Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Jay Adhikari

Romance Tragedy Classics


2  

Jay Adhikari

Romance Tragedy Classics


জলছবি

জলছবি

93 mins 314 93 mins 314


সময় এখন রাত দুটো। একের পর এক গাড়ি হুসহুস করে, কোনোরকম শব্দ ছাড়াই তীব্র গতিতে ভেসে চলেছে মায়াবী রাতের আলোতে রাজপথ ধরে, একদিক থেকে আরেকদিকে। এই শহর, স্বপ্নের শহর; রাতেও না ঘুমিয়ে জেগেই থাকে এই শহর, জানিনা কিসের অপেক্ষায়। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের সেভেন্টি ফোর্থ স্ট্রিট আর থার্টি ফোর্থ এভিনিউ এর এইজায়গাটা সবাই চেনে লিটিল ইন্ডিয়া নামে। এখানে একইসাথে ভারতীয় , বাংলাদেশি পাকিস্তানী মানুষ বসবাস করে। দেড়লাখ লোকজনের মধ্যে , প্রায় পঁচিশহাজার মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশের। প্রায় আটমাস হয়ে গেলো আমার এই দেশে। একসময়ে যে ঘোর ছিল দু চোখে , যে স্বপ্ন ছিল বাইরের দেশে এসে কাজ করে ডলার কামানোর , আজ সেই মোহ ভঙ্গ হয়েছে। এই বিদেশে দূর পরবাসে প্রায়ই মনে পড়ে আটহাজার দূরের বাড়ির কথা। সেখানে হয়তো অভাববোধ ছিল, হয়তো ছিল রোজকার বাসে ধাক্কাধাক্কি, ঘামে ভেজা জামার গন্ধ , বৃষ্টিতে জমা জলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা ; তবুও মনে ছিল শান্তি, ঘরে ছিল ইরা , ছিল স্বর্গসুখ। এখানে, আমি যদি মরেও পড়ে থাকি তবুও হয়তো কেউ জানতে পারবে না ; যখন পচা গলা দেহ থেকে গন্ধ বেরোতে শুরু করবে, তখন ঘরের দরজা ভেঙে সবাই এসে দেখবে আমার মৃতদেহ। কারোর সাথে নেই কোনো আত্মীয়তা, নেই কোনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সবাই এখানে চেনে টাকা , না মানে ডলার ! সব কিছু কাজ হয়ে যাবে ঠিক সময়ে, ফেলে দাও শুধু একগুচ্ছ ডলার। এটাই কি বড়ো শহরে থাকার উপকারিতা ? শুধুই ছুটে বেড়াও, সকালে উঠে গেলো ওটস বা কর্নফ্লেক্স , দুপুরে গেলো বার্গার জাতীয় কিছু , রাতে খাও বিভিন্ন রকমের ব্রেড বা রোস্টেড মাংস আর সুপ ! এই এতো বড়ো এপার্টমেন্টে প্রায় ষাটখানা পরিবার থাকে , কেউ কারোর নাম জানিনা আমরা। দেখা হলে শুধু হাই হ্যালো ! এখন আমার ফিরে যাওয়ারও নেই উপায়, প্রোজেক্ট যতদিন চলবে আমাকেও থেকে সবকিছু ম্যানেজ করতে হবে , মাঝপথে চলে গেলে অনেক ফাইন দিতে হবে আমাকে। হ্যাঁ , যদি আমার কোম্পানি আমাকে জোর করে বের করে দেয় , সেটা আলাদা ব্যাপার।    


আসার সময়ে চেয়েছিলাম ইরা আসুক আমার সাথে। কিন্তু ওর নিজেরও চাকরি আছে ওখানে, আর আছে ওর বয়স্ক মা,বাবা। একমাত্র মেয়ে হিসেবে ওর কর্তব্য কিছু থেকেই যায় ! বাধ্য হয়ে আমি একা চলে এসেছি এখানে। আমার কনট্র্যাক্ট অনুযায়ী , আমাকে আরো চোদ্দ মাস থাকতে হবে এখানে, মানে পাক্কা দু বছর, মাঝে আমি ছুটি নিয়ে কিছুদিন ঘুরে আসতেই পারি, তবে আমি চেষ্টা করছি ছুটি না নিয়ে যদি প্রোজেক্টটা সময়ের আগে শেষ করে ফিরে যাওয়া যায় ইরার বুকে, ফিরে যাওয়া যায় জং ধরে যাওয়া, নোনা গন্ধের পুরোনো প্রাচীন শহরে , আমার দেশে। মাঝে মাঝে যখন ভীষণ একা লাগে, মনে হয় নারীসঙ্গ পেতে, ইরাকে ফোন করি। সময়ের পার্থক্যের জন্য ও তখন অফিসে , তাই ফোনে ফোনে প্রেমটাও আর করা হয় না। 


ঠিকই ধরেছেন, আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলানোর পরেও, এখন আর পারছি না। আমার কাউকে চাই, কারোর সঙ্গ ! আমি কি প্রেম করবো আবার ? একবার ইরাকে বলেছিলাম ফোনে ! ও হাসতে হাসতে বলেছিলো , তাই করো ! চারমাস আগে, অফিসের এক কলিগের ব্যাচেলর্স পার্টিতে দেখা আমার ডেসির সাথে। একটা জনপ্রিয় এসকর্ট সার্ভিসের হয়ে কাজ করে ও। কি কারণে জানিনা, ডেসির আমাকে দেখে ভালো লেগে যায় , আমার চোখের মধ্যে বোধহয় পড়তে পেরেছিলো নিঃসঙ্গতার কবিতা। সেদিন পার্টি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, ক্লাবের পেছনে আমি সিগারেট টানছিলাম , পেছন থেকে এসে ডেসি বলে :

- আমাকেও একটা দিও। 


ওর দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেওয়ার পরে, সেটা জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে ডেসি। বাইরের নিওনের মায়াবী আলোতে ডেসিকে কি অপরূপ সুন্দর লাগছিলো , ঠান্ডায় স্বল্পবসনে কাঁপতে থাকা ছোটোখাটো শরীরটা উষ্ণতা খুঁজছিলো। আমার জ্যাকেট ওকে অফার করায় , অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে :

- জানো, এভাবে আমাকে কেউ কখনো জ্যাকেট অফার করেনি। সবাই ভাবে আমরা মানুষ নই, আমরা আসলে বিনোদনের জন্যই তৈরী। 


আমি আরো কিছুক্ষন ওর সাথে সেই সন্ধেতে দাঁড়িয়েছিলাম ক্লাবের পেছনে। একটু পরে আমার মধ্যে হঠাৎ করে কিছু একটা হলো, আমি ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 

- আমি তো তোমাকে একটা চুমু খেতে পারি ? 


আবারো চোখে হাজার সহস্র বিস্ময় ফুটিয়ে বলে ওঠে মেয়েটি , 

- তুমি পারমিশন নিচ্ছ ? এখানে তো আমাদের ওপরে সবাই জোর করে, ইচ্ছে হলে জোর করে আমাদের টেনে....


সেদিন আমি আর ডেসিকে চুমু খেতে পারিনি। তবে ওর সাথে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হয়। ডেসি আমাকে ওর নম্বর দিয়ে বলে :

- ইন্ডিয়ান বয়, তোমার যখন খুব একা মনে হবে, যদি মনে হয় কারোর সাহচর্য দরকার, আমাকে ফোন কোরো ! আমাকে শুধু কয়েকঘন্টা আগে থেকে জানিয়ে দিও, আমি চলে যাবো। আমার যা নর্মাল চার্জ, তার থেকে আমি তোমাকে তিরিশ শতাংশ ছাড় দেবো। 


সেই শুরু আমার আর ডেসির গল্প। প্রায় মাসতিনেক হলো আমি মাঝে মাঝেই ডেসিকে ডেকে নিই আমার সাথে রাত কাটানোর জন্য।   


আজ যখন, এই গভীর রাতে সবাই যখন পরম নিশ্চিন্তে, ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন আমি তখনও জেগে। ঘুম নেই আমার চোখে , এক অপরাধবোধ, গ্লানিতে ভেঙে পড়ি আমি প্রতি মাসে, এইভাবেই প্রতিটা মাসের বেশ কিছু রাতে। পাশে বিছানায় শুয়ে আছে ডেসি , পোশাকি নাম দেসমোদিনা, আমি ওকে ডেসি নামেই ডাকি। ওর সারা শরীরে নেই কোনো সুতো , নেই কোনো জামা কাপড়। মেঝের ওপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে ওর সিল্কের বেগুনি রঙের ড্রেস, তার ওপরে মানানসই স্বচ্ছ লেসের তৈরী ব্রা , প্যান্টি, করসেট। আমার এই বড়ো ফ্ল্যাটের একটা চাবি থাকে ওর কাছে সব সময় , আমিই দিয়ে রেখেছি। আমার এই ফ্ল্যাটটা এপার্টমেন্টের একদম ওপরে , জানলার বাইরেই, নিচে প্রশস্ত রাস্তা। সামনের দিকে নেই অন্য কোনো এপার্টমেন্ট। যে যে রাতে ডেসি আসে, আমি ভেতরের সব আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে দিই ঘরটাকে। প্রথমে ওর হাতে তুলে দিই শ্যাম্পেন , আমিও একটা গ্লাস নিয়ে সঙ্গ দিই ডেসিকে। তারপরে আমরা দুজনে মিলে কিছু খাই , সাধারণতঃ পিজ্জা আর পাস্তা। তারপরেই আমি আমার মিউজিক সিস্টেমে খুব মৃদু লয়ের গজল বা শুধুই বিভিন্ন সুরের ছন্দে ভরিয়ে দিই সারা রুমটাকে। সুরের ছন্দে ছন্দে দুজনেই হয়ে উঠি মাতোয়ারা , ধীরে ধীরে ডেসি আমার হাত ধরে নাচতে নাচতে খুলতে থাকে ওর পরনের সব পোশাক , আমাকেও করে দেয় পুরো নগ্ন। তবে আজ, ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল।


আজ ডেসি গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে, দেখছিলো আমাকে। চোখে ছিল এক অদ্ভুত মাদকতা। একটু পরেই এগিয়ে এসে তারপরে, গ্লাসের বাকি পানীয়টা ঢেলে দেয় আমার মুখের ওপরে। আমাকে মেঝেতে ফেলে , উঠে আসে ওপরে ডেসি, জিভ দিয়ে ভালো করে চেটে পরিষ্কার করে আমার মুখের ওপরে লেগে থাকা শ্যাম্পেনের শেষ বিন্দুটুকু। একটা জোর ঝটকায় তুলে আনে আমাকে ওর সামনে , টেনে টেনে খুলে ফেলে শার্ট , প্যান্ট ! আমার হাতও ওর শরীরের কোনায় কোনায় , আনাচে কানাচে ঘুরতে থাকে। মত্ত আদরে , পাগলামিতে মেতে উঠি দুজনে। ডেসি আমার মাথা টেনে নামিয়ে আনে ওর স্তনবৃন্তের ওপরে। আমার হাত আবার আবিষ্কার করতে থাকে ভীষণভাবে চেনা , অথচ অচেনা শরীরটাকে ! আশ্লেষে ভেসে যেতে থাকে দুটি শরীর , আবেগে আনন্দে উচ্ছল ডেসি কেঁপে ওঠে আমার স্পর্শে , থরথর করে কাঁপতে থাকে ও । ঊরুর ওপরে ঠোঁটের স্পর্শে আর দাঁতের আধো আধো আদরে ডেসি কামনার আগুনে ছটফট করতে করতে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে নিজের ঠোঁট। ডেসিকে আদর করতে করতে নিজের কোলের ওপরে উঠিয়ে নিয়ে , শীৎকারে ঘন, অতৃপ্ত ডেসিকে নিয়ে ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে পা বাড়াই আমি।


আজ মিউজিক সিস্টেমে চলছে স্যাক্সোফোনে প্রেমের উল্লাস ; আধো আলো , আধো মায়াবী অন্ধকারে, আমি শাওয়ারটা চালু করে দিই। গরম জলের ধারার মধ্যে ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যায় দুজনের নগ্ন তপ্ত শরীর। নিষ্পেষিত হতে থাকে ডেসির শরীর। এক ভীষণ ভালোলাগাতে , আনন্দে, সুখে , ব্যথায় , চোখে জল চলে আসে দুজনেরই। স্যাক্সোফোনের মূর্ছনা ঢাকা পড়ে যায় দুজনের ঘন নিশ্বাসের শব্দে, শীৎকারের আবেগে। চরম পরিতৃপ্তির শেষে আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আরো কিছুক্ষন জলধারার নিচে।


ডেসি ঘুমিয়ে পড়েছে বিছানাতেই , আমি ঘুমোতে পারিনি। ডেসির সাথে এইভাবে সময় কাটিয়ে , আমি নিজেই যেন নিজের কাছে আরো ছোট হয়ে যাই, মারা যায় আমার সত্ত্বা ! মনে হয় আমি ইরার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছি , আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি হয়তো পৃথিবীর সবথেকে লম্পট, দুশ্চরিত্র একটি পুরুষ। কিন্তু কি করে অস্বীকার করবো আমার শরীর, তার চাহিদাকে? খাদ্য, বস্ত্র বাসস্থানের মতোই শরীরের চাহিদাও তো একটা প্রাথমিক চাহিদা। তাহলে ? আচ্ছা আমি কি ডেসিকে ভালোবাসি? নাকি, এটা শুধুই শারীরিক চাহিদা ওর প্রতি? এইরকম রাতের শেষে, দিনের বেলায় ঘুম থেকে ওঠার পরে আমি ওকে ওর প্রাপ্য দিয়ে দিই। আমি ওর সার্ভিস নিচ্ছি কিছু ডলারের বিনিময়ে। এটা কি প্রেম হতে পারে ? 


মনস্থির করে ফেললাম আমি, যে কয়েকটা পাওনা ছুটি আছে সেটা নিয়ে আমি ঘুরে আসি দেশ থেকে, ইরার কাছে সব স্বীকার করবো, ওকে ফোনে না বলে ওর সামনে বসে আমি বলবো আমার সব কীর্তি। ওর যদি মনে হয় আমি ক্ষমার যোগ্য, আমি চাকরি ছেড়ে দেব, ওখানেই থেকে যাবো, আর ডলার কামানোর জন্য আমি দৌড়োবো না। আর ওর যদি মনে হয় আমি ভুল করেছি , আমার চরিত্র খারাপ, তাহলে ডিভোর্স দিয়ে আমি ফিরে চলে আসবো এই বিদেশে আবার। আমি জানি, আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই ! আচ্ছা, আমিও তো ইরার সাথে নেই আট মাস, ওর নিজেরও যদি এরকম কারোর সাথে কোনো সম্পর্ক হয় ? আমি, আমি কি মেনে নিতে পারবো ? 


উহ্হ্হ , আর কিছু ভাবতেই পারছি না , মাথাটা ধরে যাচ্ছে , ব্যথা বাড়ছে ভীষণ। 


পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো ঢোলের শব্দে, ডেসি চলে গেছে টেবিলের ওপরে রাখা ওর প্রাপ্য নিয়ে। আমি জানালাটা খুললাম। নিচের রাস্তা ভেসে যাচ্ছে বিভিন্ন রঙে, আবিরে। সবাই খুশিতে উচ্ছল, আনন্দে সেজে উঠেছে। আজ যে হোলি। কিছুই মনে থাকে না আজকাল , এই নিরেট রসকষহীন শহরে সব কিরকম যেন ভুলে গেছি। আমিও যাবো ? রং খেলবো ওদের সাথে ? শেষ রং খেলেছিলাম ইরার সাথে, আগের বছরে। কি মজাই না করেছিলাম আমরা। আমি ফোনটা হাতে তুলে অফিসে ফোন করে বললাম , 

- আমার আজ থেকেই তিন সপ্তাহের ছুটি চাই , ভারতে কিছু এমার্জেন্সি চলে এসেছে, আমাকে যেতেই হবে। 


মিথ্যে কথাগুলো বলে ছুটি নিয়ে , ফোন করলাম ইরা কে। 

- ইরা , আমি আসছি। 


ঘুম ঘুম চোখে আটহাজার কিলোমিটার দূর থেকে ইরা বলে উঠলো অন্য প্রান্তে, 

- সে তো তুমি রোজই আসো, তোমার অপেক্ষায় তো আমার মাথার সব চুল সাদা হয়ে গেলো। 


- না ইরা, আমি সত্যিই আসছি। আজ দুপুরে আমি ফ্লাইট বুক করে ফিরে আসছি। আজ যে হোলি, তোমাকে রঙে রাঙাতে খুব ইচ্ছে করছে ইরা , সেই আগের বারের মতো। 


ঘুম ভেঙে গেছে ইরার:

- সত্যি? সত্যি বলছো তুমি ? 


- সত্যি ইরা, তবে তোমার সাথে কিছু খুব জরুরি কথাও আছে। তবে এখন নয়, দেখা হলে, তোমার সাথে বসে, তোমার হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে বলবো। ছাড়ছি এখন, তুমি এবার ঘুমোও ইরা। 


আমি তাড়াতাড়ি জামাকাপড় গুছিয়ে, টেবিলের ওপর থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যাগে রেখে , আমার ডায়রিটা তুলে নিলাম। এই আমার একটা অনেকদিনের অভ্যেস, ডায়রি লেখা, আজও ছাড়তে পারিনি। ডায়রিটা নিতে গিয়ে বইয়ের ফাঁক থেকে একটা ফটো উঁকি দিলো। দশ বছরের আমি লাল, গোলাপি রঙে মাখা সারা শরীর ,হাতে পিচকিরি ; পাশে দাঁড়িয়ে নয় বছরের ফ্রক পরা তুলি, হাতে আবির, সারা মুখে সবুজ আর নীল বাঁদর রঙে মাখামাখি, শুধু সাদা দাঁত গুলো দেখা যাচ্ছে ফটোতে। মনে পড়ে গেলো অনেক স্মৃতি। 


++++++++++


প্লেনে বসে আছি এখন আমি। প্রায় চব্বিশ ঘন্টার লম্বা জার্নি করতে হবে এখন। তবে এত মাস পরে ইরার কাছে যাওয়ার যে আনন্দ হচ্ছে, সেটাতেই দেখতে দেখতে এই সময়টুকু কেটে যাবে, জানি আমি। আমার সাথে সেরকম জিনিসপত্র কিছুই নেই, আসলে এতো তাড়াহুড়োর মধ্যে বেরিয়ে এসেছি যে জানিনা কি নিয়েছি, আর কি ছেড়ে এসেছি। তবে আমি ইরার পছন্দের চকলেট নিয়ে চলেছি এখান থেকে, এছাড়াও ওর জন্য আছে একটা বিস্ময়। তবে আজকাল আর এভাবে কাউকে সারপ্রাইজ দেওয়া যায় না। অনলাইন শপিংয়ের জন্য সারা পৃথিবীর সবরকমের ভালো খারাপ জিনিসপত্র চলে এসেছে আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। তবুও আমি ওর জন্য নিয়েছি আমার পছন্দ করা কিছু পারফিউম , আসলে মেয়েটা ভীষণ পছন্দ করে বিভিন্ন রকমের সুগন্ধী। আগে দুজনে মিলে যা রোজগার করতাম, সংসার সামলে, বাবা মায়ের ওষুধপত্র, ডাক্তার, সব নিয়ে খুব কম টাকাপয়সা জমাতে পারতাম, এইসব শৌখিনতায় ভাসাতে পারতাম না নিজেদের। তখন সস্তার সুগন্ধী নিয়ে দুজনেই রোজ করতাম মারামারি। এখন তাই দু হাত ভরে একসাথে দশটা বিভিন্ন ধরণের পারফিউম নিয়ে চলেছি আমি আমার ইরার জন্য। জানি, আমাকে একটু বকাবকি করবে, তবুও, ওর খুশি, ওর মুখের হাসি দেখাতেই আমার শান্তি। 


প্লেনের সিটে বসে অনেকেই ঘুমোচ্ছে , দীর্ঘ যাত্রাপথে এখন অনেকেই ঘুমোবে, সিনেমা দেখবে, এয়ারহোস্টেসদের সাথে ফ্লার্ট করবে। আমার এসবে কোনো আগ্রহ নেই. আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে, বাইরে ভেসে যাচ্ছে মেঘেদের দল, কোনো কোনো মেঘ ধবধবে সাদা, কেউ বা ধূসর, পেঁজা তুলোর মতো, আবার কোনো কোনো জায়গাতে এতো ঘন মেঘ মনে হয় ওর ওপরে নেমে দিব্যি হেঁটে বসে দৌড়ে আরামে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যায়! হাতে আমার এখন স্কচের গ্লাস, আর সামনের ট্রের ওপরে রাখা দুটো বই আর আমার ডায়রি। ডায়রির মধ্যে আমার আর তুলির ছোটবেলার হোলি খেলার ফটো, আর আছে অনেকগুলো চিঠি। এই চিঠিগুলো ছিলো আমার আর চিন্ময়ীর বন্ধুত্বের চিঠি, আমার আর চিন্ময়ীর অব্যক্ত প্রেমের কাহিনী, এতে রয়েছে আমাদের দুজনেরই অনেক কিছু পাওয়া না পাওয়ার কাহিনী। ইরা কে আমি দেখিয়েছিলাম চিঠি গুলো, ও পড়ায় কোনো উৎসাহ দেখায় নি, জানতেও চায় নি। ও বলেছিলো, কি হবে শুনে , জেনে? এরকম তো অনেকের জীবনেই অনেকরকমের গল্প আছে। তার থেকে যেটা বর্তমান, সেটাকে নিয়েই বাঁচা ভালো। 


বর্তমান ! সত্যিই তো, এখন আমার বর্তমান পরিস্থিতি কি ? প্লেনে বসে স্কচ পান করছি , তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। এখনো তেইশ ঘন্টার সুদীর্ঘ যাত্রাপথ। বাইরের দিকে তাকালে, বা চোখ বন্ধ করলেই মনের মধ্যে ভেসে উঠছে পুরোনো সব কথা। কিছুতেই বর্তমানে বাঁচতে ইচ্ছে করছে না এখন, বার বার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে অনেকদিন আগে ফেলে আসা জীবনে। মনে পড়ে যাচ্ছে তুলির কথা, মনে পড়ে যাচ্ছে চিন্ময়ীর কথা, মনে পড়ে যাচ্ছে কলেজের তিয়াসার কথা। আশ্চর্যের ব্যাপার, ডেসির কোনো স্মৃতি আমার মাথায় ভিড় করছে না , আসলে ওকে হয়তো কখনো আমি ভালোবাসিনি, এটা শুধু ছিল পারস্পরিক একটা বোঝাপড়া , শরীরের বোঝাপড়া ! 


মনে পড়ে যাচ্ছে অনেকদিন আগের কথা , তখন কতই বা বয়স আমার ? দশ কি নয় ! ছোট থেকে একটা কলোনিতে বেড়ে উঠছিলাম আমি। দেশলাই খোপের মতো ছোট্ট ছোট্ট কোয়ার্টার ; সকাল ৮টার সাইরেন বাজতেই সবার মধ্যে তড়িঘড়ি। বাজার যাওয়ার ব্যস্ততা, অফিসে সময় মতো পৌঁছনোর তাড়া, স্কুলে যাওয়ার হুড়োহুড়ি। শুধু সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতো ছোট্ট তুলি আর সামনের বাড়িতে আমি, তখনও আমাদের স্কুল শুরু হয়নি, আমাদের মধ্যে ছিলোও না কোনো ব্যস্ততা ! এই হৈচৈ, শোরগোলের মধ্যেও আমরা বারান্দায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খেলে যেতাম, সে কতরকম আবোলতাবোল খেলা, কখনো আমি লুকিয়ে পড়ছি নিচু হয়ে কখনো তুলি ; কখনো বা কোনো কারণ ছাড়াই দুজনে চেঁচিয়ে যেতাম আর একটু পরেই হেসে গড়িয়ে পড়তাম। কখনো বা আমি হয়ে উঠতাম পান্ডব গোয়েন্দার বাবলু তো তুলিকে করে দিতাম বিচ্ছু; আবার কখনো বা আমি গলা ছেড়ে আমার কচি কণ্ঠস্বরে গাইতাম ' আয় তবে সহচরী , হাতে হাতে ধরি ধরি ' আর ওদিকে তুলি নেচে যেত আপনমনে। এভাবেই দিব্যি কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো। 


বিকেলে একসাথে নিচে নামতাম খেলতে , সেখানে কখনো গাছে ওঠা, কখনো লুকোচুরি, কখনো বা ছোঁয়াছুঁয়ি, কখনো বা কিছুই না করে কৃষ্ণচূড়া গাছের কুঁড়ি নিয়ে তার ভেতরের পরাগরেণু নিয়ে কাটাকুটি। আর ছিল বাড়ির সামনে এক বাগান দাদু, সারাদিন বাগান নিয়ে কাটিয়ে দিতেন উনি। নিত্য নতুন গাছ, ফুল তাদের পরিচর্চাতেই কেটে যেত সারাদিন। দাদু ভীষণ ভালোবাসতো আমাদের দুজনকে , মাঝে মাঝেই গাছের পেয়ারা, কুল খেতে দিতেন আমাদের। আবার অনেক সময়ে দাদুর মন ভালো থাকলে আমাদের দুজনকে দুই কোলে বসিয়ে কত না গল্প শোনাতেন। আরো কয়েক বছর পরে যখন তুলির দশ বছর বয়স, ওকে ছেড়ে চলে যেতে হয় সেই কলোনি , ওর বাবার ছিল বদলির চাকরি। যাওয়ার কথা শুনেই আমার এসেছিলো ভীষণ জ্বর , তুলিরও ছিল ভীষণ মন খারাপ। যাওয়ার দিন বাগানদাদু তুলির হাতে একটা ফোটো তুলে দিয়েছিলেন, আর একটা একইরকম ফটো দিয়েছিলেন আমাকে। তুলি চলে যাওয়ার পরে, আমাকে কাঁদতে দেখে বলেছিলেন, 

- তোদের হয়তো আবার কোনোদিন দেখা হবে, জানি না, তখন বেঁচে থাকবো কিনা , যদি না থাকি, আমার কথা মনে করিস। দেখিস, একদিন আমার তোলা এই ফটো তোদেরকে আবার মিলিয়ে দেবে। 


এই সেই ফটো, হোলির দিন সকালে দাদুর বাগানে তোলা হয়েছিলো। সবাই যখন রং নিয়ে খেলতে ব্যস্ত, আমাদের দুজনকে ডেকে , পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে এই ফটোটা তুলেছিলেন সেই বাগানদাদু। না, তারপরে আর কোনোদিন দেখা হয়নি তুলির সাথে। আমি জানি ও কোথায় আছে, কোন শহরে, কোথায় থাকে, সেটাও আমি আজ জানি। ইন্টারনেটের আন্তর্জালে আমি দেখে ফেলেছি তুলি কেমন দেখতে এখন, কি সুন্দর সংসার করছে ও, ছোট্ট দুটো বাচ্চাও আছে ওর। ওর স্বামীর নিজের ব্যবসা আছে , ফাইনান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে কাজ করে কিছু। খুব ভালো আছে ও, হয়তো ! জানিনা ! সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপারে হলো, তুলি আজ সেই একই কলোনিতে থাকে, সেই একই পাড়ায় ! এটা কি কাকতালীয়, নাকি তুলি ওখানে থেকে আমার মতো করেই আমাদের ছোটবেলা খুঁজে চলেছে ? 


