STORYMIRROR

Rashmita Das

Crime Thriller

5  

Rashmita Das

Crime Thriller

জাহাঙ্গীরের পেয়ালায় রক্তের দাগ

জাহাঙ্গীরের পেয়ালায় রক্তের দাগ

52 mins
3




 দৃশ্য এক

 শীতটা বেশ জম্পেশ করেই পড়েছে। অজিতেশ গায়ে সোয়েটার টা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে রীতিমতো জবুথবু হয়েই বসেছে। সামান্য ঠান্ডা লেগে ওর গলাটা একটু ধরে গিয়েছে।ওই ধরা গলাতেই অজিতেশ হাঁক পেড়ে বলে উঠল,"কি গো... একটু চা পাওয়া যাবে?" রান্না ঘরের ভিতর থেকে বৌঠান একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,"সারা দিনে আর কত চা খাবে বলো তো? পেটের ভিতরে চায়ের পুকুর বানাবে নাকি?এই পর্যন্ত ক কাপ চা খেলে, তার কোনো খেয়াল আছে তোমার?" বৌঠানের ধমক খেয়ে অজিতেশ বাধ্য ছাত্রের মতো চুপ করে গেল। কিন্তু আমি হাত কামড়াতে বসলাম। কারণ,এই পর্যন্ত অজিতেশ অসংখ্য বার চা খেলেও, লেখালেখি তে ব্যস্ত থাকার দরুন, আমার কিন্তু এক‌ কাপ চা ও খাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার কৃষ্ণকুমারী লাল চোখ করে অজিতেশ কে যখন চা খাওয়া নিয়ে ধমক দিয়ে উঠল, তখন রাগান্বিত কৃষ্ণকুমারী কে আর ঘাঁটানোর সাহস হল না আমার।আর কি করা... অজিতেশ কে না দাও... অন্ততপক্ষে তোমার এই দেবরটিকে একটু তোমার হাতের গরম চা খাওয়াও...এ কথাটা মনের ভিতরে আকুলিবিকুলি করে উঠলেও, মুখে এসেই নিদারুণ ভাবে আটকে গেল। একরাশ দুঃখ নিয়ে আমি যখন অজিতেশের দিকে তাকালাম, অজিতেশ তখন খবরের কাগজের আড়ালে নিজের মুখ ঢেকে নিয়েছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে এখন রাত নেমে আসার উপক্রম হয়েছে। রামু কাকার একটু ঠাণ্ডা লেগেছে।তাই এখন ওকে আর চা বা পকোড়া বানাতে বলার কোনো উপায় নেই। কৃষ্ণকুমারী ওকে বিশ্রাম দিয়েছে।রাতের রান্না আগে থেকেই সে সেরে রেখেছে।অতএব আমি মনে মনে নিজের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম,"আজ আর কপালে কিছু ই জুটবে না।" ঠিক এমন সময়ে, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। আমি সাথে সাথে উঠে গিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার মনে একরাশ উচ্ছ্বাস।আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম, এখন এই অনাগত অতিথি র কল্যাণে আমার কপালেও গরম চা ঠিক ই ছুটে যাবে। দরজাটা খুলতেই, দরজার ওপারে যাকে দেখলাম তাকে দেখামাত্র আমি তো যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম। আমি একরাশ উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠলাম,"আরে সুবিনয়... এতদিন পর তোর এই হতভাগ্যের কথা মনে পড়ল? সেই কলেজের শেষ দিনের পর তো তোকে কত খুঁজেছি, এতদিন ধরে কোথায় গা ঢাকা দিয়ে ছিলি তুই?আয় আয়... ভিতরে আয়...!" কৃষ্ণকুমারী ভিতরের ঘর থেকে আরো কিছু সোয়েটার,চাদর বার করায় ব্যস্ত ছিল। দরজা‌ খোলার শব্দ পেয়ে সে ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে উঠল,"কে এসেছে সুজিত?" আমি বলে উঠলাম,"আমার কলেজের বন্ধু সুবিনয় ব্যানার্জি এসেছে গো বৌঠান।" অজিতেশ এতক্ষণে উঠে এসেছে দরজার কাছে।সে বলল,"নমস্কার সুবিনয় বাবু, আপনি বুঝি সুজিতের কলেজের বন্ধু? তাহলে তো আপনার সাথে আমার আড্ডা টা দারুন জমবে!এই কনকনে শীতের সন্ধ্যায় একটা জমাটি আড্ডার ই বড়ো দরকার ছিল। আপনি দাঁড়িয়ে কেন! ভিতরে এসে আমাদের সাথে বসুন।" আমি এতক্ষণে খেয়াল করলাম, সুবিনয়ের চোখে মুখে যেন ফুটে উঠেছে একটা চাপা আতঙ্কের ছাপ! কোনো এক অজানা দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা ওকে প্রচন্ডভাবে গ্রাস করেছে। আমি বলে উঠলাম,"আয় ভাই,বোস, তোর চোখমুখের চেহারা এমন হয়ে গিয়েছে কেন? কিছু হয়েছে?কি হয়েছে আমাকে খুলে বল... কিছু লুকোস না... লক্ষ্মীটি...! কোনো সমস্যা থাকলে আমরা দুজনে মিলে ঠিক কোন সমাধান বার করব! আমি এবার স্পষ্ট দেখলাম, আমার কথাগুলো শোনার পর যেন ও আরো যেন বেসামাল হয়ে পড়েছে।এই মাঘ মাসের তীব্র শীতেও ওর কপালে ফুটে উঠেছে শিশির বিন্দুর মতো ঘামের ফোঁটা। অজিতেশ এবার আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর সুবিনয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,"সুবিনয় বাবু, আপনি সুজিতের বন্ধু... মানে আপনি আমারো বন্ধু। আপনার যদি কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিঃসংকোচে আমাদের বলুন। আমরা আমাদের দিক থেকে যতটা সম্ভব হবে, আপনাকে সাহায্য করব।কথা দিলাম।" সুবিনয় ওর পাঞ্জাবি র পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে ওর কপালের ঘাম টা মুছে নিল। তারপর আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"ভাই সুজিত,আজ আসলে আমি অজিতেশ বাবুর শরণাপন্ন হওয়ার জন্য ই ছুটে এসেছি ‌রে। আমি তো চাকরি নিয়ে শহরের বাইরে ছিলাম এতদিন।আজ সকালেই আমি কলকাতায় ফিরলাম।আর আজ...এই কিছুক্ষণ আগেই আমার দাদা সুধাংশু সেন ওর নিজের স্টাডি রুমের ভিতরে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আমি আর দেরি না করে হ্যারিসন রোডের এই বাড়িতে ছুটে এলাম। আমি জানি,তুই আর অজিতেশ বাবু এই বাড়িতে একসাথে থাকিস। এখানে এলে অজিতেশ বাবুর দেখা পাব... সেই আশা নিয়েই আমি এখানে ছুটে এসেছি।" এতখানি বলে হাঁপাতে থাকল সুবিনয়। ঠিক তখনই কৃষ্ণকুমারী একটা ট্রে তে করে তিন কাপ চা নিয়ে এই ঘরে ঢুকল। তারপর বলে উঠল,"সুবিনয় বাবু, একটু চা খান।" সত্যি বলতে কি, এতক্ষণ ধরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের জন্য উচাটন হয়ে থাকা এই আমার মনটা, এখন এই চায়ের ট্রে টা দেখার পর আনন্দে বিগলিত হয়ে উঠল না একেবারেই।না... সুবিনয়ের এই দাদাটির সাথে আমার আলাপ নেই। তাঁকে আগে কোনোদিন দেখিওনি আমি। কিন্তু সুবিনয়ের এমন দুশ্চিন্তা গ্রস্থ অবস্থা দেখার পর, আমার মনটা ভীষন খারাপ হয়ে উঠল। অজিতেশ ওর কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল,"এই একটু আগেই তোমার দাদা মারা গিয়েছেন?তাও আবার তাঁর নিজের স্টাডি রুমের ভিতরে? কিভাবে মারা গেলেন তিনি? তোমার কি ধারণা... ওঁকে কেউ খুন করেছে?" সুবিনয় বলল," হ্যাঁ অজিতেশ বাবু, আপনি একদম ঠিক ধরেছেন। কেউ অতর্কিতে আমার দাদার স্টাডি রুমে ঢুকে, তার মাথা র পিছনে কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে...! অজিতেশ বলে উঠল,"সে কি? স্টাডি রুমে বসে থাকা অবস্থায় তোমার দাদা কে পিছন থেকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে?এ তো সাংবাদিক ঘটনা!" সুবিনয় বলে উঠল,""হ্যাঁ অজিতেশ বাবু,আর খুনির মোটিভ টা আমাদের সকলের কাছে একদম পরিষ্কার। আমার দাদা সুধাংশু ব্যানার্জি ভারত কলাভবনের একজন প্রাক্তন কিউরেটর ও মুঘল শিল্পকলা র ইতিহাসবিদ। জাহাঙ্গীরের একটা রত্নখচিত মদ্যপানের পাত্র, অর্থাৎ পেয়ালা নিয়ে তিনি নিজের স্টাডি রুমের ভিতরে বসে রিসার্চ করছিলেন।ওই সময়ে আমাদের ব্যানার্জি ভিলায় কেউই থাকে না বলতে গেলে। এমনিতে এই ব্যানার্জি ভিলায় বসবাস করার মতো সদস্য বলতে আমি, দাদা আর ভাইপো প্রবীর। অজিতেশ বলে উঠল,"তোমার ভাইপো আছে?" "হ্যাঁ অজিতেশ বাবু, আমাদের বড়দা সুবিমল ব্যানার্জি আর বড় বৌঠান অনেক বছর আগে একটা দুর্ঘটনায় মারা যান।বড়দা আমাদের থেকে অনেক বড়ো ছিলেন।কাজেই ওঁর ছেলে অর্থাৎ আমাদের ভাইপো প্রবীর একদম আমাদের কাছাকাছি বয়সের।যাই হোক, আমাদের এই ব্যানার্জি ভিলায় সদস্য বলতে এই আমরা তিনজন। আমি তো এতদিন কলকাতাতেই ছিলাম না।তাই দাদার জীবনের হালহকিকত সম্পর্কে আমি বড় একটা জানি না। যতদূর জানি,দাদা মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ থেকে রিসার্চ করার লিখিত অনুমতি নিয়ে পেয়ালা টা নিজের স্টাডি রুমে নিয়ে এসেছিল রিসার্চ করার জন্য।ওই পেয়ালা টা কেউ হাতানোর মতলব নিয়ে তক্কে তক্কে ছিল কিনা, সেটা আমি বলতে পারব না।আজ...এই একটু আগে দাদা র মৃতদেহের পাশ থেকে ওই পেয়ালা বেমালুম উধাও হয়ে গিয়েছে!কোনো আততায়ী, অতর্কিতে আমার দাদার স্টাডি রুমে ঢুকে পিছন থেকে মাথায় আঘাত করে দাদাকে হত্যা করে,ওই রত্ন খচিত পেয়ালা টা চুরি করে পালিয়ে গিয়েছে। অজিতেশ বাবু, আপনি দয়া করে একটিবার আমার সাথে ব্যানার্জি ভিলায় চলুন। দাদার হত্যাকারী কে খুঁজে বার করতে হবে।" অজিতেশ বলে উঠল,"সুবিনয়‌ বাবু, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি এক্ষুনি আপনার সাথে ব্যানার্জি ভিলায় যাব। সুজিত, তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে।" আমি বলে উঠলাম,"হ্যাঁ অজিতেশ, আমি এক্ষুনি তৈরি হয়ে নিচ্ছি।" সুবিনয় ভীত সন্ত্রস্ত চাহনিতে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে জানলার দিকে। আমি উঠে গিয়ে ওর পিঠে হাত রেখে বলে উঠলাম,"সুবিনয়, আমি আর ব্যোমকেশ আছি তোর পাশে। আমি এক্ষুনি তৈরি হয়ে আসছি।" দৃশ্য দুই ব্যানার্জি ভিলার ভিতরে ঢোকার পর থেকেই আমার মনের ভিতরে যেন খচখচ করে উঠছিল একটা চাপা অস্বস্তি ও একটা অদ্ভুত দোলাচল!এই এত বড় বাড়িটাতে এতদিন ধরে মাত্র দুজন মানুষ বসবাস করে এসেছে।সুবিনয়ের মেজো দাদা সুধাংশু ব্যানার্জি আর ভাইপো প্রবীর ব্যানার্জি। যতদূর শুনলাম,প্রবীর ব্যানার্জী একজন ব্যবসায়ী।ব্যবসার কাজে তাঁকে হামেশাই এখানে ওখানে যেতে হয়।কাজেই এই এতবড় প্রাসাদের মতো বাড়িখানা সবসময় ফাঁকাই থাকে বলতে গেলে।আর সেটা আমি এই বাড়িতে ঢোকার পর পরই অনুধাবন করতে পারছিলাম।একটা অগোছালো... একটা লক্ষ্মীছাড়া... সৃষ্টিছাড়া আবহের গন্ধ এই ব্যানার্জি ভিলার ভিতরের বাতাসের প্রতিটি পরতে পরতে বিদ্যমান। বাড়ির ভিতরটা ভীষন রকমের অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন। কোনো শৃঙ্খলা নেই... নেই কোনো বাঁধন!আর এই উড়নচণ্ডী আবহের ভিতরে একটা ঘরের ভিতরে একজন মানুষ খুন হয়ে গিয়েছে আজ বিকেল সন্ধ্যা নাগাদ!এই ব্যানার্জি ভিলার ভিতরে বাস করাটাই যেন রীতিমতো একটা শাস্তি র সমান!তো এই বাড়ির একটা ঘরে ঐতিহাসিক কোন জিনিস নিয়ে রিসার্চ করার মানসিকতা রাখাটাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার! আমি আর অজিতেশ আস্তে আস্তে সুবিনয় কে অনুসরন করে সিঁড়ি র দিকে এগোতে শুরু করলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সুবিনয় বলে উঠল," অজিতেশ বাবু, এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে প্রথমেই যে ঘরটা পড়বে,ওটাই দাদার স্টাডি রুম। সিঁড়িটা আসলেই পুরোনো আমলের। লাল সিমেন্টের তৈরি এই সিঁড়ি টার ধাপে ধাপে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে ক্ষয়ের চিহ্ন। সুবিনয় ওদের পথ দেখিয়ে,আগে আগে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে।ওর হাতে রয়েছে একটা বড় টর্চ। ব্যানার্জি ভিলার এই অংশটায় ইলেকট্রিসিটির আলো বড়ই ক্ষীণ। একটা ষাট পাওয়ারের বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে, কিন্তু তাতে সিঁড়ির অন্ধকার তো কাটছে না, বরং অন্ধকার টা আরও যেন ঘন হয়ে উঠছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে অজিতেশ আমার কানে ফিসফিস করে বলল, "একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ সুজিত, এই অতীব সুন্দর,প্রাসাদ তুল্য বাড়ির খোলসের ভিতরে বাড়িটার ভিতর টা কিরকম গুদাম ঘরের মতো!কি বিশ্রী একটা গুমোট গন্ধ আসছে নাকে...এটা শুধু অপরিচ্ছন্নতার গন্ধ নয়। এটা আসলেই একটা অবহেলার গন্ধ।" আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। সত্যিই তাই। অজিতেশ একদম আমার মনের কথাটাই বলেছে। দোতলায় উঠে প্রথম ঘরটাই। ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল। সুবিনয় দরজাটা ঠেলে খুলতেই আমি আর অজিতেশ দুজনেই থমকে দাঁড়ালাম। সুবিনয় বলে উঠল,এটা মেজদার স্টাডি রুম। চারপাশে তাকিয়ে আমার যেন মনে হল, এই ঘরটাকে আদৌ ঠিক স্টাডি রুম বলা চলে না। এ যেন একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম। ঘরের তিন দিকে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কাঠের আলমারি সাজানো রয়েছে, আর তার ভিতরে থরে থরে পুঁথি সাজিয়ে রাখা রয়েছে। সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, মুঘল আমলের ছোট ছোট মিনিয়েচার পেইন্টিং, কিছু পাথরের ভাস্কর্য...। আর ঘরের একেবারে মাঝখানে রয়েছে একটা বিশাল সেগুন কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে এখনও। আর সেই টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে আছেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। আমি আন্দাজ করে নিলাম,ইনিই হলেন সুধাংশু ব্যানার্জি। তাঁর রয়েছে পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখের মোটা ফ্রেমের চশমাটা একটু সরে নাকের ডগায় এসে আটকে রয়েছে। তাঁর মাথার পিছন দিকটা একেবারে থেঁতলে গিয়েছে। আর সেখান থেকে চাপ চাপ রক্ত বেরিয়ে টেবিলের সবুজ ফেল্টের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। রক্ত এখন জমাট বেঁধে কালচে হয়ে গিয়েছে। অজিতেশ সুবিনয়কে ইশারায় বাইরে দাঁড়াতে বলল। তারপর আমাকে নিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকল। ও দরজাটা ভিতর থেকে ভেজিয়ে না দিয়ে খুলেই রাখল। ঘরে ঢুকে প্রথম পাঁচ মিনিট অজিতেশ কোনো কথা বলল না। ও চুপচাপ ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়েই পুরো ঘরটায় ভালো করে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগোতে শুরু করল। আমি বলে উঠলাম, "হ্যাঁ রে,তুই পুলিশে খবর দিয়েছিলি সুবিনয়?" সুবিনয় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "ইয়ে...না, মানে... আমি থানাতেই যেতে গিয়েছিলাম প্রথমে। কিন্তু দাদা মৃতদেহের পাশে এই কাগজটা পাই... তারপর আর পুলিশের কাছে না গিয়ে ব্যোমকেশ বাবুর শরণাপন্ন হই।" এই বলে সুবিনয় ওর পকেট থেকে একটা কাগজ বার করল। অজিতেশ এগিয়ে এসে বলল,"কই দেখি কি কাগজ!" ওর হাত থেকে কাগজটা নিজের হাতে নিল। আমিও ওই কাগজটার ওপরে ঝুঁকে পড়ে দেখলাম,"কাগজে লেখা আছে,"পুলিশে খবর দিলে ফল ভালো হবে না।" আমি বলে উঠলাম,"এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার, একজন মানুষ কে খুন করে ঘর থেকে একটা ঐতিহাসিক দামী জিনিস চুরি করে পালানোর পর আবার চোর একটা চিঠিও রেখে গিয়েছে!এই চোর তো রীতিমতো আগে থেকে সময় নিয়ে নিজের সব পরিকল্পনা গুছিয়ে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চুরি আর খুন করে পালিয়েছে, যাতে দামী জিনিসটাও নিজের হাতে চলে আসে আবার দামী জিনিসটার প্রাথমিক দাবীদার কেও চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়! অজিতেশ, আমি তোমাকে বলছি শোনো,এই চোর কিন্তু অতর্কিতে চুরি করে তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার মতো ছিল না। সুবিনয় বলে উঠল,"আসলে অজিতেশ বাবুএই কাগজটা আমি আপনাকে দেখানোর জন্য ই নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু টেনশনে মনেই ছিল না। অজিতেশ এবার আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"তুমি একদম ঠিক বলেছ সুজিত। তবে পুলিশে খবর দিতে তো হবেই। কিন্তু পুলিশ আসার আগে আমার কিছু জিনিস দেখে নেওয়া দরকার। সুবিনয় বাবু, আপনি দয়া করে একটু নিচে যান, দেখুন আপনার ভাইপো প্রবীর বাড়ি ফিরেছে কিনা। আর হ্যাঁ, এই ঘরে কিন্তু এখন আর কারোর ঢোকা চলবে না। কেমন!" সুবিনয় ভীত সন্ত্রস্ত কন্ঠে বলে উঠল,"আজ্ঞে, আপনি যেমন টা বলবেন...!" এই বলে সুবিনয় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ‌। সুবিনয় চলে যেতেই অজিতেশ ওর পকেট থেকে একটা ছোট আতশ কাঁচ বের করল।ওই আতশ কাঁচ টা হাতে নিয়ে ও প্রথমে মৃতদেহের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভালো করে নিরীক্ষণ করল। তারপর খুব সাবধানে, মৃতদেহ স্পর্শ না করে, তার মাথার ক্ষতটা ভালো করে দেখল। তারপর ও চাপা স্বরে বলে উঠল, "দেখো সুজিত, সুধাংশু বাবু র মাথা র পিছনের এই আঘাতটা খুব ভারী কোনো বস্তু দিয়ে করা হয়েছে, কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কিন্তু নয়। তুমি ভালো করে ক্ষত টা লক্ষ্য করে দেখো,এই ক্ষতটা ছেঁড়া-ফাটা,থ্যাঁতলানো, কিন্তু কাটা নয়। সম্ভবত এই ঘরেরই কোনো জিনিস দিয়ে আঘাত টা করা হয়েছে।" আমি ভালো করে দেখে বুঝলাম,অজিতেশ একদম ঠিক ই আন্দাজ করেছে। আমি বলে উঠলাম,"তুমি ঠিকই বলেছ।কিন্তু অজিতেশ,চোর যে জিনিসটার চুরি করতে এসেছিল,সেটা কি আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে? ওটা তো মিউজিয়াম থেকে রিসার্চ করার জন্য নিয়ে এসেছিলেন সুধাংশু বাবু।" অজিতেশ বলে উঠল, এই রহস্যের জট আমি খুলবোই, এবং সেটা খুব শীঘ্র। আমি দেখলাম, অজিতেশের চোখ এবার টেবিলের ওপর ঘুরতে লাগল। বিশালাকৃতি এই টেবিলটার দিকে এবার চোখ পড়ল আমার। আমি দেখলাম, টেবিল টা অসম্ভব রকমের অগোছালো । টেবিলের একদিকে রয়েছে কিছু খোলা বই , 'জাহাঙ্গীরনামা'র ইংরেজি অনুবাদ, পার্সি ব্রাউনের 'ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার', আর সেই সাথে রয়েছে একটা মোটা খাতা, যেখানে সুধাংশু বাবু নিজের নোট লিখছিলেন। আমি দেখলাম,খাতাটা খোলা পড়ে আছে। অজিতেশ খাতাটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। তারপর আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,দেখো সুজিত,এই খাতাটার একেবারে শেষ পাতায় কাঁপা হাতে কি লেখা রয়েছে ! আমি জোরে লেখাটা পড়লাম। "পেয়ালার নিচে লাল দাগটা রক্তের নয়, অন্য কিছু... আসল রহস্য নিচে..." আমি বলে উঠলাম,"অজিতেশ,লেখাটা তো অসম্পূর্ণ।" হঠাৎ আমার চোখে পড়ল,খাতার ঠিক পাশেই একটা চৌকো মতো দাগ রয়েছে। একরাশ ধুলোর ওপর ওই পরিষ্কার চৌকো দাগ স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে। আমি চমকে উঠে বললাম, "দেখো অজিতেশ, টেবিলের ওপরে ওটা কিসের দাগ!" ব্যোমকেশ আমার অঙ্গুলি নির্দেশ করা স্থানে তাকিয়ে দেখল। তারপর ওই দাগটার ওপরে ঝুঁকে পড়ে ভালো করে দাগটা নিরীক্ষণ করতে লাগল। তারপর অজিতেশ ওই দাগ টা আঙুল দিয়ে মেপে বলল, "ছয় ইঞ্চি বাই ছয় ইঞ্চি। নিশ্চয়ই একটা বাক্স বা কাঠের স্ট্যান্ড রাখা ছিল এখানে।আর সেটার ওপরেই রাখা ছিল ওই হারিয়ে যাওয়া জাহাঙ্গীরের পেয়ালাখানি।" "পেয়ালাটা তাহলে চুরি গেছে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। অজিতেশ উত্তর দিল না। সে টেবিলের নিচে ঝুঁকে পড়ে কি যেন দেখতে শুরু করল। আমিও কৌতূহল বশত নীচে ঝুঁকে দেখতে শুরু করলাম। আমি দেখলাম,টেবিলের নিচে, একপাশে রয়েছে একটা ছোট ডাস্টবিন।তাতে রয়েছে কিছু ছেঁড়া কাগজ। আর তার পাশেই পড়ে আছে একটা ভারী পাথরের পেপারওয়েট। পেপারওয়েটটা আসলে মুঘল আমলের হাতির মূর্তির আদলে তৈরি করা। আমি বিস্মিত দৃষ্টি তে দেখলাম,ওই পেপার ওয়েট টার গায়ে টাটকা রক্তের ছিটে লেগে রয়েছে। অজিতেশ বলে উঠল, "আচ্ছা...এই তাহলে ছিল হত্যার অস্ত্র।" অজিতেশ সাথে সাথে রুমাল দিয়ে পেপার ওয়েট টা তুলে নিল। তারপর চাপা স্বরে বলে উঠল,"খুনি আসলেই এই ব্যানার্জি পরিবারের...বা বলা ভালো ভিলার খুব কাছের লোক।এই চোর বা খুনি আসলেই বাইরে থেকে আসেনি।কারণ বাইরে থেকে এলে সে এই পেপার ওয়েটটা খুঁজে পেতে সময় নিত। আমি সুধাংশু বাবু র টেবিলের ড্রয়ারে এরকম একাধিক পেপার ওয়েট দেখেছি।এটাও নিশ্চয়ই ওগুলোর সাথে সাথেই ছিল। কাগজ চাপা দিতে হবে এমন কোনো কাজে সুধাংশু বাবু করছিলেন না।মরার সময়ে তিনি শুধু কতগুলো বই ঘাঁটছিলেন।অতএব এই পেপার ওয়েট টা যে ওই ড্রয়ারের মধ্যেই ছিল,এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।এখন প্রশ্ন হল,এখন প্রশ্ন হল, চুরি করার তাড়াহুড়ো র মধ্যেও খুনি এটা আগে থেকে কি করে জানল,যে পেপার ওয়েট‌ টেবিলের বামপাশের ড্রয়ারে থাকে!" এবার হঠাৎ উঠে দাঁড়াল অজিতেশ। তারপর ও এক পা এক পা করে ঘরের জানলার দিকে গেল।এই ঘরের জানলাটা রয়েছে দক্ষিণ দিকে। জানলাটা ভিতর থেকে বন্ধ করা রয়েছে,কিন্তু জানলার ছিটকিনিটা আলগা করা আছে। আমি আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম,ওই জানলার কাঁচে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে একটা হাতের ছাপ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম,ওই ছাপটা ছোট, সরু আঙুলের। অজিতেশ এবার ওর পকেট থেকে আতস কাঁচ টা বার করল। তারপর ওই আতশকাঁচ দিয়ে ওই হাতের ছাপ টা ভালো করে নিরীক্ষণ করতে লাগল। তারপর চাপা স্বরে বিড়বিড় করে ও বলে উঠল, "সুজিত,এই জানলা দিয়ে কেউ ঢোকেনি, বেরোয়ওনি। তাহলে ছিটকিনি টা আলগা হয়ে আছে কেন? আমিও জানলার কাছে এসে ছিটকিনি র সংলগ্ন জায়গা টা ভালো করে দেখতে শুরু করলাম। অজিতেশ এবার জানলার কাঁচে র দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে উঠল, "অজিতেশ দেখো,এই হাতের ছাপ কার? সুধাংশু বাবুর হাত তো এত ছোট নয়।" এই বলে সে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দিল। পর্দা সরাতেই আমাদের চোখে পড়ল,পর্দার পিছনে রাখা রয়েছে একটা ছোট কুলুঙ্গি।ওই কুলুঙ্গির ভিতরে রয়েছে একটা কাঁচের শিশি। অজিতেশ সেটার ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখল ভালো করে। তারপর শিশি টা হাতে নিয়ে বলে উঠল,দেখো সুজিত,এই শিশি টার ভিতরে গাঢ় লাল রঙের একটা তরল পদার্থ রয়েছে। এই বলে অজিতেশ শিশিটা নাকের কাছে নিয়ে এসে শুঁকল। তারপর বলে উঠল, "বুঝলে সুজিত,এটা আলতা নয়। রং নয়। এটা... এটা পুরোনো রক্তের মতো গন্ধ, কিন্তু তার সাথে একটা কিছু মিশে আছে। বোধহয় কোনো কেমিক্যাল।" আমি অবাক হয়ে বললাম, "তার মানে পেয়ালার রক্তের দাগটা নিয়ে উনি পরীক্ষা করছিলেন?" অজিতেশ বলে উঠল, "হ্যাঁ। আর সেই কারণেই ওঁকে মরতে হল।" অজিতেশ এবার মেঝের দিকে তাকাল। মেঝেতে একটা কারুকার্যখচিত কার্পেট পাতা রয়েছে। কার্পেট টার ওপর ভালো করে চোখ বুলিয়ে ও বলে উঠল,এই কার্পেটের ওপরের পায়ের ছাপের প্যাটার্ন টা দেখো সুজিত, কিছু আন্দাজ করতে পারছ? আমি সেদিকে তাকাতেই যা দেখলাম, তাতে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আমি বলে উঠলাম,এই কার্পেটের ওপর তো দুই রকমের পায়ের ছাপ রয়েছে। অজিতেশ বলে উঠল,"এক্স্যাক্টলি।এই দুই রকমের পায়ের ছাপের মধ্যে একটা হল সুধাংশু বাবুর চটির ছাপ, আর অন্য টা খালি পায়ের ছাপ, যেটা টেবিল থেকে একেবারে দরজার দিকে গিয়েছে। আমি ওই পায়ের ছাপের ওপর ঝুঁকে পড়ে ভালো করে নিরীক্ষণ করতে শুরু করলাম। ছাপ গুলো দেখে আমার মনে হল,এই ছাপ একেবারে টাটকা। আর তাছাড়া,কার্পেটের একটা জায়গায় ভাঁজ পড়ে রয়েছে, দেখে মনে হল,যেন কেউ খানিকক্ষণ আগে এখানে হোঁচট খেয়েছিল। আমি অজিতেশ কে ওই ভাঁজ টা দেখাতেই,ও বলে উঠল "এখানেই হয়তো সব রহস্য উন্মোচনের চাবি লুকিয়ে আছে!" এই বলে সে হাঁটু গেড়ে বসে কার্পেটের সেই ভাঁজের কাছে আঙুল বোলাল। আমি দেখলাম,সেখানে আটকে আছে একটা সোনালি রঙের সুতো। ওটা যে একটা জরির সুতো, এতে সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে সুবিনয় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। অজিতেশ সূতোটা হাতে নিয়ে বলে উঠল, "এটা নিশ্চয়ই শাড়ি বা পাঞ্জাবির জরি। সুবিনয় কে ঘরের ভিতরে ঢুকতে দেখে অজিতেশ ওর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"আচ্ছা সুবিনয় বাবু,এই ব্যানার্জি ভিলায় কি কোনো মহিলা থাকেন?" সুবিনয় বলে উঠল, "না না অজিতেশ বাবু, এই ব্যানার্জি ভিলায় কোনো মহিলা থাকে না। তবে... তবে আমাদের পুরোনো কাজের লোকের মেয়ে টুকটুক মাঝে মাঝে আসে। আর...আর প্রবীরের একজন বান্ধবী আসে, তার নাম লতা।" অজিতেশ মাথা নাড়ল। তারপর সে আবার টেবিলের দিকে ফিরে গেল। টেবিল ল্যাম্পের আলোটা সে ঘুরিয়ে দিল সুধাংশু বাবু র মৃতদেহের ওপর।এর ফলপ্রসূ, ল্যাম্পের আলোটা গিয়ে পড়ল সুধাংশু বাবু র মৃতদেহের ডান হাতের মুঠোর ওপর। তাঁর হাতের মুঠোটা যে বন্ধ ছিল, সেটা এতক্ষণ আমরা কেউই খেয়াল করিনি। অজিতেশ খুব সাবধানে আঙুল দিয়ে ওই মুঠোটা খুলল। মুঠোটা খুলে যাওয়ার ফলপ্রসূ, মুঠোর ভিতরে আত্মগোপন করে থাকা একটা ছোট্ট রত্ন উন্মোচিত হয়ে পড়ল। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম,নীল রঙের ওই বহুমূল্য রত্নটির গায়ে কিঞ্চিৎ ময়লা লেগে আছে। "এটা পেয়ালার গা থেকে খুলে পড়া একটা পাথর।" অজিতেশ বিড়বিড় করে বলে উঠল। আমি বলে উঠলাম, "তার মানে মৃত্যুর আগে সুধাংশু বাবু পেয়ালাটা নিয়ে বেশ ধস্তাধস্তি করেছেন। পেয়ালাটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরানো হয়নি।" অজিতেশ এবার ঘরের কোণায় রাখা সেই আলমারিটার দিকে গেল,যে আলমারিটার দিকে আমার প্রথমেই চোখ পড়েছিল।অজিতেশ এখন ওই আলমারিটার দিকেই এগোচ্ছে। আলমারি টা লোহার তৈরি, তাতে একটা তালা দেওয়া রয়েছে বটে ,কিন্তু তালাটা ভাঙা নয়, খোলা। চাবি আলমারির গায়েই ঝুলছে। আলমারিটা খুলতেই ভিতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ বেরিয়ে এল। আমি দেখলাম, আলমারি র তাকে রাখা রয়েছে কিছু দলিল, আর একটা খালি মখমলের বাক্স।ওই বাক্স টা এবার হাতে‌নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শুরু করল অজিতেশ। তারপর আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,"দেখো সুজিত,এই বাক্সের গায়ে কি লেখা আছে...!' আমি ওর হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে সেটা মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করলাম। বিড়বিড় করে বলে উঠলাম,"এই বাক্সের গায়ে তো লেখা ,"ভারত কলাভবন - সংরক্ষিত - জাহাঙ্গীর পেয়ালা।" সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যেটা,সেটা হল... এই বাক্স টা একদম খালি...কিন্তু বাক্সের ভিতরে একটা সাদা কাগজের টুকরো রাখা রয়েছে।আর তাতে ইংরেজিতে টাইপ করে একটা কথা লেখা আছে। আমি ওই কাগজ টা হাতে নিয়ে সেটা অজিতেশের দিকে এগিয়ে ধরলাম। অজিতেশ আমার হাত থেকে কাগজটা লুফে নিয়ে বলে উঠল,"দেখেছ সুজিত, একটা চিন্তা আমার মাথায় খচখচ করছিল অনেক্ষণ থেকেই...আর সেইটাই সঠিক প্রমাণিত হল।দেখছ তো...এই কাগজে কি লেখা! এই বলে অজিতেশ ওই কাগজ টা হাতে নিয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলে উঠল, "আসলটা পেয়ালা টা কখনোই এখানে ছিল না।" আমি দেখলাম,অজিতেশেল চোখ জ্বলজ্বল করছে। কাগজের এই লেখাটা তো আমিও পড়লাম এক্ষুনি! আমি তো কোনোকিছুর কোনো কূলকিনারা করে উঠতে পারছিলাম না। অজিতেশ বলে উঠল, "বুঝতে পারছ সুজিত? এটা আদৌ সাধারণ চুরির কেস নয়। সুধাংশু বাবু বুঝতে পেরেছিলেন পেয়ালাটা নকল। বা পেয়ালার রক্তের দাগটা আসল রক্ত নয়। কেউ ইতিহাস জাল করছে। আর সেই জালিয়াতি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাঁকে এইভাবে সরিয়ে দেওয়া হল। খুনি নির্ঘাত এই বাড়িরই কেউ। আমি বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলাম,"কি সাংঘাতিক! কিন্তু খুনি যে এই বাড়ির ই কেউ, এই বিষয়ে তুমি এতটা নিশ্চিত হচ্ছ কি করে?" অজিতেশ বলে উঠল,"আমি নিশ্চিত হয়ে এ কথাটা বলছি কারণ, খুনি জানত আজ সন্ধ্যায় এই বাড়ি ফাঁকা থাকবে, শুধু তাই নয়,খুনি জানত সুধাংশু বাবু ওই সময়ে একা থাকবেন স্টাডিতে।" ঠিক তখনই হঠাৎ বাইরে শাঁখের আওয়াজ শোনা গেল। সেই সাথে নিচ থেকে প্রবীরের গলা শোনা গেল, "কাকা? কাকা, বাড়িতে কে এসেছে?" আমরা তিনজনেই সিঁড়ির কাছাকাছি চলে এলাম। সিঁড়ি থেকে নীচের বৈঠকখানার কিছু টা অংশ দেখা যাচ্ছিল। বৈঠকখানায় তখন হ্যাজাকের আলোটা কাঁপছে। সিঁড়ি র কাছে একটা ছোট জানলা রয়েছে।বাইরে মাঘের হাওয়া শনশন করে বইছে...ওই বাতাসের স্পর্শে আমাদের শরীর যেন শিহরিত হয়ে উঠতে শুরু করছিল । বাইরে প্রবাহমান সতেজ বাতাসের স্পর্শানুভূতির সাথে সাথে, এই প্রাসাদ তুল্য বাড়ির ভিতরে জমাট বাঁধতে শুরু করা গুমোট অস্বস্তিটা আমরা তিনজনেই অনুভব করতে পারছিলাম।অজিতেশ সুবিনয় কে বলে উঠল, "সুবিনয় বাবু, আপনি এই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটু দেখুন, এখন যেন সুধাংশু বাবু র ঘরে কেউ যেন না ঢোকে! ঠিক আছে?আমি নিচটা দেখছি।" সুবিনয় বলে উঠল, "আচ্ছা ঠিক আছে।" এরপর আমি আর অজিতেশ নীচে বৈঠকখানার ঘরে নেমে এলাম। এখন এই ঘরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সুবিনয়ের ভাইপো প্রবীর ব্যানার্জি। প্রবীর বাবু কে দেখে অজিতেশ বলে উঠল, "নমস্কার, আমি অজিতেশ বক্সী। আমি আপনার মেজো কাকার খুনের ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছি। আপনার ছোট কাকা সুবিনয় ব্যানার্জি আমাকে এই ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই, এবং সেই সঙ্গে এই বাড়ির চাকরদের কিছু প্রয়োজনীয় সাথেও কথা বলতে চাই। আপনি যদি এই বাড়ির সব চাকর ও পরিচারিকা দের এখানে আসতে বলেন, তাহলে ভালো হয়। প্রবীর বাবু বলে উঠলেন,"হ্যাঁ... অবশ্যই... অজিতেশ বাবু। আমি এক্ষুনি এই বাড়ির সব চাকর ও পরিচারিকাদের এই বৈঠকখানার ঘরে আসতে বলছি‌। এই বলে প্রবীর বাবু ভিতরে চলে গেলেন। এরপর এই বৈঠকখানার ঘরে এক এক করে এসে হাজির হল এই ব্যানার্জি ভিলার পুরোনো চাকর হরিহর, ব্যানার্জি ভিলার নতুন চাকর গনেশ‌। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল এক বৃদ্ধা মহিলা। প্রবীর বাবু ডেকে উঠলেন,"মানদা পিসি, তুমিও এখানে এসো।" ডাক শুনে মানদা পিসি আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায়ে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল। অজিতেশ ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বৈঠকখানার ঘরের একেবারে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।ও কোনো তাড়াহুড়ো না‌ করে,একটা চেয়ার টেনে বসল। তারপর পকেট থেকে সেই জরির সুতোটা বের করে সামনে রাখা কারুকার্যখচিত বড় টেবিলটায় রাখল। তারপর ধীর কন্ঠে বলে উঠল, "এই বাড়িতে আজ সন্ধ্যায় আপনারা কে কে ছিলেন, এক এক করে বলুন।" এবার প্রবীরই প্রথম মুখ খুলল। এই ছেলেটাকে দেখে যতদূর মনে হয়,ছেলেটার বয়স তিরিশ কি একত্রিশ হবে।ও নিজেকে একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছে বটে, কিন্তু ওর চোখে-মুখে আমি একটা অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি, যেটা কাপড়ের ব্যবসায়ীর মধ্যে থাকাটা বেশ অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে আমার।যাই হোক, প্রবীর বাবু বলে উঠলেন, "আমি... আমি তো দুপুর দুটোয় বেরিয়ে গিয়েছিলাম। আমার বড়বাজারে পার্টির সাথে মিটিং ছিল। এই তো আধঘণ্টা আগে ফিরলাম। এসে দেখি..." "বড়বাজারে কোথায়? কার সাথে মিটিং?" অজিতেশ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল। প্রবীর থতমত খেয়ে গেল। তারপর হাত কচলে বলে উঠল,"ইয়ে...মানে... শ্যামসুন্দর কোম্পানিতে একটা জরুরী মিটিং ছিল। আমার কাপড়ের ব্যবসা। আপনি চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।" অজিতেশ মাথা নেড়ে বলে উঠল,"ঠিক আছে প্রবীর বাবু,নিশ্চয়ই দেখব। আচ্ছা , আপনি একটা কথা বলুন,আপনি বেরোনোর সময় সুধাংশু বাবু কি করছিলেন?" প্রবীর বাবু বলে উঠলেন, "মেজো কাকা তো ওই পেয়ালা নিয়েই পড়ে ছিলেন। আপনি জানেন,মেজো কাকা তিনদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। আমাকে একদিন ডেকে বললেন, 'প্রবীর, এই পেয়ালার দাগটা নিয়ে একটা গোলমাল আছে'। কিন্তু আমি তাঁর কথায় অত গুরুত্ব দিইনি। আমার নিজের ব্যবসা সামলাতেই জেরবার অবস্থা,আর অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় কোথায় বলুন...!" অজিতেশের চোখ হঠাৎ চকচক করে উঠল।ও বলে উঠল, "গোলমাল আছে - এই কথাটা ঠিক কি বলেছিলেন?" অজিতেশের এই প্রশ্ন টা শুনে প্রবীর একটু ভাবার চেষ্টা করল। তারপর বলে উঠল,"মেজো কাকা বলেছিলেন, রক্তের দাগটা... রক্তের দাগটা যেন বড্ড টাটকা। চারশো বছরের রক্ত এত টাটকা হয় না।" অজিতেশ এবার আর কিছু বলল না। সে এবার তাকালো গনেশের দিকে। তারপর গণেশের সামনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "তুমি? তুমি কতদিন এই বাড়িতে কাজ করছ?" গনেশের দিকে আমি লক্ষ্য করে দেখলাম,ওর চেহারা একেবারে রোগা পাতলা, ওর গালে বসন্তের দাগ রয়েছে। গণেশ হাত কচলাতে কচলাতে বলল, "ছয় মাস, বাবু।" অজিতেশ বলে উঠল, "ছয় মাস আগে কোথায় ছিলে?" "শোভাবাজারে, এক মেসে।" "আজ সন্ধ্যায় কোথায় ছিলে?" "আমি... আমি বাজার গেছিলাম। মানদা পিসি বলল তেল-নুন ফুরিয়েছে।তা... সেগুলো আনতেই বেরিয়ে ছিলুম।" "কখন গেছিলে? আর ফিরেছিলেই বা কখন?" "আজ্ঞে,চারটেয় গেছি, আর ফিরেছি এই...ছটায়।" অজিতেশ হাসল। তারপর বলে উঠল,"বাহ। দু ঘণ্টা বাজার? তেল-নুন কিনতে দু ঘণ্টা?তা তোমার হাতের বাজারের থলিটা এখন কোথায়?" গনেশ চুপচাপ হয়ে গেল। আমি লক্ষ্য করলাম,ওর কপালে শিশির কণার মতো ঘামের বিন্দু ফুটে উঠেছে। অজিতেশ গণেশের দিক থেকে হঠাৎ মনোযোগ টা সরিয়ে নিয়ে এবার হরিহরের দিকে তাকাল। যতদূর মনে হল,এই হরিহর ব্যানার্জি ভিলার সবচেয়ে পুরোনো চাকর।ওর বয়স বোধ করি পঞ্চাশের ওপর হবে। হরিহর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাতদুটো জড়ো করে। অজিতেশ বলে উঠল, "হরিহর, তুমি তো এই বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো লোক। মানদা পিসির পর তুমিই এই বাড়ির পুরোনো ও বিশ্বস্ত চাকর। তাই তো? হাত কচলাতে কচলাতে হরিহর বলে উঠল,"আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু।" অজিতেশ বলে উঠল, "বেশ, আচ্ছা,তুমি বলো, আজ বিকেলে কে এসেছিল এই বাড়িতে?" হরিহর ধীরে ধীরে বলে উঠল, "আজ্ঞে,কেউ আসেনি বাবু। বাড়ি তো পুরোপুরি ফাঁকাই ছিল। মেজবাবু ওপরে ছিলেন ওনার স্টাডি রুমে। আমি তো নিচে রান্নাঘরে ছিলাম।" "মিথ্যে কথা।" অজিতেশ গলাটা একটু শক্ত করল। তারপর বলে উঠল,"ওই স্টাডি রুমে একজন এসেছিল। তবে সে বাইরের কেউ নয়, সে এই ব্যানার্জি ভিলার ভিতরের কেউ। স্টাডি রুমের কার্পেটের ওপর আমি দুটো পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছি। ওই পায়ের ছাপ দুটোর একটা মেজবাবুর চটির, আর একটা খালি পায়ের ছাপ। আচ্ছা হরিহর,খালি পায়ে এই শীতে কে ঘুরে বেড়ায়? খালি পায়ে দোতলা র স্টাডি রুমে সেই হাঁটাচলা করবে,যে ঘরের ভিতরেই থাকে। অথবা যে জুতো পরতে ভুলে যায় ভয়ে।" এই বলে অজিতেশ এগিয়ে গিয়ে মানদা পিসির সামনে দাঁড়াল। মানদা পিসি এতক্ষণ দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, "মানদা পিসি, আপনি কাঁদছেন কেন?" অজিতেশের মুখে এই কথা শুনে মানদা পিসি আরো তীব্রভাবে ফুঁপিয়ে উঠলেন যেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন,"বাবা...