Indranil Majumder

Inspirational


4.0  

Indranil Majumder

Inspirational


এক বিখ্যাত বাঙালি ব্যবসায়ীর গল্প

এক বিখ্যাত বাঙালি ব্যবসায়ীর গল্প

4 mins 78 4 mins 78

রমেশ মিত্র মহাশয় একজন নামকরা ব্যবসায়ী। গড়িয়ায় বাজারের পাশে তাঁর একটি মস্ত বড়ো দোকান রয়েছে, যাতে প্রায় সব ধরনের খাওয়ারই পাওয়া যায়। তা, তিনি একদিন দোকান সেরে বাড়ি ফিরছিলেন রাস্তায় হঠাৎ পাড়ার মোড়ে ক্লাবের সামনে বিধুবাবু ওরফে বিধুশেখর দাসের সাথে দেখা। বিধুবাবু স্কুল মাষ্টারি করতেন। এখন রিয়াটার্ড। তা সেই বিধুবাবু আজ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, " কি হে ভায়া? বলি মতিলাল শীলের নাম শুনেছেন?"


রমেশবাবু তো আকাশ থেকে পড়লেন, " অ্যাঁ, মতিলাল…..কি যেন বললেন?


-আরে বাপু, মতিলাল শীল। নাম শুনেছেন?


-না মশাই, ওরকম কারুর নাম শুনিনি। তা কে তিনি?


-হে হে।ব্যবসা করো তা মতিলাল শীলের নাম শোনোনি?


-সারাদিনই প্রায় দোকানে কাটাই। বই পড়ার সময় কই?


-তোমাকে আর দোষ দিয়ে লাভ নেই। অনেক বাঙালি আজ ভুলে গেছে মতিলাল শীলকে। কি আর করা যায়!


-তা বলুন না মতিলাল শীলের কথা।শুনি একটু, সারাদিন দোকান করে একটু গল্প না করলে হয়।


-রসো বাপু, বসো।


রমেশবাবু পাশের সীটে বসলেন আর বিধুবাবু মতিলাল শীলের গল্প আরম্ভ করলেন।


"মতিলাল শীল ছিলেন বাংলার একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী। শুধু কি ব্যবসায়ী? তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবী।ব্যবসার সাথে অনেক দান-ধ্যানও করতেন। অর্থাৎ ব্যবসাদার আর সমাজসেবক আবার দান-ধ্যানেও বিশেষ খ্যাতি ছিল।রাজা রামমোহন রায়ের পর তিনি জন্মেছিলেন।তিনি জন্মেছিলেন ১৭৯২ সালে।তিনি জন্মেছিলেন সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে।মতিলাল ছিলেন বংশানুক্রমে চৈতন্য অনুগামী পরম বৈষ্ণব।তাঁর বাবার নাম চৈতন্যচরণ শীল,যিনি ছিলেন তখনকার আমলে চীনাবাজারের একজন কাপড় ব্যবসায়ী।


-তা তিনি থাকতেন কোথায়?


-উত্তর কলকাতার কলুটোলার নাম শুনে থাকবে।তিনি সেখানে থাকতেন।দুঃখের বিষয় মতিলাল শীল মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতাকে হারান।এক আত্মীয়ের সংসারে তিনি বাস করতে থাকেন। ছোটবেলায় লেখাপড়ার সুযোগ বেশি পাননি। তখনকার দিনে এত লেখাপড়ার সু্যোগও ছিল না। লেখাপড়ার মাধ্যম ছিল টোল ও পাঠশালা। তা তিনি পাঠশালায় বাংলা ভাষা ও শুভঙ্করের অঙ্ক প্রণালি খুব মনযোগ সহকারে শেখেন। তিনি কিছুকাল পড়েছিলেন মার্টিন বোল(Martin Bowl)-এর ইংরেজি স্কুলে।পরে নিত্যানন্দ সেনের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।তখন সবে কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করছিলেন। কেননা, ইংত্রেজি জানলে কোম্পানির অফিসে কাজ পাওয়া যেত।যাইহোক,মতিলাল শীল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিলেভ করেননি বটে কিন্তু তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা ছিল ব্যাপক বুঝলে ভায়া। মতিলাল ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে সামান্য বেতনে কিছুকাল চাকরি করেছিলেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে সামরিক কর্মচারীদের তিনি প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করতেন। আর এইভাবেই তিনি তাঁর অর্থোপার্জন শুরু করেছিলেন। তারপর,অল্প পুঁজি সংগ্রহ করেই স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করেন।সেই ব্যবসা হল শিশি বোতল এবং ছিপির। কিছুদিন তিনি বালিখালের কাস্টমস দারোগার কাজ করেছিলেন।১৮২০ থেকে ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত-এই দীর্ঘ চৌদ্দ বছর বিভিন্ন ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানে হিসাব রক্ষক বা করণিক যাদের তখনকার দিনে মুৎসুদ্দী বলা হতো, তো সেই মুৎসুদ্দীর কাজ করেছিলেন এই মতিলাল শীল। আর ওই সময়তেই তিনি আমদানী ও রপ্তানীর ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।আর এই ব্যবসা করেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।এদেশে তিনি হয়ে ওঠেন রুস্তমজী কাওয়াসজী এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত প্রতিপত্তিসম্পন্ন বিখ্যাত একজন ব্যবসায়ী। 


-বাহ্‌, বেশ ইন্টারেস্টিং! তারপরে বলুন…


-এরপরেরটা তো আরও ইন্টারেওস্টিং। মতিলালের অর্থ আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটলে তিনি জাহাজ শিল্পে যোগ দেন। তখনকার দিনে যা ছিল অর্থোপার্জনের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। কেননা তখনকার দিনে জাহাজই ছিল দেশের মধ্যে ও বিদেশেও আমদানী ও রপ্তানী করার সেরা মাধ্যম। তখন না ছিল বাস, না ছিল রেল, এরোপ্লেন তো দূর অস্ত। তা মতিলাল জাহাজ শিল্পে যোগ দিয়ে বিদেশীদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন।আন্তর্দেশীয় অর্থাৎ দেশের মধ্যে জাহাজ ব্যবসায়ে মতিলালই প্রথম যিনি বাষ্পীয় পোত ব্যবহার করেছিলেন।


-বাহ্‌, খুব ভালো লাগছে।


-ভালো লাগারই যে কথা। ব্যাবসার সাথেও বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মে বা সমাজসেবায় তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শীলস্ ফ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে ইহুদী শিক্ষকদের এনে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।যা তখনকার দিনে বিস্ময়ের ব্যাপার। আরও বিস্ময়কর, তিনি ছিলেন 'ধর্মসভা'-র একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি কিন্তু তা সত্ত্বেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রবর্তিত বিধবা বিবাহ আন্দোলনকে সমর্থক করেছিলেন। তাঁকে বিভিন্ন জনহিতকর কাজে বহু অর্থ ব্যয় করতে দেখা যেত। এই যেমন, তিনি ১৮৪৬ সালের ১লা মার্চ তারিখে হিন্দু চ্যারিটেবল ইনস্টিটিউশন এবং ১৮৫৩ সালের মে মাসে হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে অর্থসাহায্য দিয়ে বিশেষ সহযোগিতা করেছিলেন। বেলঘরিয়ায় মতিলাল ঘাট খুব বিখ্যাত। অনেকেই এই ঘাটের নাম শুনে থাকবেন। ১৮৪৬ সালে মতিলাল স্বয়ং বেলঘরিয়ায় অতিথিশালা এবং স্নানার্থীদের জন্য গঙ্গাতীরে এই মতিলাল ঘাট স্থাপন করেছিলেন। এমনকি,কলকাতা মেডিকেল কলেজের জন্যে বহু জমি তিনি দান করেছিলেন।১৮৫৪ সালের ২০শে মে(অনেকের মতে ২১ কি ২৯ শে মে) তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। 


-অসাধারণ! অসাধারণ, মশাই। জেনে যে কি ভালোলাগছে, তা আপনাকে কিভাবে বোঝাবো? আমি নিজেই একজন ব্যবসাদার অথচ স্বনামধন্য বাঙালি ব্যবসায়ী মতিলাল শীলের নাম জানি নি। এ যে আমার পক্ষে সত্যিই লজ্জার ব্যাপার। 


-শুধু আপনার কেন? গোটা বাঙালি সমাজে ক'জন জানে মতিলাল শীলের নাম। এই যেমন ধরুন আমি নিজেও জানতুম না। দুপুরে শোওয়ার আগে বইয়ের তাক থেকে সংসদের বাঙালি চরিতাভিধানটা নামিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখছিলাম। আর তখনই পাই মতিলাল শীলের নাম।তারপর মোবাইলে নেট ঘেঁটে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করলাম। তা সেইসব পড়েই এত ভালো লাগলো, ভাবলাম রমেশবাবু তো ব্যবসা করেন তা ওঁকেই শোনানো যাবে খন মতিলাল শীলের গল্প।এই গল্প প্রতিটা বাঙালির জানা উচিৎ।

-ঠিক বলেছেন।আজও অনেকেই মনে করেন যে বাঙালির দ্বারা নাকি ব্যবসা হয় না। অথচ চাঁদ সওদাগর, মতিলাল শীল, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আলামোহন দাশ সহ অনেকেই প্রমাণ করে গেছেন যে বাঙালিরাও সফলভাবে ব্যবসা করতে পারে। তাঁরা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন সেই প্রবাদ বাক্যটি- "বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী"।


-তা তোবটেই! তা, নেটে আশা করি মতিলাল শীলের ছবি পেয়ে যাব। এর মধ্যেই তাঁর ছবি জোগার করে দোকানে রাখব ভাবছি। তাহলে বাঙালি ব্যবসাদার আরও গর্ববোধ হবে। 



Rate this content
Log in