Subhra Mukherjee

Horror


3  

Subhra Mukherjee

Horror


অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ

অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ

12 mins 137 12 mins 137


বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম শিবপুরে বাস করত ফুলবন্তী নামে এক বৃদ্ধা ।তার দুই ছেলে ঝুকিন্দর আর মনিন্দর ।ফুলবন্তীর স্বামী বহুদিন আগে মারা গেছে ।তাদের শিবপুর গ্রামের চারদিকে জঙ্গল।পাশ দিয়ে কোশী বা কুশী নদী বয়ে গেছে।গ্রামের বেশী মানুষ অশিক্ষিত।শিক্ষার আলো সেভাবে প্রবেশ করে নি ।গ্রামের লোকেরা চাষবাস করে জীবন যাপন করে ।


ফুলবন্তীর দুই ছেলে র মধ্যে বড় ছেলে সেরকম পড়াশোনা শেখে নি ।অল্প বয়সে সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে ভাই মনিন্দর কে পড়াশোনা করতে উদ্যোগী করে ।মনিন্দর পড়াশোনা তে ভালো ছিল ।তাই লেখাপড়া শেষ করে সে গাঁয়ের পোস্টঅফিসে একটা কাজ পেয়ে যায় ।কিন্তু তার একটা অদ্ভুত শখ আছে ।সে শ্মশান,মৃতদেহ, আত্মা, ভূত প্রেত ইত্যাদি তে খুব আগ্রহী ।তাদের গ্রামে যে হাট বসে সেখানে একটা বুড়ো এসব ভূত প্রেত কালাযাদু এসবের বই বিক্রি করে হাটের এককোনে বসে।তার বইয়ের একনিষ্ঠ খদ্দের মনিন্দর ।সে লোকটা প্রতি হাটবারে মনিন্দর কে এসব বইয়ের যোগান দেয় ।বদলে মোটা টাকা পায় সে।এধরনের বই পড়ে মনিন্দর প্রথম প্রথম গভীর রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রয়োগের চেষ্টা করতে থাকে ।কিন্তু সফলতা আসে না ।


একদিন হাটের সে লোকটা কে মনিন্দর বলে 'কি বই এনে দিচ্ছ হে!বললে বই পড়ে সফলতা আসছে না ।যত সব ফালতু ।'লোকটা একটু কাছে এসে বলল'বাবু তাহলে তো সবাই সফল হতে পারত ।এসব হাতে কলমে করতে হয় ।আজ অমাবস্যা।আপনি আজ রাত বারোটা নাগাদ কোশী নদীর ধারে যে শ্মশান আছে সেখানে যাবেন ।ওখানে এক পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক এসেছেন ।ওনাকে তুষ্ট করতে পারলে সব কাজ সিদ্ধ হবে।'কথা টা মনিন্দরের খুব মনে ধরল ।সে রাতের জন্য তৈরি হয়ে রইল ।বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে পাঁচিল টপকে সোজা শ্মশানের দিকে রওনা দিল ।


কোশী নদীর তীরে শ্মশান ।সেখানে কারা একটা মড়া চিতায় চাপিয়ে সরে পড়েছে ।সে জ্বলন্ত চিতার সামনে এক ভীষণ দর্শন কেউ বসে আছে ।সে চিতার আগুন উপেক্ষা করে হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে চিতায় ।সেখান থেকে জ্বলন্ত মৃতদেহের মাংস ছিঁড়ে নিয়ে খাচ্ছে ।মনিন্দর বুঝতে পারল এই সেই তান্ত্রিক ।সে তান্ত্রিকের সামনে এসে দাঁড়ালো ।দেখলো লাল কৌপীন ধারী কপালে সিঁদুর মাখা জটাধারী এক ভয়াবহ রকমের লোক 'জয় তারা 'নাম করে পোড়া মাংস খাচ্ছে ।মনিন্দর তার পায়ে প্রনাম করতেই সে চেঁচিয়ে উঠল 'কৌন হে তু?'মনিন্দর তাকে জানালো যে সে তান্ত্রিকবিদ্যা শিখতে চায় ।প্রথম দিন তান্ত্রিক তো তাকে পাত্তাই দেয় না ।কিন্তু মনিন্দর ছাড়ার লোক নয় ।সে প্রতিদিনই শ্মশানে যাতায়াত করতে লাগল আর তান্ত্রিক কে তার ইচ্ছা জানাতে লাগলো ।অবশেষে তান্ত্রিক বলল'ঠিক আছে ।তোকে আমি তান্ত্রিক বিদ্যা শেখাবো ।কিন্তু তোকে অনেক ধৈর্য ধরতে হবে ।ফালতু কথা বলে নিজের প্রাণশক্তির বাজে খরচ করিস না ।কথা কম বলবি।'তান্ত্রিক কে প্রনাম করে মনিন্দর বাড়ি চলে গেল ।প্রতিদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সে ঐ তান্ত্রিকের শেখানো মন্ত্র গুলো অভ্যাস করতে শুরু করল ।


জিনিস টা খুব বেশি দিন চাপা রইল না ।মনিন্দরের কার্যকলাপ সব ধরা পড়ে গেল তার মা ফুলবন্তীর কাছে ।সে রাতে কি কারনে বাইরে বেরিয়েছিল ।ছোট ছেলের ঘরের কাছে এসে দেখল ঘরে আগুন জ্বেলে ছোট ছেলে কি সব যজ্ঞ শুরু করেছে ।তার খামার থেকে একটা ছাগল এনে সেটাকে বলি দিয়ে রক্ত নিবেদন করছে আগুনে ।ভয়ে ফুলবন্তীর বুক কেঁপে উঠল ।এসব যাদু টোনা কালাযাদু করলে ছেলে একদিন চরম বিপাকে পড়বে তা সে খুব ভালো করে বুঝতে পারল।কাছে গিয়ে ছেলে কে এসব বন্ধ করতে বলল।কিন্তু মনিন্দরের বয়ে গেছে ।মাকে একপাশে সরিয়ে সে নিজের কাজ করে চলল ।উপায় না দেখে বুড়ি বড় ছেলে ঝুকিন্দর কে ডেকে আনল ।ঝুকিন্দর এসে এসব দেখে সাংঘাতিক রেগে গেল।ঝুকিন্দর আর তার মা অনেক বোঝালো মনিন্দর কে ।কিন্তু যখন কোন কিছু তেই কিছু হল না ঝুকিন্দর করল কি যাবতীয় পূজোর সাজ সরঞ্জাম টান মেরে বাইরে উঠোনে ফেলে দিল ।দুই ভাইয়ে চরম ঝগড়া শুরু হল ফুলবন্তী বুড়িও চিৎকার তুলে আশে লোক জড়ো করে ফেলল ।গভীর রাতে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেল তাদের বাড়ি তে ।সবকিছু দেখে গ্রামবাসী রা বলল আবার যদি মনিন্দর এরকম কিছু করে তাহলে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেবে ।বাধ্য হয়ে মনিন্দর রনে ভঙ্গ দিল।


এরপর মনিন্দর তার সাধনা খুব গোপনে চালাতে থাকলো ।শ্মশানের সেই তান্ত্রিক তাকে নানা রকম কালো জাদু শেখাতে লাগল ।এসব দিকে বেশ উন্নতি করতে লাগল মনিন্দর ।লোক চক্ষুর অন্তরালে এসব সাধনা করে চলতে থাকলো তার ।এরপর একদিন বড়ভাই ঝুকিন্দরের বিয়ে হয়ে গেল পাশের গাঁয়ের মেয়ে চম্পা র সাথে ।চম্পা এসে বাড়ির কাজ কর্ম নিজের হাতে তুলে নিল ।শাশুড়ি তার কাজকর্মে খুব খুশি ।এতদিনে সে শান্তি পেল।আর কিছুটা নিশ্চিন্ত হল ছোট ছেলে ঐ তন্ত্র মন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে দেখে ।মনিন্দর সময় মত নিজের চাকরি তে যায় ।বাড়িতে কাজকর্ম করে ।এসব দেখে মা ফুলবন্তীর আনন্দ ধরে না ।সে দিন গুনতে থাকে কবে ছোট ছেলের বিয়ে দিয়ে চোখ বুজবে ।কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে নানা রকম গল্প ফেঁদে মনিন্দর এড়িয়ে যায় ।ফুলবন্তী বুড়ি বলে'ওরে হতভাগা আমি মরলে তোকে কে দেখবে বেটা ?'মনিন্দর বলে 'কেন বৌদি দেখবে ।তোমার পর ঐ তো আমার মা ।কি বল বৌদি! 'এসব শুনে চম্পা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসে ।সত্যি দেওর তাকে খুব সম্মান করে ।


দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো পাঁচ বছর ।এরপর ঝুকিন্দর আর চম্পা র একটি মেয়ে হল ।সে বাড়ি তে সবার চোখের মণি হয়ে উঠলো ।নাম রাখা হল গীতা ।সবার তো বটেই বিশেষ করে কাকা মনিন্দরের সে খুব আদরের ।তাকে নিয়ে সময় কেটে যায় মনিন্দরের ।কিন্তু ঐ যে বলে 'চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী '।তেমনি মনিন্দরের অবস্থা হল ।সে গোপনে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিল শ্মশানের সেই তান্ত্রিক টার সাথে ।এর ফল খুব খারাপ হল।


অবস্থা চরমে ওঠে একদিন ।সেদিন অমাবস্যা।শ্মশানের তান্ত্রিক ঝুকিন্দর কে বলে এবার সাধনার শেষ ধাপ শবসাধনা করতে হবে ।তার কথা মত মনিন্দর গভীর রাতে শ্মশান থেকে একটা মড়া তুলে নিয়ে এল বাড়ি তে ।তাকে সে কাজে সাহায্য করল সেই তান্ত্রিক ।দুজনে মিলে মড়া টা গোপনে নিয়ে এসে শুরু করল তন্ত্র সাধনা ।মন্ত্র উচ্চারণের গুনগুন শব্দ এসে পৌঁছল ঝুকিন্দরের কানে ।সে চুপিচুপি বেরিয়ে এসে উঠোনে দাঁড়াল ।দেখলো চারদিক অন্ধকার হলেও ভাইয়ের ঘরে খুব হাল্কা করে আলো জ্বলছে ।তার মনে আগের ঘটনা ভেসে উঠল ।সে খুব সন্তর্পণে ভাইয়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল সে যা ভেবেছিল তাই ।দেরী না করে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল সে ।তাতে বাড়ির সবার ঘুম ছুটে গেল ।সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকল ঘরের ভেতর একটা শব।তার ওপর মনিন্দর আসীন ।পাশে একটা তান্ত্রিক বসে আছে ।ফুলবন্তীর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল ।সে একটা মুড়ো ঝাঁটা বাগিয়ে তাড়া করে গেল তান্ত্রিক টাকে ।বেগতিক দেখে তান্ত্রিক সদর দরজা খুলে মারলে দৌড়।সে সঙ্গে বলল'তোদের আমি পরে দেখে নেব ।'ফুলবন্তী ঝাঁটা আরেকবার দেখাতে সে বেপাত্তা হয়ে গেল ।


বাকী রয়ে গেল মনিন্দর ।তার সঙ্গে বড়ভাই ঝুকিন্দরের মল্ল যুদ্ধ বেঁধে গেল ।ফুলবন্তী ওদের আলাদা করে মনিন্দর কে মারলো এক থাপ্পড়।ততক্ষণে বহু লোক জড়ো হয়ে গেল ।ফুলবন্তী বুড়ি বলল'তুই কি ভেবেছিস যে এই বাড়িতে তোকে আমি তান্ত্রিক সাধনা করতে দেব?কক্ষনো না ।আমি বেঁচে থাকতে তো দেবই না ।মরে গেলেও দেব না ।শালা শয়তান!'কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত ।এত মার ধোর গালি খেয়ে ও মনিন্দর চুপ করে বসে আছে ।দেখে মনে হচ্ছে তার বিন্দু মাত্র যায় আসে না ।ফুলবন্তী সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলল'কাল সকালে সবার উপস্থিতিতে আমি পঞ্চায়েত ডাকব।দয়া করে সবাই এসো ।'এরপর সবাই বাড়ি চলে গেল ।ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে ।


সকাল বেলা হতেই পঞ্চায়েত বসল ।গ্রামপ্রধানের সামনে ফুলবন্তী তার যাবতীয় জমি জমা পুকুর বাগান সব কিছু সম্পত্তি বড় ছেলে র নামে করে দিল ।ছোট ছেলে কে কানা কড়ি ও দিল না ।বরং তাকে ধমকি দিল ফের যদি সে ঐসব কাজ করে তাহলে সে যে পোস্ট অফিসে কাজ করে সেখানে বলে তার চাকরি শেষ করে দেবে ।আজ থেকে সে আলাদা থেকে নিজে রান্না করে খাবে ।তাদের সঙ্গে মনিন্দরের কোন সম্পর্ক নেই ।এই ঘটনারপর মনিন্দর কেমন যেন গুম মেরে গেল ।


এর মাস ছয়েক পর অসুখ করে ফুলবন্তীবুড়ি মারা গেল ।তার মৃত্যু আবার দুই ভাই কে কাছে নিয়ে এল ।দুই ভাইয়ে মিলে মিশে মায়ের কাজ সম্পন্ন করল ।আবার সংসার টা ভালো করে চলতে শুরু করলো ।মনিন্দর আবার গীতা কে বুকে জড়িয়ে ধরল ।তাকে নিয়ে ই দিন কাটাত মনিন্দর ।এরমধ্যেই একদিন একটা রেল দূর্ঘটনাতে ঝুকিন্দর আর তার স্ত্রী মারা গেল ।গীতা বেচারী শোকে কাতর হয়ে কাঁদতে থাকল ।মনিন্দর ওকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকল ।ঝুকিন্দরের যাবতীয় টাকা পয়সা জমি জমা পুকুর বাগান এর মালিক হল গীতা ।গ্রামের পঞ্চায়েত থেকে বলা হল যেহেতু গীতা এখনো আঠারো বছর বয়স হয়নি তাই তার অভিভাবক হিসেবে মনিন্দর এসব দেখাশোনা করবে ।এতে গীতা কোন প্রতিবাদ করে নি ।সে ছেলেমানুষ ।এসবের কিছুই বোঝে না ।

দেখতে দেখতে কেটে গেল অনেক গুলো বছর ।গীতা এখন আঠারো বছরের নব্য যুবতী ।


এদিকে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে লোক মনিন্দর কে অস্থির করে তুলল গীতার বিয়ে নিয়ে ।কথাটা গ্রামপ্রধানের কান অবধি পৌঁছল ।পঞ্চায়েত থেকে মনিন্দর কে বলা হল গীতার বিয়ে র ব্যবস্থা করতে ।না হলে গ্রাম থেকে তাদের বের করে দেওয়া হবে ।মনিন্দর সব কিছু শুনে চুপ করে রইল ।কারন সে জানতো রূপার বিয়ে হলেই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে


।মনিন্দরের মাথায় এবার চিন্তা ঢুকল ।তাইতো! এবার তো গীতা র বিয়ে দিতে হবে ।কিন্তু নতুন জামাই এসে যদি জমি জমা র দখল নিতে চায় তখন সে কি করবে? এতদিন গীতা র জমি জমা খেত খামার সে অবাধে ভোগ করেছে ।নাহ চুপ করে বসে থাকলে চলবে না ।কিছু একটা করতে হবে!


সেদিন কি একটা উৎসবের কারনে গাঁয়ে মেলা বসেছিল।গীতা মন খুব খুশি ।সকাল বেলা দুবেলা র রান্না সেরে সে মেলা যাবে বান্ধবী দের সাথে ।দাওয়া তে বসে গীতা সব্জি কাটতে বসে দেখে তার কাকা বেশ কিছু জন্তু জানোয়ার পুতুল তার কাকা নিয়ে আসছে ।যেমন চিতাবাঘ,  ,ভালুক, হরিণ, টিয়াপাখি ইত্যাদি ।কাকা কে জিজ্ঞাসা করলে মনিন্দর বলল ওগুলো মরার পরে ওদের ছাল চামড়া ছাড়িয়ে তার ভেতরে খড় তুলো সব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ।তাতে গীতা র ভয় পাবার কিছু নেই ।কিন্তু সেদিন থেকে গীতা লক্ষ্য করল তার কাকা রোজ রাতে দরজা বন্ধ করে কিছু একটা করে ।সে এসবের মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারলো না ।

একদিন একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটলো ।একটা টিয়াপাখি উড়ে এসে তাদের উঠোনে এসে বসল আর কিচিরমিচির করে ডাকতে লাগল ।গীতা উঠোনে কি কাজ করছিল ।জিনিস টা তার চোখে পড়লো ।হঠাৎই মনিন্দর কি একটা মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে এসে সেই টিয়াপাখি র গায়ে তিনবার ফুঁ দিল।দেখতে দেখতে জীবন্ত টিয়াপাখি পুতুল টিয়াপাখি তে পরিণত হল ।মনিন্দর তাকে ধরে নিয়ে তার ঘরের ভেতর নিয়ে গেল ।গীতার মনে পড়ল মেলার দিন তার কাকা অনান্য জীবজন্তু র পুতুলের সাথে একটা টিয়াপাখি র পুতুল ও নিয়ে এসেছিল না!এই টিয়া টা সেটা নয় তো!তাহলে তার কাকা কোন মন্ত্রবলে সেটা কে জীবন্ত করেছে ।আশ্চর্য ব্যাপার তো!গীতা মনে মনে খুব ভয় পেয়ে গেল ।কারন মরা জিনিসে প্রাণ সঞ্চার করা সোজা ব্যাপার না ।সে চিন্তা ভাবনা করে কোন সমাধান খুঁজে পেল না ।তারা কেবলই মনে হতে লাগলো তার সাথে খুব খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে


সেদিন অমাবস্যা।সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে ।সন্ধ্যার পর থেকে একটু বেশি শুরু হল ।তাড়াতাড়ি খেয়ে মনিন্দর আর গীতা শুতে গেল যে যার মতো নিজের নিজের ঘরে ।মাঝরাতে খুব জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণের শব্দে গীতার ঘুম ভেঙে গেল ।সে বিছানা তে শুয়ে থাকতে পারলো না ।ঘর থেকে বেরিয়ে সে বুঝতে পারলো শব্দ টা আসছে কাকার ঘর থেকে ।সে চুপিচুপি কাকার ঘরে এসে উঁকি দিল ।তারপর সে যা দেখল তাতে তার খুব ভয় লেগে গেল ।


সে দেখলো তার কাকা একটা লাল কাপড় পরে কপালে রক্ত চন্দনের টিকা লাগিয়ে কিসব মন্ত্র উচ্চারণ করে যাচ্ছে ।সামনে দাঁড় করানো হয়েছে পুতুল চিতাবাঘ টা ।মনিন্দর মন্ত্র উচ্চারণ করছে আর চিতার গায়ে ফুঁ দিচ্ছে ।ধীরে ধীরে চিতা বাঘ জাগ্রত হল ।সে প্রান ফিরে পেয়ে গোটা ঘরে গর্জন করে বেড়াতে লাগল ।আর তা দেখে পৈশাচিক হাসি হাসতে লাগল মনিন্দর ।সে ঘটনা দেখে গীতা হয়ত নিজের অজান্তে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল ।সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরে গেল মনিন্দরের ।

জানালার পাশে গীতা কে দেখে সে তাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে এসে ঘরে ফেলল ।ভয়ে আতঙ্কে গীতা মরমর অবস্থা!মনিন্দর গীতা কে বলল'কী দেখছিস!খুব অবাক হচ্ছিস না! এসব প্রতিশোধ নিচ্ছি তোর থেকে ।আমি যখন তন্ত্র সাধনা শুরু করেছিলাম তখন তোর বাবা আর ঠাকুমা বাধা দিয়েছিল আমাকে ।তোর ঠাকুমা আমাকে সম্পত্তির কানাকড়ি দিল না ।উল্টে গালাগালি করল সবার সামনে ।তোর বাবার এত সাহস যে বাইরের লোকের সামনে মারধর করল আমাকে ।শেষে পঞ্চায়েত ডেকে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করল ।আমি তখনকার মত চুপচাপ ছিলাম ।লোকদেখানি করে তখনকার মতো সাধনা বন্ধ করে দিয়েছিলাম ।কিন্তু গোপনে গোপনে শ্মশানের সেই তান্ত্রিকের কাছে সব বিদ্যা আয়ত্ত করছিলাম ।তোর ঠাকুমা আমার মা ছিল ।তাকে কিছু করতে পারি নি ।কিন্তু মরন বান চালিয়ে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে তোর বাবা মা কে খুন আমি করেছি ।তোর মাকে মারার ইচ্ছা ছিল না ।কিন্তু ঐদিন তোর বাবার সাথে বৌদি ছিল ।তাই তাকে মরতে হল ।বাকী রয়ে গেলি তুই ।তোর নামে জমিজমা থাকলেও অভিভাবক ছিলাম আমি ।বেশ ছিলাম ।কিন্তু পঞ্চায়েত থেকে যখন তোর বিয়ের কথা বলল তখন ভেবে দেখলাম তোর বর এসে তো জমি জমা পুকুর বাগান সব কিছু সম্পত্তি দখল করে আমাকে পথে বসাবে।সেজন্য তান্ত্রিকের সাথে যুক্তি করে তোকে মারার পরিকল্পনা করি ।ঠিক দেখেছিস তুই।এরা সবাই মৃত প্রানী হলেও আমি এদের মধ্যে প্রাণ সৃষ্টি করেছি ।জাগ্রত করেছি ।আজ আমার সাধনা সফল ।আজ এই চিতা বাঘ কে জাগিয়েছি ।একে দিয়ে তোকে খুন করব ।কোন প্রমাণ থাকবে না আমার নামে ।উপরন্তু তোর যাবতীয় সম্পত্তিরমালিক হব আমি ।নে এবার মরার জন্য তৈরি হ।'এই বলে সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজার শেকল লাগিয়ে দিল।


গীতা বেচারী একদমই তৈরি ছিল না এরকম একটা ঘটনার জন্য ।সে তো বিশ্বাস করতেই পারছে না তার পিতৃ সম কাকা যে তাকে কোলে নিয়ে মানুষ করেছে সে এমন একটা ঘটনা ঘটাতে পারে ।ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল গীতা ।এদিকে মন্ত্র পড়ে চিতা কে জাগিয়ে তুলেছে মনিন্দর ।বিরাট গর্জন করতে করতে বাঘ এসে হাজির হল গীতা র সামনে ।মৃত্যুর সম্মুখীন গীতা! আর তার রক্ষা নেই ।বাঘ টা খুব জোরে একটা ঝাঁপ দিল বাঘ টা ।ভয়ে চিৎকার করে উঠল গীতা ।বাইরে শোনা যাচ্ছে কাকা মনিন্দরের ভয়ঙ্কর হাসি ।সে বাঘকে বারবার উস্কে দিচ্ছে গীতা কে আক্রমণ করার জন্য ।


কিন্তু একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটলো ।যে বাঘ গীতা র দিকে ধেয়ে আসছিল সে একলাফে ঘরের দরজা ভেঙে বাইরে উঠোনে বেরিয়ে পড়ল গর্জন করতে করতে সে মনিন্দরের দিকে এগোতে থাকলো ।সমস্ত উঠোনে দৌড়ে বেড়াতে লাগল মনিন্দর ।কিন্তু বাঘ তার পিছু ছাড়ে না ।ছুটিয়ে ক্লান্ত করে বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল মনিন্দরের ঘাড়ে ।তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল বাঘ।ততক্ষণে গীতা বাইরে উঠোনে এককোনে এসে দাঁড়িয়েছে ।তাকে দেখে বাঘ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল ।তারপর সে আবার পুতুল বাঘে পরিনত হল।বাঘের মুখ থেকে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে এল ।সে ধোঁয়া তে আবছা ভাবে দেখা গেল তার ঠাকুমা ফুলবন্তী বুড়ির মুখ ।গীতার মনে পড়ল তার বাবা মা বলত যে কিছুতেই তার ঠাকুমা বাড়িতে কাকার এসব তন্ত্র মন্ত্র মেনে নেবে না ।এমনকি মরে গেলে ও না ।সেজন্য আজ তার ঠাকুমা র আত্মা এসে শয়তান কাকা কে হত্যা করে গীতার জীবন রক্ষা করেছে ।গীতা দুই হাত জোর করে ঠাকুমা র উদ্দেশ্যে প্রনাম জানাল ।

ততক্ষণে অন্ধকার দূর হয়ে সূর্য উঠছে ।শুরু হচ্ছে এক নতুন দিনের ।গীতা সোজা চলে গেল পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি ।তাকে সবকিছু জানাতে তিনি আরো অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে গীতাদের বাড়ি এলেন ।সবকিছু নিজের চোখে দেখে বললেন 'ভগবান কোন দিন পাপ সহ্য করেন না ।তাঁর চোখে ফাঁকি দেওয়া যায় না ।তিনি যা করেছেন মঙ্গলের জন্য করেছেন ।'গীতা কে তাঁর খুব পছন্দ হল ।নিজের ছেলের সাথে গীতা র বিয়ে সম্পন্ন করলেন তিনি ।আর কোন কষ্টই রইলো না গীতা


Rate this content
Log in

More bengali story from Subhra Mukherjee

Similar bengali story from Horror