হঠাৎ করে, তুলির সাথে দেখা করার জন্য মনটা যেন কেমন করে উঠলো , ফটোটা হাতে নিয়ে একভাবে দেখতে দেখতে কখন যে চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল এসে পড়লো ফটোর ওপরে ! এয়ারহোস্টেস অনেকক্ষন ধরে হয়তো আমাকে দেখছিলো, আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো : 

- স্যার , আপনি ঠিক আছেন তো ? কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি আপনার ? কিছু দেবো আপনাকে ?    


আমি ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে, সিট থেকে উঠে গেলাম বাথরুমে , চোখে মুখে ভালো করে জল দিলাম। দেখি ফিরে গিয়ে ঘুমোনো যায় কিনা ! কে জানে ইরা কি করছে এখন? আমার পছন্দের রান্না গুলো করছে? জামা কাপড় বের করে বাছাবাছি চলছে কোনটা পরে এয়ারপোর্টে আসবে আমাকে নিতে? নাকি ঘুমোচ্ছে এখন আর আমাদের দুজনকে নিয়ে পরের কয়েকদিনের সুখস্বপ্ন দেখছে ?

     

++++++++++


- না না , এভাবে হয় না বিভাসদা , এভাবে আমাদের আর দেখা করা ঠিক নয় ! আমাদের কথা বলাও বন্ধ করতে হবে, আমি , আমি নাহলে দুর্বল হয়ে যাবো। প্লিজ, আমার জীবন থেকে সরে যাও তুমি। 


ইরার দুই কাঁধের ওপরে হাত রেখে বলে ওঠে বিভাস, 

- তুমি কি বলছো ইরা ? আমাকে চলে যেতে বলছো এখন ? এই সময়ে ? ও বুঝেছি, চিরন্তন আসছে, আজ তাই আমি অবাঞ্ছিত , উপেক্ষিত ? আর এই কয়েকমাস আগে যখন ....


- তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিলো বিভাসদা, সেটা তুমিও জানো। আমি তো বারবার বলেছি তোমাকে, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। হ্যাঁ , সেদিন তুমি পাশে না এসে দাঁড়ালে, ওই রাতে পাশে দাঁড়িয়ে তুমি যদি সবরকম ভাবে সাহায্য না করতে, তাহলে হয়তো বাবাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারতাম না ! তবে মানুষের ধর্মই তো এইটা, েকে অপরের পাশে এসে দাঁড়ানো , তাই না ? 


-আর আমার ভালোবাসা? আমি যে সেই ছোট থেকে তোমাকেই ভালোবেসে এসেছি ইরা ? তার কোনো দাম নেই? 


- আমি জানি না বিভাসদা , আমি জানি না কি বলবো তোমাকে। তবে আবারও বলছি, প্লিজ চলে যাও। তোমায় যদি আসতেই হয়, আমাকে বোনের মতো করে দেখো , অন্য কিছুই নয় ! 


ইরা কে ছেড়ে মাথা নিচে করে বেরিয়ে গেলো বিভাস। বিভাস বেরিয়ে যাওয়ার পরেই নিচে নেমে এসে তাড়াতাড়ি করে সদর দরজা বন্ধ করে বাবা মাকে দেখে নিলো একবার উঁকি দিয়ে ইরা। দুজনেই এখনও ঘুমোচ্ছে। তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে এসে আলমারি খুলে শাড়ি বের করে ইরা। চিরন্তন আসছে, কতদিন পরে ছেলেটা বাড়িতে আসছে। এই কয়েকমাসে সব কিরকম ওলোট পালোট হয়ে গেলো। একটা শাড়ির ওপরে হাত দিয়ে বসে পড়লো ইরা। বিভাসদা, সেই ছোট থেকে একই পাড়াতে বড়ো হয়ে উঠেছে দুজনে। ওর থেকে বছর পাঁচেকের বড়ো , এমনিতে বখাটে ছেলে হিসেবে ওর সাথে কেউ মিশতে চাইতো না , তবুও ইরা কে দেখে কোনোদিন বিভাসদা কিছু তো করেও নি, অন্যদেরকে কিছু করতেও দেয় নি। ইরা জানতো, মনে মনে বিভাসদা ওকে ভালোবাসতো , কিন্তু মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু বলতে পারেনি। ও নিজেও যেন কিভাবে ভালোবেসে ফেলেছিলো বিভাসদাকে। চিরন্তন ওর জীবনে আসার পরেও , বিভাসদার জন্য মনের কোনো এক কোণায় কিছু ভালোলাগার মুহূর্তগুলো তবুও জমে ছিল। চিরন্তন চলে যাওয়ার মাস তিন পরে পরে, এক রাতে বাবার হঠাৎ স্ট্রোক হয়। তখন ইরা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, কি করবে ভেবে না পেয়ে ফোন করে বিভাসদাকে। বিভাসদা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব কিছুর ব্যবস্থা করে , নিজে সব খরচ করে বাবাকে সুস্থ করিয়ে নিয়ে আসে. তারপরেই বিভাসদার ওদের বাড়িতে আনাগোনা বেড়ে যায়। সত্যি কথা বলতে, চিরন্তন পাশে না থাকার জন্য , বিভাসদার এই সঙ্গটা ভালো লাগতে শুরু করে ইরার। একদিন বাবা , মা দুজনেই হাঁটতে বাইরে গিয়েছিলো, তখন ছিল সন্ধে সাতটা। অফিস থেকে ফিরে স্নান করে ভেজা চুলে চিরুনি দিতে দিতে ছাদে গিয়েছিলো ইরা। বিভাসদা দূর থেকে ওদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো। ওকে দেখে হাত নাড়ে, ইশারায় বলে ও আসছে। একটু পরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ইরা গিয়ে দরজা খুলে দেখে সামনে বিভাসদা দাঁড়িয়ে। বিভাসদা ভেতরে ঢুকে বলে :

- কি রে ? স্নান করে এলি ? কাকু কাকিমা কোথায় ? 


- মা বাবা এই হাঁটতে গেছে , একটু পরেই চলে আসবে। কি খাবে বলো ! 


- কিছু না, চল ছাদে যাই , এখানে বেশ গরম. ওখানে চল আড্ডা মারি। 


বিভিন্ন কথার মাঝে হঠাৎ কখন বিভাসদা ওর কাছাকাছি চলে আসে , ওর কানে ফিসফিস করে বলে, 

- তোকে আজ কি মিষ্টি লাগছে রে ইরা। 


- ধ্যাৎ ! তুমি, তুমি একটা বিয়ে করো এবার বিভাসদা। 

সরে আসে ইরা একটু পেছনের দিকে। ওর হাত টেনে ধরে বিভাসদা , 

- তুই তো এলি না আমার জীবনে, আমি আর কি করে অন্য কাউকে ভালোবাসি বলতো ইরা ? 


ইরার মন গলতে শুরু করে , তবুও সামাজিক লজ্জার খাতিরে ও ধীরে ধীরে বলে :

- এভাবে বলতে নেই বিভাসদা। ছাড়ো , ছাড়ো আমাকে। 


বিভাস জোর করে নিজের কাছে টেনে নেয় ইরা কে, ইরার চোখে চোখ রেখে বলে :

- বল, তুই আমাকে কখনো ভালোবাসিস নি? 


ইরা বলে ওঠে :

- জানি না বিভাসদা। 


বিভাস ওর ঠোঁট নামিয়ে আনে ইরার ঠোঁটের ওপরে। এতদিন পরে অন্য এক পুরুষের সংস্পর্শে কেঁপে ওঠে ইরা। বিভাসদা, ওর জীবনের প্রথম প্রেমিক, কি করে অস্বীকার করে এই প্রেমকে ! 


এর পরেও বিভাসদা মাঝে মাঝেই আসতো, তবে কোনোদিন নিজে থেকে আর স্পর্শ করেনি ইরা কে। মাঝে মাঝে এক দুবার দুজনের ঠোঁট মিশেছিল একে অপরের সাথে , মাঝে মাঝেই ইরার মন খারাপ হলে , বা চিরন্তনের সাথে ফোনে ঝগড়া হলে বিভাসদার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেছে কয়েকবার , এর বেশি কখনোই এগোতে সাহস পায়নি ইরা। তবুও আজ , আজ নিজেকে খুব খেলো মনে হচ্ছে ইরার। 


কি করে পারলাম আমি দুর্বল হয়ে পড়তে ? কি করে পারলাম আমি বিভাসদাকে স্পর্শ করতে ? আমি , আমার আর ওই রাস্তায় দাঁড়ানো মেয়েটার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে ? চিরন্তন জানতে পারলে কি ভাববে আমাকে নিয়ে ? আমি, আমি ওকে সব বলে দেবো , তারপরে জানিনা কি হবে। ধীরে ধীরে চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায় ইরা , শাড়ি ব্লাউজ সব বের করে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যায় ইরা। আজ নিজে হাতে চিরন্তনের সব পছন্দের খাবার রান্না করবে ও। 


++++++++++   


হঠাৎ এক তীব্র ঝাঁকুনিতে দু চোখ থেকে ঘুম চলে গেলো। চোখ খুলেই দেখি মুখে সামনে ঝুলছে অক্সিজেন মাস্ক , এয়ারহোস্টেসরা ভেতরে ছোটাছুটি করতে করতে, বাচ্চা আর বয়স্কদের সিট বেল্ট পরতে সাহায্য করছে। কেউ একজন ঘোষণা করলো : 

- আমি আপনাদের পাইলট বলছি ; বাইরে খুব খারাপ আবহাওয়ার জন্য সবাই সিটবেল্ট পরে নিন , কেউ যদি বাথরুমে থাকেন ফিরে আসুন নিজের জায়গাতে , চেয়ার সোজা করে সামনের ট্রে বন্ধ করে দিন; ভেতরে এয়ার প্রেসার কমে যাওয়ার জন্য আপনার সামনে অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেওয়া হয়েছ; প্রয়োজনে ব্যবহার করুন। আমরা চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দুর্যোগ থেকে বেরোতে। অযথা ভয় না পেয়ে নিজেদের জায়গাতে চুপ করে বসে আমাদের সহযোগিতা করুন। এয়ারহোস্টেস আর ক্রূ মেম্বাররা বসে পড়ুন নিজেদের জায়গায়। 


প্রচন্ড ভাবে প্লেনটা কাঁপছে, ভেতরের আলো গুলো ঝাঁকুনিতে দপদপ করতে শুরু করলো। আমার আসে পাশে যেদিকেই তাকাই, সবার মুখে ভয়ের ছাপ ! বাচ্চারা ভয়ে কান্না শুরু করেছে ; ঈশ্বর বিশ্বাসীরা জোরে জোরে বিভিন্ন ভাষায়, মন্ত্র জপ করা শুরু করলো নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য। সত্যি কি অদ্ভুত, আমরা সবাই জানি একদিন চলে যেতেই হবে, তবুও বেঁচে থাকার কি আকুল প্রার্থনা। আমার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক, একটা কুশন নিয়ে মুখটা তার মধ্যে গুঁজে দিয়েছে , হাউ হাউ করে কাঁদছে আর বলছে :

- আমি অনেক পাপ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দাও ঈশ্বর। আর কোনোদিন হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে না মাঞ্চকিন , তোমাকে, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি , খুব। 


আমার চারদিকে নানা বর্ণের, নানা ধর্মের মানুষ, সবার মধ্যেই এই একই চিন্তা , আজ এই দুর্যোগে সেটা মনের ভেতর থেকে চলে এসেছে মুখের মধ্যে ; সবাই যে যার মতো করে ক্ষমা চাইছে কারোর কাছে; কেউ নিজের অপরাধের জন্য, কেউ বা নিজের প্রেমের জন্য ; কেউ বা তার নাতি নাতনিকে আর ভবিষ্যতে না দেখতে পাওয়ার জন্য। আমি ? আমি কার জন্য কাঁদবো? কার জন্য ভয় করবো ? যদি সত্যি সত্যি আমাদের পাইলট প্লেনটা কন্ট্রোলে না আনতে পারে, যদি এইখানেই , এই তিরিশ হাজার ফিট ওপরে কিছু হয়ে ধ্বংস হয়ে পড়ে প্লেনটা , কি হবে? কার মুখ আমার সামনে ভেসে উঠবে ? শুনেছি মানুষ মারা যাওয়ার আগে, তার সবথেকে নিজের আপনজনের কথা ভাবে, তার সবথেকে কাছের মানুষের মুখ ভেসে ওঠে ক্ষনিকের জন্য চোখের সামনে। আমার তো সেরকম কিছুই হচ্ছে না , আমি কি মানুষ ? 


হঠাৎ করে প্লেনটা একটা গোঁত্তা মেরে নিচের দিকে নেমে গেলো প্রচন্ড গতিতে , কিছুক্ষনের ভারসাম্যহীনতায় , সবাই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো ; কয়েক সেকেন্ড পরে প্লেনটা ধীরে ধীরে আবার সোজা হোলো , বাইরে এখন আর কোনো দুর্যোগের চিহ্ন নেই। আরো কিছু পরে পাইলটের গলার স্বর ভেসে এলো আবার : 

- আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ সহযোগিতা করার জন্য ; এখন আমরা বিপদের বাইরে। আমরা যে এয়ার টানেলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে প্রচন্ড ঝড় হচ্ছিলো, তার মাঝে আমরা আটকে গিয়েছিলাম; ওই এয়ার টানেল ছেড়ে আমরা আরো নিচের একটা শান্ত এয়ার টানেলে চলে এসেছি। এখন আমরা আরো কয়েকশো কিলোমিটার এইভাবে গিয়ে আবার ওপরে উঠবো। এবার আপনারা সিট বেল্ট খুলে ফেলতে পারেন , টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন।  


সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো, কেউ কেউ চেঁচিয়ে বলে উঠলো :

- থ্যাংক গড, ওই আর সেফ। 


- ওহ গড, ইউ আর মাই সেভিয়ার !       


- ওয়াও , আমি বেঁচে আছি 


- ওহঃ, মেরি, আমি আসছি তোমার কাছে আর কিছুক্ষনের মধ্যে ! 


আমারও খুব আনন্দ হলো, নিজের জন্য , তার সাথে সবার জন্য। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ ভাবে ভ্রমণ শেষ করে যে যার প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাক। আমি পাশের ভদ্রলোককে ডেকে বললাম :

- ডোন্ট ওয়ারি , ওই আর সেফ নাও। আপনি কি কিছু খাবেন? জল বা কোনো ড্রিংক ? 


একটু পরে আমি সিটবেল্ট খুলতে গিয়ে দেখলাম আমার হাতে রাখা ডায়রি, বই সব মেঝেতে পড়ে গেছে। আমি নিচু হয়ে তুললাম সেগুলো। দেখলাম আরো একটা খাম নিচে পড়ে আছে। খুব চেনা এই খাম , হাতে তুলে নিলাম। চিন্ময়ী, চিন্ময়ীর চিঠি।


++++++++++


অনেক বছর আগে, তখন আমি ইলেভেনে পড়ি ; বায়োলজি ক্লাসের ল্যাবে এক দিন ব্যাঙ নিয়ে কাটাকুটি করে শরীরের সব অঙ্গ প্রতঙ্গ শনাক্তকরণের দিন ! আমরা ফর্মালিনে ডুবিয়ে রাখা ব্যাঙ গুলো নিয়ে যে যার টেবিলে সামনের ট্রেতে রেখে অপেক্ষা করছি। বরুণ স্যার, নিজে একটা ব্যাঙ কেটে দেখালেন কি করে কাটতে হবে ব্যাঙটাকে সাবধানে। তারপর বোর্ডে বড়ো করে বিভিন্ন আভ্যন্তরীন অংশ দেখালেন , কোনটাকে বলে হৃদপিন্ড, কোনটা লিভার, কোনটা কিডনি, কোনটা জরায়ু। এবার আমাদের পালা। আমরা ধীরে ধীরে ব্যাংটা কেটে , দেখে বোঝার চেষ্টা করছি কোনটাকে কি বলে ; হঠাৎ করে এক তীব্র চিৎকার :

- স্যার , আমার জরায়ু নেই। 


আমরা বেশ কয়েকজন একটু অবাক হয়ে চুপ করে তারপরে হেসে উঠলাম হোহো করে। স্যার নিজেও এবার একটা টেবিলের সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন :

- কি বললি ? আর একবার বল ? 


- স্যার , আমার জরায়ু নেই। খুঁজে পাচ্ছি না ! 


স্যার মেয়েটির মাথায় একটা গাঁট্টা মারলেন।  

- হতচ্ছাড়ি, তোর , নাকি তোর ব্যাঙের ? 


জিভ কেটে মেয়েটি বলে উঠলো ,

- না মানে, আমার ব্যাঙের ! 


এই ছিল চিন্ময়ী। এক ক্লাসে পড়লেও ওর সাথে সেরকম আলাপ ছিল না আমার , আসলে ওকে খুব একটা ভালোও লাগতো না। সারাক্ষন ছেলেদের সাথে ফ্যা ফ্যা করে ঘোরা , মুখে যখন যা আসে বলে দেওয়া। এইসব কারণের জন্য আমরা অনেক ছেলেরাই ওর থেকে দূরে দূরে থাকতাম। আরো কিছু বছর পরে যখন আমি সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন প্রায়ই আমাকে যেতে হতো কলকাতায়। যেতে যেতে আবার দেখা চিন্ময়ীর সাথে, ট্রেনে। 


আমি প্রতিদিন ট্রেনে উঠে বসে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে দিতাম। একদিন হঠাৎ দেখা ওর সাথে। আমার পাশে এসে বসে , আমাকে বললো:  

- কি রে? চিনতে পারছিস ? কেমন আছিস বল ?


- তুই, তুই তো চিন্ময়ী ! কত চেঞ্জ হয়ে গেছিস তুই ! আগে তো এমন ভাবে স্কুলে আসতি মনে হতো কতদিন স্নান করিস নি, কতদিন মাথায় তেল দিস নি ; এখন তো একদম ফিটফাট, সুন্দরী , আবার মেকআপ ! বাহ ! 


- তো করতে হবে না ? আমি এখন কলেজে পড়ি বলে কথা , কত ছেলেরা আছে, কতো ঝাড়ি মারতে হয়, আমাকে কতজন হাঁ করে দেখে ! এসব তো করতেই হবে, তাই না ? তা তুই কোথায় ? 


সেই শুরু ওর সাথে রোজ ট্রেনে করে যাওয়া , একসাথে। সেই আলাপ ধীরে ধীরে গাঢ় বন্ধুত্বের দিকে এগিয়ে যায়। প্রতিদিন সকালে আমি অপেক্ষা করতাম চিন্ময়ীর জন্য স্টেশনে, কখন ও আসবে , তারপরে দুজনে একসাথে ট্রেনে উঠবো। সকালের লোকালে জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন, তবুও যেদিন জায়গা পেতাম, পাশাপাশি বসে গল্প করতে করতে, ঝাল মুড়ি খেতে খেতে ঠিক পৌঁছে যেতাম। মাঝে মাঝে ও ঘুমিয়ে পড়তো আমার কাঁধে মাথা রেখে , আমি নিজের হাতটাকে ওর বালিশ করে দিতাম। মনে হতো সবসময় ওকে আগলে রাখি। সন্ধেতে আবার ফেরার সময়ে, একসাথে ফেরার চেষ্টা করতাম আমরা। ও বলতো কলেজের গল্প, বলতো কটা নতুন ছেলের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে আজ ; আর আমি বলতাম আমার স্বপ্নের কথা, আগামী দিনগুলোর চিন্তা ভাবনা। কিভাবে যেন আমি ওর মনের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। 


আমি এটাও জানতাম চিন্ময়ী আসলে নীলাঞ্জনকে ভালোবাসে, সেই স্কুল জীবন থেকে। ওদের অনেকদিনের পুরোনো প্রেম, শুরু সেই ক্লাস সিক্স থেকে। এখন নীলাঞ্জন চলে গেছে আর্মির কলেজে। চিন্ময়ীর কলেজ শেষ হলেই ওদের বিয়ে হওয়ার কথা। তবুও চিন্ময়ীর আমাকে পছন্দ করা, আমার জন্য ভাবা, আমার জন্য অপেক্ষা করা খুব ভালো লাগতো আমার। ভেতরে ভেতরে আমি ওকে ভালোবেসে ফেলি। বলতে পারিনি কোনোদিন যদি এতো সুন্দর বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায় ? 


নিজেই নিজেকে অনেক বুঝিয়ে , ক্রন্দনরত মনটিকে কখনো উজাড় করে দিতে পারি নি। যখনই চিন্ময়ীর কোনো দরকার হতো, কোথাও যাওয়ার হতো, সব সময় পাশে ঠিক চলে আসতাম আমি সময় করে। একটা সরকারি ব্যাঙ্কের পরীক্ষার ঠিক আগের দিন রাতে হঠাৎ চিন্ময়ীর ফোন আসে ; ওর দিদির মেয়েকে 'বিজ্ঞান ও সমাজ' নিয়ে রচনা লিখতে হবে। আমি ঠিক রাত এগারোটার সময়ে, ওর বাড়িতে গিয়ে রচনা দিয়ে আসে। কলেজে পড়তে পড়তে, ইন্টারভিউ কল আসে ওর কলকাতায়। একা একা এতো বড়ো শহরে যেতে ভয় পায় চিন্ময়ী , আমি সেদিন ওর পাশে চলে আসি, ওকে গাইড করে নিয়ে যাই কলকাতায়। দুজনে একসাথে কত আড্ডা দিতাম সেই সময়, সারা শহর চষে বেড়াতাম সাইকেলে। চিন্ময়ী অনেকবার হাসতে হাসতে বলেছে :


- তোকে বিয়ে করলে কিন্তু খুব ভালো হয়। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, ভালো ভবিষ্যৎ , আর তুই নিজে কত ভালো। নীলাঞ্জনটা ভীষণ খারাপ , খালি ঝগড়া করে ফোনে। কোথায় সুদূর দিল্লীতে পড়ে আছে, আসতেও চায় না। বল না, তুই বিয়ে করবি আমাকে ? আমি তোকে যে খুব ভালোবাসি। 


তারপরে দুজনেই আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম। যদিও চিন্ময়ী কোনোদিন আমার ভিজে যাওয়া চোখের কোণ দেখতে পায়নি। এক দুপুরে, আমি শুয়েছিলাম ঘরে। আমার একটা চাকরির অফার লেটার চলে এসেছে , কিছুদিন পরে জয়েন করতে হবে শিলিগুড়িতে। হঠাৎ করে চিন্ময়ী এসে হাজির বাড়িতে। সেদিন বাবা-মা কোন অনুষ্ঠানে গ্রামে গিয়েছিলো, আমার কিছু কাজ ছিলো বলে থেকে গিয়েছিলাম ঘরে। ও এসেই আমাকে বললো : 


- চিরু ,শোন্ না, একটা কথা বলবো তোকে ? কিছু মনে করবি না তো ? 


- তুই এই চিনলি আমাকে ? এতদিন পরেও আমার কাছে তোর এতো উৎকণ্ঠা ? 


- আচ্ছা আচ্ছা, তুই, তুই আমাকে একটা সেইসব সিনেমা দেখাবি? মানে কি হয়, কি করে ওইসব সিনেমাতে? 


- কোন সিনেমা? তুই কি বলছিস? 


- কাল রাতে নীলাঞ্জন বলছিলো আমাকে, পানুর কথা। আমি তো বললাম এরকম কিছু হয় না। ও আমাকে হেসেই উড়িয়ে দিলো। ওদের ক্যাম্পাসে এরকম নাকি.. যাই হোক , তোর কাছে আছে এরকম কিছু ? 


- তুই? তোকে আমি ওই সিনেমা দেখাবো ? তুই পাগল হয়েছিস? যা যা, ও তুই তোর নীলাঞ্জনের সাথে বসে দেখ।  


- না রে, প্লিজ। একবার, একবার আমাকে দেখা ! 


অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করে, তারপর পাড়ার গোপালের কাছ থেকে একটা সিডি জোগাড় করে আনি আমি। সিনেমাটা কম্পিউটারে চালিয়ে আমি চলে আসি সামনের রুমে। চিন্ময়ী আমাকে টেনে আনে ভেতরে। বলে দুজনে একসাথে বসেই দেখবো। আড়চোখে মাঝে মাঝে আমি দেখছিলাম চিন্ময়ীর দিকে , আমি বুঝতে পারি ও উত্তেজিত হয়ে পড়ছে , নিজের ঠোঁট চেপে ধরছে আবেশে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রাখি সেদিন। শেষ হয়ে গেলে, চিন্ময়ী কিছু না বলে শুয়ে পড়ে বিছানার ওপরে। আমিও কি বলবো বুঝতে না পেরে, একটু দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়ি। ওর বুকটা অনবরত ওঠানামা করছে , এখনো একটা রেশ এর মধ্যে আছে চিন্ময়ী। একটু পরে আমার দিকে ঘুরে বলে :

- এটা কি ছিল রে ? এইসব কারা দেখে ? 


- এই যে , আমরা ! আমরাই তো দেখলাম একসাথে ! 


- হাহাহাহা , তুই খুব ভালো রে চিরু। আজ যদি আমি তোর পাশে শুয়েও থাকি, আমি জানি তুই আমার সাথে কিছু করবি না। তুই কেন এতো ভালো রে ?  


আমার যেন কি একটা হয়ে গেলো সেদিন , আমি সব বাধা নিষেধ ভুলে , ওর কাছে এগিয়ে গেলাম ; ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, 

- তোকে একটা চুমু খাবো ? 


চিন্ময়ী নিজের দু চোখ বন্ধ করে দিলো, ওর নিঃশ্বাস ঘন হতে শুরু করে। আমি ওর ঠোঁটের ওপরে রাখি আমার ঠোঁট। জানিনা কতক্ষন আমরা এভাবে ছিলাম, তবে কিছু পরেই বুঝতে পারি আমার হাত ধীরে ধীরে ওর বুকের দিকে এগোচ্ছে। ওর হাত দুটোও আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ ও আমাকে সরিয়ে দেয়। 

- না, আর কিছু না চিরু। আমরা খুব ভালো বন্ধু ! আমি তোকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি, তবুও....


বেরিয়ে চলে গেলো চিন্ময়ী। তারপরেও ওর সাথে আমার অনেকদিন যোগাযোগ ছিল, আমি শিলিগুড়িতে আসার পরে ও নিয়ম করে প্রতি মাসে আমাকে দুটো করে চিঠি লিখতো, আমিও উত্তর দিতাম। আমরা আগের মতোই ভীষণ ফ্রি ছিলাম কথাবার্তায়। একদিন , আমি অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছি , কুরিয়ার এলো আমার নামে। খুলতেই চিন্ময়ীর চিঠি। চিন্ময়ী লিখেছে :


"দু সপ্তাহ পরে নীলাঞ্জনের সাথে আমার বিয়ে। আমি , আমি তোকে কোনোদিন ভুলতে পারবো না রে চিরু ! তুই ভালো থাকিস, খুব ভালো থাকিস, আরো বড়ো হয়ে ওঠ। 

শুধু আমার বিয়েতে, তুই আসিস না, আমি হয়তো তাহলে নীলাঞ্জনকে দেওয়া কথা রাখতে পারবো না। "


++++++++++


সেই শেষ চিঠি চিন্ময়ীর আমাকে। আমিও আর ওর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখিনি তারপরে। এই সেই চিঠি, আমার হাতে। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম আমি বাইরের দিকে। তারপরে সময় দেখলাম। আর পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা বাকি। আমি ঠিক করে নিলাম, যেভাবেই হোক, একবার দেখা করতে হবে তুলির সাথে, চিন্ময়ীর সাথে। খুঁজে বের করতে হবে আমার অতীতকে।


++++++++++


- মামন, এই মামন , কোথায় গেলি তুই ? রান্নার আর কত দেরি ? এবার তো তবে বেরোতে হবে নাহলে চিরন্তন আবার অপেক্ষা করবে তোর জন্য এয়ারপোর্টে। 

বলতে বলতে সুদীপা ঢুকে এলেন রান্নাঘরে। ইরা এখনো এক মনে কিছু একটা করছে ; খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে রান্নার, রসুন আর কালো জিরে , সাথে ধনেপাতা আর লেবুর এক অসাধারণ গন্ধে ম ম করছে চারদিক। ইরার কাছে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে সুদীপা বললেন ,

- কি রে , তখন থেকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না ? ছেলেটার তো চলে আসার সময় হয়ে এলো। 


- ওঃ মা, তুমি ? না না, এখনো সাড়ে তিন ঘন্টা মতো বাকি আছে ওর আসতে। তাছাড়া এসে লাগেজ নিয়ে বেরোতে বেরোতে আরো ঘন্টাখানেক। আমি ঠিক পৌঁছে যাবো সময় মতো। তুমি উঠে এলে কেন ? বাবা কোথায় ? 


- তোর বাবা তো এখনো ঘুমোচ্ছে। হ্যাঁ রে , কি কি বানালি ? আমি কিছু করে দেবো ? 


- না মা, তোমাকে আর কিছু করতে হবে না, আমি সব আজ নিজের হাতে করেছি। এই দেখো, ওর পছন্দের মাটন রেজালা, চিকেন পোলাও, সাথে ট্যাংরা মাছের ঝাল, কুচো চিংড়ি পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা দিয়ে ভাজা; ভেন্ডি পোস্ত , বেগুন ভাজা আর চাটনি। আর একটু পায়েস বানিয়েছি, ফ্রিজে আছে কোল্ড ড্রিংক। 


- বাপরে , তুই কত কিছু করেছিস। তা জামাই এতো কিছু খেতে পারবে তো এতক্ষন জার্নি করে ? 


- কি যে বলো না মা, ওকে এইবেলা আমি কিছুই দেবো না , ও শুধু একটু সাদা ভাত আর ট্যাংরা মাছের ঝাল খাবে , সাথে দেবো বেগুন ভাজা। বাকিগুলো তো কাল। 

এই শেষ, আমার আজকের মতো রান্নাবান্নার পালা শেষ। চলো, ওপরে চলো ! কতদিন তোমার সাথে ভালো করে কথা বলিনি। আমিও শাড়ি পরবো আজকে , একটু সাহায্য করবে আমাকে , প্লিজ চলো ! 


- আচ্ছা বাবা চল, আর পারি না তোকে নিয়ে। 


একথা, সেকথা বলার পরে হঠাৎ করেই মাকে জড়িয়ে ধরে ইরা, মায়ের গালে গাল লাগিয়ে বলে, 

- একটা কথা বলবে মা ? একদম সত্যি একটা কথা ? 


- এ আবার কি ? তোর কাছে কি আমি কোনোদিন কিছু লুকিয়েছি ? তুই আমার একমাত্র মেয়ে , তোকেই তো আমরা দুজনে ছেলের মতো করে বড়ো করে তুলেছি। বল, কি হয়েছে তোর ? কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্ছে তোর মনের মধ্যে কিছু চলছে, তোর এই বাবার শরীর নিয়ে এমন গেলো, তোকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি। 


- মা তুমি কি, তুমি কি বাবাকে ভালোবাসো ? যাকে বলে সত্যিকারের ভালোবাসা, সেরকম ভাবে ? 


- মানে? কি যাতা বলছিস ! যতসব আজেবাজে কথা। প্রায় পঞ্চাশ বছর তোর বাবার সাথে একসাথে এতদিন কাটিয়ে দিলাম। আর আজ এই প্রশ্ন ? তোর লজ্জা করছে না নিজের মাকে এইরকম প্রশ্ন করতে ? 


- তুমিই তো বললে যা মনে আছে জিজ্ঞেস করতে। আচ্ছা এক কাজ করো , ভাবো, আমি তোমার মেয়ে নই , আমি তোমার সবথেকে প্রিয় বান্ধবী, এবার তো বলো ? 


সুদিপা ইরা কে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন , কিছু না বলে চুপ করে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে। ইরা মায়ের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে চুপ করে বসে গেলো , একটু পরে উঠে তাড়াতাড়ি করে পাউডার, মুখে একটু মেক আপ, চোখে কাজল লাগিয়ে নিলো। এবার বেরোতে হবে , আর দু ঘন্টা মতো বাকি আছে। এখান থেকে এয়ারপোর্টে যেতে সময় লাগবে ঘন্টাখানেক। হঠাৎ পায়ের আওয়াজে চমকে দরজার দিকে তাকালো ইরা। সুদীপা ঘরের ভেতরে এসে ঢুকলেন, হাতে একটা অনেকদিনের পুরোনো ফাইল। ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন সুদীপা। মেয়ের হাত ধরে ওকে বিছানায় বসিয়ে বললেন :

- ফাইলটা খোল ! 


ফাইলটা খুলতেই অনেক পুরোনো কিছু সাদা কালো ফটো বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। সব ফটোগুলো একটি ভদ্রলোকের। সাথে বেশ কিছু চিঠি। 


সুদীপা বলে উঠলেন, 

- মামন, তুই জানতে চেয়েছিলি না , আমি তোর বাবাকে ভালোবাসি কিনা ? সত্যি কথা বলতে কি, আমি জানিনা। ভালোবাসা আসলে কি সেটাই বুঝতে পারলাম না। এতবছর একসাথে ঘর করার জন্য, তোর বাবা এখন আমার একটা অভ্যেস হয়ে গেছে। ওর সবকিছু ভালোতে আমি খুশি হয়ে উঠি, ওর কোনো কিছু খারাপ হলে আমার কষ্ট হয়। ওর শরীর খারাপ থাকলে আমার রাতে ঘুম হয় না, ও সুস্থ হয়ে হাঁটাচলা করলে, তোর পেছনে লাগলে, হেঁড়ে গলায় জোরে জোরে গান করলে আমার খুব আনন্দ হয়। এটাই যদি ভালোবাসা , তাহলে আমি তোর বাবাকে ভালোবাসি, নিজের থেকেও বেশি। তবে কি জানিস, আমি সেই সাথে তোর বাবার ওপরে ভীষণ রেগেও যেতাম মাঝে মাঝে। তখন তুই খুব ছোট, বা তার ও আগে। তোর বাবা এমনিতে আমাকে কোনো কিছুতে বাধা দিতো না কখনো , আমি বিয়ের পরেও পড়তে চেয়েছিলাম তোর বাবা আপত্তি করে নি। কিন্তু আমি যখনই বললাম চাকরি করবো, আমাকে করতে দিলো না। আমার অনেক শখ ছিল বাইরে কোথাও প্রতি বছর ঘুরতে যাওয়ার , সে শখ কখনোই পূরণ করেনি তোর বাবা। যখনই ছুটি পেতো , চলে যেত নিজের গ্রামের বাড়িতে , সেটাই তার কাছে স্বর্গ , আমাকেও বাধ্য হয়ে যেতে হতো তোর বাবার সাথে। আমাকে কোনোদিন ঘরের কোনো কাজে সাহায্য করে নি, চেষ্টাও করে নি। তুই তখন পেটে , ছয় কি সাত মাস হয়ে গেছে , ওই অবস্থাতেও প্রতিদিন আমাকে বসে বসে ঘর মুছতে হতো , ঘরের সবকিছু কাজ করতে হতো। কোনোদিন নিজে মুখ ফুটে এগিয়ে এসে আমাকে সাহায্য না করে নিজে বেরিয়ে যেত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। তুই হয়ে যাওয়ার পরে রাতে যখন কাঁদতিস, সেটা নিয়ে আমাকে কম কথা শুনতে হয়নি তোর বাবার কাছে , তার নাকি ঘুমের অসুবিধে হচ্ছে। আমি কতরাত ওই সময় না ঘুমিয়ে থেকেছি। কম জ্বালা সহ্য করতে হয়নি আমায়। আবার খুব রেগে গিয়ে বেশ কয়েকবার আমার গায়ে হাত ও উঠিয়েছে তোর বাবা। সেই সব দিনগুলোতে মাঝে মাঝে মনে হতো সব ছেড়ে বেরিয়ে যাই ! মাঝে মাঝে মনে হতো এই লোকটা মরে গেলেই ভালো। এরকম আরো কত অপূর্ণতা রয়ে গেছে মনে মনে। তাই আমি সত্যি জানিনা, আমি তোর বাবাকে ভালোবাসি কিনা। 


ইরা এগিয়ে এসে মায়ের হাতের ওপরে হাত দিয়ে চাপ দিলো ,

- কি বলছো কি মা তুমি ? আমি, আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছি না ! আর এই ছবিতে যে আছে ? 


- এই ছবিতে যে আছে? ওই লোকটা আমাকে ভালোবেসেছিলো, হবে ভাবে অনেকবার আমাকে বলেছিলো , বুঝিয়েছিল। তখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ার , ওই লোকটিও এসেছিলো পড়তে। পড়া শোনায় খুব একটা ভালো ছিল না , তবে ছিল দু চোখ ভর্তি স্বপ্ন, সমাজ বদলের স্বপ্ন। ওর নাম ছিল রাধাকান্ত। আমরা সবাই ওকে রাধা বলে ডাকতাম। যেদিন আমার বিয়ে হয় তোর বাবার সাথে, সেদিন ও নিজে না এসে আমাকে লেখা চিঠিগুলো ওর এক বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠিয়েছিল। পরে আর কোনোদিন দেখা হয়নি রাধার সাথে। প্রায় বছর তিরিশ আগে শুনেছিলাম মধ্যপ্রদেশের কিছু পিছিয়ে পড়া জেলায় লোকজনের সাথে কাজ করছে। আর কিছুই জানি না। 


- মা, তাহলে তুমি এই রাধাকান্ত , এনার সাথে চলে গেলে না কেন? মনে তো হচ্ছে তোমার ও ওকে খুব পছন্দ ছিল ? 


- তোর কি মনে হয় ? যদি তোর বাবার সাথে বিয়ে না হয়ে আমি রাধার সাথে চলে যেতাম, সেটা অত সহজ হতো ? তখনকার সময়ের কথা ভেবে দেখ ! তখন লোকজন প্রেম ভালোবাসা এগুলো থেকে অনেক দূরে দূরে থাকতো। আর তখনকার দিনে পরিবারের সম্মান রক্ষার একটা ব্যাপারও থাকতো। আর যদি মেনেও নিই, আমি রাধাকান্তর সাথে বেরিয়ে গিয়েছি, ওর সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে, সেটাও কি খুব সুখের হতো ? আমি জানি না ! আসলে কি বলতো, প্রত্যেক মানুষেরই ভালো মন্দ সবকিছু থাকে। তুই এমন কোনো মানুষ পাবি না যার সবকিছু ভালো, ঠিক তুই যেরকম, যেভাবে চাস ! দিনের শেষে কোথাও একটা আক্ষেপ থেকেই যায় ! আসলে কি বলতো, আমাদের এই যে হৃদয়, এটা টুকরো টুকরো হয়ে বিভিন্ন জায়গাতে বিভিন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আমাদের এই হৃদয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠুরি থাকে, সেখানে কোনটা নিজের বাবা মায়ের জন্য, কোনোটা স্বামী বা স্ত্রী এর, কোনোটা বাচ্চাদের, কোনোটা দাদু, দিদা, ঠাকুমা, মামা, জেঠা , আরো অন্যদের জন্য ; আর আরো একটা বা বেশ কয়েকটা গোপন কুঠুরি থাকে, একদম পেছনে কোথাও, যাকে আমরা ঠেলে দূরে সরিয়ে রাখি। সেটা হচ্ছে আমাদের খুব পছন্দের কোনো মানুষের জন্য। সেই গোপন কুঠুরি আমরা খুলতে চাই না, তবে মাঝে মাঝে সেটাকে বাইরে এনে ঝাড়পোঁছ করে সেই ভালোলাগার রেশটুকু নিতে থাকি আমরা বিভিন্ন সময়ে। 


- মা ? তুমি , তুমি এতো কিছু ভাবো ? কখনো জানতেই পারিনি। মা একটা কথা বলবো ? বিভাসদা


সুদীপা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন ; 

-জানি রে , আমি সব জানি। কিন্তু কি আর করবি বল, সবাই যা চায়, সব সময় তো সব কিছু পূর্ণ হয় না। আর যা চেয়েছিস, সেটা যদি পেয়েও যাস, তবুও মন অন্য কাউকে দেখে অস্থির হয় , হৃদয় মাঝে মাঝে আনচান করে। তাই না ? আচ্ছা এবার, তুই এগো , নাহলে সময়ে পৌঁছতে পারবি না। আর বাবাকে এইসব কথা কোনোদিন বলিস না। তোর বাবা জানে না। কিছু কিছু কথা একান্তই নিজের হয় ; সেটাকে সযত্নে লালন করতে হয়। বুঝলি ? 

- মা, আমি ভেবেছি বিভাসদার কথাটা বলে দেবো চিরন্তনকে। জানি না ও কি ভাববে। 


- দেখ মামন, তুই বলবি কি বলবি না সেটা একান্তই তোর ব্যাপার , তোকেই ঠিক করতে হবে। তবে এরকম ও তো হতে পারে চিরন্তনের ও কাউকে ওখানে পছন্দ হয়েছে বা কোনোরকম কিছু সম্পর্ক হয়তো। সেটা ভেবে দেখেছিস ? জামাইয়ের যদি এরকম কিছু থাকে, আর ও যদি সেটা তোকে বলে , তুই কি করবি ? ভেবে দেখেছিস? এসব আজে বাজে চিন্তা ছেড়ে এবার দৌড় দে। 


আরো ঘন্টাখানেক পরে এয়ারপোর্টে দেখা ইরা আর চিরন্তনের। এতদিনের অদর্শনে, কেউ কাউকে সামলাতে পারলো না , দুজনেই দুজনকে জড়িয়ে ধরলো সবার সামনে। দুজনেরই চোখে ভর্তি জল। একটু পরে ইরা বলে উঠলো,

- এই কি হচ্ছে ! সবাই দেখছে তো। এবার বাড়ি চলো ! 


ভাড়ার গাড়িতে উঠে ইরা চিরন্তনের হাতের মুঠোর মধ্যে নিজের মুঠো ঢুকিয়ে ওর দিকে তাকালো। 

- বেশ রোগা হয়ে গেছো তো তুমি। চলো, তোমাকে এই কয়েকদিন খাইয়ে খাইয়ে আবার আগের মতো করে দেবো। এই জানো , তোমার পছন্দের সব কিছু রান্না করেছি, নিজের হাতে। তবে আজ রাতে একদম কিছু দেবো না। কাল খেয়ো সব। 


হাসতে হাসতে চিরন্তন বললো 

- আচ্ছা, তাই হবে ; তোমার জন্যও আমি সারপ্রাইজ আছে। তবে এখন একদম বায়না করবে না , রাতে দেবো , কেমন ? 


- এই যাঃ , খালি আজে বাজে কথা ! গাড়ির মধ্যে আমরা বসে আছি, সে খেয়াল আছে ? আচ্ছা, তোমার মনে আছে তো ? এখন আমরা আমার মা-বাবার কাছে থাকবো ? বাবার শরীরটা এখন ও পুরো সুস্থ হয়ে ওঠেনি গো। মাঝে মাঝে খুব চিন্তা হয়। 


- আরে আমি কি কিছু বলেছি তোমাকে ? আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। আমার তো আর মা, বাবা নেই ;তোমার মা বাবাই আমার মা বাবা এখন। বুঝেছো ? 


ইরার চিবুক ধরে নাড়িয়ে দিলো চিরন্তন। একটু পরেই ইরা চিরন্তনের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে , চিরন্তনের হাত আগলে রাখে ইরা কে। 


একটু পরেই চিরন্তন আর ইরা নাম গাড়ি থেকে , সামনেই ইরার মা বাবা দাঁড়িয়ে আছে। ওদের প্রণাম করে চিরন্তন ইরা কে নিয়ে ঢোকে ভেতরে। হঠাৎ ইরার ফোনে একটা ফোন আসে, ইরা কলটা রিসিভ করে , কিছুক্ষন শুনেই চেঁচিয়ে ওঠে : 

- কি ? কি বলছেন কি আপনি ? না না এ কি করে সম্ভব ? আমি তো এখন ছুটিতে আছি। এখন আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় ! 


চিরন্তন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 

- কি হোলো ? 


- আর বোলো না, কাল দিল্লী থেকে ফ্যাক্টরি দেখতে আসছে কিছু ক্লায়েন্ট আর সরকারি কিছু আমলা। তাই সবাইকে থাকতে হবে কাল। এখন আমি ছুটি নিয়েছি , তোমার সাথে এই কয়েকদিন থাকবো বলে। 


চিরন্তন এগিয়ে এসে ইরা কে বললো :

- ইরা, বাচ্চাদের মতো কোরো না। সরকারি লোকজন আসছে, ক্লায়েন্ট থাকবে। না না তোমার যাওয়াটা জরুরি। আমি তো মা বাবার সাথে আড্ডা দিয়ে ঠিক কাটিয়ে দেবো।  


- বলছো ? তুমি রাগ করবে না তো ? 


- রাগের কি আছে ? আচ্ছা ছাড়ো , এবার আমার খুব খিদে পেয়েছে। মা ? মা? দাও, কি মিষ্টি আছে দাও আমাকে খেতে। একটু শরবত করে দেবে ? লেবু নুন চিনি দিয়ে ? 


++++++++++  


আজ বাড়িতে যেন উৎসব শুরু হয়েছে অনেকদিন পরে। সারা সন্ধেতে সারা বাড়িতে চলছে গান , কখনো রবীন্দ্রসংগীত , কখনো বা আধুনিক, কখনো আবার বিভিন্ন ব্যান্ডের গান। রান্না সব করাই ছিল, ইরা কে সেসব নিয়ে আর ভাবতে হয়নি। চিরন্তন অনেক রকমের চকলেট নিয়ে এসেছে বিদেশ থেকে , সেগুলো কত বিভিন্ন রকমের! এছাড়াও নিয়ে এসেছে বেশ কিছু কুকিজ আর কেক সাথে করে। ইরার মা বাবা লো ফ্যাট লো সুগার কেক নিয়ে বসেছে বাইরের ঘরে, সাথে আছে ধোঁয়া ওঠা গরম চা। বাবা জিজ্ঞেস করলেন :

- মামন, জামাই কোথায় গেলো রে ?ও কিছু খাবে না ? 


- জানি না কি করছে রান্না ঘরে, আমাকে তো ঢুকতেই দিলো না, জোরে করে বের করে দিয়েছে। আসছে একটু পরে, তোমরা খাও। 


আরো মিনিট দুই পরে চিরন্তন বাইরে এলো , সাথে করে একটা বড়ো বাটিতে নিয়ে এসেছে ঝাল মুড়ি , নিজের হাতে তৈরী করেছে পিঁয়াজ , লঙ্কা, আমতেল, নারকেল, গাজর, শশা, টুকরো করে কাটা আলু আর চানাচুর মিশিয়ে। এসেই বসে পড়লো মেঝেতে , ইশারায় ইরা কে বসতে বললো ওর পাশে। ইরা বসার পরেই একমুঠো মুড়ি মুখে ঢুকিয়ে বলে উঠলো :

- আহ, কতদিন খাইনি। এইসব জিনিস বুঝলে, ও দেশে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও, সেই পরিবেশটা তৈরীই হয় না কেন কে জানে ? নাও নাও ইরা , দেখো আমি নিজের হাতে তৈরী করেছি সব। বাবা, মা, তোমরাও নাও ! 


ইরা মুড়ি নিতে নিতে বললো :

- আর রান্নাঘরটা রেখে এসেছো তো নোংরা করে ? আমাকে আবার সব পরিষ্কার করতে হবে। কি হতো চা এর সাথে কেক আর কুকিজ গুলো খেলে ? 


মা বলে উঠলেন: 

- আহ মামন, ছেলেটা কতদিন এইসব খায় নি, কেন এরকম করছিস? আচ্ছা তোকে চিন্তা করতে হবে না, আমি সব পরিষ্কার করে দেবো। 


খাওয়া শেষে ইরা রান্নাঘরে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো :

- এসব কি করেছো তুমি, চিরন্তন ? এতো সব পরিষ্কার , কোনো নোংরা কিছুই নেই। কখন করলে এই সব। 


চিরন্তন পেছন থেকে এসে , ইরা র কাঁধে হাত দিয়ে বললো,

-ম্যাডাম , সব শিখে গেছি আমি ওই দেশে গিয়ে, বুঝেছো ? 


সেদিন রাতে খাওয়ার হয়ে গেলে, বাবা মা ঘুমোতে চলে গেলো। ইরা সবকিছু কাজ শেষ করে বাসন পত্র মাজা শেষ হতেই , বাইরের ঘরে বসে থাকা চিরন্তন এসে দাঁড়ালো পাশে। ইরা কে জড়িয়ে ধরলো, ওর ঠোঁটের ওপরে আঙ্গুল রেখে ওকে চুপ করতে বললো চিরন্তন। কোলে তুলে নিলো ইরা কে। ফিসফিস করে কৌতুকের স্বরে বলে উঠলো ইরা :

- কি হচ্ছে কি ? মা বা বাবা কেউ চলে আসবে ! ছাড়ো আমাকে ! 


-সস্স , কেউ আসবে না ! আর এলেই বা কি, জামাই ওদের মেয়েকে আদর করছে, ওরা থোড়াই বাধা দেবে ? 


চিরন্তন কোলে করেই ইরা কে নিয়ে উঠে এলো ওপরে ওদের রুমে। আগে এই রুমটা ইরার ছিল , এখন বাবা আরো কিছু খরচ করে রুমটাকে আরো বড়ো করেছে, যাতে বিয়ের পরে দরকার হলে , মেয়ে জামাই ওদের বাচ্চারা সবাই থাকতে পারে। রুমের সাথেই একটা ছোট্ট লাগোয়া রুম আছে বাচ্চাদের জন্য। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন বছর , এখনও বাচ্চা নিয়ে কিছু ভেবে উঠতে পারেনি ওরা। 


চিরন্তন ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে, জড়িয়ে ধরে ইরা কে , ইরা ও নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় চিরন্তনের ঠোঁটের মধ্যে। ইরা কে ধীরে ধীরে বিছানার ওপরে বসিয়ে , চিরন্তন বলে :

-দাঁড়াও, তোমার জন্য অনেক কিছু আছে , অনেক উপহার, সারপ্রাইজ।  


ব্যাগটা খুলে বের করলো পারফিউমগুলো একের পর এক , আর বের করলো কিছু ড্রেস। 

- এত্তো পারফিউম ? সব আমার জন্য ? আর এই প্যাকেটে কি আছে শুনি ? 


প্যাকেট খুলেই আঁতকে ওঠে ইরা ;

- ছিঃ, তুমি কি ভেবেছো , এগুলো আমি পরবো ? এগুলো পরা আর না পরার মধ্যে কি পার্থক্য আছে বলোতো চিরু ? শুধু যেখানে ঢাকা থাকার কথা, সেইটুকুতেই কাপড়ের ছোট্ট টুকরো, বাকি সবই তো দেখা যাচ্ছে ! তোমার কাছে আমার কি কিছু লুকোনোর আছে ? 


- আরে ইরা, বি আ স্পোর্ট ! একবার পরে তো দেখো , নিজে তোমার জন্য গিয়ে পছন্দ করে কিনেছি। 


- তারপরে কি হবে ? লাইট অফ করে নাঙ্গা নাচ ? পারোও তোমরা ছেলেরা ! সত্যি ! ঠিক আছে, আমি পরছি একটা। 


ভেতরে চলে গেলো ইরা। একটু পরেই ইরা বাইরে বেরিয়ে এলো। শরীরের ওপরে একটা পাতলা ফিনফিনে ছোট্ট একটা নেগলিজে; ভেতরে লেসের কাজ করা অন্তর্বাস, বাইরে থেকেই প্রকট হয়ে আছে। লজ্জা লজ্জা মুখ করে এসে ইরা ঝাঁপিয়ে পড়লো চিরন্তনের বুকে ;

- এই আমার লজ্জা করছে ; আমি পারবো না এগুলো পরতে ! 


চিরন্তন ওকে নিয়েই গড়িয়ে গেলো অন্যদিকে, এখন ইরা নিচে, চিরন্তন ওর ওপরে, ধীরে ধীরে ওকে আদর করতে করতে বলে উঠলো :

- আহ, কি মিষ্টি ইরা ; তোমার গন্ধ, তোমার শরীরের গন্ধ, মাথার চুল, হাত, পা সব আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। কতদিন, কত রাত ভালো করে ঘুমোতে পারিনি তোমাকে পাশে না পেয়ে। মনে হচ্ছে , আজ সারা রাত ধরে শুধু আদর করে যাই তোমাকে। 


ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে নিতে ইরা বলে উঠলো :

- আচ্ছা শোনো, আজ থাক না প্লিজ। কাল আমার আমাকে সকালে বেরিয়ে যেতে হবে ; তারপরে তো আরো দিন দশেক ছুটি। আর তুমিও এতদূর থেকে এসেছো। প্লিজ, লক্ষীটি। কতদিন তোমার এই চওড়া বুক পাইনি আমি , আজ আমাকে একটু তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে দাও ! 


চিরন্তন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে এলো ইরার কাছ থেকে ; ইরা ওর বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো পাশে। চিরন্তন চুপ করে গেছে, কিছুই বলছে না। ইরা বললো :

- কি গো, রাগ করলে ? বলোনা ? তুমি রাগ করলে আমি কি করে ঘুমোবো ? 


- না না, রাগ কেন করবো। ঠিকই তো বলেছো তুমি। 


একটু পরেই চিরন্তনের চোখ বন্ধ হয়ে গেলো, ইরা লাইটের সুইচ অফ করে দিলো, কিন্তু ঘুম আসছে না আজকে। 


চিরু কি আমাকে আদৌ ভালোবেসেছে কোনোদিন ? নাকি শুধুই আমার শরীরটাই চায় ? আমার মন, আমার ভালোলাগা , খারাপলাগা থাকতে পারে না? ও জানে আমি এইসব সিল্কের অন্তর্বাস পরতে ভালোবাসি না , তারপরেও সেই সব কিনে আনলো। কি ভাবে আমাকে ? আমাকে নিজেকে কি ওর জন্য চেঞ্জ হতে হবে ? কিছু না পরে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে শুলেইতো, এমনিতেই শরীরে শরীর লেগে উত্তেজনা চলে আসে ! কি দরকার এইসব ফালতু জিনিসের পেছনে টাকা খরচ করে, জানি না। 


চিরন্তনও অন্ধকারে শুরু করলো নিজের সাথে কথা ; এতদিন পরে এলাম, তবুও ইরা এতো ঠান্ডা? ও কি আমাকে ভালোবাসে না ? এতদিন পরে এলাম, কোথায় আমরা আনন্দ করবো, একসাথে সারা রাত জাগবো, ও আমাকে পাগল করে দেবে, আমি ওর সারা শরীর সেই আদিম সুখে বারবার কাঁপিয়ে তুলবো ; কিন্তু ওর তো কোনো ইচ্ছেই নেই। ইরা কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে ? 


একটু পরেই দুজনে চলে গেলো ঘুমের দেশে। পরের দিন সকালে উঠে সবাই একসাথে ব্রেকফাস্ট করে , তারপরেই ইরা বেরিয়ে যায় অফিসের কাজে। বারবার চিরন্তনকে বলে: 

- সরি চিরু, তোমাকে আজকে ছেড়ে যেতে আমার একদম ভালো লাগছে না, এতদিন পরে এলে তুমি। আর প্লিজ,প্লিজ তুমি রাগ করে থেকো না কাল রাতের জন্য। আমি তো তোমারই ; একটু বোঝার চেষ্টা করো। 


চিরন্তন ওকে জড়িয়ে ধরে ওর মুখটা নিজের দুই হাতে নিয়ে , ইরার চোখে চোখ রেখে বললো :

- আমি জানি ইরা , আমি রাগ করিনি ! তুমি আজ সব কাজ শেষ করে এসো ভালো করে। কাল থেকে কিন্তু পরের দশদিনের জন্য পুরোপুরি আমার, আমি আর কারোর কাছে আমার বৌকে ছাড়বো না।      


নাকে নাক লাগিয়ে আদর করলো ইরাকে চিরন্তন। ইরা চলে গেলো অফিসে। অফিসে চলে যাওয়ার পরে চিরন্তন ভাবলো , আজ আর কি করবো আমি একা বুড়ো বুড়ির সাথে ! আমিও একটু ঘুরে আসি , দেখে আসি যদি তুলি বা চিন্ময়ীর সাথে দেখা হয়ে যায় ! দেখে আসি ওদেরকে, কেমন আছে ওরা !


তুলি আজকের দিনে থাকে সেই পুরোনো কলোনিতেই , ওর স্বামী মনে হয় ওখানেই অফিসে কাজ করে। ইরার বাড়ি থেকে, ট্রেনে আধঘন্টার দূরত্বেই ওদের সেই ছোট্ট কলোনি। ট্রেনে উঠে চিরন্তন দাঁড়িয়ে পড়ে দরজার সামনে ; কতদিন এইভাবে হাওয়া খেতে কেহতে যাওয়া হয় নি। হকারদের রকমারি জিনিসপত্র বেচাকেনার শব্দ, কিশোরকণ্ঠী ,বাউলের মিঠে সুর শুনতে শুনতে এসে পৌঁছলো নির্দিষ্ট স্টেশনে চিরন্তন। ওর পকেটে আছে ছোট্টবেলার সেই ফটোটা। একটা অটো নিয়ে মিনিট দশের মধ্যেই চলে এলো পুরোনো কলোনিতে চিরন্তন। বাড়িটা খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধে হলো না ওর। ফেসবুকে অনেকদিন আগে তুলি কলোনির ফটো দিয়েছিলো, সেখানে ওর কোনো পরিচিত কে লিখেছিলো কত নম্বর বাড়িতে থাকে ও ! ভীষণ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ;চিরন্তন ছোটবেলায় যে বাড়িতে থাকতো, এখন তুলি সেই বাড়িতেই থাকে। 


রাস্তার কত পরিবর্তন হয়েছে, সেই ছোট্ট খেলার মাঠ আজ আর নেই, শুধুই আগাছার জঙ্গল। যেখানে জীবনের প্রথম অনেকগুলি বছর কাটিয়েছিলো, সেই পাড়াটাও কিরকম ভেঙে গেছে, পুরোনো বিল্ডিংগুলো কতদিন যে রিপেয়ার হয় নি, পলেস্তারা ভেঙে , ভেতরের কাঠামো বেরিয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই জীবন-যাপন করছে অনেক লোকজন। সেই বাগানদাদুর বাগান আজ আর নেই, সেখানে হয়েছে গাড়ি রাখার গ্যারেজ। 


যে দেশলাইয়ের খোপ এ বড়ো হয়ে ওঠা, সেই বারান্দাও আজ লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। চিরন্তন ধীরে ধীরে উঠলো ওপরে, সাবধানে, এককালে যে সিঁড়িতে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠতো, সেই সিঁড়ির ভগ্নদশা দেখে ওর চোখে জল চলে এলো আজ। ওর ছোটবেলার মহলের সামনে এসে, কলিং বেল বাজালো। একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখলো সামনের বাড়ির বন্ধ দরজার দিকে। এইবাড়িতেই থাকতো তুলি, সেই কত বছর আগে, দুই বারান্দায় , দুজনে দাঁড়িয়ে কত খেলা, আড্ডা , চিৎকার চেঁচামিচি। 


দেওয়ালের ওপরে হাতের ছাপ ছিল না? কত পেন্সিল দিয়ে আঁকি-বুকি, রঙের দাগ ! সব হারিয়ে গেছে আজ। ঘরের ভেতরে দেওয়ালে বল মেরে ক্রিকেট প্র্যাক্টিস বা মায়ের সাথে খুনসুটি, বাবার সাথে বসে বসে গল্পের বই পড়া সব আজ স্মৃতি। আবার একবার কলিং বেল বাজালো চিরন্তন। একটু পরে একটি ছোট ছেলে দরজা খুলে দাঁড়ালো। 

- কাকে চাই ? আমরা কিছু কিনবো না কিন্তু। 


চিরন্তন দেখেই চিনতে পারলো, তুলির দুই ছেলের মধ্যে একজন , ঠিক যেন তুলির মুখ কেটে বসানো। নিচু হয়ে বসে বললো , 

- তোমার নাম কি ? ঘরে কেউ নেই ? তুমি জানো, এই এই ঘরে আমি বড়ো হয়েছিলাম, তখন আমার তোমার মতোই বয়স !


ছেলেটি বললো :

- মা তো নেই , মা একটু বাইরে গেছে দাদাকে আনতে ! 


- ওহ, তাহলে তো খুব অসুবিধে হয়ে গেলো। আচ্ছা শোনো, তুমি জানো, তোমার মা ছোটবেলায় কি দুস্টু ছিলো ? এই দেখো, এটা কে বলোতো ? 


ফটোটা বের করে ছেলেটার হাতে তুলে দিলো চিরন্তন। ছেলেটা দেখে বললো :

- জানি না কাকু, কে এটা ? 


- এইটা, আমি ; আর এই যে , এই বাঁদরীটা তোমার মা। 


ছেলেটা কোমরে হাত দিয়ে রেগে মেগে তাকালো চিরন্তনের দিকে :

- এই আমার মাকে তুমি বাঁদরী বলবে না , বুঝেছো ?  

হাসতে হাসতে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলো চিরন্তন , ওর মাথায় হাত দিয়ে, ওর কপালে আদর করে বললো, 

- আচ্ছা, ঠিক আছে আর বলবো না। এই ফটো, এটা তুমি তোমার মাকে দিয়ে দিও পরে। আমি এবার যাই , ঠিক আছে ? আর মা জিজ্ঞেস করলে কি বলবে ? তুমি বলবে , পান্ডব গোয়েন্দার বাবলু এসেছিলো তার বিচ্ছুর সাথে দেখা করতে। কেমন ? মনে থাকবে তো ? 


চিরন্তন বেরিয়ে এলো ওখান থেকে, আরো বেশি কিছুক্ষন থাকলে পুরোনো সব স্মৃতির ভারে চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসবে।


++++++++++  


একটু পরে হাঁটতে হাঁটতে আমি চলে এলাম স্কুলের পাশে , এই সেই স্কুল যেখানে চিন্ময়ীর সাথে আলাপ, পরিচয়, ওর সাথে কত আড্ডা। স্কুলের পাশেই একটা ছোট নদী ছিল, আজও কি আছে সেটা একইরকম ? এগিয়ে গেলাম নদীর দিকে আমি। নদীর ধারটা এখন খুব সুন্দর করে বাঁধানো হয়েছে, তৈরী হয়েছে অনেক বসার জায়গা। নদীর পাড়ে কোনো গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না, শুধুই বাইসাইকেল। দেখে খুব ভালো লাগলো আমার , আমাদের সময়ে যদি এরকম ভাবে সবকিছু পরিকল্পনা করে সাজানো হতো। আমাদের সময় না ছিল কোনো বসার ঠিকঠাক জায়গা, না ছিল ঘোরার জন্য রাস্তা। আমরা সবাই আড্ডা দিতে এসে, ভেজা মাটির ওপরেই বসে পড়তাম, কখনো বা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতাম। আবার যারা প্রেম করতো, খুঁজতো ঝোপ ঝাড়ের আড়াল। অনেকসময় কানে আসতো , কোনো মেয়েকে তুলে নিয়ে চলে গেছে কেউ এই নদীর ধার থেকে, বা পাওয়া গেছে কোনো মৃতদেহ। এইসব ভয় তো সব সময় ছিলই মনের মধ্যে, তবে আমরা চেষ্টা করতাম একসাথে দল বেঁধে গিয়ে আড্ডা দিতে। সাথে থাকতো ঝাল মুড়ির প্যাকেট, বা আলুকাবলি বা দেশি চানা দিয়ে তৈরী চানা মশলা ! তখন সন্ধ্যের অন্ধকার হতে শুরু করলেই, আমরা আর থাকতাম না, চলে আসতাম সবাই সবাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে।  


এখন তো, বাঁধানো রাস্তা, পাশে স্ট্রিট লাইট, বেড়েছে দোকানের সংখ্যা। দেখলাম অনেকেই নদী ধারে বসে আছে অলস হয়ে। হয় তাদের কোনো কাজ নেই, নাহলে স্কুল পালিয়ে এখানে আড্ডা দিচ্ছে। আমি খুঁজে খুঁজে এগিয়ে গেলাম আমাদের অনেক পুরোনো চেনা জায়গাতে, একটা বিশাল বড়ো অশ্বত্থ গাছ , দাঁড়িয়ে আছে এখনও তার সব রং রূপ নিয়ে। কে জানে কত বছরের পুরোনো এই গাছ , যখন থেকে আসা শুরু করেছিলাম সেই কয়েক দশক আগে, তখন থেকেই দেখছি এই বিশাল মাশরুমের মতো গাছটাকে। কত বৃষ্টির বিকেলে যে এর ছায়াতে দাঁড়িয়ে থেকেছি , কত গরমের দুপুরে আমরা সব ক্লাস পালানো বন্ধুরা এসে এখানে, এর নিচে বসে দিয়েছিলাম আড্ডা, আর কত গোধূলী লগ্নে এখানেই এক কোণে বসেছি আমি আর চিন্ময়ী।  


অনেকে অনেকবার বলেছিলো চিন্ময়ীর থেকে দূরে থাকতে, তবুও নিজেকে সামলাতে পারিনি কোনোদিন সেই সময়। আমার জীবনের সবথেকে ভালো বন্ধু ছিলো যে চিন্ময়ী! ওর সাথে সব রকম কথা বলতে পারতাম , সব রকম ভালোলাগা - খারাপলাগা, মন খারাপের দিন, সব কিছু আলোচনা হতো আমাদের , যেটা হতো না, সেটা ছিল পড়াশোনার কথা বা ভবিষ্যৎ জীবনে কে কি করবো, কিভাবে কোথায় থাকবো, সেসব নিয়ে আমরা কথাই বলতাম না। আমাদের দুজনের ভালোলাগা, খারাপ লাগাগুলো কিরকম যেন একই রকমের ছিল, তাই ওর মধ্যে যেন খুঁজে পেতাম নিজেকে। চিন্ময়ীও ওর পরিবারের সমস্যা, নীলাঞ্জনের সাথে ওর মন কষাকষি, কাউকে দেখে হঠাৎ ভালো লাগা, সব কিছু বলতো আমাকে। ওর দিদির প্রেম, বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে, দুই বাচ্চা , তার মধ্যে মেয়েটা হওয়ার পরে চিন্ময়ীর কাছে তার বেড়ে ওঠা , ছেলে হওয়ার পরে স্বামীর অন্য একটা মেয়ের প্রতি ভালোবাসা, মারামারি, অশান্তি , আবার ওর দিদির সব ছেড়ে, এক কাপড়ে ছেলেটাকে নিয়ে ফিরে আসা ! এইসব কত গল্প, কত কথা আমাদের হতো। বয়সের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি পরিণত হয়ে গিয়েছিলো চিন্ময়ী। যে বয়সে আমরা খেলতাম, ছুটে বেড়াতাম , সিনেমা দেখে, টিভি দেখে আনন্দে দিন কাটাতাম , তখন থেকে চিন্ময়ী , ঘরের যাবতীয় কাজ, পড়ার পাশাপাশি নাচের প্রোগ্রাম বা পেন্টিং করে রোজগার , কি না কি করেছিল সেই সময়। ওর দিদির মেয়েটা আমার খুব ন্যাওটা ছিল সেই সময়। যখনই ওদের বাড়িতে যেতাম, আমার কাছে চলে আসতো, উঠে পড়তো আমার কোলে। কে জানে কেমন আছে মেয়েটা, এতদিনে বয়সে অনেক বড়ো হয়ে যাবে, হয়তো বিয়ে করেছে, হয়তো বা চাকরি। এইসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম আমি। বসে পড়লাম আমি সেই বুড়ো অশ্বত্থ এর তলায় ! 


বিভিন্ন স্মৃতির ভিড়ে যখন মন উদাস, হঠাৎ একটা খসখস শব্দে চমকে পাশে তাকালাম। ঘুরে তাকাতেই দেখি চিন্ময়ী বসে পাশে। চেহারায় বেশ একটা ঔজ্বল্য, চাকচিক্য এসেছে ওর। অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম :


- তুই? তুই এখানে ? 


চিন্ময়ী আমার দিকে না তাকিয়ে , সামনে নদীর ধীরে ধীরে বইতে থাকা জলের দিকে চোখ রেখে,  

- আমি তো এখানে প্রায় প্রত্যেকদিন চলে আসি , এই জায়গাতেই বসি । বসে থাকি অনেকক্ষন। আজ এখানে তুই হঠাৎ ? এতো বছর পরে ? এলিই যখন, এতো দেরি করলি কেন ? এখানে বসে, সেই সব দিনের কথা ভাবি , তোকে খুব মিস করি। 


- আর নীলাঞ্জন ?  


- নীলাঞ্জন ? ও আছে ওর মতো, মানে ও এখন ভিয়েনাতে, অফিসের কাজে লাস্ট পাঁচ বছর ধরে ওখানেই আছে। বছরে একবার করে আসে, তাও সাতদিনের জন্য। আমাকে যেতে বলেছে অনেকবার। বাবা মারা যাওয়ার পরে মা এখন ভীষণ একা , কি করে মাকে ছেড়ে যাই বলতো ? 


- ওহঃ ! চিনু, তুই সুখী হয়েছিস ? তোকে এতো মনমরা লাগছে কেন ?


আমার হাতের ওপরে নিজের হাত রেখে বললো চিন্ময়ী , 

- তোর কি মনে হয় চিরন্তন, আমরা কি কোনোদিন ও প্রকৃত ভাবে সুখী হতে পারি ? আমি তোর কথা জানিনা ,তবে তোর আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে ? 


- দেখে তো ভালোই লাগছে এখন, আগের থেকে অনেক ভালো। 


- তুই পাল্টে গেছিস চিরন্তন , আমাকে দেখে আজকাল আর কিছু বুঝতে পারছিস না। তবে সেটা হয়তো ভালোই হয়েছে সবার জন্য। আমি, আমি ভালো নেই রে। তোর তো কিছুই অজানা নেই ! নীলাঞ্জনের সাথে আমার সেই ছোট্টবেলার প্রেম, তারপর বিয়ে। কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, বিয়ে করে কি পেলাম ? চাকরির জন্য , নিজের কেরিয়ারের জন্য ও আজ অন্য দেশে ; আমি আরেকটা জায়গাতে! অনেকদিনের পুরোনো প্রেমের সাথে ঘর বাঁধলাম, সেখানে কেন আমি সুখী হতে পারিনি ? তার ওপরে, রয়েছে মায়ের দায়িত্ব, জানিস তো দিদি কিরকম দুর্বল ;নিজে পায়ে যাতে দাঁড়াতে পারে, আমি ওকে ব্যবসা করতে সাহায্য করেছিলাম , ও সেটাও পারলো না। সাথে আছে দিদির মেয়ে আর ছেলেটা। ছেলেটা এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ; আর মেয়েটাতো এখন কানাডা বা আমেরিকা, কোথাও একটা আছে!

 

- দেখি না তোর দিদির মেয়েটার ফোটো , আমাকে মেল করে দিবি পরে ? অনেকদিন ওকে দেখিনি ! 


- আচ্ছা দেবো। আর জানিস ? আমি নীলাঞ্জনের কাছে মাঝখানে গিয়ে প্রায় আট মাস ছিলাম , কিন্তু ও যখন অফিসে বেরিয়ে যেত, তখন অত বড়ো দেশটা আমাকে যেন গিলে খেতে আসতো ! একটা কথা বলবো তোকে ? তুই হয়তো আমাকে খারাপ ভাববি ! তবুও, দেখ তোর কাছে তো আমি কখনো কিছুই লুকোয়নি। তুই আমার অনেক গোপন কথা জানিস। 


- বল না , তুই কি বলতে চাস আমাকে বল ! আমি যদি কোনোভাবে তোকে কোনোরকম সাহায্য করতে পারি ! 


চিন্ময়ী আমার চোখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো একভাবে , যেন আমাকে পড়ার চেষ্টা করছে। একটা অস্বস্তিতে আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। 

- সেটা তুই ঠিক বলেছিস চিরন্তন , তোকে আমি সবকিছু বলতেই পারি , তবে তুই আমাকে কোনোরকম সাহায্য করতে পারবি না। এখন সেই দিনগুলোও নেই, নেই সেই সময়। আসলে কি জানিস তো, ভেতরে ভেতরে এমন কিছু কথা থাকে, যেটা হয়তো নিজের স্বামী বা স্ত্রী কে বলা যায় না ; সেগুলো শুধু হয়তো এমন কোনো বন্ধুকে বলা যায়, যে আমার সব কিছু জেনেও আমাকে কোনোরকম ভাবে বিচার করার চেষ্টা করবে না, শুধু চুপ করে আমার কথা শুনবে। যেটা বলছিলাম তোকে, নীলাঞ্জনের সাথে বিয়ে হওয়ার ঠিক কয়েকদিন পরের কথা এগুলো...আমি জানতে পারি নীলাঞ্জন পুরুষ হিসেবে অক্ষম , মানে, মানে পুরুষ হিসেবে কোনো মেয়েকে ও শারীরিক ভাবে সুখী করতে পারবে না কোনোদিন। ওর, ওর পুরুষাঙ্গ বা যৌনাঙ্গ উত্থিত অবস্থায় ছোটো , অস্ত্রোপচার করেও ঠিক করা যাবে না! আমাকে ও কখনোই তৃপ্ত করতে পারেনি। 


চমকে তাকালাম আমি চিন্ময়ীর দিকে, ওর হাতের ওপরে হাত রাখলাম ! হাতটা সরিয়ে নিলো চিন্ময়ী , দেখলাম চোখের কোণে জলের ফোঁটা ! আমি বললাম ,

- কিন্তু তোদের এতদিনের প্রেম, এতদিনের সম্পর্ক , তোরা জানতে পারিস নি কোনোদিন ? 


- আমরা দুজনে মিলে ঠিক করেছিলামরে , বিয়ের আগে কোনোরকম ভাবে আমরা শারীরিক ভাবে মিলিত হবো না ;আজকাল তো কথায় কথায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলো এর তার সাথে শুয়ে পড়ে ! আজকাল ভালোবাসা প্রেম এসব কিছু পরে, আগে শরীর। 

নীলাঞ্জন আগে আমাকে বলেছিলো, বলার চেষ্টা করেছিল। আমিই পাত্তা দিই নি কখনো। সব সময় বলতাম যা কিছু খামতি আছে, প্রেম ভালোবাসাতে সব পূর্ন করে দেবো ! তবে পরে বুঝলাম, সবকিছু পূর্ণতা, শুধু মাত্র কথায় , প্রেমে হয় না ! কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে। ও আমাকে কষ্ট পেতে দেখে বলেছিলো ডিভোর্স করতে ; আমি পারিনি , আমি পারিনি ওর থেকে সরে আসতে ! ওকে যে আমি খুব ভালবাসতাম। তখন ও আমাকে কি বলেছিলো জানিস ? নীলাঞ্জন আমাকে বলেছিলো, চিন্ময়ী, তুমি অন্য কারোর সাথে প্রেম করতে পারো, ঘুরে বেড়াতে পারো, ফ্লার্ট করতে পারো, ঝাড়ি মারতে পারো , তবে শেষে তোমাকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। ও জানতো আমার এই দুর্বলতার কথা। 


আমি একটু রেগেই গেলাম, একটু গলা তুলে বললাম : 

- তা বলে তুই নিজের শখ আল্হাদ ছেড়ে ; আমি জানি না কি বলবো তোকে। 


হেসে তাকালো আমার দিকে চিন্ময়ী ,

- সে জন্যই তো বললাম, তুই আমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবি না। জানিস, তুই চলে যাওয়ার পরে, নীলেশ নামের একজনের সাথে আলাপ হয়েছিল কাজের সূত্রে। সে তো আমার পেছনেই পড়ে গেলো, আমার ফোন নাম্বার নিয়ে, রোজ রাতে আমাকে ফোন করা , আমার সাথে গল্প করা। ও বলতো, ওর বৌকে নাকি ও খুব মিস করছে, আর আমাকে নাকি ওর বৌ এর মতো দেখতে, সেরকমই ছোটোখাটো, সেরকমই চেহারা। প্রথম প্রথম আমি হাসতাম, পরে না আমিও কিরকম দুর্বল হয়ে পড়লাম ওর ওপরে। আমি নীলাঞ্জনাকে বলেছিলাম , ও আমাকে হাসতে হাসতে বলেছিলো, তাহলে আর কি , তোমার একটা প্রেমিক জুটেই গেলো ! একদিন , এক বিকেলে আমি গিয়েছিলাম ওর বাড়িতে , সেই সপ্তাহে ও বাড়ি যায় নি ! সেদিন ওর বাড়িতে গিয়ে আমার খুব খুব আদর খেতে ইচ্ছে করছিলো নীলেশের। তবে কিসের যেন একটা বাধা , জানিনা সেটা কি ! আমি পালিয়ে এসেছিলাম সেদিন ওখান থেকে। আর পরে কোনোদিন নীলেশের সাথে কথা হয় নি। 


আমি দেখলাম ওর দুচোখে ভর্তি জল। সত্যিই তো মানুষ এর মন , কিভাবে বোঝা যায় ? আদৌ কি পাওয়া যায় কারোর মনের গভীরের খবর ? আমি ওর হাত টেনে নিলাম আমার দিকে , ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম ,

- আসলে কি জানিস তো চিন্ময়ী, মানুষ মাত্রেই পলিগ্যামাস! মনের দিক থেকে তো অবশ্যই, তাই বার বার আমাদের প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে , বার বার ইচ্ছে করে পুরোনো দিন ফিরে পেতে যখন ছিলো না কোনো নিয়ম বা সমাজের বাধা ধরা অনুশাসন। একজনকে ভালোবেসেও। অন্যের হাত ধরা , তারপর গোপন নিভৃতে তার কথা ভেবে চোখের জল ফেলা। জানিস, আমার ও এরকম একটা সম্পর্ক হয়েছে ? 


সব খুলে বললাম চিন্ময়ীকে। বললাম ডেসির কথা , বললাম ওই দেশে আমার একা একা থাকার কথা। সব শুনে বললো চিন্ময়ী ,

- জানি না তোকে আমি কি বলবো , তবে মনে হয় তোর ইরা কে সব বলে দেওয়া উচিত। আর ওকে তুই নিয়ে চলে তোর সাথে। আসলে কি জানিস তো, প্রত্যেকটা মানুষ, একটা বয়সের পরে আরেকজনের সাহচর্য চায় , চায় আরেকজনের উপস্থিতি তার জীবনে। সেটা যখন থাকে না, তখন হয়তো কিছুটা লাগামছাড়া হয়ে যায় মন; সস্তায়, ভাড়া করা সবকিছুর মধ্যে খুঁজতে থাকে জীবনের সুখ। নীলাঞ্জন তো অনেক আগেই চলে গিয়েছিলো আমাকে ছেড়ে, তারপর তুইও যখন চলে গেলি.... তবে আমি আজও জানি, তুই ভেতরে ভেতরে, সেই একইরকম আছিস ! আমি যদি তোর সামনে নিজেকে উজাড় করে বলি কখনও, চিরন্তন, তুই আমাকে নে, আমাকে তোর করে নে ! তুই হয়তো পারবি না। আর তুই যদি সত্যি আমাকে গ্রহণ করিস, আমার তার মধ্যে কোনো পাপ চোখে আসবে না। আমি জানি, তোর হৃদয়ের কোনো জায়গাতে আমি আজ ও আছি , আর থাকবো। আমি কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই তোকে, মনে করতে চাইলেই তোর ভাবনাতে হারিয়ে যেতে পারি। 

তুই , তুই ইরা কে আর কষ্ট দিস না। আর গতকাল রাতের যেটা নিয়ে তুই আক্ষেপ করলি? ওরে পাগল, তোরা ছেলেরা এরকম কেন বলতো ? তোদের প্রেম ভালোবাসা মানেই শরীর থাকতে হবে কেন? তবে জানি না, ঈশ্বর হয়তো এভাবেই তোদের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমাদের মেয়েদের ব্যাপারটা একটু আলাদা ! আমাদের কাছে প্রেম, ভালোবাসা মানে, অনেকক্ষন কোনো কথা না বলে শুধু বুকের ওপরে মাথা রেখে শুয়ে থাকা , বা তার প্রিয় পুরুষের বুকের ওপরে হেলান দিয়ে বসে থাকা আর হাতের আঙ্গুল নিয়ে খেলা। আর সেখানে ইরা তোকে এতদিন কাছে পায় নি , ও তো চাইবেই তোর সাথে লেগে থাকতে , তোকে জড়িয়ে ধরে তোর শরীরের ওম নিতে চাইবে। আমারও তো খুব ইচ্ছে করে নীলাঞ্জন এলে ওকে জড়িয়ে ধরে, বা কোলে মাথা রেখে চুপ করে শুয়ে থাকতে আর ও ধীরে ধীরে আমার মাথার চুলে বিলি কেটে দেবে, আমার মাথার চুল নিয়ে খেলবে। কিন্তু আমার তো সেসব আর হবে না !


আমি চুপ করে গেলাম, আমার কাছে চিন্ময়ীর কথার কোনো উত্তর নেই। ও যা বলেছে, সেগুলো অস্বীকার করার জায়গাতে নেই আমি। একটু পরে চিন্ময়ী আমার হাতের ওপরে নিজের দু হাত রেখে বললো :

তবে একটা সত্যি কথা বলবো তোকে ? জানি না তুই বিশ্বাস করবি কিনা! আমার মাঝে মাঝেই আমাদের দুজনের একসাথে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। এখনও আমার অবসর সময় কাটে সেই সব দিনের কথা ভেবে। মাঝে মাঝে রাতের গভীরে ,নীলাঞ্জনের কথার থেকে আমার তোর কথা বেশি মনে পড়ে চিরন্তন , কেন রে? আমার তো ওর কথাই বেশি ভাবা উচিত, তাই না? আচ্ছা একটা কথা বল, একসাথে কি দুজনকে ভালোবাসা যায় ?      


চিন্ময়ী চোখ ভর্তি জল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে যায় হঠাৎ করে। আমি আরো কিছুক্ষন চুপ করে বসে দেখলাম ওর চলে যাওয়া , নদীর নিস্তরঙ্গ বুকে ঢেউ উঠেছে আবার। সাথে করে নিয়ে আসা চিন্ময়ীর চিঠিগুলো টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দিলাম হাওয়াতে!


++++++++++


আজ প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, একটু আগে 'মহারাজের' আদেশ এসেছে, রাতে উনি ফ্রায়েড রাইস আর হানি চিকেন খাবেন ; সময় কোথায় এতো কিছু জোগাড় করার হঠাৎ করে? সকালে অফিসে যাওয়ার আগেও জিজ্ঞেস করলাম রাতে কি খাবে ; উত্তর এলো, যা খুশি করে ফেলো একটা ! এখন এই পাঁচটার সময়, হঠাৎ করে ফোনে অর্ডার দেওয়া হচ্ছে ? এটা কি বাড়ি না হোটেল ? মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যের ওপরে খুব রাগ হয় ; বাবা কি যে দেখেশুনে একটা বিয়ে দিলো। অত করে বললাম তখন , আরো একটু অপেক্ষা করো ! শুনলো না, না বাবা , না মা। আসলে মনের গভীরে কি গোপন কেউ একটা বারবার করে বলছিলো , অপেক্ষা কর আরেকটু, তোর 'বাবলু' ঠিক আসবে! কিন্তু না, কোথাও কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি 'বাবলু'র। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রিজ থেকে বিট, গাজর, বিনস, ব্রকোলি, ফুলকপি বের করে আনলো। ওপরে আগে থেকে পেঁয়াজ, রসুন কেটে রেডি করে রেখেছে ; অন্যদিকে বাসমতি চাল ভিজিয়ে রাখা। এখনও কত কাজ , চিকেন ছোট ছোট করে কেটে, সেটাকে আবার কর্নফ্লাওয়ার, ডিম, সোয়া সোয়া সস দিয়ে মাখিয়ে ভেজে....উহঃ, জীবনটা একেবারে কয়লা হয়ে গেলো। বিলু, ভোম্বলকে নিয়ে নিচে আছে মনে হয়, পঞ্চুটাও ওদের সাথে থাকবে। 


নিচে বাচ্চারা খেলতে খেলতে হঠাৎ করে দুটি মেয়ে এসে ভোম্বলকে ধরে বললো :

- এই, তোর নাম ভোম্বল কেন রে ? শুনেই মনে হয় গোলগোল। 


- আমি কি জানি ! তবে এটা তো আমার বাড়ির নাম, মা ডাকে এই নামে ; স্কুলে তো.....


হঠাৎ পাশ থেকে বয়সে বড়ো একটা দিদি এসে বললো : 

- তোরা আবার ওর পেছনে পড়েছিস ? কতবার না বলেছি ফ্রেন্ডদের সাথে এরকম করতে নেই ?


- কিন্তু দিদি, ওর নাম ভোম্বল কেন ? 


- হতে পারে, একটা গল্পের চরিত্র ! হ্যাঁ রে ভোম্বল , একটা কথা বল, কাকীমার কি খুব পছন্দ ছিলো পান্ডব গোয়েন্দা ? ওতেও না এইরকম পাঁচজন ছিলো , বাবলু, বিলু, ভোম্বল, বাচ্ছু আর বিচ্ছু ; আর ওদেরও একটা কুকুর ছিল, ওকে ওরা ডাকতো পঞ্চু বলে। 


ভোম্বল, হঠাৎ করে চেঁচিয়ে উঠলো, 

-কি , কি বললে তৃনা দিদি ? পান্ডব গোয়েন্দা? বাবলু আর বিচ্ছু ? মনে পড়ে গেছে, মনে পড়ে গেছে !


দৌড়ে মায়ের কাছে চলে এলো ছোট্ট ভোম্বল , পেছনে পেছনে পঞ্চুও উঠে এলো ঘেউ ঘেউ করতে করতে। 

- মা , মাআআআ !!!


- অাহ্, চেঁচাচ্ছিস কেন? যা না , নিচে গিয়ে খেল ! আমার এখন অনেক কাজ পড়ে আছে। 


বইয়ের ফাঁকে রাখা ফটোটা নিয়ে মায়ের কাছে আসে ভোম্বল ; 

- একটা কাকু এসেছিলো দুপুরে , তখন সেই তুমি দাদাকে আনতে গিয়েছিলে ! কাকু টা এসে এই ফটো দিয়ে গেলো। আমাকে বলতে বললো 'পান্ডব গোয়েন্দার বাবলু এসেছিলো তার বিচ্ছুর সাথে দেখা করতে'।   


মায়ের হাতে ফটো ধরিয়েই নিচে লাফাতে লাফাতে চলে গেলো ভোম্বল। হাতে ফটো নিয়ে সব কাজ ভুলে গেলো তুলি ! 


বাবলু, মানে চিরন্তন সত্যিই এসেছিলো ? এতো বছর পরে ? আমার, আমাদের সেই ফটো নিয়ে ? তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে টেনে বের করলো পালঙ্কের তলা থেকে অনেকদিনের পুরোনো একটা ট্রাঙ্ক , ইস্স, কি অবস্থা হয়েছে এটার , কতদিন বের করে দেখা হয়নি। ট্রাঙ্কটা খুলে অনেক পুরোনো, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা বই বের করে আনলো তুলি। বইয়ের পাতাগুলো হয়ে গেছে হলুদ; অল্প চাপেই ভেঙে যাচ্ছে কিছু পাতা ঝুরঝুর করে। তার ভেতরে রাখা একটা ফটো বের কোলো তুলি ; এই তো, সেই একই ফটো, বাগানদাদু, একটা আমাকে একটা আমার 'বাবলু'কে দিয়েছিলো সেই কত বছর আগে। তুমি, তুমি সত্যিই এসেছিলে চিরন্তন ? চলে গেলে কেন , আরেকটু অপেক্ষা করতে পারলে না ? দেখে যেতে পারলে না তোমার এখনকার বিচ্ছুকে ? 


ফটোর বছর দশের 'বাবলু' বা চিরন্তনের মুখের ওপরে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে বলে উঠলো তুলি, জানো, আমার দু ছেলে ; একজনকে ডাকি বিলু বলে আরেকজনকে ভোম্বল; আমি একটা কুচকুচে কালো রঙের কুকুরও তুলে নিয়ে এসেছি পাড়া থেকে বছর পাঁচেক ; ওকে আমি পঞ্চু বলে ডাকি। সবাই আছে এখানে, শুধু, তুমি, তুমিই নেই ! কেন চলে গেলে তুমি? কোথায় খুঁজবো তোমায় ? বারান্দায় গিয়ে মুখ বাড়িয়ে ভোম্বলকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো তুলি ,

- যে এসেছিলো, কোনো ঠিকানা বা ফোন নম্বর কিছু দিয়ে গেছে ? 


- না তো, মা ? 


একটা মন খকরাপ করা বিকেল নিয়ে তুলি আবার সব গুছিয়ে রেখে দিলো , চলে এলো রান্না ঘরে। কোনোভাবেই কাজে মন বসাতে পারছে না, তবুও অনেক কষ্ট করে , সন্ধে সাতটার মধ্যে শেষ করে দিলো ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। সাড়ে সাতটা নাগাদ ঘরে ফিরে এলো ভাস্কর , এসে ব্যাগ সোফার ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে দেখে নিলো চারদিকে চোখ বুলিয়ে। ছেলেদুটো পড়ছে; তুলি জলের গ্লাস হাতে সামনে দাঁড়িয়ে। হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে চুমুক দিয়ে বললো ভাস্কর ,

- ঠান্ডা জল দিতে হয় তুলি, কতবার একই কথা বলবো তোমায়। যাক গে , যেটা বলছিলাম, রান্না হয়ে গেছে তো ? আজ তাড়াতাড়ি খাবো আমরা, কেমন? তারপর একটু আমরা দুজনে 


তুলির দিকে চোখ মেরে একটা অশ্লীল ইশারা করলো ও। তুলি মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠলো :

- কি হচ্ছে কি ? দিন দিন আরো অসভ্য হয়ে যাচ্ছ , বাচ্চাদের সামনে ও ? ছিঃ ! 


রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ হলে, বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে। তুলি রান্নাঘরের সব কাজ শেষ করে, বেডরুমে ঢোকে। ভাস্কর একটা কিছু দেখছে মন দিয়ে ফোনে ; তুলি জানে, ভাস্কর কি দেখছে ! দিন রাত সময় পেলেই শুধু পর্ন আর পর্ন , কি পায় কে জানে এসবে ! শাড়ি ছেড়ে নাইটি পরে আসার পরেই ওকে জোরে টানে ভাস্কর নিজের দিকে। কিছুক্ষনের মধ্যে সারা ঘর জুড়ে যেন এক উদ্দাম ঝড় ওঠে , তছনছ করে দিয়ে যায় তুলির মন, শরীর দুটোই। প্রায় মিনিট চারেক পরে , তৃপ্ত ভাস্কর তুলিকে সরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে ঘুরে ঘুমিয়ে পড়ে। তুলি কিছুক্ষন পরে উঠে দাঁড়ায় , বারান্দা খুলে গিয়ে দাঁড়ায় অন্ধকার রাত্রির নিচে। চারদিকে অন্ধকার, শুধু রাস্তার স্ট্রিট লাইট গুলো মিটিমিটি করে জ্বলছে। কোনো কোনো ঘরে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। হয়তো কোনো বাচ্চা পড়ছে, না হলে ,হয়তো ওর মতোই আরো কেউ.....তার স্বামীর হাতে ধর্ষিত হচ্ছে ; আচ্ছা কেউ কি ভালোবাসা পায় তার স্বামীর কাছ থেকে ? তুলির যতজনের সাথে কলোনিতে আলাপ, সবারই প্রায় একইরকম গল্প ! আবার ঘরে গিয়ে বালিশের নিচ থেকে ফটোটা বের করে আনে তুলি। ভালো করে ফটো নিয়ে দেখতে দেখতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে ও. শেষ কবে এরকম ভাবে মনের গভীর থেকে কেঁদেছিলো, ভুলে গেছে তুলি। এ কিরকম ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছিলো বাবা জোর করে ? 


সবসময় একটাই শখ ছিল বাবার, ছেলে যেন মাসে লাখ টাকা রোজগার করে ! ভাস্কর এখন মাসে প্রায় দু লক্ষ টাকা রোজগার করে , কিন্তু মন? এতো বাজে মনের একটা মানুষের সাথে ঘর করাটাই হয়ে উঠেছে বিভীষিকা ! বিয়ের দিন সবাই কি খুশি ছিল, সবাই কত আনন্দ করলো।মা বলেছিলো, দেখ তোকে জামাই খুব সুখে রাজরানী করে রাখবে ! সত্যিই আজ তুলি খুব সুখী, প্রচন্ড খুশি। এরকম ছেলে স্বামী হিসেবে কে না চায় , যে পিরিয়ডের সময়েও তার স্ত্রীকে ছাড়ে না; প্রচন্ড যন্ত্রনা আর রক্তক্ষরণের মধ্যেও ভাস্কর ওর শরীর নিয়ে যা করেছিল সেই একবার ! কি হতো যদি এইরকম ছেলের সাথে বিয়ে না হতো, কি হতো যদি সত্যিই 'বাবলু' ফিরে এসে ওর 'বিচ্ছু'কে নিয়ে যেত। কি হতো যদি, কলেজে পড়ার সময় যে মৈনাক ওকে ভালোবাসার কথা বলেছিলো তার হাত ধরতো একটু সাহস দেখিয়ে ? শুধু বাবা আর মাকে খুশি করতে গিয়ে দিনের পর দিন, নতুন নতুন ভাবে মৃত্যু হচ্ছে আমার। হাতের ফটোটা নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিলো তুলি। একটা শব্দে পেছনে তাকিয়ে দেখলো , পঞ্চু ওর পায়ের কাছে বসে, ওর মুখের দিকে জুলজুল করে দেখছে। জড়িয়ে ধরলো পঞ্চুকে তুলি , কান্নায় ভেসে যাচ্ছে পঞ্চুর শরীর। পঞ্চু মুখ তুলে দেখলো তুলিকে, কি মনে হলো কে জানে, জিভ বের করে তুলির গালে বইতে থাকা নোনা জল সব চেটে নিলো।


 তুলি যখন গভীর রাতে পঞ্চুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তখন, ঠিক সেই সময়, পৃথিবীর অন্য এক প্রান্তে সময় ঠিক বিকেল চারটে! 


পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত শহর, নিউইয়র্ক ! সবাই ছুটছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আর কিছুক্ষন পরেই নেমে আসবে সন্ধে, রঙিন , নিওনের ঘন আলোতে আলোকময় রহস্যে ঘেরা সন্ধে। ক্লাবে ক্লাবে চলবে টলটলে রঙিনের ফোয়ারা, সেখানে একদল আসবে ডলার ওড়াতে, আরেকদল আসবে তাদের সামনে শরীর মেলে ধরতে , কেউ মেতে উঠবে স্ট্রিপ ডান্সে , কেউ বা ধরবে গান প্রায় নগ্ন হতে হতে ; কেউ বা আবার ঘুরে বেড়াবে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে , যদি কেউ রাতের জন্য হাতে গুঁজে দেয় কিছু ডলার ! 


দেবযানী কখনোই এই জীবন চায় নি; বেড়ে উঠেছিলো মাসী আর মায়ের আদরে, ছিল এক ছোট ভাই সাথে। বড়ো হয়ে ওঠার সাথে সাথে বুঝতে পারে বাবা কোনোদিনই ওদের ভালোবাসেনি। বাবাও মাকে ছেড়ে অন্য কোনো মেয়ের সাথে পালিয়ে যায় ! মা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে চলে আসে দাদু, দিদার কাছে। মাসী তখন দুহাতে সব সামলায় , একইসাথে পড়াশোনা, আবার সাথে কাজ করে কিছু রোজগার, যাতে এতজনের মুখের ভাত জোগাড় করতে পারে। মা কে মাসী শাড়ির ব্যবসা শুরু করতে বলেছিলো, সেই মতো কিছু দিন করেওছিলো মা ব্যবসা। কিন্তু বেশিক্ষন সময় দিতে পারতো না অসুস্থ মা। মাসীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছিলো দেবযানী , মাসীর কাছেই ওর যত আবদার, বায়না , পড়াশুনো, সব ! মাসীকেই নিজের মা বলে মনে করতো ছোট থেকে দেবযানী। যখন দেবযানীর বারো বছর বয়স, তখন ও প্রথম দেখে চিরন্তনকে , মাসী বলেছিলো চিরু মামা বলে ডাকতে ! মাসীকে খুশি করার জন্য সবার সামনে ও চিরু মামা বলেই ডাকতো চিরন্তনকে। কিন্তু আড়ালে , সদ্য কিশোরী দেবযানী চিরন্তনের মধ্যে পেয়েছিলো ওর জীবনের প্রথম ভালোবাসা, প্রেম কে। 


যখনই চিরন্তন আসতো মাসীর সাথে ওদের বাড়িতে , ও ঠিক কোনো না কোনো ভাবে ওর চিরু মামার কোলে উঠে বসে যেত। চিরু মামা ওকে কপালে আদর করতো, ওর খুব ভালো লাগতো। মাসী আবার নীলাঞ্জনদাকে ভালোবাসতো , কিন্তু কেমন যেন ছেলেটা। ওর থেকে চিরন্তন অনেক ভালো ! মেয়ের মন তো, দেবযানী ঠিক বুঝতে পেরেছিলো, মাসী ধীরে ধীরে চিরু মামার দিকে চলে যাচ্ছে, মানসিক ভাবে প্রচন্ড নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে চিরুমামার ওপরে। মাঝে মাঝেই ফোনে প্রায় ঘন্টাখানেক আড্ডা , বা দুজনে একসাথে ঘোরা , গল্প করা , ভীষণ ভীষণ রাগ হতো মাসীর ওপরে তখন। কেন চিরু মামা আমার সাথে এসে গল্প করে না, কেন আমার সাথে, আমার পাশে বসে না ? 


হঠাৎ একদিন চিরু মামা আসা বন্ধ করে দেয় , জানিনা মাসীও কিছুই বলে না আমায়। আমি মাসীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মাসী আমাকে বলেছিলো :

- দেখ দেবু , প্রেম ভালোবাসা এসব অনেক আসবে তোর সামনে। পৃথিবীটাই তো রঙ্গীন ! তবে কারোর হাতে হাত রেখে যদি সারা জীবন চলতে হয়, তখন অনেক কিছু হিসেবে নিকেশ করতে হয়। সেই মানুষটা আমাকে কতটা ভালো রাখতে পারবে ; সেই মানুষটা আমাকে হঠাৎ করে পথে বসিয়ে দেবে না তো ? তার ব্যাঙ্ক ব্যালান্স, টাকা পয়সা, ঘর বাড়ি, জমি জায়গা সব আছে তো ? জীবনের এই এতগুলো বছর তো অনেক কষ্ট করলাম আমি, আমরা সবাই মিলে ! আর পারবো না নতুন করে সবকিছু করতে। এবার আমি শান্তি চাই। প্রেম ভালোবাসা তাই বিভিন্ন মানুষের সাথে হলেও, যদি কখনো ঘর বাঁধতে হয়, বুঝে শুনে পা ফেলবি। 


সেদিন কথাটা বুঝতে পারেনি দেবযানী, তবে খুশিও হয়েছিলাম মনে মনে। যাক চিরুমামা , আমার চিরন্তন, সে তো আমার ভেতরেই থেকে যাবে , আমার জীবনের প্রথম স্বপ্নের পুরুষ হিসেবে। 


এর পর অনেকদিন চিরন্তনের কোনো খোঁজ নেই ! মাসীও দিন দিন কিরকম যেন হয়ে যাচ্ছিলো। নীলাঞ্জনদা এখন ভিয়েনাতে থাকে, আর মাসী আমাদের সাথে এখানে। মাসী একবার কয়েকমাসের জন্য গিয়েও চলে এসেছিলো আবার, বলেছিলো ভালো লাগছে না। তবে মনে হয় মাসী আর নীলাঞ্জনদার মধ্যে কিছু ঝামেলা হয়েছে , জানিনা ! মাসীকে জিজ্ঞেস করলে বলতো, 

- তোর বোঝার বয়স হয়নি, এখনও !


আরো কিছুদিন পরে কলেজ থেকে বেরিয়ে একটা চাকরির অফার নিয়ে চলে আসে দেবযানী আমেরিকাতে। এখানে এক দুবছর থেকে সব ঠিক করে, তারপরে মা আর ভাইকেও নিয়ে চলে আসবে ঠিক করে। প্রথম প্রথম সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, মাঝে মাঝে নিজেকেও ভাসিয়ে দিয়েছিলো এই নতুন পৃথিবীর নতুন নিয়মে। হয়েছিল বেশ কিছু প্রেম ; না প্রেম ঠিক নয় , সেটা ছিলো শরীরের সাথে আরেক শরীরের উদ্দামতায় নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া। হঠাৎ করে একদিন হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় পিঙ্ক স্লিপ। 


কি করে বলবে দেবযানী এই খবর বাড়িতে ? ওর আশায় চেয়ে বসে আছে মা আর ভাই। মাসীর ও ওর ওপরে অনেক আশা ভরসা ! এইসময় এক সন্ধেতে ও ওর অফিসের এক কলিগের সাথে একটা পাব এ এসে বসে। ওর কলিগ বলে :

- দেব , একটা কথা বলবো ? তুমি একটা ক্লাবের সাথে যোগ দাও , এই ক্লাবটা একটা সিক্রেট প্রিমিয়াম ক্লাব আর এরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে সারা দেশ জুড়ে , সেখানে সব বড়ো বড়ো অফিসের লোকজন আসে, থাকে ব্যবসায়ী, আর হলিউডের শিল্পীরাও। এখানে শুধু ওদেরকে খুশি করতে পারলেই, হাত ভর্তি ডলার ! 


- ছিঃ, এসব আমি কি করে করবো ? এর থেকে মরে যাওয়া ভালো !


- তাহলে তুমি কি করবে, দেব ? ফিরে যাবে ? শোনো, এই দেশ হচ্ছে সুযোগসন্ধানীদের দেশ! এখানে সবাই আসে দুহাতে কামাতে ! আর তোমার এতো সুন্দর চেহারা, এতো সুন্দর গায়ের রং, এমন কমনীয়, মাদকীয়তায় ভরা শরীর তোমার , তুমি না পারলে কি আমরা পারবো ? আমি তো অডিশন দিয়ে এসেছি , আমাকে না বলে দিয়েছে ওরা মুখের ওপরে। তবে আমার মনে হয়, তোমার হবে। আসলে ভারতীয়দের, লাতিন আমেরিকানদের , এশিয়া থেকে আসা মেয়েদের কদর খব বেশি। তার সাথে তুমি এতো ভালো কথা বলতে পারো। কে জানে, ওরাই হয়তো তোমাকে এতো উপহার দেবে, তোমাকে রাজরানীর মতো করে রেখে দেবে। 


শুরু হলো দেবযানীর নতুন জীবন। আজ ডেসির একটা বড়ো ফ্ল্যাট , নিজের একটা গাড়িও হয়েছে। এসবই ওকে দিয়েছে গ্রীস থেকে আসা এক ব্যবসায়ী। বছরে দেড় মাস করে দুবার আসে এই শহরে সেই গ্রীক ব্যবসায়ী! তখন ডেসি ওর সারাক্ষনের ছায়াসঙ্গী। বাকি সারা বছর ডেসি নিজের ইচ্ছে মতো থাকতে পারে। এসময়েই একদিন ,হঠাৎ এক ক্লাবের পার্টিতে দেখা হয় চিরু মামা, ওর চিরন্তনের সাথে। সেই একইরকম আছে চিরন্তন , কিন্তু আজ কি চিনতে পারবে আমাকে ? ডেসিকে ? বুঝতে পারবে, আমিই আসলে দেবযানী ? 


রাতে চিরন্তনের ফ্ল্যাটে এসে, চিরন্তনের শরীরের সাথে নিজের শরীর মিশে যাওয়ার পরে ডেসি বুঝতে পারে , এই শহর মেরে দিয়েছে দেবযানীকে, এখন ও ডেসি ! ওর স্বপ্নের পুরুষ, ওর প্রথম প্রেম, কৈ পারলো না তো ওকে চিনে নিতে ! চিরন্তনের কাছে ডেসি আসলে ডলারের বিনিময়ে কিনে নেওয়া ক্ষনিকের কিছু সুখের মুহূর্ত ; এছাড়া ওর কোনো অস্তিত্ব নেই ওর কাছে। কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো সেদিন ডেসির , জড়িয়ে ধরে, চিরন্তনের কাঁধে মাথা রেখে ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো। অনেক কষ্টে নিজের ভাবনাগুলোকে মনের গভীরে, পুঁতে ফেলে পা দুটো আরো ফাঁক করে নিজের মধ্যে জোর করে টেনে নেয় চিরন্তনকে , শুষে নিতে চায় সব ওর প্রথম প্রেমিকের স্বেদ, গন্ধ , জীবনের সব নির্যাস নিজের মধ্যে।  


++++++++++


- বলতো, আমরা কেন বারবার আমাদের ছোটবেলায় ফিরে যেতে চাই ? কেন বার বার আমাদের মনে ফিরে আসে শৈশবের পুরোনো স্মৃতি? কেন বারবার ইচ্ছে করে মায়ের আঁচলের তলায় মাথা রেখে মায়ের গায়ের গন্ধ মেখে , মায়ের কোলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে? কেন বারবার মনে হয় মায়ের হাতে এই রান্নাটা যেন আজো মুখে লেগে আছে? কেন বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ছোটবেলার খেলার মাঠে, বার বার মনে পড়ে সেই সব ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ? 

ইরা কিচুক্ষন চুপ করে সত্তরোর্ধ বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলে উঠলো, 

- জানি না ! হঠাৎ এইসময়ে আমাকে এইসব প্রশ্ন করতে এলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ? 


মলয় কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন :

- না রে , আসলে ভালো লাগছিলো না। তোর মা তো এখন ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চিরন্তন ও নেই , ভাবছিলাম কি করি। তখন আমার টেবিলে পুরোনো খাতা , বই পত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে হঠাৎ হাতে উঠে এলো "সহজ পাঠ" ; মনে পড়ে গেলো আমার ছোটবেলার কথাগুলো। আচ্ছা, তুই আজ এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি ? তোর কাজ শেষ হয়ে গেলো? 


বাবাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো ইরা , বাবার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে বাবার কোলের ওপর মাথা রেখে বললো ,

- হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি করে সব কাজ শেষ করে চলে এসেছি। বলো , ভালো লাগে এইসময় কাজ করতে ? আমার কিনা ছুটি চলছে, আর আমাকে তবুও অফিসে যেতে হলো। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি চলে এসে তোমাদের অবাক করে দেবো , কিন্তু চিরন্তনটাও নেই। ধুর ভালো লাগে না। তোমরা যেতে দিলে কেন ওকে ? 


- তো আমাদের বুড়ো বুড়ির সাথে বসে কি করবে ছেলেটা? থাকে, একটু ঘুরতে গেছে আসে পাশে। বলছিলো ওর পুরোনো পাড়ায় যাবে একটু, সন্ধের মধ্যেই চলে আসবে। ফোন করে দেখ না একবার ওকে। 


- না, আমি আজ ওকে ফোন করবো না। কতদিন, কতদিন পরে আমি তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়েছি বলোতো ! এখন তো তুমি আর ওপরেই আসো না। আমিও কাজে ব্যস্ত, তোমাদের সাথে ভালো করে কথাই বলা হয় না। 


ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন মলয় ,

- পাগলী মেয়ে আমার! সময়ের সাথে সাথে দূরত্ব তো চলেই আসে একটা , তাই না ? আচ্ছা, তুই আমাকে আমার কথা উত্তর দিলি না তো ? কেন আমরা বারবার আমাদের পুরোনো দিনে ফিরে যেতে চাই ? 


ইরা চুপ করে শুয়ে শুয়ে বাবার আদর খেতে খেতে বললো :

- জানিনা যাও, তুমিই বলো না ! আমি শুনি চুপ করে ! 


- তাহলে শোন ! ছোটবেলা, ফিরে আসা দিনগুলো আমরা সবাই খুব ভালোবাসি, বারে বারে মনে হয় সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যেতে। কিন্তু আসলে আমরা ভয় পাই সেই দিনগুলোকে। কেন জানিস? আসলে সেই সব সময়ে আমাদের মনে থাকে না কোনো চিন্তা ভাবনা, সারাক্ষন শুধু হুল্লোড়, এর বাগানে ফুল চুরি তো ওর বাগানে ফল, আর মাঝে মাঝে ঝপাং করে পুকুরে ঝাঁপ ! সারাদিন টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়ানো। অথচ সেই সময়ে আমাদের মনে চলতে থাকে কখন যে বাবা দাদা কাকার মতো বড়ো হবো ! আবার ধীরে ধীরে বড়ো হতে শুরু করলে, তার সাথে চলে আসে অনেক দায় দায়িত্ব! চলে আসে মনে ভয় সংসারের ভার বহন করার ! আর এই দুদিকের বৈপরীত্বে আমরা পিষতে থাকি আমাদের মন। সান্ত্বনা দিয়েই চলি নিজেদের আগের সময়টা আসলে অনেক ভালো ছিল , এখনকার সময়টা তো নরক। কিন্তু এখনকার সময়টাকে মেনে নিয়েও যদি তুই তোর মনটা সেই বাচ্চাদের মতো করে রাখতে পারিস , তাহলে তার থেকে ভালো কিছুই হয় না। হয়তো লোকে বলবে কি বাচ্চাদের মতো পাগলামি করছিস , সে বলতে দে না ! তোর তাতে কি ? তুই তোর নিজের মতো , অন্য কারোর কথা কেন শুনবি ? 


- ওহঃ, কিসব যে বলছো, কেন যে বলছো, কিছুই বুঝতে পারছি না তো। কি হয়েছে বলোতো তোমার ? 


মলয় একটা অনেকদিনের পুরোনো খবরের কাগজ, কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে। বলে উঠলেন,

- তুই আর তোর মা সেদিন যেসব কথা বলছিলি, আমি সব শুনে ফেলেছি। তোরা দরজা ভেজিয়ে কথা বলছিলি, আর আমি আমার ওষুধটা খুঁজে না পেয়ে তোকে জিজ্ঞেস করার জন্য আসছিলাম ওপরে। তখন হঠাৎ করে শুনে ফেলি তোদের কথা। জানি, এভাবে শোনাটা অন্যায়, তবুও চলে যেতে পারিনি সেদিন ! 


হাতে পেপারটা নিয়ে ভালো করে দেখে ইরা , পেপারের কয়েকটা জায়গাতে লাল, নীল, কালো কালিতে লেখা একজনের নাম - প্রমীলা। চমকে উঠে বাবার দিকে তাকায় ইরা। প্রমীলা তো.....

- তুই ঠিক ধরেছিস ইরা; প্রমীলা, প্রমীলা তোর জেঠিমার নাম। এটা অনেকদিন আগেকার কথা , তখনও আমার বিয়ে হয় নি। তোর মায়ের সাথে দেখাশোনা যোগাযোগ এসব কিছুই হয়নি তখনও ! তখন আমার আঠেরো বছর বয়স। আজও মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। আমরা সবাই, মানে তোর দাদু, ঠাকুমা, আমার দুই দাদা আর আমি, সাথে ছিল ঘটক, আমরা এসেছিলাম দাদার জন্য মেয়ে দেখতে। প্রমীলা ছিল নাম। প্রথম দর্শনেই কেন জানিনা আমার খুব নিজের মনে হোলো প্রমীলাকে। আর বৌদির বয়সটাও তখন ছিল পনেরো , দাদার বয়স ছিল ছাব্বিশ ! কেন জানিনা তখন শয়নে স্বপনে বারবার ভেসে আসতো বৌদির নাম, বৌদির মুখ। যদিও আমি জানতাম এ হয়তো অন্যায় , তবুও নিজেকে সামলাতে পারিনি। দাদার বিয়ের দিন, যখন ওদের মালাবদল হয়ে সিঁদুরদান হচ্ছিলো, আমি আর সামনে দাঁড়াতে পারিনি সেই সময়। পরে ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছিলাম সব, তবুও একদিন, একদিন করে ফেললাম ভীষণ বড়ো একটা অপরাধ। সেটার জন্য আজও আমার নিজের কাছে নিজেকে ভীষণ ছোটো মনে হয়। 


ইরা উঠে বাবার পাশে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে উঠলো :

- হতেই পারে না , আমার বাবা আমার হিরো। আমার বাবা কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না। 


ম্লান হয়ে হেসে উঠলেন মলয়,

- বাবা তো কি ? মানুষ তো আমি নিজেও , তাই না ? আর মানুষ মাত্রেই এইসব ইচ্ছে , ভালো মন্দ মেশানো চাওয়া পাওয়া তো থাকবেই। বয়সের সাথে সেগুলো হয়তো পরিবর্তিত হতে থাকে , এটাই যা পার্থক্য ! 


ইরা বাবার হাতে চাপ দিয়ে বলে উঠলো,

- কি হয়েছিল বাবা ? কি এমন করেছিলে যেটা আজও তোমাকে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে ? মা জানে ? 


- হ্যাঁ রে , তোর মা সব জানে। আমি তোর মায়ের কাছে কিছুই লুকোই নি কখনও ! আমার মনে হয় স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কোনোকিছু গোপন করাই উচিত নয় ! সেদিন ছিল কাঠফাটা রোদ্দুর , সবাই তাপে পুড়ে যাচ্ছিলো। ঘরে তখন কেউ ছিলো না, দাদারা যে যার কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলো, বাবা চলে গিয়েছিলো মাঠে। আমি তখন কলেজে পড়ি। এটা তোর জেঠিমার বিয়ের আরো বছর দুই পরের কথা। সেই প্রচন্ড গরমে, ঘরের সব কাজ সেরে তোর জেঠিমা গিয়েছিলো স্নান করতে। আমার খুব জল তেষ্টা পায় , আমি অনেকক্ষন ধরে ডাকাডাকি করেও কাউকে না পেয়ে, রান্নাঘরে যাই।ওখান থেকে আমাদের পুকুরটা দেখা যেত। আমি দেখলাম প্রমীলা, মানে তোর জেঠিমা জামা কাপড় , গামছা নিয়ে চলেছে পুকুরের দিকে। আমার মনের ভেতরে যেন কেমন একটা হয়ে গেলো , আমি, আমি কোনো কিছু না ভেবেই পা বাড়ালাম ওদিকে। পুকুরের চারদিকে ছিল ঘন বাঁশের বন , ওখানে আড়াল থেকে আমি দেখলাম তোর , তোর জেঠিমাকে , নিরাভরণ প্রমীলাকে। বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারলাম না সেই প্রচন্ড সুন্দর ভয়ংকর দৃশ্যের দিকে , পালিয়ে এসেছিলাম আমি। এটাই ছিল আমার অপরাধ , আমার গভীর গোপন পাপ যেটা আজও আমাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। 


- কিন্তু বাবা, হঠাৎ এইসব কথা, আজ কেন? 


- ওই যে, সেদিন শুনে ফেলেছিলাম তোর আর বিভাসের কথাটা ! সেই জন্যই আমি তোকে আগেকার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলছিলাম 

 এতক্ষন। আমি তো জানতাম অনেক ছোটো থেকে তোর বিভাসকে পছন্দ ছিল ! কিন্তু তুই মুখ ফুটে আমাদের কখনো কিছু বলিস নি, বা বিভাস ও তো সেরকম কোনো কিছু করতো না পাড়ার মোড়ে আড্ডা দেওয়া ছাড়া। এখন যখন তুই আরেকজনের সাথে ঘর করেছিস, কেন সেই পুরোনো কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস? এখন তুই এগিয়ে যা চিরন্তনের সাথে, ওর পাশে থেকে, ওর হাতে হাত রেখে। আমাদের জন্য তোদের আর ভাবতে হবে না। তুই ওর সাথে চলে যা , দুজনে যখন থাকবি একসাথে, দেখিস কত সুন্দর মায়াময় হয়ে উঠবে চারদিক। তবে আরো একটা কথা, একসাথে থাকতে থাকতে একসময় মনে হয় সামনের মানুষটা তোকে ভালোবাসে না, তোর জন্য ভাবে না। এরকম যদি কোনো চিন্তা মাথায় আসে, তাহলে কিন্তু সেটা ভুল। আসলে একসাথে থাকতে থাকতে আমাদের সবকিছুই পরিণত হয় একটা অভ্যাসে ; আমরা পরস্পরের অভ্যেস হয়ে যাই , যাকে না হলে আমরা থাকতে পারবো না। তাই তো তোর মা কখনও কখনও বাপের বাড়িতে চলে গেলে আমি কিরকম দিশেহারা হয়ে যেতাম , তুই তো দেখেছিস , তাই না ?


ইরা উঠে দাঁড়িয়ে, বললো :

- একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ? তুমি কি ভুলতে পেরেছো প্রমীলা , মানে জেঠিমাকে ?


- ভোলা কি যায়? সত্যিই কি কখনো ভোলা যায়? কোনো এক কোণায় এইসব স্মৃতি সবসময় থাকে, হাজার চেষ্টাতেও ভোলা যায় না ! তুই জোর করে বলতেই পারিস আমি সব ভুলে গেছি, আসলে তা হয় না। নাহলে এতো এতো বছর পরে হঠাৎ করে কেন মনে পড়লো ? তোর জেঠিমা তো কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে , তবুও...

আচ্ছা আমি এবার যাই, তোর মায়ের ওঠার সময় হয়ে গেছে। আমাকে পাশে না দেখলে আবার চিন্তা করবে, আর ওকে প্রেসারের ওষুধ টাও তো দিতে হবে। তুইও একটু বিশ্রাম করে নে ! চিরন্তন ফিরে এলে আমরা সবাই একসাথে চা নিয়ে বসবো। আজ মনটা কিরকম পেঁয়াজি পেঁয়াজি করছে , করবি অল্প করে একটু ?


ভিয়েনাতে এখন দুপুর, নরম মিষ্টি রোডের মধ্যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে নীলাঞ্জন। সামনেই কয়েকজন হেঁটে যাচ্ছে জোড়ায় জোড়ায় , হয় সদ্য বিবাহিত, নাহলে প্রেমিক প্রেমিকা। ওদের মধ্যে একজোড়া আবার সময় কাল ভুলে পরপস্পরের ঠোঁটের মধ্যে ডুবে গেছে। এখানে এসব ভীষণ সাধারণ ব্যাপার , কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেও না। প্রথম যখন নীলাঞ্জন এসেছিলো এখানে, চোখের সামনে এইভাবে দেখতো কাউকে, ভীষণ অবাক হয়ে যেত। একটা সংস্কারবোধ, ওর শিক্ষা, সবকিছু বাধ্য করতো ওর চোখ নামিয়ে নিতে। তবুও মাঝে মাঝেই ও নিজেও দূর থেকে আড়চোখে দেখতো ওদের। কি অন্যরকম ভাবে এরা চুমু খায় ! এরা সত্যি পারলে যেন একজন আরেকজনের মুখের মধ্যে ঢুকে তার জিভ, দাঁত টেনে সব কিছু খেয়ে ফেলে। এখানে চুমু খেয়ে কি যে সুখ পায় এরা কে জানে ? চুমু খাওয়ার একটা কলা আছে ! দুজন দুজনের ঠোঁটের সামনে এসে কিছুক্ষন অপেক্ষা, নিজেদের উপস্থিতকে খোঁজা , তারপরে গাঢ় ঘন নিঃশ্বাস, বুকের মধ্যে ধুকপুকানি; অল্প ঠোঁটের পরশ , নাক বাঁচিয়ে ধীরে ধীরে ঠোঁটের মধ্যে ডুবে যাওয়া, দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরা এমনভাবে যেন একটা লতা, একটা গাছকে আঁকড়ে ধরে উঠতে চায় ওপরে। 


আজকাল এইসব দেখে দেখে জলভাত হয়ে গেছে নীলাঞ্জনের। ওদেরকে পাশ কাটিয়ে এসে ঢুকলো লাঞ্চ করতে একটা ছোট দোকানে। অর্ডার দিয়ে ফোন করলো চিন্ময়ীকে, প্রতিদিন এই সময়ে কিছুক্ষন কথা বলে ওরা। ফোন করতেই, ওদিক থেকে ভেসে এলো চিন্ময়ীর উচ্ছসিত গলা :

- এই নীল, জানো আজ কি হয়েছিল ? আজ, আজ চিরন্তন এসেছিলো এখানে। 


যাহ, আজকের লাঞ্চটা , পুরো সময়টা তেতো হয়ে যাচ্ছে ! নিজের ভেতরের খারাপ হতে থাকা পরিবেশটা নিজের মধ্যেই রেখে বলে উঠলো নীলাঞ্জন : 

- তাই ? বাড়িতে এসেছিলো ? কি বললো ? অনেকদিন পরে তাই না ?


- হ্যাঁ, কতগুলো বছর হয়ে গেলো, সেই যে আমাদের বিয়ে, তারপরে তো আর দেখাই হয় নি। এখন ও স্টেটস এ থাকে তো। কি প্রোজেক্টে ওখানে গেছে বছর দুইয়ের জন্য। এতদিন পরে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো। 


চিন্ময়ী বিভিন্ন রকম কথা বলেই যেতে থাকলো ফোনের ওপর প্রান্তে , নীলাঞ্জন কোনো কথাই যেন আর শুনতে পাচ্ছে না , হারিয়ে যাচ্ছে, হেরে যাচ্ছে। যখন নীলাঞ্জন পড়াশোনার জন্য বাইরে ছিল, তখন চিন্ময়ী ঝুঁকে পড়ে চিরন্তনের দিকে ; হয়তো ভালোও বাসতে শুরু করে ওকে। যদিও মুখ ফুটে কোনোদিন বলে নি, তবে চিন্ময়ী নাকি অনেকবার বলেছিলো চিরন্তনকে, ওর মতো ছেলেকে বিয়ে করতে পারলে সবথেকে ভালো হতো। ও তো আসলে বিভিন্নভাবে হিন্ট দিচ্ছিলো চিরন্তনকে। জানিনা চিরন্তন কেন কিছু বলেনি। হয়তো চিরন্তন নীলাঞ্জন আর চিন্ময়ীর সম্পর্কের কথা জানতো বলে ! তবে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে কতবার, কতবার যে চিন্ময়ী ওকে ওর পৌরুষত্ব নিয়ে দিনের পর দিন অপমান করেছে ; সে কথা কি ভুলতে পারে নীলাঞ্জন ? বিয়ের আগে তো বলতেই চেয়েছিলাম ওকে, ও আমাকে বললো ভালোবাসা দিয়ে সব খামতি মিটে যাবে ! মাঝে মাঝে খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে , ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করতে ; সে সাহসটাও তো নেই আমার ! কেউ কেউ হয়তো শুধু ভালোবেসেই এইভাবে সবার হাসির পাত্র হয়ে ওঠে ! তবে আরো খারাপ লাগে যখন নিজের সবথেকে কাছেরজন এইভাবে মজা করে , একটা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে। আমি তো বলেছিলাম আমাকে ছেড়ে চলে যাও ! চিন্ময়ী তবুও আমাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে , বলে ও নাকি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। আমি জানি, ও আমাকে ছাড়াও খুব ভালোই আছে , কখনো নীলেশ, কখনো পলাশ, কখনো সুকান্ত , সবাইকে নিয়ে ও খুব ভালো আছে। আমি? আমি যে সত্যিই ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না , আমার যা কিছু ভালোবাসা, অস্তিত্ব , সবটুকুই তো ওর জন্য ! আমার এই এতো দূরে থেকে খাটা খাটনি , এতো রোজগার করা, সবকিছুই তো ওর জন্য , যাতে আরো ভালোভাবে ও থাকতে পারে ! আমি কি তাহলে? ওর হাতের খেলার পুতুল ? 


- এই , নীল ? শুনছো আমার কথা ? নীল? নীল ?


- ওহ হ্যাঁ, এই তো , সব শুনেছি। সব শুনছি। 


- দাঁড়াও , আমি ফোন রাখি এবার ! আমাকে দেবযানীকেও বলতে হবে। ও কতদিন ধরে বলছিলো চিরুমামার কোনো খবর আছে কিনা ! 


ফোন ছেড়ে দিলো নীলাঞ্জন ! আজ আর কিছুই খেতে পারবো না। আমি , আমি সেইসময় চিরন্তন আর চিন্ময়ী, দুজনের ভেতরেই দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ, তবুও সবকিছু ভুলে চিন্ময়ীর হাতে তুলে দিয়েছিলাম নিজেকে। 


++++++++++


অন্যদিকে, চিন্ময়ী ফোন করে দেবযানীকে ,

- দেবু, জানিস কি হয়েছে আজ ? 


- কি হয়েছে মাসী ? খুব খুশী খুশী মনে হচ্ছে? নীলাঞ্জনদা কি আসছে নাকি ? 


- ধুর, ছাড় তো ওর কথা। অরে চিরন্তন এসেছিলো, তোর চিরু মামা। আমরা অনেকক্ষন আড্ডা দিলাম একসাথে। তোর কথা জিজ্ঞেস করছিলো, আমি তোর একটা ফটো ই-মেল করে দিয়েছি ওকে। সেই যে , তোর কয়েকমাস আগের , অফিসে তোলা ফটো ! 


- কি? কেন ? কেন তুমি আমার ফটো পাঠালে ? আচ্ছা শোনো মাসী, আমার একটু জরুরী কাজ আছে , পরে তোমাকে ফোন করি , কেমন ? 


ফোন ছেড়েই দেবযানী , ডেসি নিজের মাথাটা গিয়ে ঢুকলো দেওয়ালে। সব জেনে যাবে চিরন্তন, সব বুঝে যাবে। আমি কি করে মুখ দেখাবো ওকে ? চিরুমামা কি ভাববে আমাকে ? আমি, আমি, উহঃ, মাসী কেন যে আমার ফটো দিতে গেলো চিরন্তনকে। 


চিরন্তন ট্রেন থেকে নেমে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। রিক্সা নিলেও হয়, তবে এইটুকু রাস্তা, হেঁটেই মিনিট পনেরো কেটে যাবে, কতদিন এভাবে ভীড়ের মধ্যে হাঁটিনি। চিরন্তন এসে পৌঁছেছে ইরার বাড়ির পাড়ায়। রকে বসে কয়েকজন আড্ডা মারছে , কেউ কেউ ক্যারাম বোর্ডে ব্যস্ত ! কি করে যে এই বুড়ো দামড়া ছেলেগুলো সারাক্ষন কিছু না করে থাকে কে জানে ? কোনো কাজ করার ইচ্ছে নেই, না আছে ভালো কোনো কাজের সন্ধান। যে কয়েকটা বড়ো ইন্ডাস্ট্রি ছিলো বা আছে, তারাও আজ অন্য রাজ্যে চলে যাবে বলছে। কি হবে এই রাজ্যের ? 


টুং টুং করে একটা শব্দ হয়ে মোবাইলটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। একদিকে দাঁড়িয়ে মোবাইল খুলে দেখলো চিন্ময়ী ই-মেল করেছে , এখনো সেই একই মেল আই ডি ! খুলে দেখলো চিরন্তন ! হঠাৎ করে জেনপুর পৃথিবী দুলে উঠলো ওর চোখের সামনে ! এটা , এটা তো ডেসি ! ওর ফটো কেন মেল করেছে চিন্ময়ী , ও লিখেছে দেবযানী ? মানে, মানে ডেসি-ই দেবযানী ? এতো বড়ো ভুল কি করে হলো আমার ? আমি, যে আমাকে মামা বলে ডাকতো, আমার থেকে এতো ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে, তার সাথে, তার সাথে....আমি....


- ও মশায় , ও মশায়।, কোনদিকে দেখে হাঁটছেন , আরেকটু হলে তো চলে যাচ্ছিলেন অটোর তলায় ! 

কেউ একটা হাত ধরে টেনে আনলো রাস্তার এক পাশে চিরন্তনকে। চিরন্তন মুখ তুলে দেখলো, অনেকেই দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে , যেন সবাই ওর অপরাধের কথা জেনে গেছে ! আবার পাশে লোকটি বললো :

- কি ব্যাপার বলুন তো, আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হয়েছে নাকি ? আমি থাকতে সেটা এই পাড়ায় হবে না। কোথায় যাবেন ? পৌঁছে দিয়ে আসবো আপনাকে ?


- না না ! থ্যাংকস ! আমি, আমি ওই কোণের বাড়িটায় যাচ্ছি। ইরা, ইরা আমার স্ত্রী। আপনি ?


- ও আপনিই তাহলে চিরন্তন ? ঠিক আছে, আর কোনো ভয় নেই, এবার একটু সাবধানে রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে চলে যান। আর হ্যাঁ, আমার নাম বিভাস। 


++++++++++


ভিয়েনা শহর, অনেকের কাছেই স্বপ্নের শহর। সারা শহর এখন জেগে উঠেছে নতুন করে। প্রত্যেকটা শহরের মতোই, এটারও একটা অন্য রূপ আছে রাতে। দিনের বেলায় সবাই ব্যস্ত , ছুটছে যে যার কাজে। রাত হলেই জেগে ওঠে বিভিন্ন ধরণের ক্লাব, ডিস্কো, শুরু হয়ে যায় পার্টি আর ছোটে মদের ফোয়ারা। ডানুবে নদীর পূর্বে অবস্থিত ভিয়েনা , আজও ধরে রেখেছে তার প্রাচীনত্ব, আর তার সাথে সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে বর্তমান সভ্যতার। 


এখন অনেক রাত । 


যখন থেকে শুনেছি চিরন্তন এসেছিলো, চিন্ময়ী ওর সাথে বসে আড্ডা দিয়েছিলো অনেকক্ষন ধরে , তখন থেকেই বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত শুন্যতা গ্রাস করেছিলো আমায়। মনে হচ্ছিলো, কেন, কেন এলো ও আবার ফিরে ! এমনিতেই আমার সব থেকেও, আমি একা, সম্পূর্ণ একা। চিন্ময়ী ধরা দিয়েও সম্পূর্ণ ভাবে আমার হলো না। ওকে আমি সবথেকে বেশি খুশি, সুখী দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি, আমি হেরে গেছি ! ওকে, ওকে কখনও আমি সেই সুখ দিতে পারিনি, যেটার স্বপ্ন দেখি আমরা যৌবনকালে। 


তাই আজ চিন্ময়ী কখনো নীলেশ, কখনো বা সুকান্ত, কখনো বা অন্য কেউ , অন্য কারোর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুনেছি ও নাকি এখন আর বাপের বাড়িতেও থাকে না , ওখানেই সামনে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে , সেখানে একা - একাই থাকে। প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে এসে মা আর দিদির সাথে দেখা করে যায় ! দেবযানীও ওখানে থাকে না আজকের দিনে। ফ্ল্যাটে একা একা থাকে, আর কি করছে সেটা তো....


না , আর ভাববো না এসব উল্টোপাল্টা কথা। আমি কেন নিজের সব কিছু ওর জন্য বিসর্জন দেবো ? এমনিতেই দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নি। এখন খিদেতে পেট জ্বলছে। ঠিক, খিদেই তো। খিদের জন্য মানুষ কি না কি করতে পারে। কারোর খিদে ওপরে ওঠার, কারোর খিদে নতুন কিছু আবিষ্কার করার , কারোর খিদে নিত্য নতুন খাওয়ার , আর কারোর বা খিদে নতুন কিছু সৃষ্টি করার। তবে একটা খিদে সবাইয়েরই থাকে ! শরীরের খিদে। 


যেসব সাধু সন্ন্যাসীরা সংসার ত্যাগ করে, তারাতো নিজেদেরকে সেই শরীরের খিদে থেকেই আসলে দূরে নিয়ে যায় নিজেদের, পালিয়ে যায় ভীরু কাপুরুষের মতো। ওরা আসলে একটা বড়ো লুসার ! সবকিছু থেকে নিজেদের বঞ্চিত করার চেষ্টা, ব্যর্থ চেষ্টা ! 


আজ আমার অনেকদিন পরে খুব খিদে পাচ্ছে, রোজ রোজ এই অপমানের জ্বালা বয়ে আর ঘুরবো না। আজ থেকে আমিও নিজের মতো করে , নিজের ইচ্ছেতে বাঁচবো। আমি, আমিও তো একটা মানুষ ! 

   

একটা ক্লাবের দিকে পা বাড়াই আমি। ক্লাবে সবার সাথে মিশে, হাতে গ্লাস হাতে , জোরালো রক না ড্যান্স না পপ না ফিউশন এর তালে তালে পা মেলাই আমি, দোলাই কোমর। বাহ, বেশ ভালো লাগছে তো এই ছন্নছাড়া সময় ! কেউ আমাকে দেখছে না, কেউ আমাকে কোনোরকম ভাবে বিচার করছে না, আমাকে আটকানোর চেষ্টা করছে না, না করছে আমাকে কোনোরকম জোর। এখানে আমি স্বাধীন, নিজের মতো করে আছি। 

 ইউরোর বিনিময়ে পাওয়া সুখ। 


আরে ? এই মেয়েটা আবার কে ? ও এখানে কখন এলো ? ওর আগে যে মেয়েটা ছিলো , কোথায় গেলো ও ? কার সাথে আমি নাচলাম এতক্ষন ধরে , কার কোমরের নিচে ছিল আমার হাত ? কে জানে? এসব কি এই আলো আঁধারিতে খেয়াল করলে চলে ? শুধু মজা করো নীল ! আজ থেকে চেটে পুটে নিতে থাকো জীবনের সব স্বাদ। ভুলে যাও অতীত , এটাই বর্তমান, এই সময়ে বাঁচো নীলাঞ্জন ! 


হঠাৎ ফোন এলো , চিন্ময়ীর ফোন ;

- কি গো, কোথায় তুমি ? এতো গান বাজনার শব্দ ?


- এই তো, একটা ক্লাবে এসেছি আমি চিন্ময়ী। তোমার খাওয়া হয়ে গেছে ? এখন কি ঘুমোতে এসেছো ?


- খাওয়া তো কখন হয়ে গেছে, ভাবলাম একটু ফোন করি তোমাকে। আচ্ছা তুমি ক্লাবে কেন গেছো ? তুমি তো যাও না ওখানে ?


- এই আর কি। ভালো লাগছিলো না। ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি। 


- বাহ বাহ , খুব ভালো করেছো নীল। এরকম সময় বের করতে হয় মাঝে মাঝে। আচ্ছা খেয়াল রেখো কিন্তু, ওখানের ক্লাবে তো আবার যে যার সাথে ইচ্ছে শুয়ে পড়ে। ওদের কোনো বিশ্বাস নেই বাবা ! তবে, তবে তোমাকে নিয়ে আমার ভয় নেই নীল ! 


- কেন, কেন ? মানে কি বলতে চাইছো তুমি ? আমিও যদি সেরকম কারোর সাথে...?


- হা হা হা হা ! না মানে হ্যাঁ, না ! না না সরি, সরি। আমি , আমি। আচ্ছা তুমি এনজয় করো নীল। কাল কথা হবে, ঠিক আছে ? 


++++++++++


ফোন পকেটে ঢুকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। আবার, আবার তুমি আমাকে অপমান করলে চিন্ময়ী ? আমার অক্ষমতা নিয়ে হাসাহাসি করলে? কি করে পারো এভাবে সবসময় আমাকে বুঝিয়ে দিতে আমার অওকাত ? রাগ হচ্ছে আমার, রাগে একটা গরম হাওয়া বেরোচ্ছে আমার চারদিক থেকে , আমি বুঝতে পারছি। অপমানে মাথা কাজ করছে না আর। কিছু একটা নিতে হবে , ঠান্ডা করতে হবে মাথা। রাত এখনও অনেক বাকি। 


ক্লাবের বার এর সামনে গিয়ে তাড়াতাড়ি তিনটে শট নিয়ে নিলাম। নিজের মনেই বলে উঠলাম, ঠিক আছে চিন্ময়ী, আমি, আমিও দেখিয়ে দেবো , তোমাদের সবাইকে। 


আমি তাকালাম আমার পাশে। দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর গায়ে। দেখে তো বেশ, ভালোই লাগছে, একেবারে স্বল্পবসনা, তার সাথে শরীরের ওপরে ঘামের বিন্দুগুলোর ওপরে নিওনের আলো পড়ে মনে হচ্ছে বিভিন্ন রকমের , বিভিন্ন রঙের মুক্তো বিন্দু। 


সাহস করে এগিয়ে গেলাম আমি ওদের দিকে। অন্যদের মতোই ইশারা করলাম ওদের দিকে তাকিয়ে , আমার কাছে চলে এলো দুজনেই, একজন আমার সামনে দাঁড়িয়ে, একজন পাশে। যে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, আমার কানের কাছে মুখ এনে কানের লতিতে দিলো একটা কামড়। শিরশিরে ভাব ছড়িয়ে পড়লো সারা শরীরে। দুজনকেই আমি একসাথে সারা রাতের জন্য নিজের করে নিলাম। 


রুমে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি ওদের মাঝে ! হাসতে হাসতে , এর ওর ওপরে গড়াতে গড়াতে , আমরা তিনজনেই জামা কাপড় খুলে দিলাম, দুজনেই আমাকে মাঝে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার ওপরে , দু দিক থেকে। কিছুক্ষন পরেই দুজনে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালো ! আমার, আমার কোমরের নিচে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে ওদের ভাষাতে কিছু বলে হাসতে হাসতে জামা কাপড় পরতে শুরু করলো। 


আমি আটকাতে চেষ্টা করলাম ওদের , একজন বলে উঠলো :

- হোয়াট ? লুক এট ইউ ম্যান ! ইউ কল ইওরসেল্ফ এ ম্যান ? হা হা হা হা ! 


বেরিয়ে গেলো এপার্টমেন্ট থেকে দুজনেই। তারপরেই আমিও জামা কাপড় পরে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি এই ব্রিজের ওপরে , নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ডানুবে নদী ! সামনে থেকে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া এসে আমাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমার মতো ক্লীব জীবের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। গ্রহণ করো আমাকে ডুনাবি ! আমাকে নাও তোমার মধ্যে , আমি তোমার মধ্যে মিশে গিয়ে নতুন ভাবে বেঁচে উঠতে চাই !


++++++++++


এই তাহলে চিরন্তন, ইরার স্বামী ? বাহ, বেশ বেশ। তা ভালোই , দেখেও বেশ ভদ্র সভ্য মনে হলো। কোথায় যেন বলেছিলো ইরা ? বাইরের কোনো দেশে থাকে ? কিন্তু এখনো গা থেকে তো দেশোয়ালি গন্ধ ভেসে আসছে। না, এই ছেলে বেশিদিন থাকতে পারবে না বিদেশে , এ হচ্ছে মাটির মানুষ ! তবে একটা ব্যাপার মানতেই হবে, আমার থেকে অনেক ভালো এই ছেলে। সত্যিই তো , আমাকে কেন পছন্দ হবে কোনো মেয়ের বা মেয়ের পরিবারের ? 


কি করি আমি ? সারাদিন শুধু পার্টির টাকাতে, ক্লাবটা চালাই, মাঝে মাঝে পার্টির হয়ে কিছু কাজ, আর নাহলে রকে বসে গুলতানি। ছোট থেকেই সবাই বলতো আমাকে বখাটে, বখে যাওয়া ছেলে ! তবে কেউ কিন্তু বলতে পারবে না আমি কারোর কোনো ক্ষতি করেছি এই পাড়াতে ! যখনই কারোর কোনো দরকার হয়েছে, আমার ছেলেগুলোকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি ওদের সাহায্য করতে। এই তো সেই , সেদিন কয়েক মাস আগে, কাকুর স্ট্রোক ! তখন কোথায় ছিল এই চিরন্তন? এই বান্দা না থাকলে, কাকু তো টেঁসেই যেতো এতদিনে। আর ওখানেই তো হলো কাল। 


এতদিন পরে ইরা কে আবার সামনে পেয়ে , কি যে হলো ! সব কিরকম ওলোট পালোট হয়ে গিয়েছিলো সেইদিন থেকে। মনে পড়ে গেলো ছোট বেলার কথা ! কতই বা বয়স তখন আমার, চোদ্দো কি পনেরো ! স্কুল থেকে পালিয়ে আড্ডা , গাঁজা সবকিছুতে ব্যস্ত থাকতাম ! সারাদিন ধরে কোনার রকে বসে তাস পেটা , দাবা খেলা আর মেয়েদের দেখলেই সিটি মারা। বাপটা মাকে ছেড়ে অন্য কার সাথে ভেগে গেলো, মা ও পরে আবার একটা লোক জোগাড় করে....আমার কথা কি কেউ ভেবেছিলো? আমি কোথায় যাবো তখন ? আমার সারাদিনের সান্ত্বনা ছিল শুধু সকালের কয়েক মিনিট আর সন্ধের আধ ঘন্টা। সকালে ইরা স্কুলে যাওয়ার জন্য হেঁটে আসতো ওদের বাড়ি থেকে , দাঁড়াতো বড়ো রাস্তায় ওদের স্কুল বাসের জন্য। আর বিকেলে ওরা সবাই খেলতে আসতো সামনের পার্কে। সেই সময় আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওদের , না শুধু ইরা কে।  


মনে হতো নচিকেতা যেন ওর জন্যই লিখেছিলো " লাল ফিতে সাদা মোজা , স্কুল স্কুল ইউনিফর্ম ", গানটা । আমি নিজেও কখনো ওকে দেখে সিটি মারিনি, অন্যদেরও মারতে দিই নি। একবার তো এইজন্য পটার সাথে কত ঝামেলা হয়ে গিয়েছিলো, মাইরি। 


কাজ আর পার্টি, পার্টি আর কাজ, এই দুই ছিল আমার ধ্যান আর জ্ঞান। তবে সেদিন কাকুর ওই ঘটনার পরে আমি যেন কিরকম একটা হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে চোখের সামনে ইরা কে কাঁদতে দেখে ভেতরে ভেতরে নিজের কাছে শপথ করে নিয়েছিলাম, তোমার সব কষ্ট আমি দূর করে দেবো ইরা। সেদিন থেকেই ওদের বাড়িতে, হাসপাতালে শুরু হলো আমার যাওয়া আসা। আমি বুঝতে পারছিলাম ইরা ও আমার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। আমার ভালোই লাগছিলো , মনে হচ্ছিলো যেন আমিই শালা ওর স্বামী ! ভুলে গিয়েছিলাম যে ওর একটা পুরুষমানুষ আছে , সে থাকে বিদেশে কোথাও। 


এমনিতেই বিভিন্ন মানুষের সাথে ওঠা বসা করার জন্য অনেক জায়গাতে গিয়েছি, অনেক মেয়েদের সংস্পর্শে এসেছি আমি। কয়েকবার তো ওই সব এলাকাতেও গিয়ে কাটিয়ে এসেছি রাত, সবথেকে ভালো মালের সাথে। কিন্তু ইরা, ইরা এমন একটা মেয়ে ওকে দেখলে শুধু ভালোবাসতে ইচ্ছে করে , শুধু ওর পায়ের সামনে বসে থেকে ওর স্নেহ, আদর নিতে ইচ্ছে করে , শুধু ওর পাশে বসে ওর কথা শুনতে ইচ্ছে করে। ও যখন মাঝে মাঝে আমার কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকতো, কি ভালো লাগতো সেই সময়গুলো। কোনোদিন ওর গায়ে জোর করে হাত দিতে ইচ্ছে করেনি আমার। শুধু, শুধু সেদিন রাতে ছাদে ও যখন স্নান করে এসেছিলো, রাতের আঁধারে , ভেজা চুলের মাদকতায় আমি সামলাতে পারিনি নিজেকে , টেনে নিয়েছিলাম ওকে আমার কাছে , ওকে ওকে......


ধুর কি সব ভাবছি আমি , আমি কি শালা ভালো ছেলে নাকি ? আমি তো, আমি তো.....

- এই পটলা; আরে এই পটলা ! একটা কড়া করে চা বানিয়ে নিয়ে আয় তো ; আর সাথে একটু মুড়ি নিয়ে আসিস। চা যেন গরম হয়, নাহলে পেঁদিয়ে শালা তোর বাপের বিয়ে দেখাবো রে ! মনে থাকবে তো ?  

চেঁচিয়ে উঠলো বিভাস !     


++++++++++


ধুর , মেজাজটাই খিঁচড়ে আছে সকাল থেকে। কাল রাতে যে কি হলো কে জানে ! আমি তো রোজকার মতোই তুলিকে টেনে নিয়েছিলাম কাছে। কিন্তু পরে রাতের গভীরে উঠে ও বারান্দায় কাঁদছিলো কেন? কোনোভাবে খুব লেগে গেছে কি ওর ? আমি চাই না ওকে কোনোরকম আঘাত দিতে। কিন্তু মাঝে মাঝে যে কি হয়, ওকে সামনে পেলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে ইচ্ছে করে। নিজেকে সামলাতেই পারি না। আর তুই বা কেমন মেয়ে তুলি, বাধা তো দিতে হয়। কখনোই আমাকে কোনোদিন বাধা দাও নি তুমি। তোমার ওপরে এরকম ভাবে অত্যাচার করে, পরের দিন আমি নিজেই ভালো থাকতে পারি না। অফিসে এসে সব কাজ উল্টো পাল্টা হয়ে যায় ! 


তুমি বলেছিলে তোমার বাবা নাকি লাখপতি ছেলের সাথে তোমাকে বিয়ে দিতে চায় ! সেই মতো তো আমার সাথে বিয়ে হলো। তুমি আসার পরে, কত সুন্দর হয়ে উঠলো আমার বাউন্ডুলে জীবন। কিন্তু তুমি , তুমি কখনো আমার কাছে কিছুই চাও নি নিজে থেকে। মাকে সবসময় তোমার মুখ দেখে বুঝতে হতো তুমি কি চাও তুলি। কেন , কেন এরকম হবে ? তুমি তো আমার স্ত্রী, আমি তোমার স্বামী , আমি আমার যা ইচ্ছে হচ্ছে সব যদি তোমাকে বলতে পারি, তুমি কেন আমাকে কিছু বলো না ? কেন এভাবে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখো?


সময়ের নিয়মে, আমাদের বাচ্চা হলো , ভাবলাম, হয়তো পরিবর্তন হবে। তাও হোলো না। তুমি সেই সারাদিন মুখ বুজে ঘরের সব কাজ করে চললে, আর আমি বাইরের। আমার কিছু ইচ্ছে না হলে তোমার হয় না , আমি সিনেমা দেখতে বাইরে যেতে না চাইলে, তুমিও যাবে না , আমি কিছু খেতে না চাইলে, তুমিও অন্য কিছু রান্না করবে না। মাঝে মাঝে, প্রচন্ড মাথা গরম হয়ে যায় এইসব ভাবলে , মনে হয় তখন, তুমি কি আমাকে আদৌ ভালোবাসো ? আর তখনই আমার ভেতরের পিশাচটা জেগে ওঠে তুলি। তুমি, তুমি আমাকে একটু ভালোবাসো , আমি আর কিছু চাই না তোমার কাছে তুলি , আর কিছুই চাই না। 


অফিসে পাশের টেবিলের বর্মনদা এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললো :

- কিরে , তুই কাঁদছিস কেন ? কি হয়েছে তোর ভাস্কর ? 


চোখ মুছে বললাম , 

- না না, বর্মনদা, ওই চোখে মনে হয় কিছু একটা পড়েছে , অনেকক্ষন থেকেই করকর করছে। আমি একটু ঘুরে আসি নিচ থেকে। পান খাবে ?


++++++++++


চিরন্তন ঘরে ঢুকতে ঢুকতে গন্ধ পেলো কিছু একটা ভাজার। কিন্তু ওর মন এখন পড়ে আছে ডেসির দিকে। এতো বড়ো ভুল ? আমি কি করে করে ফেললাম ? রান্নাঘর থেকে ইরা বেরিয়ে আসছে হাসি মুখে, শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে। 

- কি গো, সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আমরা সবাই। যাও যাও , জামা কাপড় ছেড়ে নিচে এসো। সবাই একসাথে বসে গরম চা, মুড়ি, পেঁয়াজি 


চিরন্তন ওপরে উঠে আসে। আমাকে একটু কথা, একটু....বলতেই হবে ডেসির সাথে ! কখন বলবো ? এখন করবো ? ওখানে তো, এখন সকাল ! ফোন বের করে ডায়াল করলাম ডেসির নম্বর। টুঁ টুঁ......টুঁ টুঁ.......টুঁ টুঁ.......


টুঁ টুঁ......টুঁ টুঁ.......টুঁ টুঁ.......


টুঁ টুঁ......টুঁ টুঁ.......টুঁ টুঁ.......


++++++++++


পনেরো মিনিটের মধ্যে, এই নিয়ে পাঁচ বার ফোন করলাম আমি ডেসিকে, দেবযানীকে। ফোন কেউ রিসিভ করছে না। কখনও তো এরকম করে নি আগে দেবযানী ! যদিও ওর সাথে এখনও পর্যন্ত তিনবার মাত্র 'দেখা-সাক্ষাৎ' হয়েছে , প্রতিবারেই একবার রিং হতে না হতেই ও ফোন রিসিভ করতো। একটা দুশ্চিন্তা, ভয়ে ঘামতে শুরু করি। কি হবে, যদি কোনোভাবে দেবযানী ইরার খবর জেনে যায়? ও যদি ওর মাসীকে বলে আমার কথা ? আমিই বা কি, একটুও বুঝতে পারিনি, ও সেই দেবযানী ? কি হবে, যদি ও ইরা কে কিছু বলার চেষ্টা করে ! 


জামাকাপড় না ছেড়ে বিছানায় বসে থাকি থাকি চুপ করে। বুকের মধ্যে একটা ঝড় হয়ে চলেছে। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি ! না না, এরকম কিছু দেবযানী করবে না ! আর কি করেই বা জানবে ও আমার খবর , আমি কোথায় আছি, বা ইরা কোথায় থাকে? আচ্ছা কেমন হয়, যদি আমি ওই দেশে ফিরেই আর না যাই কোনোদিন! তাহলে তো ওর সাথে দেখাও হবে না কোনোদিন , তাহলে সবার জন্যই ভালো হয় সেটা ! কিন্তু, কিন্তু তা বলে আমি চিনতে পারলাম না ওকে ! এতো ছোট একটা মেয়ের সাথে, যে কিনা কোনো এক সময়ে আমার কোলে বসে খেলেছে, বায়না করেছে, আবদার করেছে.....!! 


কে বলেছে ও ছোট মেয়ে ? যে এরকম সব কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে , যে একটা প্রিমিয়াম এসকর্ট ক্লাবের সদস্য, সে বাচ্চা মেয়ে ? কিছুই বোঝে না, ছোট খুকি ? কি করছিস চিরন্তন, কি সব ভাবছিস ! তোর সামনে এখন ইরা, ইরা তোর ভবিষ্যৎ , সব ভুলে যা, যেভাবে তুলিকে ভোলার জন্য ওর সাথে তোর ফোটো ওর ছেলের হাতে দিয়ে এসেছিস, যেভাবে চিন্ময়ীর সব স্মৃতি নিজের হাতে নষ্ট করে হাওয়াতে উড়িয়ে এসেছিস, সেভাবেই ভুলে যা ওই মেয়েটাকে। 


নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে শুরু করি আমি। 


দরজার কাছে ইরা এসে ভেতরে উঁকি মারে ! 

- কি হলো ? তুমি এখনো জামা কাপড় ছাড়ো নি ! কি যে করো না বাচ্চাদের মতো। কি বিড়বিড় করছো ? কোনো সমস্যা? অফিস থেকে কিছু মেল বা কিছু....ছুটিতে এসেছো তুমি চিরন্তন , ভুলে যেও না। আর, নিচে বাবা মা অপেক্ষা করছে তো। চলো, চলো ! 


ওর হাত ধরে টেনে নিলাম নিজের কাছে , আমার সামনে দাঁড়িয়ে ইরা। কি একটা প্রচন্ড কষ্ট , একটা যন্ত্রনা হচ্ছে সারা বুকের ভেতরে , সারা শরীর জুড়ে। ওকে দুহাতে জোরে জড়িয়ে ধরলাম, ওর বুকের মধ্যে গুঁজে দিলাম আমার মাথা। কোথা থেকে একরাশ কান্না নদীর বাঁধভাঙা জলের মতো বেরিয়ে এলো। আমার ভেতরেও এতো কান্না জমে ছিল ? 


আমার মাথার ওপরে নিজের চিবুকটা রেখে ধীরে ধীরে বলে উঠলো ইরা: 

- কি হয়েছে চিরু, এতো কান্না কাটি করছো কেন? নিশ্চয়ই পুরোনো জায়গাতে ফিরে গিয়ে সব পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেছে। এইজন্যই আমি বিশ্বাস করি, পুরোনো স্মৃতি বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত নয়! অনেক আনন্দ থাকে ওখানে,, তবে তার সাথে নিয়ে আসে একরাশ মন খারাপের টুকরো টুকরো ছবি। সেগুলো হঠাৎ করে, সামলে ওঠা যায় না এতো সহজে। 


আমার মুখটা দুহাতে তুলে নিলো ইরা , দেখলাম ওর চোখেও জল। আমার কষ্টে, ইরা ও কাঁদছে ? কিন্তু ও তো জানে না আমি, আমি কতটা খারাপ মানুষ, কিভাবে ওর বিশ্বাস, ভালোবাসার অমর্যাদা করেছি, খেলেছি। ও আমাকে, আমাকে এতোটা ভালোবাসে? আরো কান্না ভেতরে থেকে বেরিয়ে এলো হোঁচট খেতে খেতে। 


ওকে জড়িয়ে আমি বলার চেষ্টা করলাম ,

- ইরা, ইরা তোমাকে আমার কিছু...


আমার মুখের ওপরে আঙ্গুল রেখে বললো,

- এখন কিছুই না চিরু। দাঁড়াও আমি তোমার জামা কাপড় বের করে দিচ্ছি। দু মিনিটে চোখে মুখে জল দিয়ে , চুলে চিরুনি, গায়ে পাউডার মেরে, পাঁচ মিনিটে নিচে এসো ! ছিঃ, কি বাজে ঘামের গন্ধ ছাড়ছে তোমার গা থেকে ! যাও তো, আগে স্নান করে এসো ! আর তারপরে তাড়াতাড়ি নিচে এসো ! নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে এবার। 


চলে গেলো ইরা আমাকে ছেড়ে। আমি বাধ্য ছেলের মতো , এখন দাঁড়িয়ে বেসিনের সামনে, চোখে মুখে জল দিয়ে, হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করলাম । না শুধুই তো হাতে সাবান দিলে হবে না, সারা শরীরে ভালো করে নারকেল ছোবড়া দিয়ে ঘষে ঘষে স্নান করতে হবে আমাকে , তুলে ফেলতে হবে সব ক্লেদ, মুছে ফেলতে হবে মনের সব কাদা ! ফিরিয়ে আনতে হবে ইরার জন্য ভালোবাসার আর্দ্রতা, সকালের শিশিরে ভেজা প্রথম হাওয়ার পরশ। 


++++++++++


যখন থেকে ডেসি-দেবযানী, জানতে পেরেছে মাসী চিরন্তনকে ওর ফটো পাঠিয়েছে ই-মেল করে , ও চুপ করে বসে আছে ঘরের এক কোণে! হাতে মোবাইল। একটা অন্যরকম ভয়ে কেঁপে উঠছে শরীর। কি হবে যদি চিরন্তন সব জানিয়ে দেয় মাসীকে ? যদি মাসী, মা, ভাই সবাই জেনে ফেলে আমি এখানে আসলে কি কাজ করছি ? কি হবে ওরা সবাই আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করলে ? পারবো তো আমি ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ? উফফ, মাসী যে কেন একবারও ভাবলো না ! আর তার থেকেও বড়ো কথা আমি এখন একজন অ্যাডাল্ট, আর আমাকে জিজ্ঞেস না করে, কি করে মাসী আমার ফটো অন্য কাউকে দিতে পারে ? কি ভাবে কি নিজেকে ? এখনও আমার ওপরে ছড়ি ঘোরাবে , মাসীর পছন্দ অপছন্দে আমাকে চলতে হবে ! 


কিন্তু, চিরু মামা, চিরন্তন আমাকে নিয়ে কি ভাববে ? আমি ঠকিয়ে এসেছি এতদিন ধরে ওকে ? কি হবে যদি আর আমার সাথে দেখা না করতে চায় ? যদি আমার সাথে কথা না বলে ? এতকিছুর মধ্যেও চিরন্তন , আমার চিরন্তনের মধ্যে আমি শান্তি খুঁজে পেতাম। আমাকে যদি ছুঁড়ে ফেলে দেয় ? কোনোদিন যদি আর চিরন্তনের ফোন না আসে তার ডেসির কাছে , কি নিয়ে থাকবো আমি? 


উঠে এসে দাঁড়ায় দেবযানী , নিজেকে শক্ত করে, আয়নায় দেখে নিজেকে ভালো করে। বিশাল বড়ো এপার্টমেন্টের খোলা বারান্দায় বেরিয়ে আসে ও। বারান্দার ওপরে খোলা ছাদ, সেটার ওপরে রয়েছে একটা পর্দার মতো ব্যবস্থা।ইচ্ছে মতো ওটাকে লাগানো বা খোলা যায় সহজেই। ওর গ্রীক ব্যবসায়ী বন্ধু, এইরকমই চেয়েছিলো। গোলাকার বারান্দার মাঝে একটা দুজনের শোয়ার মতো বিছানা , মেঝে থেকে মাত্র তিন ইঞ্চি ওপরে। এখানে কত রাতে শুয়ে শুয়ে ওরা দুজনে সারারাত ধরে........রাতের আঁধারে, আকাশে উড়ে যেতো প্লেন ডানা মেলে, রাস্তার ওপর দিয়ে চলে যেত গাড়িগুলো হুশহাশ করে , ঠান্ডা হাওয়া আসতো ভেসে, মাঝে মাঝে ওর সাথে আসতো বরফের কুচি; ..... তার মধ্যে ওর গ্ৰীক প্রেমিক - মালিক , আর ও, এই বিছানায়...কত অম্লমধুর মুহূর্ত...  


বারান্দার একদম ধারে রয়েছে রেলিং, উঁচু রেলিঙের পরেই কয়েকশো ফিট নিচে কুচকুচে কালো রাজপথ! শীতের সময়ে , বরফ পড়ে থাকে যখন রাস্তার ওপরে, দেখতে কি ভীষণ ভালো লাগে এতো ওপরে থেকে। ধীরে ধীরে রেলিঙে পা দিয়ে উঠে দাঁড়ায় দেবযানী। আরো একটু ওপরে উঠতে হবে, তারপরেই একটা ছোট্ট ঝাঁপ নিচের দিকে ; কিছুক্ষন পরেই শান্তি, সব দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি। 


++++++++++


ডুনাবির বরফ ঠান্ডা জল যেন ডাকছে আমাকে ওর সবগুলো হাত বাড়িয়ে। আচ্ছা, একটা নদীর কতগুলো হাত ? দুটো, আটটা, বারোটা নাকি অজস্র ? ধুর কিসব ভাবনা মাথায় আসছে। এইতো একটু পরেই বুঝতে পারবো কতগুলো হাত দিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করবে ডুনাবি ! কিন্তু যদি আমি জলে ঝাঁপ দিই , কি হবে তারপর ? আমি তো সাঁতার জানি না ! ধীরে ধীরে নদীটা, আমাকে জড়িয়ে ধরবে - ওর সহস্র বা আরো বেশি হাত দিয়ে আমাকে চারদিক থেকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে ধরবে ।আমি হাত পা ছুঁড়বো খুব, আরো তলিয়ে যাবো নিচের দিকে, ঢুকে যাবো জলের ভেতরে, হাবুডুবু খাবো, খাবি খাবো, কাশতে চাইবো, মুখ খুললেই মুখের ভেতরে হু হু করে ঝুঁকবে জল। নাকের ভেতরে জল, কানের ভেতরে জল , নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে , মুখ তোলার চেষ্টা করবো, কিন্তু পারবো না। 


না, না এই মৃত্যু শান্তির নয়, এই বীভৎসতা আমি চাই না। আমি আরো বাঁচতে চাই, যতদিন পারি, আমি হাঁটবো পৃথিবীর বুকে। আত্মহত্যা আমি করতে পারবো না , আমি সত্যিই কাপুরুষ একটা , ভীতু। 


ধীরে ধীরে পা সামলে নেমে পড়লো ব্রিজ থেকে নীলাঞ্জন। এই ঠান্ডাতেও ঘামছে ও। ফোন বের করলো পকেট থেকে।

 

কাউকে একটা ফোন করতে হবে , কাকে করবো ? চিন্ময়ী ? আবার অপমানিত হবো ওর কাছে ? না ! ওকে আমি আর ফোন করবো না। আচ্ছা আমাদের দেবু কেমন আছে ? ও তো আমাকে নীলাঞ্জনদা বলে ডাকে, ওকে তো আমি আমার বোনের মতোই ভীষণ ভালোবাসি। ওকে একটা ফোন করি। অনেক দিন, অনেক দিন আমার বোনটার সাথে কথা হয় নি ! 


কারোর সাথে কথা না বললে , শান্তি পাবো না ! 


++++++++++


দেবযানীর ফোনটা হঠাৎ জোরে জোরে বেজে উঠলো , নীলাঞ্জনদা ফোন করছে ? এখন, কেন ? একটু কথা বলে নেবো ? 

- বলো নীলাঞ্জনদা। 


- তুই, তুই কেমন আছিস রে দেবু ? অনেকদিন তোর সাথে কথা হয়নি। 


- ভালোই তো। এই আমি ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলাম আমার ফ্ল্যাট থেকে। তোমার ফোনটা এসে , আমার ঝাঁপ দেওয়াটা কিছুক্ষনের জন্য স্থগিত রাখলাম। 


- হা হা হা হা , ভালো বলেছিস তুই। জানিস? আমিও না এই একটু আগে ডানুবি তে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলাম। তো ভাবলাম , মরতেই যদি হয়, একবার তোর সাথে আগে কথা বলে নিই ! 


- ভালো তো, তারপরে দুজনেই আমরা ভূত হয়ে যেতাম একসাথে। 


- আচ্ছা শোন দেবু, আর ইয়ার্কি নয় ! আমি ভাবছিলাম , ভাবছিলাম এখান থেকে চলে যাবো সব কাজ কর্ম ছেড়ে। আর ভালো লাগছে না সবাইকে ছেড়ে এতো দূরে দূরে থাকতে। আসলে যতদিন আমরা সবাই সবাইয়ের সাথে আছি, আমরা খুব ভালো থাকবো সবাই মিলে ! দূরে এলেই সমস্যা। 


- আমি জানি না , মানে কি বলবো তোমাকে ! তবে একটা কথা তোমাকে বলবো ? কাউকে কিন্তু বলতে পারবে না , এটা শুধু দাদা আর বোনের কথা। 


দেবযানী ফোনে নীলাঞ্জনকে সব বললো , সবটা নয় , যতটা বলা সম্ভব সেইটুকু। কথা বলতে বলতে কেটে গেলো প্রায় ঘন্টা দুই। নীলাঞ্জন শেষে বললো :

- তাহলে বোন, ওই কথাই রইলো। তুই তোর সব কিছু ছেড়ে , ফিরে আসছিস, আমিও আমার সবকিছু ছেড়ে ফিরে যাচ্ছি। আমরা সবাই একসাথে থাকবো আবার আগের মতো। আমরা দুই বেকার , নতুন করে চেষ্টা করি আবার যদি জীবনটাকে অন্যভাবে শুরু করা যায় ! আর যা হয়েছে , তোর ডেসির চ্যাপ্টার এবার, আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে বন্ধ ! তোর মাসী , মা, ভাই কেউ কোনোদিন জানবে না। শুধু আমি জানলাম। তোর মাসী , আসলে খারাপ নয় , মানুষ হিসেবে ভালো। কিন্তু আমার মনে হয়, মধ্যেকার এই যে দূরত্ব , সেটা আমাদের সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে ভীষণ একা করে দিয়েছে। হয়তো আমরা অনেক রোজগার করছি, বড়ো বাড়িতে আছি, আছে গাড়ি আর অন্য সুযেগ সুবিধে ! কিন্তু ভেতর থেকে যে আমাদের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে , কান্নায় ভেঙে পড়ছে নিজের ভালোবাসার লোকজনের সাথে থাকার জন্য , সেটাকে অস্বীকার করে আমরা সেই ভাঙা হৃদয় নিয়ে এগিয়ে চলেছি একটা ভয়ঙ্কর অনিশ্চিতের দিকে। আর কান্নাকাটি নয়, এবার যা কিছু ভেঙে গিয়েছিলো, বা ভেঙে যাচ্ছে, সেই সব কিছুকে আমরা চল জোড়া লাগাতে চেষ্টা করি। কিরে , পারবি না? 


- কে বললো নীল দা আমি কাঁদছি ? আমি, আমি.....তুমিও তো কাঁদছো ! তুমি কেন কাঁদছো নীল দা ?


- জানিস তো একটা কথা, কান্না এলে ভালো; কেঁদে নে ! কান্নার জলের সাথে ভাসিয়ে দে সব পুরোনো জমানো ব্যথা, স্মৃতি ! দেখবি, শেষে একটা নতুন দেবযানীর জন্ম হচ্ছে, আমার থেকেও একটা নতুন নীলাঞ্জন। আচ্ছা এবার আমি ছাড়ি ! কয়েকদিন পরেই তাহলে দুবাই এয়ারপোর্টে আমাদের দুজনের দেখা হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা একসাথে দেশে ফিরবো। আমরা কাউকেই কিছু জানাবো না, সবাইকে চমকে দেবো, ঠিক আছে ? 


++++++++++


পিঁয়াজি দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে মলয় বলে উঠলেন,

- বেশ ভালো লাগছে আজকে। কতদিন পরে আমরা সবাই একসাথে বসেছি এভাবে। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এইসময়ের ও খুব দরকার আছে। তাহলেই সেটা হয়ে ওঠে একটা আদর্শ পরিবার! কি বলিস ইরা ? 


- তুমি আমাকে বলছো কেন বাবা ? আমি তো এরকমই চাই সবসময়। তোমরা দুজনেই তো হাঁটতে বেরিয়ে ফের সেই সন্ধে সাতটার পরে। 

 তখন কি আর এভাবে বসে আড্ডা দিতে দিতে খাওয়া যায় ? পরের দিনের জন্য রান্না থাকে , আরো অনেক কাজ ! কাজের চাপে  

       

 সুদীপা বলে উঠলেন,

- তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? আমরা বুড়ো বুড়ি হাঁটতে যাবো না তাই বলে ? কতজনের সাথে দেখা হয়, কত কথা হয়। তবে, দেখি চেষ্টা করে , আরো নাহয় আমরা আগেই বেরোবো আর ছটা সাড়ে ছটার মধ্যে ঢুকবো! তাহলে তো হবে ? আরে , জামাইতো কিছুই খাচ্ছে না ! এই , তুই বলেছিস নাকিরে ছেলেটাকে ? এতদিন পরে এসেছে !


ইরা একটু কপট রাগ দেখিয়ে বললো :

- আচ্ছা, যা কিছু ভুল ভ্রান্তি , সব আমার ! তাই না ? যাও আমি কথাই বলবো না কারোর সাথে। 


ইরা তিনটে পেঁয়াজি তুলে দিলো চিরন্তনের বাটিতে ! 

- এই যে, দিলাম তোমাকে। এবার একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে দেখিয়ে দাও তো সবাইকে , আমি তোমাকে কিছু বলিনি ! 


হাসতে হাসতে চিরন্তন ইরার হাতের ওপরে হাত রেখে বললো :

- আসলে কি হয়েছে জানেন তো ! অনেকদিন পরে এইরকম পরিবেশ পেয়ে একটু ভাবুক হয়ে গিয়েছিলাম। বাবা, মা দুজনেই তো আমার অল্প বয়সে চলে গিয়েছে, এইরকম পুরো ব্যাপারটা আমি শুধু পড়েছি , বা অন্যদের গল্প করতে শুনেছিলাম। তাই আর কি। 


খেতে খেতে চিরন্তন , চায়ের কাপ টেনে নিয়ে চুমুক দিলো। মলয় বলে উঠলেন :

- আচ্ছা চিরন্তন, একটা কথা বলো , তোমার কেমন লাগছে ওখানে গিয়ে থাকতে ? তোমার একা লাগে না ? বোর হয়ে যাও না ! 


- সত্যি কথা বলবো ? মাঝে মাঝে, খুব, খুব রাগ হয় ! কেন আমাদের দেশ থেকেই ছেলে মেয়েদের সবসময় বাইরের কোথাও যেতে হয় বেশি রোজগার বা উন্নতির জন্য? আমাদের এখানে আমরা চাকরি নয়, আমরা আসলে চাকরগিরি করি। তাই তো এখানে সকাল থেকে যে ছোটা শুরু হয়, সেটা শেষ হয় সেই রাতে ! আবার শনি বা রবিবারেও আসতে হয়। আর ওখানে ? ওখানে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে কেউ অফিসের কোনো কথা ভাবে না , মেল চেক করে না , শনি বা রবিবার বা ছুটির দিনে, কোনোরকম অফিসের কাজ করতে অস্বীকার করে। আর আমরা কাজের সময় কত আড্ডা মারি, সময় নষ্ট করি চা বা সিগারেট খেতে গিয়ে বা ক্যান্টিনে গিয়ে ! ওখানে ওরা কাজের সময়ে অন্য সবকিছু ভুলে যায় , তখন কোনো আজে বাজে আড্ডা নয় ! আর এইজন্যই ওরা, সময়ে, সবকিছু করে বেরোতে পারে। আর যেটা বললেন, হ্যাঁ, আমার মাঝে মাঝেই ভীষণ একা একা লাগে, ভীষণ অসহায় মনে হয় নিজেকে। মনে হয়, আপনারা বা ইরা যদি কাছে থাকতো যার সাথে আমিও বাইরে ঘুরতে যেতে পারতাম, বা একসাথে দেখতে যেতাম সিনেমা বা শুধু চুপ করে বসে একে অন্যের সাথে গল্প করতে পারতাম ! 


ইরা ওর হাতের ওপরে চাপ দেয় একটু। 


মলয় বলে ওঠেন, 

- আমি তো মেয়েটাকে পইপই করে বললাম, তুই চলে যা, তোর সংসার গুছিয়ে নে ! আমাদের বুড়োবুড়ির কাছে থাকতে হবে না ! কে কার কথা শোনে !  


চোখ বড়ো করে বাবার দিকে তাকায় ইরা।  

 

সুদীপা বলে ওঠেন, 

- আচ্ছা, ওই যে বললে, খারাপ লাগে একা থাকতে থাকতে , তো, যখন খুব খারাপ লাগে, বা একা লাগে, কি করো তুমি ?


- কি আর করবো, ফোন করি ইরা কে , বা ল্যাপটপে বসে থাকি। একা একা থাকলে মনে হয় পুরো এতো বড়ো শহরটা গিলতে আসছে। প্রথম প্রথম যখন গিয়েছিলাম খুব ভালো লাগছিলো ; নতুন জায়গা, নতুন মানুষ। কিন্তু এখন , এখন আর কিছুই ভালো লাগে না। জানো তো এই একাকিত্বের জন্য কত লোকজন ওখানে ডিপ্রেশনে চলে যায় ? কতজন আবার অন্য অনেক কিছু করে ফেলে ! এইতো, আমাদের অফিসেই বেশ কয়েকজন আছে যারা আমারই মতো অন্য দেশ থেকে এসেছে , আর একাই থাকে ওখানে। ওরা প্রায়ই ক্লাবে যায় , মদ খায়, অন্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক , তাদের নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে। অথচ, ওরাও বিবাহিত, ওদেরও অন্য দেশে সংসার আছে। ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম , সে বলেছিলো এটা হচ্ছে একাকিত্ব কাটানোর ওষুধ ! মানসিকভাবে তো কারোর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছি না , শুধু কিছুটা সময় একটু ভালো থাকার জন্য , কিছু ডলারের বিনিময়ে সুখের মুহূর্ত কিনে নেওয়া। 


কেউ কিছু না বলে চুপ করে খেতে লাগলো। একটু পরে খাওয়া হয়ে গেলে ইরা সবকিছু নিয়ে ওঠার সময় বলে উঠলো ধীরে ধীরে :

- সত্যিই তো, নিজেদের পরিবার, ভালোবাসার মানুষজনকে ছেড়ে থাকাটা খুব কষ্টের! তবুও এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকতে হয়।


রাত হয়েছে গভীর , মা, বাবা শুয়ে পড়েছে , ওদের ওষুধ খাইয়ে ইরা এলো বেডরুমে। চিরন্তন টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঘর অন্ধকার করে। ওর চোখ বাইরের দিকে , ওপরে একটা সাদা স্যান্ডো আর নিচে একটা শর্টস পরে দাঁড়িয়ে আছে ও। জানালার বাইরে থেকে ভেসে আসছে স্ট্রিট লাইটের হলুদ রঙের আলো। একটা যন্ত্রনা ফুটে উঠেছে চিরন্তনের মুখে, কিছু না বলতে পারার যন্ত্রনা। ইরা এসে দরজা বন্ধ করে ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। কিছু না বলে চিরন্তন ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ায় , ওর ঠোঁটের মধ্যে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিতে যায়। নিজের মুখটা সরিয়ে নেয় ইরা। ওকে ধীরে ধীরে বিছানায় টেনে নিয়ে এসে বসায় ,

- তুমি কি আমার কাছে কিছু লুকিয়ে যাচ্ছ চিরু ? 


আমতা আমতা করে , একবার বাইরে, একবার ঘরের ভেতরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে চিরন্তন,

- কই , না তো ? কেন? কেন এরকম বলছো তুমি ? 


- দেখো চিরু, তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন বছর; একসাথে আমরা ঘর করেছি তার থেকেও কম। কিন্তু তোমার মুখ দেখলেই আমি বলে দেবো, আমি বুঝে যাবো , তুমি আমার কাছে কিছু লুকোচ্ছ কিনা। তোমার মুখ, তোমার ভেতরের প্রতিচ্ছবি। সেটাকে তুমি কিছুতেই লুকোতে পারবে না। 


চিরন্তন বসে পড়ে মেঝেতে , ইরার কোলের ওপরে মাথা রেখে বলে :

- আসলে কি জানো ইরা ? আমরা মানুষেরা, সব সময় লুকোচুরি খেলতে চাই , নিজেদের সাথে, নিজেদের মনের সাথে। তাই ভেতরের খবর বাইরে নিয়ে আসতে পারি না, চাই না, আর সবাইকে আমরা অন্যকিছু বোঝাতে চাই, নিজেদের মনগড়া কিছু। আর নিজেদের ও সেটাই বোঝাই ! আমি, আমি চাই না আমাদের মধ্যে কোনো কিছু লুকিয়ে থাকুক। আমি চাই না শেষ বয়সে এসে কোনরকমভাবে কোনোকিছু জন্য আক্ষেপ করতে। আর তুমি, তুমি যখন বুঝেই গেছো...যার কথা তখন বলছিলাম সন্ধেতে, সেটা আর কেউ নয় , আমি আমি নিজে ছিলাম ইরা। আমি আজ লজ্জায়, অপমানে, শঙ্কায় তোমাকে মুখ দেখাতে পারছি না। আমি জানি এর কোনো ক্ষমা হয় না , তবুও একটা কথাই শুধু বলবো ইরা , আমি, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি জানিনা কি করবো , হয়তো এভাবেই অন্ধকারে আরো তলিয়ে যাবো। 


ইরা কিছু না বলে চিরন্তনকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো , ধীরে ধীরে ঘরের অন্য একটা অন্ধকার কোণায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো :

- তাহলে তো আমিও অপরাধী চিরু। আমি, আমি তোমার অনুপস্থিতিতে অন্য একজনের মধ্যে তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে তোমাকে কামনা করেছিলাম। তোমার মতো হয়তো এতটা এগোতে পারিনি, তবে জানিনা, তুমি , তুমি যদি এখন চলে না আসতে , আমিও হয়তো ভেসে যেতাম ! 


চিরন্তন কিছু না বলে চুপ করে রইলো। ইরা আবার একটু পরে বলে উঠলো কাঁদতে কাঁদতে , 

- আসলে এই একা একা থাকা যে কি কষ্টের ! একজন মানুষের উপস্থিতি খুব দরকার চিরু, পাশে যে দাঁড়িয়ে থাকবে, পাশে যে হাতে হাত রেখে চলবে , যার কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে বসে থাকা যাবে কিছুক্ষন, যার বুকে মাথা রাখলে মনে হবে জীবনে আর কোনো সমস্যা নেই, পুরো পৃথিবীটাই ভীষণ ভালো। 


চিরন্তন এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো ইরা কে। ঘরের লাইট এর সুইচ অন করে টেনে নিলো ওকে বুকে , ওর চোখ থেকে মুছে দিলো জল। 

- ভুল, বা অপরাধ যাই হোক না কেন, আমরা দুজনেই করেছি ইরা , সেটা হয়তো পরিস্থিতি, সময় ; জানি না কিসের জন্য। কিন্তু আমি আর পারছি না ইরা, তোমাকে ছেড়ে , তোমাদের ছেড়ে একা একা আর পারছি না। আমি ভাবছি চাকরিটা ছেড়ে দেবো। এমন কিছু করবো, যাতে তোমার পাশে, বাবা মায়ের পাশে থাকতে পারি। যাতে সারাদিন কাজের চাপে ব্যস্ত থাকলেও, দিনের শেষে ফিরে আসতে পারি বাড়িতে , তোমাদের কাছে। 


- আচ্ছা চিরু, তুমি চাকরি ছাড়ার কথা কেন বলছো ? জানোনা , এখন চাকরি ছেড়ে দিলে, এই দেশে চাকরি পেতে কত সমস্যা ? আমরাও যদি তোমার সাথে চলে যাই ওই দেশে ? পারবে না , পারবে না আমাদের সবার ভার নিতে ? 


বিস্ময়ে কোলে তুলে নিলো ইরা কে চিরন্তন।

- সত্যি ? সত্যি বলছো ? তাহলে তো ভিসা, আরো অনেককিছু কাগজপত্র ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সেসব হয়ে যাবে , কোম্পানির সাথে কথা বলতে হবে। আমি, আমি এক কাজ করি, আরো কিছু ছুটি বাড়িয়ে নিয়ে, তারপরে সবাই একসাথে চলে যাবো ! আমি কাল সকালেই বাবা মায়ের সাথে কথা বলছি। 


ঘর অন্ধকার করে ইরা আর চিরন্তন মিশে গেলো দুজনের মধ্যে। 


++++++++++


কয়েকদিন পরে দুবাই এয়ারপোর্টে , ইরা, মলয়, সুদীপা আর চিরন্তন অপেক্ষা করছে। চিরন্তন জল খেতে গিয়ে দেখলো বোতলে জল শেষ। ও ইরা কে বললো, তুমি একটু বোসো , আমি জলের বোতল কয়েকটা নিয়ে আসি। 


কিছুটা গিয়ে সামনে একজনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো চিরন্তন , 

সামনের মেয়েটি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে চিরন্তনের। মেয়েটি কাছে আসার পরে চিরন্তন বললো ,

- ডেসি ? তুমি এখানে ? 


- ডেসি না চিরু মামা ! তুমি কি আমার নামটাও ভুলে গেছো ? দেবযানী, দেবযানী আমার নাম, তোমার সেই ছোট্ট দেবু। তাহলে, ফিরে যাচ্ছ ছুটি কাটিয়ে? ওইটা কে? মামী? খুব সুন্দর, খুব সুন্দর দেখতে গো। আচ্ছা আমি এবার আসি , ওদিকে নীল দা অপেক্ষা করছে লাউঞ্জে। খুব ভালো থেকো তোমরা।




Rate this content
Log in

More bengali story from Jay Adhikari

Similar bengali story from Romance