STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

4  

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

শেষ সময়

শেষ সময়

2 mins
3

রাত তখন এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।
অফিসের প্রায় সব আলো নিভে গেছে। শুধু অরিন্দমের কেবিনে আলো জ্বলছে।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে বড় করে লেখা—
DEADLINE: 12:00 মিডনাইট

আর মাত্র পনেরো মিনিট।
গত তিনদিন ধরে সে প্রায় ঘুমোয়নি। কোম্পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্টের রিপোর্ট আজ রাতের মধ্যেই জমা দিতে হবে। এই রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে কয়েকশো কর্মীর ভবিষ্যৎ, নতুন একটি চুক্তি এবং আগামী বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।
অরিন্দম জানত—ডেডলাইন মানেই শেষ সময়।
এক মিনিট দেরিও চলবে না।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে আবার কাজে মন দিল।
১১:৫০।
হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মেয়ের নাম।
অরিন্দম বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিল।
আবার ফোন।
সে এবার রেগে গিয়ে বলল,
— “এই সময় ফোন করছে কেন?”
ওপাশ থেকে স্ত্রীর কণ্ঠ—
— “তুমি কোথায়?”
— “অফিসে। কাজের মধ্যে আছি। কাল কথা বলব।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর স্ত্রী বলল,
— “বাবা হাসপাতালে। তোমাকে দেখতে চাইছে।”
অরিন্দমের হাত থেমে গেল।
— “কী হয়েছে?”
— “হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার বলেছেন অবস্থা খুব ভালো নয়।”
অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
স্ক্রিনে তখনও সেই শব্দ—
DEADLINE: 12:00 মিডনাইট

সে জানত, রিপোর্ট জমা না দিলে বড় ক্ষতি হবে।
কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় তার বাবা হয়তো জীবনের অন্য একটি ডেডলাইনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
সে উঠে দাঁড়াল।
তারপর আবার বসল।
একদিকে চাকরি, দায়িত্ব, কোম্পানি।
অন্যদিকে বাবা।
ঘড়িতে ১১:৫৬।
হঠাৎ অরিন্দম বুঝতে পারল—জীবনে আমরা কত ডেডলাইন নিয়ে ছুটে বেড়াই!
প্রজেক্টের ডেডলাইন।
অফিসের ডেডলাইন।
ব্যাংকের ডেডলাইন।
বিল দেওয়ার ডেডলাইন।
কিন্তু সম্পর্কের?
বাবার সঙ্গে শেষবার বসে কথা বলার কোনো ডেডলাইন কেউ দেয় না।
মায়ের হাত ধরে থাকার কোনো নির্দিষ্ট শেষ সময় লেখা থাকে না।
সন্তানের সঙ্গে গল্প করার জন্য কোনো ক্যালেন্ডার মনে করিয়ে দেয় না—
“আজই শেষ সুযোগ।”
অরিন্দম কম্পিউটার বন্ধ করে দিল।

সেদিন প্রথমবার সে একটি ডেডলাইন অমান্য করল।

রাত বারোটার দশ মিনিট পর সে হাসপাতালে পৌঁছল।
বাবা তখনও জেগে ছিলেন।
অরিন্দম তাঁর হাত ধরে বলল,
— “বাবা…”
বৃদ্ধ চোখ খুলে মৃদু হেসে বললেন,
— “এত রাতে এলি?”
অরিন্দম চোখের জল লুকিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আজ একটু দেরি হয়ে যাচ্ছিল।”
বাবা তার হাত চেপে ধরে বললেন,
— “জীবনে সব কাজ সময়মতো করতে হয় না। কিছু কাজ সময় থাকতে করতে হয়।”
অরিন্দম বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

পরদিন অফিসে গিয়ে সে রিপোর্ট জমা দিল।
কিছুটা দেরি হয়েছিল।
কোম্পানি অসন্তুষ্ট হয়েছিল।
কিন্তু প্রজেক্ট শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়নি।
আর অরিন্দম সেই রাতের পর থেকে তার ডায়েরির প্রথম পাতায় একটি নতুন ডেডলাইন লিখে রাখল—
“প্রিয় মানুষগুলোর জন্য সময় বের করার শেষ সময়—আজ।”
কারণ সে বুঝেছিল,

কাজের ডেডলাইন পেরিয়ে গেলে কখনও কখনও জরিমানা দিতে হয়।
কিন্তু জীবনের ডেডলাইন পেরিয়ে গেলে অনেক সময় সুযোগটাই আর ফিরে আসে না।



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational