অন্য গন্তব্য
অন্য গন্তব্য
১
"কি রে, কেমন আছিস ?"
আরে, এ যে সেই স্বর। চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালাম।
সে আবার বললো, "কি রে, খবর কি তোর?"
আমি কয়েক মিনিটের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলাম ।
২
"এই চাকরিটা ছেড়ে দেব জানো।"
"কেন, কি হল হঠাৎ?"
"আরে কলকাতায় যে কম্পানিটায় ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম না, সেখানে সিলেক্ট হয়ে গেছি। সেদিন যেটার কথা বলছিলাম না তোমাকে।"
"ওহ হ্যাঁ, তা ভালো তো।" সুজাত দা মুচকি হেসে বলল, "যাক, এবার তাহলে তোর জ্বালাতন থেকে মুক্তি পাচ্ছি, কি বলিস?"
.....
এখানে বলে রাখি যে আমি মুম্বইয়ে একটি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ক্যেমিকাল টেস্টিং বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রবেশ করেছিলাম ।
এবং এই সুজাত দা হল আমাদের ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কোয়ালিটি ম্যানেজার সুজাত সেন, অর্থাৎ সোজা ভাষায় বললে আমার "বস"। আমার থেকে আন্দাজ বছর দশেকের বড়।
বস বলতে ঠিক যেমনটা বোঝায়, ও মোটেই তেমনটা নয়। জুনিয়রদের সাথে ওর যথেষ্ট সদ্ভাব। তাই হয়তো সদ্য নিজের শহর ছেড়ে চাকরি করতে এসে এমন এক সাপর্টিভ বসের, থুড়ি এমন এক দাদার সান্নিধ্যে এসে যথেষ্ট খুশী হয়েছিলাম।
তারপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে দু বছর।
চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে যেদিন কলকাতায় ফিরে এলাম, সেদিন আর সুজাত দার সাথে দেখা করে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। এক বিশেষ কাজ থাকায় ও সেদিন অফিসে আসতে পারেনি।
....
চাকরিটা ছাড়ার প্রায় ছয় মাস অতিক্রম হতে চলল। এই ছয় মাসে আর সুজাত দা-এর সাথে ফোনে কোন যোগাযোগ করা হয়নি। বেশ কয়েকবার দাদাকে ফোন করার কথা ভেবেও, বিভিন্ন ব্যস্ততার ফাঁকে আর সময় বের করে তা করা হয়ে ওঠেনি। হোয়াটস্যাপে টুকটাক কথাবার্তা চলত, কিন্তু মাসখানেক যাবৎ তাও একেবারেই বন্ধ ছিল ।
....
৩
"The number you're trying to call is not reachable at the moment. Please try again later" ও প্রান্ত থেকে মহিলা স্বরটি হিন্দিতে আবারও এই একই কথা পুনরায় বলে চলেছেন । আর অপেক্ষা না করে ফোনটা কেটে দিলাম। এই নিয়ে কাল থেকে ২০ বার কল করলাম সুজাতদা কে। একটা ভালো খবর তাকে জানানোর জন্য আমি উদ্গ্রীব হয়ে আছি আর তার ফোন কিনা দুই দিন ধরে পরিষেবা সীমার বাইরে! এমনটা এর আগে কখনও হয়েছে বলে তো মনে পড়ে না। আমার মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেল । তার সাথে একটু চিন্তাও যে হল না তা নয়, কিন্তু সে নিয়ে আর বিশেষ একটা গুরুত্ব দিলাম না।
....
৪
সারাদিন কাজের ব্যস্ততার পর বাড়ি ফিরে রাতে ঘুমাতে যাবো এমন সময় ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠলো । বুঝলাম কোন মেসেজ এসেছে, কিন্তু অতিরিক্ত ক্লান্তি আমাকে গ্রাস করল, আর মেসেজটা দেখার তেমন আগ্রহ জাগল না। পরের দিন সকালে উঠে দেখব ভেবে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে অবশ্য ঘুম এল না। সেদিন সকালেই অফিস যাওয়ার পথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার কথা বারবার ভাবতে লাগলাম।
মুম্বইয়ের চাকরি টা ছেড়ে কলকাতায় ফিরে নতুন চাকরিতে ঢুকেছি অবশ্যই, কিন্তু একটা অভাব, থুড়ি একজনের অভাব ভীষণ ভাবে অনুভব করতাম। সেটা হল সুজাতদার মতো একজন মেন্টরের। এই রকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রোজকারের মতো সেদিনও সকালে ট্রেন থেকে নেমে অফিসের উদ্দেশ্যে সবেমাত্র হাঁটা দিয়েছি, ঘড়িতে তখন বাজে প্রায় ১০টা, আর আধঘন্টার মধ্যে পৌঁছতে হবে অফিসে, এমন সময়, পিছন থেকে কে যেন বেশ জোরেই বলে উঠল:
"কি রে, কেমন আছিস ?"
আরে, এ যে সেই স্বর। চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালাম।
সে আবার বললো, "কি রে, খবর কি তোর?"
আমি কয়েক মিনিটের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলাম।
কোন রকমে অস্ফুটে বললাম, "দা-দাদা তুমি ?"
"ভূত দেখলি মনে হচ্ছে?" বলেই হেসে ফেলল সুজাত দা ।
জিজ্ঞেস করলাম, "তা তুমি হঠাৎ এখানে?"
"কেন, আমাকে কি আসতে নেই ?" আবার একগাল হেসে কথাগুলো বলল সে।
"না না সেটা আবার কখন বললাম, তা কেমন আছ বলো?"
"বেশ ভালোই আছি, হা হা" এমন হাসির মাঝেও এ কথাটা বলার সময় ওর চোখ দুটো কেমন যেন নিষ্প্রভ লাগল।
হঠাৎ মনে পড়ায় জিজ্ঞেস করলাম, "তোমাকে ফোন করেছিলাম সপ্তাহখানেক আগে, 'not reachable' বলছিল বারবার, কি ব্যাপার বলো তো?"
"ওহ, সেই ফোনটা তো ভেঙ্গে গেছে"
"সে কি? কিভাবে? নতুন ফোন নিয়েছ তাহলে? নম্বরটা দিও তো", একটানা বলে গেলাম।
উত্তরে সে বললো, "নাহ্, আর নতুন ফোন নিইনি রে, কি হবে আর নিয়ে?"
অবাক হয়ে বললাম, "কি যা-তা বলছ, দাদা"
"ঠিকই বলছি রে" দাদা যেন একটু বিষণ্ণ ভাবে বলল।
"তবে?" জিজ্ঞেস করলাম আমি।
"সে না হয় আরেক দিন বলবো। ট্রেনের আবার সময় হয়ে যাচ্ছে"
"কোথায় যাচ্ছ এখন?"
"বাড়ি। যাই রে"
"'আসি' বলতে হয়।"
"নাহ, তা আর হয় না।" মৃদু হেসে কথাটা বলেই আর কোনরকম অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করে দিল দাদা, এবং অচিরেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ।
আমি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম, হঠাৎ সম্বিত ফিরতে হাত ঘড়িটার দিকে এক ঝলক দেখে নিয়েই দৌড় লাগালাম অফিসের দিকে।
.....
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা খেয়াল করিনি, ঘুম ভাঙল আর্ল্যামের আওয়াজে। ফোনটা হাতে নিয়ে আর্ল্যামের বিরক্তিকর আওয়াজটা বন্ধ করতে যাবো, এমন সময় গতকাল রাতের মেসেজটা চোখে পড়ল। এবং পড়ামাত্রই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে আবার পড়লাম মেসেজটা। এরপর আরও কয়েকবার পড়লাম। সেই সঙ্গে অনুভব করলাম যেন প্রতিটি স্নায়ু আমার শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে । ডিসেম্বরের শীতেও আমার সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে ঘামে । ফোনটা যে কখন হাত থেকে বিছানার ওপর পড়ে গেছে তা টেরই পাইনি । গত রাতে যে মেসেজটা আমার আগের কর্মক্ষেত্রের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ থেকে এসেছিল তা হল:
"With profound grief and sorrow,we regret to inform that our beloved colleague Mr. Sujato Sen left for his heavenly abode today at 5 am IST after battling severe head injuries for not less than a week. May his soul rest in eternal peace"

