STORYMIRROR

Mainak Mandal

Inspirational Children

4  

Mainak Mandal

Inspirational Children

মায়া

মায়া

21 mins
74

দূর চক্রবাল রেখায় অস্তমিত সূর্যের গোলাপী আভার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে পাশের মানুষটার উদ্দেশ্যে কিশোরী বলে উঠলো - "দেখুন ঠিক যেন অরোরা ! কি অপূর্ব আকাশ।"

প্রিয় ছাত্রের পিঠে স্নেহভরে হাত রেখে সুশীলবাবু বললেন "যেতে হবে তো অরোরার দেশে ! কিরে , পারবি না ?" 
গ্রামের সরকারি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র কিশোরী । সত্যি বলতে , একজন অসাধারণ ছাত্র । তবে এই অসাধারণ হওয়ার পিছনে কারণ বা পরিশ্রম সমস্তই তার নিজস্ব ,  অন্য সকলের চোখে সে গরিব কর্মচারীর একমাত্র সন্তান । 

প্রায় দু'ঘণ্টা স্যারের বাড়িতে অপেক্ষা করছিল কিশোরী। সঙ্গে তার একান্ত প্রিয় বন্ধু , রক্তিম । হঠাৎ রিকশার আওয়াজ পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে ঘরের দরজা খুলে দিল কিশোরী । প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিষন্নমুখে ঘরে প্রবেশ করলেন সুশীলবাবু । পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী ইলাদেবী ও কোলের কাছে ন বছরের মেয়ে , পৃথা । ইলাদেবীর চোখে জল । সুশীল বাবু ক্লান্তভাবে পিঠের ব্যাগটা রেখে বললেন "কিশোরী ,  আজ তুমি এসো । আজ আর পড়তে হবে না। "

কথাটা শেষ হবার আগেই মেয়ের হাত ধরে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন ইলাদেবী । 

কিশোরী কৌতুহলীভাবে জিজ্ঞাসা করল " স্যার ,পৃথা ?"
"না গো ,তেমন কিছুই হলো না । চেষ্টা করেছিলাম ,  কিন্তু ভাগ্যটাই আমার খারাপ। ডাক্তারবাবু বললেন , ওকে আর স্বাভাবিক করা যাবে না । কিশোরী,  তোমার কাছে বলতে আমার দ্বিধা নেই । ওই একটাই মেয়ে, ওকে নিয়ে কত আশা , ওর একটা গতি না করতে পারলে আর যে চলেই না। তোমার কাকিমারও শরীরটা ভালো নেই। রাতে ঘুম হয় না ,  সারাদিন মেয়েটার জন্য চিন্তা করে । আমার কাছে কান্নাকাটি করে ,  আমিই বা কি করি বলো ! এই সব সামলে নিজের পড়াশোনার ও আজকালের সময় হয়ে ওঠে না । " 

তার চোখে হতাশার দৃষ্টি । গলার আওয়াজে মনে হল ,  যেন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে । নিজের কষ্টের কথা একমাত্র কিশোরীকেই বলে থাকেন সুশীলবাবু । কিশোরী স্বভাবে অত্যন্ত দায়িত্ববান ও সহানুভূতিশীল । বাকি ছাত্রদের কাছে সংকোচ হলেও তাই কিশোরীকে বলতে কখনো দুবার ভাবেন না সুশীলবাবু । 

খানিক্ষণ কথাবার্তার পর ঘরে চলে গেলেন সুশীলবাবু । রক্তিম এতোক্ষণ পড়ার টেবিলেই ছিল , স্যার চলে যাওয়ার পর বেড়িয়ে এসে বললো ,"দেখ কিশোরী , শুধু শুধু ওই মেয়েটাকে নিয়ে গা ঘামাস না । একটা অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ভাবা তোর কাজ নয় । আর ভেবেই বা লাভ কি ? ডাক্তার বলে দিয়েছে , ওই মেয়ে ঠিক হবার নয়। চল বাড়ি ফিরে যাই !" 
এতক্ষণ কিশোরীর মুখের ভাব লক্ষ্য করেনি রক্তিম ।  তাকিয়ে দেখল, কিশোরী তার কোন কথাই শোনেনি । তার সমস্ত দৃষ্টি , মন , ভাবনা এখন আটকে আছে উঠোনে  দাঁড়িয়ে থাকা একটা রোগা ,  জীর্ণ মেয়ের প্রতি । 
 
মেয়েটির শরীর অত্যন্ত ক্ষীন , চুল এলোমেলো ,  রুক্ষ। হাতে পায়ে কাটা দাগ , গায়ের পোশাক নানা জায়গায় ছেঁড়া ।  দুই গালে জলের দাগ ,  গায়ের রং চাপা । চোখের ভাষা অর্থহীন , যেন কোন সুদূরে হারিয়ে গেছে । দেখে মনে হয় ,  সে যেন এ দেশের প্রাণই নয় , ভিনদেশী কোন যোগিনী । 

খুব আলতো ভাবে একটা ধাক্কা দিল রক্তিম । কিশোরী চমকে উঠে বলল " ও তুই ? আমি তো......" 
রক্তিম সে কথা না শুনে বলল," তুই তো পৃথার  জন্য ভাবতেই ব্যস্ত। আর কোন দিকে তোর মন আছে ?"
কিশোরী অন্যমনস্ক ভাবে বলল ," রক্তিম , আমি একবার ওর কাছে যাব । ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করব ।  একবার ভেবে দেখ তো , একটা মেয়ে , মা- বাবার বল ভরসা , যার কিনা সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখার কথা , শুধুমাত্র সবাইয়ের থেকে আলাদা বলেই তাকে এককোণে পড়ে থাকতে হবে ! না রক্তিম , এটা হয় না , স্যারের স্টুডেন্ট হয়ে আমি মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবো না ! " 

রক্তিম বিরক্ত বোধ করছে বুঝতে পেরে কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই পায়ে পায়ে এগোতে থাকলো কিশোরী।

পৃথার ঠিক পাশটিতে এসে চুপ করে দাঁড়ালো কিশোর । একটা অন্যরকম অনুভূতি , যেন নতুন কিছু ঘটতে চলেছে, যা এর আগে কেউ ভাবেনি , কেউ করেনি..... একটা সুন্দর রোমাঞ্চ ,  কিছুটা আনন্দের , কিছুটা দুঃখের ,  আবার কিছুটা ,  এক অজানা রহস্যের ! 

পৃথার আলুথালো চুল পিঠের উপর ছড়ানো ।  চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। সেই মায়াবী চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বন্ধুত্বের ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো কিশোরী - " কেমন আছো পৃথা ?" 
চারিদিক অন্ধকার নিশ্চুপ থাকায় অচেনা কণ্ঠস্বরের আহবানে মানুষ যেমন চমকে ওঠে ,  ঠিক তেমনি ভাবেই অবাক হয়ে কিশোরীর দিকে চাইল পৃথা।
হঠাৎ খুব জোরে একটা চিৎকার শোনা গেল বাড়ির ভেতর পর্যন্ত । কিশোরীকে দেখে ভয় ছেঁচিয়ে উঠে পালাতে লাগল পৃথা । কিশোরী  কিছু বলবার আগেই পা পিছলে পড়ে গিয়ে কেঁদে উঠলো। মেয়ের কান্না শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কিশোরীর  প্রতি কোনরকম লক্ষ্য না দিয়েই মেয়েকে কোলে তুলে চলে গেলেন ইলাদেবী । 

সমস্ত ব্যাপারটায় কিশোরী এত অবাক হয়েছিল যে কোন কথাই বলতে পারল না ।  মনে মনে খুব কষ্ট হল। ওর জন্যই বেচারা মেয়েটা পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। হয়তো বা খুব ভয় পেয়েছিল ! সত্যিই কি তাহলে সে কোন কথাই বলবে না ? একটু চেষ্টা করলে কিশোরী কি পারবে না পৃথার  মন জয় করতে ? 

"ও কি ?  বসে রইলে কেন কিশোরী  ? লেখো ! "
বইয়ের পাতা থেকে কিশোরীর  মন উড়ে গিয়েছিল সেই অসহায় অবহেলিত মেয়েটির চোখে ! সে বুঝেছে ! ওই ভাসা ভাসা,জল ভরা চোখ দুটোর চাহিদা সে বুঝেছে ! 
ওরা শুধু একটু ভালোবাসা চায় ! চায় অন্যের আপন হতে ,  সকলের আদর পেতে। কিশোরীই কি পারে না ওকে একটুnei ভালোবেসে আগলে রাখতে ? 
স্যার আবার ডাকলেন "আজ তোমার কি হয়েছে বলো তো  কিশোরী ?  পড়ায় মন নেই কেন ? কি ভাবছো ?"
"আচ্ছা স্যার, এখন থেকে আমি যদি পৃথার সাথে একটু কথা বলি ?"
নিজের প্রবল ইচ্ছা এবং স্যারের উৎসাহ থাকা সত্ত্বেও পৃথার সাথে দেখা হলো না কিশোরীর। মা খবর পাঠিয়েছেন , বাবার শরীরটা বিশেষ ভালো নেই । আজ একবার তার কারখানায় না গেলেই নয়। 

তাড়াতাড়ি টিউশন থেকে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল কিশোরী। রাস্তায় যেতে যেতে বাবার জন্য খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল , বাবার বয়স হয়েছে , এই বয়সে ওসব কাজ করা মানুষটার  উচি নয়। কিন্তু কিছু একটা কাজ না করে যে উপায় নেই।

বাড়ির সমস্ত কাজ সামলে রাত্রিবেলা বই নিয়ে বসে পড়লো কিশোরী। বাড়ির চারপাশ অন্ধকার ,  পশ্চিম দিকে ঘরটায় মা-বাবা ঘুমাচ্ছেন । হাতের কাছে ছোট হারিকেন ,  খাটের তলায় তেলের শিশি । হারিকেনের আলোয় ছোট ঘরটাতে আলো-আঁধারের মায়াজাল সৃষ্টি হয়েছে। সেই আলোর রেখাগুলোর মধ্যে গালে হাত দিয়ে বসে আছে কিশোরী। গ্রীষ্মের রাতে ঠান্ডা বাতাসে বইয়ের পাতাগুলো সমানে উড়ে চলেছে , কিশোরীর মন পড়ে রয়েছে তার অসুস্থ বাবার শরীরে । সারাদিন এত পরিশ্রমের পর বাবার মাঝে মধ্যেই জ্বর হচ্ছে , মায়ের চিন্তা বাড়ছে । মাঝে মাঝে কিশোরীর মনে হয় বাবা আর পারবে না । খুব কান্না পায় । পৃথিবীর যত কষ্ট ভগবান কি ওর বাবাকেই দিয়েছেন ?

ভাবতে ভাবতে অনেক রাত হয়ে গেল । বই খাতা গুছিয়ে পড়ার ঘরেই শুয়ে পড়লো কিশোরী । সুখের স্বপ্ন মাথার উপর মা-বাবার দায়িত্ব । আবার কোথাও যেন শুধু সেই মায়া ভরা , ভয় মাখা , চোখ দুটোর কথা.....

স্যার বাড়ি ছিলেন না, স্কুলের কাজে কলকাতা গিয়েছিলেন । কিশোরীকে বলে গিয়েছিলেন , একদিন সময় করে গিয়ে কাকিমা ও পৃথার সঙ্গে দেখা করে আসতে। দিনটা ছিল রবিবার , বাবারও কাজের ছুটি । একটু বেলার দিকে স্যারের বাড়ি যেতে গিয়ে দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কিশোরী। 

দেখল পৃথার মা সারা বাড়িতে ছুটে বেরিয়ে তার এককোণে  শুয়ে থাকা মেয়েকে খাওয়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন , আর পৃথা চুপ করে শুয়ে কাঁদছে । 

স্যার না থাকায় এদের এই অবস্থা দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না কিশোরী । ভেতরে ঢুকে ইলাদেবীকে জিজ্ঞাসা করল - "পৃথার কি হয়েছে কাকিমা ? ও কাঁদছে কেন ? আপনি ওরকম ছোটাছুটি করে...নানা কাকিমা , আপনি আমায় বলুন , আমি অবশ্যই একবার চেষ্টা করবো। " 
হাত থেকে খাবারটা নামিয়ে রেখে ইলাদেবী বললেন - " কিশোরী, খুব ভালো হয়েছে তুমি এসেছ ।  দেখো না , তিন চার দিন ধরে কিছু খাচ্ছে না , কোথাও যাচ্ছে না। শুধু গুম হয়ে পড়ে আছে। কিছু খাওয়াতে গেলেই বলছে বাবাকে দেখবে। তোমার স্যার এখন এক সপ্তাহ আসবে না। ততদিন এই মেয়েকে আমি কি করে সামলাবো কিছুই বুঝতে পারছি না । তুমি একটু চেষ্টা করে দেখো না বাবা ,  যদি কিছু করতে পারো । " 

কিশোরী যেন ঠিক এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিল ।  একবার , শুধু একবার যেন সে পিঠার খেয়াল রাখার দায়িত্ব পায়। একটু কথা বলা ,  একটু সাহায্য করা , একটু ভালোবেসে বেধে রাখা..... যে চোখ দুটো এতদিন শুধু অপরের ঘৃণা ও অনাদরই সহ্য করেছে , তার কাছে এটাই যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখ সে বিষয়ে কোন সংশয় নেই । 

খুব আস্তে আস্তে বিছার মাথার কাছে পৌঁছে হাটু মোড়ে বসে পড়ল কিশোরী। জিজ্ঞেস করল - " তুমি খাচ্ছো না কেন পৃথা ?  বাবার জন্য মন খারাপ ? আচ্ছা বেশ বাবা তো আর কয়েকদিন পরই চলে আসবে। তাই বলে কি না খেয়ে থাকলে হয় ? কিগো , খাবে না ? " 

নিজের খেয়ালে ডুবে থাকা পৃথা কথাটি বলল না , মুখ তুলে চাইলও না। 

পৃধার চোখদুটো রাঙা ।  শরীরের কোন শক্তি নেই। নিজের অজান্তেই দুহাত দিয়ে পৃথার মুখটা তুলে ধরে কিশোরী । তার দুঃখ চুলের একগাছা কানের পাশে দিয়ে বলল - " আচ্ছা পৃথা , আমি যদি তোমায় ,  ঠিক তোমার বাবার মত খুব , খুব ভালোবাসি ? তোমায় খাইয়ে দিই , ঘুরতে নিয়ে যাই , গল্প বলি ? বলো না পৃথা , তুমি যেমন থাকতে চাইবে ,  তোমায় ঠিক তেমনি করেই রাখবো । তুমি যা চাইবে ,  যেখানে যেতে চাইবে , তোমায় নিয়ে যাব। তোমার বাবা এলে না হয় আবার আমি চলে যাব । এই কটা দিন ,  শুধু একটা সপ্তা , তুমি কি চাও না , আমি তোমার বাবার মতো থাজানেনা

জলভরা দুটো চোখের উজ্জ্বল মণিগুলো এক মুহূর্তের জন্য মিশে যায় কিশোরীর চোখে। সেই দৃষ্টিতে শুধুই ভালোবাসা , একটা গভীর স্নেহ । কিসের জন্যে পৃথার  প্রতি তার এত টান তা কিশোরী জানেনা ,  শুধু জানে , ওই চোখে একটা অনুরোধ আছে , ভালোবাসার । আর সেই অনুরোধ অবজ্ঞা করার সাধ্য তার নেই । 

" না , আসবে না ,  আমি জানি ! " 
জীবনে প্রথমবার পৃথার গলার স্বর শুনতে পেল কিশোরী ।

পৃথাকে বোঝানোর সমস্ত চেষ্টা করতে লাগল কিশোরী । " কেন আসবো না পৃথা , কে বলেছে তোমায় ? তুমি যদি চাও ,আমি তোমার কাছে, তোমার সাথেই থাকবো । কোথাও যাবো না তোমায় ছেড়ে । সবসময় তোমার খেয়াল রাখব.... রাজি তো ? " 
" সত্যি তুমি থাকবে ? বাবাকে দেবে আমায় ? " ধীরে ধীরে কিশোরীর কোলে ঝুঁকে পড়লো পৃথা । 

খুব সাবধানে পৃথাকে খাইয়ে দিতে লাগলো কিশোরী । পৃথাকে চঞ্চল হতে দেখে কোলে তুলে নিয়ে এক ছুটে চলে গেল বারান্দায় । 
ঘেরা বারান্দায় সারি সারি ফুলের টব সাজানো দুপুরের রোদে গ্রিলগুলো কেমন চকচক করছে । মাঝখানে বসে দুটো চড়াই আর একটা শালিক । মাটির টবে বাহারী রঙের  কাগজ ফুলের দিকে আঙুল দেখিয়ে কিশোরী বলল - "  দেখো কি সুন্দর ফুল...তুমি ফুল নেবে ? " 

পৃথা বলল - " আমি ফুল আঁকি , দেখবে তুমি ? " 
কিশোরী - " কেন দেখবো না ?  কেমন সুন্দর ফুল আঁকতে পারো তুমি ! দেখতেই হবে ,  কই তোমার আঁকা ? " 
হঠাৎ উল্টো দিকে মুখ করে চুপ করে রইল পৃথা । 
কিশোরী ডাকতে গেলে জানালো - " তুমি আমার আঁকা দেখে হাসবে না তো ? " 
পৃথাকে কোলে তুলে জড়িয়ে ধরল কিশোরী ।  মাথায় হাত বুলিয়ে বলল - " না ,  একটুও হাসবো না । তুমি খুব ভালো আঁকো । এখন থেকে আর কেউ হাসবে না তোমার আঁকা দেখে । আমি আছি তো , কাউকে কিছু বলতে দেব না। " 

কিশোরীর কাঁধে মাথা রাখল পৃথা । বাবার কোলের পর এটাই যেন সবচেয়ে নিরাপদ ও স্নেহপূর্ণ জায়গা বলে মনে হল তার। 

কিশোরী বুঝলো ওর গলার কাছে জামাটা আস্তে আস্তে ভিজে উঠছে। পৃথার মুখটা জোর করে তুলে ধরে বলল - " কাঁদছো কেন পৃথা ? আমি তো তোমায় কিছু বলিনি ! কি হয়েছে ?  " 
হঠাৎ খুব জোরে কেঁদে উঠলো পৃথা । " ওরা সবাই বলে আমার আঁকা খুব খারাপ । একটুও আঁকতে পারি না আমি। খুব খারাপ আমি ।  ওরা আমায় দেখে  খুব হাসে । কেউ আমায় পছন্দ করে না , কেউ ভালোবাসে না । " 

কিশোরী কখনো ভাবেনি, পৃথা তার সামনে এই কথাগুলো বলবে । প্রথম দিন থেকেই সে  পৃথাকে খুব ভালোবেসেছে ।
নিজের মতো করে ভালোবেসেছে , তাকে বোঝার চেষ্টা করেছে । পৃথাকে কাঁদতে দেখে তাই কিশোরের চোখেও জল এসে গেল । 
পৃথাকে সাহস দিয়ে বলল - " যারা বলে , তারা কেউ তোমায় বোঝেনা । কেউ তোমার ভালো চায় না , তোমায় বোঝার মত ক্ষমতা তাদের নেই। তুমি আর কখনো নিজেকে এরকম বলবে না । তুমি জানবে , তুমি খুব ভালো মেয়ে। যাও পৃথা , তোমার আঁকা নিয়ে এসো , আমি দেখতে চাই । "

প্রায় এক মিনিটের মধ্যে বাবার ওষুধের বড় খামের উপর আঁকা একটা সুন্দর ফুল নিয়ে হাজির হলো পৃথা । খুব আশা নিয়ে কিশোরীর হাতে তুলে দিয়ে বলল - " দেখো না , ফুল এঁকেছি । কেমন হয়েছে ? " 

কিশোরী দেখল, কাগজের উপর আঁকা একটা অপূর্ব সুন্দর হলুদ রঙের ফুল । ফুলের প্রতিটি অংশে রং উজ্জ্বল , এমনকি পাপড়ির খাঁজগুলো পর্যন্ত । এ যেন কোন শিল্পীর হাতে ফুটে ওঠা এক আশ্চর্য তুলি ! 
যে মেয়ে এখনো স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে না , খেতে পর্যন্ত পারে না , তার হাতে যে এত অপূর্ব শিল্প সৃষ্টি হতে পারে ,   তা কিশোরী স্বপ্নেও ভাবেনি । 

প্রথমটা খুব অবাক হয়ে কিশোরী বলে  ওঠে - " ছবি তোমার আঁকা পৃথা?  সত্যি বলছো ? " 
" হ্যাঁ ,  কেন ?  ভালো হয়নি ? " 
কিশোরী হাঁটু মুড়ে বসে পৃথার মাথায় হাত রেখে বলল - " কি বলছো তুমি? খুব ভালো হয়েছে । খুব সুন্দর এঁকেছো তুমি। এতো ভালো ছবি আঁকো তুমি , আর ওরা তা নিয়ে হাসাহাসি করে !  তুমি কখনো ওদের কথায় কান দেবেন না , না ..." 

