STORYMIRROR

Davi Saha

Horror

4  

Davi Saha

Horror

আগন্তক

আগন্তক

6 mins
3

রাত প্রায় সাড়ে বারোটার মতো বাজে। এই এলাকায় তেমন মানুষ-জন থাকে না। দিনে মানুষ নিজেদের কাজ করে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে যায়। রাতে প্রায় সময় বিদ্যুৎ থাকে না, আজও তেমনি, বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টা দুই-এক হবে। মোমবাতি নিয়ে ইরা সোফায় বসে আছে। মোমবাতির সেই আলোয় সে লেখালেখি করছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আকাশে কালো মেঘ হয়ে আছে। সকালে ইরা খবরের কাগজে দেখেছিলো, আজ রাতে ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘ ডাকছে খুব জোরে। হঠাৎ গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার কাঁচে পড়ে আলাদা-ই এক সুর তৈরি করে ফেলেছে। বাড়ির পাশের আম গাছগুলো আমাদের বাড়ির খুব কাছে কাছে। তাই এই ঝড়ো হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো জানালার সাথে বাড়ি খাচ্ছে। বৃষ্টি আরো বড় বড় ফোটায় পড়তে শুরু করে। পাশের ঘরের জানালাটা আবার ভাঙা। পানি ঘরে এসে পুরো বিছানাটা  ভিজিয়ে দিয়েছে। ইরা হঠাৎ খেয়াল হয় ছাদে কাপড় রয়েছে। সে দৌড়ে ছাদে গেলো। ছাদ দুই তলায়। দুই তলাটা পুরো অন্ধকার হয়ে রয়েছে। মোমবাতির সেই অল্প আলোয় বিভিন্ন আকৃতি ভেসে উঠছিলো। ছোট থাকতে ইরা একা মোমবাতির আশেপাশে থাকতে খুব ভয় পেতো মোমবাতির সেই আলোয় যে আকৃতি ভেসে উঠতো, তা দেখে ইরা ভয় পেয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যেতো, মা যে তাকে কত বকা দিতো। এই কথাগুলো মনে করে ইরা মুচকি মুচকি হাসছে। ছাদের গেটটা বেশ শক্ত। দুই হাত দিয়ে ধাক্কা না দিলে খুলতে চায় না। ইরা মোমবাতিটা পাশের টেবিলে রেখে গেটটা জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলে জামা কাপড় আনতে যায়, এতো বৃষ্টিতে কাপড়গুলো এমন ভাবে ভিজে গেছে, দেখে মনে হবে কাপড়গুলো মাত্র ধু্ঁয়ে শুকাতে দিয়েছিলো, সব কাপড় নিতে নিতে সেও প্রায় ভিজে গেছে। এমন সময় সে লক্ষ্য করে ছাদের এক কোণে একটা কালো বিড়াল বসে আছে। এই এলাকায় তেমন


বিড়াল নেই, থাকলেও কালো কোনো বিড়াল সে দেখেনি। সেই সময় গেটটা খুব জোরে বন্ধ হয়ে যায়। ইরা দ্রুত গেটটা খুলে, বন্ধ করার সময় ঘুরে দেখলে বিড়ালটা আর দেখা যায় না। মোমবাতিটা নিভে গেছে। খুব কষ্ট করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে কাপড়গুলো দুই তলার একটা রুমে মেলে দিয়ে আসে ইরা। তারপর ইরা তার মাকে ফোন দেয়। দুই-তিন বার ফোন দেয়, তবে ফোন ঢুকে না। দশ-পনেরো মিনিট পর মা কল ব্যাক করে ।


"কখন আসবে তোমরা?"

"দেখ না বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি।"

"তোমাদের মানা করেছিলাম... শুনলে না।"

"আহা!!! রাগ করিস না, বিয়েটাতে না গেলে যে ওরা খারাপ মনে করতো। ওরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছে।"

"থাক আর কিছু বলতে হবে না, আসবে কখন সেটা বল?"

