শেষ পাতার পর
শেষ পাতার পর
অভিজিৎ একসময় খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিল। ছোট চাকরি, ছোট সংসার, আর খুব সাধারণ কিছু স্বপ্ন—এই নিয়েই তার জীবন।
কিন্তু জীবনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছু বদলে দিল।
একটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগে তার সমস্ত সঞ্চয় চলে গেল। বন্ধুরাও ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। যে মানুষগুলো একসময় তার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলত, তারা ফোন করা বন্ধ করে দিল।
অভিজিৎ মনে করেছিল, তার জীবন বুঝি এখানেই শেষ।
প্রথম কয়েক মাস সে কারও সঙ্গে কথা বলত না। অফিস থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। নিজের ব্যর্থতাকে সে নিজের পরিচয় বলে মনে করতে শুরু করেছিল।
একদিন পুরোনো বই গোছাতে গিয়ে সে একটি ডায়েরি পেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় বহু বছর আগে নিজের হাতে লেখা একটি বাক্য—
“পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়; উঠে দাঁড়ানোর গল্পটাও জীবনের অংশ।”
অভিজিৎ অনেকক্ষণ সেই কথাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সে সিদ্ধান্ত নিল, আবার শুরু করবে।
বয়স বেড়েছে, সঞ্চয় নেই, আগের অবস্থান নেই—কিন্তু অভিজ্ঞতা তো আছে।
সে নিজের পুরোনো দক্ষতাগুলো ঝালিয়ে নিতে শুরু করল। নতুন কিছু শিখল। ছোট একটি কাজ দিয়ে আবার শুরু করল।
প্রথম দিকে আয় ছিল সামান্য।
অনেকে হাসল।
কেউ বলল,
— “এই বয়সে আবার শুরু করে কী হবে?”
অভিজিৎ এবার কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু কাজ করে গেল।
দুই বছর পর সেই ছোট কাজটাই একটি সফল উদ্যোগে পরিণত হলো। আগের মতো অর্থের অহংকার তার মধ্যে আর ছিল না। বরং এখন সে নিজের প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মীদের বলত,
— “ভুল করলে ভয় পেয়ো না। ভুল তোমাকে শেষ করে না; ভুল থেকে কিছু না শেখাটাই মানুষকে শেষ করে।”
একদিন তার পুরোনো বন্ধু সৌম্য দেখা করতে এল।
সৌম্য অবাক হয়ে বলল,
— “তুই অনেক বদলে গেছিস।”
অভিজিৎ হেসে বলল,
— “হ্যাঁ। আগে আমি ভাবতাম, সফল হওয়াই জীবনের লক্ষ্য। এখন বুঝি, প্রতিটি পতনের পর নিজেকে নতুন করে তৈরি করাটাই আসল।”
সৌম্য বলল,
— “তোর এত বড় পরিবর্তন কীভাবে হলো?”
অভিজিৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “আমার জীবন বদলায়নি। বদলেছে জীবনকে দেখার চোখটা।”
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে সেই পুরোনো ডায়েরিটা আবার খুলল।
শেষ পাতায় লিখল—
“আমি আগের মানুষটি নই। কিন্তু তাকে অস্বীকারও করি না। কারণ তার ভুল, তার কান্না, তার ব্যর্থতাই আমাকে আজকের মানুষটিতে রূপান্তরিত করেছে।”
জীবন তাকে নতুন কোনো পৃথিবী দেয়নি।
শুধু পুরোনো পৃথিবীর মধ্যেই
একটি নতুন মানুষ তৈরি করে দিয়েছিল।
সেটিই ছিল তার রূপান্তর।
“যে বদল আমাদের ভেঙে দেয়, সেই বদলই কখনও কখনও আমাদের নতুন করে গড়ে তোলে।”
