Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Siddhartha Singha

Tragedy


3  

Siddhartha Singha

Tragedy


একান্ন বছরের টুকরো স্মৃতি

একান্ন বছরের টুকরো স্মৃতি

13 mins 886 13 mins 886

রাসবিহারী মোড়ের দিকে যাচ্ছিলাম। হেঁটেই যাচ্ছিলাম। তখন সি আর দাস সেতুর জায়গায় কাঠের সাঁকো। ব্রিজের দু’মুখেই দু’হাত দূরে দূরে খুঁটি পোঁতা। সাইকেল নিয়ে কোনও রকমে গলে যাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু গাড়ি-টারি যেতে পারে না। তখনও অতটা যাইনি। তার আগেই হঠাৎ দেখি, ও দিক থেকে একটা লোক আসছেন। কেমন যেন চেনা-চেনা মনে হল। কোথায় দেখেছি! কোথায় দেখেছি! মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না।

ততক্ষণে লোকটা আমার একেবারে সামনাসামনি চলে এসেছে। আমাকে দেখে একটু হাসলেন। আমাকে দেখেই হাসছেন তো! নাকি… পিছন ফিরে দেখি, না। পিছনে কেউ নেই। তার মানে আমাকে দেখেই… আমিও হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে গেলাম। লোকটাও আমাকে দেখতে দেখতে পাশ দিয়ে চলে গেলেন।

আমি ভাবতে লাগলাম, লোকটা কে! ঠিক চিনতে পারলাম না তো! কে! দেখার জন্য পিছন ফিরতেই দেখি, উনিও খানিকটা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

তার মানে আমাকে চিনতে পেরেছেন! ওই তো আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমিও ভদ্রতার খাতিরে তার দিকে এগোতে লাগলাম। কাছাকাছি যেতেই বললেন, ভাল আছিস?

আর যেই উনি এটা বললেন, সঙ্গে সঙ্গে আমি চিনতে পারলাম, আরে, ইনি তো আমার বাবা। সীতানাথ সিংহ।


আমার স্কুলে এবং রেশন কার্ডে পিতৃ পরিচয়ের জায়গায় এই নামটা আছে। কিন্তু আমার আরও যে চার-চারটে ভাইবোন আছে, তাদের বাবার নামের জায়গায় কিন্তু এই নামটা নেই। আছে— নকুলচন্দ্র সিংহ।

নকুলচন্দ্র থাকতেন আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ, পরমহংস দেব রোডে। উনি আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আমার বাবার তখন কাজবাজ নেই। বাবা-কাকারা মিলে অনেকগুলো ভাই। তাঁরা বাড়িতে চিট-পাটালি বানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করতেন। আর যাতায়াতের পথে কোথাও কোনও কলকারাখানা দেখতে পেলেই খোঁজ করতেন, ওখানে কোনও লোকজন নেওয়া হচ্ছে কি না।

তা, সেই নকুলবাবু একই সঙ্গে দুটো ইন্টারভিউয়ের কল পান। একটা রেলে আর একটা পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে। উনি রেলের চাকরিটাই বেছে নেন।

তখন নকুলবাবুদের সঙ্গে বাবা-কাকাদের খুব দহরম মহরম। বাবা যখন শুনলেন, নকুলবাবু রেলের চাকরিটা নিয়েছেন। তাই পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রামে আর ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন না, তখন সেই চিঠি নিয়ে বাবাই পরীক্ষা দিতে ছুটলেন। রেস কোর্সের উল্টো দিকে পি অ্যান্ড টি-তে। না। ইন্টারভিউ দিতে কোনও সমস্যা হয়নি। তখন চাকরির আবেদনের সঙ্গে ছবি-টবি দেওয়ার কোনও বালাই ছিল না। অত কড়াকড়িও ছিল না। সেখানে প্রশ্ন বলতে ছিল, আপনার নাম কী? কোথায় থাকেন? আর, সাইকেল চালাতে জানেন কি?

বাবা একটু-আধটু সাইকেল চালাতে পারতেন। কিন্তু উঠতে-নামতে পারতেন না। কেউ ধরে সিটে বসিয়ে দিলে টাল খেতে খেতে হলেও ঠিক চালিয়ে দিতেন। তাই যাঁরা পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, সাইকেলটাকে হাঁটাতে হাঁটাতে তাঁদের চোখের আড়ালে নিয়ে গিয়ে একটা ল্যামপোস্ট ধরে কোনও রকমে সিটে বসে পড়েছিলেন। এবং যেহেতু নামতে পারতেন না, তাই চালাতে চালাতে এসে তাঁদের সামনে হঠাৎ ব্রেক কষে এমন ভাবে কায়দা করে পড়েছিলেন, যাতে তাঁদের মনে হয়, তাঁর প্যান্টটা সাইকেলের চেনে আটকে গিয়েছিল।

ক’দিন পরেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। বাবার চাকরি হয়ে গেল। হল, তবে নিজের নামে নয়, যে নামে কল-লেটার এসেছিল, সেই নকুলচন্দ্র সিংহের নামে। তখন যাঁরা সরকারি চাকরি করতেন, তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ানোর মাইনেটা অফিস থেকে পেতেন। তাই আমার বাকি চার ভাইবোনের স্কুলে বাবা হিসেবে ঢুকে পড়েছিল নকুলচন্দ্র সিংহের নাম। আর আমার বাবার নাম যে কী করে সীতানাথই রয়ে গেল, সেটা বাবাই জানেন।

ছোটবেলায় কার মুখে যেন শুনেছিলাম, পরে যাতে কোনও অসুবিধে না-হয়, সে জন্য অফিসে ঢোকার কয়েক দিনের মধ্যেই বাবা প্রথম যে-কাজটা করেছিলেন, সেটা হল, খুব সন্তর্পণে অফিসের আলমারি থেকে চাকরির ওই নথিপত্রগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন। না। শুধু নিজেরটাই নয়, তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েক জনেরটা। যাতে সহজে কেউ তাকে সন্দেহ করতে না পারে।

আমার মনে পড়ে, আমরা তখন খুব ছোট। অফিস থেকে ফিরেই বাবা আমাদের চেতলা পার্কে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। এবং মাঝেমধ্যেই ওই পার্কের উল্টো দিকে রূপায়ণ সিনেমা হলে ছত্রিশ পয়সার টিকিট কেটে গেটকিপারকে বলে আমাদের প্রথম দু’-তিনটে রো-য়ের ম‌ধ্যে বসিয়ে দিতেন। 

আমাদের ঢোকাতেন, কিন্তু নিজে ঢুকতেন না। হল ভাঙলে দেখতাম, গেটের কাছে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথম প্রথম অত বুঝতাম না। একবার হাফ টাইমের সময়, সিনেমা শেষ হয়ে গেছে ভেবে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে বাবাকে না দেখে কান্না জুড়ে দিয়েছিলাম। তখন ওই হলেরই এক দারোয়ান বুঝতে পেরে আমাকে ফের হলের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

তখন আমি ভাবতাম, আমার বাবার মতো বাবা হয় না। বাবার কাছে অত পয়সা নেই দেখে নিজে সিনেমা দেখেন না। কিন্তু আমাদের দেখান। আমার বাবা কত ভাল। সারা পৃথিবী খুঁজলেও এ রকম বাবা আর একটাও পাওয়া যাবে না।

পরে, অনেক পরে বুঝেছিলাম, অজস্র গুণের মধ্যে বাবার আর একটা গুণ ছিল, মেয়ে দেখলেই ছোঁকছোঁক করা। আমরা দেখলে যদি বাড়ি এসে বলে দিই, সেই ভয়ে বাবা আমাদের সিনেমা হলে ঢুকিয়ে দিয়ে বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করতেন।

