STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

4  

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

রক্তের রং

রক্তের রং

3 mins
1

শহরের এক প্রান্তে ছিল পুরোনো একটি রাজবাড়ি। বিশাল লোহার ফটক, উঁচু দেওয়াল, ঝাড়বাতি আর পুরোনো ছবিতে ভরা সেই বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
বংশপরিচয় নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না।
কথায় কথায় তিনি বলতেন,
— “আমাদের রক্ত সাধারণ মানুষের মতো নয়। আমাদের নীল রক্ত।”
বাড়ির কর্মচারীদের সঙ্গে তিনি প্রায় কখনও বসে কথা বলতেন না। গ্রামের মানুষ সাহায্য চাইতে এলে দূর থেকে শুনে বিদায় করে দিতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বংশের মর্যাদা রক্ষা করাই জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তাঁর একমাত্র ছেলে অয়ন অবশ্য বাবার মতো ছিল না।
বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে সে গ্রামের মানুষের জন্য একটি ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করতে চেয়েছিল।
রাজেন্দ্রনারায়ণ শুনে বললেন,
— “চৌধুরী পরিবারের ছেলে হয়ে তুমি গ্রামের লোকেদের নিয়ে পড়ে থাকবে?”
অয়ন শান্তভাবে বলল,
— “বাবা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বংশের অনুমতি লাগে না।”
রাজেন্দ্রনারায়ণ রেগে উঠলেন।
— “তুমি বুঝবে না। আমাদের রক্তের একটা মর্যাদা আছে।”
অয়ন আর কোনো উত্তর দিল না।
কয়েক মাস পর এক বর্ষার রাতে রাজবাড়ির পাশের নদীতে ভয়াবহ বন্যা হলো। চারদিকে জল, বিদ্যুৎ নেই, রাস্তা বিচ্ছিন্ন।
সেই রাতেই রাজেন্দ্রনারায়ণ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
বাড়ির গাড়ি বের করার উপায় নেই। ফোনে যোগাযোগও সম্ভব হচ্ছে না।
অয়ন সাহায্যের জন্য গ্রামের দিকে ছুটল।
কিছুক্ষণ পর কয়েকজন গ্রামবাসী নৌকা নিয়ে রাজবাড়িতে পৌঁছাল। তাদের মধ্যে ছিল রতন—রাজেন্দ্রনারায়ণের বহুদিনের পরিচিত এক দরিদ্র কৃষক।
যে মানুষটিকে রাজেন্দ্রনারায়ণ একদিন রাজবাড়ির বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, সেই রতনই সেদিন তাঁকে নিজের কাঁধে তুলে নৌকায় নিয়ে গেল।
হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসক বললেন,
— “রক্তের প্রয়োজন। খুব দ্রুত।”
রক্তের গ্রুপ মিলল রতনের সঙ্গে।
রতন এক মুহূর্তও দেরি করল না।
রক্ত দেওয়ার পর রাজেন্দ্রনারায়ণের জ্ঞান ফিরল।
চোখ খুলেই তিনি দেখলেন, পাশে বসে আছে রতন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দুর্বল গলায় বললেন,
— “তুই?”
রতন মৃদু হেসে বলল,
— “হ্যাঁ, বাবু।”
রাজেন্দ্রনারায়ণ আর কিছু বলতে পারলেন না।
কিছুক্ষণ পর তাঁর চোখ চলে গেল নিজের হাতে লাগানো রক্তের ব্যাগটির দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— “রতন... তোর রক্ত আর আমার রক্তের রং কি আলাদা?”
রতন চুপ করে রইল।
অয়ন বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
— “না বাবা। রক্তের রং সবারই এক।”
রাজেন্দ্রনারায়ণ চোখ বন্ধ করলেন।
সেদিন হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে তাঁর বহু বছরের অহংকার ভেঙে গেল।
রাজবাড়িতে ফিরে তিনি প্রথম কাজ করলেন পুরোনো বংশপরিচয়ের ছবিগুলো নামিয়ে রাখা।
তারপর গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির কাজে নিজেই অর্থ দিলেন।
উদ্বোধনের দিন অয়ন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
রাজেন্দ্রনারায়ণ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন,
— “আমি সারা জীবন ভেবেছি, আমাদের রক্ত নীল। আজ বুঝেছি, রক্তের কোনো রং আলাদা হয় না। মানুষকে বড় করে তার বংশ নয়, তার কাজ।”
সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা রতনের চোখে জল।
রাজেন্দ্রনারায়ণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “যে মানুষ আমার জীবন বাঁচিয়েছে, আজ থেকে সে আমার কাছে শুধু রতন নয়—আমার আপনজন।”
সেদিন রাজবাড়ির ফটক প্রথমবারের মতো সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল।
আর সেই ফটকের ওপরে পুরোনো পাথরের ফলকে লেখা ছিল—
“বংশ মানুষকে পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু মানবিকতাই তাকে মর্যাদা দেয়।”



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational