Sanghamitra Roychowdhury

Inspirational

3  

Sanghamitra Roychowdhury

Inspirational

মাতৃত্বের আকাশ

মাতৃত্বের আকাশ

12 mins
958


ঘড়ির দু'টো কাঁটাই একটি ঘরে, একসাথে। রাত পাক্কা বারোটা, মধ্যরাত। মোবাইলে টুক করে তারিখটা পাল্টে গেলো। শুভদীপ এখনো বাড়ী ফেরে নি। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ শোবার ঘরের খাটের পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় পা মুড়ে বসে আছে দেবাঞ্জনা। ঘরের চড়া আলোটা নিভিয়ে নীল নাইটল্যাম্প জ্বেলে বসে আছে। ওদের সাড়ে চার বছরের ছেলে শুভাঞ্জন ঘুমোচ্ছে অকাতরে, বাবার জন্য অপেক্ষা করে করে শেষ পর্যন্ত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো ছেলেটা।

সময় দেখলো দেবাঞ্জনা আবার। বাইরে নিরিবিলি শহর ভিজছে অঝোর শ্রাবণধারায়। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী ধীরস্থির হয়ে গেছে আজকাল দেবাঞ্জনা।


এগারো বছরের দাম্পত্য জীবনে শিখে নিয়েছে দেবাঞ্জনা, যে সরকারী হাসপাতালের একজন ব্যস্ততম ডাক্তারের বৌ হলে, ঠিক কতখানি ধৈর্য্যশীলতার, সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয় প্রতি পদে। এই পর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু শুভদীপ ফোন ধরে নি কেন, রাত দশটা পর্যন্ত? ডিউটি অফ হবে রাত আটটায়, ধরা গেলো কাজকর্ম গুছিয়ে চার্জ হ্যাণ্ডওভার করতে আরো একঘন্টা। তাহলেও ন'টা।

তারপরেও হয়তো হাসপাতাল ছেড়ে বেরোবার আগেই কোনো এমার্জেন্সি। কিন্তু তাও রাত দশটাতেও বাড়ীর ফোন রিসিভ করবে না? তার মিনিট পনেরো পর থেকেই তো ফোন সুইচড অফ, রেকর্ডেড মেসেজ শোনাচ্ছে! তাহলে? কোনো বিপদ-আপদ? কথাটা মনে হতেই দেবাঞ্জনার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেলো। মনে পড়ে গেলো কয়েক সপ্তাহ আগেই কলকাতায় নামজাদা সরকারী হাসপাতালে ঘটে যাওয়া বিশ্রী দুর্ঘটনা।


এই মুহূর্তে দেবাঞ্জনার ভারী অসহায় লাগলো নিজেকে। কোন ছোট্টবেলায় মা'কে হারিয়েছে, তার পর থেকে তো শুধুই বাবা। বাবা যদি এখনো বেঁচে থাকতো, তবে এক্ষুণি বাবাকে ফোন করতো, আর বাবাও ফোনের অপরপার থেকে সাহস জোগাতো দেবাঞ্জনাকে। বিয়ের পর প্রথমদিকে কত কঠিন পরিস্থিতিতে, এমনকি অনেক সময় মাঝরাতেও বাবাকে ফোন করে জ্বালাতন করেছে দেবাঞ্জনা।

এখন বাবা যেখানে, সেখানে যে যোগাযোগ করা যায় না! বাবার জন্য, মায়ের জন্য, শুভদীপের জন্য.... দেবাঞ্জনার বুকের ভেতর থেকে কান্নাটা পাক খেয়ে খেয়ে উঠে গলার কাছে এসে দলা হয়ে আটকে রইলো। আপনার বলতে শুধু শুভদীপ আর ছেলে। নির্নিমেষে ছেলে শুভাঞ্জনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেবাঞ্জনা। হঠাৎ ওর সম্বিৎ ফিরলো, ডিং ডং ডিং ডং কলিং বেলের আওয়াজে।