বাবা যে এ রকম করতেন, আমি সেটা টের পেয়েছিলাম ক্লাস টু-য়ে উঠেই। উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার ভিতরে সঙ্কোশ টি-গার্ডেন। সেখানে আমাদের এক মাসির বাড়ি। ওখানে ঘুরতে গিয়ে বাবা একটি মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তাকে নাকি দেখার কেউ নেই। বাবা তাকে ধর্ম মেয়ে ডেকেছেন। তখন এ সবের খুব চল ছিল। ধর্ম ভাই। ধর্ম বোন। ধর্ম মেয়ে।

মেয়ে মানে তো আমাদের দিদি। কিন্তু মায়ের বয়সি কোনও মেয়েকে আমরা দিদি ডাকব কী করে! মাসির বাড়ির দিকের লোক, তাই তাকে মাসি বলেই ডাকতে শুরু করলাম। শেফালি মাসি।

মা আপত্তি করেছিলেন। এইটুকু ঘরে অত বড় বয়স্কা একটা মেয়েকে থাকতে দেব কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে বাবা বলেছিলেন, বেশি দিন তো থাকবে না। খাটের তলায় বিছানা করে দেবে… তার পর দেখি কী করা যায়!

বাবা যা মাইনে পেতেন তাতে সংসার চলত না। টানাটানি লেগেই থাকত। তাই টাকার জোগান দেওয়ার জন্য মা সেলাই-ফোঁড়াই করতেন। সেই সুবাদে এ দিকে ও দিকে যেতেন। আর মা না-থাকলেই সুযোগ বুঝে শেফালি মাসির পিছনে ঘুরঘুর করতেন বাবা। এবং ওই বয়সেই বাবার ওই চালচলন আমার মোটেই ভাল লাগত না। কত দিন যে বাবা আর শেফালি মাসিকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছি, কী বলব!

শুধু আমিই নই। একদিন মা-ও দেখে ফেললেন। সে নিয়ে কী অশান্তি। আশপাশের লোক জড়ো হয়ে গেল। পাড়ার যাঁরা মাতব্বর গোছের, তাঁরা বাবাকে বললেন, এই মেয়েটিকে যেখান থেকে নিয়ে এসেছেন, সেখানে পাঠিয়ে দিন। 

বাবা বললেন, কোথায় পাঠাব! ওর যে তিন কূলে কেউ নেই।

অগত্যা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পাড়ার লোকেরাই চাঁদা তুলে শেফালি মাসির বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মেয়ে দেখতে শুনতে ভাল। ফর্সা। বালকি। হাসলে গালে টোল পড়ে। দেখামাত্র পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়ে গেল। পাত্র দেখতে শুনতে তার যোগ্য না হলেও ভাল আয় করেন। হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ান। প্রচুর টিউশনি করেন। নিজের বাড়ি-ঘরদোর আছে। সাত দিনের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল। বাবাই সম্প্রদান করলেন।

বিয়ের খবর জানিয়ে মা চিঠি লিখলেন সঙ্কোশ টি-গার্ডেনে। সেটা পড়ে মাসি একটা দীর্ঘ চিঠি লিখলেন, শেফালি খুব একটা সুবিধের মেয়ে নয়। এখানকার প্রচুর বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেদের মাথা চিবিয়ে খেয়েছে। কত সংসার যে ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই। কতগুলো বাচ্চা যে নষ্ট করছে, ও হয়তো নিজেও ভুলে গেছে।

জামাইবাবুর সঙ্গে ওর ঢলাঢলি দেখে এখানকার লোকেরা ভীষণ খেপে গিয়েছিল। ঠিক করেছিল, সালিশি সভা ডেকে হয় ওকে নেড়া করে গ্রামছাড়া করবে। আর তা না হলে, রাতের অন্ধকারে মেরে গাছে ঝুলিয়ে দেবে। সেটা শুনেই জামাইবাবু বোধহয় চুপিচুপি ভোররাতে ওকে নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে গেছে। সঙ্গে ‘পুনশ্চ’ করে লিখেছেন, শেফালির থেকে সাবধান। 

