STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Horror Crime Thriller

3  

Nityananda Banerjee

Horror Crime Thriller

কাপালিক পর্ব বাইশ

কাপালিক পর্ব বাইশ

4 mins
109

দ্বাবিংশ পর্ব


স্বর্গত রামচরণ ভট্টাচার্য্যের আত্মা দিক-বিদিক শুন্য হয়ে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তাঁকে মরতে হল । সেদিন যদি তান্ত্রিকের কথায় শিব স্থাপন না করতেন তবে এমন দশা হত না । কিন্তু পূণ্য কাজে না বলতে নেই - অধর্ম হয়, সেই ভয়ে তিনি মায়ের পাশে বাবাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । 

তান্ত্রিক বলেছিলেন - ওহে ঠাকুর ! জন্মার্জিত পূণ্য ফলে এই সুযোগ তুমি পেলে । আমি দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি তোমার উপরে যাবার সময় আসন্ন । এমন একটি পূণ্য কর্ম দ্বারা তুমি যে বড়ই সুফল লাভ করবে - বলাই বাহুল্য।

রামচরণ ভেবে দেখলেন তান্ত্রিক তো কোন ভুল কথা বলছেন না । কোন অন্যায় কর্মও করতে বলছেন না । সুতরাং তিনি সম্মত হয়ে তান্ত্রিকের কথামত মহাকাল প্রতিষ্ঠা করলেন । 

অমনই গুহাময় শোরগোলে ভরে উঠল । রামচরণ দেখলেন নন্দী ভৃঙ্গী এবং অসংখ্য প্রেতাত্মার দল গুহামধ্যে কলরব করছে । বাবা অর্থাৎ মহাটাল চক্ষু বুঁজে ধ্যানে মগ্ন । সেই মুহুর্তে রামচরণের মনে হল হর-পার্বতী প্রেমালাপে মত্ত । সমগ্র কৈলাস যেন একসঙ্গে উঠে এসেছে গুহার মধ্যে । উজ্জ্বল চন্দ্রাতপে হর-পার্বতী কথোপকথনে ব্যস্ত। নন্দী ভৃঙ্গীর দল বটগাছে বসে গঞ্জিকা সেবন করছে - আর বাকি প্রেতাত্মারা তান্ত্রিককে ঘিরে মুক্তি পেতে কাতর আর্তনাদ করছে ।

রামচরণের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেল । তিনিও সেই প্রেতাত্মার দলে ভিড়ে তান্ত্রিকের পদার্চনা করতে লাগলেন । তান্ত্রিক তাঁকে বললেন - এই মুক্তির জন্য সকলে যে উদ্গ্রীব তা তো দেখতেই পাচ্ছ ভটচাজ ঠাকুর । তুমিও কি মুক্তি চাও নাকি তোমার নপুংসক পৌত্রের সন্তান রূপে পুনরায় পৃথিবীতে আসতে চাও ?

রামচরণ তখন আর রামচরণে নেই । মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফূট স্বর ' দুটোই ' ।

তান্ত্রিক গম্ভীর হয়ে পড়লেন । নিমেষে গুহার ভিতর ঘন অন্ধকারে ঢাকা পড়ল । রামচরণ ভূপাতিত হয়ে সংজ্ঞাহীন হলেন । সেই সংজ্ঞা আর ফিরে এল না । তাঁর প্রাণবায়ু দিগন্তে বিলীন হয়ে গেল ।

সন্ন্যাসী ধ্যানে বসলেন । সম্মুখে মৃত রামচরণের পার্থিব দেহ । 

রামচরণের বাড়ির লোকজন অধিক রাত্রে শ্মশানে তাঁর খোঁজে এল । রামচরণের পিতৃমাতৃহীন পৌত্র শ্রীমান জগন্নাথ ভট্টাচার্য্য ' দাদু দাদু ' বলে কেঁদে উঠল । সন্ন্যাসীর অনুমতি ব্যতীত গুহায় প্রবেশ নিষেধ - তখনও পর্য্যন্ত গ্রামের লোকজন তা' জানে না । পূর্বে অতি সহজে মন্দিরে আসতে যেতে পারত । এখন সেই মন্দির গুহার মধ্যে চলে গেছে । 

তান্ত্রিক তথা সন্ন্যাসী তারানাথ জগন্নাথের কান্না শুনতে পেয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন । লোকজন প্রশ্ন করার পূর্বেই বলে উঠলেন - রামচরণ স্বেচ্ছায় শিব কল্পলোকে গমন করেছেন । অন্দরে যাও তাঁর দর্শণ করে এস ।

কেউ ভেতরে যেতে রাজী হল না । শুধু পঞ্চানন এবং জগন্নাথ ভেতরে গেল । তান্ত্রিক বললেন - বড় পূণ্যবান ছিলেন ভট্টাচার্য্য ঠাকুর । এমন ধারার মৃত্যু সচরাচর কারও হয় না ।

জগন্নাথ ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল - সন্ন্যাসী ঠাকুর ! দাদুকে তুমিই মেরে ফেলেছ । একটা সুস্থ মানুষ মন্দিরে এল নিত্যকর্ম করতে আর অমনি সে মরে গেল ? 

তান্ত্রিক সর্বজ্ঞ । তিনি জানেন রামচরণের ইহলীলা কেন সাঙ্গ হল । এও জানেন এই হঠাৎ মৃত্যুর জন্য সকলেই এই বালকের মত তাঁকেই দায়ী করবে । প্রয়োজনে আইন আদালতেও যেতে পারে ।শান্ত কন্ঠে বললেন - বেটা ! তোর যদি তেমনই মনে হয়; তবে এই নে খড়্গ, আমার শিরশ্ছেদ করে দে ।

পঞ্চাননকে বললেন - এই আমি পড়ে রইলাম ; আমার হাত পা বেঁধে হাঁড়িকাঠে গলা ঢুকিয়ে দে । জগন্নাথ স্বয়ং আমার শিরশ্ছেদ করুক ।

সন্ন্যাসী যূপকাষ্ঠে গলা দিলেন । জগন্নাথের হাতে তরবারি । জয় মা বলে জগন্নাথ সেই খড়্গ অনায়াসে আকাশে উঠিয়ে দিল । অমনি রামচরণ বলে উঠলেন - তুমি কোন পাপ কর না দাদুভাই ! আমার পরমায়ু শেষ হয়েছে বলে শ্রীধামে চলে এসেছি । তোমরা এক্ষণে এই পার্থিব দেহের সৎকার করলে আমি খুশি হই ।

খড়্গ জগন্নাথের হাত থেকে নীচে পড়ে গেল । তান্ত্রিক ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বললেন - অর্বাচীন বালক ! ভূমিতে খড়্গ ফেলে ঘোর অন্যায় করেছিস ! এর শাস্তি কি জানিস?

পাঁচু জগন্নাথকে আড়াল করে বলল - ক্ষমা করে দেন বাবা । ছেলেমানুষ । অত বোঝেনি ।

- সেই জন্যই ক্ষমা করে দিলাম । তবে এই খড়্গের আর কোনরূপ খড়্গত্ব রইল না । অতএব আজ থেকে এই মন্দিরে পশুবলি নিষিদ্ধ করে দিলাম । এখন থেকে বৈষ্ণব মতে মায়ের পূজার্চনা হবে ।

পাঁচু বা জগন্নাথ ওসব ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব মতের কিছু বুঝে না । বলল - মানে ?

- হুমম্ এখানে আর পাঁঠা বলি দেওয়া যাবে না । বাবা বা মায়েরও তাই ইচ্ছে । নে এবার তোরা রামচরণের দেহ দাহ করবার ব্যবস্থা কর । শ্মশানের দক্ষিণ প্রান্তে চিতা সাজাবি । ঠিক মায়ের সম্মুখে । তবে ঠাকুর মশাই শান্তি পাবেন।

তিনি পঞ্চানন ও জগন্নাথকে গুহার বাইরে এনে দাহকার্য্যের সুবন্দোবস্ত করে দিলেন । 

সেই থেকে নিয়ম করে রামচরণের আত্মা গর্ভগৃহে আসে মুক্তির খোঁজে । তান্ত্রিক অসন্তুষ্ট হন না । রামচরণ পূণ্যবান সচ্চরিত্রের নির্লোভ মানুষ ছিলেন । তাঁর পুত্র কৃষ্ণচরণ শ্মশান মন্দিরের অলৌকিকত্ব ভাঙিয়ে প্রচুর ধনসম্পদ করেছিল । নিয়তির করাল নিয়মে সস্ত্রীক অকালপ্রয়াণ হয় তাদের । তার আর এক ভাই হরিচরণও লোভের বশবর্তী হয়ে মন্দিরের সুনাম ভাঙিয়ে বেশ রোজগার করেছিল । ফলস্বরূপ মিনু কাকিমাও বিধবা হন । শুধু তাই নয় ; কৃষ্ণচরণের পুত্র জগন্নাথের মধ্যে বংশ বিস্তারের কোন সক্ষমতা ছিল না ।

তন্ত্র যোগে সন্ন্যাসী রামচরণের সাংসারিক ইতিবৃত্ত জ্ঞাত হয়ে কিছু একটা করবার প্রচেষ্টায় ছিলেন । বাগদী বউয়ের উদরের সন্তান জগন্নাথকে উপহার দিয়ে পরম্পরা রক্ষণে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

( চলবে )



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Horror