পৃথা হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে বলল - " তোমার কোন নাম নেই ? " 
কিশোরী মৃদু হেসে বলল - "  তুমি আমায় যেই নামে ডাকবে , আজ থেকে সেটাই আমার নাম । " 
পৃথা - " আমি তবে নাম দিই ? " 
কিশোরী  - "হ্যাঁ " 
পৃথা খিলখিল করে হেসে বললে - " ফুল " 
কিশোরী জিজ্ঞেস করল - " ফুল !  কেন ? " 
পৃথা আবার হেসে বলল - " এই যে তুমি এতক্ষণ শুধু ফুল ফুল বলছ ! "

কি রিনরিনে মিষ্টি হাসি ! ঠিক যেন বসন্তের কোকিল ! কিশোরীর মনে হয় , এর চেয়ে বেশি খুশি বোধহয় সে কোনদিন হয়নি । 

পৃথার সাথে থেকে সময় কাটালেও কিশোরীর মনে পড়ে যায় অসুস্থ বাবার কথা । সেই কোন দুপুরবেলা খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছে , মাকে বলেছে , দেখা করেই চলে আসবে । অথচ এত রাত হয়ে গেল , এখনো বাড়ি ফিরতে পারল না । কে জানে মা-বাবা এখন কত চিন্তা করছে । 
অথচ পৃথাকে মুখ ফুটে কিছু বলার স্পর্ধা তার নেই । সে একরকম ভেবেই নিয়েছে ,  স্যার না আসা পর্যন্ত কিশোরী তার সাথেই থাকবে । আজ পৃথাকে এতটা মিশে যেতে দেখে ইলাদেবী খুব অবাক হয়েছেন । এর আগে পৃথা কারোর সাথে এত কথা বলেনি । যে মেয়েকে তিনি সামলাতে পারেননি , কিশোরী তার বন্ধু হয়ে উঠেছে। এ যে বড় গর্বের কথা  । কিশোরীর হাত ধরে অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। 

রাত নটার সময় পৃথার ঘরে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলেন ইলাদেবী । কিশোরী এগিয়ে এসে বলল - "  কাকিমা আমি চলে গেলে পৃথা খুব কষ্ট পাবে । ও কিছুতেই রাজি হবে না । আমি এত খুশি ওকে কোনদিন দেখিনি । তাই কি করব , কিছু বুঝতে পারছি না । 

ইলদেবী বললেন - " এতদূর যখন পেরেছ , ওকে আর একটু বোঝাতে নিশ্চয়ই পারবে । দেখো না বাবা , যদি কথা শোনে । তোমার উপর আমার ভরসা আছে । "

বারাদায় এসে পৃথার হাতের উপর হাত রাখে কিশোরী । পৃথা তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে । কিশোরীর হাতের ছোঁয়া পেয়ে পৃথা বলে ওঠে - " ফুলদাদা দেখো , কত তারা । ওখানে যাব আমি ? " 
কিশোরী থামিয়ে দিয়ে বলে - " যা , বলতে নেই ! জানো পৃথা , তোমার মত আমারও একটা বাবা আছে । আর বাবার খুব শরীর খারাপ , জ্বর হয়েছে । আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনা , কিন্তু আমাকে না দেখলে বাবা খুব মন খারাপ করবে । আমি যদি এখন বাড়ি চলে যাই , তুমি কি খুব রাগ করবে? " 

হঠাৎ ঝড়ের বেগে কিশোরীর দিকে তাকালো পৃথা ।  উফ্, কী ভীষণ রাগ , কী ভীষণ কষ্ট সেই দৃষ্টিতে ! 
কোনো উত্তর না দিয়েই বারান্দা থেকে ছুটে গিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ে কেঁদে উঠল পৃথা। বারবার বলতে লাগলো - " কেউ থাকবে না , কেউ থাকবে না , আমাকে কেউ থাকবে না ! " 

পৃথাকে এরকম করতে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল কিশোরী । বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পৃথার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো - " বিশ্বাস করো পৃথা , আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনা । কিন্তু আমার কোনো উপায় নেই । আমাকে না দেখে অসুস্থ হয়ে যদি আমার বাবা মারা যায় , তাহলেও কি তুমি রাগ করবে ? " 

জোর করে কথাটা বলতে গিয়ে ঠোঁট কেঁপে উঠলো কিশোরীর । ওর চোখে জল । পৃথা কান্না থামিয়ে উঠে বসে বলল - " না ফুলদদা , রাগ করবো না । তুমি আমাকে নিয়ে  চলো , তোমার বাবাকে দেখব । চলো না ফুলদাদা , নিয়ে চলো না ! তোমার বাবা কি আমায় দেখে হাসবে ? " 

কিশোরী তাড়াতাড়ি বলে উঠলো - " নানা বাবা খুব খুশি হবে । বাবাকে আমি তোমার সব কথা বলবো । দেখবে ,  বাবাও তোমায় খুব ভালবাসবে । কিন্তু আমি তোমায় নিয়ে গেলে  , তোমার মা যে খুব রাগ করবেন। " 

" মা বকবে না। নিয়ে চলো না ফুলদাদা ! " 

অগত্যা কিশোরী বাধ্য হলো পৃথাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে । ইলাদেবীর দৃঢ় বিশ্বাস , কিশোরী তাঁর মেয়ের খেয়াল ঠিক রাখতে পারবে । 

