সংশপ্তক ( ষড়বিংশতি অধ্যায়)
সংশপ্তক ( ষড়বিংশতি অধ্যায়)
লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু । আপ্তবাক্যটি সম্পূর্ণরূপে ফলল না হয়তো কিন্তু বাবা আর ছেলের শাস্তি অনিবার্য হয়ে গেল । নীলেশবাবুকে বৌঠান বলছেন - দেখ ঠাকুরপো আমার দাদা বা ভাইপো বলে ভাবছি না সবার ক্ষেত্রেই একই নিয়ম । তা না হলে বিদ্বজ্জন 'ভস্মে ঘি ঢালা 'র মত কথাটি বলতেন না।
নীলেশবাবু বললেন - থাক বৌঠান। পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই । তার চেয়ে নিজেদের নিয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করি।
ঐন্দ্রিলাদেবী বললেন - গাঁয়ের মোড়ল এবার একজন সজ্জন এবং ভদ্রলোকই হয়েছেন । আমাদের পক্ষ থেকে ওনাকে পূর্ণ সমর্থন জানাই।
- আগে ওর কাজ দেখি। তারপর সে সম্বন্ধে ভাবা যাবে। তবে ওকে যতটুকু চিনি বা বুঝি ; আর যাই হোক, হরিপদর মত মতলবী মানুষ নয় ।
দীপু নেমে এসে বলল - কাকাবাবু, কাল কিন্তু ডাক্তার দেখানোর ডেট রয়েছে। আমি ফাইলপত্র রেডি করে রেখেছি।
- জানি বাবা। আমার নলেজে আছে। আমিও রেডি হয়ে আছি।
পরদিন ভোরবেলায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসে ওরা রওনা দিল।
কাঁটায় কাঁটায় এগারোটার সময় দীপুর ডাক পড়ল । ডক্টর রাধাকৃষ্ণণ বললেন - রিপোর্ট খুব সুন্দর। দুর্দান্ত অগ্রগতি হয়েছে। এমনভাবে চললে কোন ভয় থাকবে না। তবে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়েছে। ওষুধ দিয়ে দেব। কিন্তু হিমোগ্লোবিন কমে গেল কেন ? ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছেন তো ? ঠিক আছে একটা ইঞ্জেকশন লিখে দিচ্ছি। Eldent deep IM. নিতে হবে কোমরে। এতে ব্যথা হয়। ভয় পাবেন না। প্রতিমাসে একটা করে তিনটে নিলেই হবে। আর আগামী বছর থেকে কিছু ভ্যাক্সিন নিতে হবে। যেমন নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ব্রঙ্কাইটিস । সব লিখে দেব।
আপনাদের আর কিছু প্রশ্ন আছে ?
তখন নীলেশবাবু বললেন - স্যার লেমন খেতে পারবে ?
- কেন নয় ? এক আধটু খেতেই পারেন। ক্ষতি হবে না। তবে বলে রাখি কেমো মেডিসিনের সঙ্গে হাইলি সাইট্রাস গ্রেপফ্রুটের সরাসরি সংঘাত হয়। ভুলেও কোনদিন খাবেন না।
নীলেশবাবু বললেন - স্যার ওষুধ তো চলছে , চলবেও। ওর একটা নতুন ব্যাধি হয়েছে। কনস্টিপেশন। লোকাল ডাক্তার দেখিয়েছি। বলেছেন পাইলস। বেড়ে গেছে খুব। অপারেশনের কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের সেটা মনোপূত নয়। শুনেছি হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এই রোগের উপশম হয়। কিন্তু এত জোরালো ওষুধের পর কি তা' কাজে লাগবে।
- কেন লাগবে না। কেমো খাওয়ার দুই আড়াই ঘন্টা আগে পিছে খেতে পারেন । কোন অসুবিধা নেই। কোন রি-একশনও হয় না ।
- যাক ভালো হল। তাহলে আয়ুর্বেদ ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করে নেব।
ডাক্তারবাবু বললেন - Next visit 20th February next year.আর এই টেস্টগুলোই করে নিয়ে আসবেন।
হসপিটাল থেকে বেরিয়ে হলুদ ট্যাক্সিতে উঠলেন ।
বাড়িতে ফিরে যে এমন দু: সংবাদ পাবেন তা বোধ হয় ওরা কেউ কল্পনাও করেনি। দরজায় গ্রামের লোকজন জমা হয়েছে। ভেতর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
সর্বেশ্বর বাবু নিকটে এসে জানালেন সম্ভবত অম্বরীশ বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
দীপু বলল - সে কি ? ওর তো জেল হয়েছে - যাবজ্জীবন। কি ভাবে এল ?
নীলেশবাবু বললেন - সে কথা পরে হবে। আগে যে কোন উপায়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। আমি পিছন দিকের পাইপ বেয়ে ছাদে চেপে যাচ্ছি। নিশ্চয় ছাদ খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে।
তিনি কথামত পাইপ বেয়ে উপরে উঠে গেলেন। তাঁর কথাই যে সত্যি সেটা দেখে দোতলায় নামলেন। অম্বরীশ
তখন সৌম্যকে ( দীপুর ছেলে ) নিয়ে বেশ হম্বিতম্বি করছে। ঐন্দ্রিলাদেবীকে বলছে - টাকাকড়ি গয়নাগাঁ টি যা আছে দাও নইলে এই ছেলেকে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলব। তোমার জন্য , তোমাদের জন্য আজ আমার এই দুরবস্থা। চাকরি খেয়েছ। জেলে পাঠিয়েছ। ভেবেছ তোমরা সুখে শান্তিতে থাকবে ? কভি নেহি। কই ? দাও ?
