মরীচিকার মায়াজাল
মরীচিকার মায়াজাল
মরীচিকার মায়াজাল
ভাদ্রের সন্ধ্যা। কলকাতার আকাশটা বিকেল থেকেই মুখ ভার করে ছিল। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ টিপটিপ করে যে বৃষ্টি নামল, আটটার মধ্যে সেটা রীতিমতো ঝমঝমে বৃষ্টির রূপ ধারণ করে, হ্যারিসন রোডের রাস্তাঘাট একেবারে বন্যায় স্রোতের মতোই ভিজিয়ে দিতে শুরু করল।
ব্যোমকেশ জানলার ধারে বসে চুরুট ধরিয়েছিল। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে পাড়ার ট্রামের ঘণ্টা মিশে মন উদাস করে তোলা একটা অদ্ভুত সুর তুলছিল। আমি ডায়েরি খুলে আমার নতুন উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেছিলাম। তবে ইদানিং আমার কি যেন একটা হয়েছে, নতুন উপন্যাস লেখার জন্য একটা প্লট যাও বা মাথায় এসেছে, কিন্তু সেটাকে আর সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে লিখে উঠতে গিয়ে আর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।মাঝে মাঝেই কলম থামিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলাম।মনটা আমার থেকে থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল কোনো উদাস পুরের গহিন দুনিয়ায়...!
হঠাৎ সশব্দে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। একবার না, তিনবার। শব্দ টা এমন জোরে হল, যেন যে বাজাচ্ছে তার হাত রীতিমতো কাঁপছে!
আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
দরজা খুলতেই দেখলাম ,ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়া এক ভদ্রলোক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
আমি পরিচয় জিজ্ঞাসা করতেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন,"“আমি অমরেশ লাহিড়ী। কালীঘাটের লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজের...” গলা যেন তাঁর ধরে এল। কিছুক্ষণ থেমে, তারপর নিজের কথা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি আবার বলে উঠলেন, এখানে ব্যোমকেশ বক্সী থাকেন তো?"
আমি বলে উঠলাম," বিলক্ষণ! আপনি বুঝি ব্যোমকেশের সাথে দেখা করতে এসেছেন?"
ভদ্রলোক বলে উঠলেন,"হ্যাঁ, ওনার সাথে আমার বড়ো জরুরী দরকার আছে। ওনার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে?"
আমি বলে উঠলাম,"হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি পড়ছে। আপনি ভিতরে আসুন।"
আমি তাকে ঘরের ভিতরে আসার জন্য অনুরোধ করলাম। একরাশ সংকোচ নিয়ে ভদ্রলোক ঘরের ভিতরে ঢুকলেন। আমি ভদ্রলোকের চেহারা ভালোভাবে জরিপ করে নিলাম। আমার মনে হল,ভদ্রলোকের বয়স মোটামুটি ষাটের ওপর হবে। তাঁর পরনে রয়েছে দামি পাঞ্জাবি, যেটা এখন ভিজে একেবারে সপসপে হয়ে গিয়েছে।কপালে তাঁর বিন্দু বিন্দু জল। চোখ দুটো লাল। ভদ্রলোক ঘরে পা দেওয়ার সাথে সাথেই ব্যোমকেশ এই বসার ঘরের ভিতরে ঢুকে এল। এই ঘরে পা রাখার সাথে সাথে ও বলে উঠল,"কে এসেছে অজিত?"
ভদ্রলোক এবার ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বললেন,"নমস্কার,আমি অমরেশ লাহিড়ী। আপনিই ব্যোমকেশবাবু তো?”
ব্যোমকেশ বলে উঠল, "হ্যাঁ,আমিই সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন?বসুন।"
ব্যোমকেশ এগিয়ে গিয়ে ভদ্রলোককে বসাল। আমি তাড়াতাড়ি ভিতরে গিয়ে একটা তোয়ালে নিয়ে এলাম।
ব্যোমকেশ হাঁক দিয়ে পুঁটিরামের উদ্দেশ্য বলে উঠল,"পুঁটিরাম,তিন কাপ দুধ চা বানাও দেখি,আর সাথে একটু গরম বেগুনী ভেজে আনো।"
ভদ্রলোক বলে উঠলেন,"আরে ব্যোমকেশ বাবু, করছেন কি? আমার জন্য এখন এত বন্দোবস্ত করার দরকার নেই। আমি বড়ো বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।"
ব্যোমকেশ ভ্রূ কুঁচকে বলে উঠল,"বিপদ? কিরকম বিপদ?"
ইতিমধ্যে পুঁটিরাম ঘরের ভিতরে তিন কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা নিয়ে হাজির হল। একগাল হেসে পুঁটিরাম বলে উঠল,"বাবু, আমি বুঝতে পেরেছি এখন ঘরে অতিথি এয়েচেন।তাই আমি আগে থাকতেই চা বসিয়ে দিয়েছি।"
আমি বলে উঠলাম,"এইটা একটা কাজের কাজ করেছ পুঁটিরাম।"
আমি ওঁর হাত থেকে চায়ের ট্রে টা নিয়ে টেবিলে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
পুঁটিরাম সাথে সাথে আগত অতিথির উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"বাবু, আপনি আমার হাতে তৈরি বেগুনী খেয়ে দেখুন,আজ পর্যন্ত যারা এই পুঁটিরামের হাতে তৈরি বেগুনী খেয়েছে,তারা সবাই আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।এই ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যায় আমার হাতের গরম গরম বেগুনী আপনার ভালো লাগবেই। আমি যাই,বেগুনী তৈরি করার তোড়জোড় করি গে...!"
অমরেশ বাবু বোধহয় হাত নেড়ে পুঁটিরাম কে থামাতে গেলেন, কিন্তু পুঁটিরাম ধাঁ করে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুট দিল।
ব্যোমকেশ এবার গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলেন,"অমরেশ বাবু, আপনি বলুন, আপনার কি সমস্যা!"
অমরেশবাবু চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “আমার নাতনি... তন্বী। আজ কলেজ থেকে আর বাড়ি ফেরেনি।”
ঘরের ভেতর থেকে শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রকৃতি যেন প্রবল কোনো তান্ডবলীলা র জন্য কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ।
অমরেশ বাবু একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন,
“এই সন্ধে ছটা নাগাদ একটা চিঠি এসেছে আমার নামে,” এই বলে তিনি কোটের পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে টেবিলে রাখলেন। আমি দেখলাম, চিঠিটার কোনো খাম নেই, শুধু মোটা একখানি কাগজ। অমরেশ বাবু উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলেন,"সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন!অপহরণকারী কোনো টাকা চায়নি। এক টাকাও না।”
ব্যোমকেশ কাগজটা তুলে নিল। তাতে নীল কালিতে বাঁকা হাতে লেখা:
"কালচক্রটা চাই। নইলে তন্বীকে আর পাবেন না। তিন দিন সময়। পরের নির্দেশ পরে যাবে। পুলিশের কাছে যদি যান, তাহলে নাতনির লাশ পাবেন।’_
“কালচক্র?” আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।
অমরেশবাবু ঢোক গিললেন। তারপর বলে উঠলেন,“আমি সবটা আপনাদের খোলাখুলি ই বলছি।
আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে একটা প্রাচীন তিব্বতি পুথি আছে। পুঁথি টার নাম কালচক্র। যতদূর জানি,ওটা নাকি প্রায় বারোশো বছরের পুরনো একটা পুঁথি। পণ্ডিতরা বলে, ওর মধ্যে নাকি এমন কিছু লেখা আছে যা ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। গত কয়েক মাস ধরে অনেকেই ওটা আমার কাছ থেকে কেনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। বিদেশি কালেক্টর, দিল্লির মন্ত্রী, এমনকি একটা দুবাইয়ের শেখও লোক পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি বলেছিলাম, এটা বিক্রির জিনিস না।”
এতখানি বলে তিনি থামলেন। জানলার কাচ বেয়ে জল গড়াচ্ছিল। বাইরে একটা লরি হর্ন দিয়ে বেরিয়ে গেল।
অমরেশ বাবু আবার বলে উঠলেন,
“আমি পুলিশে যাইনি, ব্যোমকেশবাবু। কারণ... কারণ আমার মনে হচ্ছে এটা বাইরের লোকের কাজ নয়।”
ব্যোমকেশ ভ্রূ কুঁচকোল। "এ কথা কেন মনে হচ্ছে আপনার?”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“তন্বীকে যারা তুলেছে তারা আমার বাড়ির সব খবর জানে। কখন ও টিউশন থেকে ফেরে, কোন রাস্তা দিয়ে আসে, আমার লকারের চাবি কোথায় থাকে। গত সপ্তাহে বাড়িতে কাজের জন্য যে নতুন দুজন লোক ঢুকেছে,এটাও সে জানে।রান্নার লোক আর ড্রাইভার,এই দুজনকেই যে আমার ম্যানেজার এনেছে,এ কথাও তার অজানা নয়।আগের দিনই তন্বী আমাকে বলেছিল, "দাদু, কেউ যেন আমাদের ফলো করছে।"কিন্তু আমি তখন ওর কথায় খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।”
ব্যোমকেশ চিঠিটা এবার আলোর দিকে তুলে ধরল। কাগজটা মোটা, দামি। কাগজের ধারে বৃষ্টির জলের দাগ। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার,কালি একটুও গলেনি। তার মানে বৃষ্টির মধ্যে লেখা হয়নি। ঘরের মধ্যে বসেই লেখা এই চিঠি।
“আর এই কালচক্রটা এখন কোথায়?” ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল।
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
"আমার স্টাডির লকারে। ডাবল লক করে রেখেছি।চাবি এখন আমার কাছেই রয়েছে, এই চাবির কম্বিনেশন টা শুধুমাত্র আমি আর তন্বী জানি।”
অমরেশবাবু কাঁপা হাতে চায়ে চুমুক দিলেন। “আজ সকালে দেখেছি, লকার অক্ষত। তার মানে ওরা এখনো ওই পুঁথি টা নেয়নি। ওরা আগে তন্বীকে চায়। তন্বী র কাছে চাবির খবর জেনে তারপর হয়তো ওরা পুঁথি টা চুরি করার যোগসাজশ করছে।”
আমি খাতা খুললাম। বাইরে বৃষ্টির বেগ টা আরো বেড়ে গিয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম,হ্যারিসন রোডের এই বাড়িতে আজ রাত থেকে শুরু হল একটা জাল বোনা। যে জালের নাম মরীচিকা, ধরতে গেলেই হাত ফসকে যায়...!
ব্যোমকেশ হঠাৎ উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা ছোট নোটবই বের করল। তারপর ওই নোটবইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে উঠল, “অমরেশবাবু, আপনাকে আমার তিনটে প্রশ্ন করার আছে। এক, তন্বী কলেজ থেকে কটায় বেরিয়েছিল? দুই, কালচক্রের কথা বাড়িতে আর কে কে জানে? তিন, গত এক মাসে বাড়িতে কে কে এসেছে যাদের আপনি চেনেন না?”
অমরেশ বাবু চিন্তান্বিত কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ তন্বী র কলেজ আজ দুপুর বারোটা নাগাদ শেষ হওয়ার কথা।কলেজ থেকে বেরিয়ে ও সোজা টিউশনের পথেই এগোয়।এটা আমি আগেই জানতাম।তাই বিকেল পর্যন্ত আমি ওর ফেরার জন্য অপেক্ষা করিনি। কিন্তু বিকেল পেরিয়ে এখন তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমি এখন বুঝতে পারছি,ও নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে!'
এই বলে বয়স্ক ভদ্রলোক টি নিজের চোখ থেকে চশমা খুলে নিজের দুই ভ্রূ র মাঝখানে হাত দিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় বসে রইলেন।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"অমরেশ বাবু, দেখুন, আপনি দয়া করে শান্ত হোন। দেখুন, আপনি যদি এখন এইভাবে ভেঙ্গে পড়েন তাহলে আমি আপনার নাতনি কে খুঁজে বার করব কি করে! তন্বী কে খুঁজে বার করতে গেলে আপনার সাহায্য এখন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আপনি একটু শক্ত হোন।
ব্যোমকেশের কথা শুনে ভদ্রলোক সম্বিত ফিরে পেয়ে, টেবিলে রাখা জল ভর্তি গ্লাস থেকে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে তারপর অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন ব্যোমকেশের দিকে।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"অমরেশ বাবু, আপনি একটু ধৈর্য ধরে, শান্তভাবে আমাকে সবটা খুলে বলুন।এই কালচক্রে র কথা আপনার বাড়িতে আর কে কে জানে,এটা ভালো করে ভেবে আমাকে বলুন।
অমরেশবাবু দুই হাতে কপাল চেপে ধরলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে জলের গ্লাস টা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। তারপর বুজে আসা কন্ঠে বলে উঠলেন,
“কালচক্রের কথা... “আমার বাড়ির সবারই কমবেশি জানা রয়েছে। তবে পুরো বৃত্তান্তটা কে যে জানে , সেটা বলতে পারব না।”
ব্যোমকেশ সামনে ঝুঁকল। তারপর বলে উঠল,“আপনি নাম বলুন। একটা একটা করে।”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“প্রথমে বলি আমার ছেলে তারপর আমার মেয়ে ঋতুপর্ণা, মানে তন্বীর মায়ের কথা। ও থাকে দুর্গাপুরে, জামাই সুশোভনের সঙ্গে। সুশোভন আমাদের কোম্পানির ডিরেক্টর।ঋতু ওর মেয়ে কে পড়াশোনার জন্য আমার কাছে রেখেছে, যাতে কলকাতায় থেকে তন্বী পড়াশোনা করতে পারে।
তারপর আসছি বাড়ির পুরনো চাকরদের প্রসঙ্গে...। হরিমোহন, সে প্রায় চল্লিশ বছর আছে। যারা নতুন এসেছে তারা হল,রান্নার লোক বিমলা আর ড্রাইভার নিমাই। ওদের ম্যানেজার গোপাল ওদের এনেছে। আর...”
