এ তুমি কেমন তুমি
এ তুমি কেমন তুমি
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
ছুটকি ও কালীচরণ হাজারিবাগে ফিরে এসে যখন শুনল লোকটা গুণীন নয়; স্বয়ং সাহেব ছিল , ছুটকি বলে ফেলল - ইসস্ ধইরতে পাইরলেনা গ ! এই জন্যি আমাদের কোডার্মায় পাঠাঁই দিল গ ।
কালীচরণ বলল - বাবুজীকে বল্যে ছিলম কেমন সন্দ হয়। শুইনল না । চল চল ছুটকি হাসপাতালে যাই।
হাসপাতালে পুলিশ পাহারা আছে । ওদের ঢুকতে বাধা দিল পুলিশ। কড়া হুকুম আছে ডাক্তারদেরও চেকিং করে তবে যেতে দিতে হবে , প্রয়োজনে পুলিশও যাবে তাঁর সঙ্গে ।
কালীচরণ বলল - তা'লে চল আমরা কুথাও যেইয়ে বসি।
ছুটকি বলল - দাঁড়া গ বাপ । আমারে এক বার দেইখতে দে ।
- কি করবি ?
- দেখ না ভাল্যে ভাল্যে ( মানে চেয়ে চেয়ে ) । এই গেলম আর এলম ।
ছুটকি ঘরের দিকে একটু এগিয়ে গেল । চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল - অ গ লাহিড়ী ঠাকুর । ছুটকি আইছে গ । গুণীনটো আমাদের ফাঁসায়ে পালাল্য ।
লাহিড়ী মশাই শুনতে পেলেন ছুটকির গলার আওয়াজ। পালও বুঝতে পারলেন ছুটকিরা এসেছে । বেড ছেড়ে বেরিয়ে এলেন মিঃ পাল ।
ছুটকিকে লাহিড়ী মশাইয়ের অবস্থা তথা সব ঘটনা বললেন । ছুটকির খুব রাগ হয়ে গেল লোকটার উপর । ভালো মনের মানুষকে কেউ এ ভাবে জব্দ করে !
সেই প্রথম ছুটকির মনে পরিবর্তন এল । - এই জন্যই গুণীনটা কু লজরে চাইত গ আমার দিকে । উটো যে ওই সায়েবটই ছিল আমিও ভাব্যেছি । কিন্তু কেমন কায়দা কইরে আমাদের সরাঁই দিল্য । ঠিক আছে আমার নামও
ছুটকি - দেখ্যে লিব ইবারে ।
ছুটকি চলে এল কালীচরণের কাছে । রাতটা হাসপাতালে কাটিয়ে ভোর ভোর রওনা দিল । কালীচরণ বারবার প্রশ্ন করে - কুথায় লিয়ে যাছিস ?
- চল না, দেইখে লে কি করি।
মেয়ের দৃঢ়তা দেখে কালী চুপ করে যায় ।
ভুলবশত একটা আন্ত:রাজ্য বাসে উঠে পড়ে । বাস ছেড়ে দেয়। বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে কণ্ডাক্টর যখন টিকিট কাটতে আসে ছুটকি টাকা দিয়ে বলে - দুটা পাকুড় ।
কণ্ডাক্টর বলে - এই বাস তারাপীঠ যাবে আসানশোল দিয়ে ।
ছুটকি বলে - অ । তবে উখেনেই নে চল ।
- তার জন্য দুজনের আরও একশ টাকা লাগবে।
কালীচরণ গাঁটের তোড়া থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে কণ্ডাক্টরকে দিল ।
কালীচরণ আর কণ্ডাক্টরকে অবাক করে দিয়ে ছুটকি বলল - পয়সা ফেরত দে । ইখেনেই নেমে যাই।
কণ্ডাক্টর বলল - এখানে ? এ যে জঙ্গল ।
- আমরা ত জংলিই । বাস থামা । নামব ।
ওদের নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেল । জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে পৌঁছাল একটা খড়ের চালাঘরে। কেউ থাকতে পারে ভেবে ছুটকি ডাকতে লাগল - কেউ আছ গ?
কোন উত্তর এল না । অথচ দরজা ভেতর থেকে বন্ধ । নিশ্চয় কেউ আছে। ছুটকি আবার ডাকল - কে আছ গ?
তবু কোন সাড়া নেই । ছুটকি অশান্ত হয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল । দরজা কেউ খোলে না । তখন কালীকে বলল - ধাক্কা মার । জোরসে ধাক্কা মার ।
কালী ধাক্কা মেরে দরজা খুলে দিল । দুজনে ভিতরে ঢুকতেই দেখে ধবধবে ফর্সা একজন লোককে খাটিয়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে । এক দেখাতেই ছুটকি বুঝে গেল এই সেই গোরা সাহেব ।
হো হো করে হেসে উঠল ছুটকি। ভগবানের মার একেই বলে।
কালীচরণ লিঠি উঁচিয়ে পেটাতে গেল । লোকটি গোঁ গোঁ করে ঈশারায় মুখের বন্ধন খুলে দিতে বলল । ছুটকি মুখটা খুলে দিতেই লোকটি বলল - হ্যাঁ, আমি এক সাহেব । রেডিও শ্রীলঙ্কার কর্মী। আমার নাম চার্লস কিংস্টন। তোমরা কে ?
- আহাহা ! চিনিস নাই ? আমি ছুটকি যে রে । আর এই আমার বাপ কালীচরণ ।
তবু লোকটা চিনতে পারল না । বলল - হয়তো তোমরা ঠিক চিনতে পেরেছ। তবে যাকে তোমরা চেন সে আমাকে এখানে বন্দী করে রেখে নিজে চার্লস সেজে নানা রকম কুকাজ করে বেড়াচ্ছে । আমি মাঝে মাঝে খবর পাই। ওর লোকেরাই খাবার আর খবর দিয়ে যায় ।
ওদের বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটা সত্যিই বলছে।
কালীচরণ বলল - তুই কি ওই ধুরন্ধর লোকটাকে চিনতে পারবি ?
আসল কিংস্টন বললেন - নিশ্চয় পারব । আমার সব মনে আছে । লোকটা কেমন করে আমাকে কিডন্যাপ করে এখানে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে নাচনী যোগাড় করতে ঝুমরিতিলাইয়া গিয়েছিল ।
ছুটকি ও কালীচরণ ওকে উদ্ধার করে নিয়ে এল রাজপথে বাস ধরবে বলে ।
( ক্রমশ )

