অন্ধকারের ডাক
অন্ধকারের ডাক
আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে নেত্রকোনার দিকে যে বাসটা ছাড়ে, তাতে জানালার পাশের সিটে বসে রায়হান। বয়স আটাশ। ঢাকার একটা বেসরকারি স্কুলে পড়ায়। প্রায় চার বছর পর সে ফিরছে তার গ্রাম বিলপাড়ায়, একটা ছোট্ট জনপদ, যেখানে বর্ষায় চারদিকে থইথই পানি, আর শীতে ফসলের সবুজে ঢাকা মাঠ।
ফেরার কারণটা সুখকর নয়। তার চাচাতো বোন মরিয়মের বিয়ে ঠিক হয়েছিল আগামী মাসে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে মরিয়মের যা হচ্ছে, তাতে রায়হানের মা ফোনে কেঁদে ফেলেছিলেন। "তুই একবার আয় বাবা। মেয়েটার কী যে হইছে, বুঝবার পারতাছি না। রাইতে ঘুমায় না, চিল্লায়, গায়ে অসুরের শক্তি আইসা ভর করছে যেন।"
রায়হান বিজ্ঞানের ছাত্র। পদার্থবিজ্ঞান পড়িয়ে জীবন চালায়। ভূত-প্রেত, জ্বিন-আছর— এসব নিয়ে তার মনে সবসময় একটা সংশয় কাজ করত। তবু মায়ের কান্নাভরা গলা তাকে থামিয়ে দিতে পারল না।
বাস থেকে নেমে সিএনজি যখন মেঠোপথ ধরে এগোচ্ছিল, তখন বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। দুপাশে ধানখেত, মাঝেমধ্যে একটা-দুটো তালগাছ, দূরে হাওরের পানি চিকচিক করছে। গ্রামের প্রবেশমুখেই বিশাল একটা বটগাছ— এই গাছটাকে ঘিরেই ছোটবেলা থেকে রায়হান হাজারটা গল্প শুনে বড় হয়েছে। গাছের গায়ে লাল সুতো বাঁধা, নিচে একটা পুরনো মাজারের মতো কাঠামো, যেখানে গ্রামের মানুষ মানত করে।
আর বটগাছের ঠিক পেছনেই, একটা উঁচু ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো জমিদারবাড়ি— যাকে গ্রামের লোকেরা বলে "রায়বাড়ি"। দেশভাগের সময় জমিদার পরিবার ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা পরিত্যক্ত। ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা থাম, জানালার লোহার গরাদ মরিচা ধরে খসে পড়েছে। রাতের বেলা কেউ ওদিকে যায় না। ছোটবেলায় রায়হানরা সাহস দেখাতে গিয়ে দিনের বেলাতেও কেবল বাড়ির উঠান পর্যন্ত গিয়ে দৌড়ে ফিরে আসত।
সিএনজি থেকে নেমে রায়হান একবার সেই বাড়িটার দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে বাড়িটা যেন আরও রহস্যময় লাগছিল। কিছু একটা তার বুকের ভেতর হঠাৎ শীতল হয়ে গেল, যদিও সে নিজেও জানত না কেন।
বাড়ি পৌঁছাতেই মা এসে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে জল। "আয় বাবা, আয়। মরিয়মের অবস্থা আরও খারাপ হইছে। আজ সকালেও..." কথাটা শেষ না করেই মা থেমে গেলেন।
রায়হান ব্যাগ রেখে সোজা গেল চাচার বাড়িতে। মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। চাচার বাড়ির উঠানে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত নীরবতা টের পেল রায়হান। সাধারণত এই সময় বাড়িতে হইচই থাকে— বিয়ের তোড়জোড়, মহিলাদের আলাপ, ছেলেমেয়েদের দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু আজ যেন সবকিছু থমকে আছে। উঠানের কোণে বসে থাকা প্রতিবেশী দুই-তিনজন মহিলা রায়হানকে দেখে মাথা নিচু করে সরে গেলেন, যেন কিছু একটা লুকাচ্ছেন।
চাচি এসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রায়হান বাবা, মাইয়াডারে বাঁচাও। ওর মইধ্যে কে যেন ঢুইকা গেছে।"
ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটা গোঙানির শব্দ। মাঝে মাঝে সেই শব্দ হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল এক গম্ভীর, ভারী স্বরে— যা কোনোভাবেই তেইশ বছরের একটা মেয়ের গলা থেকে বেরোনো সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছিল।
রায়হান ঘরে ঢুকল। খাটের সাথে মরিয়মের দুই হাত গামছা দিয়ে বাঁধা। চুল এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালি। শরীর কাঁপছে থরথর করে। রায়হানকে দেখে প্রথমে সে চোখ বুজে রইল, তারপর হঠাৎ চোখ খুলে তাকাল— আর সেই চাহনি দেখে রায়হানের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। চোখের মণি যেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রসারিত, দৃষ্টিতে এক অচেনা, হিংস্র ভাব।
"কে... কে আইছে এইখানে?" মরিয়মের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটা গলা। ভারী, পুরুষালি, যেন বহু বছরের জমাট ক্ষোভ সেই স্বরে মিশে আছে।
চাচা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন, "গত দশ দিন ধইরা এইরকম করতাছে। মাঝেমইধ্যে স্বাভাবিক থাকে, তহন কান্নাকাটি কইরা কয় ওর কিছু মনে নাই। আবার মাঝেমইধ্যে এই কণ্ঠে কথা কয়।"
রায়হান কাছে গিয়ে বসল। "মরিয়ম, আমি রায়হান ভাই। চিনতে পারতাছোস?"
