Sanghamitra Roychowdhury

Inspirational


3  

Sanghamitra Roychowdhury

Inspirational


প্রথম প্রেম

প্রথম প্রেম

8 mins 642 8 mins 642

ডালে ফোড়ন দেবার আগে রান্নাঘরের দরজায় খসখস করে আওয়াজ শুনে সাঁড়াশি ধরা হাতেই বিশাখা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সেদিকে। ওও, ওর ছেলেটা দরজার চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাখা ছেলেকে নিয়েই লাহিড়ি বাড়ীতে থাকে। কেউ নেই আর ছেলেটাকে দেখাশোনা করার। কী করবে বিশাখা? পেটের ভাতের জোগাড় তাকে নিজেকেই করতে হবে। বিধবা মানুষ, অল্প বয়স, একা থাকার ঢের জ্বালা। তার থেকে এই ভালো, বিশাখার জন্য। ছেলেকে নিয়ে থাকা খাওয়ার বিনিময়ে লাহিড়িবাড়ীর রান্নাবান্না করে বিশাখা। আজ বছর চারেক এবাড়ীতে। যখন কাজে বহাল হয়েছিলো, তখন বিশাখার ছেলে রাজু সবে বছর দেড়েকের। স্বামী মারা গেছে অ্যাক্সিডেন্টে। মদ খেয়ে ট্রাক চালাচ্ছিলো। ছেলে নিয়ে বিশাখা অথৈ জলে। বস্তিতে ওর পাশের ঘরের মানদাদিই এই কাজে বিশাখাকে লাগিয়ে দিয়েছিলো।


রাজু ভারী বাধ্য আর শান্ত ছেলে। কাজের সময় মা'কে মোটে বিরক্ত করে না। নিজের মতো নিজে খেলা করে। আজ মনে হয় ক্ষিদে পেয়েছে। সকাল থেকে আজ এখনো একটুও ফুরসৎ পায় নি বিশাখা জলখাবারটুকুও খাবার। ছেলেকে নিয়েই বসে খায়। এবাড়ীর লোকেরা ভালো। কোনো রোকটোক নেই। তাই বলে বিশাখাও এদের অমর্যাদা করে না। কাজের লোক হিসেবে যেটুকু তার প্রাপ্য তার বাইরে বিশাখার কোনো চাহিদা নেই। বড়ো শান্ত ভদ্র মেয়ে বিশাখাও। হবে নাই বা কেন। গ্রামের বেশ সম্পন্ন ভদ্রঘরের মেয়ে বিশাখা। বাপ-মা মরা বলেই শুধু যা একটু অযত্নে মানুষ। কাকা জ্যেঠারাই দেখে বিয়ে দিয়েছিলো বিশাখার। ফাইভ ক্লাসের পরে সংসারের কাজে কাকি জ্যেঠিদের সাহায্য করতে করতেই বিশাখার লেখাপড়াটা আর হয় নি। আর বাপ-মা না থাকলে কার অতো দায় ভালো বরে ঘরে দেখেশুনে বিয়ে দেবে? ঐ ঘটকের কথায় কোনো রকমে নমো নমো করে বিশাখার বিয়ে হয়ে গেলো ট্রাক ড্রাইভার বিজয়ের সাথে। এমনিতে মানুষটা খারাপ ছিলো না। যদ্দিন বেঁচে ছিলো, বৌ বাচ্চাকে খাওয়া পরার কোনো কষ্ট কখনো দেয় নি। বিজয়ের দোষের মধ্যে বড়ো দোষ, সে ছিলো পাঁড় মাতাল। মদ খেয়ে ট্রাক চালাতে গিয়েই তো অ্যাক্সিডেন্টে বেঘোরে মরলো!


তারপর থেকেই বিশাখা লড়ে যাচ্ছে তার আদরের সাত রাজার ধন এক মাণিক রাজুকে নিয়ে। তাকে

লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার বড়ো শখ বিশাখার।


লাহিড়িবাবুকে বলেও ছিলো একদিন। ওনার অনেক চেনাজানা, একথা শুনেছে বিশাখা। তাইতে লাহিড়িবাবু একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিশাখা রাজুকে স্কুলে ভর্তি করাবে। অনেক আশা তার। অনেক আকাঙ্ক্ষা, ছেলে একদিন লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। তাই আজ ওদের মা-ছেলেকে নিয়ে লাহিড়িবাবু স্কুলে ভর্তি করাতে এসেছেন। পাহাড় প্রমাণ দুঃখ বুকে চেপে রেখে বিশাখা লাহিড়িবাবুদের একটা ছোট্ট শর্ত মেনে নিয়েছে। ছেলেকে আশ্রমের স্কুলে ভর্তি করাচ্ছে, অনাথ আশ্রমের স্কুলে। সেখানেই থাকবে এখন থেকে রাজু... মানে বিশাখার ছেলে রাজীব।


বিশাখা ভয়ে ভয়ে লাহিড়িবাবুর পেছন পেছন ছেলের হাত ধরে এসে, অনাথ আশ্রমটির অফিস ঘরে ঢুকলো। হাতদুটি জোড় করে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েই রইলো। ইশারায় লাহিড়িবাবু বিশাখাকে বসতে বললেন। বিশাখা পাশে রাখা একটি টুলে সংকুচিতভাবে বসলো। এখানেই রাজু এখন থেকে থাকবে। রাজুই বিশাখার একমাত্র আপনার জন। বাবা, মা, স্বামী... আর কেউই তো নেই, মনটা তাই বিশাখারও ভার। তবে আর উপায়ই বা কী?

বিশাখা এই ব্যবস্থাটা মেনে নিয়েছে রাজুর ভবিষ্যৎ ভেবেই। বাবুদের বাড়ীতে থাকলে ছেলেকে কেবল ওই দুবেলা চোখের দেখাটুকুই হবে। সারাদিনের কাজের মধ্যে কী করে বিশাখা ছেলের খেয়াল রাখবে? কোথায় কোথায়, কার সঙ্গে মিশে ঘুরে বেড়াবে, এসব নজরদারি বিশাখা কী করে করবে?



তাছাড়া লেখাপড়ার ভালোমন্দ বিশাখা কতোটুকুই বা বোঝে? লাহিড়িবাবুর কথাই তাই নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছে বিশাখা, কেবল ছেলের ভবিষ্যতের জন্যই।


ছেলে যদি বদ সঙ্গদোষে পড়ে বাপের দোষ পেয়ে বসে? মাতাল ট্রাকড্রাইভারের আর বাবুদের বাড়ীর রান্নামাসীর ছেলের পরিচয়ে বাবুদের বাড়ীর এককোণে অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকার চেয়ে রাজু নিজের মত নিজে মানুষ হয়ে ওঠার যে সুযোগ পাচ্ছে এইই বিশাখার পরম ভাগ্য। বিশাখার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে।

এতোক্ষণ রাজু মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলো l আশ্রমের মহারাজের ডাকে রাজুর থেকে একটু বড়ো দুটি ছেলে এসে রাজুর হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলো। রাজু একবারও পেছন ফিরে মায়ের দিকে তাকালো না, হয়তো অভিমানে, কিম্বা দুঃখে।

তবে বিশাখা মাঝেমধ্যে ছেলেকে দেখতে আসার অনুমতি পেলো, লাহিড়িবাবুর কথায়। রাজুও বছরে একবার মায়ের কাছে এসে থেকে যায় ক'দিন।


******


এরপর দেখতে দেখতে মাঝখানে অনেকগুলো দিন, মাস, বছর পেরিয়ে গেলো। বিশাখার চুলে পাক ধরেছে, চোখের জোর কমেছে, চশমাও উঠেছে চোখে। আজকাল লাহিড়িবাড়ীতে বিশাখাকে আর রান্নাবান্না করতে হয় না। সেজন্য অন্য এক নতুন মেয়ে বহাল হয়েছে। বিশাখা লাহিড়িবাবুর মেয়ে মিমির দেখাশোনাই করে এখন। দেখাশোনা বলতে মিমিকে সঙ্গে করে টিউশনে আনা নেওয়া, স্কুলবাসে তুলে দেওয়া, নামিয়ে আনা। মিমির পছন্দের খাবার আলাদা করে বানিয়ে দেওয়া। মিমির ঘর গুছিয়ে রাখা, এইসব। সেই মিমি এবার উচ্চমাধ্যমিকে দুর্ধর্ষ রেজাল্ট করেছে। খুশীতে ডগমগ লাহিড়ি পরিবার। বিশাখাও খুব খুশী, কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও একটা কাঁটা বুকে খচখচ করে বিঁধছে বিশাখার।



