অনেক গুপ্ত তথ্য জেনে ফেলেছিস,এ আমাদের বোঝার বাকি নেই।এই বাড়ির অন্দরমহলে একবার যখন ঢুকে পড়েছিস তুই, তখন এখান থেকে বেরোনোর আর কোনো রাস্তা নেই তোর!আদিত্য,আর দেরি করা ঠিক নয়।এক্ষুনি পিছনের ওই পরিত্যক্ত ঘরের তালাটা খুলে তার ভিতরের অন্ধকুঠুরি র দরজা টা খুলে ফেল।এটাকে ওখানেই ফেলে রাখা হোক আপাতত। মনে রাখিস এরপর আমাদের কাজ আরো বাকি। এরপর আমাদের টার্গেট অনির্বাণ রায়।ও ব্যাটা কিন্তু ডি এন এ টেস্টের দাবি তুলে, মামলা করে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে নিজের সপক্ষে। আদালতের ওকে এই পরিবারের একজন ওয়ারিশ হিসেবে ঘোষণা করা টা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।আর এটা হলে আমাদের পারিবারিক সম্পদের একজন ভাগীদার বেড়ে যাবে এবং সেই সাথে আমাদের পরিবারের মানসম্মান ও ধূলোয় মিশে যাবে।এর ব্যবস্থা করার পর আমাদের পরবর্তী নিশানা অনির্বাণ রায়। আমাদের কাজগুলো খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।বুঝেছিস? তাড়াতাড়ি এটাকে হাত পা বেঁধে ওখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর।---হ্যাঁ দাদা।ওই বহুমূল্য তলোয়ারের খোঁজ আমরা খুব শীঘ্রই পেয়ে যাব।ওটা হাতে পাওয়ার পরেই এই বাড়ি বিক্রি করে আর ওই তলোয়ার বিদেশে বিক্রি করে টাকাপয়সা নিয়ে আমাদের সবাইকে এই দেশ থেকে পালাতে হবে। ততদিন এই ঔপন্যাসিক আর ওই উকিল অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে পচে মরুক।"
এই বলে ওরা সবাই মিলে আমার হাত পা বাঁধতে শুরু করেছিল শক্ত দড়ি দিয়ে।আমার মুখ বেঁধে দিতে শুরু করেছিল শক্ত কাপড় দিয়ে। আমার মুখ দিয়ে শুধু একটা চাপা গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই বার হচ্ছিল না তখন। আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, রায়চৌধুরী পরিবারের তিন ভাই মিলে এইভাবে অতর্কিতে আমাকে হাত পা বেঁধে বন্দী করে, একটা ভূগর্ভস্থ অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে ফেলে রাখবে নিজেদের কোনো দুরাভিসন্ধি চরিতার্থ করার জন্য!যদিও আমি এইটাই বুঝতে পারছিলাম না, ওদের কোনো পারিবারিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আমাকে বন্দী করার প্রয়োজন পড়ল কেন!এমন কি পারিবারিক গুপ্ত তথ্য আমি জেনে ফেলেছি,যার জন্য ওরা এইভাবে আমাকে নিশানা বানাল!আমার মাথার ভিতরে সবকিছু যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল ভীষণভাবে!তিনভাই মিলে এইভাবে অতর্কিতে আমার দরজায় কড়া নেড়ে হঠাৎ আমার ওপরে উন্মত্ত নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমার হাত পা বেঁধে রায়চৌধুরী ভিলা র অন্দরমহলের ভিতরে একটা অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে নিয়ে এসে ফেলে দিয়ে, বাইরের দুনিয়ার দরজা টা বন্ধ করে দেবে চিরতরে,এ আমার দুঃস্বপ্নেরও অতীত ছিল! আমি কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি এইভাবে ওদের হাতের শিকার হয়ে গেলাম!
আমার হাতের মোবাইল টাও আর নেই আমার কাছে। এখন আমার এই দুরাবস্থার কথা তো আমি একজন মানুষকেও জানাতে পর্যন্ত পারব না! যেভাবে শক্ত দড়ি দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছে এখানে,তাতে তো মনে হচ্ছে, আমার এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই!
হা ঈশ্বর!এখন এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে, পৃথিবীর সকলের অগোচরে এইভাবে অভুক্ত অবস্থায় দমবন্ধ হয়ে পৃথিবী থেকে আমাকে অকালে বিদায় নিতে হবে!
হা ঈশ্বর!এ তোমার কেমন বিধান!
