"আয়নার ওপারে"
"আয়নার ওপারে"
রাত ঠিক ১২টা। পুরোনো পোড়োবাড়ির দরজা ভাঙার শব্দ হলো। ধুলোমাখা মেঝেতে পা রাখতেই একটা ঠান্ডা বাতাস শরীর গুলিয়ে দিল। সোহান ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। হাতে মোবাইলের টর্চ, পিছনে বন্ধুরা—রাজীব, তানিয়া আর ইমরান। — "এই বাড়ির আয়নাটা নাকি অভিশপ্ত। কেউ তাকালেই সে আর নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় না, বরং অন্য কিছু!" রাজীব হাসল। "ভূতের গল্প সব বাজে কথা। আয়না তো আয়না, যা দেখার তাই দেখাবে!" তানিয়া ফিসফিস করে বলল, "কিন্তু এ বাড়ির সব আয়না কোথায় গেল? এত বড় একটা জায়গায় একটা মাত্র আয়না?" ইমরান পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালাতে গেল, কিন্তু হাওয়া যেন আপনা থেকেই আগুন নিভিয়ে দিল। সোহান টর্চের আলোতে দেওয়ালের দাগগুলো লক্ষ্য করল। আঁচড়ের মতো, যেন কেউ ভেতর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল। তখনই… একটা মৃদু হাসির শব্দ ভেসে এলো। চারজনই থমকে গেল। কণ্ঠস্বরটা যেন খুব কাছেই ছিল, কিন্তু কোথাও কেউ নেই। ঘরের এক কোণে একটা বিশাল ধুলোমাখা আয়না দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রেমে পুরনো কারুকাজ, যেন বহু বছর কেউ স্পর্শ করেনি। সোহান আয়নার ধুলো ঝেড়ে সামনে দাঁড়াল। সে আয়নার দিকে তাকাল… …আর তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল! নিজের প্রতিবিম্বের বদলে সে দেখল একটা বিকৃত মুখ—চোখগুলো গভীর কালো গহ্বর, ফাঁটা ঠোঁট থেকে কালচে লালা ঝরছে, পেছনের অন্ধকার থেকে একটা হাত উঠে আসছে! — "সোহান, আয়না থেকে সরে এসো!" তানিয়া চিৎকার করে উঠল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। সোহান দেখল, আয়নার প্রতিচ্ছবিটি হাসছে। কিন্তু তার নিজের ঠোঁট নড়ছে না। আচমকা সেই প্রতিচ্ছবিটি নিজের হাত বাড়িয়ে দিল… আয়নার ভেতর থেকে! একটা পলকেই সোহানকে শক্ত করে ধরে আয়নার ভেতরে টেনে নিয়ে গেল! ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। আয়নায় শুধু ধুলোমাখা কাচ। তিনজন বন্ধু চিৎকার করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সামনে সোহান দাঁড়িয়ে আছে। তানিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ল। — "তুমি… তুমিই তো… আয়নার ভেতরে চলে গেলে!" সোহান ম্লান হেসে বলল, "তুমি কী বলছ? আমি তো এখানেই ছিলাম!" রাজীব গলা শুকিয়ে বলল, "আমরা দেখেছি! তুমি আয়নার মধ্যে হারিয়ে গেছ!" সোহান ধীরে ধীরে বলল, "কিন্তু আমি তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তাই না?" তারপর… সে আয়নার দিকে তাকাল। এই প্রথম… সোহানের কোনো প্রতিচ্ছবি পড়ল না। তানিয়া আর রাজীব আতঙ্কে সরে গেল। ইমরান হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। — "ওটা… ওটা সোহান নয়!" সোহান ধীরে ধীরে হেসে উঠল। তার হাসিটা স্বাভাবিক ছিল না, গলায় একরকম অদ্ভুত গর্জন! সে ধীরে ধীরে বলল, "সোহান তো এখন আয়নার ভেতরে… আর আমি…" সে এক ধাক্কায় রাজীবের সামনে চলে এল। — "আমি তো এখন বাইরে!" একটা শীতল বাতাস ঘরজুড়ে বয়ে গেল। তানিয়া, রাজীব আর ইমরান চিৎকার করে দরজার বাইরে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল সেই আয়না। …আর তার ভেতরে সোহান! সে আয়নার ভিতর থেকে চিৎকার করছিল, কিন্তু বাইরে কোনো শব্দ আসছিল না। তার চারপাশে অন্ধকারের মধ্যে অসংখ্য ছায়ামানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সবাই তার মতোই ছিল, সবাই একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল… আর এখন তারা এখানে বন্দি। সোহান তাদের দিকে তাকাল। একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ফিসফিস করে বলছে— — "আমরা সবাই কখনো না কখনো আয়নায় তাকাই… তাই না?" তারপর আয়নাটা এক বিকট শব্দে ভেঙে গেল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল সোহানের মুক্তির সব রাস্তা! পরদিন সকালে, তানিয়া, রাজীব আর ইমরান পুলিশ নিয়ে ফিরে এলো পোড়োবাড়িতে। কিন্তু ভেতরে কিছুই ছিল না। সেই আয়নাটাও গায়েব! আর সোহানের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। কিন্তু কয়েকদিন পর… তানিয়া যখন নিজের ঘরে বসে ছিল, তখন হঠাৎ করেই আয়নার দিকে চোখ গেল। তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল। কারণ আয়নার মধ্যে সে একা ছিল না! তার পেছনে… সোহান দাঁড়িয়ে ছিল! কিন্তু সে হাসছিল না। সে শুধু ফিসফিস করে বলল— — "আমার জায়গা এখন তোমার দরকার…"