বিশাখা অতশত বোঝে না, লাহিড়িবাবু বিশাখাকে বুঝিয়ে বলেছেন, তার রাজু নাকি মস্ত বড়ো সরকারী জলপানি পেয়েছে। আর তাই রাজুকে দিল্লি নামের কোন এক শহরে চলে যেতে হবে। দেশের সবচেয়ে নামী আর বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি রাজু পড়বে। কলেজের পড়াও তো রাজু ঐ আশ্রমে থেকেই করেছে। এমন সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না, রাজু তার নিজের পরিশ্রমের ফলেই পেয়েছে। বিশাখা দু'হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো। ভগবান এবার মুখ তুলে চেয়েছেন। তবু বিশাখার মনটা খচখচ করছেই এখনো, দিল্লি কতদূরে? চাইলেই তো দেখা করতে আসতে পারবে না রাজু।



আজই চলে যেতে হবে রাজুকে। মায়ের সাথে দেখা করে, লাহিড়িবাবুদের প্রনাম করে রাজু বিকেল চারটেয় দিল্লির ট্রেনে চাপবে। লাহিড়িবাবুই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবারেও রাজুর যাবার। আশ্রম থেকে সব জিনিসপত্র, বই এসব নিয়ে রাজু আসবে। দুপুরে লাহিড়িবাড়ীতে খেয়েই রাজু হাওড়ায় ট্রেন ধরতে যাবে। প্রায় একটা বাজে। রাজু এবার বিদায় চাইলো সকলের কাছে। বিশাখার চোখে টলমল করছে জল। রাজু যখন ধীরে ধীরে একে একে সকলকে প্রণাম করছে, তখন লাহিড়িবাবু বললেন , "আমি তো আজ বাড়ীতেই আছি, বরং রাজুকে হাওড়ায় ট্রেনে তুলে দিয়েই আসি। প্রথমবার তো! বাসে বা ট্যাক্সিতে যাওয়ার দরকার নেই। আর বিশাখা তুমিও চলো, ছেলেকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবে।"

সবাই যখন বেরোবে, ঠিক সেইসময় মিমি কোথা থেকে এসে হাজির। রিনরিনে গলায় কলকল করে উঠলো ,"আমিও যাব !" রাজু পেছন ফিরে দেখলো, "ওরে বাবা, কত্তো বড়ো হয়ে গেছে সেই ছোট্ট গুটিগুটি পায়ে হেঁটে বেড়ানো মিমি।" মিমির কথাগুলো শুনে রাজুর মনে হোলো ঠিক যেন টুংটাং শব্দে জলতরঙ্গ বাজছে, নাকি একটা দুরন্ত পাহাড়ী ঝর্ণা ছমছম করে নামছে, না না, যেন নাইটিঙ্গেল পাখিটাই গান গাইছে!"



না না, আর দেরী করা যাবে না। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে, আর দেরী হলে রাজুর পৌঁছতে অসুবিধা হতে পারে। সবাই গাড়িতে উঠে পড়লো। লাহিড়িবাবু নিজে গাড়ী চালাচ্ছেন। পাশে রাজু।

পেছনের সিটে বিশাখা আর মিমি। বিশাখার বুকটা বড়ো ঢিপঢিপ করছে, ভয়ে, আশঙ্কায়, আনন্দে। বাঁ হাতে কালীঘাট মায়ের মন্দিরে যাবার পথ। চেনে বিশাখা। লাহিড়িগিন্নীর সাথে বছরে দু-তিনবার আসা হয়, বিভিন্ন বিশেষ বিশেষ পুজো উৎসবে। বিশাখা দু'হাত তুলে মাকালীকে প্রণাম করলো। হাত নামিয়ে সোজা হয়ে বসতে গিয়ে বিশাখার নজরে পড়লো, রাজু আর মিমি, কোণাকুণি বসেই দু'জনে দু'জনের দিকে অপলক চেয়ে আছে। এই চাউনির ভাষা খুব চেনে বিশাখা। তার অভিজ্ঞ মন বলছে, এই চোখের ভাষার পরিণতি ভালো হবে না। রাজু তার পেটের ছেলে, আর মিমি তার মনিববাড়ীর মেয়ে। মিমিকে যতই কোলে পিঠে করে বুক দিয়ে আগলে মানুষ করুক না কেন, বিশাখা তো তাদের বাড়ীর কাজের লোক বৈ আর কেউ নয়।


হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেছে ওরা। বিশাখা অবাক হয়ে দেখছে। কতো লোক, কতো ভিড়। তার মধ্যেও বিশাখা যেন একলা। ছেলের জন্য দুশ্চিন্তায় তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেলো। লাহিড়িবাবু রাজুকে নিয়ে এগিয়ে ট্রেনের সিটনম্বর লেখা লিস্ট টাঙানো হয়েছে কিনা দেখতে গেছেন। মিমি দাঁড়িয়ে বিশাখার পাশে। একবার বিশাখা ভাবলো, মিমিকে সাবধান করে দেয়। কিন্তু এটা কিছুতেই মাথায় এলো না, ঠিক কী বলে সাবধান করবে। ততক্ষণে লিস্ট দেখে এসে গেছেন রাজুকে নিয়ে লাহিড়িবাবু। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে, দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে যাবার সময় একটু আগেপিছে হয়ে গেছে সবাই। লাহিড়িবাবু সামনে, পেছনে মিমির হাত ধরে বিশাখা। আর ওদের পাশেই রাজু। বিশাখা ঐ ভিড়ের মধ্যেও স্পষ্ট দেখলো, মিমি একটা কাগজ আর ছোট্ট একটা কী প্যাকেটের মতো রাজুর বাঁহাতে গুঁজে দিলো। আর রাজুও দিব্যি নিয়ে কাগজটা আর ছোট্ট মতো প্যাকেটটা বাঁহাতেই বুক পকেটে পুরে ফেললো যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। বিশাখা কিচ্ছু বলতে পারলো না, কিচ্ছু করতে পারলো না। শুধু অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখলো।

ওরা ট্রেনের সামনে চলে এসেছে। লাহিড়িবাবু আর রাজু ট্রেনে উঠে সিট খুঁজে ব্যাগপত্র রেখে আবার নেমে এলো প্ল্যাটফর্মে। বিশাখা মিমিকে নিয়ে দাঁড়িয়েই ছিলো প্ল্যাটফর্মে। মিমি যেন হঠাৎই খুব গম্ভীর। এবার ট্রেন ছাড়বে। একদম সময় হয়ে গেছে। রাজু ট্রেনে উঠে পড়ার আগে লাহিড়িবাবুকে প্রণাম করে, বিশাখাকে প্রণাম করার জন্য নীচু হোলো। প্রণাম করে ওঠার আগেই বিশাখা ছেলেকে জড়িয়ে ধরার জন্য দু'হাত বাড়ালো। আর তখনই চোখে পড়লো, রাজুর পকেটে ভাঁজ করা কাগজের পেছনে একটা ছোট্ট লাল গোলাপের কুঁড়ি। ওটাই অনেকক্ষণ মিমির হাতের চাপে থেকে একটু নেতিয়ে গেছে বোধহয়। ছেলের বুকপকেটে গোলাপ। বিশাখার হাতটা নিশপিশ করে উঠলো গোলাপের কুঁড়িটা বার করে নেবার জন্য। বুঝতে পারছে বিশাখা, জানাজানি হলে অশান্তির শেষ থাকবে না। কিন্তু তাও কিছুতেই বিশাখা পারলো না ছেলের বুক থেকে ছেলের প্রথম প্রেমের উপহার গোলাপকুঁড়িটা বার করে ছেলেকে আসন্ন বিপদের সম্ভাবনা বোঝাতে।


রাজু ট্রেনে উঠে পড়েছে। ট্রেনটা ছেড়েও দিলো। হাত নাড়ছে জানালা দিয়ে। বিশাখার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সেই ছোট্ট থেকেই রাজুটা শুধুমাত্র লেখাপড়ার জন্য মায়ের কাছছাড়া। তা হোক। ছেলে মানুষ হোক, বড়ো হোক, অনেক বড়ো। তাতেই বিশাখার শান্তি। কিন্তু এখন রাজু আর মিমির ব্যাপারটা নিয়ে বিশাখার মন বড়ো চঞ্চল। বড়ো দুশ্চিন্তায়।


******


দেখতে দেখতে দু'টো বছর পার হয়ে গেলো। রাজু আসে নি কলকাতায়। একটা খরচা তো আছেই। অন্য সময় হলে হয়তো বিশাখাও বলতো, রাজুকে একবার অন্তত আসতে। কিন্তু ইচ্ছে করে, ভীষণ ভয়ে পড়ে, বলে নি বিশাখা। বিশাখা একদম চায় না রাজু আর মিমি মুখোমুখি হোক। এই নিয়ে যদি রাজু লাহিড়িবাবুদের কাছে অপমানিত হয়, তবে বিশাখা তা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।

পাক্কা দু'বছর পরে রাজু দিল্লি থেকে ফিরছে। এবারে লাহিড়িবাবুর কথা শুনে বিশাখা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো, রাজু নাকি আরো বড়ো জলপানি পেয়েছে। তার ফলে একেবারে সেই বিদেশে পড়তে যাবে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে, উড়োজাহাজে চেপে। সেই দূরদেশের নাম নাকি আমেরিকা। সেই দেশ কতো দূরে জানে না বিশাখা। যাইহোক বিশাখা এতেই খুব খুশী, রাজুর সাথে মিমির দেখা হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। কোথায় মিমিদের পরিবার, আর কোথায় বিশাখা আর তার ছেলে রাজু। এই বরং ভালো, চোখের বার তো মনের বার, তাইই ভালো। রাজু এসে পৌঁছবে বিকেলে। বিশাখা মিমির কাপড়চোপড় গোছাতে গোছাতে ভাবলো, রাজু বিদেশে যাওয়ার আগে একবার কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে যাবে, পুজো দিতে। মা বিশাখার কথা শুনেছেন, এই ব্যবস্থাতেই হয়তো রাজুর মঙ্গল। রাজুর বিপদমুক্তি। মিমি কলেজ থেকে ফেরার আগেই ওর জন্য একটু খাবার বানাতে বিশাখা রান্নাঘরে ঢুকলো। আর লাহিড়িগিন্নী সবসময়ের পুরনো লোক গোবিন্দকে দিয়ে ডেকে পাঠালেন।


এবার ভীষণ দুশ্চিন্তায় বিশাখার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। নির্ঘাত রাজুর আর মিমির ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলেছেন ওঁরা। তাই রাজু এসে পৌঁছবার আগে, আর মিমির কলেজ থেকে ফেরার আগেই ওনারা বিশাখাকে সাবধান করে কাজে জবাব দিতে চান। এবার কী করবে বিশাখা? গলা শুকিয়ে কাঠ। এসে দাঁড়ালো বিশাখা লাহিড়িগিন্নীর শোবার ঘরে। ও বাবা, লাহিড়িবাবু কখন ফিরলেন অফিস থেকে?

লাহিড়িবাবুই শুরু করলেন, "বিশাখা, আগে তোমার মতামত না নিয়েই আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমার আপত্তি হবে না তো, যদি রাজু বিদেশে রওনা হবার আগেই আমরা রাজুর আর মিমির বিয়েটা করিয়ে দিই? রাজুর মতো ছেলে লাখে এক। মিমির নিজেরও তাই ইচ্ছে। তাছাড়া আমরাও তোমাকে ছাড়া মিমির দায়িত্বের কথা আর কারুর হাতে দেবার কথা কখনো ভাবতেই পারি নি।" কী বলবে বিশাখা? কী বলার আছে বিশাখার? শুধু কোনোরকমে বলতে পারলো, "মিমি আর রাজুর নামে কাল একবার মায়ের মন্দিরে পুজো দিয়ে আসবো। খুব সুখী হবে ওরা।"


পরদিন সকালে মায়ের মন্দিরের প্রসাদী ফুল মিমির আর রাজুর কপালে ছুঁইয়ে বিশাখা মনে মনে বললো, "সারা জীবন যেন তোদের এই প্রথম প্রেমের গোলাপ কুঁড়িটা টাটকা সতেজ থাকে!"

-----------------------------------------------------------


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Inspirational