আমার... আমার বড় অন্যায় হয়ে গেছে বাবা..." অজিতেশ বলে উঠল, "কি অন্যায়?" মানদা পিসি চোখের জল মুছতে মুছতে বলে উঠলেন, "আমি... আমি দরজা খুলে দিয়েছি।" মানদা পিসি র এই কথাটা শোনা মাত্র এবার ঘরে উপস্থিত সকলে চমকে উঠল। প্রবীর বলে উঠল, "কি বলছ পিসি? কোন দরজা খুলে দিয়েছ তুমি?" মানদা পিসি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "মেজো বাবু র ওই স্টাডি রুমের দরজা।মেজবাবু আমাকে পই পই বলে দিয়েছিলেন,ওই ঘরে যেন আমি কাউকে ঢুকতে না দিই। কিন্তু... কিন্তু ওরা বলল..." "কারা বলল?" অজিতেশ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল মানদা পিসি কে। "আমি জানি না বাবা। আমি কিচ্ছু জানি না।আজ সকালে আমার কাছে একটা চিঠি এসেছিল জানো বাবা...। ওই চিঠিতে লেখা ছিল, টুবলুকে... আমার নাতি টাকে কেউ ধরে নিয়ে গেছে। যদি আমি আজ বিকেলে মেজো দাদাবাবু র স্টাডি রুমের পিছনের দরজাটা খুলে না রাখি, তাহলে ওরা টুবলুকে মেরে ফেলবে। আমার যে দুনিয়ায় আর কেউ নেই।ওই নাতিটাই আমার দুনিয়া,ওই আমার সব‌ বাবা।ওর জন্মের পর পর ই ওর বাবা মা মারা গিয়েছিল।তার পর থেকে আমিই ওকে মানুষ করছি।ওর একটা কিছু বিপদ আপদ হয়ে গেলে আমি যে শেষ হয়ে যাব বাবা...। আমি বলে উঠলাম, "সে কি?আপনার নাতিকে অপহরণ করা হয়েছে?কে বা কারা এই কাজ করেছে? আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন? আপনি দয়া করে ভয় পাবেন না। আমাদের সবটা খোলাখুলি বলুন। আমরা আপনার নাতিকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করব।" বৃদ্ধা ভগ্ন কন্ঠে বলে উঠলেন, "টুবলু টা সকালে ইস্কুলে গেছিল। তারপর ইস্কুল থেকে আর ফেরেনি। অজিতেশ বলল, "আপনার ঘরে যে চিঠিটা পেয়েছিলেন,ওই চিঠিটা কোথায়?" অজিতেশের কথা শুনে মানদা পিসি আঁচলের গিঁট থেকে একটা মোচড়ানো কাগজ বের করল। তারপর ওটা অজিতেশের হাতে দিল। অজিতেশ কাগজ টা খুলে দেখল, তাতে কাঁচা হাতে বাংলায় লেখা - "বিকেল ৪টে‌ নাগাদ তুই সুধাংশু ব্যানার্জি র স্টাডি রুমের দরজা খোলা রাখবি। আর সেই সঙ্গে টেবিলে রাখা দামী পেয়ালাটা সরিয়ে রাখবি। ভুলেও পুলিশে খবর দেওয়ার মতো মূর্খামি করবি না।পুলিশে যদি খবর দিস,তাহলে কিন্তু তোর নাতি তোর কাছে একদম লাশ হয়ে ফিরবে।" অজিতেশ কাগজ টা ভালো করে নিরীক্ষণ করতে লাগল। তারপর বিড়বিড় করে বলে উঠল,"এই হাতের লেখা টা ধরে ই এখন এগোতে হবে আমাদের।" এই বলে অজিতেশ এবার গনেশের দিকে তাকাল। তারপর ওই কাগজ টা গণেশের সামনে মেলে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"এই হাতের লেখা চেনো তুমি?" গনেশ ঢোক গিলে বলে উঠল। "না বাবু।এ হাতের লেখা আমি চিনি না।" অজিতেশ এবার বলে উঠল, "গণেশ, তুমি একটা কাগজে কিছু একটা লিখে দেখাও দেখি....!" আমি সাথে সাথে আমার পকেটে থাকা একটা নোটবুক বার করে সেখান থেকে একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে গণেশের দিকে এগিয়ে দিলাম। সেই সাথে এগিয়ে দিলাম একটা কলম। গনেশ কাঁপা হাতে ওই কাগজ আর কলমটা ধরল। তারপর সেই কাগজে নিজের নাম লিখল। আমরা ভালো করে সেটা নিরীক্ষণ করলাম। না... মানদা পিসি র ওই চিঠিতে লেখা ওই হাতের লেখা র সাথে এই হাতের লেখা তো মিলছে না। অজিতেশ এবার হরিহরের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,"হরিহর, তুমি লেখাপড়া জানো?" হরিহর মাথা নেড়ে বলল,"আজ্ঞে...ওই সামান্য... লিখতে পড়তে পারি আর কি।" এ কথা শুনে অজিতেশ হরিহরের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, "তুমি লেখো তো - 'পেয়ালা'।" হরিহর কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা নিল। তারপর সেটা টেবিলের ওপর রেখে অজিতেশের বলা শব্দ টা লিখল।ওর লেখা হয়ে গেলে,অজিতেশ সাথে সাথে কাগজ টা হাতে নিল। তারপর থুতনি তে হাত রেখে চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠল,"নাঃ...এই হাতের লেখাও তো মিলছে না। অজিতেশ এবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তে প্রবীরের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"প্রবীর বাবু,এই কাগজে আপনি একটু লিখুন তো - 'পুলিশে খবর দিলে ফল ভালো হবে না'।" অজিতেশের মুখে এই কথাটা শুনে প্রবীরের মুখ যেন একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। হুবহু এই কথাটাই তো লেখা ছিল ওই চিঠির কাগজটাতে...যে কাগজ টা সুধাংশু বাবুর মৃতদেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল। প্রবীর এবার কাঁপা হাতে অজিতেশের বলে দেওয়া কথা টা লিখল। আমি আর অজিতেশ ঝুঁকে পড়ে দেখলাম, কিন্তু না... প্রবীর বাবু র এই হাতের লেখার সাথে ওপরের ঘরে পাওয়া কাগজের হাতের লেখার কোনো মিল ই নেই। অজিতেশ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলে উঠল, "তার মানে চিঠি এই বাড়ির কেউ লেখেনি। বাইরের কেউ লিখেছে। সুধাংশু বাবু র খুন ও পেয়ালা চুরি র সময়ে আততায়ী কিন্তু মানদা পিসিকে ব্যবহার করেছে। কারণ মানদা পিসিই জানে এই বাড়ির‌ কোন চাবি কোথায় আছে। পিছনের দরজার চাবি, আলমারির চাবি, সব। তাই না মানদা পিসি? আমি ঠিক বলছি তো?" অজিতেশের মানদা পিসি এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন । তারপর কাতর কন্ঠে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ বাবা। মেজ দাদাবাবু সব চাবি র দায়িত্ব আমার হাতেই দিয়েছেন। আমি আজ তিরিশ বছর ধরে এই বাড়ির সব চাবি সামলাচ্ছি। কিন্তু আজ... আজ আমি ভয়ে..." অজিতেশ এবার বলে উঠল, "আচ্ছা মানদা পিসি,আপনি কি পেয়ালাটা সরিয়েছেন?" এ কথা শুনে মানদা পিসি সাথে সাথে বলে উঠলেন, "না বাবা, বিশ্বাস করো। আমি শুধু ই স্টাডি রুমের পিছনের দরজাটা খুলে রেখেছিলাম। তারপর...তারপর ভিতরে ঢুকে দেখি মেজবাবু... মেজ দাদাবাবু টেবিলে র ওপরে পড়ে আছেন।যে পেয়ালা টা নিয়ে তিনি রিসার্চ করছিলেন,ওই পেয়ালা টা টেবিলে আর নেই।এই দৃশ্য দেখে আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে নিচে চলে আসি।" আমি বলে উঠলাম, "তাহলে পেয়ালা কে নিল?" মানদা পিসি বলল, "সেটা আমি দেখিনি বাবা। কিন্তু... অজিতেশ বলে উঠল,"কিন্তু কি মানদা পিসি?" মানদা পিসি সভয়ে একবার শুন্য দৃষ্টিতে ওপরের দিকে চাইলেন। তারপর বলে উঠলেন,"নীচে নামার সময় সিঁড়িতে হরিহরের সাথে দেখা হয়েছিল। আমি ওকে কোথায় যাচ্ছে,এটা শুধাতেই ও বলল,ও ওপরে যাচ্ছে।" মানদা পিসি র মুখে এই কথা শুনে এবার হরিহর চিৎকার করে উঠল, "মিথ্যে কথা! আমি ওপরে যাইনি! আমি তো রান্নাঘরেই ছিলাম!" অজিতেশ এবার হাত তুলে দুজনকেই থামাল। তারপর শীতল কন্ঠে বলে উঠল, "আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো পিসি। এই বাড়ির সেজো ছেলে সুব্রত ব্যানার্জির কথা মনে আছে আপনার?" এই নামটা নামটা শুনতেই ঘরের আবহাওয়া বদলে গেল। প্রবীর অবাক হয়ে বলল, "সেজো কাকার নাম আপনি জানলেন কি করে? বাবা তো বলত উনি নিরুদ্দেশ..." মানদা পিসি কাঁপা গলায় বলল, "সেজো খোকা... সেজো খোকা তো... তাকে তো বড় দাদাবাবু তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুকাল আগে। সে ভালো ছেলে ছিল না। তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে অনেক বদনাম ছিল।" অজিতেশ বলে উঠল, "আচ্ছা...কত বছর আগে এই ঘটনা ঘটেছিল?" মানদা পিসি গভীর ভাবে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলে উঠলেন,"তা... তা ধরো...বছর কুড়ি হবে।" অজিতেশ এবার বলে উঠল, তা মানদা পিসি, এই বাড়ির সব চাবি যখন আপনিই সামলে রাখেন, তখন এই বাড়ির সবকিছু ই আপনার ই নখদর্পণে...তাই নয় কি?" প্রবীর বাবু এবার সন্দেহের চোখে তাকালেন। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,"আমি বুঝতে পেরেছি... আপনি মেজোকাকার স্টাডি রুম টা অনুসন্ধান করে এসেছেন তো?আর সেখানেই আপনি নিশ্চয়ই হাতে পেয়েছিলেন আমাদের এই ব্যানার্জি পরিবারের ও তার ইতিহাস সম্বন্ধে সবিস্তারে লিখে রাখা ওই খাতাটা।আর সেই খাতার পাতা উল্টিয়েই আপনি এই ব্যানার্জি পরিবারের সেজো ছেলে অর্থাৎ সেজকা র কথা টা জানতে পেরেছেন। তাই তো? কিন্তু অজিতেশ বাবু, শেষ পর্যন্ত এই অবলা বৃদ্ধা মানদা পিসিকে ই আপনার দোষী মনে হচ্ছে?" অজিতেশ বলে উঠল, "দেখুন প্রবীর বাবু,আমি এখন ই কাউকে দোষী বলছি না। আমি শুধু বলছি, এই বাড়িতে আজ যা হয়েছে, তা শুধু পেয়ালা চুরির জন্য হয়নি। আমার মনে হচ্ছে,এই সবকিছু র পিছনে অনেক পুরোনো একটা রাগ আছে। আচ্ছা সুবিনয় বাবু, আপনার বড়দা সুবিমল বাবু আর বড় বৌঠানের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল তাই তো?" সুবিনয় বলে উঠল,"আজ্ঞে হ্যাঁ অজিতেশ বাবু। তবে আমি তখন খুব ছোট ছিলাম তো,তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না ‌। তবে ওই খাতাটায় সব লেখা রয়েছে। অজিতেশ বলে উঠল, হ্যাঁ,ওই লেখা কিছু কিছু চোখে পড়েছে আমার।... তবে আমার মনে একটা প্রশ্ন এখন ভীষণভাবে চাগাড় দিয়ে উঠছে ‌। আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,"কি প্রশ্ন অজিতেশ?" অজিতেশ বলে উঠল,"প্রশ্ন টা হচ্ছে এটাই, সুবিমল বাবু ও বড় বৌঠানের ওই গাড়ি দুর্ঘটনা‌ টা কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?" প্রবীর এবার চিৎকার করে বলে উঠল, "আপনি কি বলতে চাইছেন অজিতেশ বাবু,আমার বাবা-মাকে খুন করা হয়েছে?" অজিতেশ ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল, "আমি কিছুই বলছি না প্রবীর বাবু। আমি শুধু প্রশ্ন করছি। আর আমি জানি, আমার সব প্রশ্নের উত্তর এই বাড়ির ভিতেই লুকিয়ে আছে। আচ্ছা মানদা পিসি, আপনি বলুন তো, আপনার সেজো দাদাবাবু ঠিক দেখতে কেমন ছিল?" মানদা পিসি বলল, "ফর্সা, লম্বা, গালে একটা কাটা দাগ ছিল। ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে..." হঠাৎ ঘরের একটা ঘড়ি তে ঢং ঢং করে আটটা র ঘন্টা বেজে উঠল।মানদা পিসি হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন।যে প্রসঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন,সেসব কথা এক নিমেষে তার মাথা থেকে যেন উবে গেল।মানদা পিসি বলে উঠলেন,"এই সময়ে রোজ নাতিটাকে খাওয়াই আমি। অথচ এখন সে যে কোথায় আছে...তাই ঈশ্বর ই জানেন...! আমাদের চোখের সামনে মানদা পিসি এবার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে বসে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন। অজিতেশ এবার তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর নরম স্বরে বলে উঠল, "পিসি, এখন তো কান্নাকাটি করলে চলবে না। আপনি আমাকে একটা কথা বলুন, টুবলু কোন রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়?" কান্না মিশ্রিত স্বরে মানদা পিসি বলে উঠলেন, "আমার নাতি তো রোজ পটলডাঙার ভেতরের গলি দিয়ে ইস্কুলে যায় বাবা। সিটি স্কুল। ক্লাস ফোর।" অজিতেশ বলে উঠল, "বুঝলাম,তা আজ যখন টুবলু ঘরে ফেরেনি, তখন আপনি কি কাউকে খুঁজতে পাঠিয়েছিলেন?" মানদা পিসি চোখে আঁচল চাপা দিয়ে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ, পাঠিয়েছিলাম তো...আমি হরিহরকে পাঠিয়েছিলাম টুবলু কে ঘরে নিয়ে আসার জন্য। ও বলল, স্কুলের দারোয়ান বলেছে টুবলু নাকি স্কুল ছুটি হওয়ার সাথে সাথেই বেরিয়ে গেছে।" অজিতেশ উঠে দাঁড়াল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "সুজিত, বুঝতে পারছ? অপহরণকারীরা তার মানে টুবলুকে স্কুলের গেটের কাছ থেকেই তুলে নিয়ে গেছে। তার মানে ওরা আজ সকাল থেকেই ওঁত পেতে ছিল। আর মানদা পিসি র এই চিঠিটা এসেছে বিকেল সাড়ে তিনটেয়, আর চিঠি তে ওরা স্টাডি রুমের দরজা টা খুলতে বলেছে বিকেল চারটের সময়ে। তার মানে ওরা ভালো করে ই জানত বিকেল চারটের সময় এই ব্যানার্জি ভিলা একদম ফাঁকা থাকবে।" আমি বলে উঠলাম,"বুঝতে পারছি... তার মানে নিশ্চয়ই এটা কোনো বাইরের লোকের কাজ নয়।এই ব্যানার্জি ভিলার ভেতরের কেউ জড়িত এইসবকিছুর সাথে।" দৃশ্য দুই বাইরে তখন মাঘের সন্ধ্যা জমাট বেঁধে রাত হচ্ছে। কুয়াশায় হ্যারিসন রোডের আলোগুলোকে যেন মনে হচ্ছে ভাসমান লণ্ঠন। আমরা একটা রিকশা নিয়ে আমরা পটলডাঙার দিকে ছুটলাম। রিকশাওয়ালাও কুয়াশায় রাস্তার কিচ্ছু স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে না। পটলডাঙা সিটি স্কুলের সামনে পৌঁছে দেখলাম, স্কুলের গেটে ঝুলছে একটা বড়সড় তালা। আমরা গেটের ভিতরে উঁকিঝুকি দিতেই আমাদের চোখে পড়ে, ভিতরে এক দারোয়ান একটা চাদর মুড়ি দিয়ে লণ্ঠনের আলোয় বসে মহানন্দে বিড়ি তে সুখটান দিচ্ছে। অজিতেশ এবার জোরে ডেকে উঠল, "দারোয়ান কাকা...ও দারোয়ান কাকা...দয়া করে একটু এদিকে শুনবেন?" একমনে বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে হঠাৎ একটা বিঘ্ন আসায় দারোয়ান বেশ বিরক্তই হয়েছে বলে মনে হল।সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে এগিয়ে এল গেটের কাছে। তারপর ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠল,"আপলোগ কৌন হ্যায়?ইয়াহাপর কেয়া চাহিয়ে? অভি তো রাত হ্যায়... স্কুল বন্ধ হ্যায়।" দৃশ্য দুই বাইরে তখন মাঘের সন্ধ্যা জমাট বেঁধে রাত হচ্ছে। কুয়াশায় হ্যারিসন রোডের আলোগুলোকে যেন মনে হচ্ছে ভাসমান লণ্ঠন। আমরা একটা রিকশা নিয়ে আমরা পটলডাঙার দিকে ছুটলাম। রিকশাওয়ালাও কুয়াশায় রাস্তার কিচ্ছু স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে না। পটলডাঙা সিটি স্কুলের সামনে পৌঁছে দেখলাম, স্কুলের গেটে ঝুলছে একটা বড়সড় তালা। আমরা গেটের ভিতরে উঁকিঝুকি দিতেই আমাদের চোখে পড়ে, ভিতরে এক দারোয়ান একটা চাদর মুড়ি দিয়ে লণ্ঠনের আলোয় বসে মহানন্দে বিড়ি তে সুখটান দিচ্ছে। অজিতেশ এবার জোরে ডেকে উঠল, "দারোয়ান কাকা...ও দারোয়ান কাকা...দয়া করে একটু এদিকে শুনবেন?" একমনে বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে হঠাৎ একটা বিঘ্ন আসায় দারোয়ান বেশ বিরক্তই হয়েছে বলে মনে হল।সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে এগিয়ে এল গেটের কাছে। তারপর ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠল,"আপলোগ কৌন হ্যায়?ইয়াহাপর কেয়া চাহিয়ে? অভি তো রাত হ্যায়... স্কুল বন্ধ হ্যায়।" আমি এবার গেটের কাছে গিয়ে বললাম,"দেখুন,আমরা আপনার কাছে একটু সাহায্য চাইতে এসেছি। আসলে,আজ দুপুরে ক্লাস ফোরের একটা বাচ্চা, নীল সোয়েটার পরা, টুবলু..." দারোয়ান বলে উঠল,"দেখিয়ে,সব বাচ্চা লোগ আপনা আপনা ঘর চলা গয়া।আভি ইয়াহাপর কোই বাচ্চা ওয়াচ্চা নেহি হ্যায়।আপলোগ চলে যাইয়ে।" আমি তাকে জোর দিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। অজিতেশ আমাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল, এইভাবে বলে কোনো হবে না সুজিত, ব্যাপার টা একটু অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে। আমি ওর কথা কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু আমি জানি,অজিতেশ যখন কোনো কথা জোর দিয়ে বলে, তখন তার কোনো জোরালো অর্থ অবশ্যই থাকে। আমি আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ ওর সাথে সেখান থেকে সরে পড়লাম। এরপর অজিতেশ আমাকে নিয়ে একটা পান সিগারেটের দোকানে গেল। আমি তো অবাক, এখন টুবলু কে খুঁজতে বেরিয়ে অজিতেশ হঠাৎ পান সিগারেটের দোকানে এল কেন! তবে আসল ব্যাপারটা বুঝতে আমায় খুব বেশি বেগ পেতে হল না ‌। অজিতেশ দোকানে গিয়ে একটা বিশেষ বিড়ি র অনেকগুলো প্যাকেট কিনল। তারপর আমার উদ্দেশ্যে অজিতেশ বলে উঠল,"দেখেছ সুজিত,যে যে পূজোর যা ফুল... সেটাই কত সহজে যোগাড় হয়ে গেল!ওই অন্ধকারের মধ্যে ও আমি দেখে নিয়েছি, দারোয়ান কাকা ঠিক কোন বিড়ি তে সুখটান দিচ্ছিলেন!" আমার চোখমুখ সাথে সাথেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল ‌। আমি অজিতেশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠলাম,"সত্যি অজিতেশ, তুমি পারো।" এরপর আমরা আবার সিটি স্কুলের গেটের দিকে পা বাড়ালাম। দারোয়ান কাকা এবার প্রথমটায় আমাদের দেখামাত্র খেদিয়ে দিতেই আসছিল। কিন্তু অজিতেশ সাথে সাথে এক তাড়া বিড়ির প্যাকেট বার করে বৃদ্ধ দারোয়ান কাকা র সামনে ধরতেই তার চোখেমুখে র মানচিত্র ই পুরোপুরি পাল্টে গেল। দারোয়ান কাকা সাথে সাথেই গেটের কাছে চলে এল। অজিতেশ দারোয়ান কাকা র হাতে ওই বিড়ির প্যাকেটগুলো এগিয়ে ধরতেই সে প্যাকেটগুলো রীতিমতো লুফে নিল। আমি বলে উঠলাম,"টুবলু কে আজ ছুটির পর আপনি দেখেছিলেন? দারোয়ান সাথে সাথেই বলে উঠল, "হা হা,ইয়াদ হ্যায়।উও তো রোজ অকেলা হি ঘর যাতা হ্যায়।লেকিন আজ দেখা দো ছোকরা লোগ উসকো কসকে পাকড়কে বোলা, 'চল,হামলোগ তুঝকো এক নয়া পতং দিখায়েঙ্গে'। বাচ্চে পহেলে উনলোগোকে সাথ নেহি যানা চাহতা থা।তবে উনলোগোনে বাচ্চে কো এক লাল চকলেট কা লালজ দিখাকে উসকো গলি কে পাস লে গ্যায়া। ম্যায়নে সোচা,জান প্যাহেচান কা লোগ হোগা সায়দ...।ম্যায় উস ওয়াক্ত গেট কি সামনে নেহি থা।গেট খোলকর ম্যায় অন্দর চলা গিয়া থা পানি পিনে কে লিয়ে।লেকিন খিড়কি কে অন্দর সে ম্যায়নে ইয়ে সব দেখা। মেরা অন্দর থোড়া শক হুয়া থা। ম্যায়নে চুপকেসে উনলোগোকি পিছা কিয়া‌। ম্যায়নে দেখা,উনলোগোনে বাচ্চে কো এক গলি কে পাস লেকর যা রাহাথা।" অজিতেশ জিজ্ঞাসা করল, "কোন গলি?" দারোয়ান কাকা সাথে সাথে বলে উঠল,"আপলোগ আইয়ে মেরে সাথ।" এই বলে সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল এক অজানা পথের দিকে। বেশ খানিকক্ষণ হাঁটা র পর আমরা বুঝতে পারলাম, সিটি স্কুল থেকে আমরা বেশ অনেকটা দূরে চলে এসেছি। দারোয়ান কাকা এবার হঠাৎ একটা সরু গলির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে উঠল, "ওয়াহি, ওহ পাতলি গলি। উধার দিন মেঁ ভি কোই নেহি যাতা।কিউ ক্যায়া হুয়া?কুছ প্রবলেম হ্যায় কেয়া?" আমি বলে উঠলাম,"দারোয়ান কাকা,আজ সকাল থেকে টুবলু নামের ওই বাচ্চা ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!" এই কথা শুনে দারোয়ান কাকা চোখ কপালে তুলে বলে উঠলেন,'হায় রাম!ই তো বহত বড়া হাদসা হো গয়া।" অজিতেশ বলে উঠল,"আমরা এখন ওকে ই খোঁজার চেষ্টা করছি প্রাণপণে।" দারোয়ান কাকা বলে উঠল,"হাঁ, যিতনা জলদি মে হো সকে উসে ঢুঁঢনে কি কোশিশ করো। ঈশ্বর তুমহারি সহায়তা করে। দৃশ্য তিন দারোয়ানের অঙ্গুলি নির্দেশ করা ওই সরু গলির ভিতরে আমি আর অজিতেশ পা রাখলাম অবশেষে। গলিতে ঢুকতেই গা ঘিনঘিন করার মতো একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। গলি তে ঢোকার পর ই আমরা বুঝতে পারলাম, এটা একটা নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত... প্রচন্ড অস্বাস্থ্যকর একটা জায়গা।সরু গলিটার দুপাশে ডাঁই করা ময়লা ঢিবি,আর ওপরে ঝুলে থাকা তার... এইসব দেখে আমার শুধু মনে হচ্ছিল,এ আমরা কোন জায়গায় এসে পড়লাম! কোনো রকমে নাকমুখ চেপে ধরে আমরা এগোতে থাকলাম।টর্চের আলোয় দেখলাম, কাদার ওপর ছোট ছোট জুতোর ছাপ, আর তার পাশে দুটো বড় জুতোর ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ছোট ছাপগুলো যেন বড় এলোমেলো।ওই ছাপ দেখার পর আমাদের মনে কোনো সন্দেহই রইল না ,টুবলু কে রীতিমতো জোরজবরদস্তি টেনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নোংরা সংকীর্ণ এই রাস্তা দিয়ে। মোটামুটি দশ পা এগোনোর পর আমরা দেখলাম,গলিটা দুভাগ হয়ে গেছে।গলির বাঁ দিকটা একটা মিষ্টির দোকানের পেছনে গিয়ে শেষ হয়েছে, আর অন্য টা শেষ হয়েছে ডান দিকে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির দিকে। আমি বলে উঠলাম, "এবার কোন দিকে যাব অজিতেশ?" আমি দেখলাম, অজিতেশ হঠাৎ ধপ করে মাটিতে বসল। তারপর সেখানে নীচে টর্চের আলো ফেলল। আমি সেদিকে তাকাতেই দেখলাম, অজিতেশের টর্চ নিক্ষেপিত ওই জায়গায়...কাদায় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে টুবলুর লাল টিফিন বক্সটা। আমি দেখলাম, ঢাকনা খুলে যাওয়া ওই বক্সটার ভেতরে রয়েছে একটা রুটি। আর বক্সের গায়ে কাদা মাখা ছোট ছোট আঙুলের ছাপ! অজিতেশ বলে উঠল,"টুবলু কে ওরা ডান দিকে গেছে। চলো।" আমি আর বাক্যব্যয় না করে সাথে সাথে অজিতেশের সাথে এগিয়ে চললাম। অনেক টা এগোনোর পর আমাদের চোখে পড়ল,এই গলির একেবারে শেষে রয়েছে একটা ভাঙা টিনের ঘর। আমরা পা টিপে টিপে সন্তর্পনে সেদিকে এগোতে শুরু করলাম।ওই পরিত্যক্ত ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় হাত‌ রাখতেই বুঝতে পারলাম, এই ঘরের দরজাটা আদৌ ভিতর থেকে বন্ধ নেই, দরজা টা শুধুমাত্র আলগাভাবে ভেজানো রয়েছে। আমি দরজা টা অল্প ঠেললাম। অল্প ঠেলতেই ভিতরের যে দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ল, তা আমাদের খুব একটা বোধগম্য হল না। কারণ ঘরের ভেতরে শুধু নিকষ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। আমরা নিঃশব্দে ঢুকলাম ওই ঘরের ভিতরে।ঘরটা যে একেবারে ই ফাঁকা... এটা আমরা বুঝতে পারলাম অচিরেই। অজিতেশ ওর হাতের টর্চ টা জ্বালল। টর্চ এর আলোয় আমরা দেখলাম, এই টিনের চাল যুক্ত ছোট্ট ঘরটা এক্কেবারে ফাঁকা। জিনিস বলতে শুধু মাটিতে একটা ছেঁড়া চট পড়ে রয়েছে, আর তার ওপর রয়েছে একটা ঘুড়ির লেজ আর একটা বিড়ির টুকরো, আমি ওটায় হাত দিয়ে বুঝতে পারলাম, ওটা এখনো গরম রয়েছে। আমি হতাশ হয়ে বললাম, "অজিতেশ,এত ঝামেলা করে এই পর্যন্ত এসে কোনো লাভ ই হল না। ওরা পালিয়েছে।" অজিতেশ ওই চটটা হাতে তুলে নিল। তারপর ওটা শুঁকল। তারপর উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল, "না সুজিত, ওরা এখনো বেশি দূর যায়নি। দেখছ না, নিচে পড়ে থাকা বিড়ি টা এখনো গরম রয়েছে। হঠাৎ এই ঘরের ভিতরে একটা জিনিসের উপস্থিতি খেয়াল করে উত্তেজনায় আমার রক্ত গরম হয়ে উঠল। আমি বলে উঠলাম,দেখো অজিতেশ, এই চট থেকে আলতার একটা গন্ধ আসছে না? তোমার মনে আছে স্টাডি রুমে আমরা জানলার পাশে আলতার শিশি পেয়েছিলাম? অজিতেশ সাথে সাথে বলে উঠল,"হ্যাঁ সুজিত। তুমি একদম ঠিক বলেছ। আমি তো আগেই আন্দাজ করেছি,পেয়ালার নিচের লাল দাগটা রক্ত নয়,ওটা আলতার দাগ। এই চটেও তো দেখছি সেই একই গন্ধ। তার মানে পেয়ালাটা এখানে আনা হয়েছিল।" হঠাৎ আমরা আশেপাশেই একটা শব্দ শুনতে পেলাম, আমার আর অজিতেশের বুঝতে বাকি রইল না,এ শব্দ আসলেই...একটা বাচ্চা র দৌড়ে যাওয়ার শব্দ!আর এক মুহূর্তও দেরি না করে অজিতেশ সাথে সাথে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে ধরে ফেলল। তারপর একটু নরম স্বরে বলে উঠল, "এই যে খোকা, এখানে নীল সোয়েটার পরা কোনো ছেলেকে দেখেছ তুমি?" হঠাৎ করে এহেন অযাচিত প্রশ্নের মুখে পড়ে ছেলেটা যারপরনাই ভয় পেয়ে গেল। আমি সেখানে এগিয়ে এসে বলে উঠলাম,"খোকা, তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি শুধু আমরা যেটা জানতে চাইছি সেটার সঠিক উত্তর দাও, আমরা তোমাকে কিচ্ছু বলব না। আমরা তোমাকে পুরস্কার দেব। পুরস্কারের কথা শুনে এবার ছেলে টা বড় বড় চোখ করে বলে উঠল, "হ্যাঁ, ওই বড় মাঠের দিকে। দুটো লোক , আমার মতো একটা ছেলে কে জোর করে নিয়ে যাচ্ছিল। জানো ,ছেলেটা খুব কাঁদছিল।" আমি আর অজিতেশ মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমি এবার পকেট থেকে দু আনি পয়সা বার করে ছেলেটার দিকে সাদরে এগিয়ে ধরলাম। বললাম,"এই দুই আনি পয়সা টা রাখো বাবা, চকলেট কিনে খেও।" এই কথা শুনে ছেলেটা ভারি খুশি হল। আমার হাত থেকে সে পয়সা টা নিয়ে নাচতে নাচতে সেখান থেকে চলে গেল। আমরা এবার বাচ্চা ছেলেটার অঙ্গুলি নির্দেশ করা পথে পা বাড়ালাম।যে বড় মাঠটার দিকে বাচ্চা ছেলে টা অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিল, ওই মাঠ টা শেষ হয়েছে শ্মশানের কাছে। আমি পকেট থেকে ঘড়ি টা বার করে দেখলাম।রাত এখন প্রায় সাড়ে নটা। কুয়াশায় আচ্ছাদিত এই মাঠটাকে দেখে মনে হচ্ছে,মাঠ টা যেন একটা সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে রয়েছে। আমরা টর্চ হাতে ওই মাঠের দিকে পা বাড়ালাম। মাঠের মাঝখানে পৌঁছতেই দেখলাম,কাদায় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে একটা বাচ্চা ছেলে র এক পাটি জুতো। জুতোটা ছেঁড়া, কাদা মাখামাখি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে....একটা অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অজিতেশ হাঁটু গেড়ে বসে জুতোটা হাতে তুলে নিল। তারপর আমার দিকে তাকালো।ও আমার মনের অবস্থা টা বুঝতে পেরে বলে উঠল,"ভয় পেও না সুজিত, ওরা টুবলু কে প্রাণে মারবে না। টুবলুকে ওদের দরকার। টুবলু আসলেই ওদের কাছে শুধুমাত্র বন্দি নয়, টুবলু হল ওদের একটা হাতিয়ার।" এই বলে অজিতেশ হঠাৎ হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল‌। তারপর বলে উঠল,"দেখো সুজিত,এই কাদায় কেমন পায়ের ছাপ গুলো পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠেছে!" আমি নীচে র দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সত্যি ই তো। এই কাদায়, জড়াজড়ি করে থাকার পায়ের ছাপ গুলো এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে একটা নির্দিষ্ট দিকে। এটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। অজিতেশ বলে উঠল,"আর দেরি করা ঠিক নয় সুজিত, এক্ষুনি এই পায়ের ছাপ ধরে আমাদের এগোতে হবে ‌।টুবলু র এখন ভীষণ বিপদ! এরপর আমি আর অজিতেশ আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না ‌। আমরা ওই পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগোতে শুরু করলাম। নির্জন...নিকষ অন্ধকারে পরিপূর্ণ পথ ধরে অনেক টা রাস্তা হাঁটা র পর... হঠাৎ আমাদের চোখে পড়ল একটা ক্ষীণ আলো!ওই আলোটা আমাদের চোখে পড়ার সাথে সাথেই অজিতেশ বলে উঠল,"সুজিত,ওই আলোর উৎস অনুসরণ করে এবার এগোতে হবে আমাদের।" ওই আলো অনুসরণ করে এগোতে এগোতে অবশেষে আমাদের চোখে পড়ল মাঠের শেষে অবস্হিত একটা পরিত্যক্ত শিব মন্দির। মন্দিরের ভেতর থেকে ই ওই ক্ষীণ আলো টা আসছে, আমরা পা টিপে টিপে মন্দিরের কাছে এগোলাম।ক্রমে আমাদের কানে আসতে শুরু করল একটা ফিসফিসানির শব্দ। আমরা কান খাড়া করে রইলাম।অজিতেশ ওর টর্চের আলোটা নিভিয়ে ফেলল। চারপাশে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশেপাশে কোথাও শিয়াল ডেকে উঠল। আমার শিরায় শিরায় যেন একটা অজানা শিহরন খেলে গেল হঠাৎ। এখন রাত গভীর।আমি আর অজিতেশ শ্মশানের পাশে ওই ভাঙা শিবমন্দিরটার পেছনের ভাঙা জানলায় বুক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ... নিঃশব্দে।ওই ঘরের একটা জানলার পাল্লা হঠাৎ হাওয়ায় খুলে গিয়ে একটুখানি ফাঁকা হয়ে গেল।আর তার ফলপ্রসূ ওই ঘরের ভিতরের সামান্য অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল আমাদের সামনে। আমি দেখলাম,ওই ঘরের ভেতরে নিভু নিভু আঁচে জ্বলছে একটা হ্যারিকেন। তার আলোটা যেন তিরতির করে কাঁপছে। আর সেই সাথে, কম্পমান অবস্থায় ওই ঘরের দেওয়ালের ওপর প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে দুটো মানুষের ছায়াও।সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য টা তখন ই আমার চোখে পড়ল।আর সেই আলোয় আমি দেখতে পেলাম, ওই ঘরের মেঝেতে হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা, মুখে ন্যাকড়া গোঁজা অবস্থায় পড়ে রয়েছে টুবলু। ওর নীল সোয়েটারটা কাদায় একেবারে মাখা হয়ে গিয়েছে মাখি। বাচ্চা ছেলে টা কাঁদতে কাঁদতে শুধু ই হেঁচকি তুলছে, কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। এহেন দৃশ্য দেখে আমি প্রচন্ড ক্রোধে দিশাহারা হয়ে উঠে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ সেই মুহূর্তেই অজিতেশ আমার মুখে হাত চেপে ধরল। চাপা স্বরে বলে উঠল,শ্...শ্...শ্! অজিতেশ এবার আমার হাত ধরে টেনে অন্যত্র কোথাও যাওয়ার জন্য উদ্যত হল। আমি তো ওর এহেন আচরণের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি এটা খুব ভালোভাবেই জানতাম, অজিতেশ যে কাজ ই করুক, তার পিছনে নিশ্চয়ই কোন গূঢ় কারণ থাকবে। আমি তাই কোন প্রশ্ন না করে অজিতেশের সাথে সাথে চললাম। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর একটা ফাঁকা জায়গায় এসে থামল অজিতেশ। এইবার আমি বলে উঠলাম,"অজিতেশ, ওরা টুবলু কে...!" আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই অজিতেশ বলে উঠল,"তুমি চিন্তা করো না সুজিত। ওরা এখন টুবলু র কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ এখন টুবলু ই হল ওদের তুরুপের তাস! আমি মাথা চুলকে বলে উঠলাম,"বুঝলাম,তা এখন তাহলে আমাদের কি করণীয় অজিতেশ? বাচ্চা টা আর কতক্ষণ ওইভাবে ওদের হাতে পড়ে থাকবে?" অজিতেশ বলে উঠল,"দেখো সুজিত,টুবলু র ওই অবস্থা দেখে তোমার মতো আমারো মনে কিন্তু এক ই অস্হিরতা চলছে। আমার মন তো বলছে, এক্ষুনি ওই ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ি,আর ওদের হাত থেকে টুবলু কে উদ্ধার করি। কিন্তু এইভাবে এগোলে এইসব কিছুর নেপথ্যে থাকা আসল সত্যটা কখনোই সামনে আসবে না। আসল সত্যটা সামনে আনবার ব্যবস্থা করতে হবে।আর এই কারণেই টুবলু কে আরো কিছুক্ষন ওইভাবে থাকতেই হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমি বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলাম,"কি বলছ তুমি অজিতেশ!" অজিতেশ বলে উঠল, আমি ঠিকই বলছি সুজিত,ওই কাঁপা কাঁপা নিভু নিভু আলো তে , দেওয়ালে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠা দুটো ছায়া র সাথে সাথে আমি দুটো মানুষের চেহারা ও দেখতে পেয়েছি, দেওয়ালের গায়ে টাঙিয়ে রাখা একটা ছোট্ট আয়না র ফ্রেমে।" আমি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম,"হ্যাঁ হ্যাঁ অজিতেশ,দেওয়ালে টাঙানো একটা ছোট্ট আয়না যেন আমারো চোখে পড়েছে বলে ভাসা ভাসা মনে হচ্ছে। কিন্তু ওই আয়না তে তুমি কোন মানুষের চেহারা দেখতে পেয়ছ? গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,"হ্যাঁ সুজিত।ওই আয়না তে প্রতিফলিত হওয়া দুজন মানুষের প্রতিবিম্ব এখন আমার মাথায় পুরোপুরি গেঁথে গেছে।" অজিতেশ এর মুখে এই কথা শুনে আমি বিস্মিত দৃষ্টি তে তাকালাম ওর দিকে। তারপর বলে উঠলাম, "তোমার এই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি কে আমি তারিফ না করে পারছি না অজিতেশ। আসলে কি জানো, দেওয়ালের গায়ে টাঙানো একটা আয়না আমার চোখে ও চোখে তো পড়েছে । কিন্তু ওই আয়না তে প্রতিফলিত হওয়া মানুষের ছায়া কোনো মানুষের প্রতিবিম্ব নিরীক্ষণ করে তাকে শনাক্তকরণ করার যে আত্মবিশ্বাস,এটা তোমাকেই মানায় ভাই অজিতেশ... আমার এত ক্ষমতা নেই।" অজিতেশ এবার শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,"সুজিত, আমার তারিফ করার জন্য মেলা সময় পাবে। কিন্তু এখন আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এখন আমাদের যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।এই বলে অজিতেশ ওর পকেট থেকে একটা কাঁচের শিশি বার করল। তারপর বলে উঠল,এই শিশি টা আমি সুধাংশু বাবু র ঘরে ই পেয়েছিলাম। ওটা আমি আমার পকেটে রেখে দিয়েছিলাম তখন।অজিতেশ ওটা আমার দিকে এগিয়ে ধরল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, "এটা চিনতে পারছ? আমি একরাশ কৌতূহল নিয়ে ওই কাঁচের শিশি টা হাতে নিয়ে বলে উঠলাম,"হ্যাঁ চিনতে পারছি।এটা তো সেই...!" আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই অজিতেশ বলে উঠল,"এটা সেই কাঁচের শিশি, সুধাংশু বাবুর স্টাডি রুমের কুলুঙ্গি থেকে যে শিশি টা পেয়েছিলাম।" আমি বললাম, "হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে হয়তো এটা দিয়েই নকল রক্ত বানানো হয়েছিল?" অজিতেশ বলে উঠল,"হ্যাঁ, ঠিক তাই।পরে ওটা ভালো করে শোঁকার পর আমার সন্দেহ হয়েছিল, এটা কোনো নেশার জিনিস হতে পারে। কিন্তু পরে আমি বুঝতে পারি,এটা আসলেই কোনো নেশার জিনিস নয়। এটা আসলে মিউজিয়ামের জিনিস। সুধাংশু বাবু কিউরেটর ছিলেন তো, ওনার কাজ ছিল পুরোনো পুঁথি, মূর্তি যাতে পচে না যায় তার জন্য প্রিজারভেটিভ বানানো। বিলেত থেকে এক সাহেব বলেছিল - এমন একটা লাল রং বানান যা দেখতে টাটকা রক্তের মতো লাগবে, কিন্তু শুঁকলে গন্ধ বেরোবে না, দর্শকরা যাতে ডায়োরামা দেখে ভয় পায়।" সুধাংশু বাবু ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ১৯২৮ সালে বিলেতে গিয়ে তিনি মিউজিয়াম কেমিস্ট্রির উপর ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তার Preserve Room টাই ছিল তার ল্যাবরেটরি। ওনার স্টাডি রুমে রাখা কিছু খাতাপত্র ঘেঁটে দেখেছিলাম আমি। আমি শিশি টা হাতে নিয়ে সেটা টর্চ এর আলোয় ভালো করে দেখলাম একবার। শিশিটা র গায়ে একটা লেবেল সাঁটানো রয়েছে।ওই লেবেলে বড় বড় করে লেখা রয়েছে, মিউজিয়াম প্রিজারভেটিভ ফেরাম রুব্রাম কম্পাঃ নং ৭ শ্রী ব্যানার্জী, ১৯৩৮ অজিতেশ বলে উঠল,"জাহাঙ্গীরের পেয়ালায় রক্তের দাগ এর প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সুজিত, এখন এই রহস্য উদঘাটনের জন্য তোমাকে একটা ঝুঁকি নিতে হবে। তুমি একটা কাজ করতে পারবে?" আমি বললাম,"পারব। কিন্তু কি কাজ? অজিতেশ এবার আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "শোনো। তুমি চুপিসারে ওই ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। সেখানে গিয়ে একবার ওই দরজার কড়া নেড়ে তারপর সাথে সাথে সরে ওদের চোখে ধূলো দিয়ে লুকিয়ে পড়ো। এইভাবে এখন তুমি ওদের খানিকটা অন্যমনস্ক করো। এখন এটাই তোমার কাজ বুঝলে?" আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম, "আর তুমি?" অজিতেশ পকেট থেকে সেই কাঁচের শিশিটা বের করল। আমি দেখলাম, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় লেবেলটা রীতিমতো জ্বলজ্বল করছে । অজিতেশ ওটা হাতে নিয়ে বলে উঠল, "আমি ওই ঘরের জানালার কাছটায় গা ঢাকা দিয়ে থাকব । টেবিলের ওপর যে ঢাকা চাপা দেওয়া একটা স্বচ্ছ মদের পাত্র রয়েছে, এটা আমি লক্ষ্য করেছি। আমি জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে তাতে এই শিশির তরলের এক ফোঁটা মিশিয়ে দেব। এরপর তুমি দেখবে, ওদের কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়!" আমি চমকে উঠে বললাম, "সে কি! এটা খাওয়ালে যদি..." অজিতেশ আমার মুখ চেপে ধরল, তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল,"আরে না না, তুমি যা ভাবছ তা নয়।এটা বিষ নয় সুজিত।এটা শুধু মিউজিয়ামের রং। সুধাংশু বাবুর ডায়েরিতে লেখা ছিল, এটা খেলে মানুষের নেশার মতো ঘোর লাগে, আর ভেতরের চাপা কথা সব বেরিয়ে আসে। কৌতূহল বশত মিউজিয়ামের এক চাপরাশি এটা মুখে দিয়েছিল একবার। এরপর ও নেশায় বেসামাল হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে সুধাংশু বাবু এটা সামলে রাখতেন। এসব তার খাতা তেই লেখা ছিল ‌।এই চাল টা ঠিকমতো চালতে পারলে,মরবে না কেউই, শুধু ওদের জিভ আলগা হবে।আর এটাই তো আমাদের দরকার। আসল সত্যিটা ওদের মুখ দিয়েই বের করাতে হবে আমাদের।" আমি ঢোক গিলে বললাম, "সে না হয় বুঝলাম,যদি ধরা পড়ে যাই?" অজিতেশ সাথে সাথে বলে উঠল, "তুমি কিছুতেই ধরা পড়বে না সুজিত। তুমি কড়া নাড়লেই ওরা দুজন দরজার দিকে ছুটবে। ওই ফাঁকে আমি জানলার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে কাজ সেরে নেব। তারপর তুমি আমি আবার এই ভাঙা জানলায় এসে দাঁড়িয়ে শুনব। ওরা যখন ওই পাত্র থেকে খাবে, তখনই সব সত্যি উগরে দিতে শুরু করবে।" এই বলে অজিতেশ শিশিটা মুঠোয় নিয়ে বাঘের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে চলল ওই ঘরের জানালা র দিকে। আমার বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি টিপতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর দ্রুতবেগে চলতে থাকা প্রবল ঢিপঢিপানি নিয়ে আমি কোনোমতে পা টিপে টিপে সন্তর্পনে এগিয়ে ওই ঘরের দরজার কাছে গেলাম। নিজের মনে বলে উঠলাম,যা থাকে কপালে!কম্পিত হাতখানি বাড়িয়ে দুবার জোরে কড়া নাড়লাম - ঠক ঠক ঠক! ভেতর থেকে চমকে উঠে একজন হেঁড়ে গলায় বলে উঠল, "কে? কে ওখানে?" আমি সাথে সাথে সরে গিয়ে অন্ধকারে দেওয়ালের সাথে মিশে গেলাম। ভেতরে হ্যারিকেনের আলো টা নড়ে উঠল। আমি জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, দুটো লোক লাঠি হাতে দরজার দিকে এগোচ্ছে। আর সেই ফাঁকে অজিতেশ বিদ্যুতের মতো জানলার কাছে রাখা টেবিলের ওপর রাখা পাত্রটার ঢাকনা একটু তুলল। তারপর... আমার আর দেখার সাহস হল না। আমি চোখ বুজে ফেললাম। মিনিট খানেক পর অজিতেশ ফিরে এসে আমার পিঠে টোকা দিল। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আমি দেখলাম,তার মুখে ছেয়ে রয়েছে একটা আত্মতৃপ্তির হাসি। চাপা স্বরে অজিতেশ বলে উঠল, "কাজ হয়ে গেছে। এবার চলো, ওই জানলায় গিয়ে কান পাতি। এইবার খেলা এবার শুরু হবে।" এবার আমরা আবার সেই ভাঙা জানলায় বুক ঠেকিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতরে তখন একজন বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলছে, "ধুর, কেউ নেই। নির্ঘাত বাতাসে কড়া নড়েছে।" তা শুনে অন্যজন বলল, "বড্ড ঠান্ডা লাগছে। দে, ওই পাত্র থেকে একটু গলা ভিজিয়ে নিই, তারপর টুবলুটাকে নিয়ে বেরোব।" আমি আর অজিতেশ এবার চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ভেতরে তখন ওই কাঁচের পাত্র থেকে ঢকঢক করে গলায় ঢালার দৃশ্য টা আমরা দুজনে আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখতে শুরু করলাম। আমি আর অজিতেশ জানলার ফাঁকে বুক ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছি,আর চুপাসারে উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করছি ভিতরে র সব ঘটনা প্রবাহ। অজিতেশ আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,"সুজিত, এখন আর উঁকি ঝুঁকি দিয়ে লাভ নেই। বরং এখন কান খাড়া করে শোনো।" এই কথা শুনে আমি উঁকি দেওয়া বন্ধ করে শুধু কান খাড়া করে রইলাম। চারপাশে এখন মাঘের হাওয়া শনশন করে বইছে, ভেতরে হ্যারিকেনের আলোটা তিরতির করে কাঁপছে। হঠাৎ আবার ঘরের ভিতরে মানুষের গলার স্বর শোনা গেল। প্রথম গলাটা একটু ভারী, জড়ানো ।সে বলে উঠল, "নে গনেশ, আর একটু খা। আজ রাতেই কাজ শেষ। বড়বাবু বলেছে, এই বাচ্চাটাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।" আমি চমকে উঠলাম। গনেশ? মানে ব্যানার্জি ভিলার নতুন চাকর গনেশও এখানে! আমি বিস্মিত দৃষ্টি তে তাকালাম অজিতেশের দিকে।ও আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে ইশারা করে বলতে চাইল, এখন শুধু চুপ করে থাকো আর কান খাড়া করে শোনো। ওদিকে দ্বিতীয় গলাটা কম্পমান অবস্থায় বলে উঠল, "কিন্তু হরিহর দা, তুমি না বলেছিলে টুবলুকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে?" হরিহর দা! এই নামটা শুনেই অজিতেশ আমার কনুইতে খোঁচা দিল। তার চোখ জ্বলছে। ভেতরে হরিহরের গলা। কিন্তু...কিন্তু...এখন আর তো সে আগে র মতো তোতলাচ্ছে না, ওর গলা এখন রীতিমতো পরিষ্কার ও ধারালো শোনাচ্ছে। সে ন নেশায় আচ্ছন্ন অবস্থায় বলে উঠল, "দূর বোকা! বাঁচিয়ে রাখতেই তো হয়েছিল! এতদিন বাঁচিয়ে না রাখলে মানদা বুড়ি দরজা খুলত? শোন, আমি তোকে আগেও বলেছি। টুবলুকে যদি মেরে ফেলতাম, তাহলে মানদা বুড়ি কে টুবলু র হাতর লেখা চিঠি পাঠিয়ে পাঠিয়ে ভয় দেখানো যাবে না ‌।" ওই ব্যানার্জি ভিলায় একমাত্র ওই বুড়িই প্রথম থেকে জানে আমার আসল পরিচয়! ওই তো আমাকে ছোটবেলায় কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। আমি যখন পাঁচ বছর আগে বৃদ্ধ চাকর হরিহরের বেশ ধরে ব্যানার্জি ভিলায় আবার ফিরে এলাম, তখন ওই আমাকে দেখে আমাকে চিনে ফেলেছিল! আমার গালের ওই কাটা দাগটা দেখে! আমি তখন ওকে বলেছিলাম , মুখ খুললে তোর নাতি টুবলুকে কেটে শ্মশানের মাঠে পুঁতে দেব। তখন থেকেই ও ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। যন্ত্রের মতো আমার সব হুকুম তামিল করে আসছে। ও ভালো করেই জানে জানে আমিই সেই সেজো খোকা, যাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এই ব্যানার্জি ভিলা থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল।এখন টুবলু হল আমাদের অস্ত্র।টুবলু বেঁচে আছে বলেই ও চুপ করে আছে। টুবলু মরে গেলে ও পাগল হয়ে গিয়ে সব টা ফাঁস করে দেবে!" এইসব শুনে আমার সারা শরীর হিম হয়ে গেল। মানদা পিসিকে এরাই ভয় দেখিয়ে অনেক কিছু করিয়েছে! সে জানত হরিহরই সুব্রত! নাতির অপহরণের পর অল্প মুখ খুললেও পুরো বৃত্তান্ত টা বলতে পারেনি শুধুমাত্র ভয়ের কারণে।প্রচন্ড রাগে আমার সারা শরীর রি রি করতে শুরু করল এবার। ক্রমশ আমরা বুঝতে পারলাম,ওরা দুজনেই একেবারে নেশা র ঘোরে চলে গিয়েছে,আর ওদের বেসামাল প্রলাপের সাথে সাথে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে সব সত্যি গুলো ‌। আমি আর অজিতেশ এবার জানলার কাছে এসে দাঁড়ালাম।এর ফলপ্রসূ আমরা দেখতে পেলাম, ঘরের ভিতরে হ্যারিকেনের আলোয়,হরিহর ধীরে ধীরে ঝোলা থেকে বের করছে সেই বহুমূল্য জিনিসটা! জাহাঙ্গীরের আসল রত্নখচিত পেয়ালা! হ্যারিকেনের আলোয় সেটা রীতিমতো ঝকমক করছে। কিন্তু তার গায়ে এখনো লেগে রয়েছে টাটকা লাল দাগ! সে ওই ফেরাম রুব্রাম শিশি থেকে আরও একটু লাল তরল পেয়ালার গায়ে মাখাচ্ছে।মাখাচ্ছে আর বলছে, আমি এর গায়ে এই রংটা লাগিয়েছি! কেন জানিস?" গণেশ নেশার ঘোরে বলে উঠল, "কেন দাদা?" ততোধিক নেশার ঘোরে হরিহর অর্থাৎ সুব্রত ব্যানার্জি বলে উঠলেন, "কারণ আমার প্ল্যান ছিল অন্য! প্রথমে বড়দাকে মারলাম গাড়ি দুর্ঘটনা র সাজানো ষড়যন্ত্র করে। কেউ আমাকে ধরতে পারল না। তারপর প্ল্যান করলাম,মেজদা সুধাংশু ব্যানার্জি কে চোর অপবাদ দিয়ে, তিল তিল করে শেষ করবার।পেয়ালা চুরি করে বিদেশে মোটা টাকায় বিক্রি করব আমি, কিন্তু সবাই জানবে , রিসার্চ করার নাম করে ও নিজেই পেয়ালা টা চুরি করেছে। মেজদা কে আমি চিনি।ও এত বড় অপমান সহ্য করতে পারবে না।ও অপমানে আত্মহত্যা করবে। তারপর আমার পরবর্তী নিশানা হবে সুবিনয়। গণেশ নেশায় আচ্ছন্ন কন্ঠে বলে উঠল,"ছোট দাদাবাবু!" অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সুব্রত ব্যানার্জি বলে উঠলেন,"হ্যাঁ,ও ব্যাটা যে কলকাতায় ফিরে আসছে অল্প দিনের মধ্যেই,এই খবরটা আমি জানতাম। ওকে আমি পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব, এরকম ই পরিকল্পনা ছিল আমার! মেজদা আর সুবিনয় যে আগে প্রায় ই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করত,এটা কারোর অজানা ছিল না। সুবিনয় কে যদি আগে সরিয়ে দিই, তাহলে সেই খুনের দায়টাও মেজদার ওপরেই আমি সহজে চাপিয়ে দিতে পারব। সবাই ভাববে, সুধাংশুই তুমুল ঝগড়া র পর,ভাইকে খুন করেছে ,পেয়ালাটা ওই চুরি করেছে! এইসবের পর,ওর জেল হওয়ার আগেই ও আত্মহত্যা করত।" গণেশ নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে বলে উঠল, "কিন্তু মেজোবাবু তো আত্মহত্যা করলেন না..." "আরে এইটাই তো আমার দুর্ভাগ্য! মেজদার সামনে একদিন আমার নকল দাঁড়ি টা খুলে গিয়েছিল। ওইসময় ও হঠাৎ আমাকে চিনে ফেলল! আজ বিকেলে যখন আমি পেয়ালা সরাতে গেছি, ও আমার গালের দাগটা দেখে চিৎকার করে উঠল - 'সুব্রত! তুই...তুই আবার ফিরে এসেছিস!' আমি তখন বেগতিক বুঝে তাড়াহুড়ো করে ওই হাতির পেপারওয়েটটা দিয়ে ওর মাথায় মারলাম! আর তাড়াহুড়োয় পেয়ালায় এই রক্তের দাগ লাগালাম।ওই সময়ে আমার ভিতর থেকে কেউ যেন আমাকে ফিসফিস করে বলছিল,'এরপর তোর নেক্সট নিশানা সুবিনয়, ওর খুনের দায় টা ,এই মৃত সুধাংশুর ওপরেই কায়দা করে চাপাতে হবে! পুলিশ ভাববে, ভাই এ ভাই এ দ্বন্দ্ব র ফলপ্রসূ সুধাংশুই সুবিনয়কে মেরেছে আর তার ফলপ্রসূ রক্ত লেগেছে এই পেয়ালায়! রক্ত মাখা পেয়ালা টা চোখে পড়বে প্রবীরের।ওর সাক্ষী তে পুলিশ ভাববে,এটা ভাই এ ভাই এ দ্বন্দ্ব র কেস।আর এরপর আমি গোপনে পেয়ালা নিয়ে পগারপার হয়ে যাব। কেউ কিচ্ছু টি টের পাবে না...হি হি হি...!" এই পর্যন্ত শুনে অজিতেশ আর থাকতে পারল না। সে পকেট থেকে হুইসেলটা বের করে প্রাণপণে বাজাল - পিঁইইইই! সত্যি বলতে কি,এই হুইসেলের জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম। ব্যানার্জি ভিলা থেকে বেরোনোর সময় অজিতেশ পটলডাঙার মোড়ের চায়ের দোকানের ছেলেটাকে দুটো আনা দিয়ে বলেছিল, "থানায় গিয়ে বলবি, আমরা শ্মশানের শিবমন্দিরে গেছি, হুইসেল শুনলেই বড়বাবু যেন ফোর্স নিয়ে ঢোকেন।" হুইসেলের শব্দ হওয়ার সাথে সাথেই বাইরের অন্ধকার থেকে একসাথে পাঁচটা টর্চের আলো জ্বলে উঠল। ইন্সপেক্টর সমরেশবাবু আর চারজন কনস্টেবল হুড়মুড় করে ভাঙা দরজা ভেঙে ঢুকলেন। আমরা যে পায়ের ছাপ, টিফিন বক্স, জুতোর ছাপ ধরে ধরে এসেছি, পুলিশও সেই সূত্র ধরেই আমাদের পেছন এসেছে, কিন্তু অজিতেশের সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল। হরিহর ওরফে সুব্রত ব্যানার্জি পেয়ালাটা নিয়ে পালাতে গেলেন, কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন। গনেশ ততক্ষণে মাটিতে পড়ে বিড়বিড় করতে শুরু করেছে।আর সব সত্যি সব উগরে দিচ্ছে, সমরেশ বাবু ওর কলার চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন,"মানদা পিসি কে ওই হুমকি চিঠি তুইই লিখেছিস তো? স্বীকার কর...!" সমরেশ বাবু র শক্ত হাতে পড়ে গিয়ে এবার বেসামাল হয়ে গণেশ সব সত্যি উগরে দিল। "হ্যাঁ,আমি লিখেছি বাবু, ওই চিঠি আমিই লিখেছি... । আমি ডান হাত আর বাম হাতে...এই দুই হাতেই লিখতে পারি হুজুর,ওই চিঠি আমি বাঁ হাতে লিখেছি...!" অজিতেশ এবার সেখানে এগিয়ে এল। তারপর হাসতে হাসতে বলে উঠল, "আমি আপনাকে আগেই বলেছি সমরেশ বাবু,এই লোকটা দুহাতে লিখতে পারে।আর এটা আমার চোখে পড়েছে অনেক আগেই। ব্যানার্জি ভিলায় যখন সবাথ হাতের লেখা পরীক্ষা করছিলাম আমরা, তখন ও ডানহাতে ই লিখছিল।ব্যানার্জি ভিলা থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ আমার চোখে পড়ে, গণেশ ব্যানার্জি ভিলার মাস কাবারির বাজারের ফর্দ টা লিখছে বাম হাতে।ওই সময়ই ওর প্রতি আমার সন্দেহ গাঢ় হতে শুরু করেছিল। সমরেশবাবু এবার হরিহর ওরফে সুব্রত ব্যানার্জি র দিকে ঘুরলেন। তার নকল দাড়ি-গোঁফ ততক্ষণে খুলে পড়েছে।আর তার ফলপ্রসূ বেরিয়ে এসেছে ওঁর আসল চেহারা টা।ফর্সা, লম্বা, গালে সেই কাটা দাগ, যেমন বর্ণনা মানদা পিসি দিয়েছিলেন, সেই সবকিছুই হুবহু মিলে যাচ্ছে। সমরেশ বাবু এবার সুব্রত ব্যানার্জির কলার চেপে ধরে বলে উঠলেন, "এবার তুই বল সুব্রত! টুবলুকে দিয়ে তুই কেন চুরি করালি?" সমরেশ বাবু র মুখে এই প্রশ্ন শুনে আমি চমকে উঠলাম। টুবলুকে দিয়ে চুরি? আমি দেখলাম,সুব্রত এখন নেশার ঘোরে সব উগরে দিতে শুরু করেছে। অজিতেশের সেই ফেরাম রুব্রাম কম্পাউন্ডের ঘোরে ওর জিভ একেবারে আলগা হয়ে গেছে। ---"হ্যাঁ! টুবলুকে দিয়েই তো করিয়েছি! না হলে কি করে করব? সুধাংশু দাদা তো জানলার ছিটকিনি ভেতর থেকে আটকে রাখত! আর দরজা তো মানদা খুলে দিয়েছিল, কিন্তু আমি তখন ঘরের ভিতরে ঢুকে বুঝেছিলাম,নিরাপদ ভাবে চুরি টা করতে হলে চাল টা অন্যভাবে চালতে হবে।ওই পেয়ালা তো টেবিলের ওপর ছিল! আর টেবিল টা ছিল জানলার পাশে। সেদিকে নজর যেতেই আমার মনে হল, কোনো ছোট বাচ্চা কে দিয়ে যদি ওই জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে চুরি টা করাতে পারি, তাহলে আমার বমাল সমেত ধরা পড়ার সম্ভাবনা অনেক টা কমে যাবে। আমি আর অজিতেশ মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। সুব্রত নেশার ঘোরে হেসে উঠল, তারপর আবার বলতে শুরু করল। "হ্যাঁ! টুবলুকে স্কুল থেকে তুলে এনে ওকে জোর ভয় দেখালাম। বললাম, তোর দিদাকে মেরে ফেলব যদি আমার কথা না শুনিস। তারপর বিকেলে টুবলুকে জানলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম! ও ছোট, ও জানলার শিক গলে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে! ওকে বললাম, টেবিলের ওপর থেকে ওই চকচকে বাটিটা নিয়ে আয়। ও ভয়ে ভয়ে জানলার কাঁচে হাত দিয়ে উঠল, আর তারপর... তারপর ওই পেয়ালা টা এনে আমাদের হাতে দিল। আমি চিৎকার করে উঠলাম, "তার মানে জানলার কাঁচে যে ছোট সরু আঙুলের ছাপ ছিল, ওটা টুবলুর!" অজিতেশ মাথা নাড়ল, "একদম। আমি তখনই বুঝেছিলাম, সুধাংশু বাবুর হাত অত ছোট নয়। ওটা কোনো বাচ্চার হাত। কিন্তু আমি এটা ভাবতে পারিনি, খুনিরা সত্যি ই একটা বাচ্চাকে দিয়েই চুরি টা করাবে!" সুব্রত ততক্ষণে বলেই চলেছে... "আর টুবলু পেয়ালাটা নিয়ে আসার পরই, মেজদা ওকে দেখে ফেলল! আর সেই সাথে আমাকেও দেখে ফেলেছিল! আমার নকল দাড়ি তখন খুলে গেছিল! আমাকে দেখামাত্র মেজদা চিৎকার করে উঠল , 'সুব্রত! তুই! তুই ফিরে এসেছিস!'... আমি ভয় পেয়ে গেলাম । আমি বুঝে গেলাম, এক্ষুনি ওই অপোগন্ডটার মুখ বন্ধ করতে হবে। আমি সাথে সাথেই বাইরে থেকে সোজা ভিতরে ঢুকে,ওই স্টাডিরুমে চলে আসি। তারপর একটা পেপারওয়েট দিয়ে ওর মাথায় সজোরে আঘাত করি! আর তারপর তাড়াতাড়ি করে ওই ফেরাম রুব্রামের লাল রং টা চারপাশে ঢেলে দিলাম!" সমরেশবাবু বললেন, "কেন ?কি জন্য চারপাশে রং ঢাললি তুই? সুব্রত নেশার ঘোরে বলে উঠল, "আরে মশাই,আমার আসল প্ল্যান তো ছিল, মেজদা কে চোর অপবাদ দেওয়া! ওই পেয়ালা চুরি করব আমি,আর চুরি র দায় পড়বে মেজদা র ওপর! আমি জানতাম,এই অপমান ও হজম করতে পারবে না।ও অপমানে নিশ্চিত ভাবে আত্মহত্যা করবে! আমি ভেবেছিলাম টুবলুকে দিয়ে চুরি করালে কেউ আমাকে ধরতে পারবে না! এরপর আমি সুবিনয় কে খুন করতাম। আমি চেয়েছিলাম,মেজদার ঘরে রক্তের হোলি খেলা দেখে সবার মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হবে, মেজদা আর সুবিনয়ের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছিল! একসাথে নিজের ভাইয়ের হত্যাকারী আর সেই সঙ্গে চোর সাব্যস্ত হয়ে ও তিলে তিলে শেষ হবে!আর আমি দূর থেকে আত্মতৃপ্তি অনুভব করব।" সমরেশ বাবু বলে উঠলেন,"কেন... কেন এইসব করছিলি তুই? ব্যানার্জি পরিবার তো তোর নিজের পরিবার তাই না? সেখানে তুই এমন প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠলি কেন?" এবার হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন সুব্রত বাবু। তারপর হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে ওর ওই উন্মত্ত উল্লাস একটা পৈশাচিক ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা র রূপ নিল।ও দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল,"ওই ব্যানার্জি ভিলার লোকগুলো আমাকে পথে বসিয়েছে।আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে ওই বাড়ি থেকে আমাকে বিতাড়িত করেছে ওরা। আমাকে ত্যাজ্য করে, ওরা তিন ভাই মিলে এতবড় সম্পত্তি মহানন্দে ভোগ করবে!সেটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না। ওই তিন ভাই কে শেষ করে তারপর ওই সম্পত্তি ভোগ করব আমি একা... শুধু একা...!" আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সুব্রত বাবু এখন আর নিজের মধ্যে ই নেই। একটা পাশবিক উল্লাস যেন ভর করেছে ওঁর ওপরে।আর ওঁর পাশে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে গণেশ। অজিতেশ এবার বলে উঠল,"এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন তো,সমরেশ বাবু, জাহাঙ্গীরের পেয়ালায় যে রক্তের দাগটা রয়েছে, সেটা আসলেই ব্যানার্জি পরিবারের ভিতরের একটা চিড়!ভাইএ ভাইএ তীব্র প্রতিশোধ পরায়নতা ও প্রতিহিংসার এক প্রতিফলন ছাড়া আর কিছুই নয়।এই গণেশ কে যে কিছু টাকা র লোভ দেখিয়ে সুব্রত ব্যানার্জি নিজের দলে ভিড়িয়ে নিয়েছিলেন,এটা তো বোঝার এখন কোন বাকি নেই!" আমি ততক্ষণে টুবলু র হাত পা থেকে দড়ি খুলে ওকে মুক্ত করলাম।ও বেচারা এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছে,যে থরথর করে কাঁপছে শুধু। অজিতেশ এবার টুবলুর কাছে এগিয়ে এসে বলে উঠল,আর তোমার কোনো ভয় নেই টুবলু সোনা, তুমি এখন তোমার ঠাম্মার কাছে ফিরে যাবে খুব শীঘ্রই। সমরেশ বাবু সুব্রত ব্যানার্জি আর গণেশ কে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের জিপে তুললেন। তারপর শান্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,"অজিতেশ বাবু, আপনি যদি না থাকতেন, তাহলে সুধাংশু ব্যানার্জি র খুনি হয়তো অধরাই থেকে যেত,আর এই সুব্রত ব্যানার্জি এই বহুমূল্য বস্তুটা বিদেশে চালান করে দিত।" অজিতেশ বলে উঠল,"কর্তা তো ঈশ্বর, তিনি ই আমাকে দিয়ে আসল সত্য র উদঘাটন করিয়ে নিলেন। আমি তো নিমিত্ত‌ মাত্র...! আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে।ভোরের আলো টা সবে ব্যানার্জি ভিলার কার্নিশে এসে পড়েছে। মাঘের কুয়াশা কেটে গিয়ে হালকা রোদ উঠেছে। কিন্তু ব্যানার্জি ভিলার বাড়ির ভেতরের আবহ টা তখনও থমথমে। বৈঠকখানার ঘরে মানদা পিসি মেঝেতে বসে, দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন। সারারাত তিনি দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি। আমরা যখন টুবলুকে কোলে নিয়ে ব্যানার্জি ভিলার সদর দরজা দিয়ে ঢুকলাম, মানদা পিসি পিসি প্রথমটা ভীষণভাবে চমকিত হয়ে উঠলেন। তিনি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না,যে তাঁর আদরের নাতি টুবলু কে আমরা ঘরে ফিরিয়ে এনেছি শেষ পর্যন্ত। টুবলু যখন আস্তে করে ডাকল, "ঠাম্মা..." মানদা পিসি চমকে মুখ তুললেন। তারপর সাথে সাথে উঠে,এক দৌড়ে এসে টুবলুকে আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। "ওরে আমার টুবলু রে... ওরে আমার সোনা রে... তুই এতক্ষণ ধরে কোথায় ছিলি রে বাবা..." বৃদ্ধার বুক ফেটে অব্যক্ত যন্ত্রনা ক্লিষ্ট কান্না বেরিয়ে এল। টুবলুও ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। তার নীল সোয়েটারটা তখনও কাদা মাখা, তার ছোট হাত দুটো ঠাম্মার গলা জড়িয়ে ধরে আছে ।যে হাত দুটো দিয়েই সে ভয়ে ভয়ে জানলার শিক গলে ঢুকে পেয়ালাটা চুরি করেছিল ওই হাত দুটো দিয়ে এখন সে সাদরে মুছে দিচ্ছে ঠাম্মা র চোখ উপচে প্রবাহমান নদীর মতো নির্গত হতে থাকা অশ্রু ধারা‌। আমি আর অজিতেশ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম। এতক্ষণের সব জট, সব ভয়, সব রক্তের দাগ যেন ওই কান্নায় যেন ধুয়ে যাচ্ছে। সুবিনয় দৌড়ে এসে মানদা পিসির পাশে বসল, তারপর বলে উঠল,"পিসি, কেঁদো না। টুবলু ফিরে এসেছে।এখন সব দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনার এখানেই ইতি।" মানদা পিসি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, "আমি জানতাম বাবা... আমি জানতাম হরিহরই এই ব্যানার্জি ভিলার সেজো খোকা... ওর গালের কাটা দাগটা দেখেই আমি ওকে চিনেছিলাম... কিন্তু ও বলেছিল, মুখ খুললে টুবলুকে মেরে ফেলবে... তাই আমি কিছু বলতে পারিনি বাবা... আমাকে মাফ করে দাও...!" অজিতেশ এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল, "না পিসি, আপনার কোনো দোষ নেই। আপনি নাতিকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। দোষ তো ওই সুব্রত ব্যানার্জি র, যে একটা বাচ্চাকে দিয়ে চুরি করিয়েছে। তারপর সুধাংশু বাবু কে নিজের হাতে খুন করেছে।ওর কঠোর শাস্তি র ব্যবস্থা হবে।" টুবলু তখন ঠাম্মার কোল থেকে মুখ তুলে অজিতেশের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে বলল, "ওই লোকটা বলেছিল... ওই সুন্দর দেখতে বাটিটা এনে দিলে আমাকে ছেড়ে দেবে... আমি ভয় পেয়ে জানলায় হাত দিয়ে উঠেছিলাম...!" অজিতেশ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, "জানি রে। তোর ওই ছোট হাতের ছাপটাই তো আমাদের সামনে রহস্যের জট খুলে দিয়েছে। তুই না থাকলে আমরা হয়তো অপরাধী কে ধরতেই পারতাম না।" এমন সময় সুবিনয় উঠে এসে অজিতেশের দুটো হাত শক্ত করে ধরল। ওর চোখে জল ছলছল করে উঠেছে। "অজিতেশ বাবু, আপনি না থাকলে আমি প্রাণে বেঁচে থাকতাম না।" অজিতেশ অবাক হয়ে বলল, "সে কি কথা সুবিনয় বাবু?" সুবিনয় গলা ধরে আসা স্বরে বলল, "আপনি ঠিকই ধরেছিলেন। সুব্রতদার আসল নিশানা ছিলাম আমিই। দাদাকে চোর বানিয়ে, আমাকে খুন করে দোষটা দাদার ঘাড়ে চাপানো। আজ যদি আপনি টুবলুকে খুঁজে বের না করতেন, যদি ওই শিবমন্দিরে না যেতেন, তাহলে কাল সকালে আমার লাশটা পড়ে থাকত এই ভিলারই কোনো ঘরে। আর সবাই ভাবত, মেজদা আমাকে মেরেছে। আপনি আমার প্রাণ বাঁচালেন, আর আমার দাদাকে মিথ্যা অপবাদের হাত থেকেও বাঁচালেন।" অজিতেশ মৃদু হেসে বলল, "আমি কিছু করিনি সুবিনয় বাবু। করেছে টুবলু। ওই ছোট ছেলেটাই আজ ব্যানার্জি ভিলাকে বাঁচিয়ে দিল। আর পেয়ালাটা..." সমরেশবাবু তখন রুমাল দিয়ে মোড়া জাহাঙ্গীরের পেয়ালাটা নিয়ে এসে বৈঠকখানার টেবিলে রাখলেন। তার গায়ে তখনও লেগে আছে সেই নকল রক্তের দাগ - আলতা আর ফেরাম রুব্রাম মেশানো ওই নকল দাগ। "এটা ভারত কলাভবনে ফিরে যাবে," সমরেশবাবু বললেন, "আসল জিনিস আসল জায়গাতেই থাকা ভালো।" অজিতেশ পেয়ালাটার দিকে তাকিয়ে বলল, "ঠিক বলেছেন। ইতিহাসের জিনিস ইতিহাসেই থাকুক। মানুষের লোভ আর প্রতিশোধের রং লাগলে তার আর দাম থাকে না।" এরপর বেলা গড়িয়ে আসল। আমরা ফিরে এলাম হ্যারিসন রোডের বাড়িতে।রামু কাকা রান্নাঘর থেকে গরম চায়ের ট্রে নিয়ে এসেছে। এবার আর কৃষ্ণকুমারীর বকুনি নেই। উপরন্তু সে আমাদের দুজনের সামনে দু প্লেট গরম লুচি আর ছোলার ডাল রেখে বলে উঠল, আমাকে কিন্তু এই ব্যানার্জি ভিলার কেসের পুরো গল্পটা বলতে হবে। এতটুকুও বাদ দিলে কিন্তু চলবে না। আমি এক কাপ চা তুলে নিয়ে অজিতেশের দিকে তাকালাম। অজিতেশও চায়ে চুমুক দিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে, চায়ে চুমুক দিয়ে ও কৃষ্ণ কুমারী কে এই ব্যানার্জি ভিলার কেসের গল্প টা সবিস্তারে বলতে শুরু করল। আমি খাওয়া শেষ করে, খাতা কলম হাতে তুলে নিলাম।আমাদের মনে শুধু রয়ে গেল ,একটা ভয় পাওয়া বাচ্চার হাতের ছাপ...যেটা একটা গোটা পরিবারকে বাঁচিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল...! সমাপ্ত                                                                                      


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Crime