মা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক বাবা বিয়ে তো দিয়ে দিয়েছি। এখন আমাদের আর কোনও দায় নেই। কিন্তু ভালয় ভালয় কাজ মিটে গেলেও সমস্যা শুরু হল তার পর থেকেই। তিন মাসও কাটল না। শেফালি মাসি ফিরে এল আমাদের বাড়ি। বলল, তার স্বামী নাকি রোজ রাতেই মদ খেয়ে এসে তাকে পেটায়। আজ দিনদুপুরেই শুরু করেছে। তাই সে এখানে চলে এসেছে। 

সেই রাতেই আমাদের বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করলেন শেফালির স্বামী। তিনিই জানালেন, গত তিন মাস ধরে রোজই দুপুরবেলায়, যখন তিনি বাড়ি থাকেন না, তখন উনি চুপিসাড়ে শেফালির কাছে যান। পাড়ার লোকেদের মুখে এ কথা শুনে তিনি তাই কয়েক জনকে নিয়ে তক্কেতক্কে ছিলেন। আজ একেবারে খুব খারাপ অবস্থায় হাতে-নাতে ধরে ফেলেছেন। 

বাবা ওখান থেকে কোনও রকমে পালিয়ে এলেও শেফালি পালাতে পারেনি। তাই তাকে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, এ সব করা ঠিক নয়। কেন এ সব করছ? এখন তোমার বিয়ে হয়েছে। পেটে দু’মাসের বাচ্চা। এ সব করা কি তোমাকে মানায়?

না। আমার কোনও কথা ওর কানে ঢুকছিল না। গুম মেরে বসে ছিল। তাই আশপাশের মেয়ে-বউরা রেগে গিয়ে কেউ কেউ ওর চুলের মুঠি ধরে টেনেছে। কেউ কেউ দু’-চার ঘা দিয়েওছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও সবটা আটকাতে পারিনি। হয়তো ওর একটু লেগেওছে। তাই কাঁদতে কাঁদতে চলে এসেছে।

উনি ও কথা বললেও বাবা অন্য আর একটা গল্প ফেঁদে বসলেন। বললেন, আমি ওকে মেয়ের মতো ভালবাসি। তাই ওকে দেখতে যাই। সেটা কী অপরাধ? ওর বর যদি আপত্তি করে, তা হলে আমি যাব না।

শেফালি মাসির বর বাবার মুখের উপরে বলে দিয়েছিলেন, না। যাবেন না। একদম যাবেন না।

সঙ্গে সঙ্গে শেফালি বলে উঠল, কেন যাবে না? আলবাত যাবে। একশো বার যাবে। আমি যেখানে থাকব ও সেখানেই যাবে। তোমার যদি আপত্তি থাকে তা হলে তুমি অন্য রাস্তা দেখো।

শুরু হল কথা কাটাকাটি। ঝগড়া। চিৎকার চেঁচামেচি। লোকজন ভিড় হয়ে গেল। এ ও মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। কানাঘুষো করতে লাগল। কেউ কেউ আমাদের ভাইবোনদের জিজ্ঞেস করতে লাগল, কী হয়েছে রে?

বুঝতে পারছিলাম, পাড়ার লোকেরা খুব মজা পাচ্ছে।

শুধু সে দিনই নয়, এই ঝামেলা রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। একদিন সকালে উঠে হঠাৎ শুনলাম, বাবা নাকি শেফালি মাসিকে নিয়ে পালিয়ে গেছেন। যাওয়ার সময় বড়দির হাতে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছেন। আর বলে গেছেন, তোর মা মারা গেলে খবর দিস।

কিন্তু কোথায় খবর দিতে হবে সেটা আর বলে যাননি। তাই বাবাকে খোঁজার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। বুঝতে পারলাম, আমার বাবা যে শেফালিকে নিয়ে পালিয়ে গেছে, সেটা আমরা জানার আগেই পাড়ার লোকেরা জেনে গেছে। আর সে জন্যই বুঝি, গত কালও যাদের সঙ্গে আমি খেলেছি, একরাত্রের মধ্যেই তারা কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। পাড়ার ব়ড়রা কী রকম ভাবে যেন দেখছে। সেই দিনই টের পেয়েছিলাম, এক ধাক্কায় আমার বয়স কুড়ি বছর বেড়ে গেছে।

বাবা পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছেন। কিন্তু সস্তার বাজার হলেও পঞ্চাশ টাকায় আর ক’দিন চলে! তাই মা উঠেপড়ে লাগলেন একটা কাজের জন্য। যে কাজ করলে কম হোক, প্রতি মাসে নির্দিষ্ট একটা টাকা তো পাওয়া যাবে। বাচ্চাদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো কিছু তো দিতে পারবেন। একদিন জানতে পারলাম, মা একটা চাকরি পেয়েছেন। বেঙ্গল ল্যাম্পে।

মা অফিস যেতেন। কিন্তু যে মাইনে পেতেন, তাতে কুলোত না। অফিসের মধ্যেই টিফিনের সময় কাপড় বিক্রি করতেন। তিন মাসের ইনস্টলমেন্টে। পাশাপাশি পিয়ারলেসও করতেন। সাত তারিখে মাইনে পেলেই আমাদের জন্য ইয়া বড় বড় রসগোল্লা নিয়ে আসতেন। না। চার আনার না। পঞ্চাশ পয়সারটা। কারণ নিমন্ত্রণ বাড়ি ছাড়া আমাদের রসগোল্লা খাওয়ার কোনও ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু ওই ঘটনার পর আমাদের তো কেউ আর নিমন্ত্রণ করতেন না। তাই প্রতি মাসের সাত তারিখে...

অফিস থেকে ফিরেই বাবার ছবি নিয়ে কোনও দিন মা চলে যেতেন নিউ আলিপুর ব্রিজের ও পারে। ও দিকে গেলেই ভয়ে আমার বুক থরথর করে কাঁপত। শুনেছিলাম, ভরদুপুরেও ওই ব্রিজের উপরে কেউ উঠলে ডাকাতরা নাকি তার ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে নদীতে ফেলে দেয়। তাই ব্রিজের ও পারে পেট্রল পাম্পের কাছে পাঁচ কাঠা জমি নেওয়ার জন্য কে যেন মাকে খুব ধরে ছিল। সে বলেছিল, এক থোকে আড়াইশো টাকা দিতে না পারলে মাসে মাসে দেবেন। 

— বলেন কী? পাঁচ কাঠার দাম আড়াইশো টাকা! দাম শুনে আঁতকে উঠেছিলেন মা। বলেছিলেন, তাও ব্রিজের ও পারে! ওখানে কোনও লোক থাকে নাকি?

না। মা নেননি। পরে শুধু ওটাই নয়, পাঁচ-দশ কাটার ও রকম আরও অজস্র প্লটের প্রায় সব ক’টাই কিনে নিয়েছিল এল আই সি কোম্পানি। 

শুধু ব্রিজের ও পারেই নয়, মা কোনও কোনও দিন চলে যেতেন কুঁদঘাটে। আশপাশের দোকানে, ক্লাবে, স্থানীয় লোকদের ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, এ রকম দেখতে কোনও লোক কি এ দিকে ঘর ভাড়া নিয়েছেন? তখন ওখানে চাষবাস হত। সস্তায় চাল পাওয়া যেত। আনতে গেলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল। তবুও ফেরার সময় যতটা পারতেন, মা ওখান থেকে লুকিয়ে চাল নিয়ে আসতেন। 