শক্ত দড়ি দিয়ে আমার হাত পা বেঁধে রাখা রয়েছে, আমি সেই অবস্থাতেই ভীষণভাবে ছটফট করতে শুরু করলাম। ছটফট করতে করতে, হঠাৎ আমার পাজামার ডানপাশের পকেটটা শক্ত মেঝের সাথে ঘষটে গেল।আর তার ফলপ্রসূ,আমার পাজামার ডানপাশের পকেটের ভিতরে রাখা ওই রাজকীয় কারুকার্যখচিত চাবিটার অস্তিত্বের কথা আমার মনে পড়ে গেল।এই চাবিটা তৃষা রাখতে দিয়েছিল আমায়।বলা বাহুল্য,এই চাবিটা আমার হাতে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৃষা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।ও বলেছিল,এই চাবিটার সূত্র ধরেই একে একে বেরিয়ে আসবে এই সমস্ত রহস্যের জটের মূল কেন্দ্রবিন্দু!আর সেই সাথে সকলের সামনে নিজে থেকে ধরা দেবে আশমি, প্রতাপ রায়চৌধুরী র প্রকৃত হত্যাকারী ও টোটোনের অপহরণকারী।
এই চাবি টা অপরাধীকে সামনে আনার সূত্র হতে পারে কিভাবে!আর তাই যদি হয়, তাহলে তো এই চাবিটা তৃষা কে ফেরৎ দিতে হবে আমাকে...! কিন্তু এখন তো সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।এই রহস্যের কিনারা করার পথে হয়তো কিছুটা এগিয়েছে তৃষা, কিন্তু ওর এই পদক্ষেপটাই তো ওর সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দিল!এখন এই চাবি হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও, আমার কাছে এসে পৌঁছানো আর কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়!
এইসব সাত পাঁচ ভাবছিলাম আমি হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থেকে...!
হঠাৎ এমন সময়ে, আমি কাছাকাছি হতে মানুষের অস্তিত্ব টের পেলাম। আমার সর্বাঙ্গে একটা অজানা শিহরন খেলে গেল।ক্রমশ এই অন্ধকার কুঠুরির কাছে দ্রুতবেগে আসতে থাক
পায়ের শব্দ পেলাম।কিন্তু এই নিকষ অন্ধকারের সমুদ্রে আমি পুরোপুরি অন্ধ ও অসহায়!রায়চৌধুরী পরিবারের অন্দরমহলে এই গোপন কুঠুরির অস্তিত্ব যে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ই নির্মিত,এ আর বোঝার বাকি ছিল না আমার।আমার সর্বনাশের ঘন্টাধ্বনি বেজে গিয়েছে অনেক আগেই।তো এখন এইদিকে যার আগমন ঘটছে,সে যেই হোক,তার কাছে শুধু হিংস্র আচরণ ব্যতীত আর কিছুই আশা করা যায় না। আমি নিজের মনকে প্রস্তুত করতে শুরু করলাম নিজের আরো ভয়ঙ্কর কোনো পরিণতির জন্য...! ধীরে ধীরে চারপাশে র দৃশ্যপট পরিষ্কার হতে শুরু করল আমার চোখে। কারণ ওই অজ্ঞাত আগন্তুকের হাতে ছিল মৃদু আলোযুক্ত একখানি টর্চ।আর সেই আলোয় আমি দেখতে পেলাম,আমার সামনে এগিয়ে আসছে একজন লম্বা চওড়া একজন পুরুষ,যার মাথা ও শরীর একটা কালো হুডি তে ঢাকা।তার মুখ স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি। কিন্তু আমার যেন মনে হতে লাগল,এই চেহারা আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু কোথায় দেখেছি! আমার মাথার ভিতরে কেমন যেন তোলপাড় হতে শুরু করল। হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, প্রতাপ রায়চৌধুরী র খুনিকে তাড়া করার সময়টা!প্রতাপ রায়চৌধুরী র হত্যাকারী কে আমি পিছন থেকে দেখেছিলাম,আর এই আগন্তুক কে আমি এখন সামনে থেকে দেখছি।এই চেহারা,এই চলার ভঙ্গি যেন আগে একবার নয়, আমি দেখেছি বহুবার! কিন্তু কোথায় দেখেছি! আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। আমার মাথার ভিতর টা ভীষণভাবে অস্হির অস্হির করতে শুরু করল।ওই আগন্তুক এক পা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে এসে, আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। টর্চের মৃদু আলোতে আমি এবার দেখতে পেলাম ওই আগন্তুকের মুখ।আর ওই মুখ দেখার সাথে সাথেই আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলাম।এ আমি কাকে দেখছি! খুনে দৃষ্টি নিয়ে আমার সামনে বসে রয়েছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, সনাতন জেঠু!
সনাতন জেঠু র চিরপরিচিত চেনা চেহারা টা এখন আর নেই। দাঁড়ি গোঁফ সব কামানো এই চেহারা দেখেও তাকে চিনতে অসুবিধা হল না আমার।
আমি পুরোপুরি আকাশ থেকে পড়লাম!
আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই, সনাতন জেঠু এইবার যে কান্ড টা করলেন,তাতে আমার নিজের চোখকেই সন্দেহ হতে শুরু করল প্রবলভাবে!
সনাতন জেঠু তার পকেট থেকে বার করে ফেললেন একটা বড়সড় ধারালো ছুরি! তারপর ওই ছুরি টা আমার গলার কাছে ধরলেন সজোরে! তারপর বলে উঠলেন,"তৃষা যে চাবি টা রাখতে দিয়েছে তোকে,ওটা কোথায় রেখেছিস তুই? এক্ষুনি বল! নাহলে এক্ষুনি এক কোপে তোর ধড় থেকে মুন্ডুটা আমি আলাদা করে দেব!"
আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। তৃষা যে আমাকে একটা চাবি রাখতে দিয়েছে,এটা সনাতন জেঠু কি করে জানল!
এই মানুষটাকে দেখে আমার নিজের পিতৃতুল্য মনে হয়েছিল।এই কারণে একজন সামান্য ক্যাব চালকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সম্মান ও ভালোবাসা জন্মেছিল। কিন্তু এখন এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে সনাতন জেঠু র নিরীহ, গোবেচারা ভালো মানুষের খোলস ছেড়ে একজন মূর্তিমান শয়তানের চেহারা বেরিয়ে পড়েছে নগ্নভাবে!এই চেহারা চাক্ষুষ করে আমার মনের ভিতরে ঢুকে উথলে উঠল একদলা ঘৃণা!চেনা মানুষটার চেহারার আড়ালে এমন অচেনা ভয়াবহতা আমার সারা শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলল। আমি ঠান্ডা স্বরে বলে উঠলাম,"আপনি কোন চাবি র কথা বলছেন? আমি কোনো চাবি র কথা জানি না!"
প্রচন্ড এক আক্রোশে ফেটে পড়ল ওই মুখোশধারী শয়তান টা!
তারপর ক্রোধান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,"চোপ হারামজাদা, তুই আর ওই তৃষা,এই দুজনে মিলে প্ল্যান করে আমাকে ফাঁসানোর তালে ছিলি তাই না? আমার দরজায় তোদের দুজনের এইভাবে ঘন ঘন পা রাখার পিছনের আসল মতলব টা আমি ধরতে পারিনি ভেবেছিস!টোটোন যে জাতিস্মর,এটা বুঝতে পারার সাথে সাথেই আমি আমার সেই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম যে মেয়ে নিজের প্রেমিকের সাথে মিলে নিজের বাবার আসল পরিচয় ফাঁস করে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল।ওই মেয়েকে তো আমি বহুদিন আগেই শেষ করে দিতাম। শুধু টোটোন কে হাতে পাওয়ার জন্য ওকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে এতদিন দেরি করলাম!ওর প্রেমিক টাকে তো অনেক দিন আগেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছি...।এরপর টোটোনকে নিজের হেফাজতে নিয়ে এসে আশমি কে নিজের হাতে খুন করলাম।টোটোনের পেট থেকে কথা বের করে অবশেষে হাতে পেয়েছি ওই চাবি...!এবার সনাতন মাইতি নামের ওই নরপিশাচ টাকে দেখে, রাগে ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে উঠল। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম,"তৃষা একটা বিশ্বাস নিয়ে ওই চাবি আমার কাছে রাখতে দিয়েছে।ওই চাবি আমি কাউকে দেব না।তোর মতো নরপিশাচের হাতে তো নয়ই!তোর যা করার,তুই করে নে!"
সনাতন মাইতি এবার হিংস্র নেকড়ের চেয়েও ভয়াবহ আস্ফালনের সাথে আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে,ওর হাতে ধরে থাকা ছুরি র শাণিত ফলা টা আমার গলার চামড়া ঘেঁষে ধরে নীচু অথচ ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,"নিজের ভালো চাস তো এখন ই বল চাবিটা কোথায় রেখেছিস তুই!এক মূহুর্তের ব্যবধানে তোর ধড় থেকে মুন্ডুটা আলাদা হয়ে যেতে পারে!"
