Banabithi Patra

Drama Romance


3  

Banabithi Patra

Drama Romance


সবুজ স্বপ্ন

সবুজ স্বপ্ন

6 mins 1.5K 6 mins 1.5K

প্রথম সূর্যের আলোটা এসে পড়েছে মোহরের মুখটাতে । বিছানা থেকে উঠে জানলার পরদাটা টেনে দেয় চয়ন । আলতো হাতে মোহরের কপালের চুলকটা সরিয়ে দেয় । একদম বাচ্চা মেয়ের মতো হাত-পা কুঁকড়ে কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে । প্রতিদিন রাতে কেন যে এমন ভয় পাচ্ছে মোহর কে জানে !!!! পরশুদিন তো ডাক্তারবাবুর কাছে নিয়েও গিয়েছিল মোহরকে , উনিও যেন মনে হলো বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না । এসময় এমন একটু-আধটু হয় বললেন । হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধও দিয়েছেন । কিন্তু তাতে কি , ভোরবেলা তো সেই একই কাণ্ড । বিছানায় মাথা রেখে শুলেই কারা যেন কাঁদছে , বাঁচাও-বাঁচাও বলে চিৎকার করছে । ভয় পেয়ে তখন কাতর ভাবে চয়নকে জড়িয়ে ধরে মোহর । বাচ্চা মেয়ের মতো চয়নের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে কাঁপতে থাকে । চয়ন অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে , এখানে কেউ নেই কান্নাকাটি করার - পুরোটাই স্বপ্ন , তবু মানতে চায়না মোহর । দুবছর আগে বাচ্চাকে অ্যাবোরেশন করাতে হয়েছিল , সেই ভয়টাই মনে বাসা বেঁধে নেই তো !!!! কিন্তু সেই ট্রমাটা তো কাটিয়ে উঠেছিল মোহর । সাইক্রিয়াটিস্ট-গাইনোকোলোজিস্ট দুজনেই বলেছিলেন এবার বেবী এলে কোনো অসুবিধা নেই । সেবার না হয় মোহরের জনডিসটা অমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল বলে, ডাক্তারবাবু বাচ্চাটাকে নষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । কিন্তু এবার তো কোনো সমস্যাই নেই । পাঁচটা মাস তো দিব্যিই ছিল । নতুন ফ্ল্যাটে আসা নিয়ে কতো খুশিখুশি ছিল । কোথা থেকে যে কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না চয়ন । কলিংবেলটা বাজতেই বিছানা থেকে উঠে দরজাটা খুলে দিতে যায় চয়ন । কাজের মেয়েটা এসেছে নিশ্চয় । সকালবেলা আসে , রান্নাবান্না-কাজকর্ম সব একাই সামলায় । একেবারে সন্ধ্যেবেলা রাতের রান্না শেষ করে বাড়ি যায় । মোহর বলছিল , সুনীতা নাকি খুব ভালো ।


একেবারে নিজের মতো করে গুছিয়ে সব কাজকর্ম করে । নতুন জায়গায় কাজের লোক পাওয়া খুব ঝামেলার । কপাল ভালো যে একটা মনোমত কাজের লোক পাওয়া গেছে । সুনীতা রান্নাঘরে রাতের এঁটো বাসনপত্র ধোয়ামাজা করছে তার খুটখাট আওয়াজ আসছে । টয়লেট থেকে বেরিয়ে সুনীতাকে দুকাপ চা করতে বলে চয়ন । আস্তে আস্তে ঘুম থেকে ডেকে তোলে মোহরকে । শহরের ব্যস্ততা ছাড়িয়ে একটু ফাঁকার দিকে ফ্ল্যাটটা । যদিও কংক্রিটের অগ্রগতিতে সবুজ আর নেই , তবু কিছুটা আকাশ এখনো যেন অবশিষ্ট আছে । দক্ষিণ খোলা ব্যালকনিটাই বেশ হু হু করছে হাওয়া । চা খেতে খেতে একটু যেন চুপচাপ মোহর , অন্যদিনের মতো কথার ফুলঝরি ফুটছে না আজকে । ভোরবেলার ঘটনাটা মনে মনে ভাবছে নাকি এখনো !!!!!! পরিস্থিতি সহজ করার জন্য চয়ন-ই কথা শুরু করলো । এখানে কতো আলো আর এতদিনের ঐ এঁদো গলির একতলার ভাড়া বাড়িতে একচিলতে আলোও ঢুকতো না । দিনের বেলা অবধি লাইট জ্বেলে থাকতে হতো । ভাগ্যিস তুমি একটা ফ্ল্যাটের জন্য জোর করেছিলে , নাহলে সারাজীবন ওখানেই পচে মরতে হতো আমাদের । বৌয়ের প্রশংসা করলে সচরাচর খুশি হয় বৌরা । কিন্তু মোহর কেমন যেন উদাসীন । চয়ন তখনো বলে চলেছে , তবে এদিকেও আর বেশিদিন ফাঁকা থাকবে না । চারদিকে দেখো কতো ফ্ল্যাট উঠছে । অফিসে ব্যানার্জ্জীদা বলছিল , আমাদের আশপাশে একটা ফ্ল্যাট দেখে দিতে । সেদিন ফোন করলাম প্রোমোটারকে , স্কোয়ার ফিটে চারশ টাকা করে বেড়ে গেছে । জানো সুনীতা বলছিল , এই ফ্ল্যাটগুলো হওয়ার আগে এখানে অনেক বড়ো বড়ো গাছ ছিল । আর ঐ পিছন দিকটায় নাকি একটা বড়ো দিঘি ছিল । হ্যাঁ জানি তো , একমুখ হেসে মোহরের কথার জবাব দেয় চয়ন । জানো তো আমরা যখন সেভেনে পড়ি , ইংরাজী স্যার আমাদের ঐ দিঘির ধারে পিকনিক করতে নিয়ে এসেছিলেন । উফ্ উচুঁ উচুঁ গাছের ফাঁকে দিনের বেলাও যেন ছায়া ছায়া অন্ধকার । আর কতরকম পাখির ডাক , সে তুমি না শুনলে ধারণাও করতে পারবে না । ছোটবেলার অনুভূতিতে সেদিন নিজেকে আফ্রিকার জঙ্গলে শঙ্করের মতো মনে হচ্ছিল । নিজের কথাতে নিজেই হেসে ওঠে চয়ন । অতো গাছ সব কেটে ফেললো !!!! দিঘিটার কি হলো ? মনখারাপের সুরে কথাদুটো বলে মোহর । আরে গাছপালা না কাটলে জমি পাবো কোথায় ? যা ফাঁকা জায়গা সব তো মানুষের সভ্যতার ইমারতে ভরে গেছে । নতুন বাড়ি - কলকারখানা বানাতে জমি তো লাগবে নাকি !!!! তাই বলে গাছগুলোকে কেটে ফেলবে !!!! গাছগুলোর বুঝি প্রাণ নেই , ওদের বুঝি কষ্ট হয়না ? কত পাখি ঘরছাড়া হয়েছে খবর রেখেছে ? ওদের কথা না ভাবো , গাছ আমাদের কতো উপকার করে জানো না !!!! এইভাবে গাছ কাটতে থাকলে একদিন তো..... কথাকটা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে মোহর । চয়ন যেন এই পরিস্থিতিটার জন্য তৈরি ছিলনা । যা বাব্বা গাছগুলো কি চয়ন কেটেছে নাকি , ওকে কেন দোষারোপ করছে মোহর !!!!! আমি কেটেছি নাকি গাছগুলো যে আমাকে বলছো..... তুমি কাটোনি , কিন্তু যারা কেটেছে তারা তোমার মতোই স্বার্থপর । তোমরা শুধু নিজেদের কথাই ভাবো , কারো যন্ত্রণা বোঝোনা । একটা প্রাণকে উপড়ে ফেলার যন্ত্রণা আমি জানি । আমার শরীর থেকেও একটা প্রাণ তোমরা...... আমি রাত্তিরবেলা ঐ গাছগুলোর কান্না শুনতে পাই । ওরা বাঁচাও বাঁচাও করে কাঁদে । আমার ভীষণ ভয় করে । ওদের কান্নায় আমার সন্তানের পৃথিবীতে আসার পথ না পিছল হয়ে যায় ।