রাত নটা । চারিদিক নিস্তব্ধ। কয়েকটা ব্যাঙ রাস্তার ধারে সমানে  ডেকে চলেছে । অন্ধকার আকাশ , দূরে মাঠের পরে অনেকগুলো তারা জোনাকির মত জ্বলছে । দুপাশে ঝোপ ঝাড় , মাঝে মাঝে এক একটা ছোট ডোবা ।

রাস্তার মাঝখান দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে কিশোরী । আকাশে জোৎস্না , সাইকেলের পিছনে বসে শান্ত , ছোট্ট পৃথা । 
এই সংক্ষিপ্ত যাত্রার আবেগ ও প্রশান্তি সে জীবনে কোনদিন ভুলবে না । 

বুধবার সকালে স্যারের বাড়িতে দেখা করতে আসে কিশোরী । দেখে , পৃথা বারান্দায় বসে একা একা কি যেনো বলে চলেছে । কাছে গিয়ে শোনার চেষ্টা করলে পৃথা লাফিয়ে উঠে বলে - " ফুলদাদা  তুমি ! এই দেখো , তোমার ছবি এঁকেছি , হি হি ! দেখো , হি হি! " 
কিশোরী দেখল , একেবারে কার্টুনের মতো করে একটি ছেলের ছবি আঁকা হয়েছে , আর তার দুহাতে অনেক ফুল । ছবিটা দেখে খুব হাসি পেলো কিশোরীর , খানিক্ষণ দুজনেই হাসতে লাগলো । 

হঠাৎ হাসি থামিয়ে কিশোরী বলল - " আচ্ছা পৃথা , তুমি পড়তে পারো না ? " 
পৃথা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল - " ছি ! একটুও না । " 
" তোমার ইচ্ছে করে না পড়তে ? " 
" না , না , না ..." আপন মনে বাড়ির চারপাশে ছুটে বেড়িয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগলো পৃথা । কিশোরী ওর হাত ধরে টেনে এনে বলল - " কেন নয় পৃথা ? সবাই কেমন স্কুলে যায় , লেখাপড়া শেখে , কত কি লিখতে , পড়তে পারে ! তোমার কি ইচ্ছা হয় না ওদের সাথে যেতে ? " 

পৃথা কিশোরীর দিকে তাকিয়ে বলল - "  আমি যাব না ।" 
" কেন ? " 
পৃথা কিশোরীর জামাটা টেনে ধরে মুঠো করে বলল - " ফুলদাদা ওরা আমায় দেখে হাসবে ! উফ্ আমি কিছুতেই যাবো না , না ,  একবারও না ! " 

মাটিতে শুয়ে পড়ে চাপা স্বরে চিৎকার করতে থাকে পৃথা । চেষ্টা করে নিজের দুই হাত দিয়ে গায়ের পোশাকটা ছিঁড়ে ফেলার । কিশোরী বুঝতে পেরে পৃথাকে কোলে তুলে নিয়ে বসে থাকে প্রায় আধঘন্টা । শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরে থাকে ওর সমস্ত শরীরটা । পৃথার ঠোঁট কাঁপছে , দুটো চোখ বন্ধ , হাত-পা গুলো যেন কেমন অস্থির ভাবে নড়া- চড়া করছে । খানিক্ষণ পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে পৃথা । চোখ খোলে , কিশোরীর দিকে তাকায় । কী যেন বলতে চায় । কিশোরী অন্যমনস্ক ভাবে পৃথার আঁকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে - " আচ্ছা পৃথা , তোমাকে যদি একটা অন্য স্কুলে দিই ? সেখানে কেউ তোমার সাথে খারাপ আচরণ করবে না , কেউ তোমায় দেখে হাসবে না , সবাই তোমায় বুঝবে , তোমায় জানতে চেষ্টা করবে । হয়তো অনেকেই , তোমার মত আঁকতে খুব ভালবাসবে । তুমি ওদের সাথে থাকবে , খেলবে...দেখো , তোমার আর একটুও খারাপ লাগবে না ! " 

তারপর পৃথার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে - " যাবে পৃথা ? " 

পৃথা দুপাশে ঘাড় নেড়ে বলল , " না " তারপর কিশোরীর কোলে মাথা রেখে বলল - " ফুলদাদা , আমি থাকবো তোমার সাথে । " 

ঘরের ডানদিকে পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকড়ে পড়ছিল উত্তপ্ত মেঝেতে । বাইরের প্রখর রোদ হলেও ফ্যানের হাওয়ায় ঘরটা বেশ ঠান্ডা । সেই হাওয়ায় পৃথার ছড়ানো চুলগুলো কিশোরীর হাতের উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল বারবার । পৃথার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে কিশোরী বলল - " আমিও থাকতে চাই । " 

সবেমাত্র কলকাতা থেকে ফিরেছেন সুশীলবাবু । ময়লা জামাটা চেয়ারে মিলে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছেন । মেয়েকে দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছে । অভ্যাসবসে  ডাক দিলেন - " পৃথা , কোথায় গেলি মা ? তোর বাবা চলে এসেছে ! কিরে , পৃথা? "

বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে কিশোরীর হাত ধরে ছুটতে ছুটতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো পৃথা । সুশীলবাবুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল বলে - "  বাবা , তুমি এসেছো ? জানো বাবা , ফুলদাদা খুব ভালো । আমায় অনেক গল্প বলে । বলেছে ,  আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে । আমি ছবি আঁকবো । 
যাবে তো ফুলদাদা ? " 

চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল । " এসব কি করে সম্ভব হলো কিশোরী ? " 

" ভালবাসা স্যার , শুধু একটু ভালোবাসা ।
ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু সম্ভব । " 

সমস্ত কথাবার্তা হয়ে গেছে । সুশীলবাবুর বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে পৃথার মতো আরো অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য একটা পুরনো স্কুল রয়েছে। পরের মাস থেকে ওখানেই পাঠানো হবে পৃথাকে। ওকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার এবং নিয়ে আসার ভার কিশোরীর উপর । না , এ দায়িত্ব তাকে কেউ দেয়নি , সে নিজেই নিয়েছে । সত্যি বলতে , শুধুই কি দায়িত্ববোধ ? পৃথার প্রতি তার মনে কি আর অন্য কোনো অনুভূতি নেই ?