ছুটে গিয়ে দরজা খুললো দেবাঞ্জনা, শুভদীপ ফিরেছে। খুব অন্যমনস্ক ছিলো দেবাঞ্জনা, গাড়ি নিয়ে গেট দিয়ে শুভদীপের ঢোকার আওয়াজই পায় নি। ইশ্, গাড়ি গ্যারাজ করে আসতে আসতেই ভিজে গেছে শুভদীপ। খোলা দরজার সামনে শুভদীপও অন্যমনস্কভাবে। দেবাঞ্জনাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে অ্যাটাচিকেসটা সোফায় রেখে এগোলো বেডরুমের দিকে। "দেরী কেন?", দেবাঞ্জনার কথাটা শুভদীপ শুনতে পেয়েছে বলে মনে হোলো না। বেডরুমে উঁকি দিয়ে ঘুমন্ত ছেলেকে একনজর দেখে নিয়েই বাথরুমে ঢুকে পড়লো শুভদীপ। 




রাত দেড়টা, অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে বেরিয়ে অত রাতে আর কিচ্ছু খেতে চাইলো না শুভদীপ। তবুও জোর করেই দেবাঞ্জনা এককাপ গরম দুধ আর প্লেটে ক'খানা ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে এলো বসার ঘরে শুভদীপকে, নিজের জন্যও তাইই নিলো। তারপর এসে বসলো শুভদীপের পাশে, সোফায়।

লক্ষ্য করছে দেবাঞ্জনা, শুভদীপের থমথমে মুখটা। এবার দেবাঞ্জনা মোটামুটি নিশ্চিত, যে হাসপাতালে নির্ঘাৎ কোনো সমস্যাই হয়েছে, হয়তো ডাক্তার শুভদীপ দত্ত আজ সার্জারিতে সফল হতে পারে নি। আগেও যে একেবারে কখনো এমন হয় নি তা নয়, তবে সেসময় শুভদীপ সবকথা খুলে প্রথম দেবাঞ্জনাকেই তো বলেছে! তবে আজ এখনো এমন অদ্ভুতভাবে মৌন কেন? দেবাঞ্জনা জিজ্ঞেস করলো ঘুরিয়ে, "কী গো, তোমার শরীর ঠিক আছে তো?" কিন্তু তাতেও নিরুত্তর শুভদীপ। আর কথা না বাড়িয়ে দেবাঞ্জনা বললো, "শুয়ে পড়ো গিয়ে, আমি আসছি।"


শুতে এসে দেবাঞ্জনা দেখলো, শুভদীপ ছেলেকে একেবারে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শুয়েছে। আর ছেলেও তেমনি, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বাবার গায়ের গন্ধ পায় বোধহয়। বাবাকে হাত-পা দিয়ে আঁকড়ে নিয়েছে একদম। দেবাঞ্জনা শুভদীপের পিঠের সাথে গালটা ঠেকিয়ে শুভদীপ আর ছেলে দু'জনকেই আঁকড়ে নিলো হাত বাড়িয়ে। অন্য অনেকদিন এরকম মুহূর্তে শুভদীপ আলতো করে ছেলের বাঁধন ছাড়িয়ে নিয়ে দেবাঞ্জনাকে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিয়েছে।

আর তারপর সারা দিনের ক্লান্তি, শ্রান্তি, অবসন্নতা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা..... সব উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে দেবাঞ্জনার সর্বাঙ্গে। তারপর পরিতৃপ্ত দু'টি দেহ-মন একে অপরের চুলে বিলি কাটতে কাটতে শুনিয়েছে সারাদিনের কড়চা কাহিনী.... সব। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে দু'জনেই, পরম গভীর নির্ভরশীলতার বন্ধনে জড়িয়ে।


আজ এখনো একটা কথাও বলে নি শুভদীপ। ছেলে পাশ ফিরে শুলো, আর শুভদীপ চিৎ হয়ে কপালের ওপর নিজের হাত আড়াআড়ি রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দেবাঞ্জনা শুভদীপের মাথায় আলতো করে হাত ছুঁইয়ে জানতে চাইলো, "সব ঠিক আছে তো? এতো আনমনা কেন? এতো দেরীই বা হোলো কেন গো?" ধীরে ধীরে শুভদীপ বললো, "তুমি তো জানো দেবী, আমাদের ডিউটি আওয়ার্স বলে কিছু নেই...."


"সে তো না হয় জানি, কিন্তু দুশ্চিন্তাও তো হয়! আমি ছেলে নিয়ে একাএকা থাকি সারাদিন, কলকাতা থেকে এতোদূরে, এতোবড়ো বিরাট একটা ভাড়াবাড়িতে একলা। সারাটা দিনই উদ্বেগে থাকি, যা সব হচ্ছে চারিদিকে, হাসপাতালগুলোতে! তাছাড়া আমি না হয় তোমার কাজের ধরন-ধারন জানলাম, বুঝলাম, কিন্তু তোমার ছেলে? সারাদিন পাপাই- পাপাই! ও কী বোঝে অতশত? তাছাড়া খবরটা পেলে অতটা দুশ্চিন্তাও হয় না। আজ তো ফোনটাও বন্ধ রেখেছিলে।"


"ফোনে চার্জ ছিলো না," সংক্ষিপ্ত উত্তর। আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শুভদীপ, "আমি বড্ড টায়ার্ড দেবী, সকালে কথা হবে।"


*****


হাইওয়ে থেকে নেমে যাওয়া মেঠো রাস্তাটা খানিকটা এঁকেবেঁকে এগিয়ে একটা আপাতশান্ত নিরিবিলি জায়গায় পৌঁছেছে। পথচলতি গ্রাম্য লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে, ধীরে ধীরে শুভদীপ গাড়ি নিয়ে এগোচ্ছে। বিশাল এক পুকুরের ধারে এক প্রাচীন বটগাছ, তলাটা বেদী করা, পুকুরের ঘাটটা বাঁধানো। পুকুরটাকে ঘিরে আছে তাল, খেঁজুর, দেবদারু, শাল বা সেগুনগাছ বোধহয়।

মনে থাকার বয়স থেকে কলকাতায় মানুষ হওয়া শুভদীপ অতশত গাছগাছালি চেনে না। সূর্যের তির্যক উজ্জ্বল আলো পুকুরের জলে। বটগাছের তলার বেদীর ঠিক পাশে এক ছোট্ট কাঁচা মন্দির, বাবা কালভৈরবের থান। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে বড়ো মান্যতা এই মন্দিরের। ধবধবে সাদা চুলদাড়ি আর পরিচ্ছন্ন সাদা ধুতি-ফতুয়াতে সৌম্য চেহারার এক বৃদ্ধ মন্দিরের চাতালের একধারে বসে চোখ বুজে জপ করছেন।

শুভদীপ ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো ভদ্রলোকের দিকে। সামনে এসে মৃদুস্বরে ডাকলো, "ঠাকুরমশাই", তারপর একটা বেশ বড়সড় চ্যাপ্টাকৃতি রূপোর লকেট সমেত চেন ভদ্রলোকের হাতে দিলো। অচেনা লোকের হাত থেকে জিনিসটি হাত নিয়ে অপলক চেয়ে আছেন হাতের পাতার মাঝখানে রাখা চেন লকেটটার দিকে। শুভদীপ লক্ষ্য করছে বৃদ্ধের মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন।


******


সন্ধ্যা নামছে, এবার বাড়ীতে ফিরতে হবে, সারাদিন খাওয়া দাওয়াও হয় নি। অনেক ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে শুভদীপ আজ। হাসপাতালেও যায় নি। ডাক্তার বাগচীর সাথে ডিউটি এক্সচেঞ্জ করে নিয়েছিলো কাল রাতেই, বাড়ীতে আসার আগেই। মনটা ঠিক ভালো নেই, বড্ড অস্থির এখনো। যথেষ্ট স্পিডেই গাড়ি চালাচ্ছে শুভদীপ। অদ্ভুত একটা দোলাচলের অনুভূতি। কালকের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা খুবই সাধারণ, বৈশিষ্ট্যহীন। চাকরি জীবনে এধরনের কেস কম আসে নি তার সামনে, অথচ কিছুতেই সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না ডাক্তার শুভদীপ দত্ত।

এতটাও দুর্বল চিত্তের মানুষ তো সে নয়, ডাক্তারদের দুর্বলচিত্ত হতে নেই! চাকরি করতে করতেই এম.এস.। তারপর এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল ঘুরে আপাতত শুভদীপ জলপাইগুড়ি জেলা সদর হাসপাতালে বদলি হয়ে এসেছে কয়েকমাস হোলো.


কাল যখন শুভদীপ হাসপাতালে ডিউটি চার্জ হ্যাণ্ড ওভার করছে, ঠিক সেই সময় কয়েকজন লোক একটি বীভৎসভাবে পোড়া মেয়েকে প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় নিয়ে এসেছিলো হাসপাতালে। ওরা জানায় রান্না করার সময় অগ্নিদগ্ধ হয়েছে মেয়েটি, ওরা প্রতিবেশী সব। বেরিয়ে চলে আসতে পারলো না শুভদীপ, এমার্জেন্সিতে আর একজনও সিনিয়র ডাক্তার নেই সেই মুহূর্তে। প্রাথমিক ভাবে দেখেই শুভদীপ বুঝতে পারে মেয়েটির গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে ওরা। প্রায় আশি শতাংশই পুড়ে গেছে, পুড়ে যাওয়া চামড়ার সাথে আটকে আছে সিন্থেটিক শাড়িটা। বীভৎস পোড়া সর্বাঙ্গ জুড়ে চড়া কেরোসিনের গন্ধ।


মেয়েটার স্ট্রেচারের পাশে জড়সড় কুঁকড়ে দাঁড়ানো বছর আট-নয়েকের ছেলেটা। ফ্যালফ্যালে চোখে, বোবা অসহায় দৃষ্টি। সব হারিয়ে ফেলার ভয়ে করুণ চোখদুটির কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো গরম নোনা জলের ধারা। সে জল মোছার কোনো তাগাদা ওর নেই। করুণ দুটি চোখ নীরব আর্তি জানাচ্ছিলো শুভদীপকে, "ডাক্তারবাবু, তুমি তো ভগবান, মা'কে বাঁচিয়ে দাও...!" তাকিয়ে থাকতে পারে নি ছেলেটার দিকে, চোখ সরিয়ে নিয়েছিলো শুভদীপ। শুভদীপ আর ক'জন জুনিয়র ডাক্তার মিলে মেয়েটিকে তৎক্ষণাৎ ও.টি.তে নিয়ে গিয়েছিলো।

সম্পূর্ণ জ্ঞান হারায় নি মেয়েটি তখনও, অসহ্য যন্ত্রণায় গোঁঙানির আওয়াজ বেরোচ্ছে একনাগাড়ে, চোখ দুটো আধ-বোজা। পোড়ার বীভৎসতা ভেতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিলো শুভদীপের মতো অভিজ্ঞ সার্জেনকেও। সিডেটিভ ইঞ্জেকশন পুশ করার মুহূর্তে মেয়েটি ওর পোড়া ঝুলে পড়া চামড়ায় আটকে থাকা রক্তাক্ত মাংসল হাতটা দিয়ে প্রাণপণে শুভদীপের হাতটা খামচে ধরে! যন্ত্রণায় তখন ওর চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে প্রায়। কঁকিয়ে উঠলো, "আমার ছেলে অমল, ডাক্তারবাবু...!" আর কিছু বলতে পারে নি, তারপরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে।


