Agniswar Sarkar

Tragedy Classics


2  

Agniswar Sarkar

Tragedy Classics


ক্ষত

ক্ষত

8 mins 784 8 mins 784

মোবাইলের রিংটোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো দীপার । এই অসময়ে কে যে ফোন করে ? শরীরটাও ভালো নেই । প্রেগনেন্সির আর্লি স্টেজ । আজ স্কুল ছুটি নিয়েছে । দুপুরে অচেনা লোকেদের ফোন করা ছাড়া এদের কি কোনও কাজ থাকেনা ? গিয়ে ধরে দেখব হয় মোবাইলের কোম্পানির অফার না হয় কোনও ইনস্যুরেন্স কোম্পানির । আজ ফোনটা কাছে নিয়ে শোয়া হয়নি । পাশের ঘরে অক্লান্ত ভাবে যান্ত্রিক চিৎকার করে চলেছে ফোনটা । একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোনটা ধরতে গেল দীপা । অচেনা নম্বর । এটাই স্বাভাবিক ।

- হ্যালো । বিরক্তিমাখা গলাতে বলল দীপা ।

- সুদীপ্তা ?

- কে বলছেন ? অনেকদিন বাদে নিজের পুরো নাম শুনে 

দীপার গলাটা খানিকটা বিচ্ছিন্ন । বিস্মিত ।

- আমি তাপস । চিনতে পারছিস না ?

মাথাটা কেমন ঘুরে গেল দীপার । মুখ থেকে অস্ফুটে বেড়িয়ে গেল , তাপসদা ?

- হ্যাঁ । কেমন আছিস ?

- ভালো আছি । তুমি কেমন আছো ? আমার নম্বর পেলে কীভাবে ?

- ওই চলছে । তুই এই সময়ে বাড়িতে ? তুই একটা স্কুলে চাকরি করতিস না ? শরীর ঠিক আছে তো ?

- হ্যাঁ । ওই আর কি । আসলে অয়ন জোর করল । বলেই চুপ করে গেল দীপা । কেন এসব বলছে দীপা ? সংসারের কথা বাইরের কারোর সামনে না বলাই ভালো ।

- অয়ন ? তোর বর ?

- হ্যাঁ । বলো ফোন করেছ কেন ? আসলে ফোনটা এখন অসহ্য লাগছে দীপার কাছে ।

- তুই বোধ হয় ব্যস্ত । ঠিক আছে পরে কথা বলব । ভালো থাকিস সুদীপ্তা । বলেই ফোনটা কেটে দিল তাপস ।

