STORYMIRROR

Mainak Mandal

Tragedy Others Children

4.2  

Mainak Mandal

Tragedy Others Children

অবসর

অবসর

5 mins
45

মেঘলা আকাশ । অন্ধকার ক্লাসরুমে ঠিক শেষ প্রান্তে একটি ভাঙা বেঞ্চিতে বসে স্কুলের প্রৌঢ় শিক্ষক , প্রতিম স্যার । প্রায় আধ ঘন্টা জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছেন তিনি । বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি , দেখে বড় একটা রাগী বলে মনে না হলেও বেশিরভাগ ছাত্রদের কাছেই তিনি যথেষ্ট অত্যাচারী শিক্ষক । 

আজ প্রথমবার ক্লাসে এসে থেকে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে একা বসে আছেন  স্যার । বাইরে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে । ফোর্থ পিরিয়ড থেকে কারেন্ট না থাকায় ছাত্ররা প্রায় ধরেই নিয়েছে , বাকি ক্লাসগুলো আর পড়া হবে না । মেয়েরা নিজেদের অভ্যাসবসে যে যার বেঞ্চে বসে গল্প করছে , ক্লাসের পিছনে একটা ছোট্ট কোণে একদল ছেলে ব্যাট বল নিয়ে তৈরি হচ্ছে । 
হায় ! একদিন যে এই সমস্তকেই ছেড়ে চলে যেতে হবে ! এমন অন্ধকার , মেঘাচ্ছন্ন দিন এলেই কেন কথাগুলো বারবার মনে হয় স্যারের ? 

ক্লাসের পিছন দিকে একটা গ্রিল - ভাঙা জানালার পাশের বেঞ্চে বসে আছে শ্রীলা ও মোহিনী । অনেকদিন পর দুই বন্ধুর দেখা হওয়ায় দুজনেই গল্পে মেতে উঠেছে । সেই দিকে তাকিয়ে , কতটা যেন নিজের মনেই বলে উঠলেন স্যার - " এই তোরা এত বলিস , স্যার বকে , মারে , আর তো মাত্র কটাদিন , তারপর আমি রিটায়ার করলে তোদেরও মুক্তি,  আমারও মুক্তি ....

তারপর হঠাৎ শ্রীলার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে  জিজ্ঞাসা করলেন - " খুব খুশি হবি বল আমি চলে গেলে ?"

হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে কেমন অস্থির হয়ে ওঠে শ্রীলা । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্যারের চোখের দিকে । 
স্যারও আর কিছু বললেন না । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় তাকিয়ে রইলেন জানালার বাইরের দিকে । 

মোহিনী একটু হাসলো । কিছুটা দূরেই স্যার বসে থাকায় শ্রীলার কানে ফিসফিস করে বলল - " দেখ , স্যার নিজেও জানে , তবুও বলতে ছাড়বে না । তুই বল তো , এত স্ট্রিক্ট কেউ হয় ? তবে যাই বল , এবার কিন্তু সত্যিই শান্তি । নইলে এতদিন......

" তুই চুপ কর মাহি । আমার ভালো লাগছে না । " 

দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল শ্রীলা । কানে বেজে উঠল একটু আগে শোনা স্যারের কথাগুলো । 

সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে । শ্রীলা যখন ক্লাস ফাইভে । 
নতুন স্কুল , নতুন বন্ধু , সবকিছুর মধ্যে আনন্দটাই আলাদা । এই স্কুলে আসার পর প্রথম ওর পরিচয় হয়েছিল প্রতিম স্যারের সঙ্গে । প্রথম যেদিন ক্লাস ফাইভের ক বিভাগটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না , সেদিন স্যারই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ওর নতুন ক্লাসে ।  প্রথম দিকটায় খুব উৎসাহ হলেও পরে বুঝতে পারে , এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা তার আগের স্কুলের মতো মিশুকে নয়। সে যাই হোক , ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শ্রীলার তেমন অসুবিধা হয়নি । 

তারপর প্রায় দু বছর কেটে গেছে । শ্রীলা এখন ক্লাস সিক্সে ,  তাও প্রায় শেষ হতে চলল । এই এক বছর স্যারের ক্লাস করার পর মনে হয়েছে , দোষটা বোধহয় তাদেরই । হ্যাঁ ,  স্যার স্ট্রিক্ট , স্যার খুব মারধোর করে , কিন্তু , ছাত্রদেরও কি উচিত নয় , একটু স্যারের কথাগুলো মেনে চলা ? 