ঐন্দ্রিলাদেবী কাকুতিমিনতি করছেন ।
ছেলেটাকে ছেড়ে দে বাবা ! সব দিয়ে দেব। এই দেখ চাবি আমার হাতেই আছে। ওকে ওর মা'র কাছে দে !
- কিছুতেই না । আগে মালকড়ি পাই তবে ছাড়ব।
নীলেশবাবুর মাথায় রক্ত উঠে গেল । যাদের জন্য নিজের জীবনটা উৎসর্গ করে দিয়েছেন; গায়ের শেষ রক্তবিন্দু থাকতে কোনমতেই ক্ষতি করতে দেব না।
অম্বরীশ বলছে - আজ বড় সুযোগ এসেছে। বাড়িতে কোন পুরুষ মানুষ নেই। আজ এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেব না। চাবি দাও নইলে ----
শিশুটির দুটি পা ধরে ঝুলিয়ে দিয়েছে। নীলেশবাবুর চোখ তার হাতের দিকে আর দু'হাতে কাঠের চেয়ারটা তুলে দুম করে অম্বরীশের মাথায় মারলেন। জ্ঞান হারিয়ে অম্বরীশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল । নিলেশবাবু তড়িঘড়ি শিশুটি নিয়ে ওর মায়ের হাতে তুলে দিলেন। তারপর এক দৌড়ে নীচে নেমে সদর দরজা খুলে পালিয়ে গেলেন । বন্যার জল যেমন গ্রামে ঢোকে; গাঁয়ের লোকেরা তেমনি ভাবে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর অজ্ঞান হওয়া অম্বরীশকে কেউ লাথি, কেউ জুতোপেটা করল।
সর্বেশ্বরবাবু পুলিশে খবর দিলেন। জেলপালানো কয়েদী ধরা পড়েছে এবং গণপিটুনিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
পুলিশ এল। অর্ধমৃত অম্বরীশকে নিয়ে চলে গেল। ঐন্দ্রিলাদেবী ডাকলেন - দীপু ! ঠাকুরপো কোথায় ?
ঠাকুরপো ততক্ষণে পগার পার। রেল লাইন বরাবর দৌড়তে লাগলেন । তাঁর ধারণা হত্যার দায়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হবে। শাস্তি যাই হোক ; বৌঠান বা দীপুরা তা সহ্য করতে না পেরে যদি নতুন কোন বিপদ হয় সেই ভয়ে পালানোই শ্রেয় মনে করলেন । কিছুদূর যাবার পর রেল পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন । রাতের মত ড়াজতবাসের পর রাজ্য পুলিশের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়া হল ।
এদিকে খবর পেয়ে সর্বেশ্বর থানায় গেলেন। জিজ্ঞাসাবাদে সন্তুষ্ট হয়ে পুলিশ সর্বেশ্বরের কথায় তাঁকে ছেড়ে দিল।
সর্বেশ্বর বাবু বললেন - কি রে ? পালানোর কি কারণ ছিল ?
- আমি খুনী।
- সে তো তুই বাধ্য হয়ে মেরেছিস ?আরে, এটা তো প্রমানিত গণপিটুনি। পুলিশকেও বিশ্বাস করতে হয়েছে। তোর এমন বালসুলভ কাজ পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে যথেষ্ট ছিল । ভাগ্যিস আমি এসে পড়েছিলাম। কোর্টে চালান দেবার আগেই।
- কিন্তু খুন আমিই তো করেছি !
- একদম না । তুই ওকে ঘায়েল করেছিলি মাত্র । তার পরের কাজ তো জনতা করেছে !
- না রে সবু ! আমি বাচ্চা ছেলে নই। কিছু একটা বুঝিয়ে দিলেই বুঝে যাব । আমি নিজে চেয়ার দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করেছি।
সর্বেশ্বর বাবু বললেন - এত নীতিবাগীশ হলে বাঁচতে পারবি না। আমি পুলিশকে যা বলেছি; গ্রামের লোকেদের তুইও তাই বলবি ।
- সারা জীবন সত্যের পথে চলেছি রে । শেষের দিকটায় এমন মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে ? ও: ভগবান !
- শোন, তোর এখনও অনেক কাজ বাকি। আচ্ছা, তুই তো চা'স দীপু সুস্থ হয়ে উঠুক। এখন যদি তুই এই রকম উল্টোপাল্টা বকিস; তবে দীপুর মনে কি প্রভাব পড়বে বল তো ? দীপুও তো ভাববে তাদের জন্যই ওর কাকাবাবুর এমন হাল হ'ল !
নীলেশবাবু সর্বেশ্বরের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। মোক্নম জায়গায় ঘা দিয়েছে সর্বেশ্বর। এতক্ষণ তাঁর চেতনায় যা কিছু কিলবিল করছিল এই একটি কথাতেই তার পরিসমাপ্তি ঘটল ।
নীলেশরঞ্জন শান্ত হলেন । সর্বেশ্বরবাবু বললেন - দেখ নীলু, বৌঠান হয়তো বাচ্চাটার মুখ চেয়ে সর্বস্ব দিয়ে দিতেন; কিন্তু তারপরও তো অম্বরীশ শিশুটিকে না ও ফেরৎ দিতে পারত। ওকে ঢাল করে বেরিয়ে যেতে পারত। তারপর রেললাইনে ছুঁড়ে দিয়ে নিজেকে হাল্কা করে নিত ।
নীলেশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন - না----
তাহলে আমি ঠিকই করেছি। কোন অন্যায় করিনি।