“আর?” ব্যোমকেশ চোখ সরু করল।
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“আর আমার ব্যবসার পার্টনার দিব্যেন্দু সোম। ও গত তিন মাস ধরে আমার পেছনে কুকুরের মতো লেগে আছে। বলছে কালচক্রটা ওকে বেচে দিতে।ও ওই কালচক্র টা হাতে পাওয়ার জন্য,পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত দাম হেঁকে গেছে, জানেন!”
আমি ডায়েরিতে লিখে রাখছিলাম সবটা। আমি তো শুধু একজন লেখক নই, ব্যোমকেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট ও বটে!
বাইরে বৃষ্টির শব্দের সাথে ট্রামের ঘণ্টা মিশে যাচ্ছিল।
ব্যোমকেশ হঠাৎ বলে উঠল,“অমরেশবাবু, আপনি এক কাজ করুন,আজ রাতটা আপনি এখানেই থাকুন। কাল ভোরে আমরা আপনার বাড়ি যাব। তার আগে আমাদের একটা কাজ করতে হবে।”
অমরেশ বাবু অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
“কি কাজ?”
ব্যোমকেশ বলল,
“এই চিঠিটার কাগজ পরীক্ষা করতে হবে।” ব্যোমকেশ চিঠিটা আলোর দিকে ধরল। “
তারপর খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে তারপর আবার বলে উঠল,"বুঝলেন অমরেশ বাবু,এই কাগজ কোনো সাধারণ নয় ।এটা আসলেই হ্যান্ডমেড খাদি পেপার। শুধুমাত্র কলেজ স্ট্রিটের দুটো দোকানে পাওয়া যায়। আর এই নীল কালি... এটা পার্কারের একান্ন নম্বর কলমের কালি। আর যে লিখেছে সে বাঁ হাতি। আপনি ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন, অক্ষরগুলো কেমন ডানদিকে একটু হেলে আছে।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,“তুমি এত কিছু বুঝলে কি করে?এ তো আশ্চর্য!”
ব্যোমকেশ বলে উঠল,“চোখ থাকলে সবাই দেখে, অজিত। কিন্তু দেখার মতো করে দেখে কজন?” ব্যোমকেশ হাসল।
ইতিমধ্যে পুঁটিরাম গরম গরম বেগুনী ভেজে ঘরে নিয়ে এসেছে।
সে বেগুনী র প্লেট টা টেবিলে রাখতে উদ্যত হতেই ব্যোমকেশ বলে উঠল,
“পুঁটিরাম, আমার ঘর থেকে একটা খাম আর গ্লাভস এনে দে তো।”
দৃশ্য দুই
রাত দশটা। বৃষ্টি তখনো থামেনি। ব্যোমকেশ টেলিফোনে আঙ্গুল ঘুরিয়ে কোনো নাম্বার ডায়াল করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তারপর শশব্যস্ত কন্ঠে বলে উঠল,“হ্যালো রজনী? আমি ব্যোমকেশ। এত সকালে ঘুম ভাঙালাম বলে কিছু মনে কোরো না, একটা জরুরী দরকারে ফোন করেছি।
রজনী সেন বলে উঠলেন,"আরে ব্যোমকেশ দা, আমি এই সময়ে বিছানায় থাকি না।
শোন, কালীঘাট থানার এরিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো মিসিং ডায়েরি হয়েছে কিনা দেখ। একটা মেয়ে, নাম তন্বী লাহিড়ী। বয়স কুড়ি।”
ওপার থেকে ইন্সপেক্টর রজনী সেনের গলা ভেসে এল, “এক্ষুনি দেখছি ব্যোমকেশদা। তুমি আবার কোন নতুন কেস হাতে নিয়েছ নিশ্চয়ই?”
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
“হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছো।এই কেস টা একটা
অপহরণের কেস। তবে এই কেসটা ভারি অদ্ভুত। এখানে অপহরণকারী কিন্তু কোনো টাকা পয়সা চায়নি। চেয়েছে একটা পুঁথি। পুঁথিটার নাম কালচক্র।”
ইন্সপেক্টর রজনী সেন বলে উঠল,"স্ট্রেঞ্জ!একটা পুঁথি হাতে পাওয়ার জন্য একজন মানুষ কে অপহরণ!
ঠিক আছে ব্যোমকেশ দা, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি, কালীঘাট মন্দির এরিয়া তে কোনো মিসিং ডায়রি হয়ে থাকলে আমি তোমাকে টেলিফোন করে জানাচ্ছি।
ফোন টা রাখার পর ব্যোমকেশ এবার আমার দিকে তাকাল। তারপর বলে উঠল,“অজিত, কাল সকাল আটটায় আমরা কালীঘাট যাচ্ছি। তন্বীর কলেজ, টিউশন, আর অমরেশবাবুর বাড়ি,এই তিনটে জায়গা আমাদের ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে।”
এই বলে ব্যোমকেশ ওর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। আমি দেখলাম,অমরেশবাবু এতক্ষণে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে রয়েছেন। আমার ভীষন খারাপ লাগল মানুষটার অবস্থা দেখে।ক্লান্তি আর ভয়ে মানুষটা একেবারে ভেঙে পড়েছেন।
দৃশ্য তিন
পরদিন সকালে আমি, ব্যোমকেশ আর অমরেশবাবু তিনজন তাঁর বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। একটা ট্যাক্সি ডেকে নিলাম।তারপর তিনজনে অবশেষে পৌঁছে গেলাম অমরেশ বাবুর প্রাসাদ তিনতলা বাড়িতে।
আমি দূর থেকে দেখেই বুঝতে পারলাম, বাড়ি টা বেশ
পুরনো আমলের। তিনতলা বাড়িটার সামনে রয়েছে একটা বড় ফুলের বাগান,আর বাড়ির পেছনে রয়েছে গ্যারেজ। বৃষ্টি বাদলা র জন্য বাগানের মাটি এখন কাদা কাদা হয়ে রয়েছে।
বাড়িতে ঢুকতেই আমাদের চোখে পড়ল এই বাড়ির নতুন দুজন কর্মচারী র দিকে। ওদের একজন রান্নাঘরে কাজ করতে ব্যস্ত,আর একজন গ্যারেজে গাড়ি মুছে চলেছে।
ওদের দেখিয়ে অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“এই হল বিমলা আর নিমাই।” অমরেশবাবু পরিচয় করিয়ে দিতে, দুজনেই মাথা নিচু করে নমস্কার করল।
ব্যোমকেশ বাড়িটার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত পুরোপুরি জরিপ করে নিল। তারপর আমরা সোজা স্টাডিরুমের দিকে পা বাড়ালাম। অমরেশ বাবুর এই স্টাডি রুম টা বিরাট হলঘরের মতো।স্টাগিরুমের একদম মাঝখানে রয়েছে মেহগনি কাঠের তৈরি একটি বিশাল লকার।ওই লকারেই রয়েছে ডাবল লক।
অমরেশ বাবু ওই লকারের সামনে আমাদের নিয়ে গেলেন। তারপর বলে উঠলেন,"এই লকারেই রয়েছে কালচক্র নামের ওই পুঁথিখানি!
ব্যোমকেশ ভ্রূ কুঁচকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ওই লকারের দিকে। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“আচ্ছা, বুঝলাম।লকারের চাবিটা আমার হাতে দিন।”
অমরেশবাবু কাঁপা হাতে চাবি আর কম্বিনেশন ডায়াল ঘোরালেন। আস্তে আস্তে ঘড়ঘড় শব্দের সাথে ওই লকারের দরজা দুদিকে সরে গেল। আমি বিস্মিত দৃষ্টি তে তাকালাম সেদিকে। দেখলাম,ওই লকারের ভেতর থেকে বেরোল একটা মখমলের কৌটো। কৌটো খুলতেই আমার রীতিমতো চোখ ধাঁধিয়ে গেল।
কালচক্র!
প্রায় বারোশো বছরের পুরনো একটা তালপাতার পুঁথি। পাতাগুলো হলদে বর্ণ ধারণ করেছে।আর তার চারধারে রয়েছে অপূর্ব সোনালি কারুকার্য। মাঝখানে রয়েছে একটি অজানা তিব্বতি লিপি,আর অদ্ভুত সব চক্রের ছবি।
ব্যোমকেশ এবার পুঁথি টা নিজের হাতে তুলে নিল।
এবার ও পাঞ্জাবি র পকেট থেকে একটা আতস কাঁচ বার করল,আর অন্য হাতে ওই পুঁথি র পাতা ওল্টাল।
কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর ব্যোমকেশ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“হুম। আসলই বটে। অমরেশবাবু, এটা আপনি কিভাবে পেলেন?”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“আমার বাবা যৌবনকালে তিব্বত ভ্রমণ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর এক তিব্বতী লামা র সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। এরপর উনিশশো সাতচল্লিশ সালে ওই তিব্বতী লামা কলকাতায় এই বাড়িতে এসে ওঠেন দিনকয়েকের জন্য। আমি যতদূর জানি,ওই তিব্বতী লামা এই পুঁথি টা আমার বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন,"আজ থেকে এই পুঁথি রক্ষা করার দায়িত্ব তোমার। আমি এই এতটুকুই জানি এই পুঁথি র বিষয়ে।”
ব্যোমকেশ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"হুম... বুঝলাম।"
এরপর ব্যোমকেশ লকার বন্ধ করল। তারপর বলে উঠল,“ঠিক আছে। এই পুঁথি টা এখন আমার কাছে থাকবে।”
হঠাৎ এই সময়ে সময় দরজায় টোকা পড়ার শব্দ হল।
আমরা দেখলাম,অমরেশ বাবুর ম্যানেজার চিন্ময় মিত্র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। অমরেশ বাবু তাকে দেখে বলে উঠলেন,"ম্যানেজার, তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভিতরে এসো।"
চিন্ময় বাবু ভিতরে ঢুকে বললেন,
“স্যার, তন্বীদির কলেজ থেকে ফোন এসেছিল। ওর ক্লাসমেট সুরঞ্জন এসেছে।ও আপনার সাথে দেখা করতে চায়।”
ব্যোমকেশ আর আমি একে অপরের দিকে তাকালাম।
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"তুমি ওকে নীচে বসাও, আমি আসছি।"
এরপর আমি, ব্যোমকেশ আর অমরেশ বাবু নীচে নেমে বৈঠকখানার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। বৈঠকখানার ঘরে পৌঁছে দেখি,
ড্রয়িংরুমে বসে আছে বাইশ তেইশ বছরের একটা ছেলে। ওর চোখ লাল হয়ে আছে। হাতে রয়েছে একটা ভেজা ছাতা।
অমরেশ বাবু বৈঠকখানার ঘরে পা রাখতেই ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করে বলে উঠল,
“নমস্কার কাকু।আমি সুরঞ্জন। সুরঞ্জন বোস।তন্বীর সাথে একই কলেজে,একই ক্লাসে পড়ি।
আমি যখন থেকে খবর পেয়েছি, তন্বী কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন থেকেই আমি বড়ো উদ্বিগ্ন ও উচাটন হয়ে পড়েছি। আপনি ডাকা মাত্রই তাই আমি সাথে সাথে এখানে ছুটে এসেছি।”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"বুঝলাম, আচ্ছা সুরঞ্জন, তুমি কি তোমার সহপাঠিনী র সম্বন্ধে এমন কিছু জানো যা ওকে খোঁজার চেষ্টায় কোনো দিশা দেখাতে পারে?
এই কথা শুনে ছেলেটা ঢোক গিলে বলল।
“আজ্ঞে...গতকাল দুপুর সাড়ে বারোটায় কলেজ ছুটির পর আমি তন্বীকে দেখেছি। ও একটা কালো অ্যাম্বাসাডরে উঠছিল।”
ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করল,“আচ্ছা...কেউ কি ওকে জোর করে গাড়িতে উঠিয়েছিল?”
সুরঞ্জন বলে উঠল,
“আজ্ঞে না। তন্বী নিজেই দরজা খুলে গাড়ির ভিতরে উঠে গেল। আর ওঠার সময়ে গাড়ির ড্রাইভারকে বলল "মামা, তাড়াতাড়ি চলো।"
এটা শুনে আমি ভেবেছিলাম ওর মামা এসেছে।”
ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা...তুমি ওর মামার নাম জানো?”
সুরঞ্জন বলে উঠল,
“না। তবে গাড়ির পেছনে একটা স্টিকার ছিল।'লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজ' লেখা।”
ব্যোমকেশ এবার উঠে দাঁড়াল। তারপর সুরঞ্জনের সাথে করমর্দন করে বলে উঠল,
“ধন্যবাদ সুরঞ্জন। তোমার দেওয়া তথ্য তন্বী কে খুঁজে বার করার জন্য খুবই কাজে লাগবে।
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"ঠিক আছে বাবা সুরঞ্জন, তুমি এখন এসো।”
সুরঞ্জন বেরিয়ে যেতেই ব্যোমকেশ অমরেশবাবুর দিকে ঘুরে তাকাল। তারপর বলে উঠল,“আচ্ছা অমরেশ বাবু,আপনার জামাই সুশোভন কোথায়?”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“ও... ও তো আজ সকালেই দিল্লি গেছে। ব্যবসার কাজে।”
ব্যোমকেশ বলল,“আচ্ছা, ওনার ফোন নম্বর টা আমাকে দিন।”
অমরেশ বাবু সাথে সাথে ভিতরে গিয়ে, তারপর একটা কাগজ আর একটা পেন হাতে নিয়ে এলেন। তারপর সেখানে সুশোভন বাবুর টেলিফোন নাম্বার টা খসখস শব্দ সহ লিখে ফেললেন।
ব্যোমকেশ বলে উঠল, এখন ওনাকে একটা টেলিফোন করা যায় কি?
