অপয়া
অপয়া
রিতাভরি যখন সাত বছরের দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসে তখনও ও জানেত না আকাশকে ছেড়ে বেরিয়ে আসছে না , ওর সাথে আর একটা প্রাণ ও আকাশের বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে আসছে । রিতাভরি র সাথে রজনী সন্যালের বিয়ে হয় সম্বন্ধ করেই । তার পর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রজনীর আচমকাই মৃত্যু হয় হানিমুনে গিয়ে । বিয়ের সতেরো দিনের মাথায় রিতাভরি যখন ফিরে এসেছিল বাপের বাড়ি সবাই মুখের উপর বলেছিল মেয়ে বড্ড অপয়া । বাপ মায়ের একমাত্র মেয়ের এই পরিণতি বড্ড ভেঙে দিয়েছিল রিতার মা বাবাকে । রজনীর সম্পত্তি বন্টন হবার পর রিতাকে ওর ননদ কিছু অংশ দিতে চেয়েছিল রিতা তা নিতে অস্বীকার করে । যার সাথে স্বপ্নের খেলাঘর গড়তে গিয়েও গড়া হয়নি তার সম্পত্তির উপর আর কোন অধিকার রিতা দাবি করতে চায়নি । তার পর বাবা মায়ের চাপে পড়ে দু বছর পর আবার বিয়েতে রাজি হয়েছিল রিতাভরি । এবার পাত্র আকাশ তাদের পাড়ার ছেলে , কাজের সূত্রে সুরাটে থাকে । শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ের জন্য রিতার মা খুব যোগ্য পাত্র চেয়ে ছিলেন আর রজনীর রূপে সেই ইচ্ছা যখন পূরণ হয়েও হলোনা এবার রিতার মা খুব সাধারণ ছেলেই নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন । আকাশ দে রিতার পাড়ার ছেলে , দেখতে শুনতে ও তেমন কিছু না আর জব ও খুব ভালো না তবু আকাশ রাজি হয়েছিল যেচে । আর না করেনি রিতার মা বাবা , আকাশ কে ওরা ছোট থেকে চেনে আর পরিবার বলতে ওর মা আর কেউ নেই সাতকুলে । মেয়ে ভালো থাকবে এই ভেবে রিতাভরির সাথে আকাশের বিয়ে দিয়ে দিলেন ওর বাবা মা । তার পর কিছুদিন বেশ ভালোই কেটেছিল রিতার , রজনীর মত না হলেও আকাশ তাকে ভালো রেখেছিল । তার পর যখন বিয়ের কবছর পেরিয়েও রিতা মা হতে পারছিল না তখন আকাশ ধৈয্য হারাতে শুরু করে । আস্তে আস্তে গালি গালাজ , মার ধোর শুরু করে আকাশ , তার পর সেটা অত্যাচারে পরিণত হয় । সুরাট থেকে অনেক বার চলে আসতে চেয়েও রিতা আটকেছে নিজেকে কারণ বাবা ততদিনে গত হয়েছেন । মায়ের ভরসা ওই পেনশনের কটা টাকা আর মনে মনে অলীক সুখ যে মেয়ে ভালো আছে । মাকে আর কষ্ট দিতে চাইনি রিতাভরি , সে দিনের পর দিন মুখ বুজে সহ্য করে গেছে এই ভেবে যে বিধবা তো সে হয়েছিল এর পর কি ডিভোর্সি ও হবে ? তার পর বিয়ের সাত বছর পর যখন মা ও না ফেরার দেশে চলে গেল রিতার আর কেউ রইল না । সেদিন মদ খেয়ে চুর হয়ে বাড়ি ফিরে আসে আকাশ তার পর কিছু বাকি রাখেনি ও রিতাকে অত্যাচার করতে । সিগারেট দিয়ে ছেকা , মেরে নাক মুখ ফাটিয়ে দেওয়া , হাত মচকে দেওয়া কিছু বাকি রাখেনি সেদিন আকাশ । রিতার কানে আসছিল কথা গুলো মার খেতে খেতে , " বিধবা একটা , অপয়া বাজা মেয়েমানুষ তুই মরিস না কেন রে ? আর কতদিন আমার অন্ন ধ্বংস করবি রে ? বেশ্যা মাগী !" তার পর ক্লান্ত হয়ে আকাশ বেরিয়ে গেছিলো ঘর থেকে বাইরে আবার নেশা করতে । রিতা বেরিয়ে এলো সেদিন আকাশের চৌকাঠ পেরিয়ে সঙ্গে নিজের আইডেন্টি কার্ডস গুলো আর কিছু টাকা নিয়ে । তার পর ট্রেনে কেটে কেটে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছানো । মায়ের বন্ধ থাকা বাড়িটা পরিষ্কার করে থাকতে শুরু করে রিতাভরি , কিছুদিন পর টের পায় যে কারণে তার প্রতি আকাশের এত অত্যাচার সেই আজ ওর মধ্যে তিলে তিলে বেড়ে উঠছে । আকাশ খোঁজ নেবার প্রয়োজন মনে করে নি আর , এ ভাবে দিন গুলো পার করে করে একদিন রিতার কোলে এলো এক রাজপুত্র । শুরু হলো রিতার নতুন লড়াই , সিঙ্গেল মাদার হয়ে নিজের সন্তানকে বড় করে তোলার লড়াই সম্বল শুধুমাত্র ডিগ্রী গুলো । এত দিন রিতাভরির সমাজে পরিচয় ছিল বিধবা , অপয়া , ডিভোর্সি এবার নতুন পরিচয় যুক্ত হলো অভিধানে সিঙ্গেল মাদার । তবু রিতাভরি কে থামলে চলবে না , মায়েদের যে থামতে নেই । শত বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয় সাফল্যের পথে । মায়েদের মূলধন যে শুধুই সাহস আর বাৎসল্য ।