ফোনটা নিয়েই ঘরে ঢুকলো দীপা । ঢুকেই এ.সি টা কমিয়ে দিয়ে গা টা এলিয়ে দিল বিছানার উপর । অসহ্য লাগছে । মাথার সব শিরার রক্ত চলাচলের মাত্রা বেড়ে গেছে । ফোনটা না ধরলেই ভালো হত । কিন্তু এখন আর কিচ্ছুটি করার নেই । চোখটা বন্ধ করতেই সেই অসহায় দিনটা , সেই অসহায় মুহূর্তগুলো ভিড় করে আসে মাথার ভিতর । উস্কে উঠলো ভিক্টোরিয়ার গেটের সেই শেষ বিকেলের স্মৃতিটা । রাত আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল দীপা । তাপসদা আসেনি । একই পাড়াতে বাড়ি ছিল দুজনের । রাজনৈতিক নেতা ছিল তাপসদা । পাড়ার সকলের দাদা । শুধু দীপার উঠতি প্রেমিক । দুজনের মধ্যে ভালোবাসাটা ছিল কিনা জানা নেই , তবে মাখো মাখো প্রেমটা ছিল । সেদিন তাপসদারই অপেক্ষা করার কথা ছিল ভিক্টোরিয়ার গেটে । ঠিক চারটের সময় । দীপার কলেজ ফিরতি পথে একান্তে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর কথা ছিল । কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রিপ্ল্যান্ড স্ক্রিপ্টটা ঠিকঠাক এক্সিকিউট হয়নি । তাপসদা আসেনি । ফোনও বন্ধ । চোখের কোলে একরাশ জলের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল দীপা । সারারাত ধরে মাথার বালিশটা অবগাহন করেছিল সেই বাঁধভাঙা জলরাশিতে । পরেরদিন সকালে একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে তাপসদার বাড়ি গিয়েছিল সুদীপ্তা । পুরানো একটা তালা ঝুলছিল সদর দরজায় । সেই তালা আর কোনোদিনও খোলা হয়নি । ঠিক ওই একই রকম একটা তালাও ঝুলে গিয়েছিল সুদীপ্তার মনে । ওই ঘটনার পর ব্লাড প্রেসার ফল করেছিল দীপার । কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি থেকে আকুল চোখ চলে গিয়েছিল তাপসদার বাড়ির দরজায় । শুধু একটু লালচে হয়েছে তালাটা । দেখতে দেখতে দরজার সামনে আগাছা জন্মালো । বাড়ির ভিতরেরও হয়তো একই অবস্থা । কলেজে আসা যাওয়ার পথে দীপার চোখ বাড়িটাকে পাহারা দিয়ে যেত । ফোনটাও আর অন হয়নি কোনোদিন । তাপসদার বাড়ির তালাটার মতো দীপার মনের তালাটাতেও মরচে পড়ছিল । একদিন অয়ন এসে তালাটাকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল । অয়নের বাড়ি শিলিগুড়িতে । যাদবপুরে মাস্টার ডিগ্রি করতে গিয়ে পরিচয় । অয়নের বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটো আকৃষ্ট করেছিল দীপাকে । হয়তো ওই চোখের চাহনিতেই সেই তালাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল । অয়ন একদিন দীপাকে নিয়ে ভিক্টোরিয়াতে গিয়েছিল । অয়নের হাতটা চেপে ধরে তাপসদার কথাগুলো বলেছিল দীপা ।

আচমকা মোবাইলের বাজনায় চিন্তাগুলো ভাঙা কাঁচের মতো ছড়িয়ে গেল ঘরের চারদিকে । মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ‘তপতী স্কুল’ ।

- বলো দি ।

- ঘুমচ্ছিলিস ? না বরের আদর খাচ্ছিলিস ? বলেই হাসতে লাগলো তপতীদি ।

- না গো । সে ভাগ্য আর কোথায় । তিনি এখন অফিসে । দুপুরে খাওয়ার পর চোখটা একটু লেগে এসেছিল ।

- এই সময় একটু ক্লান্তি হবে । হ্যাঁ , তোকে যেটা জিজ্ঞেস করার জন্য ফোন করেছিলাম । তুইতো জানিস আজ নতুন এইচ.এম জয়েন করলেন । কাল সবাইকে আসার জন্য বলেছেন । মানিকদার কাছ থেকে সকলের ফোন নম্বর নিয়ে উনি নিজেই সবাইকে ফোন করছিলেন । তোকে ফোন করেন নি ?

- না তো দিদি । আর এমনিতেই আমি কাল যাবো । এখন বেকার ছুটিগুলো নষ্ট করবো না । পরে তো লাগবে ছুটিগুলো । আর কাল শনিবার । কাল কামাই করার কোনও মানেই হয়না । হাফডে ।

- ঠিকই বলেছিস । জানিস উনি খুব জলি । কাল ফোরথ পিরিয়ডের পর সকলকে খাওয়াবেন বলেছেন । সঙ্গে পরিচয়টাও সেরে নেবন বোধ হয় । মনে হয় আমরা একজন ভালো এইচ.এম পেলাম ।

- আচ্ছা ।

- চল কাল দেখা হচ্ছে । বাই ।

- বাই দি ।

বলেই লাইনটা কেটে দিল দীপা । বাইরের আলোটা পড়ে আসছে । এবার শুলে গা টা ম্যাজম্যাজ করবে । তাছাড়াও অয়নের আসার সময়ও হয়ে এসেছে । এ.সি টা অফ করে ব্যালকনির চেয়ারটাতে বসল । পড়ন্ত বিকেল দীপার খুব ভালো লাগে । ব্যালকনি থেকে আকাশটা খুব ভালো দেখা যায় । এই সময় আকাশ নানা রঙ নিয়ে খেলে । গোধূলির আকাশটার দিকে চেয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা ………’ গানটা গুনগুন করতে লাগলো । গানটা শেষ হতেই পিঠের ওপর হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল দীপা । চেনা হাতের স্পর্শ ।

- তুমি কখন ফিরলে গো ?

