সেদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় ছিল দোল পূর্ণিমা, কিন্তু আমার জন্য সকালটা ছিল অন্যরকম। আমি তখন পবিত্র রমজানের রোজা রেখেছিলাম, তাই মনে মনে ঠিক করেছিলাম—আজ রঙের ছোঁয়া থেকে নিজেকে দূরেই রাখব। সেহেরি খেয়ে যখন হোস্টেলের জানালা দিয়ে দেখছিলাম আকাশটা ধীরে ধীরে আবিরে রাঙা হচ্ছে, তখন এক অদ্ভুত শান্তিতে মনটা ভরে ছিল। নিজেকে আড়াল করতে হোস্টেলের একেবারে অন্ধকার এক কোণে গিয়ে লুকিয়ে বসেছিলাম।
কিন্তু হোস্টেল জীবন মানেই তো এক ছন্নছাড়া পরিবার! সেখানে 'লুকোচুরি' বেশিক্ষণ চলে না। বন্ধুদের নজর এড়ানো অসম্ভব। ওরা ঠিকই আমায় খুঁজে বের করল। আমার হাজারো বারণ, রোজার দোহাই—কিছুই ওদের কানে গেল না। ওদের একটাই কথা, "আজকের দিনটা তো রঙিন হতেই হবে!" বন্ধুদের সেই পাগলামি আর ভালোবাসার টানে শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হলো। ওরা আমায় টেনে নিয়ে গিয়ে আবিরে আবিরে মাখামাখি করে দিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সারা দিনের উপবাসের ক্লান্তিটুকু যেন বন্ধুদের সেই হাসির তোড়ে ভেসে গেল।
রঙ মেখে যখন নাজেহাল অবস্থা, তখন কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে ভেজা জামাকাপড় শুকাতে ছাদে গেলাম। ভাবলাম, আপদ চুকেছে! কিন্তু সিঁড়ির মুখেই দেখা হলো সেই মায়াবী দিদির সাথে। আমাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, অথচ ওনার উপস্থিতিতে মনের সব মেঘ কেটে যায়। দিদি হাসিমুখে এগিয়ে এসে পরম স্নেহে গালে একটু আবির ছুঁইয়ে দিলেন। ওনার সেই হাতের ছোঁয়ায় যেন এক অদ্ভুত প্রশ্রয় আর গভীর মায়া মিশে ছিল। মনে হলো, এই রঙের ছোঁয়াটা বোধহয় স্রেফ আবির নয়, এক অজানা ভালোবাসার টান।
আবার স্নান করে ফ্রেশ হয়ে গেটের সামনে গেটম্যান দাদুর পাশে গিয়ে বসলাম। একটু জিরিয়ে নিতেই হঠাৎ পেছন থেকে হানা দিলেন আমাদের হোস্টেল সুপার । ওনার সেই শাসন মেশানো ভালোবাসার রঙ থেকে বাঁচার কোনো পথই ছিল না। এরপর বাকি ছিল বড় দিদিরা—ওনারাও এসে বাদ রাখলেন না।
সব মিলিয়ে সেদিন আমায় চার চারবার স্নান করতে হয়েছিল! বারবার ফ্রেশ হয়েও মনে হচ্ছিল, গায়ের রঙ যতবারই ধুয়ে যাক, মনের গভীরে লেগে থাকা সেই ভালোবাসার রঙগুলো যেন আরও গাঢ় হচ্ছে। বিকেলের মরা রোদে যখন ইফতারের অপেক্ষায় বসেছিলাম, তখন মনে হলো—এই যে বারবার রঙ মাখা, বারবার বন্ধুদের সাথে খুনসুটি, আর সেই বিশেষ মানুষের আশীর্বাদ মাখা আবির—এটাই তো আসল উৎসব। ধর্ম আর নিয়মের বেড়াজাল ছাপিয়ে সেই দিনটি আমার কাছে এক 'অদ্ভুত মায়ার হোলি' হয়ে স্মৃতিতে অমলিন রইল।