হঠাৎ এই সময়ে,এই কুঠুরির ভিতরে অনেকগুলো পায়ের সম্মিলিত শব্দ শোনা গেল। আমি বুঝতে পারলাম, যারা আমাকে এখানে ধরে রেখেছে, সেই রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা এক্ষুনি জমায়েত হতে চলেছে এই কুঠুরির ভিতরে!সনাতন মাইতি এবার ভীষণভাবে গর্জে উঠল। প্রচন্ড ক্রোধে রীতিমতো গর্জন করতে করতে বলে উঠল"এইবার এই রায়চৌধুরী ভিলায় রক্তগঙ্গা বইবে।"
আমি দেখলাম, আমার অনুমান ভুল নয়। আদিত্য রায়চৌধুরী, দেবাশীষ রায় চৌধুরী ও বিক্রম চৌধুরী তিনজন একসাথে এসে হাজির হল এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে। প্রতাপ রায়চৌধুরী র পরে যে আদিত্য রায়চৌধুরী ই এই পরিবারের বড়ো ছেলে, এটা জানতাম আমি। কিন্তু এই আদিত্য রায় চৌধুরী যখন এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে পা রাখার সাথে সাথেই এই সনাতন মাইতি কে চাক্ষুষ করে চেঁচিয়ে উঠলেন,"বড়দা তুমি? তুমি বেঁচে আছ?"
তখন আমি যেন পুরোপুরি অথৈ জলে পড়ে গেলাম!
এ আমি কি শুনছি!এই সনাতন মাইতি আসলে এই রায়চৌধুরী পরিবারের বড়ো ছেলে!হঠাৎ এই কুঠুরির ভিতরে সম্পূর্ণ অন্যপ্রান্ত হতে, ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল।এই কুঠুরির ভিতরে জমায়েত হওয়া মানুষগুলো যারপরনাই অবাক হয়ে গেল! দেবাশীষ বাবু সচকিত হয়ে বলে উঠলেন,আমরা তিন ভাই ছাড়া কে এই গোপন কুঠুরির ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে?
বিক্রম চৌধুরী ততোধিক বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,"আর এর চাইতেও বড়ো প্রশ্ন হল,এই কুঠুরির দরজার চাবি দরজার ওপ্রান্ত হতে যে খুলছে,সে এই গুপ্ত কুঠুরির কথা জানল কি করে?"
বিক্রম বাবুর কথা শেষ হতে না হতেই,প্রায় ওই দরজা ফুঁড়ে সদলবলে ভিতরে ঢুকে পড়ল ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ বাহিনী!আর তাদের সাথে যে ঢুকল, তাকে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। হলুদ শার্ট আর নীল জিন্স পরিহিতা তৃষা র দুচোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে এক অনির্বচনীয় ক্রোধ!তৃষা ভিতরে ঢুকেই চিৎকার করে বলে উঠল,ক্যালডেং শেরিং ওরফে সনাতন মাইতি, আপনি পুলিশের হাতে সারেন্ডার করুন! সহজ সাধাসিধে ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে আপনার আসল পরিচয় টা আমি যে ইতিমধ্যেই বার করে নিয়েছি,এটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন!"
সনাতন মাইতি সামান্য তুতলিয়ে বলে উঠল,"ক্কি...কি ভুলভাল কথা বলছ তুমি মা?কি আমার আসল পরিচয়?"
তৃষা মৃদু হেসে বলে উঠল..."ভুয়ো পরিচয় কি আপনার একটা!আপনি তো আসলেই একজন বহুরূপী!এই কার্শিয়াং শহরের বুকে নকল দাঁড়ি গোঁফ লাগিয়ে এত বছর ধরে সাধারণ, হতদরিদ্র ক্যাব চালকের ছদ্মবেশে পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে এসেছেন আপনি। স্মাগলার ক্যালডেং শেরিং যে ছদ্মবেশে এই কার্শিয়াং শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছদ্মবেশে এ সন্দেহ পুলিশের আগেই হয়েছিল। এই চোগিয়াল রাজা র নির্মিত এই প্রাসাদ তুল্য বাড়ির ভিতরের গুপ্ত চোরা সুড়ঙ্গের ভিতরের দুর্গম ও গুপ্তপথ কে নিজের কাজে ব্যবহার করেই হেরোইন পাচার করে টাকার পাহাড় করে তুলেছিলেন যাতে একটা সময়ের পর এই বহুমূল্য প্রাসাদ তুল্য সুবিশাল বাড়িটা নগদ টাকায় কিনে নিয়ে ভাইদের পথে বসিয়ে প্রতিশোধ নিতে পারেন!আজ থেকে প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে এই রায়চৌধুরী পরিবার থেকে আপনাকে বিতাড়িত ও ত্যাজ্য করা হয়েছিল আপনার স্বৈরাচার, ব্যাভিচার ও কুকর্মের জন্য!এই পরিবারের বড়ো ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, সম্পত্তির কণা মাত্র না পেয়ে, নিজের প্রতিশোধ চরিতার্থ করার জন্য পাঁচ বছর আগে আপনি ফিরে এসেছেন এই কার্শিয়াং শহরে,মোটা অঙ্কের টাকা করে সে টাকা দিয়ে এই রায়চৌধুরী ভিলা কিনে নেওয়ার উদ্দেশ্যে!কি! আমি ঠিক বলছি তো দেবরাজ রায়চৌধুরী?"
পুলিশ এই সনাতন মাইতি ওরফে দেবরাজ রায়চৌধুরী র হাতে হাতকড়া পরাতে পরাতে বলে উঠল,"এই ক্যালডেং শেরিং কে খুঁজতে গিয়ে আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্টের জান কয়লা হয়ে গিয়েছিল...! অথচ এ ব্যাটা, ভালো মানুষের ছদ্মবেশে আমাদের ই সামনে ঘোরাঘুরি করছিল এতদিন ধরে!ওর একমাত্র মেয়ে আশমি, দিনকয়েক আগে থানায় এসে বলেছিল,ও পারবে স্মাগলার ক্যালডেং শেরিং কে হাতেনাতে ধরিয়ে দিতে...!
এর দিনকয়েক পরেই মেয়েটা খুন হয় প্রণবেশ দত্ত র ছোটছেলে ইভান দত্ত র বাংলোয়। আমাদের প্রাথমিক সন্দেহ গিয়ে পড়ে ইভানের ওপরেই। আমাদের ধারণা হয়েছিল, প্রথমে টোটোন কে অপহরণ করে তারপর তার খোঁজ দেওয়ার নাম করে ও আশমি কে নিয়ে যায় ওর বাংলোয়। আমাদের ধারণা হয়েছিল, ইভান এই ক্যালডেং শেরিং এর দলের লোক! কিন্তু না! গন্ডগোল টা যে আরো কতটা গভীরে...এটা আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্ট টের পায়নি একেবারেই! অনির্বাণ রায় ওরফে অনির্বাণ রায়চৌধুরী আদালতে ওকালতি করে ইভান কে নির্দোষ প্রমাণিত করেছেন তো বটেই, সেই সাথে তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের পিতৃ পরিচয়! অনির্বাণ রায়চৌধুরীর জন্মদাতা পিতা আর কেউ নয়,সে হল এই ক্যালডেং শেরিং ওরফে দেবরাজ রায়চৌধুরী!আমরা যাস্ট একটাই জিনিস ভাবছি, একজন স্মাগলারের রক্ত যে ঠান্ডা ও নৃশংসতায় ভরা হবে এ তো স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু একজন মানুষ নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের নাতিকে অপহরণ করিয়ে তারপর নিজের
আসল পরিচয় ফাঁস করার থেকে আটকাতে নিজের একমাত্র মেয়েকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে কি করে!"
যাক গে, পুলিশের ঘা পড়লেই টোটোনের খোঁজ পেতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগবে না।"
তৃষা বলে উঠল,"হ্যাঁ, আফশোষের বিষয়,টোটোন আসলে একজন জাতিস্মর! যখন থেকে ওর মুখে বোল ফুটতে শুরু করেছিল, তখন ই এটা বোঝা যেতে শুরু করেছিল যে টোটোন আসলে এই রায়চৌধুরী বংশের একজন পূর্বপুরুষ,যার নবজন্ম হয়েছে!"
আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম," হ্যাঁ,ও আমার কাছে ছিল অল্প সময়ের জন্য। যতক্ষণ ও ছিল আমার কাছে, ততক্ষণ ও অনর্গল বকবক করে যাচ্ছিল।এই রায়চৌধুরী ভিলার ভিতরে নাকি একখানি গুপ্ত কুঠুরি আছে আর তার পিছনের দরজা থেকে চলে গেছে শাখাপ্রশাখা যুক্ত
সুড়ঙ্গ পথ যা শেষ হয়েছে পাহাড়ী নির্জনতায় আচ্ছাদিত কোনো দুর্গম জায়গায়! আমি তো ওর কথাগুলো শুনে কোনো আমল ই দিইনি। আমি ভেবেছিলাম ও নিশ্চয়ই কোনো থ্রিলার মুভি দেখেছে আর সেখান থেকে ওর মনে উড়ান দিয়েছে অদ্ভুত অলীক কল্পনা! কিন্তু ও যা যা বলেছিল, সেগুলো যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, সেটা আমি এখন বুঝতে পারছি!"
তৃষা বলে উঠল,"হ্যাঁ।এই কারণেই ওর নিখোঁজ হওয়ার খবর শোনামাত্র এই রায় চৌধুরী পরিবারের ভিতরে নেমে এসেছিল হাহাকার। কারণ চোগিয়াল রাজা যে বহুমূল্য তলোয়ার তার বিশ্বস্ত কর্মচারী কে সংরক্ষণ করে রাখতে দিয়েছিলেন,তার পরবর্তী তে তিনি তাকেই প্রদান করেন খুশি হয়ে।আর সেই তলোয়ার কোথায় রাখা রয়েছে এখন,সেটা জানে টোটোন! এইবার বুঝতে পারছেন কেন ওকে অপহরণ করা হয়েছিল?"
---"হ্যাঁ। এখন আমি সব বুঝতে পারছি। প্রতাপ রায়চৌধুরী ও তো টোটোন কে একবার হাতে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আমার পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন।তার আসল কারণটা এতক্ষণে পরিষ্কার হল। কিন্তু প্রতাপ রায়চৌধুরী কে খুন হতে হল কেন?"তৃষা বলে উঠল,"ওই প্রতাপ রায়চৌধুরী নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তার আপন দাদা দেবরাজ রায়চৌধুরী র সাথে গোপনে হাত মিলিয়েছিলেন পরবর্তীকালে।এই রায়চৌধুরী পরিবারের মধ্যে একমাত্র তিনিই জেনেছিলেন স্মাগলার ক্যালডেং শেরিং ওরফে নিজের দাদার আসল পরিচয়।আর এই প্রতাপ রায়চৌধুরী কে হাতে করেই এই রায়চৌধুরী ভিলা র ঘরের ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে এই দেবরাজ রায়চৌধুরী অনায়াসে শুরু করেছিল হেরোইন পাচারের ব্যবসা!
এই রায়চৌধুরী ভিলার ভিতরে সুড়ঙ্গ পথ তো আসলে তৈরী করিয়েছিলেন তিনশো বছর আগে চোগিয়াল রাজা, শত্রুপক্ষ কে লুকিয়ে অস্ত্র সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য! কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে,তিনশো বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ওই সুড়ঙ্গ পথ হেরোইন পাচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ।দেবরাজ রায়চৌধুরী যখন এই পরিবারের ভিতরে ছিলেন, তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত প্রপিতামহের নানাবিধ প্রলাপের মাঝে এই গুপ্ত কুঠুরি ও সুড়ঙ্গের কথা জানতে পারেন। রায়চৌধুরী পরিবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন এই কার্শিয়াং শহরে ও গোপনে এই পরিবারের মেজো ছেলে প্রতাপ রায়চৌধুরী কে নিজের হাতে করে নেন। প্রথমটায় প্রতাপ রায়চৌধুরী টাকায় লালে লাল হয়ে গেলেও, পরবর্তীতে তিনি টোটোকে স্বচক্ষে দেখে ফেলেন ও তারপর ওকে নিজের হাতে করে,ওই তলোয়ারের খোঁজ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।এই কারণেই দেবরাজ রায়চৌধুরী নিজের ভাই কে সরিয়ে দিলেন পৃথিবী থেকে...!কি ঠিক বলছি তো ক্যালডেং শেরিং ওরফে দেবরাজ রায়চৌধুরী?"
ছদ্মবেশী দেবরাজ রায়চৌধুরী এবার ভীষণভাবে ফুঁসে উঠলেন। ভয়ঙ্কর ক্রোধের সাথে তিনি বলে উঠলেন,"কি...কি প্রমাণ আছে,যে আমিই এই খুন গুলো করেছি?"
তৃষা একটা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলল,"প্রমাণ সেই চাবিটা,যেটা আমি আপনার ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে ঋদ্ধিমান বাবু র হাতে তুলে দিয়েছি, আমাদের বড়শির ফাঁদে আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলার জন্য!আশমি খুন হওয়ার পর ওই মার্ডার স্পটে গিয়ে,কন্যাহারা শোকাতুর বাবার যে নাটকটা আপনি করছিলেন,ওই নাটক দিয়ে সবাইকে ধোঁকা দিতে পেরেছিলেন আপনি, কিন্তু আমাকে পারেননি! আপনার ওই অতিরঞ্জিত নাটক টা আমার চোখ ঠিক ধরতে পেরেছিল! আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয় তখন ই।আমি আপনার প্রতি সহমর্মিতার অজুহাতে আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনার ছোটখাটো সেবা শুশ্রূষা করতে শুরু করি সত্য উদঘাটনের জন্য। ঠিক ওই সময়ে সেখানে ঋদ্ধিমান বাবু র সাথে আলাপ হয় আমার। ওনার কাছেই আমি জানতে পারি,টোটোনের সম্বন্ধে।ওর কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঋদ্ধিমান বাবুর মুখ দিয়ে বারে বারে বেরিয়ে আসছিল টোটোনের মুখ দিয়ে অনর্গল নির্গত হতে থাকা ওর অর্থহীন প্রলাপ গুলো। ওগুলো শুনে আমি বুঝতে পারলাম অনেক কিছু। ওর বলা কথাগুলো ঋদ্ধিমান বাবুর কাছে অর্থহীন প্রলাপ হলেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম,সেটা ছিল এই রায়চৌধুরী ভিলার এই অন্ধকার কুঠুরির সংযুক্ত সুড়ঙ্গ পথের বর্ণনা ও দিকনির্দেশনা! আমি এখানকার পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে,ওই দিকনির্দেশনা অনুসারে মাটি খোঁড়ার ব্যবস্থা করি, এবং তার ফলপ্রসূ উন্মোচিত হয়ে পড়ে শাখাপ্রশাখা যুক্ত সুড়ঙ্গ পথ,যা এই রায়চৌধুরী ভিলা র এই অন্ধকার কুঠুরির সাথে যুক্ত! আমাদের হাতে ধরা পড়ে হেরোইন পাচারের সুবিশাল চক্র! কিন্তু এই চক্রের পান্ডা যে আপনি নিজেই এটা আমি আন্দাজ করতে শুরু করি আপনার গতিবিধির ওপর নজর রেখে। আপনার ঘরে আমি গোপনে ভিডিও রেকর্ডার ফিট করে রাখি।আর সেটার থেকেই আমি জানতে পারি,