মেয়েটার ঠোঁটের কোণে একটা বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। "রায়হান... শহরের পোলা। তুমি কী বুঝবা এইখানে কী আছে? তুমি তো বিশ্বাসই করো না।"
রায়হান চমকে উঠল। এই কথাটা তো সে কাউকে বলেনি— যে সে ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে না। তবে কি মরিয়ম আগে থেকেই জানত তার মনোভাব, নাকি সত্যিই অন্য কিছু তার ভেতর থেকে কথা বলছে?
মেয়েটা হঠাৎ প্রবল শক্তিতে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। গামছা বাঁধা হাত দুটো মুচড়ে উঠল অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে। চাচা আর দুজন প্রতিবেশী মিলে চেপে ধরলেন। মেয়েটা চিৎকার করে উঠল— এক ভয়ংকর, দীর্ঘ চিৎকার, যা শুনে ঘরের বাইরে দাঁড়ানো মানুষগুলো কানে হাত চাপা দিল।
তারপর হঠাৎই সব থেমে গেল। মরিয়ম চোখ বুজে ফেলল। শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। কয়েক মিনিট পর চোখ খুলে তাকাল— এবার সেই চাহনিতে আর হিংস্রতা নেই, বরং এক গভীর ক্লান্তি আর ভয়।
"ভাইজান... আমি কই ছিলাম? আমার কিছু মনে নাই।" গলার স্বরও এবার স্বাভাবিক, কোমল। মরিয়ম কাঁদতে শুরু করল। "আমার খুব ভয় লাগে। মনে হয় আমার শরীরের মইধ্যে আমি নাই।"
রায়হান তার মাথায় হাত রাখল, কিন্তু নিজের মনেও একটা অস্বস্তি টের পাচ্ছিল। সেই রাতে রায়হান তার মায়ের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনল, আর পরদিন সকালে মরিয়মের ছোট বোন হালিমার কাছ থেকেও।
ঘটনার শুরু আজ থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে। মরিয়মের বিয়ের কেনাকাটার জন্য গয়না বানানোর একটা পুরনো নকশা দরকার ছিল— তাদের দাদির আমলের একটা গয়নার বাক্স, যা নাকি বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে গুজব ছিল যে সেই বাক্সটা নাকি রায়বাড়ির পুরনো নিচতলার একটা ঘরে পড়ে আছে, জমিদারবাড়ির চাকরানিদের কেউ একজন নাকি সেটা লুকিয়ে রেখেছিল দেশভাগের সময়।
মরিয়ম আর তার এক বান্ধবী সালমা মিলে, একদিন দুপুরবেলা, লোকজনের অগোচরে রায়বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল সেই বাক্স খুঁজতে। ব্যাপারটা কেউ জানত না, পরে সালমা নিজেই স্বীকার করে।
"আমরা ভয়ে ভয়ে ঢুকছিলাম।" সালমা বলে, চোখে-মুখে এক আতঙ্কের ছাপ। "একতলার একটা ঘরে অনেক পুরান আসবাব পইড়া আছিল। একটা কাঠের সিন্দুক খুঁজতে খুঁজতে মরিয়ম আপায় একটা লোহার বাক্স পাইল, তালা দেওয়া। বাক্সের ওপরে কী একটা প্যাঁচানো নকশা কাটা আছিল, দেখলে গা গুলায়। মরিয়ম আপায় বাক্সটা খুলার লাইগা টান দিতেই ভিতর থেইকা একটা গন্ধ বাইর হইল— পোড়া গন্ধের মতন। আর তখনই খুব আস্তে একটা শব্দ আইল, যেন কেউ কানতাছে। আমরা দুইজনেই দৌড়াইয়া বাইর হইয়া গেছিলাম। বাক্সটা মরিয়ম আপায় সাথে নিয়া আইছিল, কারণ ভিতরে একটা পুরান লকেট আছিল।"
সেই লকেটটা— একটা কালচে ধাতুর তৈরি, তাতে খোদাই করা অদ্ভুত এক চিহ্ন— মরিয়ম নিজের গলায় পরে ফেলেছিল। তার তিনদিন পর থেকেই মরিয়মের আচরণে পরিবর্তন শুরু হয়। প্রথমে শুধু দুঃস্বপ্ন। রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। তারপর একদিন গভীর রাতে হালিমা দেখে, মরিয়ম বিছানায় নেই। খুঁজতে খুঁজতে তারা তাকে পায় বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে, একা দাঁড়িয়ে, চোখ খোলা কিন্তু অচেতন, মুখ দিয়ে বিড়বিড় করে অচেনা কিছু শব্দ বলছে।
এরপর থেকে ধীরে ধীরে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। মরিয়ম খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়, রাতে ঘুমায় না, আজানের শব্দ শুনলে কানে হাত চাপা দিয়ে ছটফট করে। একদিন নামাজের জায়নামাজ দেখে হঠাৎ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কোরআন শরীফের তেলাওয়াত শুনলে গা মোচড়ায়, দাঁতে দাঁত চেপে গোঙাতে থাকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল, মাঝে মাঝে সে এমন সব কথা বলত, যা তার জানার কথা নয়। প্রতিবেশী একজনের মৃত স্বামীর নাম ধরে ডেকে তার গোপন কথা বলে দিয়েছিল একদিন, যা শুনে সেই মহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন।
গ্রামের মুরুব্বিরা প্রথমে বলেছিলেন, মেয়েটার হয়তো মানসিক সমস্যা হয়েছে, শহরে ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু যখন তার শরীরে অস্বাভাবিক শক্তি দেখা দিল— চারজন পুরুষ মিলেও তাকে ধরে রাখতে পারছিল না— তখন সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল, এ কোনো সাধারণ অসুখ নয়।
রায়হান প্রথমে চেষ্টা করেছিল যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটা দেখতে। তার মনে হয়েছিল, হয়তো মরিয়ম কোনো মানসিক আঘাত থেকে এমন আচরণ করছে— বিয়ের চাপ, পারিবারিক কোনো চাপা কষ্ট, বা কোনো ধরনের মানসিক ব্যাধি, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি বা অনুরূপ কিছু বলা যেতে পারে।
সে জোর করে চাচাকে রাজি করাল ময়মনসিংহ শহরের একটা হাসপাতালে মরিয়মকে নিয়ে যেতে। সেখানে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মরিয়মকে পরীক্ষা করলেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা বলার পর ডাক্তার সাহেব বললেন, মেয়েটার মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অনিদ্রার লক্ষণ আছে, কিছু ওষুধ দিলেন এবং কাউন্সেলিং-এর পরামর্শ দিলেন।
কিন্তু ওষুধ খাওয়ানোর প্রথম রাতেই আবার সেই ঘটনা ঘটল। রাত প্রায় দুইটার দিকে মরিয়ম বিছানা থেকে নেমে সোজা হেঁটে গেল ঘরের দরজার দিকে, চোখ বন্ধ অথচ নিখুঁতভাবে সব বাধা এড়িয়ে। দরজা বন্ধ ছিল, তবু সে দরজার হাতল ধরে এমনভাবে টান দিল, কাঠের দরজায় ফাটল ধরে গিয়েছিল।
হালিমা চিৎকার করে সবাইকে ডেকে তোলে। যখন সবাই মিলে মরিয়মকে থামায়, তখন তার মুখ থেকে আবার সেই ভারী কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসে— "আমারে আটকাইয়া রাখতে পারবি না। আমার জিনিস আমি ফেরত নিমু।"
রায়হান তখন নিজের চোখে দেখল, যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মরিয়মের গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছিল, চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে গিয়েছিল, আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার— ঘরের ভেতরে তাপমাত্রা যেন হঠাৎ অনেকটা কমে গিয়েছিল, যদিও বাইরে আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরম। সেই রাতেই রায়হান প্রথমবারের মতো নিজের মনে স্বীকার করল— এটা শুধু মানসিক রোগ নয়। কিছু একটা আছে, যা তার বিজ্ঞানের বই তাকে শেখায়নি। পরদিন সকালে চাচা সিদ্ধান্ত নিলেন, গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব, যাকে সবাই "হুজুর" বলে ডাকে, তার কাছে যাওয়া হবে।
মাওলানা আব্দুল সাজ্জাদ— গ্রামের মসজিদের ইমাম, বয়স ষাটের কাছাকাছি, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় আছেন। তার নাম আশেপাশের কয়েকটা গ্রামেও পরিচিত। প্রথমে তিনি আসতে একটু ইতস্তত করছিলেন, কারণ বয়সের কারণে শরীর আর আগের মতো চলে না। কিন্তু চাচার কাকুতি - মিনতিতে রাজি হলেন। হুজুর বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর মরিয়মের ঘরে ঢোকার আগে জিজ্ঞেস করলেন, "মেয়ে কি সম্প্রতি কোথাও গিয়েছিল কোনো পুরনো, পরিত্যক্ত জায়গায়? কিছু কুড়িয়ে এনেছে?"
চাচা লকেটের কথা বলতেই হুজুরের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। "লকেটটা কোথায়?"
লকেটটা এতদিন মরিয়মের বালিশের নিচে রাখা ছিল, সে নিজেই সেটা গলা থেকে খুলে ফেলেছিল প্রথম রাতে। ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, "এইটা আমার শইলে থাকবার পারব না।" কিন্তু কেউ সাহস করে সেটা ফেলে দেয়নি, শুধু বালিশের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল।
হুজুর লকেটটা তুলে নিয়ে ভালো করে দেখলেন। তার ওপর খোদাই করা চিহ্নটা দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। "এইটা সাধারণ কোনো তাবিজ না। এইটা তন্ত্রসাধনার একটা বন্ধনী। কেউ একজন এইটার মধ্যে একটা শক্তিরে আটকায় রাখছিল।" তারপর তিনি মরিয়মের ঘরে ঢুকলেন। মরিয়ম তখন শান্ত অবস্থায় ছিল, বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে। হুজুর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আয়াতুল কুরসি পড়া শুরু করতেই মরিয়মের শরীর হঠাৎ খিঁচুনির মতো কেঁপে উঠল।
"বন্ধ কর!" সেই ভারী কণ্ঠ আবার ফিরে এলো, এবার আগের চেয়েও তীব্র, ক্রুদ্ধ। মরিয়মের পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে গেল, শুধু মাথা আর পায়ের গোড়ালি বিছানায় ঠেকে আছে, বাকি শরীর শূন্যে ভাসমান— এমন একটা ভঙ্গি, যা স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে করা শারীরিকভাবে অসম্ভব। ঘরে উপস্থিত সবাই ভয়ে পিছিয়ে গেল। হুজুর কিন্তু থামলেন না, তিনি আরও জোরে তেলাওয়াত করে যেতে লাগলেন। মরিয়মের মুখ দিয়ে তখন এক ধরনের গোঙানি বেরোতে লাগল, যেন প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর হুজুর তেলাওয়াত থামিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কে? কেন এই মেয়ের শরীরে আসছো?" দীর্ঘ নীরবতার পর মরিয়মের শরীর শিথিল হয়ে এলো, আর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটা ধীর, ঠান্ডা স্বর। "আমার নাম বাদল। আমি এই মাটির মানুষ ছিলাম। জমিদাররা আমারে দিয়া যা করাইছে, তার শাস্তি আমি এহনো ভোগ করতেছি। আমি কাউরে ছাড়ুম না।"
হুজুর আরও কিছু জানতে চাইলেন, কিন্তু ততক্ষণে মরিয়ম আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলল, স্বাভাবিক ঘুমের মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ল। সেদিন রাতে হুজুর চাচাকে ডেকে বললেন, "এইটা সাধারণ জ্বিনের আছর না। এইটা মনে হইতাছে কোনো মানুষের আত্মা, যে অতৃপ্ত রইয়া গেছে, আর কোনো কালাজাদুর মাধ্যমে তারে বাইন্ধা রাখা হইছিল ঐ লকেটে। মেয়ে না জাইনা সেই বাঁধন খুইলা দিছে। এইটা ছাড়াইতে সময় লাগব, আর আগে জানতে হইব আসল কাহিনী কী।"
রায়হান ঠিক করল, সে নিজেই খোঁজ নেবে রায়বাড়ির ইতিহাস, আর "বাদল" নামের সেই লোকটার কথা। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তার ভেতরে যুক্তির চর্চা এখনও ছিল। যদি এই আত্মার একটা বাস্তব ইতিহাস থাকে, তাহলে হয়তো সেই ইতিহাস জানাই সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি হতে পারে। গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ, নবীন মিয়া, যিনি ছোটবেলায় জমিদারবাড়ির চাকরদের একজন ছিলেন, তার কাছে গেল রায়হান।
নবীন মিয়া পুরনো দিনের কথা মনে করে বললেন, "রায়বাড়ির শেষ জমিদার আছিলেন নীলমণি রায়। বড় অত্যাচারী মানুষ আছিলেন। প্রজাগো ওপর জুলুম করতেন, খাজনা না দিতে পারলে জমি কাইড়া নিতেন, মেয়েগো ওপর অত্যাচার করতেন। কিন্তু তার আসল ভয়ংকর কামটা আছিল অন্য জায়গায়— তিনি একজন তান্ত্রিক সাধক পালতেন, নাম আছিল বাদল ওঝা।"
"বাদল ওঝা?" রায়হান সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"হ। বাদল আছিল নিচু জাতের মানুষ, কিন্তু তান্ত্রিক বিদ্যায় তার নাম-ডাক আছিল। জমিদার তারে দিয়া নানান কালাজাদু করাইতেন— শত্রুরে বশ করা, প্রজাগো ভয় দেখানো, এমনকি শোনা যায় গ্রামের কিছু মানুষরে গায়েব কইরা দেওয়া হইছিল বাদলের তন্ত্রসাধনার নামে। শোনা যায়, একবার এক অভাবী পরিবারের যুবতী মেয়েরে জমিদার ধরে নিয়া গেছিলেন, আর সেই মেয়েরে দিয়া বাদল একটা ভয়ংকর সাধনা করছিলেন, যাতে মেয়েটার মৃত্যু হয়। এর পর থেইকা গ্রামে অনেক অমঙ্গল শুরু হয়— ফসল নষ্ট হইতে থাকে, মহামারী লাগে, অনেক মানুষ মারা যায়।"
"তারপর কী হইল বাদলের?"
নবীন মিয়া একটু থেমে বললেন, "গ্রামের মানুষ যহন বুঝতে পারল যে বাদলের কালোজাদুর কারণেই এত অমঙ্গল, তহন তারা একরাইতে দল বাইন্ধা রায়বাড়িতে হামলা করে। বাদলরে ধইরা মাইরা ফালায়। কিন্তু মরার আগে বাদল অভিশাপ দিয়া গেছিল— 'আমি এই মাটি ছাড়ব না। আমি ফিরা আসমু, আর যারা আমারে মারছে তাগোর ওপর প্রতিশোধ নিমু।'" "জমিদার নীলমণি রায় তহন ভয় পাইয়া এক তান্ত্রিকরে দিয়া বাদলের আত্মারে একটা লোহার বাক্সের ভিতরে একটা লকেটের মধ্যে বাইন্ধা রাখে, যাতে সেই আত্মা মুক্তি পাইয়া প্রতিশোধ নিতে না পারে। বাক্সটা লুকাইয়া রাখা হইছিল বাড়ির নিচতলায়। এর কিছুদিন পরেই দেশভাগ হয়, জমিদার পরিবার ভারতে চইলা যায়, বাড়ি খালি পইড়া থাকে।"
রায়হানের গা শিউরে উঠল। এই কাহিনি শুনে তার মনে পড়ল, মরিয়মের পরিবার— তার দাদার দাদা— তারাও কি সেই সময় গ্রামের মানুষদের মধ্যে ছিলেন, যারা বাদলকে হত্যা করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে সে আরও গভীরে অনুসন্ধান শুরু করল। গ্রামের পুরনো মসজিদের রেকর্ড আর স্থানীয় একজন সংগ্রাহকের কাছে থাকা কিছু পুরনো দলিল ঘেঁটে রায়হান জানতে পারল, তার পরিবারের এক পূর্বপুরুষ, মরিয়মদেরও একই বংশের লোক, সেই রাতের হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন। এই তথ্য জানার পর রায়হানের মনে হলো, বাদলের আত্মা হয়তো নির্দিষ্টভাবে এই বংশের ওপরই প্রতিশোধ নিতে চাইছে, আর মরিয়ম সেই বংশেরই মেয়ে, যে ভুল করে বাক্স খুলে ফেলেছে।
ইতিহাস জানার পর হুজুরকে সব জানানো হলো। হুজুর মাথা নেড়ে বললেন, "এইটা তাইলে সাধারণ আছর না, এইটা প্রতিশোধপরায়ণ একটা আত্মা, যার মধ্যে ক্রোধ আর কালোজাদুর শক্তি দুইটাই মিশা আছে। এইটারে সরাইতে চেষ্টা করতে হইব ধারাবাহিকভাবে।" পরবর্তী কয়েকদিন হুজুর নিয়মিত আসতে লাগলেন। কিন্তু প্রতিবার মরিয়মের অবস্থা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে থাকল।
একদিন গভীর রাতে মরিয়ম হঠাৎ এমনভাবে চিৎকার শুরু করল যে পুরো পাড়া জেগে উঠল। তার শরীর থেকে যেন একটা তীব্র পোড়া গন্ধ বেরোতে লাগল। গায়ে অদ্ভুত কিছু দাগ ফুটে উঠল— নখের আঁচড়ের মতো, অথচ ঘরে তখন মরিয়ম ছাড়া আর কেউ ছিল না। আরেকদিন মরিয়ম হঠাৎ বলে উঠল প্রতিবেশী এক বৃদ্ধের নাম ধরে, "তোর দাদায় আমারে মারছিল, এহন তোর পালা।" সেই বৃদ্ধের বাড়িতে সেই রাতেই আগুন লেগে যায় রান্নাঘরে, যদিও কেউ চুলা জ্বালায়নি বলে সবাই দাবি করে।
গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ বলতে লাগল, এই বাড়িতে অভিশাপ নেমে এসেছে, মরিয়মের কাছে যাওয়াও বিপজ্জনক। মরিয়মের হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর এলো, তারা বিয়ে বাতিল করতে চায়। এই খবর শুনে মরিয়ম, যে তখন কিছুক্ষণের জন্য স্বাভাবিক ছিল, ভেঙে পড়ল কান্নায়। "ভাইজান, আমি কি সারাজীবন এমনেই থাকমু? আমার কী দোষ আছিল?" রায়হান তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "কিছু হইব না তোর। আমরা সবাই আছি তোর লগে।" কিন্তু ভেতরে ভেতরে রায়হান নিজেও ভয় পাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, পরিস্থিতি দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সেই রাতে হুজুর রায়হানকে আলাদা ডেকে বললেন, "বাবা, এই আত্মা এত শক্তিশালী হইছে কারণ তার ক্রোধ বহু বছর ধইরা জমা হইছে, আর তার সাথে বাঁধা আছে তন্ত্রসাধনার শক্তি। শুধু আমার চেষ্টা দিয়া এইটা সম্পূর্ণ যাইব না। যেই বাক্সের ভিতরে লকেট পাওয়া গেছে, সেই বাক্সের ভিতরে যদি আরও কিছু থাইকা থাকে, যা দিয়া বাদলের আত্মারে প্রথমে বাঁধা হইছিল, সেইটা খুঁইজা বাইর করতে হইব। আর যেই স্থানে বাদলরে হত্যা করা হইছিল, সেইখানে গিয়া তার আত্মারে শান্তি দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে হইব— ক্ষমা চাইতে হইব, তার অতৃপ্ত ইচ্ছা পূরণের একটা প্রতীকী ব্যবস্থা করতে হইব।" রায়হান জিজ্ঞেস করল, "সেই জায়গাটা কোথায়?" হুজুর বললেন, "নবীন মিয়ারে জিজ্ঞেস করো। তিনিই সবচেয়ে ভালো জানবেন।"
পরদিন সকালে রায়হান, চাচা, আর দুই প্রতিবেশী মিলে নবীন মিয়াকে নিয়ে রায়বাড়ির দিকে রওনা দিল। এবার আর কৌতূহল বা সাহস দেখানোর জন্য নয়, জীবন বাঁচানোর তাগিদে। নবীন মিয়া পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনের দিকে, যেখানে একসময় জমিদারদের শাস্তিকক্ষ ছিল বলে জনশ্রুতি ছিল। ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে একটা অন্ধকার কুঠুরি, যার দেয়ালে এখনো পুরনো শিকল লাগানো ছিল।
"এইখানেই বাদলরে মারা হইছিল বইলা শুনা যায়।" নবীন মিয়া কাঁপা গলায় বললেন। "এই কুঠুরির মেঝেতেই নাকি তার রক্ত পড়ছিল।"
মেঝের একপাশে পুরনো ইট সরাতেই একটা ছোট কুলুঙ্গি বেরিয়ে এলো, যেখানে কিছু হাড়, একটা মরিচা ধরা ছোরা, আর কয়েকটা তামার পাত পাওয়া গেল, তাতে অদ্ভুত চিহ্ন খোদাই করা। এগুলোই ছিল সেই তন্ত্রসাধনার বাকি উপকরণ, যা দিয়ে বাদলের আত্মাকে প্রথমে বন্দি করা হয়েছিল। হুজুরকে খবর পাঠানো হলো। তিনি এসে সব জিনিস দেখে বললেন, "এইগুলা আজকে রাইতেই এইখানে নিয়া, সঠিক নিয়মে, ক্ষমা চাইয়া বিসর্জন দিতে হইব। আর মরিয়মরে নিয়া আসতে হইব এইখানে— কারণ আত্মাটা তার শরীরে আছে, দূরে বইসা এই কাজ করলে ফল হইব না।"
এই কথা শুনে সবাই আঁতকে উঠল। মরিয়মকে এই ভুতুড়ে বাড়িতে, সেই কুঠুরিতে নিয়ে আসা মানে যেন বিপদকে আরও কাছে ডেকে আনা। কিন্তু হুজুর দৃঢ়ভাবে বললেন, "ভয় পাইলে চলব না। যা হওয়ার হইব, কিন্তু আমাদের বিশ্বাস আর সাহস নিয়া এগোইতে হইব।"
সেই রাতের জন্য পুরো গ্রামে একটা চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। মসজিদ থেকে আরও দুজন হাফেজ ডেকে আনা হলো। রায়বাড়ির সেই কুঠুরিতে কয়েকটা হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হলো। হুজুর আগে থেকেই নির্দেশ দিয়েছিলেন কী কী প্রস্তুতি লাগবে, পানি, কিছু নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ রাখা মানুষ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ধৈর্য আর অবিচল বিশ্বাস। রাত এগারোটার দিকে মরিয়মকে নিয়ে আসা হলো। ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় থেকেই তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছিল, চোখ দুটো যেন অন্ধকারেও কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে যা অন্যরা পাচ্ছে না। রায়বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই মরিয়ম হঠাৎ প্রবল আক্রোশে ছটফট করে উঠল, তাকে ধরে রাখতে চারজন পুরুষ মানুষের প্রয়োজন হচ্ছে। মুখ থেকে সেই ভারী স্বর আবার বেরিয়ে এলো, এবার তীব্র ক্রোধে কাঁপছে।
"আমারে এইখানে আনছোস ক্যান? আমি এই জায়গায় মরছি! আমি এই জায়গায় আর ফিরত যামু না!"
হুজুর শান্ত স্বরে বললেন, "আমরা তোমারে শান্তি দিতে আনছি বাদল। তোমার সাথে যা হইছে, তার লাইগা আমরা ক্ষমা চাইতে আসছি। কিন্তু তোমারে এই মেয়ের শরীর ছাইড়া দিতে হইব। এই মেয়ের তো কোনো দোষ নাই।"
"দোষ নাই?" স্বরটা তীব্র বিদ্রূপে ভরে উঠল। "ওর বংশের মানুষরাই তো আমারে শিকল দিয়া বাইন্ধা পিটাইছিল! ওগো একজনরেও আমি ছাড়ুম না!"
কুঠুরির ভেতর নিয়ে যাওয়া হলো মরিয়মকে। মেঝেতে বিছানো একটা মাদুরে তাকে শোয়ানো হলো, চারপাশে হাফেজরা বসে তেলাওয়াত শুরু করলেন। হুজুর সেই তামার পাত আর ছোরাটা সামনে রেখে বিশেষ দোয়া পড়তে শুরু করলেন। মরিয়মের শরীর প্রবলভাবে কাঁপতে লাগল। বাতাসে যেন একটা চাপা গোঙানির শব্দ ভেসে বেড়াতে লাগল, কখনো মানুষের কণ্ঠের মতো, কখনো পশুর মতো। হ্যাজাক লাইটের আলো হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে উঠতে লাগল।
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। তেলাওয়াতের শব্দ, মরিয়মের গোঙানি, আর ভারী নিঃশ্বাসের মধ্যে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। হঠাৎ মরিয়ম চিৎকার করে উঠল এমন এক ভাষায়, যা কেউ বুঝতে পারল না— পুরনো আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে অদ্ভুত এক উচ্চারণ। তার শরীর মেঝে থেকে যেন সামান্য উঠে যাচ্ছিল। দুজন প্রতিবেশী ভয়ে দরজার কাছে সরে গেল।
হুজুর তখন উচ্চস্বরে বললেন, "বাদল, শোনো! তোমার সাথে যা হইছে, তা অন্যায় ছিল। জমিদার তোমারে দিয়া পাপ করাইছে, আর তার শাস্তি তুমি একলাই পাইছ, অথচ আসল দোষী জমিদার পার পাইয়া গেছে। কিন্তু প্রতিশোধ দিয়া তুমি শান্তি পাইবা না। এই মেয়ের কোনো দোষ নাই, তার পূর্বপুরুষরাও যা করছে, তা তাদের সময়ের ভয় আর অজ্ঞতা থেইকা করছে। এখন সময় হইছে ক্ষমা করার। তোমার আত্মারে মুক্তি দেওয়ার লাইগা আমরা প্রস্তুত। বলো, তুমি কী চাও?" কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মরিয়মের মুখ থেকে সেই ভারী স্বর, কিন্তু এবার কিছুটা কাঁপা, ক্লান্ত শোনাল।
"আমার লাশ... আমার লাশ তারা নদীতে ফালাইয়া দিছিল। কোনো জানাজা হয় নাই। আমার কবর নাই। আমি এই মাটিতে... শান্তিতে শুইতে পারি নাই এতদিন।" এই কথা শুনে নবীন মিয়া চমকে উঠলেন। "হ, এইটা সত্য কথা। বাদলরে মাইরা তার লাশ হাওরে ফালাইয়া দেওয়া হইছিল, কোনো কবরই দেওয়া হয় নাই।"
হুজুর তখন বললেন, "তাইলে আজ রাইতেই আমরা তোমার লাইগা প্রতীকী জানাজা পড়ুম, আর এই কুঠুরির মাটিতেই তোমার স্মরণে একটা কবর বানামু, যাতে তুমি শান্তি পাও। কিন্তু তার আগে তোমারে এই মেয়ের শরীর ছাইড়া দিতে হইব।"
দীর্ঘ এক নীরবতা নেমে এলো। মরিয়মের শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হতে লাগল। কিন্তু ঠিক তখনই, হঠাৎ আবার এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে সে উঠে বসল, চোখ দুটো য়েন জ্বলছে অন্ধকারে।
"না! আমি ক্ষমা চাই না! আমি শান্তি চাই না! আমি চাই ওগো কষ্ট, যেমন আমি কষ্ট পাইছি!"
এক মুহূর্তেই মরিয়ম হঠাৎ প্রবল শক্তিতে ছুটে গিয়ে সেই মরিচা ধরা ছোরাটা তুলে নিল, নিজের গলার দিকে তাক করল। সবাই আঁতকে উঠে ছুটে গেল। রায়হান, যে এতক্ষণ কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, হঠাৎ ছুটে গিয়ে ছোরাটা ধরে ফেলল, নিজের হাতের তালু কেটে গেল ধারালো প্রান্তে, রক্ত ঝরতে লাগল। কিন্তু সে ছোরাটা মরিয়মের হাত থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলো। সেই মুহূর্তে, রায়হানের রক্ত মেঝেতে পড়তেই, ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। হুজুর দ্রুত বুঝতে পারলেন কী ঘটছে, চিৎকার করে বললেন, "রক্ত মাটিতে পড়ছে! এখনই তেলাওয়াত জোরে করো, এখনই!"