পড়তে পড়তে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল কিশোরী । হঠাৎ মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে উঠে বসে । কিশোরীর মা অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের , খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না ।আজ হঠাৎ কিশোরীর পাশে এসে বসলেন । ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন - " দেখ বাবা , আমি তোর মনের কথা বুঝি । কিন্তু তুই বড় হয়েছিস , সংসারের দিকটাও যে তোকে দেখতে হবে । আমিও কি চাই না তুই লেখাপড়া শিখে দশের এক হবি ? তোর বাবার কারখানায় এখন যে ঝামেলা শুরু হয়েছে , তা সহজে মিটবে বলে মনে হয় না। তুই সারাদিন পড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকিস , জমিজমার কি অবস্থা তাও লক্ষ্য রাখিস না । এদিকে তোর টিউশনের খরচ চালাতে গিয়ে একা হাতে অত কাজ করে তোর বাবার শরীরটাও খারাপ হচ্ছে । ওরে , শুধু কি নিজের ভবিষ্যৎ ?
ওই মানুষটার কথাও তো একটু ভাববি ? সংসারের যে অবস্থা , তোর বাবা তোকে আর কতদিন পড়াতে পারবে তা বলতে পারি নে..." 

" মা ! " কী একটা বলতে গিয়ে যেনো থেমে গেলো কিশোরী  । চোখদুটো কেমন জ্বালা করে উঠলো । 

কিশোরীর মা আর কিছু না বলে দরজা লাগিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। বাইরে একটা ঝোড়ো হাওয়া বইছে । ঘর অন্ধকার । জীবনে এত বড় কথা মা কোনদিন মুখে আনেন নি । 

" আমাকেও কী বলা যায় না কিশোরী ? " কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল রক্তিম । 
" আমি টিউশনি ছেড়ে দেব । " 
" কী ? কী বলছিস তুই ? বৃত্তি পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি , আর এখন তুই বলছিস পড়া ছেড়ে দিবি ? এমন কি হয়েছে যে তুই এইসব বলে বেড়াচ্ছিস ? " 
" পড়াশুনা করতে টাকা লাগে রক্তিম । আমার সে সামর্থ নেই । আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কারখানায় কাজ করবো। আর আজকেই আমার এখানে শেষ দিন । 

কিশোরীর মুখটা নিজের দিকে সজোরে ঘুরিয়ে নিল রক্তিম । " তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে কিশোরী ? সবকিছু জানার পরেও স্যার তোকে যেতে দেবেন ভেবেছিস ? আর পৃথা ? যাকে এত ভালবাসিস তাকে ছেড়ে থাকতে পারবি তুই ? " 

"পরের মেয়ের জন্য আমার কোনো ভাবনা নেই রক্তিম । "
নিজেকে সংযত রেখে কথাগুলো উচ্চারণ করল কিশোরী ।

" কী হয়েছে কিশোরী ? কখন এলে তোমরা ? " বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন সুশীলবাবু । 
" স্যার কিশোরী বলছে , ও আর পড়তে আসবে না । " 
কিশোরীর দিকে তাকালেন সুশীলবাবু । 
" স্যার আসলে আমার বাড়িতে একটু সমস্যা ছিল...."
" আর আমি যদি বলি যে সমস্যাটা তোমার ? " 
অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকালো কিশোরী । 
" এতকিছুর পরেও তুমি এই কথা বলবে কিশোরী ? কোনদিন কি ভেবেছিলাম , আমারই এক ছাত্র আমার মেয়েকে সুস্থ করে তুলবে ? তুমি নিজেও জানো না কিশোরী , তুমি আমার জীবনটা বদলে দিয়েছো । আর একজন শিক্ষক হয়ে আমি তোমার মত ছাত্রকে পড়াতে পারবো না ? " 

কিশোরীর চোখদুটো ছলছল করে উঠল । সুশীলবাবু এগিয়ে এসে কিশোরীকে জড়িয়ে ধরে বলল - " তোমায় কিছু ভাবতে হবে না কিশোরী । আমি আছি তো , তুমি মন দিয়ে পড়াশুনা করো । নিজের জীবনটা শেষ হতে দিও না কিশোরী  , কোনকিছুর বিনিময়ই না । " 

বৃত্তি পরীক্ষার দিন সকালে স্যার কে প্রণাম করতে এলো কিশোরী । 
" আমি পারবো তো স্যার ? " 
" হ্যাঁ কিশোরী , তুমিই পারবে । যাও , মন দিয়ে পরীক্ষা দাও ।  খুব ভালো হবে ! " 

রেজাল্টের আগের দিন সারারাত ঘুমোতে পারে না কিশোরী । জানালা দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে । উঁচু তালগাছের মাথা থেকে রাতচরা পাখির ডাক ভেসে আসছে । খুব ভয় হয় , এতো রাত জেগে পড়া , এত স্বপ্ন দেখা , স্কলার্শিপ না পেলে যে সবই বৃথা হয়ে যাবে ! মনে মনে ঠাকুরকে স্মরণ করে কিশোরী । দুটো চোখ বন্ধ হয়ে আসে । মনে পড়ে যায় স্যারের মুখে শোনা আশার বাণীগুলো । 

সকালবেলা স্কুলে ঢুকতেই ক্লাস থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো রক্তিম । 
" এক্ষুনি প্রিন্সিপাল অফিসে যা কিশোরী ! তুই স্কলারশিপ পেয়েছিস ! " 
আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠল কিশোরী । চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল । ধীরে ধীরে এগোতে থাকলো প্রিন্সিপাল রুমের দিকে । 

" স্যার আসতে পারি ? " 

" ও কিশোরী ? ভেতরে এসো । খুব ভালো রেজাল্ট করেছো কিশোরী । You are genius ! আমি জানতাম তোমার পরীক্ষা খুব ভালো হবে । এই নাও তোমার মার্কশিট। 
কিন্তু , তোমার সাথে একটা কথা ছিল.....আসলে...."

" কী স্যার ? " 
" তোমাকে এই স্কুল ছেড়ে দিতে হবে কিশোরী । ভবানীপুরে boys high school এ ভর্তি হবে তুমি । স্কলারশিপ এর টাকাতেই পড়তে পারবে । তুমি আরো পড়বে তো ? " 

মা বাবার হাজার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ভবানীপুরে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কিশোরী । এই বাড়ি , এই স্কুল , টুইশন , এমনকি পৃথা , সমস্ত পিছুটান অবহেলা করে শুধুমাত্র নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে গেল সে । যাবার আগেরদিন সন্ধ্যাবেলা দেখা করতে গেল স্যারের বাড়িতে । 
কিশোরী প্রণাম করতে গেলে সুশীলবাবু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন । আশীর্বাদ করে বললেন - " প্রার্থনা করি তুমি অনেক বড় হও কিশোরী । আমার মেয়ের মতো যেনো আরো হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে সুস্থ করে তুলতে পারো তুমি। তোমার সেই ক্ষমতা আছে , তুমি পারবে । নিজের খেয়াল রেখো কিশোরী , খুব ভালো থেকো....." 

" স্যার পৃথা ? " 
" ওই ঘরে আছে । তুমি চলে যাবে শুনে সেই সকাল থেকে কাঁদছে । দেখো  , শান্ত করতে পারো কিনা । " 

কিশোরীর বুকের ভেতরটা কেমন যেনো করছিলো । আগামী তিন চার বছর তাকে গ্রামের বাইরে থাকতে হবে ।
ফেরা হবে আবার সেই পরের বছর পুজোর ছুটিতে। পৃথাকে ছেড়ে থাকতে পারবে তো সে ?

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো কিশোরী । দেখল , পৃথা খাটের উপর শুয়ে উপুর হয়ে কাঁদছে । কিশোরী ঘরে ঢুকে পৃথার মাথায় হাত রাখলে সে কিশোরী বুকে মুখ লুকিয়ে বলে - " ফুলদাদা , তুমি আমায় স্কুলে নিয়ে যাবে না ? আমি তোমায় অনেক ফুল দেবো । তুমি যেও না ফুলদাদা , তাহলে আমি খুব কাঁদবো । " 

পৃথার চোখের দিকে তাকাতে পারে না কিশোরী । ওই চোখে কি ভীষণ মায়া ! যে মায়ার জালে জড়িয়ে পড়লে সে কোনমতেই নিজেকে আলাদা করতে পারবে না । 
পৃথাকে সান্তনা দিয়ে কিশোরী বলল - " আমি তো আবার আসবো । তখন তোমার জন্য রং , আঁকার বই , তুলি , সমস্ত নিয়ে আসবো । কেমন , খুশি তো ? " 

কিশোরীর গলা জড়িয়ে ধরে পৃথা বলে - " আমি কিচ্ছু চাইনা ফুলদাদা । তুমি আমায় ছেড়ে যেও না ! " 


দেখতে দেখতে যাবার দিন চলে এলো । কিশোরীকে ট্রেনে তুলতে গেল তার মা ও বাবা । ছেলের অমঙ্গল হওয়ার ভয়ে চোখের জল চেপে রাখলেন মা । কিশোরীর হাতে ভারী ব্যাগটা তুলে দিয়ে বললেন - " ভালো ভাবে থাকিস । পৌঁছে একটা টেলিফোন করিস ! " 

ট্রেন ছেড়ে দিলো । জানাজার ধারে বসে বাইরের দিকে চেয়ে রইলো কিশোরী । তার মনে হলো , এই ছুটে চলা গাছপালার মতো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টাও যেনো কতদূরে হারিয়ে যাচ্ছে । নির্জন গ্রাম , কিশোরীর বাড়ি , স্যার , মা , বাবা , সেই ছোট অন্ধকার পড়ার ঘরটা.....

চোখের সামনে ভেসে ওঠে পৃথার ছোট্ট মুখটা .......

" না ফুলদাদা , তুমি আমায় ছেড়ে যেও না !!! " 

                                    .............. 












Rate this content
Log in

More bengali story from Mainak Mandal

Similar bengali story from Inspirational