শুভদীপ বুঝেছিলো বাঁচানো প্রায় অসম্ভব, অবশ্য তাতে কারো কিছু যায় আসে না। পোড়া সমাজে এমন অভাগীদের কথা ভাববার সময় কারো নেই। শুধু দরজার ওপাশে চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আট-ন বছরের ছেলেটা... অমল সব হারাবে। হারিয়ে ফেলবে চিরকালের মতো শৈশব, কৈশোর, মায়ের কোল, মায়ের স্নেহ, মায়ের শাসন, মা বলে ডাকা, মায়ের কাছে আব্দার করা..... সব হারিয়ে ফেলবে, চিরতরে হারিয়ে ফেলবে ওর জীবনের অমূল্য রক্ষাকবচটা।

ঠিক যেমনটা একদিন শুভদীপ একলহমায় সব হারিয়ে ফেলেছিলো চিরতরে। অমলের মায়ের গলায় রূপোর চেনে আটকানো একটা বেশ বড়ো চ্যাপ্টা লকেট, তাতে খোদাই করা কিছু লেখা। আগুনের হল্কায় কালচে। পকেটে রেখেছিলো তখন শুভদীপ, কী লেখা আছে ওতে লেখা দেখার অদম্য কৌতূহলে। বাড়ী আসার পথে মনে পড়েছিলো। খুব ভালো করে ঘষে ঘষে ধুয়ে পরিষ্কার করেছিলো বাড়ী ফিরে স্নানের সময়। অবাক হয়েছিলো দেখে, একটা ঠিকানা লেখা, বাংলায়। হারিয়ে গেলে সন্ধানপ্রাপ্তির আশায় অনেকেই ছোট শিশুদের গলায় পরিয়ে রাখতো এমন লকেট।



অপারেশন শেষ করে শুভদীপ যখন বেরিয়েছিলো তখন বাইরের টানা বারান্দা শুনশান ফাঁকা। যারা ভর্তি করতে এসেছিলো তারা ঐ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব খালাস করেই কেটে পড়েছে প্রত্যাশামতোই। টানা বারান্দায় পাতা এক ফাঁকা বেঞ্চের এককোণায় বসে হাতলে মাথাটা কাত করে ঘুমিয়ে রয়েছে অমল, একলা। হাসপাতালের খাতায় লেখানো অমলের মায়ের নাম লতিকা। হয়তোবা অমল ভেবেছে, ডাক্তারবাবু আছে ঠিকই, তবু মা'কে একা রেখে গেলে যদি মা'কে একদম চিরকালের মতো নিয়ে চলে যায় মৃত্যুদূত!



শৈশবের শুভদীপের মা হারানোর যন্ত্রণা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিলো বেঞ্চে ঘুমিয়ে থাকা অমলের সাথে। বড্ড বেশী মিল, শুভদীপের মাও যে এমনি চীৎকার করেই বলেছিলো পোড়ার যন্ত্রণা সহ্য করে কঁকিয়ে উঠে, "আমার ছেলে শুভ... ডাক্তারবাবু...!" তারপর জ্ঞান হারিয়েছিলো। আর ফেরে নি সে জ্ঞান। অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা অমলকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে আসে শুভদীপ, নিঃশব্দে, সন্তর্পণে। মুখোমুখি হতে চায়নি শুভদীপ, কি উত্তর দেবে ওকে? "সব শেষ!" কী করে বলবে?



ঘড়ির কাঁটা অনেকক্ষণ বারোটার ঘর পেরিয়ে গেছে, শুভদীপ গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছিলো। নিজেকে মনে হয়েছিলো পরাজিত। শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষের সাথে ভয়ানক সেই অসম যুদ্ধের হেরে যাওয়া সেনাপতি, লুকিয়ে লুকিয়ে পালাচ্ছে। গাড়ি নিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগোচ্ছে ডাক্তার শুভদীপ দত্ত, বুঝতে পারছে না সামনের ঝাপসা হয়ে আসা রাস্তা কী পুরোটাই উইণ্ডস্ক্রিনের ওপরের বৃষ্টিকণাদের জন্য? নাকি অপরিচিত এক সদ্য মাতৃহারা শিশুর অনুভূতির বৃষ্টিকণাগুলো শুভদীপের চোখ ঝাপসা করে দিচ্ছে?


