শেষ নিলাম
শেষ নিলাম
পুরোনো বাড়িটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে রণদীপের খুব কষ্ট হচ্ছিল।
বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা অনেকদিন বন্ধ পড়ে ছিল। শহরের মাঝখানে এত বড় বাড়ি রেখে দেওয়ার মতো সামর্থ্যও ছিল না, আবার স্মৃতিগুলোকে কোনো মূল্যে বিক্রি করতেও মন চাইছিল না।
শেষ পর্যন্ত বাড়ির পুরোনো আসবাবপত্র ও কিছু জিনিস নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত হলো।
নিলামের দিন সকাল থেকেই লোকজন আসতে শুরু করল।
পুরোনো কাঠের আলমারি, গ্রামোফোন, পিতলের প্রদীপ, দাদুর হাতঘড়ি, মায়ের সেলাই মেশিন—একটার পর একটা জিনিসের দাম উঠতে লাগল।
রণদীপ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
নিলামকারী ঘোষণা করল—
— “পুরোনো গ্রামোফোন। শুরু হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা থেকে।”
একজন বললেন ছয় হাজার।
আরেকজন—সাত হাজার।
রণদীপের মনে পড়ল, ছোটবেলায় বাবা প্রতি রবিবার সেই গ্রামোফোনে গান বাজাতেন। ঘরভর্তি হয়ে যেত রবীন্দ্রসঙ্গীতে।
দাম উঠতে উঠতে দশ হাজারে পৌঁছল।
রণদীপ হঠাৎ বলল—
— “থামুন।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
— “ওটা বিক্রি হবে না।”
নিলামকারী অবাক হয়ে বললেন,
— “কিন্তু আপনি তো নিলামে তুলেছেন!”
রণদীপ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “ভুল করেছি। সবকিছুর দাম হয়, কিন্তু সবকিছুর মূল্য হয় না।”
নিলাম আবার শুরু হলো।
এবার এল মায়ের পুরোনো সেলাই মেশিন।
একজন মহিলা বললেন,
— “দুই হাজার।”
রণদীপ মৃদু হেসে বলল,
— “এটার দাম যতই উঠুক, এটা আমি দেব না।”
লোকজন অবাক।
সে বলল,
— “এই মেশিনে আমার মায়ের হাতের স্পর্শ আছে। আমার স্কুলের জামা, বাবার পাঞ্জাবি, এমনকি আমার মেয়ের প্রথম জামাটাও এই মেশিনে তৈরি হয়েছিল।”
শেষে বেশিরভাগ জিনিসই বিক্রি হয়ে গেল।
কিন্তু কিছু জিনিস রয়ে গেল—গ্রামোফোন, সেলাই মেশিন, বাবার ঘড়ি আর একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার।
বাড়ি খালি করার শেষ দিনে রণদীপ সেই চেয়ারটায় বসে ছিল।
তার ছোট মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা, এগুলো বিক্রি করলে কত টাকা পেতে?”
রণদীপ একটু হেসে বলল,
— “অনেক।”
— “তাহলে বিক্রি করলে না কেন?”
রণদীপ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “কারণ কিছু জিনিসের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।”
মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল,
— “তাহলে এগুলোর মূল্য কত?”
রণদীপ বলল,
— “যতদিন আমরা এগুলো মনে রাখব, ততদিন এদের মূল্য বাড়তেই থাকবে।”
সেদিন বাড়ির দরজায় তালা পড়ল।
কিন্তু রণদীপ বুঝল, বাড়ি বিক্রি হয়েছে, স্মৃতিগুলো নয়।
সেদিন তার জীবনের শেষ নিলাম হয়েছিল—যেখানে টাকার বিনিময়ে কিছুই কেনা-বেচা হয়নি।
বরং সে নিজের কাছে ফিরে পেয়েছিল তার শৈশব, বাবা-মা আর হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী।
“সবকিছু বিক্রি করা যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি বিক্রি করলে মানুষ নিজেরই একটা অংশ হারিয়ে ফেলে।”