হাফেজরা প্রাণপণে তেলাওয়াতের গতি বাড়িয়ে দিলেন। হুজুর মরিয়মের কপালে হাত রেখে বিশেষ দোয়া পড়তে শুরু করলেন উচ্চস্বরে। মরিয়ম প্রচণ্ড খিঁচুনিতে কাঁপতে লাগল, মুখ থেকে ফেনা বেরিয়ে এলো, শরীর বেঁকে গেল অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তারপর, হঠাৎ, এক দীর্ঘ, তীব্র চিৎকার— যা মানুষের কণ্ঠ থেকে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে গেল এক অস্পষ্ট, বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া গোঙানিতে। ঘরের হ্যাজাক লাইটগুলো একসাথে নিভে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তারপর আবার জ্বলে উঠল। মরিয়ম মেঝেতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল। ঘর নীরব হয়ে গেল। শুধু শোনা যাচ্ছিল তার ক্ষীণ শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। কয়েক মুহূর্ত কেউ নড়ল না, কথাও বলল না। সবাই যেন দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল। তারপর হুজুর ধীরে ধীরে মরিয়মের নাড়ি পরীক্ষা করলেন, চোখের পাতা তুলে দেখলেন।
"শ্বাস চলতাছে, নাড়িও ঠিক আছে। ও এখন ঘুমাইতেছে, স্বাভাবিক ঘুম।" হুজুরের গলায় স্বস্তির সুর। কিন্তু তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। বাকি রাতটা সবাই সেই কুঠুরিতেই কাটাল, তেলাওয়াত চলতে থাকল মৃদু স্বরে, যতক্ষণ না ভোরের আজান শোনা গেল।
আজানের ধ্বনি কুঠুরির ভেতর পৌঁছাতেই মরিয়ম চোখ খুলল। এবার তার চাহনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, শান্ত। "ভাইজান... আমি বাড়িত যামু।" গলার স্বর তার নিজের, কোমল, ক্লান্ত কিন্তু ভয়হীন। রায়হান কেঁদে ফেলল। "হ, আমরা বাড়িত যামু।"
সেদিন সকালেই হুজুরের নির্দেশমতো, সেই কুঠুরির এক কোণে প্রতীকী কবর তৈরি করে বাদলের নামে জানাজা পড়ানো হলো, যদিও তার প্রকৃত দেহাবশেষ কোথাও ছিল না। শুধু সেই হাড়গুলো, যা কুলুঙ্গিতে পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো একটা সাদা কাপড়ে মুড়ে সমাহিত করা হলো। হুজুর দোয়া পড়লেন, ক্ষমা প্রার্থনা করলেন সেই আত্মার জন্য, যে দুইশ বছর ধরে অন্যায়ের শিকার হয়ে ক্রোধে পুড়েছিল। লকেট আর তামার পাতগুলো একটা কলসিতে ভরে হাওরের গভীর জলে ফেলে দেওয়া হলো, হুজুরের বিশেষ নির্দেশ অনুযায়ী।
এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন মাস। মরিয়ম ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে দুর্বল ছিল, প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখত, কিন্তু ধীরে ধীরে তার জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। তার হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনও, গ্রামের মুরুব্বিদের আশ্বাসে এবং মরিয়মের সম্পূর্ণ সুস্থতা দেখে, বিয়েতে রাজি হয়েছেন। সামনের মাসেই বিয়ের নতুন তারিখ ঠিক হয়েছে। রায়হান তার হাতের কাটা দাগ নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেছে, কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি। বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও, এখন সে আর আগের মতো নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না যে অতিপ্রাকৃত বলে কিছু নেই। বরং তার মনে হয়, পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে, যা মানুষের জ্ঞানের সীমানার বাইরে, যা বোঝার জন্য শুধু বিজ্ঞান নয়, বিশ্বাস আর নম্রতাও প্রয়োজন।
রায়বাড়ি এখনো সেই ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে আছে, ভাঙা, পরিত্যক্ত। তবে গ্রামের মানুষরা বলে, সেই রাতের পর থেকে বাড়িটার আশপাশে আর কোনো অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যায় না, রাতের বেলা আর কোনো আলো জ্বলতে দেখা যায় না জানালায়। হয়তো বাদলের আত্মা সত্যিই শান্তি পেয়েছে, নয়তো শুধু গ্রামবাসীর মনের ভয়ই কমে গেছে। তবে নবীন মিয়া, যিনি এখনো বেঁচে আছেন, মাঝেমধ্যে সন্ধ্যাবেলা বটতলায় বসে বলেন, "যা ঘটছিল, তা সত্য। মানুষ যহন মানুষের ওপর অন্যায় করে, সেই অন্যায় কোনো না কোনোভাবে ফিরা আসে। হয়তো ভূত হইয়া, নয়তো নিজের সন্তানের ওপর দিয়া। ইতিহাস কোনোদিন সম্পূর্ণ মুইছা যায় না।"
আর মরিয়ম, আজও রাতে ঘুমানোর আগে জানালার দিকে একবার তাকায়, দূরে রায়বাড়ির ভাঙা ছাদটা দেখে, তারপর আলতো করে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিছু স্মৃতি হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না— তবে সে জানে, এখন সে নিজের শরীরে, নিজের মনে, সম্পূর্ণভাবে নিজেই আছে।