- এই তো ।

- আমাকে ডাকলে না ?

- ডাকলে তোমার গানটা শোনা হত না ।

- ধ্যাত । যাও , তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এসো । আমি চা চাপাই ।

- তোমাকে কোথাও যেতে হবে না । আজ থেকে আমিই চা করব ।

- তা আবার হয় নাকি ? তাছাড়া তুমি তো চা করতেই পারো না মশাই ।

- আমি সারা বাজার খুঁজে তোমার পছন্দের মকাইবাড়ির টি ব্যাগ এনেছি । তুমি এখানে চুপ করে বোসো । একদম উঠবে না । উঠলেই আমি কিন্তু খুব বকবো ।

চোখে কপট রাগ দেখিয়ে অয়ন বাথরুমে ঢুকলো । কিছুক্ষন বাদে একটা পাজামা পরে দুকাপ গরম জল আর টি ব্যাগের প্যাকেট নিয়ে বউয়ের পাশের চেয়ারটাতে বসল ।

- তুমি আর একটা গান গাও দীপা । আজ তোমার গলার গান আর সঙ্**************

 

পরেরদিন সকালে অয়ন দীপাকে স্কুলে নামিয়ে অফিসে চলে গেল । স্কুলের লন পেরিয়ে দীপা গিয়ে ঢুকলো হেডমাষ্টারের ঘরে । তিনি এখনও আসেন নি । আজ দীপাই একটু আগে চলে এসেছে । আসলে অয়নই বলল একটু আগে করে বেরোতে । আসতে গাড়ি চালাবে । অয়ন দীপাকে খুব ভালবাসে । দীপা খুব সুখী অয়নকে পেয়ে । আর তাপসদা ? স্বার্থপর । একদিন দীপাকে ফেলে দিয়ে যেতেও কুণ্ঠা বোধ করেনি । দূর , কীসব উলটোপালটা ভাবছে । অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করে স্টাফরুমে গিয়ে বসল । একটু বাদে স্কুলের অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে তপতীদিও এলো ।

- তুই কখন এলি দীপা ?

- এইতো ।

- শরীর ঠিক আছে ?

- হ্যাঁ দি ।

- চল । আস্তে আস্তে ওঠ । এবার প্রেয়ারের সময় হয়ে এলো ।

প্রেয়ারে গিয়ে নতুন এইচ.এমের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো দীপা । এ কীভাবে সম্ভব ?

ফিসফিসিয়ে তপতীদিকে জিজ্ঞেস করল ,

- দি উনি কে ?

- আরে উনিই তো আমাদের নতুন এইচ.এম ।

- কী নাম ওনার ?

- তুই অ্যাটেন্ডেন্স খাতায় সই করতে গিয়ে দেখিস নি ? সুদীপ্ত বটব্যাল ।

মাথাটা ঘুরতে লাগলো দীপার । কোনোমতে প্রেয়ার পর্ব সেরে স্টাফরুমের চেয়ারে এসে বসে পড়ল । একই দেখতে মানুষ কীভাবে সম্ভব ? মাথা কাজ করছে না দীপার ।

- ম্যাডাম , হেড স্যার ডাকছে আপনাকে । আপনি ভুল করে অ্যাটেন্ডেন্স খাতায় গতকালের ঘরে সই করে এসেছেন ।

- তুমি চলো । আমি যাচ্ছি ।

বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পিওনের পথ অনুসরণ করে প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের ঘরের সামনে এসে হাজির হল সুদীপ্তা । ঘরে প্রধান শিক্ষক ছাড়া আর কেউ নেই । কাঁপা গলায় বলল ,

- স্যার আসবো ।

- আসুন ।

একই গলা । একই চেহারা । ঘরে ঢুকে নার্ভের উপর কন্ট্রোল করে কোনও মতে স্যারের চেয়ারের সামনে বসল সুদীপ্তা ।

- বলুন স্যার ।

- আপনি কালকের ঘরে সই করেছেন । আমি কেটে ঠিক করে দিয়েছি । আপনি আজকের ঘরে সই করে দিন ।

দীপার মুখ থেকে অস্ফুটে বেড়িয়ে এলো ,

- আপনি কে ? আপনি কি তাপসদা ?

উত্তরটা আর পাওয়া হল না । দুজন সহ শিক্ষক ঘরে এলেন ।

সারাদিন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে গেল দীপার । দুপুরে কোনোরকমে খেয়ে নিয়েই একটা টোটো নিয়ে বাড়ি ফিরল । ফিরেই এ.সি টা অন করে স্কুলের কাপড়েই শুয়ে পড়ল দীপা । মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে । এ কীভাবে সম্ভব ? ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে কালকের সেই নম্বরটাতে ডায়াল করল । রিং হচ্ছে ।

- হ্যালো ।

- সুদীপ্তা বল ।

- তুমি কোথায় তাপসদা ? কী করছ এখন ? আমার নম্বর পেলে কীভাবে ?

- আজ সারাদিনই আমরা একই স্কুলে কাটালাম । চিনতে পারিস নি বুঝি ? অনেক দিনও হয়ে গেল ।

- তুমি কে প্লিজ বলো । বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল দীপা ।

- তোর হাতে সময় আছে ?

- আছে একটু ।

- সেদিন আমি তোর সাথে দেখা করতে ভিক্টোরিয়া যাচ্ছিলাম । পথে অপজিশানের কিছু মেম্বার আমাকে কিডন্যাপ করল । কয়েকদিন অকথ্য অত্যাচার করল আমার উপর । সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত । সঙ্গে মনটাও । একদিন আমি কোনোক্রমে ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বিহার চলে যাই । মা র কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি । হয়তো মেরে ফেলেছে ওরা । ওখানে গিয়ে প্রায় এক বছর আত্মগোপন করেছিলাম । একটু ঠাণ্ডা হলে ফিরে আসি । মার খোঁজ করি । জানিস , রোজ তোর খোঁজ যেতাম ফেলে আসা সেই ভিক্টোরিয়ার গেটে । জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এস.এস.সি তে কোয়ালিফাই করতেই হত । পোস্টিং নিই বাঁকুড়া জেলার প্রত্যন্ত একটা স্কুলে । তারপর এইচ.এমের পরীক্ষা কোয়ালিফাই করে এখানে । এসে খাতায় তোর নামটা দেখি । একটা চান্স নি । দেখি তুই ।

দীপার গাল বেয়ে অজানা নদী অবিরাম প্রবাহিত হয়ে চলছে ।

- কিন্তু সুদীপ্ত বটব্যাল ?

- আসলে পাড়ার দাদা হলে যা হয় । দাদাগিরির আড়ালে পোশাকি নামটা চাপা পড়ে যায় । কেউ কোনোদিন বাবা-মা র দেওয়া নামটা জানতে চায়নি । তুইও না । সবার কাছে আমি ছিলাম তাপসদা । বাংলায় আলাদা হলেও ইংরাজিতে তোকে আর আমাকে কোনওদিন কেউ আলাদা করতে পারবে না । এটা যেন ললাটের লিখন ।

সুদীপ্তার হাত থেকে ফোনটা বিছানাতে পড়ে গেল । ওদিকে সুদীপ্ত হ্যালো হ্যালো করতে করতে চুপ করে গেল ।

তবে কি স্কুলের বাকী বছরগুলো সুদীপ্তাকে সুদীপ্তর ক্ষতটা নিয়ে কাটাতে হবে ?


Rate this content
Log in

More bengali story from Agniswar Sarkar

Similar bengali story from Tragedy