******


সন্ধ্যা নামছে দেখেই শুভদীপ উঠে পড়লো সেই নিরিবিলি কী এক অদ্ভুত নামের স্টেশনটার বেঞ্চ থেকে। আজ সারাদিন ধরে শুভদীপ যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে নিজের কাছ থেকেই। বাবা কালভৈরবের থান থেকেই গাড়ি নিয়ে এদিকে চলে এসেছিলো শুভদীপ, উদ্দেশ্যহীনভাবে, চেনা গণ্ডী থেকে দূরে। এসব দিকে ছোট স্টেশনগুলো ফাঁকাই পড়ে থাকে।

দিনান্তে হয়তো একখানা ট্রেন থামে! কোনো ব্যস্ততা নেই কোথাও, শুভদীপেরও আজ কোনো ব্যস্ততা নেই। আস্তে আস্তে গিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলো, চকিতে যেন ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো অমলের মায়ের ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাওয়া চোখজোড়া, অমলের চোখের আর্তি, তারপর গালে শুকনো জলের দাগ নিয়ে ঘুমন্ত অমলের মুখখানা। গাড়ি চালাতে শুরু করার আগে ফোনটা সুইচ অন করলো শুভদীপ। সঙ্গে সঙ্গে পিঁক পিঁক আওয়াজে ঢেউয়ের মতো মেসেজ ঢুকতে থাকলো।

চল্লিশটা মিসড্ কল, সবই দেবাঞ্জনার। সর্বনাশ, হয়তো পুলিশেও খবর দিয়ে ফেলেছে দেবী এতোক্ষণে।


মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে শুরু করেছে, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে দেবীর নাম্বার... ফোন করছে দেবী!


তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলো শুভদীপ, "হ্যাঁ, বলো..."


"বলো, মানেটা কি? কি শুরু করেছো বলো তো তুমি? সারাদিন কোথায় ছিলে? ফোন অফ করে রেখেছিলে কেন? আজ হাসপাতালে পর্যন্ত যাওনি! কোথায় কি করছিলে সারাদিন ধরে?" গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো দেবী। ধীরস্থির গলায় শুভদীপ বললো, "দুশ্চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি। বাড়ীতে পৌঁছচ্ছি অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই।"


"দুশ্চিন্তা কোরো না‌। মানেটা কি? সারাদিন তোমার ফোন অফ, বলেও যাও নি... সকালে ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম পাশে নেই, বারবার ফোন করেছি। হাসপাতাল থেকে শুরু করে পরিচিত সব জায়গায় খুঁজে বেরিয়েছি...... কোথাও নেই! আর তুমি বলছো, দুশ্চিন্তা কোরো না!" দেবীর গলায় তখনো ঝাঁঝ। স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললো শুভদীপ, "বাড়ীতে আসি, তারপর সামনাসামনি না হয় শুনবো তোমার সব অভিযোগ, গাড়ি চালাচ্ছি এখন।"


ফোনের ওপারে চেঁচিয়ে উঠলো দেবী, "না না, বাড়ি আসতে হবে না এখন, বাড়িতে তালা দেওয়া। তুমি বরং আগে থানায় চলে এসো। আমি ছেলেকে নিয়েই থানায় এসেছি, কয়েকটা সই করতে হবে তোমাকে। তাড়াতাড়ি এসো।"


ইস্, থানায় মিসিং ডাইরি করেছে দেবাঞ্জনা। এখন সই-সাবুদ করে তবে ছাড়া পাবে। অগত্যা গাড়ি নিয়ে থানার পথেই এগোলো শুভদীপ। থানার বাইরেটায় দাঁড়িয়ে আছে দেবী, দূর থেকেই দেখেছে শুভদীপ। গাড়ি পার্ক করে নেমে দাঁড়াতেই ছুটে এলো দেবী, "এতোক্ষণ লাগে আসতে? কোথায় গিয়েছিলে বলো তো?"