শ্রীলার মতো আর এক দুজন ছাত্র ছাড়া বাকি শিক্ষকদের তুলনায় ভালো পড়ানো সত্ত্বেও সকলের চোখে স্যার অপছন্দের । বছর শেষে সব স্যারদের প্রণাম করে উপহার দেওয়ার সময় মোহিনীদের তালিকায় শুধু স্যারের নামটাই বাদ পড়ে যায় । 

আর একদিনের কথা মনে পড়ে । গরমের ছুটির পর প্রথম স্কুল খোলায় সেদিন বন্ধুদের সাথে গল্প করতে একটু বেশি
ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল শ্রীলা । হঠাৎ বোর্ডের দিকে চোখ  পড়তেই একটা ভীষণ গর্জন -----

" উঠে দাঁড়াও ! " 
" স্যার আসলে......"
" শাট আপ ! এক্ষুনি বেরিয়ে এসো ! " 
" সরি স্যার । " 
" বেরিয়ে যাও ! বেরিয়ে যাও আমার ক্লাস থেকে ! " 

সেদিন ক্লাসের বাইরে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল শ্রীলা । ক্লাস শেষ হওয়ার পর ভেতরে ঢুকলে বন্ধুরা বলেছিল , স্যার অকারনে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে । শ্রীলা কিন্তু সেদিন স্যারের উপর একটুও রাগ করেনি । বরং রাগ করেছিল নিজের উপর । এমন কি কথা বলার প্রয়োজন ছিল তার যে স্যারের সামনে তাকে এতটা খারাপ হতে হল ? 

বাড়ি ফেরার সময় সেদিন স্কুলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্যার । শ্রীলাকে দেখে কি একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন । শিলা অনেকবার সরি বলার কথা ভেবেও বলতে পারেনি , ভয় হয়েছিল । যদি স্যার আরো খারাপ ভাবেন ? 

ঢং ঢং করে বেজে উঠল ক্লাস শেষ হওয়ার ঘন্টা । নিজের সমস্ত স্মৃতি সরিয়ে রেখে শ্রীলা তাকিয়ে রইল পিছনের বেঞ্চে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা প্রতিম স্যারের দিকে । 
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন স্যার । 

ক্লাস থেকে বেরোবার মুখে হঠাৎই শ্রীলার মাথায় হাত রাখলেন স্যার। 
" পড়াশোনাটা মন দিয়ে করিস ! তুই পারবি ! " 
অকারনেই ছলছল করে উঠলো শ্রীলার অপূর্ব চোখজোড়া 

স্কুল ছুটি হওয়ার সময় হয়ে এলো । ছাত্ররা দল বেঁধে এগোতে লাগলো স্কুল গেটের দিকে । 

নিচের তলে নিজের ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিম স্যার । স্কুলের পুরনো রীতি অনুযায়ী সকলকে বিদায় জানাতে লাগলেন তিনি । শ্রীলাও বিদায় জানালো । তারপর ধীরে ধীরে প্রিয় বন্ধুদের হাত ধরে বেরিয়ে এলো স্কুল বিল্ডিং থেকে । 

বাড়ির ছাদে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীলা । আজ সিক্সথ পিরিয়ড থেকেই , কে জানে কেন , বার বার প্রতিম স্যারের কথা মনে হচ্ছে । এতদিন তো পড়াচ্ছেন , কই আর কোনদিন তো স্যার এমন করে কথা বলেননি ! 

শ্রীলার আজ শুধুই মনে হচ্ছে , স্যারের সাথে বুঝি আর দেখা হবে না । এত শাসন , বকাঝকা ,  ভয় মাখা ক্লাস- গুলো... যেন কেবলই স্মৃতি হয়ে যাবে । কিন্তু স্যারের রিটায়ারমেন্টের তো আরো দু মাস বাকি ! কে জানে ,  হয়তো স্যার তার সাথে কথা বলেছেন বলেই আজ এই কথাগুলো মনে আসছে ! 

টিউশনি থেকে ফিরে এসে বই নিয়ে বসে পড়লো শ্রীলা । সারাদিনটা কেটে গেল নানা ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে । বই খুলতেই হঠাৎ বামদিকের পাতায় ভেসে উঠলো স্যারের বিদায় জানাবার দৃশ্যটা । 

রাত নটার সময জোরে ভেজে উঠল মায়ের মোবাইল ফোনটা । 

" হ্যালো মোহিনী ? " 

হাতটা হঠাৎই খুব কেঁপে উঠল । মোবাইল ফোনটা হাত থেকে পড়তে পড়তেও দুটো আঙুলের ফাঁকে আলগাভাবে রয়ে গেল । চোখ -দুটো ভয়ানক ভাবে জ্বালা করে উঠলো ।
মোহিনীর ফোনে ওপার থেকে একটা ক্ষীণ স্বর ভেসে আসলো  ------- মারাগেছেন ? 

রাত একটা । বারান্দার পাশে ছোট্ট ঘরের কোণে একটা পুরনো বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে । রাতের আকাশে অসংখ্য তারার মাঝে এক দৃষ্টি তাকিয়ে আছে শ্রীলা । 
উফ্ ! কি অসহ্য নিস্তব্ধতা ! 

বিছানার উপর বইয়ের পাশে পড়ে থাকে সেই কয়েক ঘন্টা আগে লেখা শেষ চিঠিটা । 


                           " বিশ্বাস করুন 
                         যদি আগে জানতাম , 
এত তাড়াতাড়ি হয়তো আপনার অবসর নেওয়া হতো না..."






























































Rate this content
Log in

More bengali story from Mainak Mandal

Similar bengali story from Tragedy