শ্রীকান্তের অপবাদ ( পর্ব: ৯)
শ্রীকান্তের অপবাদ ( পর্ব: ৯)
শ্রীকান্তের অপবাদ ( পর্ব: ৯)।
লেখক:– সোহন ঘোষ।
পরদিন সকালে ডাক্তারবাবু পুনরায় এলেন এবং বিমর্ষ মুখে মাথা নেড়ে জানালেন—
“অবস্থা বড়ই সঙ্কটজনক।”
শ্রীকান্তের শারীরিক অবস্থার এমন দ্রুত অবনতি দেখে হরিহর বাবু আর কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ ফোনে শ্রীকান্তের মাকে খবর দিলেন।
এদিকে জ্বরের ঘোরে শ্রীকান্তের চেতনা বাস্তব আর অবাস্তবের সীমানায় দোল খাচ্ছিল । তার ঘোলাটে দৃষ্টি কখনও ঘরের ছাদের দিকে, কখনও জানলার বাইরের শূন্যতায় স্থির হয়ে থাকছিল— যেন কারও অপেক্ষায়।
কয়েকদিন ধরেই সে প্রলাপ বকছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে কখনও আতঙ্কিত, কখনও হতাশ কণ্ঠে বলছিল—
“আমি কারও হাত ধরিনি...। আমি চরিত্রহীন নই...”
জ্বরের ঘোরে তার ওষ্ঠপ্রান্ত থরথর করে কেঁপে উঠছিল। হঠাৎ ভাঙা গলায় মাঝিদের সেই চিরচেনা গান ধরল—
“হেই–হো–রে, হেই–হো...
নৌকা চলে, হেই–হো...
আর একটুখানি,
তারপর যাব...
কত গভীর এ পানি...”
নদীর পাড়েই তার বেড়ে ওঠা; তাই ছোটবেলা থেকে শোনা মাঝিদের সেই ভাটিয়ালি সুর আজ রোগশয্যায় তার অবচেতন মনে ভেসে উঠল। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে বকতে শ্রীকান্ত তাদেরই অনুকরণ করে এক করুণ সুরে গাইতে লাগল। কিন্তু সেই গান বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না; ক্রমশ তার কণ্ঠস্বর যেন মিলিয়ে গেল গভীর ক্লান্তিতে।
এমন সময় শ্রীকান্তের মা ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করলেন। উচ্চকণ্ঠে হাহাকার করতে করতে এগোতে গিয়ে শাড়িতে পা আটকে তিনি মেঝের ওপর আছড়ে পড়লেন। শ্রীকান্তের বড়ো মামা ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরে তুলে তাঁর শোকোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাঁধনহারা মাতৃহৃদয় কি আর শাসন মানে? হরিহর বাবুর বাধা অবলীলায় কাটিয়ে তিনি ছুটে গিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা শ্রীকান্তকে জড়িয়ে ধরলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন— “কী হয়েছে বাবা? মানিক আমার!”
মায়ের কণ্ঠস্বর শোনামাত্র শ্রীকান্তের জীর্ণ শরীরে যেন শেষবারের মতো প্রাণসঞ্চার হলো। সে অতিকষ্টে চোখ মেলল। চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা জল গড়িয়ে কান পর্যন্ত চলে গেল। মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরতে চাইলেও তার আঙুলগুলো আর তার কথা শুনল না। শেষবারের মতো সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে সে শুধু বলল— “মা... আমি কিছু করিনি মা... আমি চরিত্রহীন নই...”
এই কথা বলে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে, কোনো সন্তান বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় যেভাবে মাকে বলে—ঠিক সেইরকম এক অস্ফুট করুণ স্বরে সে ফিসফিস করে বলল—“মা... আসছি...”
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
দ্রষ্টব্য:– এটি একটি ছোটগল্প, যার বয়ান পরিণতি থেকে সূচনার দিকে অগ্রসর হবে— অর্থাৎ বিপরীত কালক্রমে (Reverse Chronology) নির্মিত। আজ প্রকাশিত হলো তার অন্তিম তথা নবম পর্ব।
লেখক: সোহন ঘোষ
(রচনাটির শিল্পসম্মত পরিমার্জনের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে কোনো কোনো অংশ সংশোধিত হতে পারে।)