শুভদীপের উত্তরের অপেক্ষা না করেই দেবী এগিয়ে গিয়ে থানার বারান্দায় উঠে পড়েছে। দেবীকে অনুসরণ করে আসতে গিয়ে থানার বারান্দায় পাতা লম্বা বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেলো শুভদীপ, অমলের পাশে বসে ওদের ছেলে শুভাঞ্জন খেলছে, যেন কত চেনা। অমলের পরনে পরিষ্কার নতুন জামাপ্যান্ট। "আবার দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? চলো চলো, ভেতরে চলো, তুমি তো সাক্ষী, তাই প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে তোমার সইটাও লাগবে। তাই তো বললো বড়বাবু।"

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শুভদীপ, "কি বলছো দেবী? প্রত্যক্ষদর্শী, সাক্ষী, কিসের?" শুভদীপের কপালে ভাঁজ। অমল এখানে থানায় কেন? শুভাঞ্জনই বা ওর সাথে খেলছে কী করে? অচেনা কারুর সঙ্গে তো কোনো কথাই তো বলে না শুভাঞ্জন! তবে?


"দেবী, এসব কী? ঐ ছেলেটা, ঐ যে, অমলের কাছে শুভাঞ্জনকে বসিয়ে রেখেছো, ব্যাপার কী বলো তো?" রাগত স্বরে বেশ জোরেই বললো শুভদীপ। "আহা হা! ডাক্তারবাবু, রাগ করছেন কেন? আপনার স্ত্রীই তো রিপোর্ট লিখিয়েছেন, অমল নামের ছেলেটাকে দিয়ে। ওর মা নাকি কাল আপনার আণ্ডারে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো, বার্ণ কেসে!" বললো থানার বড়বাবু।



"তাতে কি? এরকম কয়েকশো পেশেন্ট প্রতিদিন আমার আণ্ডারে অ্যাডমিশন নেয়," উচ্চৈঃস্বরে বললো শুভদীপ। "ডাক্তারবাবু, শান্ত হোন। ঐযে ছেলেটা... অমল, ওর মাকেই তো কাল পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো! তাইই তো শুনলাম, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছেলের মুখে। আর ডাক্তারবাবুর সাক্ষ্য লাগবে না? অমলের দাদুকেও তো সকালে আপনি নিজেই গিয়ে খবর দিয়েছেন, এই লকেটটা দিয়ে", শান্ত গলায় কথাগুলো বললো বড়বাবু। বড়বাবুর হাতে চেনসমেত লকেটটা। এতোক্ষণ খেয়াল করে নি শুভদীপ, বারান্দায় বেঞ্চের এককোণায় মাথায় হাত দিয়ে বসে কালভৈরব মন্দিরের সেবাইত বৃদ্ধও।


******


থানার কাজকর্ম মিটিয়ে শুভদীপ গাড়িতে গিয়ে স্টার্ট দিয়েছে, আর দেবাঞ্জনার পাশে হাত ধরাধরি করে হেঁটে আসছে শুভাঞ্জন আর অমল। শুভদীপ দেখলো, দেবাঞ্জনাকে হাত জোড় করে কিছু বলে চোখ মুছলো অমলের দাদু। তারপর একবেলায় ঝড়ে বিধ্বস্ত গাছের মতো, অমলের দাদু ক্লান্ত পায়ে আবার থানার বারান্দায় গিয়ে বসলো।

পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মেয়ের দেহটার সৎকার করতে হবে যে। তারই তো দায়িত্ব, নাতিটা যে বড্ডই ছোট। আর একবার সেই শয়তানটার মুখোমুখি হতে চায় বৃদ্ধ, যার হাতে ভরসা করে একমাত্র মেয়েটাকে সম্প্রদান করেছিলো। অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে মেয়েটাকে প্রাণে বাঁচতেই দিলো না? ডাক্তারবাবুর স্ত্রীকে থানার বড়বাবু কথা দিয়েছে, "ঐ ক্রিমিনালটাকে ঠিক ধরে ফেলবো দিদি, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।"


শুভদীপ ভাবছে, কী ধাতুতে গড়া দেবাঞ্জনা? কে নেয় আজকালকার দিনে এমন পরের ঝঞ্ঝাট কাঁধে? গাড়ির পেছনের সিটে শুভাঞ্জন আর অমলকে বসিয়ে দরজা লক করে দিয়ে দেবাঞ্জনা এসে শুভদীপের পাশে বসলো। গাড়ি গড়াতে শুরু করতেই গাড়ির পেছনের সিট থেকে কলকল করে দুই কচি কন্ঠের কত গল্প!

শুভদীপ আর দেবাঞ্জনা আড়চোখে দু'জনেই দু'জনকে দেখে নিলো। মন ওদের তখন বোধহয় অনেককাল পেছনে। বৃষ্টিঝরা একরাতে দেবাঞ্জনার বাবা ডাক্তার দেবাশীষ মিত্রর হাত ধরে আট-ন বছরের শুভদীপ কাঁদতে কাঁদতে এসে দেবাঞ্জনাদের ঘরে ঢুকেছিলো। শুভদীপের মা অগ্নিদগ্ধ হয়ে সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো, ডাক্তার দেবাশীষ মিত্রর আণ্ডারে। বাঁচানো যায় নি।


ছ-সাত বছরের দেবাঞ্জনা সব শুনে বিজ্ঞের মতো বলেছিলো, "আমার মাও মারা গেছে অনেকদিন, তাই বলে আমি কী কাঁদি সবসময়? আমার বাবা আছে তো! আচ্ছা ঠিক আছে, আমার বাবাকেই আমরা দু'জনে মিলে ভাগ করে নেবো।" শুভদীপ কালক্রমে ডাক্তার শুভদীপ দত্ত হয়েছে। দেবাঞ্জনা সবকিছু কতো সুন্দর করে সামলাতে পারে, সেই ছোট্টবেলা থেকেই। দেবাঞ্জনাকে শুভদীপ খুব ভালো করে চেনে। জলের মতো পরিষ্কার এখন শুভদীপের কাছে সবকিছু, কীভাবে সব সামলালো দেবাঞ্জনা! সত্যিই দেবাঞ্জনার ঋণ শোধ হবার নয় শুভদীপের এজীবনে।


স্টিয়ারিঙের ওপরে শুভদীপের হাতে হাত রেখে মৃদু চাপ দিয়ে দেবাঞ্জনা বললো, "শুভাঞ্জনও শিখুক নিজের পাপাই-মাম্মাকে ভাগ করে নিতে।" শুভদীপ দেবাঞ্জনার হাতে পাল্টা চাপ দিতে যাচ্ছিলো, দেবাঞ্জনা চেঁচিয়ে উঠলো, "সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাও।" সামনে তখন করলা নদীর ঝোলনা ব্রীজ। শেষ শ্রাবণেও সেদিন পরিষ্কার আকাশ, ত্রয়োদশীর চাঁদের আলো আর করলা নদীর জলে মৃদুস্রোতের কলতান ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন মা'হারাদের চোখের জল নিজেদের সাথে।


জলপাইগুড়ি শহরের উদ্ভাসিত আকাশ মিশেছে অসাধারণ উজ্জ্বলতায় মাতৃত্বের আকাশের সাথে, মানবিকতার সাক্ষ্যে!


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational