STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

4  

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

দর্পচূর্ণ

দর্পচূর্ণ

3 mins
3

অরিন্দমের জীবনে সাফল্যের অভাব ছিল না।
ছোট শহর থেকে উঠে এসে নিজের মেধা আর পরিশ্রমে সে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে পৌঁছেছিল। অফিসে তার কথাই ছিল শেষ কথা। অধস্তন কর্মীরা তাকে সমীহ করত, কেউ কেউ ভয়ও পেত।
অরিন্দম মনে মনে বিশ্বাস করত—
"আমি যা অর্জন করেছি, তা আমার যোগ্যতার কারণেই।"
তার কাছে ব্যর্থ মানুষ মানেই অলস, দরিদ্র মানেই অযোগ্য, আর যারা তার সমালোচনা করে তারা তার সাফল্য সহ্য করতে পারে না।
একদিন অফিসে নতুন এক তরুণ কর্মী যোগ দিল—নিলয়।
নিলয় মেধাবী, কিন্তু অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের। প্রথম কয়েকদিন অরিন্দম তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের দায়িত্ব নিলয়কে দেওয়া হলো। অরিন্দম নির্দেশ দিলেন,
— "আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করবে। নিজের মতো করে কিছু করার দরকার নেই।"
নিলয় মাথা নাড়ল।
কয়েক সপ্তাহ পর প্রজেক্টের রিপোর্ট জমা পড়ল। অরিন্দম রিপোর্ট দেখে সন্তুষ্ট হলেন না।
— "এগুলো কী করেছ? আমি যে পদ্ধতি বলেছিলাম, সেটা কোথায়?"
নিলয় শান্তভাবে বলল,
— "স্যার, আপনার পদ্ধতিটা অনুসরণ করেই শুরু করেছিলাম। পরে কিছু তথ্য দেখে মনে হলো, অন্যভাবে করলে ফলটা আরও ভালো হতে পারে। তাই একটা বিকল্প মডেল তৈরি করেছি।"
অরিন্দম রেগে গেলেন।
— "তুমি আমাকে শেখাবে কীভাবে কাজ করতে হয়?"
নিলয় আর কিছু বলল না।
কয়েকদিন পর সেই প্রজেক্টের ফল প্রকাশিত হলো। নিলয়ের তৈরি বিকল্প মডেলটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সফল হয়েছে।
অরিন্দমের মুখে কোনো কথা রইল না।
সেদিন প্রথমবার তিনি বুঝলেন—
জ্ঞান শুধু পদমর্যাদার সঙ্গে আসে না।
কিন্তু আসল আঘাতটা এল কয়েক মাস পরে।
অরিন্দমের কোম্পানি বড় আর্থিক সংকটে পড়ল। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদ তাকে দায়ী করল। যে মানুষটির একটি নির্দেশে সবাই ছুটত, তাকেই একদিন নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হলো।
বাড়ি ফিরে তিনি দীর্ঘক্ষণ নিজের ঘরে বসে রইলেন।
দেয়ালে ঝোলানো পুরস্কার, সার্টিফিকেট, ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো—এগুলো যেন তাকে দেখছে।
স্ত্রী এসে বললেন,
— "খাবার দিচ্ছি।"
অরিন্দম মাথা নাড়লেন।
তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন,
— "আমি কি খুব অহংকারী হয়ে গিয়েছিলাম?"
স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "তুমি খারাপ মানুষ ছিলে না। কিন্তু সাফল্য পাওয়ার পর তুমি ভুলে গিয়েছিলে যে অন্য মানুষগুলোরও মূল্য আছে।"
সেই রাতেই অরিন্দম বহুদিন পর নিজের পুরোনো ডায়েরি খুললেন।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
"একদিন বড় মানুষ হব। কিন্তু বড় হয়ে যেন ছোট মানুষদের ভুলে না যাই।"
লাইনটি পড়ে তার চোখ ভিজে উঠল।
পরদিন তিনি নিলয়কে ফোন করলেন।
— "নিলয়, তোমার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।"
নিলয় এল।
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "তোমার সেই প্রজেক্টের দিন আমি তোমাকে অপমান করেছিলাম। তুমি প্রতিবাদ করোনি।"
নিলয় মৃদু হেসে বলল,
— "আপনি আমার সিনিয়র ছিলেন।"
— "না," অরিন্দম বললেন, "সেদিন আমি শুধু তোমার সিনিয়র ছিলাম না, আমি নিজের অহংকারের বন্দিও ছিলাম।"
নিলয় কিছু বলল না।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বললেন,
— "আমার পদ চলে গেছে। সম্মানও অনেকটাই হারিয়েছি। কিন্তু মনে হচ্ছে, এই হারটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।"
নিলয় এবার বলল,
— "স্যার, কখনও কখনও মানুষকে নিচে নামানো হয় তাকে ছোট করার জন্য নয়; তাকে নিজের উচ্চতা বোঝানোর জন্য।"
অরিন্দম মৃদু হাসলেন।
সেদিন তিনি প্রথমবার বুঝলেন—
সাফল্য মানুষকে বড় করে না, সাফল্যের মধ্যেও বিনয়ী থাকতে পারাটাই মানুষকে বড় করে।
তার অহংকারের যে আয়নায় এতদিন শুধু নিজের মুখই দেখতেন, জীবনের আঘাতে সেই আয়না ভেঙে গেছে।
সেই ভাঙা আয়নার টুকরোগুলোর মধ্যেই তিনি দেখতে পেলেন নিজের আসল চেহারা।
সেটিই ছিল তাঁর দর্পচূর্ণ।



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational