ভেতরের শত্রু
ভেতরের শত্রু
শহরের অন্যতম পুরোনো প্রকাশনা সংস্থা “অক্ষর”। তিন দশক ধরে বাংলা সাহিত্যের বহু নতুন লেখককে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংস্থার কর্ণধার অমলেন্দু সেন সবসময় বলতেন,
— “একটা প্রতিষ্ঠানকে বাইরের প্রতিযোগিতা যতটা ক্ষতি করতে পারে, ভেতরের অবিশ্বাস তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে।”
কিন্তু একদিন সেই কথাটাই তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানে সত্যি হয়ে দাঁড়াল।
পরপর তিনটি বড় বইয়ের প্রকাশনা ব্যর্থ হলো। ছাপার ভুল, বিতরণে সমস্যা, গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে সংস্থার আর্থিক ক্ষতি বাড়তে লাগল।
অমলেন্দু বুঝতে পারছিলেন, এগুলো নিছক ভুল নয়।
কেউ যেন খুব পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে।
তিনি কাউকে সন্দেহ করতে চাইছিলেন না। কারণ “অক্ষর”-এর কর্মীরা প্রায় পরিবারের মতোই ছিল।
বিশেষ করে অনির্বাণ।
পঁচিশ বছর ধরে সংস্থার সঙ্গে থাকা অনির্বাণ ছিল অমলেন্দুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত ছাড়া অমলেন্দু এগোতেন না।
একদিন অমলেন্দুর ছেলে অর্ক বলল,
— “বাবা, সব তথ্য এক জায়গা থেকে বাইরে যাচ্ছে।”
অমলেন্দু অবাক হয়ে বললেন,
— “কীভাবে বুঝলে?”
— “যে তথ্য শুধু পরিচালনা পর্ষণের তিনজন জানত, সেটাও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশকের কাছে পৌঁছে গেছে।”
অমলেন্দু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “তাহলে শত্রু বাইরে নেই।”
কয়েকদিন গোপনে নজরদারি চলল।
এক রাতে অর্ক অফিসে ফিরে দেখল, অনির্বাণের ঘরে আলো জ্বলছে।
দরজা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।
ভেতর থেকে অনির্বাণের কণ্ঠ শোনা গেল—
— “আর একবার চাপ দিলেই ওরা চুক্তিটা ছেড়ে দেবে।”
অর্ক থমকে গেল।
পরদিন সমস্ত তথ্য অমলেন্দুর সামনে রাখা হলো।
প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে পারলেন না।
— “অনির্বাণ?”
যে মানুষটি তাঁর সঙ্গে পঁচিশ বছর কাজ করেছে?
যে মানুষটির ওপর তিনি নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই বিশ্বাস রেখেছেন?
তদন্তে জানা গেল, অনির্বাণ বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছিল। পরিকল্পনা ছিল “অক্ষর”-এর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া।
অমলেন্দু অনির্বাণকে ডেকে পাঠালেন।
দুজন কিছুক্ষণ মুখোমুখি বসে রইলেন।
অমলেন্দু বললেন,
— “কেন?”
অনির্বাণ মাথা নিচু করলেন।
— “টাকার জন্য।”
— “পঁচিশ বছরের বিশ্বাসের দাম এত কম?”
অনির্বাণ কোনো উত্তর দিলেন না।
অমলেন্দু ধীরে ধীরে বললেন,
— “তুমি আমাদের ক্ষতি করোনি শুধু। তুমি নিজের পঁচিশ বছরের পরিচয়টাকেও ধ্বংস করেছ।”
অনির্বাণ এবার চোখ তুললেন।
— “আমি ভেবেছিলাম, কেউ জানতে পারবে না।”
অমলেন্দু মৃদু হেসে বললেন,
— “অন্তর্ঘাতের সবচেয়ে বড় ভুল এটাই—যে মানুষ ভিত থেকে ভাঙে, সে ভাবে ভাঙনের শব্দ বাইরে পৌঁছয় না।”
অনির্বাণ চলে গেলেন।
কয়েক মাসের কঠিন সময়ের পর “অক্ষর” আবার ঘুরে দাঁড়াল।
একদিন অর্ক বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা, এত বড় বিশ্বাসঘাতকতার পরও তুমি কেন ওর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বললে না?”
অমলেন্দু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— “কারণ প্রতিশোধ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচায় না। সত্য আর শিক্ষা বাঁচায়।”
তারপর একটু থেমে বললেন,
— “তবে একটা কথা মনে রেখো—বাইরের শত্রুকে সামলানো সহজ। ভেতরের মানুষকে বিশ্বাস করার আগে তার চরিত্রকে চিনতে হয়।”
অর্ক বলল,
— “তাহলে এখন থেকে কাউকে বিশ্বাস করবে না?”
অমলেন্দু মৃদু হেসে বললেন,
— “না। বিশ্বাস না করলে কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো সম্পর্ক, কোনো সমাজই টিকে থাকে না। শুধু বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেকটাকেও জাগিয়ে রাখতে হয়।”
“অক্ষর” আবার আলো জ্বালল।
কিন্তু সেই ঘটনার পর অমলেন্দু অফিসের প্রবেশদ্বারের পাশে একটি নতুন বাক্য লিখে রাখলেন—
“দরজা বন্ধ রাখলেই প্রতিষ্ঠান নিরাপদ হয় না; ভিত শক্ত রাখলেই হয়।”
“বিশ্বাস ভাঙার শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত থেকে যায়।”