আমরা তখন খুব ছোট। মা বেরোলেই আমরাও যে যার মতো খেলতে বেরিয়ে যেতাম। কেউ কারও কথা শুনতাম না। ঝগড়া করতাম। মারামারি করতাম। একদিন আমার মেজদি ঘরঝাঁট দিতে দিতে যেই দেখেছে আমার ছোট ভাই পা না ধুয়েই ঘরে ঢুকেছে, আর যায় কোথায়? হাতের ওই ঝাঁটা দিয়েই ওকে এমন মার মেরেছিল যে সারা গায়ে কালশিটে পড়ে গিয়েছিল। 

মা ঠিক করলেন, আমাদের আর একসঙ্গে রাখবেন না। মায়ের দূর সম্পর্কের এক বোনের বাড়ি ছিল হাওড়ার দাশনগরে। সেখানে আমাকে আর আমার মেজদিকে কয়েক দিনের জন্য রেখে এলেন। মায়ের বিশ্বাস ছিল, মানুষের বিপদে-আপদে আত্মীয়রাই পাশে এসে দাঁড়ায়। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

আমার কোনও দোষ ছিল না। মেজদিরও না। ওই মাসির মেয়ের সঙ্গেই আমরা পাশের পুকুরে গিয়েছিলাম। মা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলেন, কোনও দুষ্টুমি করবি না। মাসি যা বলবে, তাই শুনবি। চুপিচুপি বলেছিলেন, না হলে কিন্তু মাসি তোদের রাখবে না। 

তাই মাসির মেয়ে পুকুরে নেমে ঝাঁপালেও আমরা দুই ভাইবোন কিন্তু মগ নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়েই স্নান করেছিলাম। তবু পর দিনই আমাদের দু’জনকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন সেই মাসি। আমরা নাকি কোনও কথা শুনি না। একা একা পুকুরে নামি। ডুবে গেলে?

পর দিন অফিস যাওয়ার সময় আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে, পীতম্বর ঘটক লেনে, ঠাকুমার বাড়ির দরজার কাছে আমাদের ছেড়ে দিয়ে মা বললেন, তোরা ঠাকুমার বাড়িতে থাক। কিছু খেতে দিলে খাবি। না দিলে চাইবি না। ঠাকুমাকে বলিস, আমি বিকেলে এসে তোদের নিয়ে যাব।

আমরা ভিতরে ঢুকতেই সেজো কাকিমা রে রে করে উঠলেন, মা দেখুন, ওই যে, পুরো চিড়িয়াখানা চলে এসেছে। রাবুইনা গুষ্টি। দ্যাখেন, কাইলকার কোনও রুটি-টুটি আছে কিনা… ঠাকুমা আমাদের একটা তুবড়ে-তাবড়ে যাওয়া কানা-উঁচু থালায় তিনটে বাসি রুটি আর একটু ভেলিগুড় দিয়ে বললেন, তোরা ভাগ কইরা খা।

মা যখন আমাদের নিতে এলেন, কাকিমারা সব লাফিয়ে পড়লেন। কী হয়েছে গো তোমার ছেলেমেয়েগুলো। বাব্বাঃ, খালি খাই খাই। আমাদেরও তো ছেলেপুলে আছে। কই, তারা তো এ রকম না।

মা আমাদের নিয়ে এলেন। পর দিন অফিস যাওয়ার সময় গলির মুখে আমাকে আর বড়দিকে খাতা-পেনসিল দিয়ে বসিয়ে বললেন, এখান থেকে যত গাড়ি যাবে, সব ক’টার নাম্বার টুকে রাখবি। একটাও যেন বাদ না পড়ে। আমি মিলিয়ে দেখব। যে সব ক’টা লিখবে, তাকে কাল হজমি কিনে দেব। আর যার বাদ পড়বে, তার যে ক’টা বাদ পড়বে, তাকে গুনে গুনে সেই ক’টা কানমলা দেব।