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আমি এক্ষুনি সুশোভনের এই নাম্বারে টেলিফোন করছি।
সুশোভন বাবুর টেলিফোন নাম্বার ডায়াল করার কয়েক মূহুর্ত পর, অমরেশ বাবু হতাশ কন্ঠে বলে উঠলেন,"নাঃ...কেউ টেলিফোন তুলল না।"
ব্যোমকেশের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,“অজিত,ওই গাড়ির খবর নাও। আর ড্রাইভার হরিমোহন কোথায়?”
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,
“ও তো গতকাল সকালেই ,দুদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে গিয়েছে।”
দৃশ্য চার
ইতিমধ্যে তন্বী চৌধুরী নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পার হয়ে গিয়েছে।এটা ওর নিখোঁজ হওয়ার তৃতীয় দিন। সকাল সাতটা নাগাদ ইন্সপেক্টর রজনী সেনের ফোন এল। ফোনের ওপার থেকে রজনী সেন বলে উঠলেন,“ব্যোমকেশদা, খবর খারাপ। দিব্যেন্দু সোম নিখোঁজ। ওর অফিস বলছে দুদিন ধরে তিনি অফিসে আসছেন না। ওনার বাড়িতেও খোঁজ নিয়ে কোনো লাভ হয়নি। মানুষ টা পুরোপুরি নিখোঁজ।”
এই খবর টা পাওয়া মাত্র বড়ো গম্ভীর হয়ে পড়ল ব্যোমকেশ।আনমনে ফোনের রিসিভার টা রাখতেই, হঠাৎ দরজায় একটা শব্দ হল। আমি উঠে গিয়ে দরজার কাছে যেতেই দেখি, দরজার বাইরে অমরেশ বাবু দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম, "আসুন, আসুন অমরেশ বাবুর চাকর । বলুন, নতুন কোনো খবর আছে?"
অমরেশ বাবু ভিতরে এসে বসলেন। তারপর উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলেন,"লাহিড়ী ভিলায় আজ তন্বী র চিঠি এসেছে।ওর চিঠি টা পাওয়ার সাথে সাথে আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। কিন্তু ওই চিঠি টা বারবার মনোযোগ সহকারে পড়বার পর আমি যেন উপলব্ধি করতে পারি, আমার নাতনি তন্বী আদৌ বিপদমুক্ত নয়।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"কোথায় সেই চিঠি?দেখি...!'
অমরেশ বাবু সাথে সাথে নিজের পাঞ্জাবী র পকেটে হাত দিয়ে বার করে আনলেন একটি খাম।
ব্যোমকেশের সাথে সাথে আমিও ওই খামের
ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। খামের ওপর লেখা রয়েছে তন্বী চৌধুরীর নাম।
ব্যোমকেশ খোলা খামটা থেকে দ্বিতীয়বার বার করল তন্বীর সেই চিঠিখানি। খামের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসল একটা পোস্টকার্ড। তাতে লেখা,
"দাদু, আমি ভালো আছি। তুমি আমায় নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করো না। মামা আমাকে নিয়ে ঘুরতে গেছে। তুমি তাঁকে কালচক্রটা দিয়ে দাও। নইলে কিন্তু ওরা রাগ করবে।
ইতি - তন্বী।"
ব্যোমকেশ ওই চিঠিখানি ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখে নিয়ে বলে উঠল,
এই চিঠির কালিটা কিন্তু ভারি অদ্ভুত। এক জায়গায় একটু লেপ্টে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে,যেন যে এই চিঠি টা লিখেছে, তার হাত লেখার সময় ভীষণভাবে কেঁপেছে!"
আমি বিস্মিত দৃষ্টি তে ওই চিঠির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ব্যোমকেশ চিঠির খাম টা উল্টাল। খামের পিছনে আবছা একটা দাগ রয়েছে। না,ওটা কোনো জলের দাগ নয়। ওটা কালির দাগ।
“কোড।” ব্যোমকেশ ফিসফিস করল। “তন্বী কোড করে খবর দিয়েছে।”
সে কার্ডটা আলোর দিকে ধরল। তারপর একটা পেন্সিল দিয়ে হালকা করে ঘষল। পেন্সিল দিয়ে হালকা করে ঘষার সাথে সাথেই ওই খামের ওপর দুটো আবছা অক্ষর ফুটে উঠল।
"গু-দা-ম। পা-ট।"
“গুদাম। পাট।” আমি বিস্মিত স্বরে বলে উঠলাম।
ব্যোমকেশ ওই খাম টা হাতে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল ।
তারপর হঠাৎ করে ও রীতিমতো লাফিয়ে উঠে বলে উঠল,“ইউরেকা! সূত্র পেয়েছি।"
আমি আর অমরেশ বাবু দুজনেই অবাক হয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।
"কি সূত্র খুঁজে পেলে ব্যোমকেশ?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ব্যোমকেশ উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল, "কলকাতার উপকণ্ঠে বিশ পঁচিশ টা পাটের গুদাম আছে।এটা জানো নিশ্চয়ই অজিত...!”
আমি মাথা চুলকে বলে উঠলাম,"হ্যাঁ,তা জানি, কিন্তু কলকাতার চারপাশে অন্তত ষাট কি সত্তর টা পাটের গুদাম আছে। সবগুলোতে হানা দেবে নাকি?"
অমরেশ বাবুর মুখ আবার সাদা হয়ে গেল। "হাতে একদম সময় নেই ব্যোমকেশ বাবু। আজ রাত বারোটা বাজলেই তিন দিন শেষ।"
ব্যোমকেশ চোখ বন্ধ করল। এক মিনিট। তারপর চোখ খুলে বলল, "না। সবগুলো না। তন্বী আমাদের আরও ক্লু দিয়ে গেছে। আমরা শুধু ধরতে পারিনি।"
তারপর ও চিঠির খাম টা হাতে নিয়ে আবার নাড়াচাড়া করতে শুরু করল। তারপর বলে উঠল,
"অজিত, আলো আর ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা দাও।"
আমি টেবিল ল্যাম্পটা কাছে টেনে আনলাম। ব্যোমকেশ খামের পেছনটা আলোর সামনে ধরল।
"দেখো।" ও পেন্সিল দিয়ে হালকা করে ঘষল। "গু-দা-ম। পা-ট। এর মাঝে একটা ফুটকি। মানে দুটো আলাদা শব্দ। আর দেখো, 'গুদাম' শব্দের নিচে একটা ছোট দাগ। এটা যে কালির দাগ নয় এটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। এটা আসলেই পাটের আঁশ।"
আমি ঝুঁকে দেখলাম। সত্যিই তো, খামের গায়ে সরষের তেলের একটা হালকা গন্ধ।
"এই গন্ধটা আমার চেনা, অজিত।" ব্যোমকেশ বলে উঠল।
"পুরনো পাটের গুদামে মেশিনে সরষের তেল দেওয়া হয়। আর এই আঁশ... এটা আসলে মোটা পাট। যেটা দিয়ে বস্তা বানানো হয়।তার মানে গুদামটা ছোটখাটো না। ওখানে বড় চালান আসে।"
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন, "কিন্তু ব্যোমকেশ বাবু, এরকম তো অনেক টা গুদাম আছে, তার মধ্যে কোন গুদামে ওকে আটক করে রাখা রয়েছে এটা আমরা কি করে বুঝব?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"হ্যাঁ,তা তো বটেই, এখন কোন গুদাম ঘরে তন্বী কে লুকিয়ে রাখার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে,এটাই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।"
এই বলে ব্যোমকেশ একটা কাগজ কলম নিয়ে লিখতে শুরু করল। আমি আর অমরেশ বাবু ঝুঁকে পড়ে সেদিকে দেখতে লাগলাম।
ব্যোমকেশ লিখতে লিখতেই বলছে,
এক,যেগুলো এখনো চালু আছে, সেখানে যাওয়ার দরকার নেই।কারণ সেখানে ইঁদুর আর স্যাঁতসেঁতের গন্ধ থাকবে না।
দুই,যে গুদামঘর গুলোর মালিক লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজ, সেখানে খুঁজে কোনো লাভ হবে না।
"থাকল কটা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"পাঁচ টা।" ব্যোমকেশ বলল। "কিন্তু এর মধ্যেও একটা আছে যেটা সবচেয়ে সম্ভাব্য।"
এই বলে ব্যোমকেশ আবার চিঠিটা হাতে নিল। তারপর ও চিঠিটার পিছনে পেন্সিল দিয়ে ঘষতেই খামের পেছনে ফুটে উঠল একটা ঝাপসা লেখা। আমি আর অমরেশ বাবু ঝুঁকে পড়ে লেখা টা দেখলাম। খামের উল্টো পিঠে ঝাপসা ভাবে লেখা রয়েছে,
10-4. 27. GD।
আমি বললাম, "এগুলো কি লেখা ব্যোমকেশ?"
ব্যোমকেশের চোখ জ্বলে উঠল। গম্ভীর কন্ঠে ও বলে উঠল,"এটা কোড, অজিত। তন্বী পুলিশি কোড ব্যবহার করেছে।"
অমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"কোড? কিরকম কোড?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"এটা আমেরিকান পুলিশ কোড। 10-4 মানে তন্বী ঠিক আছে।তন্বী আসলেই বলতে চাইছে ,"দাদু, আমি ঠিক আছি। আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো`।"
27 এর অর্থ হল,"ভারতীয় পুলিশে 27 নম্বর ধারা মানে Wrongful Confinement , অর্থাৎ বেআইনি ভাবে আটক করা। মানে ওকে জোর করে কোথাও আটকে রাখা হয়েছে।"
আর কোডের একদম শেষটায়,GD বলে যে লেখা দেখতে পাচ্ছ,এটাই হল আসল ক্লু। GD অর্থাৎ Godow। পুলিশ ফাইলে গুদামকে শর্টে GD লেখা হয়।
আর কলকাতা পুলিশের এরিয়া কোডে সাতাশ নম্বর থানা হল বজবজ থানা`।"
বিস্মিত কন্ঠে অমরেশ বাবু বলে উঠলেন, তার মানে তুমি বলতে চাইছ,বজবজের কোনো গুদামঘরে অপহরণকারীরা ওকে জোর করে আটকে রেখেছে!"
ব্যোমকেশ মাথা নাড়ল। তারপর বলে উঠল,"হ্যাঁ। আর দেখো খামের গায়ে পাটের আঁশ আর সরষের তেলের গন্ধ। মানে পরিত্যক্ত পাটের GD।"
এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে, ব্যোমকেশ সাথে সাথে ইন্সপেক্টর রজনী সেন কে টেলিফোন করল।
রজনী সেনকে ফোন করতেই দশ মিনিটে বজবজের সব পাটের গুদামের লিস্ট চলে এল। খোঁজ খবর করে দেখা গেল,বজবজে পরিত্যক্ত পাটের গুদাম মাত্র দুটো।
তার মধ্যে একটা তিন বছর আগে অমরেশ বাবুর জামাই সুশোভন চৌধুরীর কোম্পানি লিজে নিয়েছিল। ওই গুদামের নাম গুপ্ত পাট গুদাম।
ব্যোমকেশ বলল, "পেয়ে গেছি। 10-4. 27. GD = বজবজের গুপ্ত পাট গুদামে ওকে আটক করে রাখা হয়েছে।"
দৃশ্য পাঁচ
অমরেশ বাবুর ঘরে বসে,ওই পাটের গুদামে পা রাখার পরিকল্পনা করায় যখন আমি, ব্যোমকেশ আর অমরেশ বাবু তিনজনে ব্যস্ত, ঠিক ওই সময়ে হঠাৎ অমরেশ বাবুর ঘরে রাখা টেলিফোনটা বেজে উঠল। অমরেশ বাবু ফোন টা তোলার সাথে সাথেই, আমি লক্ষ্য করলাম, ওনার চোখমুখ ভয়ে আতঙ্কে যেন একেবারে কালো হয়ে গিয়েছে । টেলিফোনের ওপাশ থেকে শুধু একতরফা কথা শুনে যাচ্ছেন অমরেশ বাবু,এটা আমি আর ব্যোমকেশ দুজনেই বুঝতে পারলাম।ফোন টা রাখার পর অমরেশ বাবু যখন আমাদের সামনে এলেন, তখন ওনার ভয়ার্ত চোখমুখের চেহারা দেখে আমি আর ব্যোমকেশ চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলাম,"কে ফোন করেছিল অমরেশ বাবু?"
অমরেশ বাবু ভীত সন্ত্রস্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,"ব্যোমকেশ বাবু র আন্দাজ একদম সঠিক। অপহরণকারীরা আমার নাতনি কে বজবজের গুপ্ত পাট গুদামের ভিতরেই আটকে রেখেছে!"
একথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। বললাম,"অপহরণকারী রা কি এইমাত্র আপনাকে ফোন করেছিল?"
অমরেশ বাবু ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,"হ্যাঁ, অপহরণকারী রা আমাকে এইমাত্র হুমকি দিয়েছে,কালচক্র ওদের হাতে সমর্পণ করতে হবে। তাহলেই ওরা আমার নাতনি কে ছেড়ে দেবে। ওরা একটু পরে আবার টেলিফোন করবে, আমার ফাইনাল সিদ্ধান্ত শোনার জন্য।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"দেখেছ অজিত, আমি একদম ঠিক রাস্তাতেই এগোচ্ছি। অমরেশ বাবু, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। এরপর যখন আপনার কাছে ফোন আসবে, আপনি ওদের বলবেন, আপনি কালচক্র ওদের হাতে সমর্পণ করার সিদ্ধান্ত ই নিয়েছেন। এরপরে যা হবে, সেটা আমি দেখে নেব...!"
দৃশ্য পাঁচ
রাত ১১টা। কলকাতার উপকণ্ঠের পরিত্যক্ত পাটের গুদামের কাছে আমি ব্যোমকেশ আর ইন্সপেক্টর রজনী সেন পা রেখেছি। এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হল, তন্বী কে খুঁজে বার করে ওকে পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় ওর দাদুর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
অমাবস্যার এই অন্ধকার রাতে,এই পাটের গুদামের চারদিকটা একেবারে নিস্তব্ধ। চারদিকে শুধু ঝিঁঝি ডাকছে। দূর থেকে ভেসে আসছে রেললাইনের ওপর দিয়ে মালগাড়ি যাওয়ার শব্দ। গুদামের টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ পড়ছে।
আমরা তিনটে গাড়ি নিয়ে এসেছি। একটাতে আমি আর ব্যোমকেশ,আর অন্যটায় রজনী সেন। আমরা দুজনেই ছদ্মবেশে রয়েছি। আমাদের মাথায় রয়েছে ময়লা গামছা, গায়ে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। আর হাতে একটা কাঠের বাক্স। বাক্সের ভেতর রয়েছে কালচক্রের নকল সংস্করণ ।আসল পুঁথিটা ইন্সপেক্টর রজনী সেনের জিম্মায় রয়েছে। পুলিশের দুটো গাড়ি রয়েছে আধ কিলোমিটার দূরে, গুদামের পেছনের বাঁশবাগানে।
ব্যোমকেশ আমার কনুইতে মৃদু চাপ দিল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “অজিত, মনে রাখবে। ভয় পেলে চলবে না। এরা কিন্তু প্রচন্ড ক্ষেপে রয়েছে। ওই পুঁথির হাতে পাওয়ার জন্য ওরা মানুষ খুন করতেও পিছপা হবে না।”
আমার গলা শুকিয়ে আসছিল। আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলাম,"আর তন্বী?"
“ওকে বাঁচাতেই তো এসেছি।”উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল ব্যোমকেশ। আমি দেখলাম,ব্যোমকেশের চোখ দুটো এই অন্ধকারেও যেন ভীষণভাবে জ্বলে উঠছিল...!
রাত এখন প্রায় এগারো টা। কলকাতার উপকণ্ঠের এই পরিত্যক্ত পাটের গুদামের চারপাশটা একেবারে শুনশান!শুধু ঝিঁঝি ডাকছে আর দূরে রেললাইনের ওপর দিয়ে মালগাড়ি যাওয়ার শব্দ। গুদামের টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ পড়ছে।
আমরা তিনটে গাড়ি নিয়ে এসেছি। একটাতে আমি আর ব্যোমকেশ। ছদ্মবেশ। মাথায় ময়লা গামছা, গায়ে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। হাতে একটা কাঠের বাক্স। বাক্সের ভেতর কালচক্রের নকল।
পুলিশের দুটো গাড়ি রয়েছে আধ কিলোমিটার দূরে, গুদামের পেছনের বাঁশবাগানে।
গুদামের সামনে একটা কালো অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে। গাড়ির নম্বর প্লেট কাদায় ঢাকা। জানলার কাচ ভেতর থেকে ঘোলাটে। ভেতরে মিটমিটে আলো।
আমরা ধীরে ধীরে এগোলাম। পায়ের নিচে কাদা। ব্যোমকেশ দরজায় তিনবার টোকা দিল। ভেতর থেকে কর্কশ গলা, “কে?”
ব্যোমকেশ গলা নামিয়ে বলল, “কালচক্র নিয়ে এসেছি। অমরেশবাবু পাঠিয়েছে।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর খ্যাঁচ করে দরজা খুলে গেল।
ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে। পাটের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। একটা টেবিল। টেবিলে একটা হ্যারিকেন। তার চারপাশে তিনজন লোক। একজনের হাতে পিস্তল। আর টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বাঁধা তন্বী। মুখে কালো টেপ। চোখ দুটো ফোলা। কিন্তু ওর দুচোখে ভয়ের বদলে রাগ টাই ভীষণভাবে প্রকট হয়ে উঠেছ
আর টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বছর পঁয়তাল্লিশের একজন মাঝবয়সী লোক ।ওই ভদ্রলোক কে চিনতে আমার কোনো অসুবিধা হল না।ইনিই হলেন অমরেশ বাবুর জামাই সুশোভন চৌধুরী। তাঁর পরনে দামি স্যুট, কিন্তু চুল উস্কোখুস্কো,চোখ লাল। ওঁর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে হরিমোহন। অমরেশ বাবুর চল্লিশ বছরের পুরনো চাকর। হাতে একটা রিভলভার।
আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
“পুঁথি কোথায়?” সুশোভন হিসহিস করে জিজ্ঞেস করল।
ব্যোমকেশ বাক্সটা টেবিলে রাখল। তারপর বলে উঠল,“আগে তন্বী কে আমাদের হাতে তুলে দিন। তারপর এই পুঁথি হাতে পাবেন। কথা তো সেইরকমই হয়েছিল।"
হরিমোহন খ্যাক করে হেসে উঠল। তারপর বলে উঠল,“কথা হয়েছিল? কথা অনুযায়ী সব কাজ পরিচালনা করার তুই কে রে? অমরেশবাবুর দালাল?”
ব্যোমকেশ শান্ত গলায় বলল, “আমরা অমরেশ বাবুর চাকর।”
এটা শুনে সুশোভনের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। “আচ্ছা,তার তিনি ই বুঝি তোদের এখানে পাঠিয়েছেন?"
ব্যোমকেশ ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল,
“হ্যাঁ। আমি আপনাদের হাতে কালচক্র টা তুলে দেওয়ার জন্য এসেছি।আপনারা কালচক্র টা নিয়ে তন্বী কে শুধু আমাদের হাতে তুলে দিন।”
"পুঁথি কোথায়?" সুশোভন প্রচন্ড গর্জে উঠে বলে উঠলেন।
ব্যোমকেশ এবার ওর হাতে ধরা ওই কারুকার্যখচিত বাক্স টা সুশোভন বাবু র সামনে রাখল। তারপর ওটা নিজের হাতের বজ্র মুষ্ঠি তে ভীষণ শক্ত করে ধরে তারপর বলে উঠল,
"আগে আপনি তন্বী কে ছেড়ে দিন, তারপর এই বাক্স আপনার। জিম্মায় দেব আমি।"
হরিমোহন এগিয়ে এল। তারপর বলে উঠল,"একদম বাজে কথা বলবেন না। আমরা তন্বী কে আপনাদের হাতে তুলে দিই,আর আপনারা আমাদের ফাঁকি দিয়ে ওই বাক্স নিয়ে পালিয়ে যান আর কি...ওটি হচ্ছে না। আগে ওই বাক্স আমাদের জিম্মায় দিন, তারপর তন্বী কে নিয়ে যাবেন।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"ঠিক আছে, তবে তাই হোক।"এই বলে ব্যোমকেশ ওই কারুকার্যখচিত বাক্স টার ঢাকনা ওদের সামনে খুলে ধরল। তারপর বলে উঠল,"এই নিন।"
সুশোভন ওই বাক্সের দিকে হাত বাড়াতেই ব্যোমকেশ হঠাৎ থমকে গেল। আমি দেখলাম,ওর দৃষ্টি সোজা চলে গিয়েছে তন্বীর পায়ের দিকে। আমিও সেদিকে তাকালাম।আর তাকাতেই আমার চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত দৃশ্য! তন্বীর পায়ে কোনো জুতো নেই।খালি পা, কিন্তু পায়ে একটুও ধূলো বা কাদা নেই।
ব্যোমকেশের ভ্রু কুঁচকাল।
বাইরে থেকে হঠাৎ পুলিশের সিগন্যাল শোনা গেল।আর তার প্রায় সাথে সাথেই ইন্সপেক্টর রজনী সেন সেখানে ঢুকলেন।
হঠাৎ চারপাশে প্রবল গুলি,লাঠি, চিৎকারের শব্দ শোনা যেতে শুরু করল।
অতঃপর সুশোভন বাবু র হাতে হাতকড়া পড়ল।
ব্যোমকেশ ছুটে গিয়ে তন্বীর বাঁধন খুলল। কিন্তু ওর মুখের সাথে আটকানো টেপ টা সরাতেই মেয়েটা ফুঁপিয়ে কাঁদল। ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,"কাকু..."
কিন্তু ব্যোমকেশ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো থমকে গেল। চমকে উঠে বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল,"তুমি কে?"
আমি চমকে উঠলাম। সমস্ত ব্যাপারটা যে ঠিক কোনদিকে এগোচ্ছে সেটা চট করে ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না।
হঠাৎ ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"এটা তন্বী না।"
ব্যোমকেশ মেয়েটার কানের পেছনে আঙুল দিল। তারপর ওর নকল তিলটা খুলে বার করে আনল।
সুশোভন বাবু এবার প্রচন্ড হতচকিত হয়ে গেলেন। আমি পুরো ব্যাপারটা চাক্ষুষ করে যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম।উনি আসলে ভেবেছিলেন, তন্বী র চেহারার সাথে সাদৃশ্য যুক্ত কোনো মেয়ে কে তন্বী র মতো করে সাজিয়ে এখানে চেয়ারে বেঁধে একটা নাটকের মহড়া তৈরি করলেই ওঁর সব অভিসন্ধি সফল হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যোমকেশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কে ফাঁকি দেওয়া ওর পক্ষে আদৌ সম্ভব হয়নি।
চেয়ারের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা মেয়েটার উদ্দেশ্যে ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"তুমি যেই হও,মেকআপের আবরণ টা খুলে ফেলো। তুমি ধরা পড়ে গিয়েছ। বিশেষ করে তোমার এই হাতের নখ দেখে আমি যা বোঝার বুঝে গিয়েছি। তন্বী বাঁ হাতি। ওর বাম হাতের নখের একটা বিশেষ আকৃতি রয়েছে,এটা আমি ওর ছবি দেখে বুঝতে পেরেছি । কিন্তু তোমার দুটি হাতের সব নখই সমান। তুমি কে? এখানে তোমাকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে কেন?"
মেয়েটা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমার নাম মিতা।আমি সুরঞ্জনের বোন। এরা আমাকে একশো পঁচিশ টাকা দিয়ে... বলেছে শুধু দশ মিনিট এখানে চেয়ারের সাথে দড়ি বাঁধা অবস্থায় বসে থাকতে হবে...!"
এই কথা শুনে,আমার মাথায় রীতিমতো আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি বলে উঠলাম,"তন্বী কোথায়?"
সুশোভন হাতকড়া পরা অবস্থাতেই কান এঁটো করা একটা পৈশাচিক হাসি হাসলেন। তারপর বলে উঠলেন,
"এই মেয়ে টা যে তন্বী নয়,এটা তুই ধরে ফেলেছিস? খুব বুদ্ধি তো তোর! কিন্তু এখানে যতই বুদ্ধি প্রয়োগ কর, কোনো লাভ হবে না। তন্বী এখন রয়েছে অন্য জায়গায়।"
ব্যোমকেশ এবার প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ওর কলার চেপে ধরল। তারপর ক্রোধান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,"কোথায় তন্বী? আপনি কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন তাকে"
"জানি না।"
মাটিতে থুতু ফেলে একরাশ ক্রোধ ও ঘৃণার সাথে
সুশোভন বলে উঠল।
ওদিকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা মেয়েটা প্রচন্ড ভয় পেয়ে বলে উঠল,
"আমাকে শুধু এখানে বসতে বলা হয়েছিল। পুতুলের মতো। আমি আর কিচ্ছু জানি না। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন...!"
ওদিকে রজনী পুলিশ কনস্টেবল সুশোভন আর হরিমোহনকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তুলছে। চারদিকে টর্চের আলো।এখনো টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে অবিরাম।
আমার বুকের ভেতরটা এখনো ধড়ফড় করছে। অমরেশ বাবুর নাতনি তন্বীকে পাওয়া গেল না, তার বদলে সেই জায়গায় মিতা নামের একটা মেয়েকে দেখে আমার মনের ভিতরে আনাগোনা করতে শুরু করল হাজারো প্রশ্ন।
ব্যোমকেশ কিন্তু ছুটে গিয়ে মিতা র বাঁধন খোলেনি। ও থমকে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখ এই গুদাম ঘরের প্রতিটা কোণ জরিপ করছে।
এরপর ব্যোমকেশ নিজে গিয়ে ওর বাঁধন খুলে দিল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল,"যাও। পুলিশ তোমার স্টেটমেন্ট নেবে।"
দড়ি খুলে দেওয়ার পর,মিতা একরাশ ভয় ও সংকোচের সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
সুশোভন একটা বাঁকা হাসি হাসল। তারপর ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলে উঠল,"কি ব্যোমকেশ? শুধু শুধু এখানে এসে ফাঁকা গুলি করলে? তন্বী কোথায় আছে,এ খবর জীবনেও পাবে না তুমি।"
ব্যোমকেশ এবার প্রচন্ড রেগে গিয়ে ওর কলার চেপে ধরল। তারপর বলে উঠল,"সত্যি করে বলুন, তন্বী কে আপনারা কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?"
সুশোভন বাবু ব্যোমকেশের ওই বজ্র মুষ্ঠির কবলে পড়েও একটা ব্যাঙ্গাত্মক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর বলে উঠল,"খোঁজো... খোঁজো... খুঁজতে থাকো...!খুজতেই থাকো...!"
ইন্সপেক্টর রজনী সেন বলে উঠলেন,
"ব্যোমকেশদা, ওকে ছেড়ে দিন। এখন এই অপদার্থ লোকটাকে ঘাঁটিয়ে আমাদের কোনো লাভ হবে না।"
ব্যোমকেশ রজনী র কথা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কি যেন ভাবল। তারপর বলে সুশোভন বাবু র কলার ছেড়ে দিয়ে বলে উঠল,"তুমি ঠিকই বলেছ। ওকে এখন পুলিশ কাস্টাডি তে নিয়ে যাও তোমরা। আমরা বরং এখন এই গোটা জায়গাটা তল্লাশি চালাই।
পুলিশ কনস্টেবল সুশোভন বাবু কে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে উদ্যত হল।তারপর আমরা ঘুরে ঘুরে গোটা ঘরটা ভালো করে দেখতে লাগলাম।
তিরতির করে কাঁপতে থাকা হ্যারিকেনের আলোয় এখন যেন এই গুদাম ঘরটা কম্পমান। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাটের ছিবড়ে। দেওয়ালের কোণায় কোণায় ইঁদুরের গর্ত। গুদাম ঘরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটা ভাঙা টেবিল। তার ওপর রয়েছে একটা ভাঙা চায়ের কাপ।
রজনী সেন বললেন, "ব্যোমকেশদা, কোনো সূত্র খুঁজে পেলেন?"
ব্যোমকেশ হাত তুলল। "এক মিনিট,একটু চুপ থাকো। আমায় একটু ভাবতে দাও।"
এই বলে ব্যোমকেশ আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত হেঁটে, একটা কিছু খোঁজার চেষ্টা করে চলেছে প্রাণপণে। হঠাৎ ওর পায়ের নিচে কটকট শব্দ হল। ব্যোমকেশ থেমে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হঠাৎ ও থেমে গেল। তারপর ও টেবিলের তলায় ঝুঁকল।
"এটা কি?"এই বলে ও আঙুল দিয়ে কিছু একটা তুলল।
আমি কাছে গিয়ে দেখলাম। একটা ছোট্ট রুপোর নুপুর। তার একটা ঘুঙুর নেই। অর্থাৎ নূপুর টা
ভাঙা।
আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমি বলে উঠলাম,"এটা তন্বীর পায়ের নূপুর?"
ব্যোমকেশ নুপুরটা নাকে শুঁকল। তারপর বলে উঠল, "হ্যাঁ। নিঃসন্দেহে এটা তন্বীর নূপুর। আমি ওর ছবিতে দেখেছি।ও বাঁ পায়ে এই নুপুর পরে সবসময়।"
রজনী সেন বলে উঠলেন, "তাহলে আপনি বলতে চাইছেন,তন্বী এখানে এসেছিল?"
ব্যোমকেশ মাথা নাড়ল। তারপর বলে উঠল,"এসেছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে,ও বেশিক্ষণ এখানে থাকেনি।"
এই বলে ও টেবিলের ওপর হাত বোলাল। টেবিলের ওপর পুরু ধুলোর একটা আস্তরণ রয়েছে। ব্যোমকেশ ওই টেবিলের ওপরে ভালো করে লক্ষ্য করে দেখল। তারপর একটা জায়গায় অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"দেখো অজিত,এই জায়গাটা ভালো করে দেখো একবার।"
আমি সাথে সাথে সেদিকে দেখলাম, টেবিলের ঠিক মাঝখানে একটা আয়তকার জায়গা রয়েছে যেখানে এতটুকুও ধুলো নেই। ওই জায়গাটা আসলে একটা আয়তকার দাগ।
"এখানে কিছু রাখা ছিল। খুব সম্প্রতি।" ব্যোমকেশ বলে উঠল।
তারপর ও আবার মেঝের দিকে তাকাল। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাটের আঁশ। কিন্তু সেখানে এক কোণে... একটা ভেজা দাগ চোখে পড়ল ওর।ওই দাগ দেখে এবার ব্যোমকেশ হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর ওই ভেজা দাগটায় আঙুল ঠেকাল। তারপর শুঁকল।
এবার সন্দিগ্ধ কন্ঠে ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"এটা সরষের তেলের গন্ধ।"
আমি আর ইন্সপেক্টর রজনী সেন মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।
ব্যোমকেশ আবার বলে উঠল," এই জলের সাথে মিশে আছে কালি। নীল কালি।"
আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "কালি?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"হ্যাঁ। তন্বী এখানে কিছু লিখেছিল। জল আর কালি দিয়ে। তারপর মুছে দিয়েছে। কিন্তুওই দাগ টা রয়ে গেছে।"
ব্যোমকেশ পকেট থেকে টর্চ বের করল। তারপর লাইটটা একদম নিচু করে ভেজা দাগটার ওপর ধরল।
আর তখনই আমার চোখে পড়ল দেখলাম আবছা একটা দাগ। আমি ভালো করে ওই দাগটা লক্ষ্য করে অবশেষে বুঝতে পারলাম,খুব আবছাভাবে মেঝেতে লেখা রয়েছে ৩.ব.বা
৩. ব.বা?" রজনী সেন বললেন। "মানে?"
ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল। ওর মুখ গম্ভীর।ও বলে উঠল,"তন্বী আমাদের দ্বিতীয় ক্লু দিয়ে গেছে।"
আমি বলে উঠলাম,
"কিন্তু সুশোভন তো এখানে ছিল। ও দেখেনি?"
দৃশ্য ছয়
পুলিশ কাস্টাডি তে এখন পুলিশি জেরার সম্মুখীন হয়েছেন সুশোভন বাবু।লকাপের এই আলোআঁধারি ঘরের ভিতরে এখন ইন্সপেক্টর রজনী সেন, দুজন পুলিশ কনস্টেবল, আমি আর ব্যোমকেশ একপাশে বসে রয়েছি,আর অপরপ্রান্ত হাতে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় বসে রয়েছেন সুশোভন বাবু।
ব্যোমকেশ সুশোভনের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,"দেখুন সুশোভন বাবু, আপনি এখন পুলিশের হাতে বন্দি।তন্বী কোথায় আছে,এটা যত তাড়াতাড়ি আপনি আমাদের বলবেন,তত ই আপনার পক্ষে মঙ্গল।
সুশোভন মাথা নিচু করলেন। তারপর বলে উঠলেন"আমি কিচ্ছু জানি না।আপনারা বিশ্বাস করুন।"
আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। সুশোভন বাবু র গলায় আর আগের মতো সেই বন্য ক্ষীপ্রতা টা নেই। তার বদলে সুশোভন বাবু র কন্ঠে ও চোখের চাহনি ফুঁড়ে নির্গত হয়েছে এক অব্যক্ত ভীতি!
সুশোভন বাবু কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আবার বলে উঠলেন
"আমি যখন এসেছিলাম, মেয়েটা চেয়ারে বাঁধা ছিল। আমি ওর সাথে কথা বলিনি। আমাকে শুধু বলা হয়েছিল একটা টেলিফোনের অপেক্ষা করতে।"
"কার টেলিফোন?" ব্যোমকেশ গর্জে উঠল।
সুশোভন বাবু বলে উঠলেন,
"জানি না। একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।
গলাটা একজন পুরুষের। সে বলেছিল "সে আমাদের দিকে নজর রেখেছে।পুঁথি টা আমি হাতে পাওয়ার পর সে ফোন করবে। তারপর তন্বীকে ছেড়ে আসার জন্য একটা জায়গা বলে দেবে।'"
ব্যোমকেশ চোখ বন্ধ করল। পাঁচ সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর তারপর চোখ খুলল ব্যোমকেশ। তারপর হতাশ কন্ঠে বলে উঠল,
"অজিত। আমরা ভুল লোককে ধরেছি।"
আমি চমকে উঠলাম। "মানে?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"মানে আর কিছুই নয়,সুশোভন বাবু আসলেই এই পুরো খেলায় একটা সুতোয় বাঁধা পুতুল মাত্র।ওকে দিয়ে ডিল করানো হচ্ছে। কিন্তু এখানে আসল মাথা অন্য কেউ। যে তন্বীকে এখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে।"
রজনী সেন বলে উঠলেন, "কিন্তু কে?"
ব্যোমকেশ মেঝের লেখাটা দেখাল। "৩. ব.বা। এর মানে দুটো হতে পারে।
এক: ৩ নম্বর বজবজ।
দুই: বিধানবাগান। ৩ নম্বর শেড।"
"বিধানবাগান?" আমি বললাম। "ওটা তো..."
"হ্যাঁ।" ব্যোমকেশের চোখ জ্বলছে। "ওটা দিব্যেন্দু সোমের পরিত্যক্ত পাটকল।"
নামটা শুনেই আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। দিব্যেন্দু সোম। অমরেশ বাবুর বিজনেস পার্টনার। যে কালচক্র কেনার জন্য পাঁচ কোটি টাকা দিতে চেয়েছিল।
"কিন্তু দিব্যেন্দু তো নিখোঁজ।" রজনী সেন বললেন।
"ঠিক।" ব্যোমকেশ বলল। "কারণ ও নিজেই এই অপহরণ করিয়েছে। আর সুশোভনকে ব্যবহার করেছে আমাদের চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য।"
আমি তখনো নুপুরটা হাতে নিয়ে বসে আছি। ব্যোমকেশ আমার হাত থেকে নুপুরটা নিল। নুপুরের ভেতরের দিকে টর্চ ধরল।
আর তখনই আমরা দেখলাম। নুপুরের ভেতরে খুব মিহি করে খোদাই করা একটা অক্ষর। "স"
"স?" আমি জিজ্ঞাসা করে উঠলাম।
এর মানে কি?
"সোম।"
ব্যোমকেশ ফিসফিস করল।
"তন্বী নুপুরের ভেতরে 'স' লিখে গেছে। ও জানত ওকে সরানো হবে। তাই ও নিজের নূপুরে প্রমাণ রেখে গেছে।ও অপহরণকারী র নামের প্রথম অক্ষর টা আমাদের জানানোর একটা চেষ্টা করেছে।"
ঘরের মধ্যে এখন বিরাজ করছে পিনপতন নিস্তব্ধতা। শুধু বাইরে অবিরাম ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ হয়ে চলেছে।
ব্যোমকেশ সুশোভনের দিকে আবার ঘুরে তাকাল। তারপর বলে উঠল,"আপনাকে কে ফোন করেছিল শেষবার?"
আমি দেখলাম,সুশোভন এবার ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে। "আমি... আমি জানি না... আমি কিচ্ছু জানি না।"
ব্যোমকেশ রজনীর দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"রজনী, ফোনের কল লিস্ট টা বের করুন। আমাদের হাতে এখন সময় খুব কম।"
দৃশ্য সাত
রাত গভীর। আমি আর অজিত আবার ফিরে এসেছি সেই পরিত্যক্ত গুদাম ঘরে যেখানে তন্বী কে আটকে রাখা হয়েছিল।ব্যোমকেশ আবার খুব ভালো করে ঘরটা দেখতে শুরু করল। টেবিল,চেয়ার,দেওয়ালের আনাচে কানাচে শাণিত ছুরি র মতো তাক করতে শুরু করল ওর অনুসন্ধানি দৃষ্টি!
হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেল দেওয়ালের গায়ে আটকানো একটা পেরেকের ওপর।
পেরেকটায় একটা সুতো আটকে আছে। লাল রঙের সুতো।
ব্যোমকেশ সুতোটা খুলল। তারপর একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে ওটা শুঁকল। তারপর চাপা স্বরে বলে উঠল,"রক্ত।"
উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। বললাম,"কার রক্ত?"
"তন্বীর না।" ব্যোমকেশ বলল। "এই রক্ত ,কারো হাত কাটার ফলপ্রসূ নির্গত হয়েছে। যখন ওকে এখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ই নির্গত হয়েছে এই রক্ত।"
এই বলে ও তাড়াতাড়ি সুতোটা নিজের পকেটে রাখল। তারপর বলে উঠল, "চলো অজিত। আমাদের হাতে এখন একেবারে সময় নেই।"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম,"কোথায়?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"বিধানবাগান। ৩ নম্বর শেড।" ব্যোমকেশ বলল। এখন আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত,"তন্বী ওখানেই আছে। আর আসল খেলোয়াড়ও ওখানেই আছে। আমাদের আর অন্ধকার হাতড়ে কোনো সূত্র খোঁজার প্রয়োজন নেই।"
রজনী সেন বললেন, "কিন্তু ব্যোমকেশদা, আমাদের কাছে তো কোনো ওয়ারেন্ট নেই।"
ব্যোমকেশ উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল, "ওয়ারেন্ট পরে হবে। আগে একটা মেয়ের জীবন বাঁচাতে হবে। চলো।"
গাড়ি চলতে চলতে ব্যোমকেশ বলল, "অজিত, নোট করো।
এক: তন্বীকে এখানে আনা হয়েছিল শুধু আমাদের ভুল পথে চালানোর জন্য।
দুই: নুপুর আর মেঝের লেখা প্রমাণ করে ও নিজে ক্লু রেখে গেছে।
তিন: আসল মাথা দিব্যেন্দু সোম। ও সুশোভনকে দিয়ে কাজ করিয়েছে। কিন্তু ও নিজে আড়ালে ছিল।"
"কিন্তু কেন?" আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"কারণ ও চায় সবাই ভাবুক সুশোভন দোষী। আর ও নির্দোষ। পাঁচ কোটি দিয়ে পুঁথি কিনে নেবে। সাধু সাজবে।"
আমি দেখলাম, প্রবল ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ব্যোমকেশের গলা রীতিমতো কাঁপছে।
আধ ঘণ্টা পর আমরা বিধানবাগান পৌঁছলাম।দৃশ্য আট
পুলিশের জিপে করে প্রায় আধ ঘণ্টা পর আমরা বিধানবাগান পৌঁছলাম।এই নির্জন রাস্তায় নির্দিষ্ট জায়গা টা খুঁজে পেতে অনেকটা সময় লেগে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজি পর অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম বিশাল পাটকলটির সামনে। আমরা সামনে পৌঁছে দেখলাম, পাটকলের গেটে তালা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু চিমনির ফাঁক ফোকর দিয়ে ভেসে আসছে একটা হলুদ রঙের আলো।
"লাইট অফ করো।" ব্যোমকেশ বলে উঠল।
আমরা এক এক করে গাড়ি থেকে নামলাম। তারপর পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কিন্তু ভিতরে পৌঁছতেই আমরা বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি একেবারেই সুবিধার নয়। প্রতিপক্ষ একেবারে কোমর বেঁধে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে যেকোনো মোকাবিলা র জন্য।
ভেতরে চার পাঁচজন গুন্ডা পাহারা দিচ্ছে। ওদের হাতে রয়েছে মোটা লাঠি। ওরা তিন নম্বর শেড পাহারা দিচ্ছে। ব্যোমকেশ ইশারা করতেই রজনীর লোকেরা এই পাটকল টা চারদিক থেকে ঘিরে ধরার উদ্যোগ করতে শুরু করল।
একটা গুন্ডা হঠাৎ আসন্ন কোনো বিপদের গন্ধ পেয়ে
চিৎকার করে হাঁক দিয়ে উঠল, "কে?"
রজনী সেন বলে উঠলেন,"আমরা পুলিশ!তোমরা সবাই আত্মসমর্পণ করো। আমরা তন্বী র খোঁজে এখানে এসেছি। তন্বী কে যত তাড়াতাড়ি তোমরা আমাদের হাতে তুলে দেবে,তত তোমাদের পক্ষে মঙ্গল!
কিন্তু না,ওরা আত্মসমর্পণের ধারপাশ দিয়েও গেল না। নিমেষের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল লড়াই। লাঠি, গুলি, চিৎকার আর ধস্তাধস্তি আরম্ভ হয়ে গেল দুই পক্ষের ভিতরে। ওদিকে আমাদের কানে ভেসে উঠল তন্বী র কাতর আকুতি পূর্ণ কন্ঠ..."কাকু... দয়া করে আমাকে বাঁচান!"
পুলিশ যাতে কোনোমতে ভিতরে না পৌঁছতে পারে, তার চেষ্টাতেই যে এরা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে,এটা আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম।
ব্যোমকেশ নিমেষের মধ্যে দুইজনকে কাবু করল। পুলিশ বাহিনী মোটামুটি দশ মিনিটে সবাইকে কাবু করে ফেলল।
তারপর আমরা সবাই শেডের দরজা ভাঙলাম। ভেতরে ঢুকেই আমরা থমকে গেলাম। ঘরের মাঝখানে রয়েছে একটা চেয়ার। আর চেয়ারের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে একটা পুতুল। পুতুল টির মাথায় রয়েছে পরচুলা। আর গায়ে রয়েছে তন্বীর কলেজের ইউনিফর্ম। আর সামনে রয়েছে একটা টেপ রেকর্ডার। সেখানে তন্বীর গলা বাজছে: "কাকু... আমাকে বাঁচান...!"
আমি থমকে গেলাম। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। এতক্ষণ যে জায়গাটাকে আমরা তন্বীর শেষ আশ্রয় ভেবেছিলাম, সেটাও আসলে একটা ফাঁদ! একটা সাজানো মঞ্চ শুধু!
রজনী সেন টর্চের আলোটা পুতুলের মুখে ফেললেন। প্লাস্টিকের পুতুল। গালে লাল লিপস্টিক দিয়ে তন্বীর মতো তিল আঁকা। কিন্তু কলেজের ইউনিফর্মটা আসল, পুতুল টা একেবারে ফাঁপা।ভিতরে খড় ভরা রয়েছে। পুরোনো ফিলিপসের টেপ রেকর্ডারটা ক্রমাগত বাজছে।ক্যাসেটটা ক্রমাগত ঘুরে চলেছে, আর ওই আর্তনাদটা বারবার বাজছে। আমরা অচিরেই অনুমান করতে পারলাম, তন্বী র গলা চিরে নির্গত হওয়া আর্তনাদ ও তার কন্ঠস্বর টা কেউ আগে থেকে রেকর্ড করে রেখেছে।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম,এই দৃশ্য দেখে ব্যোমকেশের ভিতরে রাগ বা উত্তেজনার লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না। ও ধীরে ধীরে ঘরের চারদিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো শিকারি বিড়ালের মতো জ্বলছে।
ব্যোমকেশ ফিসফিস করে বলল,
"রজনী, আলো নিভিও না। কেউ নড়বে না।"
আমি বলে উঠলাম,
"কেন?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"দেখো, অজিত।এই মেঝেটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখো।"
আমি সাথে সাথে নিচে তাকালাম। দেখলাম ,মেঝেটা সিমেন্টের তৈরি। কিন্তু পুতুলের চেয়ারের চারপাশে চারটে নতুন পেরেকের দাগ। পেরেকগুলো এখন নেই, কিন্তু ওই পেরেকের গর্তগুলো রয়েছে। আর সেই গর্ত থেকে একটা সরু তার বেরিয়ে গেছে দেওয়ালের দিকে। তারটা কুচকুচে কালো।ওটা ধুলোর সাথে এমনভাবে মিশে আছে, যে ওটা খালি চোখে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই।
ব্যোমকেশ তারটা ধরে ধরে এগোল। তারটা গিয়ে মিশেছে দরজার পিছনে রাখা একটা লোহার ড্রামের সাথে। ড্রামের ওপরটা ঢাকা, কিন্তু তার ভিতর থেকে একটা খুব মৃদু টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে।
আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। আমি আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠলাম,
"বোমা?"
ব্যোমকেশ হাঁটু গেড়ে বসল।ও ড্রামের ঢাকনা টা সরাল না, শুধু কান পাতল। তারপর নাক টানল।
তারপর চাপা স্বরে বলে উঠল,
"না অজিত। এটা বোমা নয়।এটা আসলেই কেরোসিন, আর ব্যাটারি। এই পুরো জিনিসটা আসলে একটা ফাঁদ। পুতুল কে ধরলে বা পুতুলের এই টেপ রেকর্ডার টা বন্ধ করলেই তারে টান পড়বে,আর তারপর এই ড্রামটা উল্টে যাবে, তারপর কেরোসিন ছড়িয়ে এখানে আগুন লেগে যাবে। ওরা চেয়েছিল আমরা তন্বী ভেবে পুতুলকে ধরব, আর তার ফলপ্রসূ এই পুরো শেডটা জ্বলে যাবে। আর সেই সাথে ওদের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।"
একটা ঠান্ডা স্রোত আমার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেল। এতখানি নিখুঁত একটা পরিকল্পনা!
"তাহলে তন্বী এখানে নেই?" একজন কনস্টেবল বলল।
"ছিল।" ব্যোমকেশ পুতুলের ইউনিফর্মটা তুলল। পকেট থেকে বেরলো একটা ছোট্ট ক্লিপ। মেয়েদের চুলের ক্লিপ। আমি দেখলাম, সেখানে লেগে রয়েছে একটা লম্বা চুল।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"এটা তন্বীর। ও এই ইউনিফর্মটা পরে ছিল। ওরা ওকে এখানে বসিয়ে ওর ওপর নির্যাতন করে ওর কন্ঠস্বর ও আর্তচিৎকার টা রেকর্ড করেছিল, তারপর ইউনিফর্ম খুলে এই পুতুলকে পরিয়েছে।"
ব্যোমকেশ এবার ইউনিফর্মটা নাকের কাছে নিল। "ঘাম, আর... মাটির গন্ধ। এঁটেল মাটি।
তারপর বলে উঠল,"বিধানবাগানের এই শেডে এঁটেল মাটি নেই। এখানে বালি মাটি। এঁটেল মাটি আছে জলতলার দিকে।"
আমি চমকে উঠলাম। আবার সেই জলতলা।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা শিসের শব্দ শোনা গেল। তিনবার শিসের শব্দ শোনা গেল। ইন্সপেক্টর রজনী সেন বলে উঠলেন,"আমাদের সিগন্যাল বাজছে।যাই গিয়ে দেখি কি হল।"
রজনী ছুটে বাইরে গেলেন। এরপর দু মিনিট পর হাঁপাতে হাঁপাতে এখানে ফিরে এসে তিনি বললেন,
"ব্যোমকেশদা, বাইরের গুন্ডাদের মধ্যে একজন গুন্ডা মুখ খুলেছে। ও বলছে, মেয়েটাকে আধ ঘণ্টা আগেই এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। একটা কালো ভ্যানে করে নিয়ে গেছে,আর ওই ভ্যানটা গেছে জঙ্গলের দিকে।"
"কোন জঙ্গল?" ব্যোমকেশ জিজ্ঞেস করল।
রজনী সেন উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলেন,
"এই পাটকলের পিছনেই। যে জঙ্গলটা জলতলা খাল পর্যন্ত গেছে। প্রায় দুই কিলোমিটার জঙ্গল। ভিতরে পুরনো ইটভাটা আছে।"
ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল। তারপর বলে উঠল,"তাহলে তো আর দেরি করা যায় না। রজনী, তুমি এই শেডটা ঘিরে রাখো। বোম্ব স্কোয়াডকে খবর দাও। এই তারে কিন্তু একদম হাত দেবে না। আমি আর অজিত জঙ্গলে ঢুকছি।"
রজনী বললেন,"ঠিক আছে, তবে এখন ই যাওয়া যাক।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"না। তুমি এখানেই থাকো। তুমি এখানে থাকলে ওরা ভাববে আমরা এখনো এখানেই আছি। তুমি বরং আমাদের সাথে তোমার দুজন লোক দাও। আমরা একদম নিঃশব্দে যাব।"
আমরা আর দেরি না করে, বেরিয়ে পড়লাম।
পাটকলের পিছনের দেওয়াল টপকে অবশেষে আমরা ওই জলা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকলাম। আমি, ব্যোমকেশ, আর দুজন কনস্টেবল , হারাধন আর নিতাই। ওদের হাতে রয়েছে লাঠি। আমাদের হাতে রয়েছে টর্চ। কিন্তু
ব্যোমকেশ আমাদের কোনোরকম আলো জ্বালাতে নিষেধ করে দিয়েছে।তাই আমরা টর্চ বন্ধ রেখেছি।
এই গভীর রাতের অন্ধকারে এই জঙ্গলটা বেশ ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল,বিপদ যেন আমাদের সাথে সাথে পা টিপে টিপে চলছে ভয়ঙ্কর কোনো দুরাভিসন্ধি নিয়ে। আমার মনে হল,দিনের বেলাতেও বোধহয় এখানে আলোটালো ঢোকে না। বাবলা, শিশু, আর হোগলা গাছে ভর্তি এই জঙ্গল টা। নিচে রয়েছে হাঁটু পর্যন্ত কচুরিপানা আর কাদা। আর মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে একটা সরু আলপথ। সেই আলপথে ভ্যানের টায়ারের দাগ স্পষ্ট। পূর্ণিমার চাঁদের ঝলমলে আলোয় ওই আমি দেখলাম,ওই দাগ যেন একদম টাটকা। যেন কিছুক্ষণ আগেই এই দাগ পড়েছে এই আলপথের ওপরে।
আমরা প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর দেখতে পেলাম,একটা ইটভাটার ধ্বংসস্তূপ।ওই ইঁট ভাটার চিমনিটা ভাঙা, কিন্তু ভাটার পাশে কাদায় পড়ে রয়েছে আরেকটা জিনিস, যেটা ব্যোমকেশের চোখ এড়াল না।
কাদায় পড়ে রয়েছে একটা ভাঙা চশমা।
ব্যোমকেশ ঝুঁকে চশমা টা তুলল। তারপর আনমনে বলে উঠল,"এটা মেয়েদের চশমা। তন্বীর চোখে পাওয়ার আছে, অমরেশবাবু বলেছিলেন।"
আমি উল্লসিত হয়ে বলে উঠলাম,"তার মানে আমরা ঠিক পথেই যাচ্ছি।"
আরো প্রায় একশো মিটার এগোতেই আমরা একটা ভ্যান দেখতে পেলাম। কালো অ্যাম্বাসাডর নয়, একটা পুরনো ম্যাটাডোর ভ্যান। ভ্যান টা কাদায় আটকে গেছে। গাড়িটার ভিতরে ড্রাইভার নেই।ভ্যানটার পিছনের দরজা খোলা রয়েছে। আমি ভালো করে লক্ষ্য করলাম, গাড়ির ভিতরে রয়েছে একটা জলের বোতল, একটা দড়ি, আর একটা ওড়না। নীল ওড়না।
"ওরা ভ্যান ছেড়ে হেঁটেছে।" ব্যোমকেশ বলল। তারপর গাড়ি র ভিতরটা আর সেই সাথে চারপাশটায় ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে তারপর বলে উঠল,
"ওরা ওড়নাটা ইচ্ছে করে ফেলে গেছে, যাতে আমরা ভ্যানের দিকে মনোযোগ টা রাখি। কিন্তু ওই পায়ের ছাপগুলো ভালো করে দেখো।"
আমি দেখলাম। ভ্যান থেকে তিনজনের পায়ের ছাপ জঙ্গলের আরও গভীরে গেছে। একটা পায়ের ছাপ দেখে মনে হল,ওই পায়ের ছাপ যার, তাকে রীতিমতো জোরজবরদস্তি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আমি বলে উঠলাম,"ব্যোমকেশ, আমার মনে হয়,আমরা তন্বী র খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,"এখন ই এত উত্তেজিত হয়ো না অজিত, মেয়ে টা কিন্তু এখনো বিপদে রয়েছে। যত তাড়াতাড়ি আমাদের ওর কাছে পৌঁছতে হবে। ওকে অপহরণকারীদের কাছ থেকে আমাদের উদ্ধার করতে হবে।"
আমরা আরো সামনে এগোতে থাকলাম।
জঙ্গল যত গভীরে ঢুকছি, শব্দ তত বাড়ছে।ঝিঁঝিঁ পোকা আর ব্যাঙের ডাক এ চারপাশের বাতাস যেন একেবারে সরগরম।হঠাৎ আমরা দেখলাম,সামনে একটা আলো জ্বলছে। টিমটিমে হ্যারিকেনের আলো।
আমরা একটা গাছের আড়ালে থামলাম। তারপর আড়াল থেকে দেখলাম,সামনে রয়েছে একটা ফাঁকা জায়গা। জায়গাটার মাঝখানে রয়েছে একটা বিশাল বটগাছ। বটগাছের ঝুরি নেমে একটা ঘরের মতো তৈরি করেছে। আর সেই ঝুরির ভিতরে বসে রয়েছে তিনজন লোক। তাদের মধ্যে দুজন লোক বসে বিড়ি খাচ্ছে, একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের মাঝখানে মাটিতে শুয়ে রয়েছে একটা মেয়ে। মেয়েটার হাত-পা বাঁধা রয়েছে।
তন্বী!
আমার বুক ধড়ফড় করে উঠল। ব্যোমকেশ আমার হাত চেপে ধরল। তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল , এখানে তিনজন রয়েছে। একজনের কাছে বন্দুক আছে, আর এখানে ওদের আরো একজন রয়েছে।সে বসে রয়েছে গাছের ডালে।
আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তো, ব্যোমকেশ একদম ঠিক দেখেছে। গাছের ডালে ওদের একজন বসে চারদিকে নজর রাখছে সন্তর্পনে...!
আমরা বুঝলাম, এটাই আসল তন্বী কে অপহরণ করে রাখার আসল জায়গা। ওই শেডটা ছিল কেবলমাত্র ধোঁকা, ওদের আসল ঘাঁটি হল এইটা।
ব্যোমকেশ পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি বের করল। ব্যোমকেশের হাতের ওই শিশিটা আমি চিনি।ওটা ক্লোরোফর্ম নয়, ওটা আসলেই তীব্র ঝাঁঝালো একটা গন্ধওয়ালা একটা জিনিস,যার ঢাকনা খুলে মানুষের মুখের সামনে চোখ জ্বালা করে। ওই শিশি টা হাতে নিয়ে ব্যোমকেশ হারাধনকে ইশারা করল। হারাধন সাথে সাথেই ব্যোমকেশের ইশারা বুঝে ফেলল।ও একটা শুকনো ডাল ভেঙে দূরের ঝোপে ফেলল।
সাথে সাথে মচাৎ করে একটা শব্দ হল।আর তার ফলপ্রসূ গাছের ওপরে বসে থাকা ওই লোকটা ভীষণভাবে চমকে উঠল। সে চিৎকার করে বলে উঠল,"কে? কে ওখানে?"এই বলে সে টর্চ জ্বালল সেই দিকে।
সেই এক সেকেন্ডের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ব্যোমকেশ বটগাছের অন্য দিক দিয়ে উঠে গেল। আমি দেখতেও পেলাম না ও কিভাবে উঠল। একটা ঝুরি ধরে বিদ্যুতের গতিতে ওপরে উঠে গিয়ে,পিছন থেকে লোকটার মুখে রুমাল চাপা দিল। তারপর শুরু হল প্রচন্ড ধস্তাধস্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লোকটা ব্যোমকেশের সাথে পেরে উঠল না।সে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।ওর হাতে ধরা বন্দুকটা নিচে পড়ে গেল। কিন্তু ওটা কাদায় এমনভাবে পড়ল যে কোনোপ্রকার শব্দ হল না।
নিচের দুজন লোক তখনও এসবের কিছুই টের পায়নি। একজন হঠাৎ বলে উঠল, "কি হল উপরে? কিছু একটা যেন গন্ডগোল লাগছে।"
ওর কথা শেষ হতে না হতেই ওই লোকটা ব্যোমকেশের বজ্র মুষ্ঠি আলগা হওয়ার ফলপ্রসূ লাফিয়ে পড়ল ওদের মাঝখানে। একজনের ঘাড়ে পড়ল একটা রদ্দা।যার ওপর পড়ল, সেই লোকটা কাত হয়ে পড়ল। দ্বিতীয়জন এবার চিৎকার করে লাঠি তুলেছিল, সাথে সাথেই হারাধন আর নিতাই ছুটে গিয়ে তাকে জাপটে ধরল।
এই পুরো ব্যাপারটা ঘটল মাত্র তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে। কোনো গুলি চলল না, কোনো চিৎকার হল না। শুধু চলল কাদায় ধস্তাধস্তি যুদ্ধ।
আমি ততক্ষনে ছুটে গিয়ে তন্বীর মুখের কাপড় খুলে দিলাম।
তন্বী চোখ খুলল। প্রথমটায় ও ভীষণ ভয় পেল, তারপর আমাকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। বলে উঠল,"আপনি... অজিতবাবু?"
আমি বলে উঠলাম,
"হ্যাঁ তন্বী। তোমার আর কোনো ভয় নেই।"
এরপর আমি ওর হাত-পায়ের দড়ি খুলে দিলাম। টানা তিন দিন ধরে ওর অবস্থা পড়ে থাকার ফলপ্রসূ ওর হাল এতটাই শোচনীয় হয়ে উঠেছিল,যে বেচারি উঠে বসতে পারছিল না।
ব্যোমকেশ নিচে নেমে এসে বলে উঠল,"তন্বী, তুমি হাঁটতে পারবে তো?"
তন্বী ঘাড় নাড়ল। বলে উঠল,"পারব। কিন্তু... কিন্তু ওরা... ওরা বলেছিল দাদুকে মেরে ফেলবে। দাদু ঠিক আছেন তো?"
"কেউ তোমার দাদু বা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।"
ব্যোমকেশ ওর মাথায় হাত রেখে ওকে অভয় দিয়ে বলে উঠল। তারপর চাপা স্বরে বলে উঠল,"আচ্ছা তন্বী,এই জঙ্গলে আর কেউ আছে?"
তন্বী বলল, "না। শুধু এই তিনজন। আর একটা লোক আছে, যে গাড়ি চালায়। সে ভ্যান নিয়ে পালিয়েছে।"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"দিব্যেন্দু সোম কোথায়?"
তন্বী হঠাৎ কেঁপে উঠল নামটা শুনে। তারপর বলে উঠল,"ওই...ওই লোকটাই... ওই লোকটাই সব করিয়েছে। ও আমাকে বলেছিল, দাদু ওকে পুঁথিটা দিলেই ও আমাকে ছেড়ে দেবে।"
ব্যোমকেশ এবার চোখ বন্ধ করল।ও তন্বী কে
আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। এরপর আমি আর ব্যোমকেশ তন্বীকে ধরে তুলে দাঁড় করালাম। তারপর কাদা, বৃষ্টি, অন্ধকার সব পেরিয়ে আমরা জঙ্গল থেকে বেরোতে শুরু করলাম।
পিছনে হারাধন আর নিতাই তিনটে গুন্ডাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে আনছে।
জঙ্গলের বাইরে এসে দেখলাম, রজনী সেনের ফোর্স পুরো জঙ্গলটা ঘিরে ফেলেছে। মশাল, টর্চ, পুলিশের গাড়ির আলোয় রাতটা দিন হয়ে গেছে।
তন্বীকে দেখে রজনী ছুটে এলেন। "অবশেষে তন্বী কে উদ্ধার করে আনতে পারলেন?"
ব্যোমকেশ তন্বীকে জিপে বসাল। তারপর ওর গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে দিল। তন্বী তখনও ভয়ে...তীব্র আতঙ্কে রীতিমতো কাঁপছে।
তন্বীকে দেখে রজনী ছুটে এলেন। "অবশেষে তন্বীকে উদ্ধার করে আনতে পারলেন?"
ব্যোমকেশ তন্বীকে জিপে বসাল। তারপর ওর গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে দিল। তন্বী তখনও ভয়ে, তীব্র আতঙ্কে রীতিমতো কাঁপছে। কিন্তু ওর চোখে এখন আর শুধু ভয় নেই, আছে একটা অদ্ভুত জেদ।
"ব্যোমকেশদা," রজনী ফিসফিস করে বললেন, "মেয়েটাকে হাসপাতালে পাঠাই? ওর অবস্থা ভালো না।"
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়ল। "না। এখনই না। ওকে হাসপাতালে পাঠালে দিব্যেন্দু সোম টের পেয়ে যাবে আমরা ওর অপকীর্তি জেনছ গিয়েছি।আর ও যদি কোনোভাবে জানতে পারে, আমরা এখন ওকে ধরার চেষ্টা করছি,ও তখন সাথে সাথে কলকাতা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, "মানে? দিব্যেন্দু সোম এখন কোথায়? আমরা তো ভেবেছিলাম ও নিখোঁজ।"
ব্যোমকেশ জিপের হেডলাইটের দিকে তাকিয়ে ছিল। আলোটা কুয়াশায় কাঁপছে। ও বলল, "দিব্যেন্দু সোম এর এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা টা আসলেই একটা সাজানো নাটক। দিব্যেন্দু সোম নিখোঁজ হয়নি, অজিত। ও নিজেকে নিখোঁজ ও ভুক্তভোগী সাজিয়ে রেখেছে, যাতে সব সন্দেহ সুশোভনের ওপর পড়ে। কিন্তু ও ভুলে গেছে, শিকারি যতই চালাক হোক, কোনো না কোনোভাবে তার কোনো ভুল সামনে এসেই যায়।"
এই বলে ও পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। সেটা আমরা বিধানবাগানের শেডের পুতুলের পকেট থেকে পেয়েছিলাম। কাগজটা তন্বীর ইউনিফর্মের পকেটে ছিল। ওই কাগজ টা এবার খুলে ধরল ব্যোমকেশ। আমি তাতে ঝুঁকে পড়ে দেখলাম,ওটা তন্বীর হাতের লেখা কোনো চিঠি নয়, বরং ওতে একটা অদ্ভুত লেখা টাইপ করা রয়েছে ।"ডি. সোম - লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজ - সত্তর লাখ - সুদ - দলিল।"
"এটা কি?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"এটাই হল সেই সুতো,যে সুতো দিয়ে দিব্যেন্দু সুশোভনকে নাচিয়েছে।" ব্যোমকেশ বলল। "চলো, এবার জিপে ওঠা যাক। তন্বীকে অমরেশবাবুর বাড়ি পাঠিয়ে আমরা দমদম যাব।"
আমি বলে উঠলাম,
"দমদম? কেন?"
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"কারণ দিব্যেন্দু সোমের আসল অফিস কালীঘাটে নয়। ওর কালো টাকার অফিস দমদমের একটা পুরনো গ্যারেজে। সুশোভন সেখানে যাতায়াত করত। এটা আমি চিন্ময় বাবু র কাছে জানতে পারি।
দৃশ্য নয়
রাত তখন প্রায় তিনটে। কলকাতা শহর ঘুমোচ্ছে, কিন্তু দমদমের ওই গ্যারেজটা জেগে আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পরিত্যক্ত লরি সারানোর দোকান। ভিতরে একটা হলুদ বাল্ব জ্বলছে।
আমরা জিপটা দূরে রেখে হেঁটে এলাম। আমি, ব্যোমকেশ, রজনী আর চারজন সশস্ত্র কনস্টেবল। তন্বীকে আমরা অমরেশবাবুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি হরিমোহনের স্ত্রীর সাথে।
গ্যারেজের সামনে একটা কালো অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই গাড়িটা, যেটা সুরঞ্জন দেখেছিল। নম্বর প্লেটে কাদা লাগানো, কিন্তু পিছনে "লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজ" স্টিকারটা এখনো আছে।
ব্যোমকেশ কান পাতল দরজায়। ভিতর থেকে দুটো গলা শোনা যাচ্ছে।
একটা গলা উত্তেজিত, "আমি আর পারব না, দিব্যেন্দুদা। পুলিশ সুশোভনকে ধরে ফেলেছে। এবার আমার পালা।"
অন্য গলাটা ঠান্ডা, ভারী। "চুপ কর, চিন্ময়। সুশোভন ধরা পড়েছে বলেই তো তোমার ভয়!ও কিছুতেই মুখ খুলবে না। ওর বউ-বাচ্চা আমার হাতে।"
ব্যোমকেশ চোখ টিপল। চিন্ময় বাবু! অমরেশবাবুর ম্যানেজার। যে বিমলা আর নিমাইকে কাজে ঢুকিয়েছিল।
ইন্সপেক্টর রজনী সেন এবার আর দরজায় টোকা দিলেন না। একেবারে এক লাথিতে দরজা ভেঙে ঢুকলেন। তারপর ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠলেন,"পুলিশ! হ্যান্ডস আপ!"
আমরা ঘরের ভিতরে ঢুকে এলাম। আমি দেখলাম,এই ঘরের ভিতরে রয়েছে দুজন লোক। একজন চিন্ময় বাবু,ম্যানেজার। আর একজন মোটা, টাক মাথা, দামি পাঞ্জাবি পরা লোক। হাতে মোটা সোনার আংটি। এই লোকটাকেই আমি ছবিতে দেখেছি। দিব্যেন্দু সোম।
দিব্যেন্দু এক সেকেন্ড থমকাল, তারপর টেবিলের ড্রয়ারের দিকে হাত বাড়াল। ব্যোমকেশ তার আগেই টেবিলটা উল্টে দিল। ড্রয়ার থেকে একটা রিভলবার ছিটকে পড়ল মাটিতে।
এরপরেই শুরু হল ধস্তাধস্তি। চিন্ময় বাবু পালাতে গিয়ে হারাধনের হাতে ধরা পড়লেন। দিব্যেন্দু লম্বা মানুষ, গায়ে বেশ ভালোই জোর আছে। সে রজনীকে ধাক্কা দিয়ে জানলার দিকে ছুটল। এবার আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওর ওপরে। দুজনে মিলে কাদায় গড়াগড়ি খেতে শুরু করলাম। শেষে ব্যোমকেশ এসে ওকে ধরে ফেলল। প্রচন্ড ক্রোধে দিব্যেন্দু সোম তখন ক্ষ্যাপা সিংহের ন্যায়ে ফুঁসছে! রজনী সেন এবার এগিয়ে এসে
ওর হাতে হাতকড়া পরালেন।
গ্যারেজের ভিতরটা তখন লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। টেবিল উল্টে, কাগজ যত্রতত্র ছড়িয়ে এক্কেবারে বেহাল অবস্থা।
ব্যোমকেশ এবার টর্চ জ্বেলে কাগজগুলো দেখতে লাগল।
এরপর ব্যোমকেশের হাতে এল একটা খাতা।ভ্রূ কুঁচকে ব্যোমকেশ খাতাটা খুলল। আমিও ওই খাতাটা দেখতে থাকলাম মনোযোগ সহকারে। দেখলাম,ওতে লেখা রয়েছে,"সুশোভন লাহিড়ী - ধার -সত্তর লক্ষ টাকা - সুদ মাসে দশ শতাংশ- জামানত - লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার।"
এরপর ব্যোমকেশ আরেকটা খাতা খুলল। তাতে লেখা,"কালচক্র - দুবাই পার্টি - অগ্রিম দুই কোটি - ডেলিভারি পনেরোই ভাদ্র।"
এরপর বেরোল আর একটা ছোট ডায়েরি ।এতে দিব্যেন্দু সোমের নিজের হাতে লেখা রয়েছে কিছু ভয়ঙ্কর সত্য।"
দুই ভাদ্র
এখন আমি অনেক টা চিন্তা মুক্ত। এমন ছক সাজিয়েছি,যে পুলিশের বাবাও আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।সুশোভনকে দিয়ে কিডন্যাপ করালে সন্দেহ ওর ওপর পড়বে। আমি নিখোঁজ সাজব। পুঁথি হাতে পেলে সুশোভনকে পুলিশে ধরিয়ে দেব। ও জেলে যাবে,আর আমি পা রাখববিদেশে। সেখানে শুরু করব একটা দারুন ঝলমলে জীবন।"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তাহলে এই হল আসল খেলা!
রজনী সেন বলে উঠলেন, "ব্যোমকেশদা, এ তো পরিষ্কার ব্ল্যাকমেইল।"
ব্যোমকেশ বলল, "হ্যাঁ। সুশোভন লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজের ডিরেক্টর, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ও পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপুরে ওর একটা আলাদা ফ্যাক্টরি ছিল, সেখানেও অপরীমেয় লোকসান হয়েছে ওর।ও সত্তর লাখ টাকা ধার নিয়েছিল দিব্যেন্দুর কাছ থেকে, চড়া সুদে। কিন্তু শোধ করতে পারেনি। দিব্যেন্দু তখন ওকে বলে - টাকা শোধ করতে হবে না, তুমি শুধু একটা কাজ কর। তন্বীকে কিডন্যাপ করে কালচক্রটা এনে দাও। পুঁথিটা দুবাইয়ে বিক্রি হবে পাঁচ কোটি টাকায়।"
"আর সুশোভন রাজি হয়ে গেল?" আমি অবাক হয়ে বললাম।
ব্যোমকেশ বলে উঠল,
"রাজি না হয়ে উপায় কি? দিব্যেন্দুর হাতে ওর সই করা দলিল। ওই দলিল অমরেশবাবুর হাতে গেলে সুশোভনের চাকরি যাবে, জেল হবে, মেয়ে-বউ নিয়ে ওকে রাস্তায় বসতে হবে। আর জামাই হয়ে শ্বশুরের কাছে সরাসরি হাত পাততেও ওর সম্মানে বেঁধেছিল নিশ্চয়ই।তাই শেষমেষ এই বাঁকা পথ ধরতে বাধ্য হয়েছে সুশোভন।তাই ও তন্বী র অপহরণের এই নাটকে পুরোপুরি পুতুল হয়ে গেল। আর দিব্যেন্দু ওকে সামনে রেখে নিজে আড়ালে রইল।"
তখনই চিন্ময় বাবু কেঁদে উঠলেন।বলে উঠলেন"বিশ্বাস করুন, আমি কিছু করিনি। দিব্যেন্দুবাবু আমাকে বলেছিলেন বিমলা আর নিমাইকে বাড়িতে ঢোকাতে। ওরা ওর লোক। ওরা খবর দিত কখন তন্বী বেরোয়, কখন লকার খোলে। আমি শুধু..."
"তুমি শুধু সুতো টানতে?" ব্যোমকেশ বলে উঠল।
এরপর এই গ্যারেজের পিছনে তালা দেওয়া একটা ছোট ঘরের দিকে আমরা এগিয়ে গেলাম।ওই তালা ভাঙার তোড়জোড় শুরু হল।তালা ভাঙতেই আমরা প্রবেশ করলাম একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে বদ্ধ কুঠুরির মতো একটা ঘরের ভিতরে। সেখানে পাওয়া গেল একটা স্টিলের আলমারি। আলমারি খুলতেই বেরলো আসল জিনিস টা।কালচক্রের মতো দেখতে একটা নকল পুঁথি, একটা টেপ রেকর্ডার, আর এক বান্ডিল টাকা।
আর আলমারির নিচে লুকানো একটা চিঠি। অমরেশবাবুর কোম্পানির প্যাডে লেখা, কিন্তু সই সুশোভনের। তাতে লেখা - "আমি স্বেচ্ছায় লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজের আমার সব শেয়ার দিব্যেন্দু সোমকে বিক্রি করলাম।"
ব্যোমকেশ চিঠিটা রজনীর হাতে দিল। "দেখলে? দিব্যেন্দুর প্ল্যান ছিল দুটো। এক - কালচক্র বেচে কোটি টাকা। দুই - সুশোভনকে ফাঁসিয়ে লাহিড়ী ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার হাতানো। এক ঢিলে দুই পাখি।"
দিব্যেন্দু সোম ততক্ষণে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় মাটিতে বসে পড়েছে। তাঁর মুখ নিচু। কিন্তু ওঁর চোখে তখনো রাগের আভাস জাজ্বল্যমান।
ব্যোমকেশ ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "দিব্যেন্দুবাবু, আপনি খুব চালাক। নিখোঁজ হওয়ার নাটকটা ভালোভাবেই সাজিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি দুটো ভুল করেছিলেন।"
দিব্যেন্দু মুখ তুলল না।
ব্যোমকেশ ফের বলে উঠল,
"এক ,আপনি যে খাদি পেপারে চিঠি লিখেছিলেন, সেই একই পেপার আপনার এই গ্যারেজেও আছে। দুই - আপনি সুশোভনকে দিয়ে তন্বীকে কিডন্যাপ করালেন, কিন্তু তন্বী যে বাঁ হাতি, সেটা আপনি জানতেন না। তাই নকল মেয়ে মিতাকে সেখানে দড়ি বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসিয়ে একটা জম্পেশ নাটক সাজাতে গিয়েও শেষমেষ ধরা পড়ে গেলেন।"
বাইরে তখন আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। পুলিশের ভ্যানে দিব্যেন্দু আর চিন্ময় কে তোলা হল। সুশোভন তো আগেই লকআপে বন্দি হয়ে রয়েছে।
আমরা জিপে উঠলাম। সামনে কালীঘাটের বাড়ি, যেখানে অমরেশবাবু আর তন্বী অপেক্ষা করছে।
দৃশ্য দশ
পরদিন সকাল। কালীঘাটের লাহিড়ী ভিলায় রোদ উঠেছে। তিনটে দিন এমন ভয়ঙ্কর উদ্বেগ নিয়ে কাটানোর পর অবশেষে সব রহস্যের জট খুলে যাওয়ার সাথে সাথে আকাশটাও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। সোনালী রোদের সাথে সে নতুন দিনের উদযাপনে মেতে উঠেছে যেন।
তন্বী এখন বারান্দায় বসে আছে। ওর পায়ে ব্যান্ডেজ, হাতে গরম দুধের গ্লাস। অমরেশবাবু ওর পাশে বসে রয়েছেন, তাঁর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। আমি আর ব্যোমকেশ সামনে বসে রয়েছি।
রজনী সেন রিপোর্ট পড়ছেন - দিব্যেন্দু সোম আর তার ম্যানেজার চিন্ময় রায় গ্রেফতার হয়েছেন। দমদম গ্যারেজ থেকে উদ্ধার হয়েছে একটা জাল দলিল, সুদের খাতা আর দুবাইয়ের পার্টির সাথে চুক্তিপত্র। সুশোভনকে জামিন দেয়নি কোর্ট। হরিমোহন রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে।
অমরেশবাবু কাঁপা গলায় বললেন, "আমি তো ভেবেছিলাম সুশোভন লোভী। এখন বুঝছি ও শুধু লোভী নয়,ও একটা ভীতু। সত্তর লাখ টাকার দেনা, ব্যবসায় লোকসান, আর মেয়ের মুখ চেয়ে ও দিব্যেন্দুর পুতুল হয়েছিল।"
ব্যোমকেশ চুরুট ধরাল। বলল, "এটাই মরীচিকা, অমরেশবাবু। দূর থেকে মনে হয় জল, কাছে গেলে বালি। সুশোভন ভেবেছিল কালচক্র বেচে দেনা শোধ হবে, সম্মান বাঁচবে। কিন্তু ও বোঝেনি, দিব্যেন্দু ওকে দিয়ে শুধু পুঁথি নয়, আপনার কোম্পানির শেয়ারটাও লিখিয়ে নিতে চেয়েছিল। একটা অপরাধ আরেকটা অপরাধকে ডাকে।"
তন্বী বলে উঠল, "আর আমি? আমি যদি বাঁ-হাতে ওই কোডগুলো না লিখতাম?"
ব্যোমকেশ হাসল, তারপর বলে উঠল"তুমিই তো এই গল্পের আসল সত্যান্বেষী। নুপুরে 'স' লেখা, মেঝেতে 'তিন.ব.বা', পুতুলের পকেটে দলিলের ক্লু এইসব লেখার কথা ওই কঠিন পরিস্থিতিতেও তোমার মাথায় এসেছিল।তুমি ভয় পাওনি, তুমি পরিস্থিতি ও সমস্যা টাকে ঠান্ডা মাথায় ভাববার চেষ্টা করেছ। তাই ওই জঙ্গলও তোমাকে লুকোতে পারেনি।"
আমি ডায়েরি বন্ধ করলাম। বাইরে পুঁটিরাম হাঁক দিল, "চা রেডি।"
কালচক্রটা আবার লকারে ফিরে গেল। মখমলের কৌটোয়, ডাবল লকের সাথে। অমরেশবাবু বললেন, এবার ওটা মিউজিয়ামে দেবেন। ওটা একটা সম্পদ।ব্যক্তিগত লোভের জিনিস নয়।
আমরা হ্যারিসন রোডের মেসে ফিরছি। রিকশায় বসে ব্যোমকেশ বলল, "জানো অজিত, এই কেসে পুলিশ পুতুল ধরেছে, কিন্তু আসল সুতোটাই ধরতে সময় লাগিয়েছে।"
আমি বললাম, "সুতো মানে?"
"টাকার সুতো। যে সুতোয় মানুষ পুতুল হয়।"
সমাপ্ত
রশ্মিতা দাস