"বৃষ্টি কমলেই চলে আসব... চিন্তা করিস না"

***

ইরা গোসল করে আসে, বিদ্যুৎ এসেছে, ফ্যানটা ছেড়ে মামুনা চুল শুকাতে বসে, এমন সময় পাশের ঘরে কিছু একটার শব্দ আসে। ইরা দেখতে গেলে দেখে কালো বিড়ালটা ভাঙা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে বসে আছে। তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে আবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ইরা ভাবে হয়তো মা এসেছে। কারণ, বৃষ্টি বেশ কমে গেছে।তাই দৌড়ে গেটের কাছে যায়। যেহেতু, এখন প্রায় ১ টার মতো বাজে, তাই ইরা একবার পাশের জানালাটা দিয়ে চেক করে। চেক করার সময় কাউকে দেখতে না পেয়ে একটু প্যানিক করে আরো ভালো করে দেখতে চায়, তখন-ই কিছু একটা কাচের সাথে ধাক্কা খায়। কাচে ফাটল ধরে যায়। ফাটলটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে ইরা তাকিয়ে থাকে, তখন একটা কালো অবয়ব কাচে ভেসে ওঠে। ভয় পেয়ে পিছনে সরতে গেলে হাতের ধাক্কায় কাচের ফুলদানিটা পড়ে ভেঙে যায়। ইরা এক টুকরো কাচ নিজের কাছে রেখে দেয় এবং চিৎকার করে বলতে থাকে 'কে কে ঐখানে!'

অবয়বটা সরে যায়। ইরা নিজেকে সামলে নেয় এবং ভাবে হয়তো কেও মজা করছে। ওই এলাকায় বখাটে ছেলেদের একটা গ্রুপ আছে। রাতে এভাবেই কলিং বেল বাজিয়ে, ইট-পাথর মেরে ডিস্টার্ব করে। কিছুক্ষণ পর ইরা মাকে কল দেয় তবে কল মা ধরে না। ইরা সোফায় বসে এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে কফি খেতে থাকে। কফির কাপটা রেখে মোমবাতি নিয়ে সোফার দিকে যেতে যেতে লক্ষ্য করে পাশের রুমে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আবার ঘুরে দেখলে দেখে সেখানে কিছু-ই নেই। নিজের মনের-ভুল ভেবে বেপারটা ইগনোর করে। সোফায় বসে হেডফোনে গান শুনতে থাকে। তখনও ইরা কারো উপস্থিতি টের পায়। মনে হচ্ছে কেও খুব কাছে ঘোরাঘুরি করছে। চোখ বন্ধ করে ইরা গান শুনতে থাকে। ইরা হেডফোন দিয়ে একটা অদ্ভুত আর্তনাদ ভেসে আসে। ইরার দেহের সব শক্তি যেন কোনো প্রাণী তার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ খোলার সামর্থ্যটাও মামুনার হচ্ছে না, চোখ অনেক কষ্টে খুলে এক ঝলক সে দেখতে পারে তার বুকের উপর একট কালো প্রাণী, প্রাণীটার চোখে এক ভয়ংকর হিংস্রতা। ইরা মনে হয় তার চোখ দিয়ে রক্তের ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে। ওঠে বসার মতো শক্তিটা তার হচ্ছে না, ইরা পুরো দেহ অবশ হয়ে রয়েছে। চোখগুলো কোনো অদৃশ্য শক্তি টেনে ধরে রেখেছে, চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। হঠাৎ, ইরার ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার সাথে সাথে সে নড়তে-চড়তে পারে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা তাকে কনট্রোল করছে। বাইরে কুকুরগুলো খুব জোরে জোরে ডাকছিলো। একটা কুকুর ইরাদের দরজার সামনে এসে চিৎকার করছিল। কিছুক্ষণ ধাক্কা দিলো আর চিৎকার করার পর চারপাশ শান্ত হয়ে যায় এক নিমিষে। ইরা এক ঢোঁকে গ্লাসের পানি শেষ করে, এটা তার কাছে দুঃস্বপ্ন থেকে কম কিছু না। তার খুব অস্বস্তি ফিল হতে থাকে। কথা আর শ্বাস দুটোই জড়িয়ে আসছে তার। গান শুনে নিজেকে শান্ত করার মতো সাহস ও পাচ্ছে না। নিজেকে সামলাতে বারান্দায় যায় সে, বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। বৃষ্টির সেই মন ভোলানো গন্ধ আর মৃদু বাতাস তার ত্বকেকে ছুঁয়ে যায়, পাশে-ই বড় একটা শিউলি গাছ। চারপাশের সেই নিরবতার কারণে তার মনে একটু শান্ত হয়, তবে শান্তি যে বিরাজ করলো না বেশিক্ষণ হঠাৎ, অনেক জোরে কাচ ভাঙ্গার শব্দ আসে, শব্দটা নিচ তলা থেকে এসেছে, ইরা এক অচেনা আতংকে নিচ তলায় চলে যায়। নিচে গিয়ে সেই রুম থেকে শব্দ পায় যেই রুমের জানলার কাঁচ ভাঙা। শব্দটা এমন মনে হচ্ছে কেও কাচের উপর দিয়ে হাঁটছে। সেই দিকে ইরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, এতো ভয়ে ইরার গলা জড়িয়ে আসছে। সে একটু একটু করে সেই রুমটায়  উঁকি দেয়। দেখা যায় একটা লোক। রুমের জানলাটা পুরোপুরি ভাঙ্গা, লোকটা অনেক লম্বা তার শরীর পুরো কালো জামা-কাপড়ে ঢাকা। সে লোকটার মুখ সম্পূর্ণ কালো যেনো অন্ধকার তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। লোকটার পাশে-ই ওই কালো বিড়ালটা ঘুর ঘুর করছিলো। লোকটা হঠাৎ, মাথা তুলে তাকায়। চোখগুলো আগুনের উল্কার মতো জ্বলছিলো। ইরা পুরোপুরি ভয়ে জমে যাচ্ছিল। ইরা পিছনে ঘুরতে-ই তার মাথায় আঘাত করা হয়।

***

ইরা মাথা ভার হয়ে আছে। এতক্ষণ সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো মেঝেতে। ইরা ধীরে ধীরে চোখ খুলে। রক্ত দিয়ে তার মুখ পুরো মেখে গেছে। আস্তে আস্তে সে শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ায়। তার সারা দেহে আঘাতের চিহ্ন, পাশে-ই রক্তে মাখা কাচ পড়ে আছে, ইরা অনুভব করে তার পেটে কাচ ঢুকে গিয়েছে। কী যে অসহনীয় যন্ত্রণা তা সে কল্পনাও করেনি কখনো। সে দেখে বসার ঘরে সেই অচেনা লোকটা বসে আছে। একটা গম্ভীর গলা তার কানে ফিসফিসিয়ে বলে "ইরা, সোফায় গিয়ে বসো, না বসলে এর থেকে ও খারাপ অবস্থা হবে।" বলে হেসে ওঠে। হাসির বিকট শব্দে তার কানের প্রায় খারাপ অবস্থা। কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। সে সহ্য না করতে না পেরে মাটিতে বসে কাতরাতে থাকে। এই যেন তার জীবনের শেষ ধাপ।

ওর চোখ খুলে দেখে সোফায়, সে সোফায় বসে আছে। আগে ওর সাথে কী হয়েছে না হয়েছে কিছু-ই মনে নেই। সামনে-ই লোকটা বসা। চারপাশ নীরব, শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইরা এবার সাহস সঞ্চয় করে লোকটাকে বলে, "আপনি... আপনি কে?” লোকটা শুধু চুপচাপ বসে থাকে। হঠাৎ, লোকটা পিছনে ঘুরে তাকায়। এবার তার মুখ কালো ভাব নেই। এক পচাগলা বিভৎস চেহারা, মুখের একপাশ পুরো গলে গলে পড়ছে। অপর পাশের চোখ ঝুলে আছে এবং প্রতিটা শিরা-উপশিরা নড়ে-ওঠছে, এই দৃশ্য তার গা হিম করে দেয়। ইরা এই দৃশ্য দেখে কাতরাতে থাকে। এইবার লোকটা তাকে ঠাণ্ডা কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “কয় তারিখ আজ?” এবং ইরা স্তব্ধ হয়ে যায়। এক পলক ক্যালেন্ডার এর দিকে ইরা তাকায় বলে, "তে...তেরো"


*** 

" ইরা, Happy birthday "কণ্ঠটা বেশ পরিচিত লাগছিলো ইরার। চোখ মেলে দেখে মা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ইরা একটা হাসি দেয়। তবে হাসিতে কিছু একটা নেই...প্রাণ নেই হাসিতে। ইরা ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে

 দেখে ১৩ তারিখ...



Rate this content
Log in

More bengali story from Davi Saha

Similar bengali story from Horror