কথাটা শেষ না করেই ঘরে চলে যায় মোহর । এ যেন এক নতুন মোহরকে দেখছে চয়ন । এইজন্য ও রাতে দিনের পর দিন ভয় পাচ্ছে !!!! অফিস বেরনোর সময় টুকটাক কাজের কথা ছাড়া কথা হলোনা মোহরের সাথে । অফিসে এসেও মনটা তিতকুটে হয়ে আছে চয়নের । কিভাবে মোহরের মনের মেঘ কাটাবে বুঝতে পারছে না । কাল শনিবার অফিস ছুটি আছে । এমনিতেও পয়লা বৈশাখ । দুদিনের জন্য না হয় বাপেরবাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনবে মোহরকে , মনটা তাতে যদি কিছুটা ভালো হয় । ফোন করে প্ল্যানটা বলতেও খুশি হলোনা মোহর । এই তো গৃহপ্রবেশের দিন-ই বাবা-মা-দাদা এসেছিল , এখনি আবার ওখানে যাওয়ার কি আছে । পরে যাওয়া যাবে.... শোনো আসার সময় সুনীতার জন্য একটা সালোয়ার-কামিজ নিয়ে এসো তো । পয়লা বৈশাখে দেবো মেয়েটাকে । একটু না দিলেথুলে মন দিয়ে কাজ করবে না । ফোনটা রাখার আগে নীচুস্বরে বলে , বেশি দামের নেওয়ার দরকার নেই । সুনীতা কাছাকাছি আছে বলেই শেষটুকু চাপাস্বরে বললো বোধহয় । যাক্ সকালের পরিস্থিতি একটু বোধহয় স্বাভাবিক হয়েছে । সুনীতার সালোয়ার-কামিজ কিনতে ঢুকে একটা শাড়ি পছন্দ হয় মোহরের জন্য । দামটা একটু বেশি , তাই নেব কি নেবে না ভাবছে । তখনি খেয়াল করে দোকানের উল্টোদিকের ফুটপাতে । মনটা আনন্দে নেচে ওঠে চয়নের । মোহরেরও নিশ্চয় খুব খুশি হবে গাছগুলো পেয়ে । অনেকটা রাত , নীল মৃদু আলোতে ঘড়ি দেখা যাচ্ছে না । জানলার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে । চাঁদের আলোয় একটা আলো আলো অন্ধকার । চয়নের কোলের কাছে শুয়ে ওর বুকে আঙুলে করে আঁকিবুকি কাটছে আর বকরবকর করে চলেছে মোহর । কাল সকালেই আমাকে টব আর মাটি এনে দেবে । একটু বড়ো সাইজের টব আনবে , নাহলে খোলামেলা ভাবে বড়ো হতে পাবেনা গাছগুলো । আর শোনো , একটু সার এনে দিয়ে তো । খাবার তো লাগবে গাছগুলোর । মোহরের শরীরের উষ্ণতা আর খুশি ছুঁয়ে যাচ্ছে চয়নকে । চোখ বুজে সুখটুকু অনুভব করছে । কি গো , ঘুমিয়ে গেলে ? না.... বলছি ও আসার আগে গাছগুলো অনেকটা বড়ো হয়ে যাবে , তাই না ? ফুলও ফুটবে হয়তো । চয়নের হাতটা টেনে নিজের পেটের ওপর ছোঁয়ায় মোহর । পুরো ব্যালকনিটা অনেক অনেক গাছে ভরিয়ে দেব । তবে না ছোট থেকে গাছকে ভালোবাসতে শিখবে পুচকুটা । চয়নের উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে চলেছে মোহর । সবুজের স্বপ্নে বিভোর তখন মোহর । সকালের অপরাধ বোধ থেকে যেন মুক্তি পেল চয়ন । রাতের ভয়টা মোহরের মনে আর ফিরে না এলেই মঙ্গল । ও তো এমন করেই খুশি রাখতে চায় মোহরকে । মোহরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে চয়ন । সকালে দুজনে মিলে গাছগুলোকে টবে লাগাবো , রোজ দুজনে জল দেবো , দেখবে কত তাড়াতাড়ি ওরা বড়ো হয়ে যাবে । রাত হলো , এবার তো ঘুমোয় .... মোহরকে নিজের আরো কাছে টেনে নেয় চয়ন ।



Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design