আপনার একজন কর্মচারী টোটোনের পেট থেকে কথা বার করে ইতিমধ্যেই আপনাকে এই শাখাপ্রশাখা যুক্ত এই সুড়ঙ্গের কোন কক্ষের ভিতরে ওই রাজকীয় তলোয়ার সংরক্ষিত রয়েছে,তার হদিস জানাচ্ছে! পরদিন সকালে আপনার ঘরে দুধ দিতে আসার অছিলায় সে আপনার হাতে তুলে দেয় সেই চাবি!ওই চাবি র অপেক্ষাতেই তো আপনি সহ এই রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা প্রহর গুনে চলেছেন তাই না? আমি আপনার ঘরে গিয়ে ওই চাবি চুরি করি এবং তা ঋদ্ধিমান বাবুর হাতে তুলে দিই। আপনার ঘরে আর কেউ ঢোকে না। কাজেই চাবি গায়ের হয়ে যাওয়ায় আপনি যে আমাকেই সন্দেহ করবেন,এটাই ছিল স্বাভাবিক! আমি আপনার ঘরে থাকতে,আপনাকে শুনিয়ে শুনিয়েই ঋদ্ধিমান বাবুকে ফোন করে বলছিলাম, আমি তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য রওনা দেব এক্ষুনি!আমি যে চাবি ওনার কাছেই রাখব,এটা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন আপনি।আর আমি এইটাই চেয়েছিলাম।ওই চাবি খুঁজতে গিয়েই যে আপনি এইভাবে নিজের কবর নিজেই খুঁড়তে চলেছেন এটা আমি জানতাম এবং আমি এইটাই চেয়েছিলাম!
ওদিকে এই রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরাও যে ঋদ্ধিমান বাবুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন এটাও আমি বুঝেছিলাম। তবে এই রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা মুখে রণচন্ডী হলেও কাজের দিক থেকে আদৌ নৃশংস নয়। কাজেই ওরা মানুষ খুন করতে পারবে না এটা আমি জানতাম।আর এই ব্যাপারটা আপনিও জানতেন দেবরাজ বাবু।
ওঁরা যে ঋদ্ধিমান বাবুকে এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে বন্দি করে রাখবে এটা জেনেই আপনি ওই সুড়ঙ্গ পথে এখানে এসে পৌঁছেছেন।আর আমি ও এই পুলিশের বাহিনীর সাথে ওই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হতে সুড়ঙ্গ পথ ধরে এখানে এসে পৌঁছেছি। এবার আর আপনার পালানোর কোনো রাস্তা নেই। এবার ঝটপট বলুন,টোটোন কে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন! অবশ্য এখানে যদি না বলতে চান,তো থানায় আপনার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করাই রয়েছে!
ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমি ফেরার ট্রেন ধরার জন্য রেডি হচ্ছি, ঠিক এমন সময়ে দরজায় টোকা পড়ল। আমি দরজা খুলে দেখি, তৃষা দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরে। আমি ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ পরে ওকে যেন অনাগত বসন্তের ফুলের মতো লাগছে। আমি মৃদু স্বরে বললাম,"এসো।"
তৃষা ভিতরে আসল।টোটোন ও একদম তৈরি হয়ে বসে রয়েছে আমার সাথে যাওয়ার জন্য। হ্যাঁ। আমার দাদা বৌদি দু মাস আগেই তাদের সন্তান হারিয়েছেন। বৌদি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন।দাদা মনস্থির করেছেন, একটা শিশু দত্তক নেবেন। আমি দাদার সাথে কথা বলে, ওকে আমার সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। এখন থেকে টোটোন যে আমার সাথে আমার বাড়িতেই থাকবে,এটা ভেবে আমার আনন্দের সীমা নেই।
তৃষা বলে উঠল,"তোমাকে বলির পাঁঠা করেই হেরোইন পাচারের পুরো গ্যাং টাকে তাদের পান্ডা সহ ধরলাম।এর জন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী!"
আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম,"এ মা ছি ছি, এভাবে বলবে না,এই পুরো মিশন টাতে আমি যে কোনো কাজে লাগতে পেরেছি,এই আমার কাছে অনেক। কিন্তু তুমি যে বলেছিলে, সামনের মাসে আমার বাড়িতে এসে আমার পরিবারের সাথে, আমার মায়ের সাথে দেখা করবে... করবে তো?
তৃষা র চোখেমুখে যেন হঠাৎ পড়ল লজ্জায় রাঙা একফালি সোনালী রোদ!ও সলজ্জ মুখে মৃদু হাসি র সাথে বলল,"আসব, কথা দিলাম।"
ঠিক এমন সময়ে,এই ঘরে প্রবেশ করলেন দেবাশীষ বাবু। তিনি বলে উঠলেন,"ঋদ্ধিমান বাবু, আপনি আপনার লাগেজ গুলো আমার হাতে দিন। আমি ওগুলো গাড়িতে রেখে আসছি।"
আমি বলে উঠলাম,"আরে না না,ওই কটা লাগেজ আমি বইতে পারব। সমস্যা নেই।"
আদিত্য বাবু বলে উঠলেন,"আপনি বোধহয় এখনো ক্ষমা করতে পারেননি আমাদের!"
আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম,"আরে তা নয়, ওইসব আমি আমার মন থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলেছি।"
একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদিত্য বাবু বলে উঠলেন,"আসলে কি জানেন,এই প্রাসাদ তুল্য বাড়ি নয়,ওই তলোয়ার টাই আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে হিংসা র প্রধান কারণ ছিল।ভালোই হয়েছে,চোগিয়াল রাজা র ওই তলোয়ার উদ্ধার করে পুলিশ তা সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন ওই তলোয়ারের স্হান হবে কোনো যাদুঘরে! লক্ষ লক্ষ মানুষ ওই তলোয়ার দেখবে যাদুঘরে।ওই কুঠুরির দরজা আমরা খুব শীঘ্রই বন্ধ করে দেব মনস্থির করেছি,আর সেই সঙ্গে আমাদের এই পারিবারিক হিংসা ও রেষারেষি ও চিরতরে বিলীন হয়ে গেল চিরতরে...!"
তৃষা হেসে বলে উঠল,"যা হয় ভালোর জন্যই হয়। এবার থেকে আপনারা ভাই এ ভাই এ মিলেমিশে শান্তিতে থাকবেন,এই কামনাই করি।"
বিক্রম বাবু বলে উঠলেন,"টোটোন আপনাকে বড় ভালোবেসে ফেলেছে এই কদিনে।ও এই রায়চৌধুরী পরিবারের সন্তান হলেও আমরা জানি, আপনার সাথে ও খুব ভালো থাকবে।ঋদ্ধিমান বাবু, এবার আপনার আর কোনো ভয় নেই এই বাড়িতে। আপনার যখন খুশি এই বাড়িতে আসবেন, উপন্যাস লিখবেন প্রাণ ভরে। টোটোনকেও নিয়ে আসবেন সাথে।আপনার জন্য এই রায় চৌধুরী ভিলার দরজা চিরকাল খোলা থাকবে।"
আমি বিক্রম বাবু র হাত ধরে বলে উঠলাম,"অবশ্যই আসব। কিন্তু এবার গাড়িতে না উঠলে ট্রেনের লেট হয়ে যাবে।"
টোটোনের হাত টা শক্ত করে ধরে বলে উঠলাম,"এখন তবে আসি?"
বিক্রম বাবু হাতজোড় করে বললেন,"বিদায়।"
গাড়ি তে উঠে পড়লাম আমি আর টোটোন। তৃষা র ওই মুখখানি নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।বুকের বামপাশ টায় একটা বেধনা অনুভব করলাম। সাথে সাথেই বেজে উঠল আমার মোবাইল ফোন টা। হোয়াটসঅ্যাপ এ একটা ম্যাসেজ ঢুকেছে। হোয়াটসঅ্যাপ অন করতেই ভেসে উঠল তৃষা র ম্যাসেজ।
"আর তো মাত্র এক মাসের প্রতীক্ষা...!তুমি তোমার নিঃশ্বাসের সাথে এই কদিনের স্মৃতি চারণ করতে করতেই দেখবে, তোমার ঘরের দরজায় আমি দাঁড়িয়ে...!"
সমাপ্ত
Roshmita das
