নামহীন চিঠি
নামহীন চিঠি
ডাকপিয়নটি প্রতিদিন বিকেল চারটের দিকে চিঠি দিয়ে যেত।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
অরুণবাবু দরজা খুলে দেখলেন, একটি খাম।
খামের ওপর তাঁর নাম ও ঠিকানা পরিষ্কার করে লেখা, কিন্তু প্রেরকের জায়গাটি ফাঁকা।
বেনামী চিঠি।
খাম খুলতেই ভিতর থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বেরিয়ে এল।
মাত্র তিনটি লাইন—
“আপনি আমাকে চিনবেন না।
কিন্তু আপনার একটি ছোট্ট কাজ আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।
আজ আমি সেই ঋণ শোধ করতে চাই।”
অরুণবাবু অবাক হলেন।
তিনি তো কোনো বড় কাজ করেননি!
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক হিসেবে জীবনে অসংখ্য ছাত্রকে পড়িয়েছেন। কাউকে বকেছেন, কাউকে উৎসাহ দিয়েছেন, কারও ফি মকুব করে দিয়েছেন। কিন্তু কার জীবনে কোন কথাটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা কি আর মনে রাখা সম্ভব?
পরদিন আবার একটি চিঠি এল।
এবার লেখা—
“আপনি একদিন বলেছিলেন, ‘দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু নিজের স্বপ্নকে দারিদ্র্যের কাছে হারিয়ে দেওয়া অপরাধ।’
আমি কথাটা মনে রেখেছিলাম।”
অরুণবাবুর মনে পড়ল।
বহু বছর আগে তাঁর এক ছাত্র ছিল—সুমন।
খুব দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বাবার চায়ের দোকান ছিল। সুমন প্রায়ই স্কুল কামাই করত।
একদিন অরুণবাবু তাকে ডেকে বলেছিলেন,
— “পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছিস কেন?”
সুমন মাথা নিচু করে বলেছিল,
— “বাড়িতে টাকা নেই স্যার।”
অরুণবাবু তার হাতে নিজের পুরোনো একটি বই দিয়ে বলেছিলেন,
— “টাকা না থাকলে বইটা আমার। স্বপ্নটা তোর।”
তারপর আর সুমনের সঙ্গে দেখা হয়নি।
চিঠিগুলো আসতে থাকল।
কখনও লেখা থাকত—
“আপনার দেওয়া একটি বই আজও আমার কাছে আছে।”
কখনও—
“আপনি সেদিন আমাকে সবার সামনে অপমান করেননি, আলাদা করে ডেকে কথা বলেছিলেন। সেই দিন থেকেই আমি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি।”
কখনও শুধু—
“স্যার, আপনি জানেন না, আপনি কতজনের জীবনে ছিলেন।”
অরুণবাবু প্রতিটি চিঠি যত্ন করে রেখে দিতে লাগলেন।
কিন্তু প্রেরকের নাম নেই।
একদিন তিনি শেষ চিঠিটি পেলেন।
লেখা—
“স্যার, এবার হয়তো আমাকে চিনতে পারবেন।
আমি সেই ছেলেটি, যে একদিন আপনার দেওয়া বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল।
আজ আমি একজন চিকিৎসক।
আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক আপনি।
কিন্তু আমি চাই না আপনি আমাকে খুঁজে বের করুন।
কারণ আপনার কাছে আমি একজন ছাত্র ছিলাম; আমার কাছে আপনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন।
আপনার সেই বিশ্বাসের কোনো নাম দরকার নেই।”
চিঠির শেষে কোনো নাম ছিল না।
শুধু একটি লাইন—
“বেনামী থাকলেই হয়তো কৃতজ্ঞতাটা সবচেয়ে সত্যি থাকে।”
অরুণবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে।
হঠাৎ তাঁর মনে হলো, জীবনে আমরা কত নাম মনে রাখি!
বিখ্যাত মানুষের নাম।
ক্ষমতাবান মানুষের নাম।
সফল মানুষের নাম।
কিন্তু আমাদের জীবন বদলে দেওয়া কত মানুষই তো থেকে যান বেনামী।
কোনো শিক্ষক।
কোনো প্রতিবেশী।
কোনো সহযাত্রী।
কোনো অপরিচিত মানুষ।
যাদের নাম হয়তো আমরা জানিই না।
কিন্তু তাদের একটি কথা, একটি সাহায্য, একটি হাসি কিংবা একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
অরুণবাবু শেষ চিঠিটিও আগেরগুলোর পাশে রেখে দিলেন।
তারপর ডায়েরিতে লিখলেন—
“নাম মনে না থাকলেও কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না। কারণ তারা নাম হয়ে নয়, স্মৃতি হয়ে আমাদের জীবনে থেকে যায়।”