আমি রোজ রোজ কানমলা খেতাম। একদিন খুব সতর্ক হয়ে লিখলেও মা যখন বললেন, আজও দুটো লিখিসনি? তখন বুঝতে পারলাম, আমার বড়দি হজমির লোভে ইচ্ছে করে বানিয়ে বানিয়ে দু’-একটা নাম্বার বেশি টুকে রাখে।

মাকে সে কথা বলতেই মা বললেন, ঠিক আছে, তা হলে আর গাড়ির নাম্বার নয়। কাল থেকে তোরা মানু‌ষ দেখবি। কত লোক রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে। তাদের মুখ দেখবি। দেখবি, ওইটুকু একটা মুখ, তার দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাক, একটা মুখ, অথচ কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। যদি হুবহু একই রকম দেখতে দুটো লোক পাস, তা হলে দ্বিতীয় জনের নাম-ঠিকানা লিখে রাখিস। কেমন?

আমরা লোকের মুখ দেখতাম। হাঁটা-চলা দেখতাম। যারা আমাদের বন্ধু ছিল, তাদের কাউকে দেখলে, কথা বলতে যেতাম। আর অমনি তাদের বাবা-মায়েরা তাদের টেনে নিয়ে চলে যেতেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে দিতেন না। আমার সামনেই আমার এক বন্ধুকে ওর মা বলেছিলেন, একদম ওর সঙ্গে মিশবি না। 

আমি যখন দেখতাম, আমার বয়সি ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের হাত ধরে কী সুন্দর যাচ্ছে। চাইতে না-চাইতেই বেলুন কিনে দিচ্ছে। আইসক্রিম কিনে দিচ্ছে। স্কুল-বাসে তুলে দেওয়ার আগে চুল ঠিক করে দিচ্ছে। তখন আমার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠত। মনে মনে ভাবতাম, আমার বাবা কি হারিয়ে গেল!

না। বাবা হারাননি। খোঁজ করতে করতে মা একদিন হদিশ পেয়ে গেলেন বাবার। বেহালার রায় বাহাদুর রোডে শেফালিকে নিয়ে ঘর ভাড়া করে আছেন। পাড়ার লোকজন দল বেঁধে গিয়ে বাবাকে ধরে নিয়ে এল।

পাড়ার মাতব্বর ছিলেন দেবু ঘোষ। কংগ্রেস করতেন। ধুতি আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পরতেন। উনি বললেন, তুমি যদি বউ-ছেলেমেয়েদের ঠিক মতো না দ্যাখো, তা হলে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে চাবকে তোমার পিঠের চামড়া তুলে নেব। মাকে বলে গেলেন, ও ঠিকঠাক মতো চলে কিনা খেয়াল রাখবে। কোনও বেয়াদপি দেখলেই আমাকে জানাবে। কেমন?

মা প্রায়ই পার্টি অফিসে গিয়ে জানিয়ে আসতেন। যেতে যেতে কী করে যে মা সেবা দলের সদস্য হয়ে গেলেন কে জানে! মিছিলে যেতেন। অনশনে যোগ দিতেন। আমার বেশ মনে আছে, মায়ের সঙ্গে আমিও একবার সল্টলেকে গিয়েছিলাম। তখনও সল্টলেক হয়নি। লবণহ্রদ। আমাদের বাস যাচ্ছিল। আর আমি পিছনের কাচ দিয়ে দেখছিলাম, ধু ধু প্রান্তরটা লাল ধুলোয় কেমন ধোঁয়ার মতো ঢেকে যাচ্ছে। ওখানে সে বার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন। তাঁর রাত্রিবাসের জন্য খড়ের যে ঘরটা বানানো হয়েছিল, তার জন্য নাকি খরচ হয়েছিল এক লক্ষ টাকা। সে সময় একদিনের জন্য অত টাকা অপচয় করা নিয়ে খুব হইচই হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে।

মা মিছিলে-টিছিলে যেতেন। পার্টির লোকজনদের সঙ্গে মিশতেন। তাই বাবা বলতে শুরু করলেন, আমার মায়ের চরিত্র খারাপ। নিশ্চয়ই ওই পার্টির কারও সঙ্গে মায়ের কিছু একটা আছে।

বাবা এটা বলতেই মা পার্টি অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাবা তখন মাঝে মাঝেই মাকে মারধর করতেন। মা কোনও প্রতিবাদ করতে পারতেন না। পড়ে পড়ে মার খেতেন। একবার সংসারের রোজকার হিসেব লিখতে লিখতে বাবা এমন ভাবে পেন ছুড়ে মেরেছিলেন যে, মায়ের ঠিক চোখের নীচে ঝর্না কলমের নিব গেঁথে গিয়েছিল।

তবু কারও কাছে মা কখনও অভিযোগ করতেন না। পাড়ার লোকজনদের বলার জন্য মাকে আমরা বললেই, মা বলতেন, কাকে বলব বল? যাকে বলতে যাব, তাকে নিয়েই আমাকে জড়িয়ে এমন এমন সব বাজে বাজে কথা বলবে, আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারব না।

পাড়ার লোকেরা যে দিন বাবাকে ধরে নিয়ে এলেন, সে দিন থেকে বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন বাবা। আমাদের ভাইবোনদের সে কী আনন্দ। যেন বাড়িতে বাবা থাকার চেয়ে বড় আনন্দ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। অথচ কয়েক দিন যেতে না যেতেই আমার মনে হল, বাবা গেলেই বাঁচি। ঈশ্বর বুঝি ছোটদের কথা শুনতে পান। তাই একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম— বাবা উধাও।

কোথায় যেতে পারেন! কোথায়! প্রচুর খোঁজাখুঁজি করলাম। মায়ের সঙ্গে বাবার অফিসে গিয়ে ধরনা দিলাম। কিন্তু কেউই কোনও হদিশ দিতে পারলেন না। পারলেন না, না ইচ্ছে করে দিলেন না, বুঝতে পারলাম মা। কেউ বললেন, বাবা অন্য ডিপার্টমেন্টে চলে গেছে। কেউ বললেন, ব্রেস ব্রিজের কাছে আমাদের আর একটা অফিস আছে, সেখানে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। আবার কেউ বললেন, ও তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।

আসলে ওই অফিসের মধ্যেই বাবা সুদের ব্যবসা করতেন। মাসে শতকরা চার টাকা হারে সুদে। বাবার কাছ থেকে তাঁর অফিসের প্রায় সকলেই টাকা নিতেন। ফলে বাবা তাঁর বউ-ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্যায় করছে বুঝতে পেরেও বাবার সহকর্মীরা বাবার পক্ষ নিতেন। বাবা যা বলতেন, তাই করতেন। এবং আমরা যাওয়ার আগেই, আমরা যে যাচ্ছি, সে খবর বাবার কাছে পৌঁছে যেত। এবং মুহূর্তের মধ্যে বাবা গা ঢাকা দিয়ে দিতেন।


সেই বাবা! এত বছর বাদে এখানে! দেখে তো মনে হচ্ছে বহাল তবিয়তেই আছেন। অথচ আমরা কেমন আছি, একবারও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি! সামনাসামনি দেখা হয়ে গেছে দেখে এখন জিজ্ঞেস করছেন, ভাল আছি কি না?

আমার বলতে ইচ্ছে করছিল, না। ভাল নেই। আমরা একদম ভাল নেই। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হল, কেন বলতে যাব! এই লোকটা আমাদের কে! জন্ম দিলেই কি বাবা হওয়া যায়? বাবার কর্তব্য পালন করতে হয়। যা তিনি কখনওই করেননি।

অন্য কেউ হলে কিংবা একদম অপরিচিত কেউ হলেও উত্তর দিতাম। কিন্তু বাবার কথার কোনও উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না। আমি পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করলাম। যেখানে যাচ্ছিলাম, সেই রাসবিহারীর দিকে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Siddhartha Singha

Similar bengali story from Tragedy